আরব্য রজনীর গল্প পার্ট ৮৩ ( Part 83)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি আমাদের চোখের আড়ালে চলে গেল।  আমরা নীরবে হতাশ দৃষ্টিতে পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার দু চোখ বেয়ে পানির ধারা নেমে এল। কয়েকজন তাে গলা ছেড়ে মরাকান্না জুড়ে দিল। জানি বিপদের মুহূর্তে ভেঙে না পড়ে বুদ্ধিমত্তা, সাহসিকতা ও ধৈর্যের সঙ্গে বিপদের মােকাবােলার কোশিস করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু অবুঝ দিলকে বুঝাই কি দিয়ে?

আমাদের সওদাপত্র তাে গেছেই এমন কি জাহাজটিকেও খােয়াতে হয়েছে। এখন জান বাঁচাবার ফিকির করতেই হয়। একার কাজ নয়। পাড়ে সবাই গােল হয়ে বসলাম। সবাই মিলিত হলাম। পরস্পরের ফন্দি ফিকির এক সাথে জুড়ে একটি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
সভায় আলাপ-আলােচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া হ’ল সবার আগে পেটের জ্বালা নেভাতে হবে। পেটে আগুন নিয়ে ভাবতে বসলে উপযুক্ত পথ বের করা সম্ভব নয়। আর ইতিমধ্যে আতঙ্ক অনেকাংশে লাঘব হয়ে স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে। দলবেঁধে দ্বীপের ফলফুলের খোঁজে ভেতরের দিকে অগ্রসর হতেই একটি সুবিশাল অট্টালিকা আমাদের নজরে পড়ল।
গাছ থেকে পাকা ফল কিছু পেড়ে আগে খানাপিনা সারলাম। এবার দলবেঁধে চল্লাম অট্টালিকাটি লক্ষ্য করে। বাস্তবিকই বিশালায়তন এক প্রাসাদ। উঁচু প্রাচীর গেঁথে চারদিক ঘেরাও করা হয়েছে। প্রধান ফটকটিও দেখার মত। প্রধান ফটকটি খােলাই রয়েছে দেখলাম। প্রাসাদের ভেতরে সুবিশাল এক কামরায় সারিবদ্ধভাবে রসুইখানার সরঞ্জামাদি রাখা আছে। কামরাময় হাড়ি ছড়ানাে। তাদের কতকগুলিতে ঝােল-' মশলা মাখানাে।
ব্যাপার দেখে আমাদের সবার মাথা চক্কর মারতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা এক এক করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লাম। সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললাম। সন্ধ্যার পূর্ব মুহূর্তে আচমকা ভয়ঙ্কর বাজ পড়ার শব্দে আমাদের মূচ্ছা ভাব কেটে গেল। চোখ মেলে তাকাতেই দেখতে পেলাম কুচকুচে কালাে দশাসই চেহারার দৈত্যাকৃতি এক আদমি সিঁড়ি বেয়ে বীরদর্পে নিচে নামছে। তার উচ্চতা ? প্রায় একটি তালগাছের মত। কদাকার আর কাকে বলে। মুখপােড়া হনুমানও বুঝি এর চেয়ে বেশী সুরতের অধিকারী। চোখ নয় তাে যেন জ্বলন্ত দুটো চুল্লি। দাঁতগুলাে গাঁইতির মত। আর মুখটি একটি কুঁয়াে বা ইদারার সঙ্গেই তুলনা করা চলে। নিচের ঠোটটি বুক পর্যন্ত ঝুলে পড়ায় তাকে আরও বেশী কদাকার দেখাচ্ছে। ইয়া লম্বা হাতের নখগুলাের দিকে চোখ পড়তেই আমার কলিজা পর্যন্ত শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেল।
ভয়াল দর্শন আদমিটিকে একটিবার দেখেই আমার চোখ দুটো অতর্কিতে বন্ধ হয়ে গেল। বাব্বা! এরকম দৃশ্য চোখে দেখা যায়। সে বীরদর্পে মেঝে কাঁপিয়ে এগিয়ে এসে পিছন থেকে আমার ঘাড়টি সাঁড়াশীর মত চেপে ধরল। ভাবলাম একে বলে নসীবের ফের। নইলে এত আদমি থাকতে বেছে বেছে আমাকেই পেয়ার মহব্বত জানাতে এল। ইয়া আল্লাহ! হতচ্ছাড়াটি এবার ছােট্ট একটি পুতুলের মত আমাকে মাথার ওপর তুলে ভন ভন করে চক্কর মারতে লাগল। পর মুহুর্তেই তার মেজাজ মর্জি বদলে গেল। আমার রােগা পটকা চেহারাটি হয়ত তার পছন্দ মাফিক হ’ল না। দুম করে মেঝেতে ফেলে দিল। এবার অন্য একজনকে মাথার ওপর তুলে ভন্ ভন্ করে দু’ চক্কর মারল। তাকেও মেঝেতে ফেলে দিল। এভাবে সবাইকে নিয়ে সে একই কাণ্ড করল।
আমার বুঝতে অসুবিধা হ’ল না। হতচ্ছাড়াটি এভাবে আমাদের ওজন সম্বন্ধে ধারণা করে নিল। কার গতর থেকে কি পরিমাণ গােস্ত মিলতে পারে, ধান্দা।
আমাদের জাহাজের ক্যাপ্টেনের গায়ে গতরে গােস্ত সবচেয়ে বেশী। যেমন মােটাসােটা নাদুস নুদুস চেহারা তেমনি লম্বাও বটে। তাকে দেখে দৈত্যাকৃতি আদমিটি খুশীতে একেবারে ডগমগ হয়ে উঠল। মুখের হাসি যেন আর মিলাতেই চায় না।
আমি দুরুদুরু বুকে আড়চোখে দৈত্যাকৃতি আদমিটির কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগলাম। এক সময় নিজের অজ্ঞাতসারে মুখ দিয়ে আচমকা বেরিয়ে এল—“ইয়া আল্লাহ! এ কী পৈশাচিক কাণ্ড!' দেখলাম, ভয়ালদর্শন হতচ্ছাড়াটি ক্যাপ্টেনকে কাঠের পুতুলের মত দু’হাত দিয়ে আলতাে করে তুলে নিল। চোখে-মুখে ভয়ঙ্কর হিংস্রতার ছাপ ফুটিয়ে তুলে এক হাতে তার কোমর আর অন্য হাতে তার ঘাড়টি ধরে আচমকা এক মােচড় দিল। ব্যস, মুণ্ডটি চোখের পলকে ধড় থেকে আলাদা হয়ে গেল।
ক্যাপ্টেনের মুণ্ডহীন ধড়টিকে পেল্লাই এক কড়াইয়ের মধ্যে রেখে চল্লীতে চাপিয়ে দিল। এবার চুল্লীতে আগুন জ্বালল। ধড়টি আধ-সিদ্ধ করে কড়াই থেকে তুলে নিল। এবার লকলকে জিহা। আর গাঁইতির মত দাঁত বের করে গব গব করে খেতে শুরু করল। ছােট ছােট হাড্ডিগুলাে সমেত গােস্তগুলাে উদরে চালান দিয়ে দিল। আর বড় বড় হাড্ডিগুলাে ঘরময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেল্ল। তার চোখে মুখে তৃপ্তির ছাপ ফুটে উঠল। বার কয়েক ঢেকুর তুলে তৃপ্তিটুকু পুরাে পুরি অনুভব করল। দৈত্যাকৃতি আদমিটি এবার পাশের শান বাঁধানাে একটি বেদীর ওপর চিৎ হয়ে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। আহারের পর বিশ্রামের প্রয়াস। কিছুক্ষণের মধ্যেই গণ্ডারের মত ঘােৎ ঘােৎ করে নাক ডাকিয়ে নিদ যেতে লাগল।
আমাদের বিশেষ করে আমার হালৎ তখন সসমিরা। জিন্দা আছি কিনা সে বিষয়েও যেন নিশ্চিত হতে পারছি না।
পরদিন সকালে কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙল বিকট আওয়াজ করে। পেল্লাই হাত দুটো ছুঁড়ে ছুঁড়ে আড়মােড়া ভাঙল। দুম করে খাড়া হয়ে গেল। ফিন মেঝে কাপিয়ে বীর দর্পে পা ফেলে ফেলে সিড়িটি বেয়ে সে ওপরে নিঃশব্দে ও নির্বিকারভাবে উঠে গেল।
হতচ্ছাড়াটি বিদায় নিয়েছে বুঝতে পেরেই আমি উন্মাদের মত গলা ছেড়ে কেঁদে উঠলাম। ডুকরে ডুকরে কেঁদে বল্লাম-খােদা, এর চেয়ে সমুদ্রের পানিতে ডুবে মরাও ঢের ভাল ছিল। নইলে বানরগুলাে যদি বুক ফেঁড়ে কলিজা ছিড়ে খুন চুষে চুষে খেত তবু সহ্য করা যেত। কিন্তু কড়াইয়ের ফুটন্ত তেলে ভাজা—আঃ আর ভাবতে পারছি না আমার সর্বাঙ্গ শিথিল হয়ে আসতে লাগল।
কেঁদে বুক ভাসালে ফয়দা কিছুই হবার নয়। নসীবের ফের কেউ খণ্ডাতে পারবে না। একমাত্র খােদাতাল্লা ভিন্ন কারাে সাধ্য নেই জান রক্ষা করে। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। এক সময় আমি উঠে দাঁড়ালাম। অভিশপ্ত প্রাসাদটি ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। আমার সহযাত্রীরা আমাকে অনুসরণ করল। যদিও জানি এ যাত্রায় আর জান নিয়ে মুলুকে ফিরে যেতে পারব না। তবু কিতাবে পড়েছি, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ।
প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে তল্লাশী চালিয়ে এমন একটি গুহা বা অন্য কোন জায়গা খুঁজে পেলাম না যেখানে মাথাগুজে দৈত্যাকৃতি শয়তানটির নজর থেকে নিজেদের লুকিয়ে রাখতে পারি। তামাম দ্বীপ হন্যে হয়ে ছুঁড়ে অন্য কোন প্রাসাদ বা ছােটমােট মকানের হদিসও পেলাম না, যেখানে মাথাগোঁজা সম্ভব। কেবল গাছ আর গাছ। দ্বীপ জুড়ে শুধুই গাছের মেলা। এমন কি কোন পর্বত বা টিলা পর্যন্ত নেই। 
দ্বীপটির এখানে ওখানে ছুঁড়ে আশ্রয় খুঁজতে গিয়ে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এল। বুঝলাম, যমপুরীর দক্ষিণ দুয়ার সেই প্রাসাদটিতে গিয়েই রাত্রে আশ্রয় নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। করলামও তা-ই।
দৈত্যাকৃতি আদমিটির মর্জি একবারে একজনকে ছাড়া দ্বিতীয় কারাে গায়ে হাত দেয় না। নসীব সম্বল করে শুয়ে বসে আমরা রাত্রি গুজরান করতে লাগলাম। আতঙ্কের রাত্রি যেন আর ফুরােতে চায় না। আমরা তাে জানিই যার নসীবে মৃত্যু লেখা আছে দৈত্যের হাতে আজ রাত্রে তার প্রাণ যাবেই।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দৈত্যাকৃতি আদমিটি কলিজা কাপানাে তর্জন গর্জন করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে আগের রাত্রির মত বীরদর্পে নেমে এল। সে ফিন আগের মতই আমাদের এক এক করে মাথার ওপরে তুলে ওজন পরীক্ষা করল। তারপর একজনের ধড় থেকে মুণ্ডটি বিচ্ছিন্ন করে কড়াইয়ে চাপিয়ে আধ-সিদ্ধ করল। পরম তৃপ্তিতে ভােজ সারল। ব্যস, ফিন গণ্ডারের মত নাক ডাকিয়ে সকাল পর্যন্ত বিভাের হয়ে নিদ দিল। খুব ভােরে তার নিদ টুটে গেল। আড়মােড়া ভেঙে খাড়া হল। ফিন সিঁড়ি বেয়ে উধাও হয়ে গেল।
প্রাসাদ তাে নয় আমরা যেন একেবারে দোজাকের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করছি। কলিজার ধুকপুকানি কিছুতেই কমছে না। আমরা পাকা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম—দরিয়ায় ঝাপ দিয়ে জান খতম করব তবু এ মৃত্যুপুরীতে আর এক মুহূর্তও নয়। আর যদি এখানে থাকতেই হয় তবে একজোট হয়ে শত্রুকে খতম করার কোশিস করব। নসীবে যা আছে পরে দেখা যাবে। আমি খাড়া হলাম। উপস্থিত সবাইকে লক্ষ্য করে বল্লাম
—“দোস্তরা, আমার বাৎ শুনুন। শয়তান দৈত্যটিকে যদি খতম করতে পারি বহুৎ আচ্ছা। আর যদি না পারি তবে একটি ফিকির করলে কেমন হয়, আপনারা বিবেচনা করে দেখুন—সমুদ্রের কিনারায় ইয়া পেল্লাই সব কাঠের গুড়ি পড়ে থাকতে দেখেছি। তাদের কয়েকটি দিয়ে ভেলা বানিয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে চেপে বসি। দরিয়ায় ভাসতে ভাসতে যেদিকে হয় চলে যাব। আজ না হােক কাল জাহাজের দেখা পাবই। নইলে অন্য কোন দ্বীপে তাে গিয়ে ভিড়তে পারব। পানিতে ডুবে দম বন্ধ হয়ে জান খতম হলেও এর চেয়ে ঢের ভাল। আমার মতলবটি দেখলাম অনেকের কাছেই গ্রহণযােগ্য মনে হ’ল। তারা বহুৎ আচ্ছা বহুৎ আচ্ছা মতলব’ব’লে তারিফও করল।
আর করবে না-ই বা কেন, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনে তিলে তিলে ধুকে মরার চেয়ে দরিয়ায় ডুবে জান খতম যদি হয়-ই হােক।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিস্সা বন্ধ করলেন।
                 তিনশােতম রজনী 
মাঝ রাত্রে বেগম শাহরাজাদ কিসসার অবশিষ্টাংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, বৃদ্ধ সিন্দবাদ নাবিক তার দোস্ত ও সেই মেহমানদের কাছে কিসসা বলে চলেছে-হ্যা, আমার মতলবটিকে সবাই স্বাগত জানাল। ব্যস, আর দেরী নয়, আমরা পা টিপে টিপে দোজাক-সদৃশ প্রাসাদটি থেকে বেরিয়ে সমুদ্রের ধারে এলাম। কাঠের গুঁড়ি জুড়ে জুড়ে বিশাল এক ভেলা বানিয়ে ফেল্লাম, জঙ্গল থেকে ফলমূল এনে তার ওপর জড়াে করলাম।
কাজ সেরে আমরা ফিন মৃত্যুপুরীতে ফিরে এলাম।
রাত্রির অন্ধকার নেমে আসতেই কলিজা-কাপানাে তর্জন গর্জন করতে করতে নিচে নেমে আমাদের একজনকে দিয়ে আগের দু’রাত্রির কায়দায় ভােজ সারল। তারপর হাত-পা ছড়িয়ে নাক ডাকিয়ে নিদ যেতে লাগল।
আমরা প্রতিশােধ নেয়ার জন্য তৎপর হলাম। দুটো ইয়া লম্বা শিক জোগাড় করে চুল্লির আগুনে গরম করে টকটকে লাল করে নিলাম। এবার সন্তর্পণে শয়তান দৈত্যটির দিকে সতর্কতার সঙ্গে পা টিপে টিপে এগিয়ে গেলাম। আর একই সঙ্গে উত্তপ্ত শিক দুটো তার দু চোখে দিলাম গেঁথে। বিকট আর্তনাদ করে এক ঝটকায় সে উঠে বসে পড়ল। সে কী তর্জন গর্জন! তামাম দ্বীপটি যেন থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। ঘরময় দাপাদাপি শুরু করে দিল প্রচণ্ড আক্রোশে। কী যে ভয়ঙ্কর রূপ সে ধারণ করল চোখে না দেখলে অনুমান করাও সম্ভব নয়।
শয়তান দৈত্যটি বিকট স্বরে তর্জন গর্জন করে হাতড়ে হাতড়ে সিঁড়িটি ধরল।কাৎরাতে  কাৎরাতে কোনরকমে ওপরে উঠে বেপাত্তা হয়ে গেল।
আমরা উৎকণ্ঠামুক্ত হলাম। দলবেঁধে চলে এলাম। সমুদ্রের ভেলায় উঠে বসলাম। দৈত্যটিকে খতম করে আমরা নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, শত্রু মুক্ত হয়েছি। কিন্তু ভেলায় উঠতে না উঠতে আমাদের ধারণা যে পুরােপুরি ভ্রান্ত, বুঝতে পারলাম। সবে ভেলাটি কিনারা থেকে কিছুদূর গেছে অমনি দেখি আহত দৈত্যটির হাত ধরে একটি অধিকতর কদাকার জনানা তর্জন গর্জন করতে করতে বিশাল একটি পাথর এনে তার হাতে তুলে দিল। সে অনুমানের ওপর নির্ভর করে আমাদের ভেলাটির দিকে সেটি ছুঁড়ে মারল। তার কোশিস ব্যর্থ হয় নি। পাথরটি ভেলাটির কাছাকাছি পড়ায় সেটি আচমকা একদিকে কাৎ হয়ে গেল। বােধ হয় ভেলাটির কানায়ও লেগেছিল। আবার আর একটি পাথর আমাদের দিকে ধেয়ে এল। আরও একটি—পরপর কয়টি পাথর ছুঁড়ে মারল যন্ত্রণাকাতর ক্রোধােন্মত্ত দৈত্যটি। কিন্তু আমরা কোনরকমে লক্ষ্য এড়িয়ে ভেলাটিকে অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। আমাদের চৌদ্দ পুরুষের নসীবের জোর ছিল বলেই আমাদের জান খতম হতে হতে কোনরকমে রক্ষা পেয়ে গিয়েছিল। হ্যা, নসীব আমাদের জান রক্ষা করল। খােদাতাল্লার দোয়ায় আমরা কোনরকমে একটি দ্বীপে পৌছাতে পারলাম।
ফলমূল আমাদের ভেলাতেই ছিল। তা দিয়ে পেটের জ্বালা নিভিয়ে সবাই মিলে দুটো গাছের ডালে বসে রাত্রি কাটালাম।
ভােরের আলাে ফুটতে না ফুটতেই আমাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। তাকিয়ে দেখি, দুটো গাছের প্রায় সব কটি ডালেই ইয়া লম্বা ও মােটা সােটা সাপ ঝুলছে। তাদের চোখগুলাে চুল্লীর মত জ্বলছে। আমার কলিজাটি যেন আচমকা ডিগবাজি খেয়ে গেল। পাশের গাছটির দিকে চোখ পড়তেই আমার শরীরের সব কটি স্নায়ু যেন এক সঙ্গে ঝনঝনিয়ে উঠল। দেখি, আমার এক সহযাত্রীকে ইয়া পেল্লাই এক সাপ একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে। আতঙ্কে তার মুখ দিয়ে রা সরছে না। তারপর তাকে গিলতে শুরু করল রাক্ষুসে সাপটি।
আমি কাঁপা কাঁপা গলায় আর্তনাদ করে উঠলাম—‘হায় খােদা! এ আবার কোন মরণ দ্বীপে এনে ফেললে! কোনরকমে দৈত্যের খপ্পর এড়িয়ে এসে আর এক যমের কবলে পড়লাম যে! খােদা, তুমিই একমাত্র ভরসা।
আমরা কাপা কাপা হাত-পায়ের ওপর নির্ভর করেই কোনরকমে গাছ থেকে জমিনে নেমে এলাম।
আমরা দলবেঁধে ফিন আশ্রয়ের খোঁজে বেরােলাম। হাঁটতে হাটতে বহু দূরে সমুদ্রের কাছাকাছি আর একটি অধিকতর মােটাসােটা ও ঝাকড়া গাছকে আশ্রয় হিসাবে বেছে নিলাম। সবাই মিলে চারদিকে ছুঁড়ে খুঁজে দেখলাম, যমদূত সাপ আছে কিনা। না, একটি বাচ্চা সাপও নজরে পড়ল না।
ফলমূল খেয়ে দিন গুজরান করলাম। ফিন রাত্রি দেখা দিল। সবাই মিলে গাছে উঠে পছন্দ মাফিক ডাল বেছে নিলাম। দিলে এটুকুই স্বস্তি যে, এ রাত্রিটি অন্ততঃ নির্বিঘ্নে কাটবে। কিন্তু এখানেও

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments