আরব্য রজনী পার্ট ৯ (Part 9) Alif laila

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
সে তাকে আঁকড়ে থাকা মেজো লেড়কিটাকে নিয়ে মেঝেতে ধপাস করে বসে পড়ল। আর ছােটটাকে নিচে শুইয়ে দিল। তার সদ্য উঁকি দেওয়া যৌবনের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইল। লেড়কিটার চোখের তারায় কাছে টানার ইঙ্গিত। ঠোটে দুষ্টুমি ভরা হাসি। অসহ্য যন্ত্রণা। বুকের ভেতরে জ্বলন্ত আগুন। আর বাইরে পিষ্ট হবার দুরন্ত বাসনা। যুবকটা কখন কৃপা করবে সে প্রতীক্ষায় থাকা তার পক্ষে সাধ্যাতীত। অধৈর্য হাতটা দিয়ে তার পেশীবহুল বাঞ্ছিত হাতটাকে জড়িয়ে ধরল। অস্থিরভাবে নিজের বুকের ওপরে রাখল। দু হাতে জাপ্টে ধরে শরীরের সর্বশক্তি নিয়ােগ করে চাপ প্রয়ােগ করল। দলন-পেষণের জন্য সে একেবারে মাতােয়ারা।

উদ্যানের কেন্দ্রস্থলে এক মনােরম সরােবর। সাদা আর লাল পদ্মের বিচিত্র সমারােহ ঘটেছে সরােবরের পানিতে। ফুরফুরে হাওয়ার তালে তালে আনন্দে নেচে বেড়াচ্ছে তার স্বচ্ছ পানি। বড় লেড়কিটা সরােবরের ধারে এসে দাঁড়াল। তার চোখের তারায় অবর্ণনীয় মাদকতা ভর করেছে। বাতাসে' তিরতিরকরে দুলছে তার গায়ের ওড়নাটা। না, বৃথা কালক্ষয় করতে রাজি নয় সে। এক ঝটকায় গা থেকে ওড়নাটা খুলে নিয়ে ঘাসের ওপর ছুঁড়ে ফেলল। এবার খুব ব্যস্ত - হাতে খুলে ফেলল কামিজের বােতাম ক'টা। শরীর থেকে নামিয়ে ফেলল সেটাকে। ভেতরের সরু একফালি অঙ্গবাস ছাড়া আর কিছুই রইল না তার যৌবনভরা দেহপল্লবে। উন্মাদিনী প্রায় সে নেমে গেল জলে। অঞ্জলিভরে জল নিল। যুবকটার গায়ে বার বার ছিটিয়ে দিতে লাগল। আর চোখের ভাষায় বলতে লাগল

– ' ওগাে, মনময়ুর, সরােবরের জল আমার কলিজার জ্বালা নিভাতে অক্ষম। এসাে, তুমি নেমে এসাে। একমাত্র তােমার উষ্ণ বক্ষই আমার দেহ-মনের জ্বালা নেভাতে পারবে।'

কিন্তু কে যাবে? কি করেই বা যাবে তার পিয়াস মেটাতে। যুবকটার দেহ-মন যে অসার হয়ে পড়েছে। ভেজা পােশাক পরিচ্ছদ গায়ে নিয়েই অলস-অবশ হয়ে সরােবরের তীরে সে পড়ে রয়েছে।মেহবুবার দিক থেকে কোন

সাড়া না পেয়ে নগ্ন প্রায় বড় লেড়কিটা জল থেকে উঠে এল। এক চিলতে কাপড় যা তার ভরা যৌবনকে কোনরকমে সামলেটামলে রেখেছিল, জলে ভিজে যাওয়ায় তা-ও যেন অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে।

তার উদ্ভিন্ন যৌবনচিহ্ন এখন স্পষ্টতর হয়ে চোখের সামনে ফুটে উঠেছে। বাঁধনমুক্ত হয়ে ফুটে উঠেছে।জল থেকে উঠে এসেই বড় লেড়কিটা আছাড় খেয়ে পড়ে অচৈতন্য প্রায় যুবকটার ওপর। মুহূর্তে যুবকটার মধ্যে সংজ্ঞা ফিরে আসে। সে তার সুদৃঢ় হাত দুটো বাড়িয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কামােন্মাদিনী বড় লেড়কিটাকে। তার বক্ষের উষ্ণতা ভেজা কাপড়ের চিলতেটার শৈত্যকে লােপ করে দিয়ে যুবকের প্রশস্ত বক্ষের আড়ালে ডুব দিল। যেন হারিয়ে যেতে, নিজেকে নিঃশেষে উজাড় করে দেওয়াতেই তার যত আনন্দ, যত সুখ। মেয়েটা যুবকের পেশীবহুল হাতের পেষণে বার বার কঁকিয়ে উঠতে থাকে। তবু তার বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে উৎসাহী নয় মােটেই। পুরুষের হাতের পেষণ, দলন তার নির্যাতনের মাধ্যমেই যৌবন - জ্বালা, দেহের কামনা বাসনা পরিতৃপ্তি লাভ করে এক সময় বড় লেড়কিটার অবসন্ন দেহপল্লবটা যুবকের বুকের ওপর ঢলে পড়ে।মেজো লেড়কি এবার নিজেকে বসনমুক্ত করে ঝাপিয়ে পড়ল সরােবরের জলে। কিছু সময় অস্থিরভাবে সাঁতার কাটল। তারপর  ব্যস্ত পায়ে উঠে এল জল থেকে। ঝাপিয়ে পড়ল কামােন্মাদনা লাঘবের উদ্দেশ্যে যুবকটার ওপর। আবার শুরু হ’ল দলন, পেষণ, মাতন, সম্ভোগ | এবার আসন্ন যৌবনা ছােট লেড়কিটা সরােবরের পানিতে কয়েক মুহূর্ত কাটিয়ে উঠে এল। ঘাসের ওপর এলিয়ে পড়ে থাকা যুবকটার ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। শুরু হ’ল পূর্বরীতি অনুসারে দাপাদাপি ঝাপাঝাপি। দীর্ঘ সময় ধরে যুবকটার কাছ থেকে সঙ্গ সুখ নিঙড়ে নিয়ে ঘাসের ওপর এলিয়ে পড়ল তার তাজা ফুলের মত দেহটা।

কুলি-যুবকটা কিছুক্ষণ পরিতৃপ্ত দেহ-মনে ঘাসের ওপর এলিয়ে পড়ে থাকার পর উঠে বসল। ধীর-পায়ে এগিয়ে গিয়ে নামল সরােবরে। দীর্ঘ সময় ধরে গােসল করে সাফসুতরা হয়ে উঠে এল।বড় লেডকির শিয়রে গিয়ে বসল। তার গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বলল – সুন্দরী, তােমাকে ছেড়ে যাওয়া যে আমার পক্ষে সম্ভব নয়।' | লেডকিটা তার কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে বল্ল – ‘তুমি ছেড়ে যেতে চাইলে বা আমি ছাড়ব কেন? একবার যখন তােমাকে বুকে ঠাই দিয়েছি তখন আর তােমাকে ছাড়ব, ভাবছ কি করে মেহবুব আমার?'  ভাবাপ্রত মনে টুকরাে টুকরাে কথা বলতে বলতে তারা যে কখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল তা নিজেরাই জানে না। আর হবে-ই না বা কেন? কয়েক ঘণ্টা ধরে দেহ ও মন উভয়ের ওপর দিয়ে যে কী ধকল গেছে তা আর কহতব্য নয়।।

সন্ধ্যার কিছু পরে বড় লেড়কিটার ঘুম ভাঙল। অন্য সবাইকে ডাকাডাকি করে তুলল।কুলি যুবকটা ঘুম থেকে উঠে বিদায় নেবার জন্য প্রস্তুতি নিল। কিন্তু যেতে চাইলেই বা তাকে যেতে দেয় কে? তিন বােনই তার পথ আগলে দাঁড়াল। একটামাত্র রাত্রি তাদের সঙ্গদান করার জন্য | বার বার মিনতি জানাল। তাদের অনুরােধ উপেক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব হ’ল না।বাধ্য হয়েই সেখানে তাকে রয়ে যেতে হ’ল।

বড় লেড়কিটা কুলি যুবকটার হাত ধরে ভাবাপ্লুত কণ্ঠে বলল - নাগর আমার, চল তােমাকে একটা জিনিস দেখাব। দরজার পাল্লায় কি লেখা রয়েছে, দেখবে চল।

দরজার কাছাকাছি গিয়ে বড় লেড়কিটা দরজার পাল্লার গায়ের একটা লেখার দিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করল। সেখানে লেখা রয়েছে – তােমার কাছে সুখদায়ক কি বিষাদময় তা নিয়ে ভেবাে না। যা করার নির্দেশ দেবে তা-ই নির্বিবাদে পালন করবে। অন্যের ব্যাপার স্যাপার নিয়ে মােটেই মাথা ঘামাতে যেয়াে না।'

কুলি যুবকটা লেখাটা পড়ার পর বলল – 'আমি এর আদেশ অমান্য করব না কথা দিচ্ছি।

ইতিমধ্যেই প্রাসাদের বাইরের বাগানে পাখিদের কলরব শুরু হয়ে গেছে। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

                        দশম রাত্রি।
বাদশাহ শারিয়ার-এর অনুরােধে বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা শুরু করলেন - এদিকে রাত্রি গভীর হওয়ার আগেই মেয়ে তিনটা কুলি যুবকটাকে নিয়ে খানাপিনা করতে বসল। সবে তার খাবারের থালা কাছে টেনে নিয়েছে এমন সময় দরজার কড়া নড়ে উঠল। _ বড় লেড়কিটা উঠে দরজা খুলে দিল। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে হাসি হাসি মুখে ফিরে এসে বলল – ' আজ যে কার মুখ দেখে সকাল হয়েছিল তাই ভাবছি। তিনজন বিদেশী আমাদের বাড়িতে থাকতে চাইছে। কারাে মুখেই দাড়ি-গোঁফ দেখলাম না। আর সবারই বাঁ চোখ কানা। আর তাতে কলুর বলদের মত ঠুলি বাঁধা। রমদেশের অধিবাসী বলেই মনে হল। ভালই হল। তারা থাকলে সারা রাত্রি | ধরে আনন্দে দেহ-সুখ মিটিয়ে নেওয়া যাবে।

তার মুখের কথা শেষ হবার আগেই ছােট লেড়কিটা এক দৌড়ে গিয়ে আগন্তুকদের ভেতরে নিয়ে এল।

আগন্তুকরা ভেতরে ঢুকে যুবকটার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে তাকে ভাল করে দেখে নিল। তারপর নিজেদের মধ্যে অনুচ্চ কণ্ঠে বলাবলি করল—'এ-যুবকটাও বােধ হয় আমাদের মতই কালান্দার ফকির। এখানে আশ্রয় নিয়েছে।এবার প্রচুর খানা আর কয়েক বােতল মদ দিয়ে তিন বহিন কালান্দার ফকিরদের আপ্যায়ন করল।খানাপিনা সারার পর তিন বহিন কালান্দারদের গান শােনাবার জন্য বায়না ধরল।কালান্দাররা গাইবার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগল।

 . এমন সময় আবার দরজায় কড়া নড়ে উঠল।খলিফা হারুন-অল রসিদ নগর পরিক্রমায় বেরিয়েছেন। প্রতিরাত্রেই এরকম বেরােন। তবে এক একদিন এক এক অঞ্চলে যান। আজকে এদিকে পালা। খলিফা একা নন। তাকে সঙ্গদান করেন উজির, জাফর-অলবারমাকি, আর যুবক তরবারি বাহক মসরুর। প্রজাদের সুখ-সুবিধা, অসুবিধা-সমস্যা প্রভৃতি সচক্ষে প্রত্যক্ষ করার জন্যই তার এরকম মহৎ প্রয়াস। এ-পথ দিয়ে যাবার সময় বাড়িটার ভেতর থেকে গান-বাজনার শব্দ শুনে ব্যাপার কি দেখার জন্য তার কৌতুহল হল। উজির জাফর-অল-বারমাকিকে বললেন—বাড়ির ভেতরে ঢােকার ব্যবস্থা কর। তবে আমার, পরিচয় যেন বুঝতে না পারে।

উজির জাফর-অলবারমাকি এগিয়ে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লেন। ছােট লেড়কি দরজা খুলে দিল। উজির বললেন-বাছা, আমরা তিবারিয়া দেশের সওদাগর। স্থানীয় এক সওদাগরের বাড়িতে উঠেছি। সামান্য লটবহর যা ছিল সব তার বাড়িতে গচ্ছিত রেখে নগরটা ঘুরে দেখার জন্য বেরিয়েছিলাম। এখন অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলেছি। বাড়িটা ঠিক চিনতে পারছিনা। আজকের রাত্রিটা তােমাদের এখানে আশ্রয় দিলে বড়ই উপকার হয়। খােদা তােমাদের ভালই করবেন।'

তাদের দাঁড় করিয়ে রেখে ছােট লেড়কিটা ভেতরে গিয়ে অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে ফিরে এল। আশ্রয় প্রার্থীদের অভ্যর্থনা করে ভেতরে নিয়ে গেল। তারা ভেতরে যেতেই বড় লেড়কিটা দরজার লেখাটা তাদের পড়তে বলল। পড়া শেষ হলে তারা বললেন-“হ্যা, আমরা এ নির্দেশ মেনে নিতে রাজি আছি।

এবার তাদের নিয়ে গিয়ে কালান্দারদের পাশে বসতে দিল।

খলিফা ও তার সঙ্গীদের জন্য খানা আর দামী সরাব নিয়ে এল। খলিফা বললেন-বাছা, আমি যে হজযাত্রী। এসব স্পর্শ করি না। এবার তার জন্য গােলাপ পানির সরবৎ বানিয়ে আনল।খলিফা দেখলেন কালান্দারদের প্রত্যেকেরই বাঁ-চোখ কানা।

এবার বড় লেড়কিটা কুলি যুবকটাকে নিয়ে পাশের ঘরে গেল। দুটো নিকষ কালাে কুকুরকে শেকলে বেঁধে নিয়ে এল। দুটোই মাদি কুকুর। এবার কুলি যুবকটাকে একটা চাবুক ধরিয়ে দিয়ে বলল–চালাও চাবুক। এ মাদিটাকে কয়েক ঘা বেশী দেবে। শুরু হ’ল সপাং সপাং চাবুকের ঘা। মাদি কুকুরটা অসহ্য যন্ত্রণায় কেঁই কেঁই শুরু করে দিল। এবার তাকে কুলি যুবকটার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এসে দ্বিতীয় কুকুরটাকে চাবুক মারতে বলল। কুলি যুবকটা আবার নিষ্ঠুর ভাবে চাবুক চালাতে লাগল। তারপর তাকে ছিনিয়ে নিয়ে আবার প্রথম কুকরটাকে এগিয়ে দিল। এভাবে পালা করে চাবুকের ঘা মারার ব্যবস্থা করা হল।খলিফা এবার সবিস্ময়ে প্রায় ফিসফিসিয়ে উজির জাফরকে বললেন—‘লেড়কিটাকে জিজ্ঞেস করে দেখ তাে কুকুর দুটোর ব্যাপার কি?

উজির বললেন—জাহাপনা, এ ব্যাপারে কৌতুহল প্রকাশ না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

মেজো বহিন এবার ছােট বহিনের হাত ধরে বলল—“চল, আমরা প্রতি রাত্রের মত প্রচলিত প্রথা অনুসারে যা-যা করা দরকার, সব করি। | ছােট লেড়কিটা একটু বটুয়া নিয়ে এল। তার ভেতর থেকে একটা বাঁশি বের করল। সুর করে বাজাতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ বাজাবার পর মেজো বহিনটা প্রায় আর্তনাদ করে উঠল-থামাে থামাে বহিন। খােদাতাল্লা তােমাকে কঠোর শাস্তি দেবেন।এক সময় সে উন্মাদের মত নিজের পােশাক আশাক ছিড়ে টুকরাে টুকরাে করে ফেলল। সংজ্ঞা হারিয়ে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।লেড়কি তিনটার ব্যাপার দেখে খালিফা হারুণ-অল রসিদ-এর মন কেঁদে উঠল। এবার বড় লেড়কিটা তার চোখে-মুখে জলের ছিটা দিয়ে সংজ্ঞা ফিরিয়ে আনল।নতুন পােশাক পরিয়ে দিল।খলিফা হারুণ-অল রসিদ আবার উজির জাফর-এর কানের কাছে মুখ নিয়ে আগের মতই ফিসফিসিয়ে বললেন—‘লেড়কির সারা গায়ে চাবুকের দাগ। কেমন কালসিটে পড়ে গেছে লক্ষ্য করেছ?

উজির জাফর বললেন—জাহাপনা, মুখ বুজে সবকিছু দেখে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।খালিফা হারুণ-অল রসিদ এবার বললেন—‘তা না হয় হ’ল। কিন্তু মাদি কুকুর দুটোকে চাবুক মারা আর তার পিঠের কালাে দাগগুলাে আমার মনে বিস্ময়ের উদ্রেক করছে। রহস্য! গভীর রহস্য! এর রহস্যভেদ আমাকে করতেই হবে।।- ‘জাহাপনা, দরজার ওই শপথ বাক্যের কথা ভুলে যাবেন না। কোন কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার অর্থ হচ্ছে শর্ত লঙ্ঘন করা।

এবার মেজো লেড়কিটা ওই বাঁশিটা বাজাতে আরম্ভ করল। সেই করুণ-মর্মান্তিক সুর। পূর্ব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। সে তার পােশাক আশাক ছিড়ে টুকরাে টুকরাে করে ফেলল। ব্যস, সংজ্ঞা হারিয়ে ফেল। সারা গায়ের চাবুকের দাগ খলিফা হারুণ-অল রসিদ-এর চোখের সামনে ভেসে উঠল। বড় মেয়েটা আবার পূর্ব কৌশলে তার চোখে-মুখে জলের ছিটা দিল। সে সংজ্ঞা ফিরে পেল।

একই পদ্ধতি অনুসরণ করে তিন তিনবার সে-ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটান হ’ল।।

খালিফা হারুণ-অল রসিদ আর কৌতুহল দমন করতে পারলেন । তিনি আগের মতই অনুচ্চ কণ্ঠে কালান্দারদের বললেন—মশাইরা, রহস্যটা কি বলতে পারেন?

‘আমরা তাে আরও ভাবছিলাম, আপনাকে পুছতাই করব। --তাই বলুন, আমাদের মত আপনারাও এখানে প্রথম এসেছেন? ‘আমার মনে হয়, ওই যুবকটা কিছু জানলেও জানতে পারে। তাদের কথােপকথন কুলি যুবকটা শুনতে পেল। কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই সে বলে উঠল-আমিও আপনাদেরই মত এখানে প্রথম এসেছি। আপনারা এসেছেন রাত্রে আর আমি এসেছি দুপুরের কিছু পরে। ব্যস, এটুকুই যা তফাৎ। এর চেয়ে বরং পথের ধারে শুয়ে রাত্রি কাটনাে অনেক ভাল ছিল মশাই।তারা সাতজন একমত হলেন। ব্যাপারটা নিয়ে ভাবা দরকার, জানা দরকার আসল রহস্যটা কি! তারা সংখ্যায় সাতজন পুরুষ মানুষ। আর তারা মাত্র তিনজন। তা-ও আবার মেয়েছেলে। এত ভয়ের কি আছে? তাদের কাছে কৈফিয়ৎ চাইতেই হবে। আর দরজার গায়ে লেখা শর্ত ?

কালান্দারদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠল—“আমরা শর্ত পালন না করলে লেড়কি তিনটাকে অপমান করা হবে না তাে আবার? তার চেয়ে বরং অবশিষ্ট রত্রিটুকু কোনরকমে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে সুবহ হতে না হতেই আমরা যে যার পথে চলে যাব।

এবার উজির জাফর বললেন—“ঘণ্টা খানেক বাদে আমরা এখান থেকে কেটে পড়ব। আর আপনার কাছে অন্ততঃ ব্যাপারটা অজ্ঞাত থাকবে না। আজ না হয় কাল জানতে পারবেনই।”

‘আমার পক্ষে এত সময় অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। সবাই উসখুস করছে ব্যাপারটা জানার জন্য। সমস্যা দেখা দিল, পুছতাছ করবে কে? অনেক কথার পর ঠিক হ’ল কুলি যুবকটাই তাদের কাছে এর কারণ জানতে চাইবে।কুলি যুবকটা বার কয়েক ঢােক গিলে বলল—তােমাদের কুকুর দুটোর ব্যাপার কি, আমরা জানতে চাইছি। কেন তাদের এরকম নিমর্মভাবে চাবুক মারলে? কেনইবা আবার তাদের আদর করলে? তােমাদের শরীরে চাবুকের কালসিটে পড়া দাগ কি করে হল?” ‘এটা কি তােমার একার, নাকি সবারই কৌতুহল?

‘একমাত্র জাফর ছাড়া আমরা সবাই ব্যাপারটা নিয়ে বড়ই ভাবিত। ‘তােমরা শর্ত ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত। আতিথ্য গ্রহণের আগে দরজার লেখা পড়ে শর্ত করেছিলে। তােমাদের শর্তভঙ্গের শাস্তি পেতেই হবে। কথা বলতে বলতে বড় লেড়কিটি হাতের চাবুকটা দিয়ে তিনবার মেঝেতে আঘাত করা মাত্র সাতজন গাট্টাগােটা দৈত্যের মত বিশালদেহী নিগ্রো ঘরে ঢুকল। ক্রোধে তর্জন গর্জন শুরু করে দিল। সবার হাতেই চকচকে তরবারি।বড় লেড়কি হুকুম দিল—এদের একটার সঙ্গে আর একটা পিঠমােড়া করে বাঁধ। চোখের পলকে নিগ্রো দৈত্যগুলাে হুকুম তামিল করল।

কুলি যুবকটা কেঁদে কেটে বল—আমায় তােমরা কোতল করাে না। সর্বনাশের মূল এক চোখওয়লা কালান্দার ফকিরগুলাে। তারা এখানে না থাকলে এসব কিছুই ঘটত না।' বড় লেড়কিটা হ হহ করে হাসতে শুরু করল।

বেগম শাহরাজাদ জানলা দিয়ে বাইরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই বুঝতে পারল ভােরের আলাে ফুটতে আর দেরী নেই। সে কিসসা বন্ধ করল। বাদশাহ শারিয়ার বেগমের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন।


               একাদশ রাত্রি
বাদশাহ শারিয়ার যথাসময়ে বেগম শাহজাদ-এর ঘরে এলেন।ছােটবােনর আগ্রহে বেগম শাহরাজাদ কিসসা শুরু করলেন—‘শুনুন জাহাপনা। বড় বােন সরবে হেসে উঠলে সবাই ভয়ে জড়ােসডােহয়ে উঠল। সবার মনেই এক ভাবনা, কি হয়—কি হয়। হাসি থামিয়ে সে বলল—“তােমাদের অসহায় অবস্থার কথা ভেবে রাত্রিবাসের জন্য আশ্রয় দিয়েছিলাম। যাকগে। এবার তােমরা সবাই এক এক করে আত্মপরিচয় দাও। তােমাদের কথায় যদি বুঝি তােমরা সত্যই বিপদে পড়ে আশ্রয় ভিক্ষা করনি তবে তােমাদের মৃত্যু অবধারিত।বড় মেয়েটা এবার কালার ফকির তিন জনকে লক্ষ্য করে বলল –বল তাে, তােমরা কি সহােদর ভাই?

-না মালকিন। আমরা তিনজন তিন দেশের বাসিন্দা। আমরা সর্বত্যাগী। বিষয় সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই। কোনরকমে জানটাকে টিকিয়ে রেখেছি। তােমরা কি জন্ম থেকে কানা? নাকি পরবর্তীকালে একটা করে চোখ। তার মুখের কথা শেষ হবার আগেই একজন কালান্দার বলে উঠল—না। আমি কানা হয়ে জন্মাই নি। জন্মের পর এক অবিশ্বাস্য কাণ্ডের ফলে চোখটাকে হারাতে হয়েছে।

বাকি দু'জনও একই কথা বলল। তাদের জীবনও বৈচিত্র্যময় ঘটনায় ভরপুর।

বড় লেড়কিটা এবার আগ্রহান্বিত হয়ে বলল-“তােমাদের জীবনের বিচিত্র ঘটনাগুলাে আমি শুনতে আগ্রহী, তােমরা এক এক করে তােমাদের জীবনকাহিনী আমাকে শােনাও। তােমাদের কথা শুনে আমি যদি বুঝি তােমরা সত্যই দয়া পাওয়ার যােগ্য তবে মুক্তি দিয়ে দেব। অন্যথায় | কুলি যুবকটা কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে উঠল—“আমি সত্যই গরীব, দীন দুঃখী কিনা তা-তাে তােমাদের অজানা নয়। আমার জীবনের অত্যাশ্চর্য ঘটনা বলতে যা কিছু সবই আজ দিনের বেলাতেই ঘটেছে। তা-তাে তােমরা ভালই জান। আর সে কথা দশজনের সামনে, এরকম ভরাহাটে বলা সমীচীনও নয়। তাই বলছি কি, আমাকে ছেড়ে দাও।

–‘ভাল কথা, তুমি এখনকার মত রেহাই পেলে, তােমার কথা পরেই না হয় শুনব। যাও, বিশ্রাম করগে।

—না, আমি এ জায়গা ছেড়ে যাব না। অবশ্যই না, এদের কাহিনী শুনব।'

               প্রথম কালান্দার ফকিরের কিসসা


 বড় লেড়কিটার নির্দেশে প্রথম কালান্দার তার কিসসাটা শুরু করতে গিয়ে বলল—“আমি সবার আগে বলছি কেন আমার মুখ দাড়ি-গােফ শূন্য। আর আমার বাঁ চোখটা কেন কানা তা-ও আপনার কাছে ব্যক্ত করব। আমি এক বাদশাহের ছেলে ছিলাম। অন্য আর এক দেশের বাদশাহ ছিলেন আমার চাচা। অতএব বুঝতেই পারছেন আমি হেলাফেলার মত ছিলাম না। যাকগে, আমার আব্বাজী আর চাচাজীর মধ্যে খুবই মনের মিল ছিল। একটা ঘটনার দ্বারাই এর পরিচয় কিছুটা পেতে পারবেন। আমার জন্মের দিনই চাচাজীরও এক লেড়কা জন্মাল। আমরা দু’ ভাই কৈশাের অতিক্রম করে যৌবনে পা দিলাম। আমাদের পরিবারের নিয়ম অনুযায়ী কিছুদিন বাদে বাদে আমরা

চাচাজীর কাছে গিয়ে কিছুদিন করে থেকে আসতাম। শেষবার সেখানে যখন গিয়েছিলাম তখন আমার ভাইজান আমাকে বলল,-“তােমাকে একটা কথা বলতে চাই। আশা করি অবশ্যই অমত করবে না। কথা দাও, না বলবে না।আমার পেটে তখন সরাব গলা পর্যন্ত। নেশায় বিভাের। আমি টলতে টলতে বল্লাম-খােদাতাল্লার নামে হলফ করে বলছি, তুমি যা বলবে আমি হাসিমুখে তা-ই করব। বল, কি তােমার কথা।

—এক কাজ কর, তুমি একে নিয়ে গােরস্তানের চালাটায় গিয়ে বােসাে। আমি একটু বাদেই যাচ্ছি। আমার হাতে এক যুবতীকে তুলে দিয়ে কথাটা ছুঁড়ে দিল।

আমি খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়েছি। কথা রাখতেই হ'ল। যুবতীটার হাত ধরে গােরস্তানে হাজির হলাম। চালাঘরটায় বসে তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ বাদেই সে-ও সেখানে গেল। তার এক হাতে কিছু প্লাস্টার আর অন্য হাতে জলের পাত্র। আর বােগলে ছিল একটা কুড়াল। চালাঘরটার অদূরে অতিকায় একটা পাথরের চাই পড়েছিল। সে কুড়াল দিয়ে পাথরটাকে টুকরাে করতে গিয়ে তাতে একটা সুড়ঙ্গের দেখা পেল। তারপর নিচের একটা পাথর সরিয়ে ফেলতই সুদৃশ্য এক প্রাসাদ চোখে পড়ল।আমার ভাইজান যুবতীটাকে নিয়ে সে-সুড়ঙ্গ পথে নেমে গেল।যাবার আগে আমাকে বলে গেল,

‘ভাইজান, তুমি এ-জায়গা ছেড়ে | যাবার আগে পাথরের টুকরােগুলাে সুড়ঙ্গের মুখে দিয়ে প্লাস্টার দিয়ে লেপে দিয়ে যেয়াে। কেউ যেন বুঝতে না পারে এর তলায় কিছু আছে।

আমি তার অনুরােধে পাথর চাপা দিয়ে সুড়ঙ্গের মুখ বন্ধ করলাম প্লাস্টার দিয়ে লেপে যেমন ছিল ঠিক তেমনটি করে রেখে চাচাজীর প্রাসাদে ফিরে এলাম। প্রাসাদে ফিরে শুনি চাচাজী শিকারে বেরিয়েছেন। সারা রাত্রি শুয়ে-বসে অস্থিরভাবে কাটালাম। আমার চাচা বা চাচাতাে ভাইয়া কেউ-ই ফিরল না। বিশেষ করে চাচাতাে ভাইয়া না ফেরায় আমার মনটা বড় চঞ্চল হয়ে পড়ল। শেষ রাত্রের দিকে আবার গোরস্তানের সে পাথরটার কাছে গেলাম। তার খোজ করলাম। কোন হদিসই মিলল না। বিষন্ন মনে প্রাসাদে ফিরলাম।।

পর পর সাতটা দিন আমি নিদারুণ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। কাটালাম। কিন্তু আমার চাচাতাে ভাইয়া তবু ফিরল না। শেষ পর্যন্ত হতাশা আর হাহাকার সম্বল করে আমি নিজের দেশে ফিরলাম। আমাদের নিজের শহরে পা দিতেই আমাকে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার মুখােমুখি হতে হল। একদল সশস্ত্র লােক অতর্কিতে। আমাকে ঘিরে ফেলল। আমি দেশের বাদশাহের ছেলে শাহজাদা। আর যারা আমাকে বন্দী করেছে সবাই আমার আব্বাজীর অনুগত কর্মচারী। নিজের দেশে, নিজের আব্বাজীর সৈন্যরা আমাকে বন্দী করায় বিস্মিত হবারই তাে কথা।

আমার নিজের দুরবস্থার চেয়ে আব্বাজীর অমঙ্গল আশঙ্কায় আমার বুকের মধ্যে কলিজাটা উথালি পাথালি করতে লাগল। ভাবলাম, তবে আব্বাজীর নির্ঘাৎ কিছু ঘটে গেছে। তিনি হয়ত ইহলােকে আর নেই।

আমার ধারণা অমূলক নয়। এক সহৃদয় সৈনিক আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে অনুচ্চ কণ্ঠে বল—‘তােমার আব্বাজী জানে বেঁচে নেই। উজির আর সেনাপতি চক্রান্ত করে তাকে নিকেষ করে দিয়েছে। উজির এখন মসনদে বসেছেন। তারই কুম তামিল করতে আমরা তােমার হাতে শেকল পরাতে বাধ্য হয়েছি।

আমি আব্বাজীর শোকে চোখের পানি ফেলতে লাগলাম। তারা আমাকে শেকল পরিয়ে উজিরের সামনে হাজির করল।আমার ওপর উজিরের অনেক দিনের খার ছিল। উজির একদিন বাগানে পায়চারি করছিলেন। আমি পাখি শিকার করতে গিয়ে তীর ছুঁড়েছিলাম। তীরটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। উজিরের চোখে গিয়ে বিধল। ব্যস, একেবারে কানা। কিন্তু আমার বাবার ভয়ে আমার উপর কোন প্রতিশােধই নিতে পারলেন না। শেকলবাঁধা অবস্থায় আমাকে উজিরের সামনে দাঁড় করানাে হ’ল।

উজির গর্জে উঠলেন—কোতল কর! গর্দান নাও। খতম কর।” আমি সচকিত হয়ে বল্লাম—“আগে আমাকে বলুন, আমার কি অপরাধ। তারপর আমার গর্দান নেন আপত্তি করব না।'

এবার শান্তস্বরে উজির আমাকে কাছে যেতে বলেন। আমি এগিয়ে গিয়ে তার মুখােমুখি দাঁড়ালাম। তিনি আচমকা নখের আঘাতে আমার বাঁ-চোখটা ঘায়েল করে দিলেন। গলগল করে খুন বেরিয়ে এল। এতেও সন্তুষ্ট হতে পারল না। ঘাতকদের হুকুম দিলেন, —একে একটা কাঠের বাক্সে ভরে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাও। সেখানে টুকরাে টুকরাে করে কেটে মাঠের মধ্যে ফেলে রেখে দিয়ে আসবে। শেয়াল-কুকুর আর শকুন ছিড়ে ছিড়ে খাক একে। যা, নিয়ে যা।’ বাক্সবন্দী অবস্থায় আমাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে এল।

আমাকে বাক্সটা থেকে টেনে হিচড়ে বের করল। চোখের যন্ত্রণায় আমি তখন ছটফট করছি। ভাবলাম, এরকম অসহ্য যন্ত্রণায় একদিন তাে উজিরও কাৎরেছিলেন। একটা মানুষের চোখ কানা করে দেওয়া যে কী মর্মান্তিক কাজ তা তখন আমি বেশী করে উপলব্ধি করলাম। তাই তিনি আমার চোখ কানা করেও তৃপ্ত হলেন...............To be continued .

Post a Comment

0 Comments