আরব্য রজনীর গল্প পার্ট ৮২ ( Part 82 )

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
আমাদের পেটে কিল মারার ধান্দা করলে কিছুতেই বরদাস্ত করব না, বলে রাখছি। জবরদস্ত কিছু করার মতলব করলে জান খতম করে ছাড়বো । আমি তাকে অভয় দিতে গিয়ে ম্লান হেসে বললাম-
     “মিঞা সাহাব। এমন গােসসা করছেন কেন? আপনার রুজি রােজগারের ভাগ নেয়ার তিলমাত্র ইচ্ছাও আমার নেই। একজন নিরীহ বণিক আমি। আমার নসীবের দৌলতে এখানে এসে পড়েছি। চুরি, ডাকাতি বা রাহাজানি কোন কুমতলবই আমার নেই।

কথা বলতে বলতে আমি পুঁটুলি থেকে হীরা বের করে কয়েকটি বুড়াের হাতে গুজে দিয়ে মুচকি হেসে বললাম-“কি, এবার খুশী তাে?'  
বুড়াে ঢ্যাবা ঢ্যাৰা চোখ করে হীরার টুকরােগুলাের দিকে তাকিয়ে রইল। এক সময় কাপা কাপা গলায় বলল-শােভন আল্লাহ! এতবড় হীরা ! এতাে জিন্দেগীতে কোনদিন চোখেও দেখি নি! বেটা, এ তুমি কোথায় পেলে ? কিভাবে পেলে?'
-কোত্থেকে পেলাম, কিভাবে পেলাম পরে সব বলছি। আগে দিল খােলসা করে বলুন, আপনার দিল ভরেছে নাকি আরও দু একটি চাই ?
-ব্যস বেটা, এ-ই যথেষ্ট। এর একটি বেচলে কয়েক পুরুষ পায়ের ওপর পা তুলে দিব্যি জিন্দেগী কাটিয়ে দেওয়া যাবে। আমার বালবাচ্চা কেউ-ই নাই। কে ভােগ করবে? তার চেয়ে বরং বাকী সব তােমার জিম্মাতেই থাক।”
-“খুব বেকায়দায় পড়েছি। আপনার কাছে থলেটলে কিছু আছে কি?
‘আছে। জরুর আছে। নাও, কি করবে, কর। আমি থলেতে হীরাগুলি ভরে নিলাম। এবার কোর্তা পাৎলুন গায়ে চাপিয়ে সভ্যভব্য হয়ে উঠলাম।
আমি এবার বুড়াের কাছে আমার দ্বিতীয় সমুদ্র যাত্রার কাহিনীর কিছু অংশ বলাম। রকপাখির সাহায্যে পাহাড়ে ওঠার পূর্ব-মুহূর্ত পর্যন্ত বলতে না বলতেই বুড়াে চোখ দুটো কপালে তুলে বলে উঠল- “ইয়া আল্লা! ওই দুর্গম হীরার পাহাড়ে তুমি উঠলে কি করে? ভাবলেই যে আমার হাঁটু কাঁপতে শুরু করছে বেটা। এর আগে অনেকেই সেখানে গিয়েছিল বটে, কিন্তু কেউ-ই জান নিয়ে ফিরতে পারেনি। তুমি—তাজ্জব কাণ্ড তাে!'।
আমি এবার পাগড়ী খুলে রকপাখির পায়ে ফাস পরানাে থেকে শুরু করে পাগড়ীতে ভেড়ার মাংসপিণ্ড বেঁধে কৌশলে পাহাড় থেকে নেমে আসার ব্যাপারটি খােলসা করে সব বৃত্তান্ত বুড়াের কাছে ব্যক্ত করলাম। বুড়াে সব শুনে সেই যে হাঁ করল কয়েক মুহূর্ত আর চোয়াল বন্ধ করতে পারল না।
এক সময় স্বাভাবিকতা ফিরে পেয়ে বুড়াে আমার পিঠ চাপড়ে বলল-সাবাস নওজোয়ান! তােমার সাহস আর হিম্মৎ আমাকে মুগ্ধ করেছে। খােদা তাল্লার দোয়া রয়েছে তােমার ওপর। নইলে...- 
তাকে কথাটি শেষ তে না দিয়েই আমি বলে উঠলাম-খিদেয় আমার পেটের নাড়ীভুঁড়িতে আগুন জ্বলছে। কাল থেকে দানাপানি কিছু জোটে নি। কিছু খানার বন্দোবস্ত করে দিতে পারেন?
-তাই তাে, আমার যে আগেই ব্যাপারটি ভাবা দরকার ছিল। আমার তাবুতে চল। সব মিলে যাবে। বেশী দূরে নয়-বাঁক ঘুরেই।' 
বুড়াের সঙ্গে তাঁবুতে এসে পেট পুরে খানাপিনা করে বল শক্তি ফিরে পেলাম। তার তাবুতেই ওদিন কাটালাম। রাত্রিবাসও তাবুতেই করতে হল।
সকালে দেখি বুড়াে একা নয়। তার সঙ্গী-সাথী আরও কয়েকজন রয়েছে। তারা আমাকে দরিয়ার ধারে নিয়ে গেল।
দুপুরের কাছাকাছি একটি জাহাজ ভিড়ল। বুড়াে ও তার সঙ্গী সাথীদের সুকরিয়া জানিয়ে জাহাজে উঠলাম।
এক সময় আমাদের জাহাজটি কপূর দ্বীপে নােঙর করল। এখানে অতিকায় সব গাছের বিচিত্র সমারােহ। দুধের মত সাদা কষ বেরােয় এদের গা থেকে, তারপর এ কষ থেকেই কর্পূর তৈরী হয়। কর্পূর দ্বীপে কারকাভন নামে ভয়ঙ্কর হিংস্র প্রকৃতির এক বিশেষ আকৃতির জানােয়ার বাস করে। আমাদের মূলকের গণ্ডারের মত অনেকটা আকৃতি। নাকের ডগায় ইয়া বড় একটি করে শিং। কম করেও ছয় হাত লম্বা। গায়ে গতরেও খুব তাগদ। পেল্লাই সব হাতীকে অনায়াসে ঘায়েল করার হিম্মত রাখে। হাতী ঘায়েল করে এরা দূরে সরে গেলে বুকপাখি শো শো শব্দে নেমে আসে। ছোঁ মেরে মরা হাতীটিকে ঠোটে আঁকড়ে ধরে উড়ে যায়। তারপর শুরু হয় মহাভােজ।
আমার সােনার মােহর দরকার। জাহাজ ভাড়া থেকে শুরু করে। অন্যান্য খরচের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়ােজন। কুছ পরােয়া নেই। দিলাম একটি হীরা বেচে। আমি ফিন আবার জাহাজে চাপলাম। শুরু হ’ল এ বন্দর থেকে অন্য এক বন্দরে নােঙর করা। সব শেষে হাজির হলাম বসরাহ বন্দরে। ব্যস, দিল আমার নাচানাচি শুরু করে দিল। বাগদাদ আর মাত্র কয়েক ক্রোশ।
আমাকে কাছে পেয়ে আমার আত্মীয়জনরা খুশীতে ডগমগ হ’ল। বাতাসে আমার আগমন বার্তা ইয়ার দোস্তদের কাছে পৌছে গেল। মধুর লােভে ফিন মৌমাছির হাট বসে গেল আমার বিশাল বৈঠকখানায়।
এবার থেকে বিলাস ব্যসনের মধ্যে আমি দিন গুজরান করতে লাগলাম। গােস্ত আর সরাবের সদ্ব্যবহার করতে লাগল আমার ইয়ার দোস্তরা। নাচা-গানার আয়ােজনও হররােজ হতে লাগল। সে-ফাকে চলে আমার সমুদ্রযাত্রার বিচিত্র অভিজ্ঞতার বর্ণনা। মােদ্দা বাৎ রীতিমত অনাবিল আনন্দ-সুখেই আমার দিন গুজরান হতে থাকে।
আমার দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রার কিসসা মােটামুটি এরকম।
দোস্ত আর মেহমানগণ আল্লাহ যদি সবার তবিয়ৎ আচ্ছা রাখেন তবে আমার তৃতীয় সমুদ্রযাত্রার কিসসা আপনাদের দরবারে পেশ করার ইচ্ছা রাখছি। আশা করি আগামীকালের কিসসা আপনাদের কাছে অধিকতর রােমাঞ্চকর ও আকর্ষণীয় মনে হবে।
বেগম শাহরাজাদ সিন্দবাদ নাবিকের দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রার কিসসা শেষ করতে না করতেই প্রাসাদের বাইরের বাগিচায় ভােরের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। বেগম কিসসা বন্ধ করলেন।
    দু’শ আটানব্বইতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর শুরু হওয়ার পূর্ব মুহুর্তে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কোনরকম ভূমিকার অবতারণা না করেই কিসসা শুরু করলেন—জাহাপনা, সিন্দবাদ নাবিক তার কিসসা শেষ করে তার দোস্ত মেহমানদের নিয়ে নাস্তা সারলেন।।
নাস্তা শেষ হলে বৃদ্ধ সিন্দবাদ নাবিক এবার কোর্তার জেব থেকে একশটি সােনার মােহর বের করে সিন্দবাদ কুলীর হাতে দিয়ে বলল-“বেটা, এগুলাে আমি খুশী হয়ে তােমাকে দিলাম। তােমার প্রয়ােজন অনুযায়ী খরচা করবে। সিন্দবাদ কুলী মােহরগুলাে কোর্তার জেবে চালান করে দিয়ে নতজানু হয়ে বৃদ্ধ সিন্দবাদ নাবিককে সালাম করে বিদায় নিল।
সিন্দবাদ নাবিকের তৃতীয় সমুদ্রযাত্রার কিসসা
সিন্দবাদ কুলী পরদিন সুবহে বিছানা ছেড়ে রুজু করে পবিত্র দিল নিয়ে নামাজাদি সারল। ব্যস, আর এক মুহূর্তও দেরী নয়। সে ফিন লম্বা লম্বা পায়ে সিন্দবাদ নাবিকের মকানের উদ্দেশ্যে হাঁটা জুড়ল। সিন্দবাদ কুলী সদর দরওয়াজা ডিঙিয়ে সিন্দবাদ নাবিকের বৈঠকখানায় পা দিয়ে দেখে তার মেহমান ও দোস্তরা ইতিমধ্যেই এক এক করে সেখানে জড়াে হয়েছেন। সবাই তার আসার অপেক্ষায় বসে। বৃদ্ধ সিন্দবাদ নাবিক ফোকলা দাঁতে হেসে সিন্দবাদ কুলীকে আদর করে পাশে বসাল।
অন্যদিনের মত সুবিশাল টেবিলে নাস্তা সাজানাে রয়েছে। সরাবের বােতল আর পেয়ালারও ঘাটতি নেই।
খানাপিনা সারতে সারতে সিন্দবাদ নাবিক তার তৃতীয় সমুদ্রযাত্রার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বলল—“আল্লাহ যে সর্বশক্তির আধার তা অবশ্যই আমাদের কারাে অজানা নয়, ঠিক কিনা? আর একটু বাড়তি কিছু যদি ভাবা যায় তবে আমরা দেখব, আমাদের মত সাধারণ আদমিদের তুলনায় তার বিচার বিবেচনাবােধ হাজার গুণ বেশী। কেন এরকম বাৎ বলছি তাই না? ভেবে দেখুন তাে, সওদাগরি কারবার করতে গিয়ে, দরিয়া পাড়ি দেওয়ার সময় আমার জান খতম হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়েছিল। একবার নয়। পর পর দু’বার।
আমার তাে ধন দৌলতের কোনই অভাব ছিল না। আল্লাহ আমাকে দু'হাত ভরে দিয়েছেন। আমার চৌদ্দ পুরুষ দেদার দিনার খরচা করলেও তা খতম হবার নয়। তবে ফিন নতুন জান হাতের মুঠোয় নিয়ে জাহাজ নিয়ে ভিন্ দেশে পাড়ি জমানাের কোশিস করতে যাব কেন?
আমি বলব, আল্লাহ যথা সময়ে আমার দিল থেকে পূর্ববর্তী সমুদ্রযাত্রার প্রাণ সংশয়ের বাৎ বিলকুল মুছে দিয়েছিলেন। তিলমাত্র ভীতিও আমার মধ্যে ছিল না। তাই ফিন আমি জাহাজে চড়ার জন্য উৎসাহী হয়ে পড়েছিলাম। মুহর্তকাল নীরবে কাটিয়ে বৃদ্ধ সিন্দবাদ নাবিক ফিন বলতে শুরু করল—“আদৎ ব্যাপার কি জানেন? প্রাসাদের চার দেয়ালে ঘেরা কামরায় বৈভবের মধ্যে দিনের পর দিন কাটিয়ে আমার দিল হাঁপিয়ে উঠেছিল। বাঁধন ছিড়ে বেরিয়ে পড়ার জন্য আমার দিল আনচান করতে লাগল। কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিলাম না।
আমি ফিন সওদা খরিদ করতে মেতে গেলাম। পরদেশের বাজারে চাহিদা আছে এমন সব সওদা খরিদ করে কামরা বােঝাই করে ফেললাম। তবে হ্যা, এবার আর ইয়া ভারী বড় আর ভারী সওদা একটি খরিদ করলাম না। আরবের আতর নির্যাস বাইরের মুলুকে বহুৎ দামে বিকায়। মুনাফাও দ্বিগুণ। আর বাগদাদের শিল্প সম্ভারও বহুৎ কদর পায়। এরকম বিবেচনা করে ছােট ছােট সামানপত্রই বেশী খরিদ করলাম।
বসরাহ বন্দরে হাজির হলাম সেদিনই দুপুরের কিছু বাদে। বসরাহ বড় বন্দর, আশা করি আপনাদের অবশ্যই জানা আছে। এখান থেকে জাহাজে তামাম দুনিয়া ঢুঁড়ে বেড়ানাে যায়।
বসরাহ বন্দরে গিয়ে একদল সাচ্চা মুসলমান বণিকের সঙ্গে জান পহছান হ’ল। প্রথম আলাপেই তাদের সঙ্গে আমার দোস্তী হয়ে গেল। আমি তাদের জিগরী দোস্ত বনে গেলাম। পছন্দসই দোস্ত না মিললে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা কেমন রুঠা রুঠা বােধ হয়।
বসরাহ থেকে আমরা বড় জাহাজে উঠলাম। গুরু গম্ভীর ভোঁ দিতে দিতে ক্যাপ্টেন জাহাজ ছাড়ল। ধীর-মন্থর গতিতে আমাদের জাহাজ মাঝ-দরিয়ার দিকে এগিয়ে চলল । 
আমাদের জাহাজ একের পর এক বন্দরে নােঙর করতে লাগল। আমরা বন্দর থেকে বেরিয়ে নগরে গিয়ে ঘুরে ঘুরে সওদা ফেরি করে বেচতে লাগলাম।
আগেই তাে বলেছি, আমার সঙ্গে যা কিছু সওদা ছিল বিলকুল বিলাস সামগ্রী। ভরসা একটিই যে, এ-কিসিমের সওদা অন্য কারাে সঙ্গেই ছিল না। ফলে দেখা গেল আমার সওদার চাহিদা অন্য সবার সওদার তুলনায় ঢের বেশী। আমি মওকা নিতে ছাড়লাম না। এক একটি সওদার চড়া দাম হাঁকলাম। তাতেও ছাড়া নেই।
আমার সওদার ওপর সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়তে লাগল। সুযােগ বুঝে আমি দু'হাতে মুনাফা লুটতে মেতে গেলাম। খুশীতে আমার কলিজা নাচানাচি শুরু করে দেয়।
আমাদের জাহাজ একের পর এক বন্দর ছুঁয়ে এক সময় মুসলমান সুলতানদের সুলতানিয়ৎ এলাকা ডিঙিয়ে মাঝদরিয়া ধরে এগিয়ে চলতে লাগল। আমাদের পায়ের তলায় অথৈ নীল পানি, মাথার ওপরে ওল্টানাে গামলার মত সুবিশাল নীল আশমান। তার গায়ে ঝুলছে। বিশাল জ্বলন্ত সূর্য। নীল আশমানের গা বেয়ে পেঁজা তুলার মত টুকরাে টুকরাে মেঘ অজানা মুলুকের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাচ্ছে।
তাদেরই টুকরাে ছায়া ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অবস্থান করছে দরিয়ার নীল পানির ওপর। আমি তাে কেবল মােহর রােজগারের ধান্দায় মুলুক ছাড়ি নি। দুনিয়ার বৈচিত্র্য স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার অদম্য বাসনাও আমার মধ্যে পুরােদস্তুর রয়েছে। আমি ডেকের রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে দরিয়ার পানিতে মেঘের আনাগােনা প্রত্যক্ষ করতে লাগলাম। এমন সময় ক্যাপ্টেনের কণ্ঠস্বর কানে এল - 
-  ইয়া আল্লাহ! কেলেঙ্কারী ব্যাপার ঘটে গেছে! আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। কোথায় কোনদিকে আমাদের জাহাজ এগিয়ে চলেছে, কিছুই বুঝতে পারছি না।
কথাটি কোনরকমে বলেই ক্যাপ্টেন বেমালুম কপাল চাপড়াতে বসে গেল। ডুকরে ডুকরে কেঁদে বার বার বলতে লাগল-খােদা, একী হ’ল! একী করলে তুমি! সে এবার হাউমাউ করে কেঁদে উন্মাদের মত মাথার চুল টানতে লাগল। নিজের পােশাক পরিচ্ছদ ছিড়ে টুকরাে টুকরাে করতে লাগল। আমরা ছুটে গিয়ে পরিস্থিতিটি সম্বন্ধে সম্যক ধারণা নেওয়ার জন্য প্রশ্ন করলাম—“আমরা এখন কোথায় আছি, কোনদিকে চলেছি কিছুই কি ঠাহর করতে পারছেন? 
আগের মতই ডুকরে ডুকরে কেঁদে ক্যাপ্টেন জবাব দিল—‘পালের হাওয়া মােড় নিয়েছে। আমরা বিলকুল পথ হারিয়ে ফেলেছি।
—সে তাে বুঝলাম। আমরা এখন কোনদিকে চলেছি ঠাহর করতে পারছেন কিছু?
—“জাহাজ এখন দ্রুত বাঁদর দ্বীপের দিকে ছুটে চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা অল্প সময়ের মধ্যে সে দ্বীপে পৌছে যাব।
-তারপর? তারপর কোথায়--
আমাকে কথাটি শেষ করতে না দিয়েই ক্যাপ্টেন ফিন কান্নাভেজা কণ্ঠে বলতে লাগল—বাঁদর-দ্বীপ মরণ-দ্বীপ বলে পরিচিত। আজ পর্যন্ত কোন জাহাজ, এমন কি কোন আদমি পর্যন্ত সেখান থেকে জিন্দা ফিরতে পারে নি। ফিন দু'হাতে কপাল চাপড়াতে শুরু করল।
আমরা দলবেঁধে চিল্লাতে লাগলাম—কী সর্বনেশে কারবার করেছেন। যেভাবেই হােক জাহাজের গতি ফেরানাের কোশিস করুন। এতগুলাে আদমির জান খতম করতে বসেছেন দেখছি।
–‘অসম্ভব! কোন কোশিসেই কাজ হবার নয়। কিছু সময় বাদেই জাহাজ বাঁদর দ্বীপে পৌছে যাবে। আর যদি জাহাজের ওপর জোর জুলুম খাটানাের কোশিস করি তবে জাহাজই গুঁড়িয়ে যাবে। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জানতে পেরে আমরা, যাত্রীরা উন্মাদের মত ডেকের ওপর ছুটোছুটি দাপাদাপি জুড়ে দিলাম। মােউত হাতছানি দিয়ে ডাকছে, দিমাক ঠিক রাখা কি আর সম্ভব? জাহাজ আরও কিছুটা এগিয়ে বাঁদর-দ্বীপের কাছাকাছি যেতে খেল শুরু হয়ে গেল। পঙ্গপালের মত দলে দলে বানর আমাদের জাহাজটিকে আক্রমণ করল। তাদের সংখ্যা নির্ধারণ করা তাে দূরের কথা মােটামুটি অনুমান করাও সম্ভব হল না। দশ-বিশ হাজার তাে নয়ই। পঞ্চাশ হাজার বললেও হয়ত কিছুমাত্র বাড়িয়ে বলা হবে না। বিশাল বানরসেনা। যুদ্ধোন্মাদ ক্রোধােন্মত্ত বানরসেনা। জাহাজের চারদিকে রীতিমত লাফালাফি দাপাদাপি শুরু করে দিল। আমাদের সাক্ষাৎ মােউত বানরের দল।
আমরা জান হাতে নিয়ে জাহাজের ডেকের ওপর বসে আল্লাতাল্লার নাম স্মরণ করে চলেছি।
জাহাজের চারদিক ঘিরে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে, দাঁত-মুখ খিচিয়ে ক্রোধােন্মত্ত জানােয়ারগুলাে আমাদের রীতিমত শাসাতে লাগল। তাদের এমন রণংদেহী ভাব যে, জাহাজ থেকে নিচে নামলেই আমাদের ছিড়ে ফেঁড়ে একাকার করে দেবে।।
বানরের দলকে আক্রমণ করার তাে প্রশ্নই ওঠে না। তারা আক্রমণ করলে কিভাবে প্রতিরােধ করব তা ভেবেই আমরা কূলকিনারা করতে পারলাম না। ভেবেছিলাম, বানরগুলাে নিচে দাঁড়িয়েই হম্বিতম্বি করবে, জাহাজে ওঠার সাধ্যে কুলােবে না। কিন্তু আমাদের সব আশা-ভরসা বানচাল করে দিয়ে তারা দলে দলে কাতারে কাতারে জাহাজের ডেকের ওপর উঠে এল।
আমরা আল্লাতাল্লা-র ওপর সব দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে হাত-পা গুটিয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে রইলাম। বানরগুলাে জাহাজে পুরােদমে খেল শুরু করে দিল। আমাদের সওদাপত্রের গাট্টি ছিড়ে তছনছ ক'রে দিতে লাগল। সে সঙ্গে দাঁত-মুখ খিচুনি আর কিচিরমিচির তাে রয়েছেই।
কয়েকটি বানর তরতর করে মাস্তুল বেয়ে ওপরে উঠে গেল। পাল ছিড়ে দিল, পালের কাছি খুলে ফেলল।
কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের আরও অবাক করে দিল যখন দেখলাম হাল-দাঁড় অধিকার করে জাহাজটি নিয়ে সমুদ্র সৈকতে হাজির করল।
আর কয়েকজন আমাদের ওপর চড়াও হ’ল। আমাদের এক এক করে টেনে হিচড়ে জাহাজ থেকে নামিয়ে তীরে নিয়ে গেল। ভয়ে আমাদের কাপাকাপি শুরু হয়ে গেল। কলিজা শুকিয়ে কাঠ। বুঝতে পারছি মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু তাদের আক্রমণ প্রতিরােধ করার শক্তি থাক আর না-ই থাক, মনােবল নিঃশেষে উবে গেছে।
আমরা পাড়ে দাঁড়িয়ে কোরবাণির পশুর মত ঠকঠক করে কাপতে লাগলাম। চোখের সামনে আমাদের এত বড় সর্বনাশ ঘটতে দেখছি কিন্তু প্রতিরােধ করার মত দুঃসাহসের একান্ত অভাব। এবার তারা আরও অবিশ্বাস্য কাণ্ড করল। বৈঠা চালিয়ে দাড় বেয়ে জাহাজটিকে নিয়ে তারা মাঝদরিয়ার দিকে অগ্রসর হতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি আমাদের চোখের আড়ালে চলে গেল।

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments