সহস্র এক আরব্য রজনী পার্ট ৮৪ ( Part 84 )

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
 সবাই মিলে গাছে উঠে পছন্দ মাফিক ডাল বেছে নিলাম। দিলে এটুকুই স্বস্তি যে, এ রাত্রিটি অন্ততঃ নির্বিঘ্নে কাটবে। কিন্তু এখানেও যে নসীব আমাদের বিরােধিতা করে চলেছে, আমাদের চারদিকে সাপের ফোস ফোসানি কানে যেতে তা মালুম হ’ল।

বুঝলাম, দিনের বেলায় সাপগুলাে এখানে-ওখানে ঢুঁড়ে খানার খোজ করে। রাত্রি গুজরান করে গাছের ডালে।ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিজের হাতটিও ভালভাবে দেখা যায় না। কোথায় কোথায় সাপ ঝুলছে দেখার তাে প্রশ্নই ওঠে না। আমার সহযাত্রীরাই বা কোথায়, কিভাবে আছে তা-ই বা কে জানে? এক সময় আমার ঠিক পাশের ডাল থেকে একটিমাত্র তীব্র আর্তনাদ ভেসে এল। সে-ও মুহূর্তের জন্য। ব্যস, তারপরই সব নির্বাকনিস্তব্ধ। চারদিক থেকে কেবল সাপের ফোস ফোসানি শােনা যেতে লাগল। আমার কোন এক সহযাত্রী সাপের পেটে যাবার আগে আর্তনাদের মাধ্যমে আমাদের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে গেল, বুঝতে পারলাম।
আমি জানের মায়া ত্যাগ করে কেবল মনে মনে আল্লাহর নাম জপ করে, বাকী রাত্রিটুকু গুজরান করলাম। কথা বলার মত সাহস বা শক্তি কোনটিই আমার ছিল না।
এবার আমি একা। একেবারেই একা।
ভাের হ’ল। গাছের ডালটি দু হাতে শক্ত করে চেপে ধরে চারদিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে ভয়ে ভয়ে তাকালাম। না, সাপটি উদরপূর্তি করে ভাের হতেই চম্পট দিয়েছে।
আমি বুঝলাম, নিঃসন্দেহ হলাম, দিনের আলােয়, মৃত্যুভয় নেই। তবে সাপটি একবার যখন মানুষের মাংসের স্বাদ পেয়েছে। তখন নির্ঘাৎ ফিন রাত্রির অন্ধকার নামতে নামতে তল্লাসী শুরু করবে। প্রয়ােজনে সারারাত্রি ধরে পুরাে দ্বীপটি চষে বেড়াবে। আর এবার তাে আমারই পালা।
মৃত্যু অবধারিত জেনেও আমি বাঁচার ফিকির খুঁজতে লাগলাম। হাত-পা গুটিয়ে মােউতের হাতে নিজেকে সঁপে না দিয়ে বাঁচার কোশিস তাে করতেই হবে।
আমি সমুদ্রের ধারে বসে আশমান-জমিন ভেবে চলেছি। হঠাৎ সামনে কিছু শুকনাে কাঠ পড়ে থাকতে দেখে বেড়ে একটি মতলব মাথায় এসে গেল। কিন্তু মতলব তো বেরলাে, তার বাস্তব প্রয়ােগ কতখানি সার্থক হবে খােদাতাল্লাই জানেন। ভাবলাম, একবার মহড়া দিয়ে নেয়া যাক। বন থেকে মােটা সােটা লতা নিয়ে এলাম। এবার আমার পা দুটোর প্রত্যেকটিতে দুটো করে বড় বড় কাঠ শক্ত করে বেঁধে ফেলাম। তারপর শরীরের চারদিকে বাঁধলাম মােট চারটি কাঠ। তাতে মাথাটিও প্রায় ঢাকা পড়ে গেল। আমি যেন কাঠের খাঁচায় বন্দী হয়ে গেলাম। প্রায় অস্ফুট স্বরে বলে উঠলাম—‘আল্লাহ, সময় মত বেড়ে মতলব, জান রক্ষার চমৎকার ফিকির আমার মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছ!’আল্লাতাল্লা যে সত্যি আছেন।
আমি নতুন করে উপলব্ধি করলাম। মহড়া সেরে আমার শরীর থেকে কাঠের টুকরােগুলাে খুলে এক জায়গায় যত্ন করে রেখে দিলাম। লতাগুলি তার পাশেই রাখলাম। সময়মত যেন আর তল্লাসী চালাতে না হয়। এবার বেরােলাম খানা জোগাড় করতে। পেটের নাড়িভূঁড়ি খিদেতে জ্বলছে। কিছু দিয়ে বুঝ না দিলে এ-জ্বালা কমার নয়।
সমুদ্র থেকে কিছু দূরে গিয়ে একটু তল্লাসী চালাতেই কিছু আধপাকা ফল পেয়ে গেলাম। শুকনাে কাঠ ছুঁড়ে ছুঁড়ে কয়েকটি পাড়া গেল। সেগুলাে গােগ্রাসে গিলে অবুঝ পেটকে বুঝ দিলাম। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার একটু একটু করে নেমে আসতে শুরু করেছে।
কাঠগুলাের কাছে ফিরে এলাম। পূর্ব প্রক্রিয়া অনুযায়ী নিজেকে কাঠের খাঁচার মধ্যে বন্দী করে নিলাম। রাত্রি একটু গভীর হতেই কলিজা-কাঁপানাে ফোস ফোসানি শুরু হয়ে গেল। বুঝলাম, আমার মমাউত আমার তল্লাশী চালাচ্ছে। গত রাত্রে আজকের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য আমাকে রেখে গিয়েছিল। অতএব কোথাও না কোথাও আমাকে পাবেই। প্রয়ােজনে তামাম দ্বীপটিই চষে বেড়াবে। না, বেশী ঢুঁড়তে হ’ল না। অনায়াসে আমাকে পেয়ে গেল। ফোস ফোস শব্দটি ক্রমে এগিয়ে আসাতে আমি নিঃসন্দেহ হলাম। আর এ-ও বুঝলাম, এটি ময়াল সাপ।
এক সময় অতিকায় সাপটির উষ্ণ নিশ্বাস আমার গায়ে এসে লাগায় তার উপস্থিতি পুরােপুরি মালুম হ’ল। তার হিমশীতল দেহের স্পর্শও মালুম হ’ল কয়েকবার। এক সময় সে ক্রোধােন্মত্ত হয়ে উঠল। কাঠের গায়ে বার বার কামড় মারছে তাও আমার পরিষ্কার মালুম হ’ল। কিন্তু ইয়া বড় বড় কাঠ সমেত আমাকে গিলে ফেলা তার পক্ষে সম্ভব হ’ল না। মরিয়া হয়ে বহুৎ কোশিসই করল। কিন্তু তাকে হতাশ হয়ে ফিরে যেতেই হ’ল। ভাের হ’ল। আমার মােউত বিদায় নিয়েছে। বাঁধন খুলে কাঠের খাঁচা থেকে এবার নিজেকে মুক্ত করলাম।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
          তিন শ’ একতম রজনী
বাদশাহ শারিয়ার যথা সময়ে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, সিন্দবাদ নাবিক এবার বলতে শুরু করলেন  - কাঠের খাঁচার মধ্যে সারা রাত্রি আবদ্ধ থেকে এবং উৎকণ্ঠার মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে আমার শরীরের স্নায়ুগুলাে যেন কেমন অবশ হয়ে গিয়েছিল। মাথাও রীতিমত ঝিমঝিম করছিল। উপায়ান্তর না দেখে আমি ঘাসের ওপর শরীর এলিয়ে দিলাম। কখন যে চোখের পাতা জুড়ে এসেছিল মালুমই হয় নি।

যখন আমার নিদ টুটল তখন সূর্য মাথার ওপরে অনেকটা উঠে এসেছে। আড়মােড়া ভেঙে উঠে বসলাম। হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রের ধরে গেলাম। উত্তল উদ্দাম সমুদ্রের বুকে চোখের মণি দুটো চক্কর মারতে পাগল। এক সময় সচকিত হয়ে সােজাভাবে খাড়া হয়ে পড়লাম। সমুদ্রের একটি বিশেষ জায়গায় আমার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। হ্যা, মাস্তুলই তাে বটে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি জাহাজ আমার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল। খুশীতে বার কয়েক উন্মাদের মত লাফালাফি করলাম। হাত দুটি সামনে নেড়ে চিৎকার করে ডাকাডাকি করতে লাগলাম। মালুম হ’ল, কেউ আমাকে দেখতে পায় নি, ডাকও শুনতে পায় নি। এবার যন্ত্রচালিতের মত মাথার পাগড়ীটি খুলে ফেলাম। উন্মাদের মত লাফিয়ে লাফিয়ে সেটি সমানে নাড়তে লাগলাম। হ্যা, মালুম হ'ল এবার জাহাজের আদমিদের নজর কাড়তে পেরেছি।
বটে। জাহাজের মুখ ঘুরল। ক্রমে সেটি আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। ক্যাপ্টেন জাহাজ ভিড়িয়ে আমাকে তুলে নিল। খােদাতাল্লাকে সুকরিয়া জানাতেই হল।
ক্যাপ্টেন আমাকে গােসল করে আসতে বলল । নয়া কোর্তা আর পাৎলুন পরতে দিল। খানাপিনা করিয়ে সুস্থ করে তুলল। বিকেলে ক্যাপ্টেন আমাকে পাশে বসিয়ে আমার দুঃসাহসিক অভিযানের বৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে আদ্যোপান্ত শুনল। সব শেষে পিঠ চাপড়ে আমার সাহসিকতার জন্য বহুভাবে তারিফ করল।
ক’ দিন মৌজ করে খানাপিনা করে আর কিসসা-কাহানী বলে খুশীতে দিন গুজরান করলাম। এক সকালে আমার অপরিচিত সালাহিতা দ্বীপে জাহাজ ভিড়ল। জাহাজের সওদাগররা নিজ নিজ গাটি বােচকা নিয়ে কেনাবেচা সারতে চলে গেল।
আমি মুখ গােমড়া করে জাহাজের ডেকে বসে রয়েছি। জাহাজের ক্যাপ্টেনের কামরায় আমার তলৰ পড়ল। ছুটে গেলাম। সে আমাকে বলল-“নসীবের ফেরে তুমি সর্বস্ব খুইয়ে আজ ভিখ মাঙ্গার সামিল হয়ে গেছ। জাহাজের গুদামে বাগদাদের এক সওদাগরের কিছু সামানপত্র রয়েছে। পথে তাকে আমাদের খােয়াতে হয়েছে। চল, তার সামানপত্রের গাট্টি গুলো তােমাকে দিচ্ছি। সেগুলাে বেচে যা মুনাফা হবে সবই তােমার। সম্ভব হলে এখান থেকে কিছু মালপত্র খরিদ করে নাও। ভিন্ মুলুকে বেচতে পারবে। ক্যাপ্টেন আমাকে নিয়ে গুদামে গেল। গাট্টি গুলাে দেখাল। আমার তাে চক্ষু স্থির। সােল্লাসে বলে উঠলাম-“শােভন আল্লাহ! আল্লা মেহরবান! আমি গাট্রিগুলাে দেখেই চিনতে পারলাম। এমন কি নিজে হাতে যেভাবে প্রতিটি গিট দিয়েছিলাম, হুবহু তেমনটিই রয়ে গেছে। আর প্রতিটি পেটরার গায়ে স্পষ্ট করে ‘সিন্দবাদ নাবিক’ নাম লেখাও রয়েছে। আমি খুশীতে ডগমগ হয়ে সােল্লাসে বললাম—আরে এসব তাে আমারই। আগেরবার সমুদ্রযাত্রায় বেরিয়ে এগুলাে খুইয়েছিলাম। এক দ্বীপে জাহাজ থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গিয়েছিলাম। আমাকে ফেলে জাহাজ চলে এসেছিল। আমি দ্বীপে নির্বাসিত হই। ক্যাপ্টেন আমার বাৎ শুনে দু পা এগিয়ে আমার একেবারে মুখােমুখি দাঁড়াল। আচমকা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল—“হ্যা, ঠিকই তাে। তুমিই তাে সে সওদাগর। দেখ দেখি কী অদ্ভুত কাণ্ড! খােদাতাল্লার মর্জি—যাও, তাড়াতাড়ি কেনাবেচা সেরে এসাে। আমি গাট্টি বােচকা নিয়ে জাহাজ ছেড়ে নামলাম। সামান্য কোশিসেই আমার বিলকুল সমানপত্র খুবই চড়া দামে বেচতে পারলাম। আশাতীত মুনাফাও হ’ল।।
মােহরের পােটলা নিয়ে নিজের মুলুকে ফিরে এলাম। আপনজনের সঙ্গে ফিন মিলিত হলাম। আমার আগমনবার্তা পেয়ে ইয়ার-দোস্তরা ছুটে এল। আমার এ কামরা ফিন খানাপিনা আর নাচা-গানায় জমজমাট হয়ে উঠল।
কিসসা শেষ করে বৃদ্ধ সিন্দবাদ নাবিক এক শ’টি সােনার মােহর শেরওয়ানির জেব থেকে বের করে সিন্দবাদ কুলীর হাতে দিতে দিতে বলল-“কাল সকালে ফিন এসাে। কাল আমার চতুর্থ সমুদ্রযাত্রার কিস্সা শােনাব।
সিন্দবাদ কুলি মােহরগুলাে কোর্তার জেবে চালান দিয়ে দিল। এবার সিন্দবাদ নাবিককে সালাম জানাল। আগামী সকালে ফিন আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কামরা ছেড়ে পথে নামল। 

সিন্দবাদ নাবিকের চতুর্থ সমুদ্রযাত্রার কিসসা 

সকাল হ'ল। সিন্দবাদ কুলী রুজু সেরে নিষ্ঠার সঙ্গে নামাজ পাঠ করল। তারপর গায়ে পাৎলুন-কোর্তা চাপিয়ে পথে নামল। সিন্দবাদ নাবিকের মাকানের সে-পরিচিত বিশালায়তন কামরাটির দরওয়াজায় পৌছে দেখে মেহমানরা ইতিমধ্যেই পৌছে গেছে। বৃদ্ধ সিন্দবাদ নাবিক তাকে পাশে বসিয়ে তার চতুর্থ সমুদ্রযাত্রার কিসসা শুরু করল—“আমি নিজের মুলুকে ফিরে এসে ফিন ইয়ার দোস্তদের সঙ্গে খুশীর জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিলাম। কিন্তু চার দেয়ালে ঘেরা কামরায় আমার দিল হাঁপিয়ে উঠল। দেশভ্রমণের পােকাগুলাে আমার মগজে কিলবিলিয়ে উঠল। আর বিলাস-ব্যসন ফিন আমার কাছে বিষবৎ মনে হতে লাগল।
ব্যস, আমি সওদা করার কাজে মেতে গেলাম। ভিন দেশের আদমিদের কাছে কদর পেতে পারে এ রকম দামী দামী বিলাস সামগ্রী খরিদ করে কামরা বােঝাই করে ফেল্লাম। বাঁধা ছাঁদা সেরে শুভ মুহূর্তে বসরাহ বন্দরে হাজির হলাম। সেখান থেকে বড় বড় জাহাজ ছাড়ে। তামাম আরব দুনিয়ায় ঢুঁড়ে বেড়ায়।
বসরাহ বন্দরে আরও কয়েকজন সওদাগরের সঙ্গে মােলাকাৎ হ’ল। একই জাহাজে আমরা চাপলাম।
দিনের পর দিন জাহাজ নির্বিবাদেই সমুদ্রের বুকে ভেসে চলেছে। খুশীতেই আমরা দিন গুজরান করছি।
এমন সময় একদিন ক্যাপ্টেনের ব্যস্ততা লক্ষ্য করলাম। তিনি তামাম জাহাজ ঢুঁড়ে যাত্রীদের সতর্ক করে দিতে লাগলেন—কিছুক্ষণের মধ্যে তুফান উঠবে। আর এক কদমও যাওয়া যাবে না। মাঝ-সমুদ্রে নােঙর করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।'
আমি ধরেই নিলাম, আমার- হ্যাঁ, আমার নসীবই জাহাজের বিপদ ডেকে আনছে। নইলে কোনবার নির্বিবাদে সফর চুকাতে পারলাম না। গত তিনবারের সমুদ্রযাত্রার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা আমার মধ্যে একে একে উদয় হতে লাগল। এবার নসীব আমাকে ঠেলে দিচ্ছে তুফানের মুখে।
তুফানের কথা কানে যেতেই আমার কলিজাটি যেন ফুটা বেলুনের মত মুহুর্তে চিপসে গেল। মুখ দিয়ে অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এল--হায় খােদা! এ আবার কোন্ ফেরে ফেলতে চলেছ। তুফান! সামুদ্রিক তুফান! যদি তুফানের মােকাবেলা করতে গিয়ে জাহাজ চুরমার হয়ে যায়-উফ! আর ভাবতে পারছি না। মাথা ঝিমঝিম করছে। সর্বাঙ্গ শিথিল হয়ে আসতে চাইছে।
ক্যাপ্টেনের সতর্কবাণী শেষ হতে না হতেই বিকট আর্তনাদ করতে করতে কোন্ অদৃশ্য দৈত্য যেন তীব্র আক্রোশে আমার জাহাজটির ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল। শুরু হ’ল প্রচণ্ড জলােচ্ছাস। ব্যস, বিলকুল খতম। ইয়া পেল্লাই জাহাজটি ভেঙে চূরে সমুদ্রের বুকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। চোখের পলকে সমুদ্রের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেল।
জাহাজের ক্যাপ্টেন, তার কর্মচারীরা আর এতগুলাে যাত্রী কোথায় যে তলিয়ে গেল মালুমই হ’ল না।
ইতিপূর্বে দেখেছি খােদাতাল্লা আমাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিলেও জান রক্ষার ফিকির একটি না একটি করেই দেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হ’ল না। জাহাজভাঙা একটি বড়সড় কাঠের পাটাতন হাতের নাগালের মধ্যেই পেয়ে গেলাম। কোনরকমে তার ওপর উঠে বসলাম। কাঠের পাটাতনটি আমাকে নিয়ে ভাসতে ভাসতে এক সমুদ্রের পাড়ে এসে ঠেকল।
পাটাতনটি থেকে নেমে আমি বালির ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম। দীর্ঘ সময় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় স্নায়ুর ওপর অস্বাভাবিক চাপ গেল। তাছাড়া শরীরের ওপর দিয়েও কম ধকল যায় নি। সারারাত্রি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় মৃতের মত পড়ে রইলাম। কিভাবে যে আমি সারাটি রাত্রি গুজরান করেছি বলতে পারব না। সকালে সূর্যের কিরণ চোখে পড়তে নিদ টুটে গেল। চোখ মেলে দেখি আমার অদূরে আমার আরও কয়েকজন সহযাত্রী বালির ওপর এলিয়ে পড়ে রয়েছে। বুঝলাম, তাদের ওপরও আল্লাহর দোয়া বর্ষিত হয়েছে।

আমি বালির বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম। সহযাত্রীদের ডেকেডুকে তুললাম। এবার দলবেঁধে মহল্লার দিকে হাঁটা জুড়লাম। কয়েক কদম এগিয়েই সাদা রঙের একটি মকান দেখলাম। বাড়িটির দিকে আরও সামান্য এগােতেই একদল গাট্টাগােট্টা ও কুচকুচে কালাে আদমি আমাদের ঘেরাও করে ফেলল। একেবারে উলঙ্গ। শরম ঢাকতে সামান্য পাতাটাতাও ব্যবহার করে নি। আমরা তাদের হাতে বন্দী হয়ে বিস্ময়মাখানাে নীরব চাহনি মেলে তাকিয়ে রইলাম। কালাে আদমিগুলাে আমাদের ইশারা করল মকানটির ভেতরে যাওয়ার জন্য। মুখে টু-শব্দটিও করল না।
বিশালায়তন এক কামরায় আমরা হাজির হলাম। কামরার কেন্দ্রস্থলে কাঠের মসনদে একজন চোখে-মুখে গাম্ভীর্যের ছাপ একে দরওয়াজার দিকে মুখ করে বসে। বুঝতে অসুবিধা হল না এ-আদমিটি অসভ্য জঙ্গলি আদমিগুলাের সম্রাট। আমরা কামরার ভেতরে ঢুকতেই সম্রাট ইশারায় আমাদের বসতে নির্দেশ করলেন। একটু বাদেই বড় বড় থালাভর্তি বিশেষ কিসিমের খানা এল। বড় বড় গােস্তের তৈরি খানা। তাদের হালৎ দেখেই আমার ভক্তি চটকে গেল। ঠেলে বমি আসতে চাইল। আমার সহযাত্রীদের পেটেও চুল্লির আগুন জ্বলছে। অখাদ্য খাদ্যের সাহায্যেই হালুম হালুম করে তারা উদর পূর্তিতে মেতে গেল। দীর্ঘ সময় অনাহারে তাে আমিও কাটিয়েছি। তবু এক টুকরাে গােস্তও জিভে ঠেকাতে পারলাম না। এক-আধ বার কোশিস যে করি নি তা-ও নয়। ভেতর থেকে নাড়িভুড়ি ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল।
আমার সহযাত্রীরা ভুড়ি বােঝাই করে যখন ঘন ঘন তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে তখন উপবাসী আমি টুল টুল করে তাকিয়ে তাদের তৃপ্তির পরিমাপ করতে লাগলাম।
আদতে খানাপিনার ব্যাপারে আমার বাছ বিচার বচপন থেকেই চলে আসছে। কিন্তু পরে বুঝলাম, আল্লাতাল্লা আমার জান রক্ষা করতেই আমার মধ্যে এরকম স্বভাব পয়দা করে দিয়েছিলেন।

আমরা যে-অসভ্য জঙ্গলী আদমিগুলাের হাতে কয়েদ বরণ করতে বাধ্য হয়েছিলাম তারা আদতে নরখাদক। আর যে-গােস্ত পাকিয়ে আমাদের খানাপিনা করতে দিয়েছিল তা-ও আমাদের মতই কোন না কোন নসীব বিড়ম্বিত আদমিরই গােস্ত। শােভন আল্লাহ! আবার কোন দোজখের দক্ষিণ দুয়ারে হাজির হলাম। আরও কয়েক দিন বাদে ব্যাপারটি আরও খােলসা হয়ে গেল। তারা আদমীদের বন্দী করার সঙ্গে সঙ্গে কোতল করে না। কিছুদিন নিজেদের জিম্মায় রেখে খাইয়ে দাইয়ে গায়ে গতরে গােস্ত বাড়িয়ে নেয়। বেশ নাদুস নুদুস করে নিয়ে তবেই কষাইখানায় নিয়ে যায়।

Post a Comment

0 Comments