আরব্য রজনী পার্ট ৮৫ ( Part 85) Arabyarajani

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
কিছুদিন নিজেদের জিম্মায় রেখে খাইয়ে দাইয়ে গায়ে গতরে গােস্ত বাড়িয়ে নেয়। বেশ নাদুস নুদুস করে নিয়ে তবেই কষাইখানায় নিয়ে যায়। যে আদমিটি সবচেয়ে নাদুস নুদুস হয়ে ওঠে সে সম্রাটের ভােগে লাগে। আর একটু কমা মালগুলাে তার চ্যালাচামুণ্ডাদের বরাতে জোটে। সম্রাটের খানাপিনা হয় রুচিমাফিক। কাচা গােস্ত কিছুতেই ছোঁবে না। ছাল চামড়া ছাড়িয়ে ভালভাবে আগুনে ঝলসে তবেই মুখে তুলবে।

সম্রাটের খানা পাকাবার সময় বিশেষ প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়। আগুনে কাঠ জ্বলে অঙ্গার হয়ে গেলেও তা ধিক্ ধিক্‌ ক'রে জ্বলতে থাকে। তখন জ্যান্ত একটি আদমির গায়ে তেল-মশলারগােলা মাখিয়ে দেয়া হয়। মরিচ লবণ ও অন্যান্য মশলার ঝাঁঝে আদমিটি যখন কোরবানির মুহুর্তের খাসির মত নিদেন ডাক ছেড়ে ছটফট করতে করতে এক সময় নিস্তেজ হয়ে পড়ে তখন তাকে ওই চুল্লীর জ্বলন্ত অঙ্গারে ছুঁড়ে দেয়া হয়। উল্টে পাল্টে পােড়ানাে হয় তার পুরাে শরীরটিকে। তেল-মশলা ছাল চামড়া ভেদ করে গোস্তের কোষে কোষে ঢুকে যায়। এবার টুকরাে টুকরাে করে সম্রাটের ভােগ দেয়া হয়।
সম্রাটের খানাপিনার ফিরিস্তি শােনার পর থেকে আমার খিদেতেষ্টা শিকেয় উঠে গেছে। কেবল ঢকঢক করে পানি দিয়ে উদর পূর্তি করতে লাগলাম। তখন আমার একমাত্র ধান্দা কি করে বেশী রােগা, একেবারে হাড্ডিসার হয়ে যাওয়া যায়। তবে সম্রাট তাে দূরের কথা তার চ্যালাচামুণ্ডা অসভ্য জঙ্গলীগুলাে পর্যন্ত চরম বিতৃষ্ণায় আমাকে অবশ্যই বাতিল করে দেবে।
আমার সহযাত্রীরা রীতিমত তােয়াজের মধ্য দিয়ে গায়ে গতরে ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগল। কড়া নজর। একজনও যদি কোনক্রমে ভেগে যায় তবে সম্রাট কোতল করে ছাড়বে। এক জঙ্গলী আমাদের জিম্মাদার। সে রােজ আমাদের জঙ্গলে নিয়ে যায়। ফলমূল জোগাড় করে এনে খেতে দেয়। আমি ভুলেও কিছু দাঁতে কাটি না। লােভ সম্বরণ করে, খিদের জ্বালা অগ্রাহ্য করে আমাকে যে যেন তেন প্রকারেণ একেবারে লিকলিকে প্যাকাঠির মত হয়ে যেতে হবে।
এক সময় আমার চেহারার হালৎ দেখে নিজেরই মায়া হল। গোস্ত টোস্ত যে কোথায় উধাও হয়ে গেছে খােদাতাল্লাই জানেন। একেবারে হাড্ডিসার হয়ে গেছি। পর মুহুর্তেই আমার শুকনাে তােবড়ানাে গালে মুখে হাসির ঝিলিক ফুটে ওঠে। এতে জান তাে রক্ষা পাবেই। আমার মতলবটি সার্থক হয়েছে মালুম হ’ল। যখন দেখলাম আমাদের জিম্মাদার উলঙ্গ নরখাদকটি আমার প্রতি নিতান্ত ঔদাসিন্য প্রদর্শন করছে। তার একমাত্র নজর আমার সহযাত্রী দোস্তদের দিকে। হবে না, তারা যা পায় তাই উদরে পুরে এক একটি খােদার খাসি বনে গেছে।
আমি আমাদের জিম্মাদারের ঔদাসিন্যের সুযােগ নিতে গিয়ে একদিন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার সময় পথের মাঝে দুম করে পড়ে গেলাম। বিমারি হয়েছে বুঝাবার কোশিস করলাম।'
কারাে বিমারি হলে তার গােস্ত তারা ছোয়ও না। শেয়াল আর গিদ্দরের জন্য ফেলে দেয়।
আমি একে রােগা পটকা তার ওপর বিমারি ধরেছে। ছােঃ ছেঃ ! এর গােস্ত আবার খাওয়া চলে নাকি!
আমার মতলবটি পুরােপুরি সার্থক হ’ল। আমাকে পথের ধারে ফেলে রেখে জিম্মাদারটি আমার সহযাত্রী দোস্তদের নিয়ে এগিয়ে গেল।
এমন অপূর্ব সুযােগ হাতছাড়া করব এতবড় আহাম্মক অন্তত আমি নই। আমার জিম্মাদার সবাইকে তাড়িয়ে নিয়ে জঙ্গলের পথে অদৃশ্য হয়ে গেলে আমি ধীরে ধীরে উঠে পড়লাম। বিপরীত দিকের পথ ধরে কোনরকমে এগিয়ে চল্লাম।
সারাদিন ধরে দুর্বল শরীরে হাঁটাহাঁটি করলাম। রাত্রেও হাঁটার বিরাম নেই। জঙ্গলের ফলমূল আর ঝর্ণার পানি খেয়ে পুরাে আটদিন হেঁটে এক নয়া মুলুকে হাজির হলাম। সে-মুলুকের আদমিরা আমাদের মাফিক কোর্তা কামিজ পরে। সভ্যভব্য। পথের ধারে জমিতে কাজ করছে এরকম একদল আদমির দেখা পেলাম। আমাকে ভিন্ দেশীয় আন্দাজ করে কৌতুহলী দিল নিয়ে এগিয়ে এল। আমার ভাষাতেই তারা কথা বলছে দেখে কলিজায় জল এল।
আমি তাদের কাছে আমার নসীবের বিড়ম্বনার ঘটনা আদ্যোপান্ত বললাম। একটি বর্ণও ছাপলাম না।
আমার চেহারার হালৎ দেখে তারা বহুভাবে দুঃখ প্রকাশ করল। এ যে আমার ইচ্ছাকৃত ব্যাপার, বহুৎ কোশিস, বহুৎ কষ্ট স্বীকার করে তবে এরকম হালৎ করতে হয়েছে। নইলে আমার গােস্তে নরখাদকদের উদর পূর্তি হ'ত তা-ও বলতে বাদ দিলাম না।
তাদের সক্রিয় সহযােগিতায় আমি জাহাজে চেপে সমুদ্রের পারে একটি দ্বীপে হাজির হতে পেরেছিলাম। দ্বীপ-শহর। এখানেই তাদের সুলতানের প্রাসাদ। তারা আমাকে দরবারে সুলতানের সামনে হাজির করল।
আমি নতজানু হয়ে সুলতানকে কুর্ণিশ করলাম। সুলতান আমাকে বসতে বলেন।
আমি কথায় কথায় সুলতানকে বল্লাম—আপনার মুলুকে একটি ব্যাপার আমার বিস্ময়ের উদ্রেক করেছে। এখানকার সবাই দেখছি জিন-লাগাম ছাড়াই ঘােড়ায় চড়ছে। জীন-লাগাম কি কেবল আরামের জন্যই ব্যবহৃত হয়, নাকি দেখতেও খুবসুরৎ, জাহাপনা ?
সুলতান চোখ দুটো কপালে তুলে ততােধিক বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন—“কি বললে! জীন-লাগাম? সে আবার কি জিনিস হে? এসব নাম তাে কস্মিন কালেও শুনিনি!
-“জাহাপনা, মেহেরবানি করে হুকুম করলে দেখাতে পারি জীন-লাগাম সুখদায়ক তাে বটেই। আবার অবশ্যই শখও পূরণ করে।
-“বহুৎ আচ্ছা। তুমি যদি আমার মধ্যে খুশীর সঞ্চার করতে সক্ষম হও তবে আমি তােমাকেও খুশী করতে কসুর করব না। আমার অনুরােধে সুলতান একজন দক্ষ ছুতাের মিস্ত্রী দিলেন। সে আমার ফরমাশ অনুযায়ী চমৎকার একটি কাঠের জীন বানিয়ে দিল। এবার এক ধুনুরী তার ওপর তুলাে বিছিয়ে বেশ পুরু করে একটি গদী বানাল। কাঠের জীনের গায়ে সােনার জরির নকসাযুক্ত কাপড় গদীর ওপর সেঁটে দিলাম। এবার কামারকে দিয়ে এক জোড়া রেকাবি বানিয়ে নিলাম। লাগাম বানালাম নিজের হাতেই।
পছন্দ মাফিক প্রয়ােজনীয় সবকিছু তৈরি হয়ে গেলে সুলতানের ঘােড়াশাল থেকে বাছাই করে সবচেয়ে মােটাসােটা একটি ঘােড়া বের করে আনলাম। ঘােড়াটির গায়ে এবার যথাস্থানে জীন, রেকাবি ও লাগাম প্রভৃতি পরিয়ে দিলাম।
ঘােড়াটিকে পছন্দ মাফিক সাজিয়ে সুলতানের সামনে হাজির করলাম। ঘােড়ার এরকম সাজ দেখে সুলতান তাে একেবারে থ বনে গেলেন।
ব্যস, আর দেরী নয়। সুলতান তড়াক করে লাফিয়ে ঘােড়াটির পিঠে চেপে বসলেন। এক চক্কর মেরে ফিন আমার কাছে এলেন।
আমার কাজের তারিফ করতে গিয়ে বললেন—বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা বন্দোবস্ত! যেমন দেখনাই তেমনি আরামদায়ক তােমার জীন-লাগাম!’ সুলতান আমাকে ইনাম স্বরূপ বহুৎ সােনার মােহর দিলেন।
বৃদ্ধ উজির তা দেখে লােভ সামলাতে না পেরে তার নিজের ঘােড়ার জন্যও আমাকে দিয়ে জীন-লাগাম বানিয়ে নিলেন। তবে অবশ্যই মাগনা নয়। তিনিও ইনাম দিয়ে আমাকে খুশী করলেন।
কিছুদিনের মধ্যে আমি সুলতানের সবচেয়ে পেয়ারের পাত্র বনে গেলাম। একদিন সুলতান আমাকে তার পাশে বসিয়ে সস্নেহে বললেন- সিন্দবাদ, আমি তােমাকে কেমন পেয়ার করি, আশা করি তােমার জরুর মালুম আছে। তােমাকে ছাড়া আমার জান রাখাই দায়। তাই তােমাকে আমি আরও কাছে টেনে নিতে চাচ্ছি। আমার প্রাসাদের একটি লেড়কিকে তােমার সঙ্গে শাদী দিয়ে কৃয়ীভাবে তােমাকে আমার কাছে রেখে দেব স্থির করেছি।
‘শাদী? জাঁহাপনা আমি পথের ভিখমাঙ্গা ছিলাম। আপনার মেহেরবানি লাভ করে আজ দরবারে ঠাই পেয়েছি। আজ আর আমার নিজস্ব কোন ইচ্ছা নেই জাঁহাপনা। আপনার মর্জি মাফিকই কাজ হবে। 
ব্যস, আর দেরী নয়। সুলতানের প্রাসাদে শাদীর তােড়জোড় শুরু হয়ে গেল। শাহবংশীয়া এক খুবসুরৎ লেড়কীর সঙ্গে আমার শাদী হয়ে গেল। সে সর্ব বিদ্যায় পারদর্শিনীও বটে।
শাদী করে আমার নসীব ফিরে গেল। আমার বিবি যে কেবলমাত্র খুবসুরৎ এবং বিদূষী তা-ই নয়। সে তার মৃত পিতার একমাত্র উত্তরাধিকারী। সুবিশাল প্রাসাদ, জমি জিরাত, বহুমূল্য হীরা-জহরৎ আর অগাধ নগদ অর্থের মালিক সে নিজে। আবার সুলতানের কাছ থেকে উপহারস্বরূপ যা কিছু মিলেছে। তা-ও কমতি নয়। শাদী সত্যি আমার নসীব ফিরিয়ে দিল। জীবনের মূল্য নতুন করে জানতে, বুঝতে শিখলাম। এমন অন্তহীন খুশীর স্বাদ তাে আগে কোনদিন বরাতে জোটে নি। আদর পেয়ার মহব্বত কি জিনিস তা-ই এই প্রথম বুঝলাম। সে সঙ্গে বুঝলাম যৌবনের কদর। যৌবনকে ভােগ করার পাকাপাকি বন্দোবস্ত, কম কথা।
আমি বিবিকে নিয়ে সুলতানের সান্নিধ্যে বেশ কয়েকটি সাল গুজরান করে দিলাম। সুলতানকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তার কাছাকাছি পাশাপাশি থাকব, খুবই সত্য বটে। তবু গােপন ইচ্ছা পােষণ করে চলেছি, একদিন বিবিকে নিয়ে আমার নিজের মুলুক বাগদাদে পাড়ি জমাব।
সবই খােদাতাল্লার মর্জি। তার মর্জিমাফিকই সব কাজ সম্পন্ন হয়। আমরা যতই প্রয়াসী হই, হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি করি না কেন তার মর্জির বাইরে এক কদমও যাবার উপায় নেই। এক সকালে আমার এক দোস্তের বিবি মারা গেল। দোস্তটি কেঁদে বুক ভাসাতে লাগল। বহুভাবে তাকে সান্ত্বনা দেবার কোশিস করলাম। কিন্তু সবই ভস্মে ঘি ঢালার সামিল হ’ল।
আমি দোস্তটির গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে প্রবােধ দিতে গিয়ে বললাম-“ঝুটমুট কেন কেঁদে নিজের জান খতম করছ? বিবি মারা গেছে এতে তাে আর কারাে হাত নেই। ফিন খুবসুরৎ এক লেড়কিকে শাদী করে ঘর-সংসার পাতবে। 
আমাকে থামিয়ে দিয়ে দোস্তটি ডুকরে কেঁদে বলতে লাগল ‘শাদী? খােয়াব দেখছ নাকি? এক ঘণ্টা বাদে যাকে সহমরণে জান দিতে হচ্ছে তাকে তুমি দেবে শাদি। তাজ্জব বাৎ শােনাচ্ছ দোস্ত! তার বাৎ কিছুই আমার দিমাকে এল না। সবিস্ময়ে বললাম—“দোস্ত এসব কী বলছ! কিসের সহমরণ! কেন তােমাকে এক ঘণ্টা বাদে সহমরণে জান দিতে হবে—কী সব যা তা বলছ?”
—সে কী দোস্ত! আমাদের মুলুকের প্রচলিত প্রথা তােমার জানা নেই? এখানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে আগে মরবে অন্য জনকে সহমরণে জান দিতে হয়। এমন কি সুলতানকেও এ-প্রথা মেনে চলতে হয়। মােদ্দা কথা, কেউ-ই এর হাত থেকে রেহাই পায় না।
দোস্তটির বাৎ শুনে আমার কলিজা পর্যন্ত শুকিয়ে যায়। কী সর্বনাশ বাৎ শােনাচ্ছে! এমন ভয়ঙ্কর প্রথার কথা ঘুণাক্ষরেও যদি জানতাম কে শাদী করতে যেত! ইয়া আল্লাহ! আমার বিবি কোনক্রমে মারা গেলে আমাকেও যে তবে ধরে বেঁধে—উফ আর ভাবতে পারছি না। শরীর শিথিল হয়ে আসতে লাগল। আমি বার কয়েক ঢােক গিলে জিজ্ঞাসা করলাম—“দোস্ত, আমি তাে এখানে পরদেশী। তবে কি আমার বেলাতেও এ-প্রথা খাটবে, নাকি - 
সে আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গেই বলল—‘জরুর। আলবৎ খাটবে। পরদেশী হলেও এখন তাে এদেশেরই বাসিন্দা। স্থানীয় এবং পরদেশী সবার ক্ষেত্রেই এ-প্রথা সমানভাবে প্রযােজ্য, কারাে মাফ নেই।
ব্যাপারটি এখন আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। বিবির মৃত্যু শোকের চেয়ে নিজের মৃত্যুভয়-ই তার এরকম বিলাপ পেড়ে কাদার কারণ। আতঙ্কেই সে পৌনে মরা হয়ে গেছে, বিবির জন্য শােক করার অবকাশ কোথায়?'
প্রতিবেশীরা এসে মৃতার বাড়িতে জড়াে হ’ল। মৃতদেহ বাঁধাছাদা হ’ল। মৃতদেহ নিয়ে শােক-মিছিল এগিয়ে চলল । তার পিছন পিছন আমার দোস্তটি বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে চলল। তার পাশে আমি চোখের পানি মুছতে মুছতে পথ পাড়ি দিচ্ছি।
মহল্লা ছাড়িয়ে পাহাড়ের ধারে একটি বিশাল কুয়াে। তার মধ্যে মৃতদেহটিকে নামিয়ে দেয়া হল। তারপর আমার দোস্তটি, যাকে সহমরণে জান দিতে হবে তার পিঠে এক কলসী পানি, সাতটি রুটি বেঁধে দেয়া হল। এবার তার একটি হাত শক্ত দড়ি বেঁধে তরতর করে কুয়ােটির মধ্যে নামানাে হ’ল। তার পা মাটিতে গিয়ে ঠেকলে, দড়ির টান বন্ধ হলে ওপর থেকে চিল্লিয়ে বলা হ’ল-“দড়ির বাঁধন খুলে দাও।' দড়ির বাঁধন আলগা হতেই সেটি টেনে তুলে নিল। রুটি সাতটি খেয়ে হতভাগাটি যে কয়দিন জিন্দা থাকে থাকবে। তারপর না খেয়ে, ডরে শিটকে লেগে এক সময় তার জান খতম হয়ে যাবে।
আমি প্রাসাদে ফিরে সােজা সুলতানের সঙ্গে ভেট করলাম। সরাসরি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম—আচ্ছা, আমার আগে যদি আমার বিবি মারা যায় তবে কি আমাকে সহমরণে জান দিতে হবে?'
—জরুর। জরুর জান দিতে হবে। হঠাৎ তােমার মুখে একথা ব্যাপার কি ?
–না, ব্যাপার কিছুই নয়। সেরকম কিছু ঘটে নি। কিন্তু ঘটাও তাে একেবারে অসম্ভব নয়। মরণবাচনের কথা কে বলতে পারে ? একটি বাৎ_ আমার মুখের বাৎ কেড়ে নিয়ে সুলতান ম্লান হেসে বলে উঠলেন-“কি বলতে চাইছ, খােলসা করে বলেই ফেল।
‘আমি তাে ভিন দেশীয়। আমার মুলুকে বিবি আর বালবাচ্চা সবই তাে রয়েছে। তবে আমাকে আপনার সুলতানিয়তের প্রথা কেন মানতে হবে? আমার ক্ষেত্রে তাে…… 
-তােমার ক্ষেত্রে একই আইন কানুন প্রযােজ্য। তুমি তাে কেবল এ মুলুকের বাসিন্দাই নও এখানকার লেড়কীকে শাদী করেছ আর এখানকার প্রথা মানবে না। জরুর মানতে হবে।' সুলতানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি ঊর্ধ্বশ্বাসে আমার প্রাসাদের দিকে ছুটতে লাগলাম। আমার বুক ভরা আতঙ্ক। যদি গিয়ে দেখি আমার বিবি এরই মধ্যে মারা গেছে তবে তাে আমার শিরেবাজ পড়ার চেয়েও ভয়ঙ্কর অবস্থা হবে। সুলতান, উজির, আমীর, ওমরাহ আর সলতানিয়তের বহু খানদানি পরিবারের আদমি শবযাত্রায় সামিল হবে। এতগুলাে চোখকে ফাঁকি দিয়ে আমার পক্ষে চুপিচুপি সটকে পড়া বাস্তবিকই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। হাতে দড়ি বেঁধে কুয়াের মধ্যে—উ, তার আগেই শিটকে লেগে যাবে। আর ভাবতে পারছি না। দম বন্ধ হয়ে আসছে।
প্রাসাদে ফিরে রােয়াকে বিবিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কলিজায় পানি এল। দিব্যি নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছে।
কিন্তু নসীবের ফের এড়ানাে যাবে কি করে। খােদাতাল্লা যাকে মারে, রুখবে কে? দু' দিন বাদেই আমার বিবির বিমারি হ’ল। কঠিন বিমারি, বিছানা নিল। বিমারি তাে হতেই পারে। দেহ থাকলে বিমারি একেবারেই হবে না, তা-ও কি হয় ? নিজেকে বহুভাবে প্রবােধ দিতে লাগলাম। কে, কাকে প্রবােধ দেয় ? কলিজা যে এদিকে শুকিয়ে একেবারে খটখটে। বার বার একই আতঙ্ক নীরবে তার মধ্যে ক্রিয়া করে চলেছে।
যা ভেবেছিলাম বিলকুল তা-ই ঘটতে চলেছে। দীর্ঘদিন বিমারিতে ভােগার পর আমার পেয়ারি আমার মেহবুবা আর বিছানা ছেড়ে উঠল না। আমাকে চরমতম বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে সত্যি দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল। আমি তাে পৌনে মরা হয়ে গেলাম। বিবির জন্য শােক করব নাকি নিজের জন্য গলা ছেড়ে কাঁদব, সহসা ভেবে উঠতে পারলাম না।
দুঃসংবাদ বাতাসের আগে ছােটে। সুলতান দুঃসংবাদটি পেয়ে লম্বা লম্বা পায়ে আমাদের প্রাসাদে এলেন। আমাকে প্রবােধ দিতে গিয়ে বললেন—‘বেটা, খােদাতাল্লার মর্জি আমরা যে এড়াতে পারি না। নসীবে যা লেখা আছে ঠিক সময় মাফিক ঘটে যাবে। আমাদের শাস্ত্রের বিধান। বিবির সঙ্গে বেহস্তে যাবার জন্য নিজেকে তৈরি কর।'
সুলতানের বাৎগুলাে আমার কাছে বিষবৎ মনে হতে লাগল। আপন মনে বলতে লাগলাম—কী ভয়ঙ্কর বিধান! নইলে নিজের মুলুকে বিবি ও বালবাচ্চা থাকতে পরদেশে এসে নিঃশব্দে জান দিতে হচ্ছে। এমন ভয়ঙ্কর প্রথা এদেশে চালু জানলে কে শাদী করতে যেত? নিজের মুলুকে বিবি বালবাচ্চার কাছে ফিরে যেতাম। সুলতানের সোহাগের প্রলেপ দেয়া বাৎগুলি এখন এক এক করে মনে হতে লাগল—তােমাকে আমি কেন পেয়ার করি তা অবশ্যই তােমার মালুম আছে। শাদী করে সুখে ঘর-সংসার কর। এরকম আরও কত কি-ই না তখন বলে আমার দিলটিকে উতালা করে দিয়েছিলেন। আর এখন সেই সুলতানই ফিন আমাকে মরার জন্য নানাভাবে উৎসাহ দিয়ে চলেছেন! জ্যান্ত গাের দেয়ার ফিকির করে নিলেন।
কয়েক জন আমার বিবির শব দেহটি বাঁধাছাদা মেরে কাধে তুলে নিল। আমি আতঙ্কে শিটকে লেগে যাবার জোগাড় হলাম।

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments