গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
বুঝলাম, আমার কোশিসটি ফলপ্রসু হয়েছে। দু-চার আদমি পিছন ফিরে ছুটতে শুরু করল। কিছু সময় বাদেই তারা ফিন ঘুরে এল। হাতে তাদের খানার থালা আর লােটা ভর্তি পানি। আমি গােগ্রাসে খেতে লেগে গেলাম। খানা শেষ করে ঢক ঢক করে লােটার পুরাে পানিটুকু গলায় ঢেলে দিলাম।
খানাপিনা সেরে পাশের দিকে ঘাড় ঘােরাতেই আমার এক জাতভাইকে দেখতে পেলাম। তারাই খুঁজেপেতে তাকে নিয়ে এসেছে। সে পরিষ্কার আরবী ভাষায় আমাকে জিজ্ঞাসা করল— ‘তােমার নাম কি হে? মুলুক কোথায়? এখানে কেন, কিভাবেই বা হাজির হয়েছ? তার কাছে আমার বিড়ম্বিত নসীবের বাৎ সবিস্তারে বাতালাম।
আমার জাতভাইটি এবার অন্যান্যদের হিন্দুস্থানী ভাষায় বুঝিয়ে দিল। সবকিছু শুনে তাদের চোখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠল। বারবার আঁৎকে আঁৎকে উঠল।
আমি বললাম- তাজ্জব বনার কিছু নেই। এরকম দুঃসাহসিক ব্যাপার স্যাপারের মধ্যে জড়িয়ে পড়ার নেশা আমার খুনের সঙ্গে মিশে গেছে। কেবলমাত্র এবারই নয়। আরও পাঁচপাঁচবার আমার জান খতম হবার জোগাড় হয়েছিল। খােদাতাল্লা প্রতিবারেই আমাকে নানা বেকায়দার মধ্য দিয়ে চালিয়ে নিয়ে শেষ পর্যন্ত জানটি টিকিয়ে দিয়েছেন। এবারও বােধ হয় জিন্দেগী বরবাদ হতে গিয়ে রক্ষা পেয়ে গেল। আমার জাতভাইটির মুখে শুনলাম, জায়গাটির নাম ‘সারণদ্বীপ’। এবার তারা আমাকে মিছিল করে সে দেশের সম্রাটের দরবারে নিয়ে গেল।
সম্রাট আমার মুখ থেকে সমুদ্র যাত্রার বিবরণ ও সঙ্কটের কাহিনী শুনে বললেন— 'বাছা, ঈশ্বর তােমার সহায়। তার অকৃপণ কৃপা না থাকলে কেউ এরকম চরমতম সঙ্কট কাটিয়ে সুস্থ-সবল দেহে ফিরে আসতে পারে না।
আমি পুটলিটি খুলে একটি বহুমূল্য পাথর বের করে সম্রাটের পায়ের কাছে রাখলাম। নজরানা দিলাম।
সম্রাট আমার ওপর খুশী হলেন। গল্পচ্ছলে তিনি বললেন আমার সাম্রাজ্য এ-সারণ দ্বীপটি চব্বিশটি পরগণায় বিভক্ত। এর উত্তরে গেলে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশিখরের মুখােমুখি হবে। পর্বতটিতে বহু গ্রহরত্ন মেলে। সম্রাট আমাকে খুশী হয়ে কয়েকটি গ্রহরত্ন উপঢৌকন দিয়ে পেয়ার জানালেন। সারণ দ্বীপের আর একটি মূল্যবান সম্পদ অসংখ্য নারকেল গাছ। এক সকালে আমি সম্রাটের দরবারে, তার পাশাপাশি বসে বাৎচিৎ করছি। প্রসঙ্গক্রমে তিনি আমাকে বললেন- “সিন্দবাদ, তােমারে বাগদাদের রাজ্য শাসন ব্যবস্থা কেমন, বল তাে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে খলিফা হারুণ-অল রসিদ কতখানি সার্থক, বল তাে।
আমি বললাম আমার মুলুকের সুলতান যথার্থই একজন পহেলা নম্বরের ধর্মাত্মা। তাঁর সুলতানিয়তে অন্যায়-অত্যাচার চলে না । প্রজারাও খলিফার জন্য জান কবুল করতে কসুর করে না। প্রজাদের হিতসাধন খলিফার রাত্রি-দিন সর্বক্ষণের চিন্তা। তার কসুরের ত্রুটি নেই।
সারণ দ্বীপের সম্রাট খলিফা হারুণ-অল-রসিদ-এর অনন্য গুণের বাৎ শুনে যারপরনাই মুগ্ধ হলেন। এবার বললেন- ‘বাছা আমি যদি খলিফার জন্য সামান্য কিছু উপহার তােমার হাতে দেই তবে কি তুমি তার হাতে পৌছে দিতে রাজী আছ? একে উভয় দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে তােলার প্রয়াস মনে করতে পার।
প্রচুর সংখ্যক গ্রহরত্ন, সাপের চামড়ার সুদৃশ্য একটি গালিচা, দু'শর কাছাকাছি কপূরের ঢেলা, আট হাত দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট হাতীর দাঁত আর দ্বীপের এক খুবসুরৎ লেড়কিও সঙ্গে দিলেন খলিফার সেবার জন্যে।
সম্রাট খলিফার নামে তার সখ্যতা কামনা করে একটি পত্র লিখে দিলেন।
এক বিকালে বাগিচায় পায়চারি করতে করতে সম্রাট আমাকে বললেন– “সিন্দবাদ তুমি আমার দেশে অতিথি হয়ে এসেছ। তুমি ইচ্ছে করলে এখানে বসবাস করতে পার। আমি খলিফার কাছে দূত পাঠিয়ে তােমার আত্মীয় জনদের খবরাখবর আনার ব্যবস্থা করছি।
আমি ভাব বিমুগ্ধ কণ্ঠে বল্লাম- মহামান্য সম্রাট, আপনার মহানুভবতা ও আন্তরিকতার বাৎ জিন্দেগীভর আমার দিলে গাঁথা হয়ে থাকবে। লেকিন, আমি আমার মুলুকে ফিরে যেতে আগ্রহী। আপনার আচরণ ও দেশ আমার দিল কেড়ে নিয়েছে। বিবি, বালবাচ্চা আর ইয়ার দোস্তের আকর্ষণেই আমি আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারলাম না। আমাকে নিজগুণে মাফ করবেন। এক কর্মচারীকে বন্দরে পাঠিয়ে সম্রাট খবর সংগ্রহ করলেন, দু’-একদিনের মধ্যেই বসরাহর দিকে একটি জাহাজ ছাড়বে।
সম্রাট আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন- ‘বাছা সিন্দবাদ, তােমার মন বাগদাদে চলে গেছে। যাও, আমি বাধা দেব না। তােমার জন্য আমার প্রাসাদের দরজা সর্বদা খোেলাই থাকবে। যখনই মন চাইবে, নির্দ্বিধায় চলে এসাে।
সম্রাট এবার জাহাজের ক্যাপ্টেনকে তলব করে দরবারে নিয়ে এলেন। আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে তাকে বললেন- এর নাম সিন্দবাদ। সিন্দবাদ নাবিক। অসীম সাহস, অটুট মনােবল এবং অনন্য উপস্থিত বুদ্ধির ধারক। বহুবার মৃত্যুর মুখ থেকে কৌশলে ফিরে এসে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। পথে যেতে যেতে এর মুখ থেকে বিভিন্ন সমুদ্রযাত্রার কথা শুনতে পারবে। একে বাগদাদে, এর দেশে পৌঁছে দিও, যা ভাড়া আমার কাছ থেকে নিয়ে নেবে।
সারণ দ্বীপের সম্রাটকে সুকরিয়া জানিয়ে আমি জাহাজে উঠলাম।
বাগদাদে পৌছে আমি সবার আগে খলিফা হারুণ-অলরসিদের-এর দরবারে পৌছলাম। খলিফাকে নতজানু হয়ে কুর্ণিশ জানালাম। সারণ দ্বীপের সম্রাটের দেয়া উপঢৌকনগুলি এবং হাতচিঠিটি তার হাতে তুলে দিলাম।
খলিফা খুবই খুশী হলেন। আমি খলিফার কাছে পঞ্চমুখে সম্রাটের গুণগান করলাম। খলিফা খুশী হয়ে একপ্রস্থ মূল্যবান পােশাক পরিচ্ছদ ইনামস্বরূপ দিলেন।
কিসসা শেষ করে সিন্দবাদ নাবিক এবার বলল- “আমার সম্মানিত মেহমান দোস্তরা, এ-ই হ’ল আমার ষষ্ঠ সমুদ্রযাত্রার মােটামুটি বিবরণ। কাল সকালে আপনাদের কাছে আমার সপ্তম সমুদ্রযাত্রার কিসসা পেশ করার ইচ্ছা রাখছি। সিন্দবাদ নাবিক এবার একটি সােনার মােহরের থলি সিন্দবাদ কুলীর হাতে দিয়ে বল্ল- এগুলাে তােমার জেবে রাখ, কাজে লাগবে। কাল সকালে আসা চাই, ইয়াদ থাকে যেন।
সিন্দবাদ কুলী মােহরের থলিটি কোর্তার জেবে চালান দিয়ে দিল সিন্দবাদ নাবিককে সালাম জানাল। এবার আগামী সকালে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদায় নিল।
সিন্দবাদ নাবিকের সপ্তম সমুদ্রযাত্রার কিস্সা
পরদিন সকালে সিন্দবাদ নাবিকের মকানে মেহমানরা এক এক করে আসতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সিন্দবাদ কুলীও তার প্রশস্ত কামরায় হাজির হল।
টেবিলে নাস্তা সাজানাে হল। সিন্দবাদ নাবিক কুলীকে পাশে বসিয়ে, অন্যান্য মেহমান দোস্তদের নিয়ে নাস্তা সারতে সারতে বলল—আমার ছয় ছয়টি সমুদ্রযাত্রার ভয়ঙ্কর সব অভিজ্ঞতা লাভ করে আমি পাক্কা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, যথেষ্ট হয়েছে, আর সমুদ্রে যাচ্ছিনে। দিল থেকে সমুদ্রকে ধুয়ে মুছে একেবারে সাফসুতরা করে ফেললাম। এবার থেকে বিবি, বালবাচ্চা আর ইয়ার দোস্তরাই আমার জিন্দেগীর একমাত্র সম্বল। তাদের নিয়েই সুখে-দুঃখে বাকী দিনগুলি গুজরান করে দেব। ওরে ব্বাস! একের পর এক যেসব মরণফাঁদে জড়িয়ে পড়েছিলাম, দোজখের দক্ষিণ দুয়ারে হাজির হয়েছিলাম তা ভাবলে এখনও আমার কলিজা শুকিয়ে আসে। হাঁটু কাপে আর
শরীরের শিরা-উপশিরা শিথিল হয়ে আসতে চায়। তার ওপর উমর ক্রমেই বেড়ে চলেছে। চুল সফেদ হচ্ছে, দাঁত নড়ছে, শরীরের কলকব্জা এক এক করে ঢিলা হয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া যাওয়ার দরকারই বা কি। জিন্দেগীভর তামাম আরব দুনিয়ায় ঢুঁড়ে ঢুঁড়ে মােহরও তো কম কামাই করি নি। খােদাতাল্লার দোয়ায় আমি বাগদাদে সবচেয়ে শরীফ আদমি। আমার চৌদ্দপুরুষ পায়ে পা তুলে ভােগ বিলাস করলেও আমার মােহরের পাহাড় ক্ষয় হয়ে সমতল হবে না। তামাম বাগদাদে আমার খাতিরও কম নয়। এমন কি খলিফাও আমাকে খাতির সমীহ করেন। মাঝে মধ্যেই তলব পাঠান। পাশে বসিয়ে আমার সমুদ্রযাত্রার কিসসা শােনেন। অবাক মানেন। অতএব আর ভুলেও সমুদ্রে যাচ্ছি না।
একটি বাৎ বহুৎ সাচ্চা—কোন আদমির ইচ্ছাই শেষ বাৎ নয়। তার ওপর একজন রয়েছেন যিনি আড়ালে বসে কলকাঠি নাড়ান।
আমি একদিন খলিফা হারুণ-অল-রসিদ-এর দরবারে হাজির। তার পাশে বসে সমুদ্রযাত্রার বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার কিসসা বলছি। খলিফা মন্ত্রমুগ্ধের মত আমার কিসসা শুনছেন।
আমি কিসসা শেষ করলে খলিফা আমাকে বললেন‘সিন্দবাদ, আমার দিল্ চাইছে সারণ দ্বীপের সম্রাটকে কিছু উপঢৌকন আর শুভেচ্ছা পাঠাব।”
আমি সােল্লাসে বললাম— বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা! এ তাে খুশীর বাৎ জাঁহাপনা!
—“সে তাে বুঝলাম। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে।
‘সমস্যা? কিসের সমস্যা জাঁহাপনা?’
–‘সমস্যা একটিই, এমন কোন পছন্দ মাফিক দূত মিলছে না যাকে দিয়ে আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হতে পারে। আমি গম্ভীর মুখে বসে রইলাম। টু-শব্দটিও করলাম না। খলিফার দিল কি চাইছে তা বুঝতে কিছুমাত্র অসুবিধে হ’ল না।
আমাকে নীরব দেখে খলিফা আমতা আমতা করে বললেন—“সিন্দবাদ, বিবেচনা করে দেখলাম, তুমিই একমাত্র আদমি যার ওপর ভরসা রাখা চলে। আমার ইচ্ছা, তুমি আমার উপটৌকন ও শুভেচ্ছা সারণ দ্বীপের সম্রাটের দরবারে পৌছে দাও। এতে লাভ কিন্তু দু’দিক থেকে আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তার দিকে তাকিয়ে বল্লাম— ‘লাভ ? কিসের লাভ? দু’দিক থেকে লাভ বলতে আপনি কি সমঝাতে চাইছেন জাঁহাপনা?’
–“মানে—মানে বলতে চাইছি তােমাকে কাছে পেলে সম্রাট বহুৎ খুশী হবেন। আর আমার কাজটি মিটে যাবে। কি বল ?
আমার বুঝতে বাকী রইল না, খলিফা ইচ্ছাক্রমে আদেশের দিকে মােড় নিচ্ছেন। অধিকতর মােলায়েম স্বরে এবার বললাম ‘জাহাপনা, আপনার ইচ্ছাই কার্যকর হবে। বলুন, কবে আমাকে রওনা হতে হবে?
খলিফা আমার সম্মতি পেয়ে উপঢৌকনের জন্য বাগদাদের সেরা সেরা সামানপত্র সংগ্রহ করাতে মেতে গেলেন। সবকিছু গােছগাছ করে বাহারী একটি পেটরাতে বােঝাই করলেন।
আমার বাৎ তােমরা বিলকুল বিশ্বাস করতে পার, মুলুক ছেড়ে সমুদ্রে আসার একদম ইচ্ছা আমার ছিল না। কেবলমাত্র খলিফাকে খুশী করার জন্য আমাকে সেবার জাহাজে উঠতেই হ’ল।। খলিফা রাহাখরচ বাবদ দশহাজার দিনার আমার হাতে তুলে দিলেন। আর দিলেন সারণ দ্বীপের সম্রাটের নামে লেখা একটি পত্র। উপঢৌকনের পেটরাটির মধ্যে দিলেন বহুমূল্য ও মনলােভা লাল আভাযুক্ত মখমলের শয্যা। তার দাম সম্বন্ধে আমি কিছুমাত্র ধারণাও করতে পারলাম না। আমার অর্থের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও সেরকম বিলাস শয্যা চোখে দেখার নসীব জিন্দেগীতে আমার হয় নি। মখমলের বিলাস শয্যাটির মতই আর দু'রঙের দু’দুটো শয্যা পেটরাটিতে দিয়ে দিলেন। আর ? কুফার সেরা দর্জির তৈরী বহুমূল্য একশ’ প্রস্ত দিলবাহার পােশাক। বাগদাদের সূচীকর্ম সম্বলিত কিছু চমৎকার পােশাক, আলেকজান্দ্রিয়ার মনমৌজি রেশমী কাপড়, কারুকার্য সম্বলিত সােনার ফুলদানি একটি। তার গায়ে একটি সিংহকে বিদ্ধ করার জন্য এক শিকারী তীর-ধনুক নিয়ে তাক করছে—একটি ছবি খােদাই করা। এক প্রখ্যাত শিল্পী অনন্য এ-শিল্পকর্মটিকে ফুলদানিটির গায়ে চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছেন, এছাড়া প্রায় দু'হাজার অন্যান্য সামানপত্র দিয়ে বিশালায়তন পেটরাটি সাজিয়ে তােলা হয়েছে।
সিন্দবাদ নাবিককে খলিফা সবকিছু বুঝিয়ে দিলেন।
কিসসার এ পর্যন্ত বলতে না বলতেই প্রাসাদ সংলগ্ন উদ্যানে ভােরের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিনশ’ বারােতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়র বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় উপস্থিত হলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন- জাহাপনা, সিন্দবাদ নাবিক মেহমান ও দোস্তদের কাছে তার নিজের সপ্তম ও সর্বশেষ সমুদ্রযাত্রার কিসসা বলে চলেছে। সিন্দবাদ এবার বলল- ‘শুনুন মেহমান ও দোস্তরা, আমি নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও খলিফার চিঠি ও পেটরা নিয়ে একদিন বসরাহ বন্দর থেকে জাহাজে উঠলাম।
নিরবচ্ছিন্নভাবে দু’-দু’টি মাস জাহাজে কাটিয়ে নির্বিবাদে সারণ দ্বীপে হাজির হলাম।
সম্রাট আমাকে কাছে পেয়ে যারপরনাই খুশী হলেন। এ যেন তার কাছে একেবারেই অকল্পনীয় এক ব্যাপার। একে পূর্বপরিচিত। পরদেশী মেহমান। সবচেয়ে বড় কথা এবার আমি খােদ খলিফা হারুণ-অল-রসিদ-এর দূত হয়ে তার সভায় উপস্থিত হয়েছি। অতএব খাতিরের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হবে, সন্দেহ কি!
আমি যথােচিত সম্ভাষণ ও প্রাথমিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর সম্রাটের হাতে খলিফাপ্রদত্ত শুভেচ্ছাপত্রটি দিলাম। আর উপঢৌকনের পেটরাটি দেখিয়ে বললাম—আমাদের মহামান্য খলিফার প্রেরিত সামান্য উপঢৌকন গ্রহণ করে আনন্দদান করুন।
সম্রাটের প্রাসাদে মেহমান হয়ে কয়েকটি দিন বহুৎ খুশীতে গুজরান করলাম।
সম্রাট আমাকে কিছুতেই ছাড়তে চান না। আমি অন্ততঃ আরও কয়েকটি দিন গুজরান না করলে নাকি তার মন ভরছে না।
আমি সসম্মানে বললাম- মহামান্য সম্রাট, আমি নিজের ইচ্ছাতে, ভ্রমণের ইচ্ছা নিয়ে এবার আপনার দরবারে মেহমান হয়ে আসিনি। সুলতানের হুকুম তালিম করতেই আমাকে আসতে হয়েছে। বাগদাদে ফিরে গিয়ে তাকে জানাতে হবে, আমি তার হুকুম যথাযথভাবে তামিল করেছি। নসীবে যদি থাকে, ভবিষ্যতে যদি ফিন আসতে পারি তখন অবশ্যই আপনার অভিলাষ পূর্ণ করার কোশিস করব। আর কয়েকদিন সম্রাটের প্রাসাদে অতিথি হিসাবে অবস্থান করলাম। তারপর এক সকালে সম্রাটের কাছ থেকে খুশীভরা দিল, নিয়ে জাহাজে উঠলাম।
এবার আর অন্য কোনদিকে যাওয়ার ধান্দা নেই। সারণ দ্বীপ থেকে সােজা বসরাহ বন্দর। তারপর সেখান থেকে বাগদাদ। ব্যস, খেল খতম।
আমাদের জাহাজ পালে দমকা বাতাস পেয়ে তরতর করে এগিয়ে চলল গভীর সমুদ্রের দিকে।
এবারের মত নির্বিবাদে কোনবারই সমুদ্রযাত্রা করা আমার নসীবে সম্ভব হয় নি।
প্রায় এক সপ্তাহ নিরবচ্ছিন্নভাবে জাহাজ চালিয়ে ক্যাপ্টেন সিন দ্বীপে জাহাজ ভেড়াল। সওদাগররা কেনবেচা করার জন্য নামল। এ বন্দরটি সওদাগরদের বহুৎ পছন্দ।
সিন দ্বীপ থেকে জাহাজ ছাড়ল। তর তর করে জাহাজ এগিয়ে চলল মাঝ সমুদ্রের দিকে।
ক্যাপ্টেন পথের নিশানা ঠিক করতে গিয়ে থমকে গেল। নিজের কাছে মন ও চোখ নিবদ্ধ রেখেই সে এবার স্বগতােক্তি করল
‘কী তাজ্জব ব্যাপার! কোথায় এসে পড়েছি, ঠিক মালুম হচ্ছে না।
কথা বলতে বলতে ক্যাপ্টেন ব্যস্ত-পায়ে মাস্তুলের কাছে গেল। মাস্তুল বেয়ে তরতর করে ওপরে উঠে গেল। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিমেলে চারদিকে তাকাতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যে তার ফ্যাকাসে মুখ একেবারে চকের মত সাদা হয়ে গেল।
আমরা একদল যাত্রী আশমানের দিকে মুখ তুলে ক্যাপ্টেনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। কলিজা ইতিমধ্যে ধিকধিক্ করে নাচতে শুরু করে দিয়েছে। সবার মধ্যেই একই আতঙ্ক, ক্যাপ্টেন নেমে এসে কি খবর দেবে! ক্যাপ্টেন মুখ চূণ করে ফিরে এল। জানাল আমাদের জাহাজ মরণ ফাঁদ দ্বীপের কাছাকাছি পৌছে গেছে। এখান থেকে আজ পর্যন্ত কেউ-ই জান নিয়ে ফিরতে পারে নি। নাবিকের এরকমই বক্তব্য।
আমি সবে মুখ খুলতে যাব। হ’ল না। ক্যাপ্টেন আমার আগেই বলতে শুরু করল—ব্যস, সব খতম। আল্লাতাল্লার নাম করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। জান রক্ষা পাওয়ার আর কোনই ভরসা নেই।
আমি চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠলাম- ‘হায় আল্লাহ! এ যাত্রায় তবে জান রক্ষার কথা ভাবতে হচ্ছে।'
ক্যাপ্টেন ঈশান কোণের দিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করে বল‘ওই দেখ এবার এখানেই আমাদের ইন্তেকালের বন্দোবস্ত হচ্ছে। ওই যে কুচকুচে কালাে মেঘের টুকরােটি দেখা যাচ্ছে—মুহুর্তে আশমান ছেয়ে ফেলবে। তার ওপর প্রচণ্ড ঘূর্ণি ঝড়ের সঙ্কেত পাচ্ছি। আমাদের মত একশ’ জাহাজকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া তার পক্ষে কিছুমাত্র সমস্যা নয়।
—“কিন্তু কোন দ্বীপ ধারে কাছে…
আমাকে কথাটি শেষ করতে না দিয়েই ক্যাপ্টেন বলল- হ্যা, আছে। খুব কাছেই একটি দ্বীপ আছে বটে। তীরে নােঙর করতে
(চলবে )

0 Comments