গল্পের পরবর্তী অংশ ( সহস্র এক আরব্য রজনী ) ঃ
আমি সাবালক হলে আমার আব্বার রেখে যাওয়া বিষয় আশয় আমার নিজের হাতে তুলে দিলেন হিতাকাঙক্ষী সে নিকট আত্মীয়টি। একে উমর কম। তার ওপর অগাধ বিষয় আশয় হাতে পড়ায় আমার দিমাক খারাপ হয়ে যাওয়ার জোগাড় হ’ল।'
ব্যস, কাচা পয়সা হাতে পড়ামাত্র আমার বিলাস ব্যসন তরতর করে উর্ধ্বমুখী হতে লাগল। দামী সরাব আর খানাপিনার মাত্রা গেল বেড়ে। ইয়ার দোস্তদের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে লাগল। খানাপিনা আর দামী সরাবের ফোয়ারা ছুটল। সে সঙ্গে বাঈজীদের নাচাগানার আসরও ঘন ঘন বসতে লাগল।
একদিন আবিষ্কার করলাম আমার বিষয় আশয় কেবলমাত্র সরাবের বােতলের তলানির মত অবশিষ্ট আছে। নামমাত্র অর্থকড়ি আমার হাতে রয়েছে। আতঙ্কে আমার কলিজা পর্যন্ত শুকিয়ে উঠল।
আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী ইয়ার দোস্তরা ইতিমধ্যেই পিঠটান দিয়েছে।
সামনে আমার বিরাট জিন্দেগী পড়ে রয়েছে। কি করে যে জীবনের বাকী দিনগুলাে গুজরান করব সে-ভাবনা তখন আমার কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। আমার আব্বা পয়গম্বর সুলেমান ইবন দাউদ-এর একটি বাণী প্রায়ই বলতেন-“জন্মের মুহূর্তের চেয়ে অন্তিম মুহুর্ত অনেক বেশী শ্রেয়। জিন্দা কুত্তা মরা সিংহের চেয়ে অনেক বেশী মূল্যবান। দৈন্যদশার চেয়ে মৃত্যু অনেক শ্রেয়। এ বাণী আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে চক্কর মেরে বেড়াতে লাগল। না, আর দেরী নয়। নামমাত্র দামে আমার যা কিছু বিষয় আশয় ছিল সব বেচে সাফ সুতরা হয়ে গেলাম। মাত্র তিন হাজার দিনার সব কিছুর বিনিময়ে আমার কোর্তার জেবে উঠল।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
দু’ শ’ বিরানব্বইতম রজনী
রাত্রি একটু গভীর হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, প্রবীণ সিন্দবাদ নাবিক তার কিসসা বলে চলেছে—মাত্র তিন হাজার দিরহাম সম্বল করে আমি ভিন দেশের উদ্দেশে পা বাড়ালাম। ছােট খাটো একটি জাহাজ আমাকে নিয়ে সাগরে ভেসে চলল বসরাহর দিকে।
জাহাজ বসরাহ বন্দর ছেড়ে এগিয়ে চলল। তারপর এক এক করে বেশ কয়েকটি দ্বীপ পিছনে ফেলে এগিয়ে চললাম। আমার জাহাজ প্রতি বন্দরেই ভেড়াতে লাগলাম। প্রতি বন্দর থেকে কিছু কিছু সওদা কিনি। আবার বিক্রিও করি কিছু না কিছু।
এবার দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ এক নাগাড়ে জাহাজ চালিয়ে আমি একটি দ্বীপের দেখা পেলাম। সবুজ দ্বীপ, গাছগাছালিতে ভর্তি। ক্যাপ্টেন দ্বীপটিতে জাহাজ নােঙর করল।
জাহাজ দ্বীপে ভিড়তেই জাহাজের কর্মীরা হুড়মুড় করে দ্বীপটিতে নেমে পড়ল। আমরা, সব সওদাগর এক সঙ্গে দল বেঁধে দ্বীপটির মাটিতে পা দিলাম।
একটি গাছের নিচে খানা পাকানাের বন্দোবস্ত করা হ’ল। আমি প্রকৃতির শােভা দেখার আনন্দে মাতােয়ারা হয়ে গেলাম। খানাপিনার ব্যাপারে কিছুমাত্রও আগ্রহ আমার রইল না।
আমরা প্রত্যেকেই যখন কোন না কোন কাজের মধ্যে ডুবে রয়েছি ঠিক তখনই আচমকা ভয়ঙ্কর এক শব্দ হল। পুরাে দ্বীপটি থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। আমার কলিজাটি যেন আচমকা মােচড় খেয়ে গেল। কে যে কোথায় ছিটকে পড়ল হদিস মিলল না। জাহাজের ক্যাপ্টেন গলা ফাটানাে চিৎকার জুড়ে দিলেন—“যে যেখানে, যে অবস্থায় আছেন তাড়াতাড়ি জাহাজে ফিরে আসুন। এটি আদৌ কোন দ্বীপ নয়। আদতে এটি একটি অতিকায় তিমি মাছের পিঠ। যুগ যুগান্ত ধরে এ সমুদ্রের মাঝখানে ঘুমােচ্ছ। তাই দিনের পর দিন পলি জমে জমে ডাঙ্গা সৃষ্টি হয়েছে। আর সে পলিমাটিতে লতা ও ঝােপঝাড় জন্মেছে। খানা পাকানাের জন্য আগুন জ্বালাবার ফলে উত্তাপ পেয়ে মােচড়া মুচড়ি দিচ্ছে। ব্যস, এবারই সে চলতে আরম্ভ করবে। আবার এমনও হতে পারে, সে আচমকা ডুব দেবে।'
ক্যাপ্টেনের সতর্কবাণী কানে যেতেই সবাই পড়ি কি মরি করে জাহাজে উঠে আসতে লাগল। জামা কাপড় আর খানাপিনা আর বাসন কোসন সব রইল ভাসমান তিমিটির পিঠে।।
জাহাজ ছেড়ে দেওয়া হল। যারা পারল হুড়মুড় করে। জাহাজের পাটাতনের ওপর ঝােলাঝুলি করতে করতে কোনরকমে উঠল। আর যেসব হতভাগা জাহাজ পর্যন্ত পৌছতে পারল না তারা ওই অজ্ঞাতনামা দ্বীপটিতে নির্বাসিত হ’ল। কিন্তু সে-ও মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। এক সময় সবাইকে নিয়েই অতিকায় তিমিটি অতল গহুরে ডুব দিল। ব্যস, তারাও সবাই জিন্দেগীর জন্য দরিয়ার অতল গহ্বরে ডুব দিল।
ক্যাপ্টেনের চিৎকার শুনতে পেয়েও যারা জাহাজে আশ্রয় নিতে পারল না আমিও তাদের দলেই ছিলাম।।
আল্লাতাল্লার অসীম দোয়া। তার দোয়াতেই আমি দরিয়ার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার হাত থেকে অব্যাহতি পেয়ে গেলাম। এক ফাঁপা গুড়িকে দরিয়ার পানিতে ভেসে যেতে দেখলাম। মুহূর্তকাল সময় নষ্ট না করে বরাতগুণে পাওয়া কাঠের গুঁড়িটির ওপর চেপে বসলাম।
আমাকে নিয়ে গাছের গুঁড়িটি ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলল। কিন্তু বেশী দূর যাওয়া গেল নয়। আচমকা পর্বত সমান একটি ঢেউ আসায় আমাকে সহ গুঁড়িটি আচমকা পাণ্টি খেয়ে গেল। আমার নসীব এখানেও কাজ করে চলেছে। আচমকা আর একটি ঢেউ এসে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আবার কাঠটির ওপর চেপে বসলাম। ক্রমে রাত্রির অন্ধকার নেমে এল। উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্রের বুকে অন্ধকারে কারাগৃহের মত আমি যেন বন্দী হয়ে গেলাম। প্রাণদণ্ডের আসামীর মতই করুণ আমার অবস্থা। আমি ঢেউয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস, একমাত্র খােদাতাল্লা ছাড়া কেউ আমার জান রক্ষা করতে পারবে না। আমি তাে কোন ছার। কাঠটির ওপর জেঁকে বসলাম। খােদা ভরসা। ভােরের আলাে দেখা দিল। এবার অস্পষ্ট হলেও নিজেকে দেখতে পেলাম। সােল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলাম—“ইয়া আল্লাহ! আমি তবে মরিনি! পূর্ব-আকাশে রক্তিম সূর্য দেখা দিল। আমি করজোড়ে তার উদ্দেশ্যে প্রণতি জানালাম। আমার চলা অব্যাহতই রইল।
আমি এবার পা দুটোকে দাঁড়ের মত বার বার আগু-পিছু চালাতে লাগলাম।
আমার করুণ আকুতি আল্লাহর কান পর্যন্ত নির্ঘাৎ পৌছেছে। নইলে বেলা একটু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুর বেগ হঠাৎ এমন অস্বাভাবিক বেড়ে যাবে কেন? আমার নিদানের সম্বল বাতাসের বেগে ঢেউয়ের তালে ভাসতে ভাসতে ধিকধিক এগিয়ে চলল তীরের দিকে।
খােদা ভরসা। শেষ পর্যন্ত তীর পাওয়া গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার ভুল ভেঙে গেল। তীর নয়। সমুদ্র দ্বীপ। এক দুর্লঙ্ঘ পর্বতের পাদদেশ। সাগরে ঘেরা, পাহাড় আর জঙ্গলে ঢাকা দ্বীপটির দিকে আমি হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। হায় আমার নসীব! এমন কোন স্থান খুঁজে পেলাম না যেখান দিয়ে হাতড়ে হাতড়ে কোনরকমে দ্বীপটিতে উঠে যেতে পারি। ওপরে উঠতে গেলে কিছু তাে একটি অবলম্বন চাই-ই চাই। একটি মােটাসােটা লতা পেলেও কোনরকমে নিজেকে দ্বীপটিতে তুলে নিয়ে যেতে পারতাম। কোন কায়দাই নেই।
এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে শেষ পর্যন্ত একটু আশার আলাে পেয়ে গেলাম। একটি পাহাড়ী বটগাছের ঝুরি জল পর্যন্ত ঝুলে পড়েছে দেখলাম। ঝুরিটি আঁকড়ে ধরে বাঁদরের মত ঝুলতে ঝুলতে কোনরকমে গাছের ডালে ওঠা গেল।
এবার কলিজায় পানি এল। দিলেও ভরসা এল। ভাবলাম, খােদাতাল্লা বােধ হয় আমার জান বাঁচাতেই চাইছেন। এবার নিজের কথা ভাববার মত সুযােগ এল। বুঝলাম, অনবরত পা চালানাের ফলে হাঁটু দুটো টন টন করছে। আর সামুদ্রিক মাছের দাঁতের ঘায়ে পা দুটো ক্ষত বিক্ষত। গাছ থেকে নেমে প্রায়-সমতল এক টুকরাে পাথর পেয়ে শরীর এলিয়ে দিলাম। কখন যে ক্লান্ত শরীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল কিছুই বুঝতে পারি নি। মাথার ওপরে সূর্যটি হামাগুড়ি দিতে দিতে এগিয়ে গিয়ে এক সময় এমন অবস্থায় দাঁড়াল যেখান থেকে আমার সঙ্গে চরম শত্রুতা করার সুযােগ পেল। বে-আক্কেলের মত আমার চোখে তার কিরণ বর্ষণ করতে লাগল। ঘুম ছুটে গেল। উঠে বসলাম। চারদিকে ঝলমলে রােদ। দাঁড়ানাের কোশিস করলাম। পারলাম না। পা দুটো বিশ্বাসঘাতকতা করল। পা সােজা করে কিছুতেই দাঁড়াতে পারলাম না। হাঁটু দুটো টন টন করছে। হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে প্রায় বুকে হেঁটে সামনের সমতল ভূমির দিকে এগােতে লাগলাম।
কিছুক্ষণ ধরে অমানুষিক পরিশ্রম করে এক ঝর্ণার ধারে এসে পৌছলাম। মাথার ওপরে ফুল-ফলের বিচিত্র সমারােহ। চেনা অচেনা ফলের মেলা। খােদাতাল্লাকে নতুন করে সুকরিয়া জানাতেই হ’ল। আর কিছু না হােক ফল আর ঝর্ণার পানি খেয়ে জানটিকে তাে কিছুদিন অন্ততঃ টিকিয়ে রাখা যাবে। ঝর্ণার পানি দিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ, গাছের ফলে উদর পূর্তি আর পাথরের বিছানায় নিদ্রা—জব্বর বন্দোবস্ত। এক-দুই-তিন করে বেশ কয়েকটি দিন কেটে গেল। পায়ের ক্ষতগুলি প্রায় কমে এসেছে। হাঁটুতে একটু শক্তি পাচ্ছি। তবে এখন মাটিতে পা ফেলে কোনরকমে খাড়া হতে পারি বটে। কিন্তু হাঁটা চলা করতে গেলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাই। একটি গাছের ডালে ভর দিয়ে তবে হাঁটাহাঁটি করতে পারি।
একদিন লাঠি ভর দিয়ে গিয়ে সমুদ্রের ধারে একটি পাথরের ওপর বসেছিলাম। হঠাৎ একটি অত্যাশ্চর্য বস্তু নজরে পড়ল। ডরে আমার কলিজাটি বােধ হয় আচমকা দরকচা মেরে গেল। আমার তখনকার হালৎ ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আদতে অতিকায় কালাে বস্তুটি কি কোন সামুদ্রিক জানােয়ার নাকি জঙ্গলের বাসিন্দা ঠাহর করতে পারলাম না। বুকের ভেতরে কোন অদৃশ্য হাত যেন সমানে হাতুড়ি পিটতে লাগল। জোর করে দিলে সাহস সঞ্চয় করলাম। এক পা দু পা করে বুকের ঢিবঢিবানি নিয়ে এগােতে শুরু করলাম। সামান্য এগােতেই ব্যাপারটি ফয়সালা হয়ে গেল। মােটামুটি বুঝলাম, হিংস্র কোন জানােয়ার অবশ্যই নয়। আমাদের দেশের ঘােড়ার জাত ভাই হবে হয়ত। অনেকটা সেরকমই দেখতে। নিরীহ-নম্র আচরণ ভরসা, অন্ততঃ ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে না। অতিকায় জানােয়ারটি একটি গাছের সঙ্গে বাঁধা। কয়েক পা এগিয়ে তার কাছাকাছি গেলাম। হ্যা, বাঁধাই বটে। প্রশ্ন জাগল নির্ঘাৎ ধারে কাছে কোন আদমি আছে। নইলে জানােয়ারটি বাঁধল কে?
আমি কৌতূহলী দৃষ্টি মেলে জানােয়ারটিকে দেখছি। ঠিক সেমুহুর্তেই কার যেন বিকট চিৎকার কানে এল। হকচকিয়ে গেলাম। এক আদমি রীতিমত হুঙ্কার দিতে দিতে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। গর্জে উঠল
—“কে তুমি? এখানে কি করে এসেছ? এখানে আসার সাহসই বা কি করে পেলে?
আমি কোরবানির খাসির মত কাপতে কাপতে করজোড়ে নিবেদন করলাম—‘হুজুর, গােসসা করবেন না। আমার কসুর নেবেন না। আমি পরদেশী। জাহাজে ছিলাম। হঠাৎ বিপর্যয়ের মুখে পড়ায় জাহাজ আমাকে ফেলে ভেগে যায়। আমার মত বে-কায়দায় আমার অনেক সঙ্গী-সাথীও পড়েছিল। তারা যে নসীব সম্বল করে ভাসতে ভাসতে কোথায় গেছে আদৌ জিন্দা আছে কিনা তাও জানা নেই। খােদাতাল্লার দোয়ায় একটি কাঠের গুঁড়ির ওপর চেপে আমি ভাসতে ভাসতে এখানে এসেছি। বিশ্বাস করুন, নিজের ইচ্ছায় নয়। ঢেউ-ই ঠেলে ধাকে গুড়িটিকে এখানে নিয়ে এসেছে। _ রহস্যজনক আদমিটি আচমকা আমার একটি হাত খপ করে ধরে ফেল। আমি তাে পৌনে মরা হয়ে গেলাম। সে তেমনি কর্কশ স্বরে বলল–‘চল আমার সঙ্গে।
আমি ডরে শিটকে লেগে গেলাম। লাঠিটি ভর দিয়ে কাঁপতে কাপতে তাকে অনুসরণ করে চললাম।
সে আমাকে একটি গুহায় নিয়ে গেল। আমাকে সমাদর করে বসাল, যেন আমন্ত্রিত মেহমান। পাতায় ফল সাজিয়ে আমার সামনে দিল। সে-ও অন্য একটি পাতায় নিজের জন্য খানা নিল। খেতে খেতে সে আমার নামধাম জিজ্ঞাসা করল। কোন উদ্দেশ্যে আমি সমুদ্রপথে পাড়ি দিতে গিয়েছিলাম, খােলসা করে বল্লাম।
আমি ইতিমধ্যে সাহস সঞ্চয় করে অনেকটা স্বাভাবিক হতে পেরেছি। তবু ভয়ে ভয়ে বললাম-“হুজুর, আমি না হয় খােদাতাল্লার মর্জিতে এ-দ্বীপে হাজির হয়েছি। কিন্তু কেন, কিভাবে আপনি এ জনমানবহীন দ্বীপে এলেন? কেনই বা এ-গুহা সম্বল করে দিন গুজরান করে চলেছেন? আর আপনার বাহন মাদীঘােড়াটিকেই বা কোথায় পেলেন? তাকে গাছের গুড়ির সঙ্গে বেঁধে রেখেছেন। কি কাজে লাগে, মেহেরবানি করে বলবেন কি?
বেগম শাহরাজাদ কিসসাটির এ পর্যন্ত বলতে না বলতেই ভাের হয়ে এল। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।
দু’শ’ তিরানব্বইতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার আবার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম ফিন তার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাঁহাপনা, প্রবীণ সিন্দবাদ তার বৃত্তান্ত বলে চলেছে-
—সে আদমি আমার বাৎ শুনে মুচকি হেসে বলল এ দ্বীপে আমি একাই নয়, আমার মত আরও অনেকেই বাস করে। আমরা সুলতান মীরজান-এর অধীনে কাজ করি। দ্বীপের চারদিকে আমরা পাহারায় নিযুক্ত। প্রতি মাসে যেদিন প্রথম চাঁদ দেখা দেয় সেদিন আমরা দ্বীপের চারদিকে একটি করে মাদী ঘােড়া বেঁধে রাখি। তারপর নিজেরা লুকিয়ে থাকি গুহার ভেতরে। মাদি ঘােড়ার গায়ের গন্ধে সাগর থেকে সিন্ধু ঘােটক উঠে আসে। মাদী ঘােড়াকে ভাগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। পারে না। পারবে কি করে? তারা সবাই যে বাঁধা। তারা চি হি রবে ডাকাডাকি শুরু করে দেয়। আমরা সিন্দু ঘােটকদের উপস্থিতির কথা জানতে পেরে দৌড়ে যাই। সিন্ধু ঘােটকটিকে মেরে ভাগিয়ে দেই। মাদি ঘোড়াটিকে নিয়ে আসি। কিছুদিন বাদে সে বাচ্চা পয়দা করে। বাচ্চা বহুৎ তাগড়াই হয়। ব্যস, বিদেশের বাজারে চড়া দামে বিক্রি হয়। আমাদের সুলতান এ কারবার করে আজ ধন দৌলতের পাহাড় বানিয়ে ফেলেছেন।
আজ এ-মাসের প্রথম চাঁদ দেখা যাবে। সিন্ধুঘােটকও উঠে আসবে। কাজ মিটে গেলে তােমাকে আমাদের সুলতানের দরবারে নিয়ে যাব। খােদাতাল্লার দোয়ায় আমার সঙ্গে তােমার দেখা হয়ে গেল। নইলে জনমভর পাহাড়ে মাথা খুঁড়লেও তুমি নিজের মুলুকে ফিরে যেতে পারতে না।
আমরা যখন গুহার মুখে বসে বাৎচিৎ করছি তখন ঘােডার চি হি রব কানে এল। বুঝলাম, সিন্ধুঘােটক উঠে এসেছে। মাদী ঘােড়ার ওপর চড়াও হয়েছে। মাদী ঘােড়াটি মনের সুখে পাল খাচ্ছে। তার চরমতম আনন্দের মুহূর্তে আমরা কাছে গিয়ে ব্যাঘাত ঘটালাম না। কাজ মিটে গেল। সিন্ধুঘােটকটি এবার মাদী ঘােড়াটিকে সঙ্গে নিয়ে যাবার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে দিল। করবেই তাে। সবে সে চরম সুখ পেয়েছে। তাকে কাছে রেখে হরবখত সম্ভোগ সুখ লাভের জন্য সে উতলা তাে হবেই। আমার আশ্রয়দাতা তখন বিকট স্বরে চিল্লিয়ে তার সঙ্গী সাথীদের তলব করল। একদল আদমি লাঠিসােটা নিয়ে দৌড়ে এল। পিটিয়ে সিন্ধুঘােটকটিকে ভাগিয়ে দিল। সিন্ধুঘােটকটিকে ভাগিয়ে দিয়ে মাদী ঘােড়াটিকে নিয়ে এসে ফিন গাছের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হল। আমার আশ্রয়দাতা এবার তার সঙ্গী-সাথীদের সঙ্গে আমার পরিচয় করে দিল।
আমাকে পেয়ে দ্বীপের সবাই তাে মহাখুশী। একটি তাগড়াই ঘােড়া এনে আমাকে বল্ল-“দোস্ত, ঘােড়ায় চাপ। আমাদের সুলতানের দরবারে তােমাকে নিয়ে যাব। আমাদের মেহমান তুমি। সুলতানও তােমাকে দেখলে বহুৎ খুশী হবেন।
সুলতানের দরবারে আমাকে খুবই খাতির দেখানাে হল। সুলতান তাে একেবারে তার মসনদের পাশে কুর্শি পেতে আমাকে বসতে দিলেন। তিনি ধৈর্যসহকারে আমার সমুদ্রযাত্রার উদ্দেশ্য এবং নসীবের বিড়ম্বনার কথা শুনলেন। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন-বেটা, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ। নসীবে যেটুকু দুঃখ আনন্দ লেখা আছে ঘটবেই। আমাদের সাধ্য কি তাকে খণ্ডন করি। তিনি তােমার সহায় না থাকলে দরিয়া পাড়ি দিয়ে এখানে, এ-দ্বীপে হাজির হলে কি করে? তােমার ইন্তেকালও তােমার কপালে লিখে দিয়েছেন বলেই তাে তুমি আজও জিন্দা আছ। ঘাবড়াও মাৎ বেটা। তিনিই তােমার তকলিফ দূর করে দেবেন।
সুলতান যে আমার ওপর সদয় হয়েছেন তা বুঝলাম যখন দেখলাম, তিনি আমাকে বন্দরের প্রধান পরিদর্শকের পদে বহাল করেছেন। তবে আমার চাকরিটি দায়িত্বপূর্ণ হলেও তেমন কিছু কঠিন নয়। মাঝে-মধ্যে জাহাজ আসে। তখন একটু ছুটোছুটি করতে হয়। ব্যস, তারপরই আমার কাজ সুলতানের দরবারে হাসি মস্করার মধ্য দিয়ে দিন গুজরান করা। সুলতান আমার বুদ্ধি ও বিচক্ষণতায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন। ফলে হালৎ এমন দাঁড়াল যে, তিনি আমার পরামর্শ ছাড়া এক পা-ও

0 Comments