আরব্য রজনীর গল্প পার্ট ৮৭ (Part 87) Arabyarajani

গল্পের পরবর্তী অংশঃ
দ্বীপটি সম্বন্ধে আমার মধ্যে কৌতুহল দানা বাঁধল। নিজেই মাস্তুল বেয়ে তরতর করে ওপরে উঠে গেলাম। গােলাকৃতি গম্বুজের মত দুইটি সাদা বস্তুর দিকে আমার নজর আকৃষ্ট হল।
মাস্তুল থেকে নেমে ক্যাপ্টেনের কাছে হাজির হলাম। দ্বীপটিতে জাহাজ ভেড়াতে বললাম।
ক্যাপ্টেন জাহাজ ভেড়াতেই সবাই হৈ হৈ করে নেমে গেল। মহাউল্লাসে আমার অঙ্গুলি-নির্দেশিত পথে ছুটে গেল। আমি তাে মাস্তুলের ওপরে উঠে মােটামুটি দেখেই নিয়েছি। তাই আর জাহাজ থেকে নামলাম না।

আমার সঙ্গী সওদাগররা একটু বাদেই ফিরে এল। তারা রহস্যজনক সাদা বস্তু দুটো সম্বন্ধে যে-বর্ণনা দিল তা শুনে আমার কলিজা পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবার জোগাড় হ’ল।
সাদা বস্তু দুটো গম্বুজ টম্বুজ মােটেই নয়। আদতে দুটো পেল্লাই ডিম। সবাই মিলে ঠেলে ধাকে ডিমদুটোকে সরানাে তাে দূরের কথা সামান্য গড়াতেও পারে নি। ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। শেষে রেগেমেগে দুটো পাথরের চাই ছুড়ে মারল। বেশ কিছু পরিমাণ পিচ্ছিল তরল পদার্থ তাদের ভেতর থেকে নির্গত হ’ল। সব শেষে ইয়া বড় বড় দুটো বাচ্চা বেরিয়ে এসে ছটফটানি শুরু করে দেয়।
আমি তাদের মুখে সবকিছু শুনে চমকে উঠে বললাম সেকি! কেলেঙ্কারি কাণ্ড বাঁধিয়ে বসেছেন যে! তাদের আব্বা আম্মা ফিরে এসে এদৃশ্য দেখলে সবার জান খতম করে ছাড়বে, রকপাখি খুব বদরাগী। গায়ে পড়ে মানুষের কোন ক্ষতিই করে না। কিন্তু চটে গেলে জান খতম না করা পর্যন্ত ছাড়ান দেয় না।।
আমি কাঁপতে কাঁপতে ক্যাপ্টেনকে জাহাজ ছাড়তে বললাম। ব্যস্ত-হাতে নােঙর তুলে জাহাজটিকে কোনরকমে মাঝ দরিয়ায় নিয়ে আসা হল। ভাবলাম, এ-যাত্রায় কোনরকমে বিপদ কাটিয়ে ওঠা গেছে। কিন্তু খােদার মর্জি আদতে তা নয়। হঠাৎ আকাশের গায়ে দু'টুকরাে কালাে মেঘ উঁকি দিল। গায়ে কাটা দিয়ে উঠল। ভাবলাম, এক্ষণি তুফান উঠল বলে। না, ভুল—একেবারেই ভুল ধারণা। দু'দুটি রকপাখি কলিজা কাঁপানাে শোঁ শোঁ শব্দ করে উঁচু-আকাশ থেকে উদ্ধার বেগে নিচের দিকে নেমে আসতে লাগল। তাদের উভয়ের পায়ের নখ দিয়ে আঁকড়ে ধরা রয়েছে বিশাল দুটো পাথরের চাই। তাদের এক একটি আকৃতিই আমাদের জাহাজটির চেয়ে বড় না হােক ছােট তাে অবশ্যই নয়। ব্যাপার দেখে আমাদের স্নায়ু শিথিল হয়ে আসতে লাগল। হাত পা যেন ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের জাহাজটিকে লক্ষ্য করে একটি পাথর ছেড়ে দিল। জাহাজের ক্যাপ্টেন খুবই অভিজ্ঞ। আচমকা জাহাজটিকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে বিপদ সামাল দিয়ে দিল।
আমরা দুরু দুরু বুকে আকাশের দিকে মুখ করে তাকিয়ে! কারণ আর এক যমদূত যে আর একটি পাথরের চাই বয়ে নিয়ে আমাদের জাহাজের চারদিকে চক্কর মেরে চলেছে। মাথার ওপরে খড়গ ঝুলছে। আমাদের জাহাজের ক্যাপ্টেন সুতীক্ষ দৃষ্টি মেলে তার দিকে তাকিয়ে।

রক পাখিটি পায়ের আঙুলের বন্ধন শিথিল করতেই ক্যাপ্টেন ক্ষিপ্রগতিতে হাল ধরে মােচড় মারতে থাকে। আর একটু—আর একটু। না, শেষ রক্ষা করতে পারল না। বিপদসীমা অতিক্রম প্রায় করেই ফেলেছিল। কিন্তু সামান্য একটুর জন্য কেলেঙ্কারীর চূড়ান্ত ঘটে গেল। বিশালাকৃতি পাথরটি জাহাজের সামনের দিকটি ভেঙে চুরমার করে দিয়ে আছাড় খেয়ে জলে পড়ে গেল। চোখের পলকে হুড়মুড় করে জল ঢুকে জাহাজটিকে তলিয়ে দিল।
খােদাতাল্লা আমার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। নইলে জাহাজভাঙা এতবড় কাঠের টুকরােটি ঠিক সে মুহুর্তেই বা আমার নাগালের মধ্যে চলে এল কি করে ? যাই হােক বরাতগুণে পাওয়া কাঠটির ওপরে কষ্টে উঠে বসলাম। কত ঢেউয়ের তালে তালে ওঠা নামা করতে করতে বাধন হারা উদ্দেশ্যে ভেসে চললাম।
সারাদিন সারারাত্রি ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে ঢেউয়ের সঙ্গে মােকাবেলা করে করে এক সময় এক দ্বীপের গায়ে এসে আমার বাহক কাঠটি আটকে গেল। প্রায় এক ঘণ্টা বালির বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে কিছুটা ক্লান্তি অপনােদন করে নিলাম। এবার দ্বীপটির ভেতরে ঢুকতে লাগলাম।
দ্বীপের গাছগাছড়ার ফাঁক দিয়ে এগােতে এগােতে এক সময় চমৎকার একটি বাগিচায় হাজির হলাম। গাছে গাছে পাকা ফল ঝুলছে। পাশেই দেখলাম কুল কুল রবে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চলেছে একটি ঝর্ণা। ফল আর ঝর্ণার পানি দিয়ে দু’দিনের উপবাস ভঙ্গ করলাম। মনে হ’ল শরীরে হৃতশক্তির কিছুটা অন্তত ফিরে পেয়েছি।
এমন সময় রাত্রির অবসান হ’ল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
         তিন শ' সাততম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, সিন্দবাদ নাবিক দোস্ত ও মেহমানদের কাছে কিসসা বলছে–আমি পেটপুরে পাকা ফল ও ঝর্ণার পানি খেয়ে কিছুক্ষণ ঘাসের ওপর শুয়ে রইলাম। ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল। এবার সত্যি সত্যি নিজেকে বড্ড অসহায় মন হতে লাগল। অজানা-অচেনা দ্বীপ, এর নামও শুনিনি। কারাে মুখে।
নিরবচ্ছিন্ন উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে সারা রাত্রি ঠায় বসে কাটালাম। ডর লাগছিল। চোখ বন্ধ করলে যদি আচমকা কোন বিপদ এসে ঘাড়ে চেপে বসে।
গাছে গাছে পাখির চাঞ্চল্য লক্ষ্য করলাম। বুঝলাম, ভােরের পূর্বাভাষ।
কিছুক্ষণের মধ্যে দ্বীপটির বুকে নেমে এলাে সকালের উজ্জ্বল আলােকচ্ছটা। দিল কিছুটা শান্তি পেল। এবার দ্বীপটিকে ঘুরে ঘুরে দেখার জন্য কৌতূহল হ’ল। পায়ে পায়ে এগিয়ে চললাম দ্বীপের কেন্দ্রস্থলের দিকে। কিছুদূর যেতে না যেতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখলাম একটি ঝর্ণা। তার ওপরে একটি সাঁকো তৈরী করে দুই পাড়ের সঙ্গে সংযােগস্থাপন করা হয়েছে।
সাঁকোটির মুখে এক বুড়াে বসে একা। উলঙ্গ, তবে একটি গাছের পাতা লতার সাহায্যে বেঁধে শরম ঢাকার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়েছে।
আমাকে দেখার পরও বুড়ােটির মধ্যে তেমন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম না। নীরব চাহনি মেলে আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। আমি ভাবলাম, এ বুড়ােটিও নির্ঘাৎ আমারই মত নসীবের ফেরে পড়েছে। জাহাজডুবির ফলে সর্বস্ব খুইয়ে ফলটল খেয়ে কোনরকমে জান টিকিয়ে রেখেছে।
আমি দু’পা এগিয়ে গিয়ে সহানুভূতির স্বরে বললাম—জী, কে আপনি? এ-দশাই বা আপনার কি করে হ’ল ? কোন্ মুলুকের আদমি আপনি?
আমি এক নাগাড়ে এতগুলাে প্রশ্ন বুড়ােটির দিকে ছুঁড়ে দিলাম। সে কিন্তু কোন জবাবই দিল না। হাত নেড়ে আর চোখের ভাষায় কি যেন বুঝাতে চেষ্টা করল। আমি জ্ঞান-বুদ্ধির ওপর নির্ভর করে অনুমান করলাম, চলার সামর্থ তার নেই। ঝর্ণার পানি একটু পেলে কলিজাটিকে ভিজিয়ে নিতে পারে। 
আমি বুড়ােটিকে কাঁধের ওপর তুলে নিলাম। সে আমার বুকের দু’পাশ দিয়ে পা দুটো ঝুলিয়ে দিয়ে গলাটি জড়িয়ে ধরল। ক্রমে কাঠির মত হাত দুটো দিয়ে সাঁড়াশির মত আমার গলাটিকে এমন আঁকড়ে ধরল যেন আর কিছুক্ষণ এভাবে চললে আমি দম বন্ধ হয়ে মারা যাব।
আমি শরীরের সবটুক শক্তি-প্রয়ােগ করে তার বাহুর বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করার কোশিস করলাম। কিন্তু হায়! পেশীহীন, হাড়ি সম্বল হাত দুটো দিয়ে আমার গলাটিকে আরও শক্ত করে ধরল। ছাড়াতে পারলাম না। বুড়াের অপ্রত্যাশিত আচরণে আমার মধ্যে মৃত্যুভয় দেখা দিল। আতঙ্কে আমার বুকের মধ্যে ঢিবঢিবানি শুরু হয়ে গেল। আপন মনে বলে উঠলাম, হায় খােদা! পরােপকার করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত যে জানই খােয়াতে হচ্ছে।
ক্রমে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। তার ওপর অবধারিত মৃত্যুর আতঙ্ক সবমিলিয়ে আমার স্নায়ুগুলাে ক্রমেই শিথিল হয়ে আসতে লাগল। আর খাড়া থাকতে পারলাম না। তাকে নিয়েই দুম করে মাটিতে পড়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার সংজ্ঞাও লােপ পেয়ে গেল। কতক্ষণ সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়েছিলাম বলতে পারব না। সংজ্ঞা ফেরার পর দেখলাম বেরসিক বুড়ােটির হাত দুটো তেমনি সাঁড়াশির মত আমার গলা আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে আমার মােউত বুড়ােটির মুখের দিকে তাকালাম। সে চোখের ভাষায় আমাকে বুঝিয়ে দিল ফলের গাছগুলাের কাছে নিয়ে যেতে।
আমি নাচার। বুড়ােটির নির্দেশ অমান্য করার মত মনােবল আমার নেই। তাকে ক্ষ্যাপালে চলবে না। তাকে সন্তুষ্ট করে, কোনরকমে ভুলিয়ে ভালিয়ে কাধ থেকে নামাতে না পারলে জান খতম করে দেবে। হাড্ডিসার চেহারা হলে কি হবে ; গায়ে যেন অসুরের শক্তি ধরে। তাকে প্রতিরােধ করার কোশিস করা নিতান্তই বােকামি।।
আমি বুড়ােটিকে কাঁধে নিয়ে একটি গাছতলায় এসে দাঁড়ালাম। ডালে ডালে পাকা ফল ঝুলছে। বুড়াে এক হাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে রেখেই অন্য হাতে গাছ থেকে ফল ছিড়ে গােগ্রাসে খেতে লাগল। এবার ঝর্ণার কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য ইশারা করল। উপায় নেই। নিজের জান রাখার তাগিদেই তাকে কাঁধে বয়ে ঝর্ণার ধারে হাজির হলাম।
সারাদিন বুড়ােটিকে বয়ে নিয়ে বেড়ালাম। ভেবেছিলাম, রাত্রে অন্তত ঘুমােবার জন্য কাঁধ থেকে নামবে। তখন আপদটিকে ফেলে রেখে সােজা চম্পট দেব। হায় খােদা! আমার গলায় জড়িয়ে থেকেই সে দিব্যি ঘুমােতে লাগল। তার কবল থেকে কিছুতেই নিজেকে মুক্ত করা সম্ভব হ’ল । একী পৈশাচিক কাণ্ড! শয়তান বুড়ােটির পাল্লায় পড়ে আমার জান কয়লা হয়ে যেতে লাগল। রীতিমত অত্যাচার। অত্যাচারে একেবারে অতিষ্ট করে তুলল দেখছি! শয়তানটিকে খােদাতাল্লা কবে যে আমার কাঁধ থেকে নামিয়ে অব্যাহতি দেবেন তা একমাত্র তিনিই জানেন।
এবার আমার মাথায় চমৎকার একটি মতলব এল। মাত্র কয়েক হাত দূরে একটি লাউগাছ দেখতে পেলাম। একটি পাকা লাউ ছিড়ে আনলাম। তার ভেতর থেকে বীচিগুলাে বের করে ফেললাম। এবার তার ভেতরে কিছু টসটসে পাকা আঙুর ঢুকিয়ে দিলাম। মাটি খুঁড়ে একটি গর্ত তৈরী করে লাউটিকে পুঁতে রাখলাম। দু'তিনদিনের মধ্যেই আঙুর পচে গাজলা কাটতে লাগল। এবার লাউটিকে তুলে দেখি চমৎকার সরাব তৈরী হয়ে গেছে। এক চুমুক গাজলা সমেত অর্ধেক সরাব উদরে ঢুকিয়ে দিলাম। ব্যস কিছুক্ষণের মধ্যেই সরাবের নেশা শুরু হয়ে গেল। এবার আমার শরীরটিকে তুলাের মত হাল্কা মনে হতে লাগল। ঘাড়ের ওপরের বােঝাটিও যেন খুবই হাল্কা মনে হতে লাগল। খুশীতে আমার দিল নেচে উঠল। ব্যস, আমি এবার উন্মাদের মত নাচানাচি লাফালাফি শুরু করে দিলাম।
আমার কাণ্ড দেখে আমার কাধের বুড়ােটি এবার যেন থমকে গেল। আমার গায়ের অসুরের বল বুড়ােকে আতঙ্কিত করল। সে রীতিমত ঘাবড়ে গেল। এবার সে পা দুটো দিয়ে আমার বুকে অনবরত গুঁতো মারতে লাগল। বুঝলাম, দাওয়াইয়ে কাজ হয়েছে।
ইশারায় আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে, লাউয়ের সরাব সে-ও খাবে। আমি আমার ভুক্তাবশিষ্ট সরাবটুকু বুড়ােকে দিলাম। সে চো চো শব্দ করে সবটুকু সরাব গলায় ঢেলে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সরাবের ক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। এবার ক্রমে পায়ের বাঁধন শিথিল হয়ে পড়তে লাগল। হাতেরও সে দৃঢ়তা আর নেই। আমি সুযােগের সদ্ব্যবহার করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আচমকা সজোরে এক ঝাকুনি দিয়ে হতচ্ছাড়া বুড়ােটিকে কাঁধ থেকে দিলাম ফেলে। সে সঙ্গে সঙ্গে হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে কোশিস করল। সরাবের নেশায় শরীর টলছে। দুম করে আছড়ে ফিন মাটিতে পড়ে গেল।
এবার আমার মধ্যে প্রতিশােধ-স্পৃহা চাঙা হয়ে উঠল। শয়তান বুড়ােটি ক’দিন ধরে আমার জানটাকে একেবারে কয়লা করে দিয়েছে। আর আমি তাকে এত সহজে রেহাই দেব? অসম্ভব। পাস থেকে একটি পাথরের চাই তুলে নিয়ে উন্মাদের মত অনবরত তার মাথায় আঘাত হানতে লাগলাম। তার মাথার খুলিটি গুঁড়িয়ে গেল।
এভাবে আমি অনেক কায়দা কৌশল ও কসরৎ করে আমার সাক্ষাৎ মােউত বুড়ােটির হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।
এমন সময়ে ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
         তিন শ’ আটতম রজনী 
রাত্রির তৃতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাঁহাপনা, সিন্দবাদ নাবিক তার কিসসা বলে চলল —দোস্ত ও মেহমানগণ, বিশ্বাস করুন, আমার সাক্ষাৎ মােউৎ বুড়ােটিকে খতম করার পর আমার মনােবল দশগুণ বেড়ে গেল। আমি তাে তার কব্জায় পড়ে জানের আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম।
এবার আমি খুশী হয়ে সমুদ্র সৈকতের দিকে হাঁটতে লাগলাম। সমুদ্রের কাছাকাছি যেতেই একটি বিশালায়তন জাহাজ নজরে পড়ল। ব্যস্ত-পায়ে এগিয়ে গেলাম। জাহাজের যাত্রী ও লস্কররা তখন জাহাজ থেকে নামছে। জাহাজের ক্যাপ্টেনও তাদের সঙ্গে রয়েছে। আমাকে দেখেই জাহাজের ক্যাপ্টেন সচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আমি বললাম-“আপনারা এ-দ্বীপে নােঙর করলেন কেন? এমন হন্তদন্ত হয়ে চলেনই বা কোথায় জনবসতি তাে এখানে নেই। | ক্যাপ্টেন বলল —‘বসতি নেই জানি। একটু এগিয়ে গেলে একটি ঝর্ণা রয়েছে। পানি খুব মিষ্টি। সুমিষ্টি ফলও রয়েছে প্রচুর। আমরা পানি ও ফল আনতে যাচ্ছি। কিন্তু তুমি কে? কি করে এখানে এলে? আর কেনই বা এলে? ক্যাপ্টেনের কাছে আমি আমার নসীবের ফেরের কিসসা সংক্ষেপে বললাম। এমন কি শয়তান বুড়াের কাণ্ডকারখানাও বাদ দিলাম না।
ক্যাপ্টেন আঁৎকে উঠে বলল —কী সর্বনেশে কাণ্ড! তুমি ওই হতচ্ছাড়া বুড়ােটির কবলে পড়েছিলে? সাক্ষাৎ শয়তানই বটে। - অতীতে যেসব নাবিক তার কবলে পড়েছিল—জান নিয়ে ফিরতে পারে নি। তার হাড্ডিসার দাবনা আর হাতে এতই তাগদ যে, চেপেই জান খতম করে দিতে পারে। বেটা, তােমার জোয়ান বয়স আর ফন্দি ফিকিরের জন্যই তার খপ্পর থেকে জান বাঁচাতে পেরেছ। ওই হতচ্ছাড়া বুড়ােটিকে সবাই সমুদ্রের আতঙ্ক বলে জানে। তার নাম শুনলেই চমকে ওঠে। খােদাতাল্লা তােমার সহায়। তাকে খতম করে তুমি বহুৎ নাবিকের জান বাঁচিয়েছ।
আমার নসীবের বাৎ শুনে ক্যাপ্টেনের মায়া হ’ল। আদর করে জাহাজে নিয়ে গেল। কোর্তা-পাৎলুন দিল। খানাও দিল হরেক কিসিমের। জাহাজ নােঙর তুলল। বেশ কিছুদিন অনবরত জাহাজ চালিয়ে খুবসুরৎ এক বন্দরে আমাদের জাহাজ ভিড়ল। জাহাজ ঘাটেই কিছু স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে মােলাকাৎ হ’ল। তাদের মুখে শুনলাম, এর নাম বানর-নগর। এর এরকম নামকরণের কারণ, বন্দরের গাছে গাছে অদ্ভুত দর্শন হাজার হাজার বানর বাস করে।
জাহাজে এক প্রৌঢ় সওদাগরের সঙ্গে আমার খুব ভাব, একেবারে দোস্তী হয়ে গিয়েছিল। বড় অমায়িক আদমি। আমি তার সঙ্গে বন্দরের ধারে পায়চারি করছিলাম। সে আমাকে একটি চমৎকার ফন্দি বাৎলে দিল। একটি কাপড়ের থলিতে পাথরের নুড়ি দিয়ে বলল-দোস্ত। এটি নিয়ে নগরের ফটকে চল। দেখবে

Post a Comment

0 Comments