গল্পের পরবর্তী অংশঃ
কখনও বদ্ধ উন্মাদের মত মাথার চুল টানি, কখনও কপাল চাপড়াই আবার কখনও বা পাথরে মাথা ঠুকতে লাগলাম—হায় খােদা, এ কী কাণ্ড তােমার! কান্নাকাটি থামিয়ে অনুসন্ধিৎসু চোখে দরিয়ার দিকে তাকালাম। চোখের মণি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমার জাহাজটিকে দেখার কোশিস করলাম। ব্যর্থ প্রয়াস। সামনে কেবল নীল আর নীল। নীলের বিচিত্র সমারােহ।
আমার হালৎ, আমার অসহায়বােধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আবার বিলাপ জুড়ে দিলাম—হায় খােদা, আমার মধ্যে ফিন সমুদ্রযাত্রার দুর্মতি কেন ঢুকিয়ে দিয়েছিলে। ইয়ার-দোস্তদের নিয়ে খােশ মেজাজেই তাে ছিলাম। খানাপিনার অভাব ছিল না। সিন্দুকভরা ধনদৌলত। জিন্দেগীভর পায়ের ওপর পা তুলে খেলেও আমার অভাব হ'ত না। লালসা ....লালসার শিকার হয়েই আমি নিজের পায়ে কুড়াল মারলাম। লালসাই আজ আমাকে এচরম সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এক সময় নিজের দিলকে সমঝলাম, এভাবে হাপিত্যেশ করে কি-ই বা ফায়দা? রাতভর পাহাড়ে মাথা ঠুকলেও কোন সুরাহা হবার নয়। দিলকে শক্ত করতে হবে। জান রাখার ফিকির আমাকেই বের করতে হবে। সােজা হয়ে দাঁড়ালাম। ইতিমধ্যেই প্রকৃতির বুকে আলাে-আঁধারীর খেলা শুরু হয়ে গেছে। দরিয়ার বুকে আধাে আলাে আধাে আধাে অন্ধকার বিরাজ করছে। একটু বাদেই অন্ধকারের বুকে বিলকুল হারিয়ে যাবে দ্বীপ-সাগর সব কিছু। তখন ?
কোন ফিকির বের করতে না পেরে বেশ বড়সড় একটি গাছে উঠে গেলাম। অজানা-অচেনা দ্বীপ। বলা তাে যায় না অন্ধকারে কখন কোন্ হিংস্র জানােয়ার ঘাড়ে চেপে বসে।
গাছের ডাল ধরে দুঃখের রাত্রি, গুজরান করলাম। ভােরের আলাে ফুটে উঠলে গাছ থেকে নেমে আসার আগে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে চারদিকে তাকাতে লাগলাম, যদি ধারে-কাছে কোন
লােকালয় নজরে পড়ে। গাছপালা, ঝােপঝাড় আর অনুচ্চ পাহাড়টি ছাড়া কিছুই চোখে পড়ল না।।
চোখের মণি দুটোকে ঘুরিয়ে চারদিকে দেখতে দেখতে এক জায়গায় আমার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। অদূরে সফেদ একটি বস্তু চোখের সামনে ভেসে উঠল। অবাক মানলাম। ভাবলাম, কি হতে পারে ওই সফেদ বস্তুটি ?
গাছ থেকে নেমে এলাম। লম্বা লম্বা পায়ে রহস্যজনক ওই সফেদ বস্তুটির দিকে হাঁটতে লাগলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার জমাটবাঁধা রহস্যের হিল্লা হয়ে গেল। রহস্যজনক সফেদ বস্তুটি একটি গম্বুজ। পেল্লাই গম্বুজ। পাথর কেটে কেটে তৈরি হবে হয়ত।
তাজ্জব ব্যাপার! গম্বুজটির চারিদিকে চক্কর মারতে লাগলাম। সত্যি তাজ্জব ব্যাপার। কোনদিকে দরওয়াজা বা জানলার চিহ্নমাত্রও নজরে আমার পড়ল না। এমন কি ওপরে ওঠার কোন সিডি পর্যন্ত তল্লাশী করে পেলাম না।
ভাবলাম, গম্বুজটির মাথায় উঠলে কোন একটি ফিকির নির্ঘাৎ বেরিয়ে যাবে। কিন্তু বহুৎ কায়দা কসরৎ করলাম। কিছুতেই উঠতে পারলাম না। তার গা এমন মসৃণ যে সামান্য ধরার জায়গা পর্যন্ত। নেই। কোশিস যে করব তার ফিকির থাকা তাে চাই। তাজ্জব মানলাম।
গম্বুজটির ওপরে ওঠার মতলব ছেড়ে এবার পায়ের সামনে পা রেখে রেখে তার চারদিক ঘুরে এলাম। এক শ পঞ্চাশ পা।
কোন ফিকির বের করতে না পেরে হতাশ জর্জরিত হয়ে গম্বুজটির গায়ে হেলান দিয়ে বসে চোখের পানি ঝরাতে লাগলাম। ক্ষুধা-তৃষ্ণার কথা ভুলে গেলাম।
সারাদিন কাটিয়ে দিলাম গম্বুজটির রহস্য উদ্ধার করার ব্যর্থ প্রয়াস চালাতে গিয়ে।
কখন যে সূর্য পশ্চিম-আশমানের গায়ে হেলে পড়েছে টেরই পাই নি। উঠে পড়লাম। কোথায় যাই, কি করি ভাবতে ভাবতে কাটিয়ে দিলাম আরও কিছুটা অমূল্য সময়। ফিন আলাে-আঁধারীর খেল শুরু হয়ে গেল। দিমাক খারাপ হয়ে যাবার জোগাড়। এখন যাই কোথায়, করি কি? একটু বাদেই ঘুটঘুটে অন্ধকার আমাকে ঘিরে ধরবে। জঙ্গল থেকে কোন হিংস্র জন্তু-জানােয়ার ঘাড়ে চাপলে—উঃ আর ভাবতে পারছি না। আমার খুন ঠাণ্ডা হয়ে আসতে লাগল।
আচমকা আশমানের দিকে চোখ ফেরাতেই আমার কলিজাটি মোচড় মেরে উঠল। আর্তনাদ করে উঠলাম—“ইয়া আল্লাহ! এ আবার কোন নতুন বিপদ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাইছ!'
গােড়াতে ভেবেছিলাম, এক খণ্ড কালাে মেঘ বুঝি ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে আশমানটিকে ঢেকে দেবার ধান্দায় মেতেছে। লেকিন তা-ই বা কি করে সম্ভব! দারুণ গ্রীষ্ম! সারাদিন খটখটে রােদ ছিল। হঠাৎ এরকম জমাটবাঁধা মেঘের আবির্ভাব কি করে সম্ভব! কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই ব্যাপারটির ফয়সালা হয়ে গেল। দেখলাম, অতিকায় একটি পাখি ডানা ছড়িয়ে দিয়ে দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসছে। কোন কিসিমের পাখি কে জানে। কোন পাখির আয়তন যে এমন বিশাল হতে পারে কোনদিন ভাবতেও পারি নি।
কিতাবের কিসসা কাহিনীতে পড়েছিলাম, এক কিসিমের পাখি আছে যাদের আকৃতি ছােটখাট একটি পাহাড়ের মত। রকপাখি নাকি তার নাম। এবার ব্যাপারটির ফয়সালা হয়ে গেল। দিনভর আমি যাকে গম্বুজ ভেবে কতরকম চিন্তা ভাবনা করেছি, আদতে মােটেই সেরকম কিছু নয়। রকপাখির ডিম। হায় খােদা! এ কী ভ্রান্তি!
আমি লম্বা লম্বা পায়ে সামান্য সরে গেলাম। পাখিটা ডিমটির কাছ নেমে এল। ডানা ছড়িয়ে তার ওপর বসল। আমার দিলে তিলমাত্র সন্দেহও রইল না—গম্বুজের মত অতিকায় ডিমটি তারই গর্ভে ছিল।
কৌতুহলী দৃষ্টি মেলে পাখিটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। এক সময় মাথায় একটি ফন্দি খেলল । প্রায় হামাগুড়ি দিতে দিতে আমি ডিমটির একেবারে কাছে চলে গেলাম।
অতিকায় পাখিটি ডানা দুটো ছড়িয়ে দিয়ে তন্ময় হয়ে ডিমে তা দিচ্ছে। নিশ্চল-নিথর। কোন দিকে ভ্রক্ষেপ মাত্র নেই। আমি মাথা থেকে পাগড়ীটি খুলে খুবই সতর্কতার সঙ্গে পাগড়ীর একটি প্রান্ত পাখিটির একটি পায়ের সঙ্গে বেধে ফেলাম।
আমার ধান্দা, সকালে পাখিটি যখন খাবারের সন্ধানে উড়ে যাবে তখন আমি পাগড়ীর বিপরীত প্রান্তটি ধরে থাকব খােদাতাল্লার নাম নিয়ে। কিতাবে পড়েছি, রকপাখি একটি হাতীকে নিয়েও অনায়াসে আকাশপথে পাড়ি জমাতে পারে। আমি তাে তার কাছে একটি গুরপােকার সামিল।
কিসসার এ পর্যন্ত বলতে না বলতেই ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
দু শ ছিয়ানব্বইতম রজনী
মাঝরাত্রের কাছাকাছি বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—জাহাপনা, সিন্দবাদ নাবিক তার দ্বিতীয় সমুদ্র যাত্রার কাহিনী বলে চলেছে—আমার হাতের কবজিতে পাগড়ীর এক প্রান্ত বেঁধে নিলাম। এবার সারারাত্রি নীরব প্রতীক্ষা। আমার ধৈর্যের পরীক্ষা শুরু হল। আমার বল-ভরসা পাখিটি তাে ডিমের ওপর বসে গভীর নিদ্রায় ডুবে রয়েছে। আর আমি? ডিমটির গায়ে হেলান দিয়ে নীরবে অপেক্ষা করে চলেছি, কখন পাগড়ীতে টান পড়বে। সারাটি দিন হতাশা আর হাহাকারের মধ্যে কেটেছে। শরীর ও দিল দু’-ই ক্লান্ত-অবসন্ন। আমার আশা, রকপাখিটি নির্ঘাৎ উড়ে গিয়ে কোন না কোন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় খানার খোঁজে গিয়ে বসবে। ব্যস, আমি আগের মত সতর্কতার সঙ্গে পাগড়ীর বাঁধন খুলে নিজেকে মুক্ত করে নেব। তারপর নিজের মুলুকে ফেরার ফিকির কিছু না কিছু একটি বেরিয়েই যাবে।
পূর্ব-আশমানের গায়ে রক্তিম ছােপ ফুটে উঠল। প্রকৃতি ক্রমে ফর্সা হয়ে দৃশ্যমান হতে লাগল। রক পাখিটি এবার ডিমটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে শূন্যে ডানা মেলল । ক্রমে আশমানের দিকে উঠতে লাগল। সে কী তার ডানা চালানাের শব্দ। ওরে ধ্বস! আমি পাগড়ীটি শক্ত করে ধরে রইলাম। চোখ দুটো বন্ধ করে দিলাম। কারণ, জমিনের দিকে নজর পড়লে পায়ের তলায় কেমন যেন অবাঞ্ছিত সুড়সুড়ি অনুভূত হয়। কোনক্রমে হাত ফসকে গেলে আর দেখতে হবে না। মুহুর্তে। একেবারে থেৎলে যাব, হাড্ডি গুড়ােগঁড়াে হয়ে যাবে।
এক সময় আমার বাহক রকপাখিটি একটি পাহাড়ের ওপরে বসল। এতক্ষণ পাখিটির হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে নিশ্চেষ্ট ছিলাম। এবার সক্রিয় হয়ে উঠলাম। ব্যস্ত-হাতে পাগড়ীটি খুলে ফেললাম। বলা তাে যায় না পাখিটির ফিন কি মর্জি হয়। হয়ত বা আবার উড়তে শুরু করে দেবে। কাজ হাসিল। তার সঙ্গে আমার আর কোনই সম্পর্ক রইল না।
হ্যা, যা ভাবছিলাম ঠিক তা-ই। কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই পাখিটি ফিন শূন্যে ডানা মেল।
ভুল—চরমতম ভুল করেছি আমি। পাখিটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা মােটেই বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি।
পাখিটি পাহাড় ছেড়ে যাবার সময় অতিকায় একটি ময়াল — সাপকে ঠোটে চেপে ধরে দরিয়ার দিকে উড়ে গেল। সাপটিকে দেখেই সে পাহাড়ের ওপর এসে বসেছিল।
পাখিটির কাণ্ড দেখে আমার কলিজা শুকিয়ে গেল। ভাবলাম, একটি সাপ যখন চোখের সামনে দেখলাম তখন আরও হাজারটি থাকলেও তাে তাজ্জব হওয়ার ব্যাপার নয়।
এবার সম্বিৎ ফিরে পেলাম। আমি পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে। ন্যাড়া পাহাড়। গাছপালা, ঝর্ণা, নদী কোথাও কিছু নেই।।
জিনিস হারিয়ে গেলে তার মূল্য শতগুণ বেড়ে যায়। আমার ক্ষেত্রেও বিলকুল তা-ই হয়েছিল। ভাবলাম, সে-দ্বীপে বরং এর চেয়ে ঢের নিরাপদেই ছিলাম। ঝর্ণা আর ফলমূলের গাছ প্রচুর ছিল। অন্ততঃ না খেয়ে শুকিয়ে মরতে হত না। এখানে এক ফোটা পানিও নেই যে শুকিয়ে ওঠা কলিজাটিকে ভিজিয়ে একটু তরতাজা করে নিতে পারি।
পাহাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলাম—এ আমি হঠাৎ করে কোথায় এসে পড়লাম। বিষধর সাপের আড্ডা। কেবলমাত্র ময়ালই নয়। হাজার কিসিমের বিষধর সাপের আড্ডা। চোখের পলকে গিলে সােজা উদরে চালান করে দিলে ঠেকাবার কেউ-ই নেই। পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে আমি ভাবতে লাগলাম—এখানে খাব কি ? কি দিয়ে উদর পূরণ করব? তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে গেলেও এক ফোটা পানি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
-“হায় খােদা! এ আমায় কোথায় এনে ফেললে? এ যে কড়াই থেকে একেবারে জ্বলন্ত চুল্লিতে এনে ফেললে! এখন কে বাৎলে দেবে বাঁচার নিশানা ?
পাথর ধরে পা টিপে টিপে কোনরকমে নিচের দিকে নামতে লাগলাম। কিছুটা পথ নেমেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। তাজ্জব ব্যাপার। চোখে ধাঁধাঁ লাগছে। অত্যুজ্জ্বল দ্যুতি। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে তাকালাম। মুখ দিয়ে আচমকা বেরিয়ে এল—“ইয়া খােদা! এ যে হীরার স্তুপ! হ্যা, হীরাই বটে। যেদিকে তাকাই কেবল হীরা আর হীরা। রাশি রাশি বস্তা বস্তা হীরা চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
আমি বিস্ময় মাখানাে দৃষ্টি মেলে ছােট-বড় হীরার টুকরােগুলােকে দেখতে লাগলাম। এমন সময় এক জায়গায় আমার দৃষ্টি থমকে গেল। সর্বাঙ্গে কাটা দিয়ে উঠল। দেখলাম, অসংখ্য সাপ কিলবিল করছে। ইয়া বড় বড় সাপ। দশাসই চেহারা। সবাই ব্যস্ত হয়ে গর্তে ঢুকছে। রকপাখির ভয়ে তারা দিনমানে বড় একটা বাইরে থাকে না। রাত্রে খাবারের খোঁজে বেরােয়। অজগর, ময়াল প্রভৃতি সাপের কথা কিতাবে পড়েছি। কিন্তু কোন সাপ যে এমন বিশালদেহী হতে পারে কোনদিন কল্পনাও করতে পারিনি।
.
:
.:.
নসীবে কি আছে, খােদাতাল্লাই জানেন। পা ফেলতে গিয়ে কখন যে সাপের গর্তে পা সিধিয়ে দেব, কে জানে। নিজের প্রতি বার বার ধিক্কার দিতে লাগলাম। নিজের মুলুকে, নিজের প্রাসাদে সুখেই দিন গুজরান করছিলাম। কেন যে ফিন সওদাগরী কারবারের ভূত মাথায় চাপল ভেবে পাচ্ছিনে।
বহুৎ খোঁজাখুঁজি করেও মাথা গোঁজার মত একটি নিরাপদ আশ্রয় বের করতে পারলাম না। শেষ পর্যন্ত ছােট্ট একটি গুহা নজরে পড়ল। ভেতরে কোনরকমে হামাগুড়ি দিয়ে থাকা যেতে পারে। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল। উপায়ান্তর না দেখে গুহাটির মধ্যে নিজেকে সিঁধিয়ে দিলাম। তারপর গুহার মুখে একটি পাথরের চাই চাপা দিয়ে একটু স্বস্তি বােধ করলাম। আমি গুহার মধ্যে একটু আয়েস করে বসার কোশিস করলাম। মুহূর্তে সামনের পাথরটি কেমন যেন একটু নড়েচড়ে উঠল। ইয়া আল্লা! এ আবার কি আজগুবি কাণ্ড!
দিনের আলােয় যাকে পাথরের টুকরাে ভেবেছিলাম আসলে সেটি আদৌ পাথর টাথর নয়, পেল্লাই একটি সাপের পিঠ। বিড়ে পাকিয়ে নিশ্চিন্তে ডিমে তা দিচ্ছে। আমি ডরে শিটকে যাবার জোগাড়। সর্বাঙ্গ কেমন যেন অবশ হয়ে আসতে লাগল। মাথার স্নায়ুগুলাে শিথিল হয়ে আসতে লাগল। ব্যস, তার পরের কথা কিছুই আমার দিমাকে নেই।
কখন যে ভাের হয়েছে হুঁশই ছিল না। এক সময় সংজ্ঞা ফিরে পেলাম। নিদ ছুটল। পিছন ফিরে তাকাবার মত অবস্থা আমার ছিল। না। পাথরটিকে কোনরকমে সরিয়ে দুরু দুরু বুকে বাইরে বেরিয়ে আসা সম্ভব হ’ল।
গত দিন ও রাত্রি উপােষ গেছে। তার ওপর স্নায়ুর ওপর অস্বাভাবিক চাপ। আমার শরীরের শক্তি যেন কোন অদৃশ্য দৈত্য কেড়ে নিয়েছে।
কোনরকমে দুর্বল শরীরটিকে তুলে দাঁড় করালাম। সােজা হয়ে দাঁড়াবার সাধ্য নেই। আর এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটল। চোখ ফিরিয়ে দেখি আমার একেবারে গা-ঘেঁষে প্রকাণ্ড একটি গােস্তর টুকরাে। ভাল করে লক্ষ্য করে বুঝলাম, একটি ভেড়ার এক চতুর্থাংশ। ছাল চামড়া ছাড়ানাে। তাজ্জব বনলাম। যে-ই কাজটি করুক না কেন এমন নিপুণভাবে ভেড়ার গা থেকে ছাল চামড়া ছাড়ালেই বা কি করে?
কিতাবের কিসসা পড়েছিলাম, জহুরীরা ওই হীরার পাহাড় থেকে হীরা সংগ্রহ করতে এসে ভেড়ার মাংস ছুঁড়ে ফেলে। কাচা মাংসের গায়ে হীরার ছােট-বড় বহু টুকরাে গেঁথে যায়। তারপর বাজপাখি বা রকপাখি এসে ছোঁ মেরে গােস্তের টুকরােটিকে নিয়ে বাসায় চলে যায়। তখন কৌশলে পাখিটিকে খেদিয়ে দিয়ে হীরাগুলি নিয়ে নেয়। _ আমার মাথায় একটি মতলব এল। চট করে কিছু বড় বড় হীরা কুড়িয়ে জড়াে করলাম। এবার কোর্তা, পাৎলুন সব খুলে হীরার টুকরােগুলি দিয়ে একটি পুঁটুলি বানালাম। সেটিকে কোমরের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে নিলাম। এবার পাগড়ীটি খুলে গােস্তের টুকরােটিকে ফাঁস দিয়ে বাঁধলাম। মাংসের অধিকাংশ অংশ বের করে অনাবৃত রাখলাম। আর পাগড়ীটির অন্য প্রান্ত আমার হাতের কর্জির সঙ্গে বেঁধে নিলাম। ফিন শুরু হ’ল নীরব প্রতীক্ষা—ধৈর্যের পরীক্ষা। জান বাঁচাবার কোশিস তাে করতে হবে। হ্যা, যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই, একটি রক পাখি উল্কার বেগে নেমে এল। ছোঁ মেরে মাংসের টুকরােটিকে ঠোটে কামড়ে ধরে শূন্যে ডানা মেলল। আমিও আশমানে উঠতে লাগলাম। খােদাতাল্লা এবার নসীবে কি লিখে রেখেছে, কে জানে।
রক পাখিটি উড়তে উড়তে গিয়ে তার বাসায় নামল। আমি পাগড়ীর বাঁধন খুলে রক পাখিটির পিছনে চলে গেলাম। একটু বাদে এক বুড়াে জহুরী সেখানে এল। আমাকে দেখেই তাজ্জব বনে গেল। বড় বড় চোখ করে তাকাল। আমি আদমির মুখ দেখে খুশীতে ডগমগ হয়ে গেলাম। সে কিন্তু খুশী না হয়ে কেমন ব্যাজার মুখ করেই আমার দিকে তাকাল। ভাঙা কাসরের মত গলায় সেঁক সেঁক করে উঠল—‘চোর— শয়তান কাহিকার! হীরা চুরির মতলব নিয়ে এখানে হাজির হয়েছ, তাই না? খবরদার বলে দিচ্ছি। এটি আমাদের কয়েক পুরুষের ব্যবসা। আমাদের অধিকার। আমাদের পেটে কিল মারার ধান্দা করলে কিছুতেই বরদাস্ত করব না, বলে রাখছি। জবরদাস্ত কিছু করার মতলব করলে জান খতম করে

0 Comments