আরব্য রজনী পার্ট ৮৬ (Part 86) Arabyarajani bangla

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
কয়েক জন আমার বিবির শব দেহটি বাঁধাছাদা মেরে কাধে তুলে নিল। আমি আতঙ্কে শিটকে লেগে যাবার জোগাড় হলাম।সুলতান, উজির, আমীর, ওমরাহ ও সুলতানিয়তের গণ্যমান্য আদমিরা শবযাত্রার সামিল হয়েছেন। আমি তাদের পিছন পিছন ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে পথ পাড়ি দিতে লাগলাম।
পর্বতের পাদদেশের সে কুয়ােটির ধারে এসে শব-মিছিল থামল। প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী আচার-অনুষ্ঠান সেরে আমার বিবির মৃতদেহটিকে কুয়াের ভেতরে নামিয়ে দেয়া হল। আমি পাশে দাঁড়িয়ে কোরবানির খাসীর মত কাঁপতে কাঁপতে সবকিছু দেখছি।

সবাই এবার আমার দিকে নজর দিল। প্রথা অনুযায়ী এক কলসী পানি ও সাতটি রুটি আমার পিঠে বেঁধে জোর জুলুম করে ইয়া লম্বা দড়ির সাহায্যে আমাকে কুয়াের মধ্যে নামিয়ে দেয়া হল। কুয়ােটির তলদেশের মাটিতে এক সময় আমার পা ঠেকল। ওপর থেকে চিৎকার ভেসে এল—‘দড়ির বাঁধন খুলে দাও। ফাস খুলে দড়িটি ছেড়ে দাও।

আমি নির্বিকার। মনস্থ করলাম, দড়ির বাঁধন খুলব না। খুললামও না। মুখে কুলুপ এঁটে ঘাপটি মেরে রইলাম। ওপর থেকে জোর চিল্লাচিল্লি ভেসে আসতে লাগল—“দড়ির ফাস খুলে দাও। করছ কি ? এত দেরী করছ কেন?
তবু আমি নির্বিকার। বাঁধন খুলাম না। হ্যা বা না কিছু বল্লামও না।।
ওপরের কণ্ঠস্বরকে অধিকতর অধৈর্য মালুম হ’ল—“আরে করছ কি হে! বাঁধন খুলে দড়িটি ছেড়ে দাও! কেন ঝুটমুট দেরী করছ? দড়ি না নিয়ে আমরা ফিরতে পারছি না। ঝটপট বাঁধন খুলে দড়ি ছেড়ে দাও। কে কার বাঁধন খােলে আর কে-ই বা দড়ি ছাড়ে। আমি অন্ধকার গহূরে ঘাপটি মেরে নিশ্চল-নিথর পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়েই রইলাম।
ওপরের আদমিগুলাে অধৈর্য হয়ে উঠল। বার কয়েক বাঁধন খােলার জন্য চেঁচামেচি করে এক সময় হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিল। শেষ পর্যন্ত উপায়ান্তর না দেখে দড়ির আশা ছেড়ে কুয়াের মুখে পাথর চাপা দিয়ে সবাই বিদায় নিল।
অন্ধকার পাতালপুরীতে আমি ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলাম। কেঁদে কেঁদে কাহিল হয়ে পড়লাম। ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। ঘুমিয়ে রইলাম। সারাদিন সারারাত্রি ঘুমে বিভাের হয়ে রইলাম। পরদিন সকালে চোখ মেলে তাকালাম।। কুয়াের মুখের পাথরটির ফাক দিয়ে ছিটকে আসা আলাে দেখে বুঝলাম সকাল হয়েছে।
খুব ক্ষিদে পেয়েছে। নাড়িভূঁড়িতে জ্বালা ধরে গেছে। দুটো রুটি আর পানি দিয়ে পেটের জ্বালা নেভালাম। ওপর থেকে ছিটকে আসা সামান্য আলােতে যেটুকু দেখা গেল
 তাতে বুঝলাম, আমার চারদিকে নরকঙ্কাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আর মাংস-পচা উৎকট গন্ধ তাে রয়েছেই। হবেই তাে। কতগুলাে মৃতদেহের গায়ে তখনও পচা মাংস জড়িয়ে। ঠেলে বমি আসতে চায়, জোর করে চেপে রাখি। অন্য ফিকির তাে যে নেই। আমার তখন ভাবনা, মূলধন তাে মাত্র সাতটি রুটি। তাও আবার ইতিমধ্যে দুটি খরচা হয়ে গেছে। তারপর? আতঙ্কে বার বার শিউরে উঠতে থাকলাম। রুটি ক’টি ফুরালে পাতালপুরীতে শুকিয়ে কুঁকড়ে মরা ছাড়া গত্যন্তর নেই, এই তাে আমার নসীব-- আমার বরাত।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

          তিনশ চারতম রজনী 
বাদশাহ শারিয়ার কামরায় এলে বেগম শাহরাজাদ তার কিসসার পরবর্তী অংশটুকু শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, সিন্দবাদ নাবিক তার কিসসা বলে চলেছে। ভিন মুলুকে না হয় বরাতগুণে এসে পড়েছি। কিন্তু শাদীর ঝামেলায় কেন ঝুটমুট জড়াতে গেলাম। নিজের মুলুকে বিবি বালবাচ্চা সবাই আছে। কোনরকমে ঘরে ফিরে যেতে পারলেই তাদের নিয়ে ঘর-সংসার করাই তাে ঢের, ঢের সুখের ছিল। আমার দুর্মতিই অপমৃত্যুর পথ সাফসুতরা করে দিয়েছে। এখন মালুম হচ্ছে হীরক পাহাড়ে সাপের পেটে গেলে বা নরখাদকরা যদি তেল-মশল্লা মাখিয়ে আগুনে ঝলসে খেত এর চেয়ে বেশী কি হত! সে-মৃত্যুর চেয়ে এভাবে তিলে তিলে মরা ঢের কষ্টদায়ক। আরও ভাল হত ঝড়ের দাপটে জাহাজটি টুকরাে টুকরাে হওয়ার সময় দরিয়ার পানিতে তলিয়ে গেলে। অন্তত তাতে দীর্ঘ সময় ধরে আতঙ্কে পৌনে মরা হয়ে এমন মানসিক যন্ত্রণা ভােগ করতে হত না। আমি উন্মাদের মত আর্তনাদ করতে লাগলাম, ’হাতে নিজের চুল টেনে ছিড়তে লাগলাম আর বার বার কুয়াের দেওয়ালে মাথা ঠুকতে শুরু করলাম। রুটি প্রায় শেষ। পানিও কলসির তলায় গিয়ে ঠেকেছে। হবেই তো । পাতাল পুরীতে সাতটি দিন যে গুজরান করেছি। ক্ষিদে, রাক্ষুসে ক্ষিদে আমাকে পেয়ে বসল। নাড়িভূঁড়িতে যেন আগুন
জ্বলেই চলেছে। তবু শেষ রুটির টুকরােটি মুখে দিতে পারলাম না। ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সেটিকে মুখের কাছে নিয়ে বার বার ফিরিয়ে এনেছি।
আমার মােউত, মৃত্যু আমার ঠিক মাথার ওপরে। শুধুমাত্র সুযােগের অপেক্ষায় রয়েছে। আতঙ্কে চোখ দুটো বারবার বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহর নাম স্মরণ করাই একমাত্র শান্তি—একমাত্র স্বস্তি। বিড় বিড় করে তার স্মরণ করতে লাগলাম।
খােদা মেহেরবান। আচমকা এক ঝলক আলাে কুয়ােটির অন্ধকার অনেকাংশে দূর করে দিয়ে আমার চারদিকের সব কিছু প্রায় দৃশ্য করে তুলল। যন্ত্রচালিতের মত ঘাড় ঘুরিয়ে ওপরের দিকে তাকালাম। দেখলাম কুয়াের মুখের পাথরটি সরে গেছে।
এক বৃদ্ধের শবদেহ ক্রমে আমার দিকে নেমে যেতে লাগল। তারপরই তার বিবি করুণ আর্তনাদ করতে করতে দড়ি বেয়ে নিচে নামল। তার পিঠেও এক কলসি পানি আর সাতখানা রুটি বাঁধা।
আমি হাত বাড়িয়ে কঙ্কালের একটি পা তুলে নিয়ে শরীরের সবটুকু শক্তি নিঙড়ে বুড়িটির মাথায় আঘাত করলাম। মুহূর্তে সব খতম।
কেবলমাত্র এক কলসি পানি আর সাতটি রুটির জন্য পৈশাচিক। হত্যাকাণ্ড করতে কিছুমাত্রও দ্বিধা করলাম না। যে করেই হােক আমাকে জিন্দা থাকতেই হবে। এভাবে যে ক’দিন জানটিকে টিকিয়ে রাখা যায় তখন আমার একমাত্র ধান্দা। উচিত-অনুচিত ন্যায়-অন্যায় আর ধর্ম-অধর্মবােধ আমার মধ্য থেকে লােপ পেয়ে গেছে। সদ্যলব্ধ এক কলসি পানি আর সাতটি রুটি মূলধন করে আমি ফিন পাতালপুরীতে দিন গুজরান করতে লাগলাম। আলােকচ্ছটা। অখণ্ডিত পাথরটি ফিন সরে গেছে। এবার এক বিবির মৃতদেহ আমার দিকে নেমে গেল। তার পিছন পিছন নেমে আসতে লাগল তার জ্যান্ত স্বামী। বহু আকাঙ্ক্ষিত রুটি আর পানির কলসিটির দিকে আমি লােলুপদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। কাছে যেতেই পূর্বপদ্ধতি অনুসরণ করে এরও জান খতম করলাম। ফিন এক কলসি পানি আর সাতটি রুটি আমার করায়ত্ব হ’ল। আল্লাহর করুণায় আরও ক’দিনের জন্য নিশ্চিন্ত হলাম। আমি এভাবে একের পর এক খুন করে নিজের জানটিকে টিকিয়ে রাখতে লাগলাম।
আমি হাড্ডির বিছানায় শুয়ে একদিন নিদে আচ্ছন্ন ছিলাম। আচমকা বিকট ও রহস্যজনক এক শব্দে হুড়মুড় করে উঠে বসে পড়লাম। যন্ত্রচালিতের মত হাড্ডির টুকরােটি হাতে তুলে নিয়ে বাগিয়ে ধরলাম। স্পষ্ট মালুম হ’ল। বেশ বড়সড় কি যেন একটি আমার পায় গা-ঘেঁষে চলে গেল। জমাটবাঁধা অন্ধকার। কিছুই মালুম হচ্ছে না। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে হাড্ডির ভূপের ওপর দিয়ে এগােতে থাকি। রহস্যভেদ করতেই হবে। পা টিপে টিপে এগােতেই থাকি।
এক সময় এক তাজ্জব ব্যাপার ঘটে গেল। আচমকা এক টুকরাে আলাে এসে আমার মুখে পড়ল। আলােটির উৎসস্থলের খোঁজে আরও এগােতে থাকি। আলাে ক্রমে বেড়ে চলল। আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিতে লাগল। একী অকল্পনীয় ব্যাপার—ভাবতে লাগলাম। সেটা যে আমার মুক্তির পথ ভাবতেই পারিনি বরং ভাবলাম, এ বুঝি নতুনতর এক মৃত্যুফাঁদ। আমি কৌতূহলী দিল নিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। হাড্ডির টুকরােটি হাতেই রয়েছে। এমন সময় আমাকে অবাক করে দিয়ে একটি জানােয়ারের মত কি যেন ছুটে পালিয়ে গেল। গােস্তের লােভে এখানে হাজির হয়েছিল। আচমকা আমার দিল খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠল।
হ্যা, হিংস্র জানােয়ারের কাজই বটে। মড়া আদমির সুস্বাদু গােস্তের লােভে কুয়াে পর্যন্ত ধাওয়া করেছিল। রাত্রে গুটিগুটি এসে লাশ টেনে নিয়ে যায়। খােদাতাল্লার ওপর আমার আস্থা অনেকাংশে বেড়ে গেল। আশায় বুক বেঁধে আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে যেতে রহস্যটি আমার কাছে আরও অনেকখানি খােলসা হয়ে গেল। মাটির নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ কেটে কেটে হিংস্র জানােয়াররা মৃত্যুকূপের সঙ্গে যােগাযােগ গড়ে তুলেছে।
আমি খােদাতাল্লার নাম স্মরণ করতে করতে আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে একেবারে খােলা আকাশের তলায় গিয়ে দাঁড়াই। কতদিন পর যে এতবড় আকাশটিকে দেখতে পেলাম খােদাতাল্লাই জানেন।
আমি কৌতুহলী দৃষ্টিমেলে চারদিকে তাকাতে লাগলাম। আমার একদিকে সমুদ্র, বিপরীতদিকে সুউচ্চ পর্বত আর মাথার ওপরে নীল আকাশ।।
পর্বতের বিপরীত দিকে নগর। পাহাড় ডিঙিয়ে নগরে যাওয়া আসা সম্ভব নয়। অতএব একমাত্র সমুদ্রই ভরসা। সমুদ্রপথেই আমাকে এখান থেকে পালাতে হবে।
এবার ক্ষিদে অনুভব করতে লাগলাম। এতক্ষণ উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় ক্ষিদে তেষ্টা শিকেয় উঠে গিয়েছিল। কিন্তু কোথায় খানা। উপায়ান্তর না দেখে ফিন মরণকূপে ফিরে গেলাম। অধীর প্রতীক্ষায় রইলাম কবে নতুন শব নামবে।
খােদাতাল্লা সহায়। শবদেহের জন্য বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। শবদেহ নামল। একই উপায়ে রুটি আর পানি সংগ্রহ করলাম। ফিরে গেলাম সমুদ্রের ধারে। জাহাজের জন্য অধীর প্রতীক্ষায় দিন গুজরান করতে লাগলাম।
হঠাৎ আমার মাথায় বহুৎ আচ্ছা একটি মতলব খেলে গেল। কেন কেবল রুটি আর পানি নিয়েই সন্তষ্ট হচ্ছি। মরণকূপ তাে অতুল ধন-দৌলতের আকরও বটে। হাজার হাজার আদমির সমাধি এখানে হচ্ছে। তাদের মধ্যে জনানার সংখ্যা অর্ধেক না হলেও কাছাকাছি তাে হবেই। আর তারা সবাই কম-বেশী অলঙ্কারাদি নিয়েই তাে কুয়ােয় নামে। সেগুলাের কিছু সংগ্রহ করতে পারলেই তাে আমি আমীর-বাদশাহ বনে যেতে পারি।
আমি সােনাদানা হীরা-জহরতের তল্লাসে মেতে গেলাম। হাডিড-খুলি সরিয়ে বহুৎ কিসিমের অলঙ্কার সংগ্রহ করে পাহাড় করে ফেললাম।
এবার সমস্যা হ’ল এতসব অলঙ্কার পত্র নেব কেমন করে? তার হিল্লে করতেও দেরী হ’ল না। শবাচ্ছাদনের দু’-একটি কাপড় খুলে নিলেই তাে মুশকিল আশান হতে পারে। করলামও তা-ই। পুটুলিটি বেশ বড়সড়ই হ'ল।
এবার গােটা কয়েক রুটি, এক কলসি পানি আর অলঙ্কারাদির পটুলিটি নিয়ে ফিন সমুদ্রের ধারে চলে এলাম।
একটি জাহাজ অদূরবর্তী অঞ্চল দিয়ে চলেছে দেখে মাথার পাগড়ীটি খুলে দোলাতে থাকি।
খােদা জান রাখলে মারে কে? জাহাজের ক্যাপ্টেন আমার সঙ্কেত বুঝতে পেরে মেহেরবানি করে একটি ডিঙি নৌকো পাঠিয়ে দিল। আমি পানির কলসিটি ফেলে দিয়ে রুটি আর অলঙ্কারের পুঁটলিটি নিয়ে ডিঙিতে উঠলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজে পৌঁছে গেলাম।
ক্যাপ্টেন কয়েক মুহুর্ত আমার মুখের দিকে সবিস্ময়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। একসময় বিস্ময়ের ঘোের কাটিয়ে বলল—কে তুমি? তােমার মুলুক কোথায় ? হিংস্র জানােয়ারের এলাকায় কি করে এলে? জিন্দাই বা রইলে কি করে ? পাহাড় ডিঙিয়ে তাে কোন আদমি ওখানে আসতে পারে না। আমি এ তল্লাটে বহুৎ চক্কর মেরেছি। আজ অবধি কোন আদমির চিহ্নও তাে কোনদিন—সত্যি তাজ্জব করলে।
আমি ক্যাপ্টেনের কাছে আমার নসীবের ব্যাপার স্যাপার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলাম। তবে শেষের দিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে লাগাম টেনে ধরতেই হয়েছিল। অলঙ্কারের ব্যাপার স্যাপারের কথা বেমালুম মিথ্যা করে বানিয়ে বল্লাম। তাকে বললাম, আমার যথাসর্বস্ব খােয়া গেলেও সােনাদানা হীরা-জহরতের পুটুলিটি বুকে আঁকড়ে রেখেছিলাম।
আমার কাহিনী শেষ করে পুটুলিটি খুলে একটি জড়ােয়ার অলঙ্কার ক্যাপ্টেনের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললাম—এটি আমার জান রক্ষার ইনাম। আপনার দোয়াতেই আমার জান রক্ষা হয়েছে। জানি সামান্য কৃতজ্ঞতা স্বীকার বা জহরতের অলঙ্কারটি দিয়ে আপনার ঋণ শােধ হবার নয়। তবু মেহেরবানি করে এটি নিয়ে আমাকে খুশী করুন।
ক্যাপ্টেন মুচকি হাসলেন। গহনাটি ফিরিয়ে দিলেন। মুখের হাসিটুকু অক্ষুন্ন রেখেই বললেন—“বেটা, এটি আমি নিতে পারব না। 
খােদাতাল্লা যে তােমার জান রক্ষা করেছেন, যথেষ্ট। তুমি বিপদে পড়ে আমার স্মরণাপন্ন হয়েছ। খােদার মর্জিতেই তােমাকে আমি হিংস্র জানােয়ারদের কবল থেকে উদ্ধার করতে পেরেছি। একে আমার কর্তব্য বলেই মনে করি। অতীতে বহুৎ আদমিকে এরকম বিপদ থেকে উদ্ধার করেছি। তাদের কাছ থেকে একটি কানাকড়িও কোনদিন হাত পেতে নেই নি। উপরন্তু জেব থেকে রাহা খরচও অনেককে দিতে হয়েছে। বেটা, ইয়াদ রাখবে, দুনিয়াটি একটি সরাইখানা ছাড়া কিছু নয়। খােদাতাল্লার মর্জিতেই দু’দিনের জন্য আসা। ফিন তারই মর্জিতে একদিন বিদায় নিতে হয়। চলার পথে এর-ওর সঙ্গে জান পরিচয় হয়। ব্যস, স্মৃতিটুকুই টিকে থাকে। এরই ফাঁকে কারাে জন্য কিছু করতে পারলে তাে নিজেকে ধন্য জ্ঞান করা উচিত।
ক্যাপ্টেনের বাৎ শুনে তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার দিল ভরে উঠল। সুকরিয়া জানাতেই হ’ল।
জাহাজ একের পর এক দ্বীপ, বন্দর আর নগর অতিক্রম করে এগিয়ে চলল।
খােদাতাল্লার দোয়ায় এক সকালে আমাদের জাহাজ বসরাহ বন্দরে নােঙর করল। খুশীতে আমার দিল ডগমগ হয়ে উঠল। এবার নির্ঘাৎ নিজের মুলুক বাগদাদে পৌঁছাতে পারব সন্দেহ রইল না।
আমার আত্মীয়জনরা আমাকে কাছে পেয়ে খুশী হ’ল। 
কিসসা শেষ করে সিন্দবাদ নাবিক এবার বলল —আগামীকাল যে কিসসা তােমাদের কাছে পেশ করব তা বাস্তবিকই অতুলনীয়। সিন্দবাদ নাবিক সেদিনও সিন্দবাদ কুলীকে একশটি সােনার মােহর দিয়ে বল্ল—এগুলাে তােমার কাছে রাখ কাজে আসবে। কাল সকালে ফিন আসবে, ইয়াদ থাকে যেন। খানাপিনা সেরে দোস্ত-মেহমানরা সিন্দবাদ নাবিককে সকরিয়া জানিয়ে বিদায় নিল।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন। 
সিন্দবাদ নাবিকের পঞ্চম সমুদ্রযাত্রার কিসসা 
      তিনশ’ ছয়তম রজনী 
বাদশাহ শারিয়ার প্রায় মাঝ রাত্রে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, পরদিন সকালে সিন্দবাদ নাবিকের ইয়ারদোস্তরা এক এক করে তার কামরায় এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সিন্দবাদ কুলী কামরায় ঢুকে সিন্দবাদ নাবিককে সালাম জানাল।
সিন্দবাদ নাবিক তার পঞ্চম সমুদ্র যাত্রার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বল্ল-দোস্ত ও মেহমান, চতুর্থ সমুদ্রযাত্রা সেরে মুলুকে ফিরে আসার পর দীর্ঘদিন আমি বিবি বালবাচ্চা আর ইয়ার দোস্তদের নিয়ে আনন্দ ফুর্তির মধ্য দিয়েই দিন গুজরান করলাম। কিন্তু সে আর কদিন? আমার দিল ফিন বহির্মুখী হয়ে উঠল। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পরদেশে যাবার জন্য দিল উতলা হয়ে উঠল। যার খুনের সঙ্গে দেশদেখার নেশা জড়িয়ে রয়েছে তার দিল চার দেওয়ালে ঘেরা ছােট্ট কামায় বন্দী হয়ে থাকতে চাইবে কেন!
আমি ফিন সওদা করার কাজে মেতে গেলাম। আগের বারের মতই ভিন দেশের বাজারে চাহিদা আছে-ওরকম সামানপত্রে কামরা বােঝাই করে ফেললাম। তারপর বাঁধাছাদা করে তৈরী হয়ে গেলাম। এমন সময় এক দোস্ত খবর নিয়ে এল, বহুৎ আচ্ছা একটি জাহাজ সভায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যস, আর দেরী নয়, দামদস্তুর করে জাহাজটি খরিদ করে ফেললাম। একটু বেশী বেতন দিয়ে এক অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেনকে নিযুক্ত করলাম। কিন্তু একা একটি জাহাজ নিয়ে বেরােলে খরচা পােষাবেনা ভেবে বাগদাদ নগরীর সওদাগর দোস্তদের আমার সমুদ্রযাত্রার কথা জানালাম। অনেকেই তাদের সামানপত্র নিয়ে জাহাজে এল।
শুভমুহুর্তে আমরা বসরাহ বন্দর থেকে জাহাজ ছাড়লাম। পথে বহুৎ বন্দর, নগর আর দ্বীপ পড়ল। কোথাও জাহাজ ভেড়ালাম। কোথাও আবার অপ্রয়ােজন বােধে কোন কোন বন্দরনগর এড়িয়ে গেলাম।।
আমরা বন্দরে বন্দরে জাহাজ ভিড়িয়ে সওদাপত্র কেনাবেচা করতে করতে এগিয়ে চললাম। আমার সামানপত্র চড়া দামে বিক্রি হয়ে গেল। মুনাফাও কম হ’ল না।।
একদিন চলার পথে একটি দ্বীপের চিহ্ন দেখতে পেলাম। দূর থেকে দেখেই সমঝে গেলাম সেখানে আদমির বাস নেই। দ্বীপটি জুড়ে কেবল বিচিত্র সব গাছের মেলা। দ্বীপটি সম্বন্ধে আমার মধ্যে


Post a Comment

0 Comments