গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
খুবসুরৎ লেড়কিটি গানা ধরল। গানা নয় তাে যেন তার কণ্ঠ দিয়ে মধু ঝরতে লাগল। তন্ময় হয়ে খলিফা তার গান শুনতে লাগল। একের পর এক একুশটি রাগরাগিনী গেয়ে শােনাল।
খলিফা যেন আনন্দ-সায়রে ভাসতে ভাসতে কোন্ অচিন মুলুকে চলে গেলেন।
গানা থামিয়ে লেড়কিটি বলল —‘জাঁহাপনা, আজ আমি নসীবের ফেরে এখানে, এ-জনমানবহীন মকানে নির্বাসিত-জীবন যাপন করছি।
-“কিন্তু কেন? কেন তােমার নসীব তােমাকে এখানে এনে ফেলেছে, বলতে পার? কিসের দুঃখ তােমার ? কেনই বা এ নিরবচ্ছিন্ন হতাশা?’
–‘জাহাপনা, আপনার লেড়কা অল-আমিন আমাকে দশ হাজার সােনার মােহরের বিনিময়ে বাদী বাজার থেকে খরিদ করে নিয়ে এসেছেন। আমাকে বলা হয়েছিল আপনাকে ভেট দেয়ার জন্যই তিনি আমাকে খরিদ করেছেন। আমার নসীব বেগড়বাই করল। আপনার খাস বেগম ব্যাপারটিকে দিল থেকে মেনে নিতে পারলেন না। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে নিগ্রো খােজাকে দিয়ে আমাকে এখানে চালান করে দেন। তারপর থেকেই এখানে বন্দী-জীবন গুজরান করছি।
লেড়কিটির বাৎ খলিফার মধ্যে ক্রোধের সঞ্চার করে। তাকে প্রবােধ দিতে গিয়ে বললেন—‘ঘাবড়াও মাৎ। তােমাকে আলাদা এক প্রাসাদ গড়ে দিচ্ছি। সেখানে থাকবে। দাসীবাদীর ব্যবস্থাও থাকবে। আমার তরফ থেকে মােটা অর্থ পাবে মাসােহারা হিসাবে।
এদিকে গানা শুরু হতেই খােজাটির ঘুম ভেঙে যায়। ডরে জড়ােসড়াে হয়ে দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল।
খলিফা খােজাকে হুকুম করলেন,‘ছুট্টে গিয়ে আবু নসাব'কে তলব দে।
খলিফা-র মধ্যে যখনই কোন দুষ্টবুদ্ধি জাগে তখনই আবু নসাব’কে তলব করেন।
এদিকে খােজা গিয়ে নেশায় বুদ হয়ে পড়ে থাকা আবু নসাব'কে খলিফার কথা বলতে সে বলল—সবই তাে বুঝলাম। কিন্তু খলিফার দরবারে কি করে যাই বল তাে? আমার দেহটি যে এক লেড়কার কাছে বাঁধা দিয়ে রেখেছি। ও ছাড়লে তবেই না যেতে পারব।
–‘লেড়কা? বন্ধক? কই, লেড়কা টেড়কা কিছু তাে দেখছি নে সাহাব! শুনেছি জমিন, মাকান আর সমানপত্র বাঁধা দেওয়া যায় বটে। কিন্তু দেহ।
কবিবর আবু নসাব বুঝল, খোজা তার হেঁয়ালীটুকু ধরতে পারে নি। সে এবার মুচকি হেসে বলল— ‘বেটা, লেড়কাটির ওমর বহুৎ কম। গোঁফ-দাড়ি গজায় নি এখনও। দেখতে রােগা পটকা হলে কি হবে একেবারে লালটুস। তাকে এক হাজার দিরহাম দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার কাছে যে অর্থকড়ি কিছু নেই, আগে হুঁস ছিল না। তাই অর্থকড়ি না পেলে সে যে আমাকে ছাড়বে না খােজা সাহাব।
–‘ইনসাল্লা! তখন থেকে লেড়কা লেড়কা করছেন কবি সাহাব, কিন্তু কোথায় সে লেড়কা?'
এমন সময় খুবসুরৎ এক লেড়কা এসে দরওয়াজায় দাঁড়াল। আবু নসাব চোখের ভাষায় তাকে দেখিয়ে বলল-“ওই দেখ।
খােজা বাধ্য হয়ে একাই হাভেলীতে খলিফা-র কাছে ফিরে গেল। তাকে আবু নসাব-এর নেশায় বুদ হয়ে পড়ে থাকা আর লেড়কাটির এক হাজার দিরহামের সমাচার দিল।
ব্যাপারটি খলিফার মধ্যে কৌতুহলের উদ্রেক করল। তিনি হাজার দিরহাম খােজার হাতে দিয়ে বললেন-“যা, আবু নসাবকে খালাস করে নিয়ে আয় গে।'
আবু নসাব এবার নেশার ঘােরে টাল খেতে খেতে খলিফার কাছে হাজির হয়। খলিফা তাে তার নেশার বহর দেখে রেগে একেবারে কাই।
আবু নসাব খলিফা-র বাৎ না শুনি না শুনি করে বলল-ইয়া আল্লা! খুবসুরৎ লেড়কি জোগাড় করেছেন দেখছি জাহাপনা।
খলিফা মুচকি হেসে বললেন—“আবু নসাব, ভাবছি এবার তােমার উপযুক্ত একটি পদে তােমাকে বহাল করব। কবিতা টবিতা লেখা ছেড়ে ছুড়ে তুমি বাগদাদের জনানাদের দালালের সর্দারী করবে।'
ভয়-ডর কাকে বলে আবু নসাব-এর জানা নেই। অন্য সবাইকে তাে দূরের কথা খলিফাকেও দিল যা চায় মুখের ওপর ফটাফট শুনিয়ে দেয়। সে খলিফা-র কথার জবাব দিতে গিয়ে মুচকি হেসে বলে উঠল— জী, দালালীর দস্তুরী আজ থেকেই পাব তাে?
খলিফা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললেন- “কেন? আজ আবার দালালী কেন ?
‘বাঃ তাজ্জব ব্যাপার তাে! এমন খুবসুরৎ লেড়কিকে রাতভর ভােগ করলেন, আর আমার প্রাপ্য দালালী দেবেন না! খলিফার গােসসা পঞ্চমে চড়ল। কাঁপতে কাঁপতে তিনি খােজাকে হুকুম করলেন—“যা মাসরুর'কে তলব দে। আজ আমি এর গর্দান নিয়ে ছাড়ব। হতচ্ছাড়া বলে কী!' এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিস্সা বন্ধ করলেন।
দুশ নব্বইতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, খলিফার জরুরী তলব পেয়ে তার দেহরক্ষী মাসরুর উদভ্রান্তের মত ছুটে এসে কুর্নিশ করে আদেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল।।
খলিফা বঙ্গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন-“মাসরুর, ওই বজাতটিকে উলঙ্গ করে ফেল। সে অবস্থায় গাধার জিনের সঙ্গে বেধে তামাম বাগদাদ নগর চক্কর মারাতে হবে। তারপর সবার চোখের সামনে ওর গর্দান নেব।'
মাসরুর খলিফার হুকুম তামিল করল। কবি আবু নসাব’কে এনে দাঁড় করাল প্রাসাদের সদর-দরজায়। নগরবাসী কৌতুহল বশতঃ সেখানে জড়াে হল। উজির জাফর প্রাসাদের সদর দরজায় আদমির মেলা বসেছে দেখে ছুটে এল। শুনল, খলিফার হুকুমে কবি আবু নসাব-এর গর্দান নেওয়া হবে। তাই কৌতূহলী আদমির ভিড়।
উজির ভিড় ঠেলে আবু নসাব-এর কাছে যায়। উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলে—“কি ব্যাপার কবি?
আবু নসাব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জবাব দেয়—আর বলবেন না। উজির সাহাব—আমার কোন কসুর নেই। জব্বর এক কবিতা লিখে খলিফাকে এমন মাতিয়ে দিয়েছি যে তিনি একেবারে খুশিতে ডগমগ। ব্যস, আর দেরী নয়। তার গায়ের পােশাক আশাক খুলে আমাকে বকশিস দিয়ে দিলেন। কথা বলতে বলতে নিজের বিবস্ত্র দেহটিকে দেখাল।
আবু নসাব-এর বাৎ শুনে খলিফা তাে হেসে গড়াগড়ি যাবার জোগাড়। এবার খুশী হয়ে তাকে তিনি কেবল প্রাণদণ্ড থেকে অব্যাহতিই দিলেন তা-ই নয়। সত্যি সত্যি নিজের গায়ের বহুমূল্য পােশাক খুলে তাকে উপহার দিলেন। কিসসা শেষ হতেই বেগম শাহরাজাদ-এর ছােট বহিন দুনিয়াজাদ তার গলা জড়িয়ে ধরে আব্দারের সুরে বলল –বহিনজী, কী সুন্দর কিসসা তােমার!
বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর পিঠে হাত বােলাতে বােলাতে বললেন—সুন্দরী, এবার একটি রােমাঞ্চকর কিসসা শােনার জন্য আমার দিল ছটফট করছে।
বেগম শাহরাজাদ আঙুল দিয়ে বাদশাহের মাথায় বিলি কাটতে কাটতে বললেন—‘জাহাপনা, এবার সিন্দবাদ নাবিকের সমুদ্রযাত্রার কিসসা বলছি, আশা করি এতে আপনার দিল কানায় কানায় ভরে উঠবে।
সিন্দবাদ নাবিকের প্রথম সমুদ্রযাত্রার কিসসা
বেগম শাহরাজাদ নতুন কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, খলিফা হারুণ-অল-রসিদের রাজত্বকালে বাগদাদ নগরীতে এক কুলী বাস করত। সে খুবই দরিদ্র। বাজারে মােট বয়ে কোনরকমে সে দিন গুজরান করত। নাম তার সিন্দবাদ। কুলী সিন্দবাদ এক গ্রীষ্মের দুপুরে ইয়া বড় ও ভারী একটি গাট্টি নিয়ে পথ পাড়ি দিতে লাগল। মাথার ওপরে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মত সূর্যটি যেন তার সঙ্গে রেষারেষি করে তাপ বিকিরণ করছে। সিন্দবাদ ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে ধুকতে ধুকতে এক বণিকের বাড়ির সদর দরজায় হাজির হ’ল। গলা শুকিয়ে কাঠ। শরীর টলছে। পা দুটো যেন বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাইছে। মাথার গাট্টিটি নিয়ে তার পক্ষে আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হ’ল । বাড়িটির রােয়াকে ধপাস করে গাট্টিটি রেখে হাল্কা হ’ল। সিন্দবাদ যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। রােয়াকের ওপর বসে সে অনবরত হাঁপাতে লাগল। কিছু সময় ছায়ায় বসে বিশ্রামের মাধ্যমে ক্লান্তি কিছুটা অপনােদন করে সামান্য স্বাভাবিকতা ফিরে পেল। এক সময় সিন্দবাদ-এর নাকে গােলাপ পানির খুসবু বাতাসে ভেসে এসে লাগতে লাগল। ব্যাপার কি হঠাৎ করে বুঝতে পারল না। এদিক ওদিক তাকিয়ে সে খুসবুর উৎসস্থল নির্ণয়ের প্রয়াসী হ’ল। শেষ পর্যন্ত বুঝল, দুনিয়ার রূপ-রস-খুসবু তার জন্য নয়। গরীবের এসবের খোঁজ করার অর্থ পণ্ডশ্রম মাত্র। আমীর বাদশাহের মােটও তাকে বইতে হয়। কতই না খুবসুরৎ সামানপত্র তার মাথার গাট্টির মধ্যে। তাদের স্বাদ কি একটি দিনের জন্যও সে পেয়েছে? অবশ্যই তার নসীবে কেবল মজুরি স্বরূপ দু-চারটে দিরহাম ছাড়া আর কিছুই জোটে না। কলুর বলদের মত কত দামী দামী সব সামানপত্র সে বয়ে নিয়ে বেড়ায়, স্বাদ পায় না। যারা সে সব ভােগ করে তারা ভিন্ন সমাজের, ভিন্ন গােত্রের আদমি। দুনিয়ার আচ্ছা আচ্ছা সব সামানপত্রে তাদের একচেটিয়া অধিকার। আমীররা ভােগ করে, গরীবরা বয়ে নিয়ে তাদের মুখের সামনে তুলে ধরে। আজ? আজও সিন্দবাদ মাথায় করে সেসব সামানপত্রের গাট্টি ঘেমে নেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বয়ে নিয়ে চলেছে তার মধ্যে নির্ঘাৎ ধনীদের বিলাসের সামগ্রী রয়েছে। এসব ব্যবহারের মাধ্যমে কত সব আল্লাতাল্লার দোয়া লব্ধ ভাগ্যবানদের বিলাস ব্যসনের সামগ্রী রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
বুকের জমাটবাঁধা দুঃখ-হতাশাকে লাঘব করার জন্য কুলী সিন্দবাদ গানা ধরল।
ছায়ায় ঢাকা রােয়াকে ফুরফুরে বাতাস পেয়ে, খােশ মেজাজে কিছুক্ষণ গান গাওয়ার পর সিন্দবাদ-এর ক্লান্তি অনেকাংশে লাঘব হ’ল। সে একটু চাঙা হয়ে উঠল এবার। সিন্দবাদ ফিন গাট্টিটি তুলে নিয়ে আবার নতুন করে যাত্রার উদ্যোগ নিতেই দরওয়াজা খুলে এক বান্দা বেরিয়ে এল।
সিন্দবাদ বান্দাটির দিকে বিস্ময়মাখানাে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
বান্দাটি বেশ একটু মােলায়েম স্বরেই বলল —“আমার মালিক তােমাকে তলব করেছেন। চল, ভেতরে চল।
ব্যাপারটি সিন্দবাদ-এর মধ্যে কেবলমাত্র বিস্ময়ই নয়, যথেষ্ট ডরেরও সঞ্চার করে। সে ব্যাপারটিকে এড়িয়ে যাওয়ার ধান্দায় ধানাই পানাই শুরু করে দেয়। –“ভাইয়া, তােমার মনিব তলব করেছেন সে-তাে আমার পক্ষে রীতিমত নসীবের ব্যাপার। কিন্তু আমার সাধ অপরিমিত থাকলেও ভেতরে যাওয়া যে কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না ভাইয়া। আদতে আমার গাট্টিটি রেখে ভেতরে যাওয়া কি করে সম্ভব বল? পরের সামানপত্র কোথায় রেখে যাব, বল তাে ভাইয়া?
—“আরে ধুৎ, বাহানা রাখ তাে। তুমি ভেতরে গিয়ে আমার মালিকের সঙ্গে বাৎচিৎ সার। আমি তােমার সামানপত্র পাহারা দিচ্ছি। কথা বলতে বলতে বান্দাটি ছােট্ট করে এক ধাক্কা দিয়ে একরকম জোর করেই সিন্দবাদ’কে বাড়ির ভেতরে চালান দিয়ে দিল।
বান্দাটি এবার সদর-দরজার রক্ষীর জিম্মায় সিন্দবাদ-এর গাট্টিটি রেখে তার পিছন পিছন ভেতরে চলে গেল। বাড়ির ভেতরটি ছবির মত সাজানাে। একেবারে ঝকঝকে চকচকে। বান্দাটি সিন্দবাদকে বিশালায়তন সুদৃশ্য এক কামরায় নিয়ে গেল।
কামরার ভেতরে আদমির ভিড়। সিন্দবাদ একনজর দেখেই সমঝে নিল সবাই খানদানি পরিবারের আদমি। আমীর-ওমরাহটাহ হবে হয়ত।
গােলাপ পানির খুসবু এসে সিন্দবাদ-এর নাকে লাগতে লাগল। সুবিশাল টেবিলে ধবধবে সাদা মখমলের চাদর বিছানাে। তার ওপরে সারি সারি রুপাের রেকাবি। প্রত্যেকটিতে খানা সাজান। হরেক কিসিমের খানা। অজানা, অদেখা খানা। অনাস্বাদিত তাে বটেই। সে সঙ্গে কয়েকটি সরাবদানি ভর্তি দামী আঙুরের সরাব। রুপাের পেয়ালাও সাজানাে রয়েছে।
কামরার একধারে হরেক কিসিমের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে সুসজ্জিত বাদীরা বিচিত্র ভঙ্গিমায় বসে।
সিন্দবাদ চোখের তারায় বিস্ময়ের ছাপ এঁকে কামরার চারদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সব কিছু দেখতে লাগল। সে আপন মনে বলে উঠল –“ইয়া আল্লাহ! এ কোথায় এসে পড়লাম! এ-ই কি বেহেস্ত, নাকি দুনিয়ারই কোন অংশ? সবচেয়ে প্রবীণ আদমিটি সিন্দবাদ’কে হাতের ইশারা করে কাছে ডাকল। টেবিলে বসতে বলল । নােকরকে ডেকে তাকে খানা দিতে বলল ।
এক মাঝবয়সী নফর খানাভর্তি রেকাবি এনে সিন্দবাদ-এর সামনে রাখল। প্রবীণ আদমিটি বলল—“তুমি আগে খানাপিনা সার। তারপর বাৎচিৎ হবে।। সিন্দবাদ গােগ্রাসে উপাদেয় খানাগুলিকে উদরস্থ করল।
প্রবীণ আদমিটি এবার বলল —“বেটা তােমার কি নাম? মকান কোথায়? পেশা কি?
—‘আমার নাম সিন্দবাদ। কুলী। মােট বয়ে রুটির বন্দোবস্ত করি।' প্রবীণ এবার শিশুর মত হাে হাে করে হেসে বলল-“আরে ভাইয়া, কী তাজ্জব বাৎ! তােমার আর আমার নাম যে একই! আমার নামও তাে সিন্দবাদ। তুমি সিন্দবাদ কুলী। আর আমি সিন্দবাদ নাবিক। ব্যস, ফারাক এটুকুই।
সিন্দবাদ কুলী নীরবে ম্লান হাসল।
প্রবীণ আদমিটি বলল—‘সিন্দবাদ ভাইয়া, আমাদের কিছু গানা শােনাতে হয় যে। নাও, ঝুটমুট দেরী কোরাে না, শুরু করে দাও।
গানার কথায় সিন্দবাদ কুলী যেন সবে আসমান থেকে পড়ল। তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল—‘সাহাব, আমার গানা তাে দুঃখ-শােকের। আপনাদের মত আমীরদের আমার মামুলি গানা পছন্দ হবে? মন পছন্দ না হলে কিন্তু আমার ওপর ফিন গােসসা করবেন না যেন।
‘গােসসা করার কি আছে ভাইয়া? তুমি তাে আমার ছােট ভাইয়ার সামিল। একটু আগে দিল উজাড় করে গাইছিলে, সেটি ফিন গাও। সিন্দবাদ কুলী একটু আগে গাওয়া গানগুলি এক এক করে গেয়ে শােনাল। গান শুনে প্রবীণ সিন্দবাদ নাবিক তাে খুশীতে একেবারে ডগমগ। সিন্দবাদ নাবিক এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—“ভাইয়া, আমার নসীবও বড়ই বিচিত্র। বার বার ওঠা-নামা আশা-হতাশার মধ্য দিয়ে দিন গুজরান করে শেষমেষ এ-জায়গায় এসে পৌছেছি।”
একটু দম নিয়ে প্রবীণ সিন্দবাদ নাবিক এবার বলল—‘শােন ভাইয়া, আমার এই যে অগাধ বিত্ত সম্পদ আর প্রাচুর্য দেখতে পাচ্ছ, সব আমারই নিরবচ্ছিন্ন কষ্টের মধ্য দিয়ে অর্জিত। জিন্দেগীভর আমি যেভাবে লড়াই করে এসব করেছি সবই তােমার কাছে বলব। কিছু গােপন না করে। আমার জিন্দেগীতে যা কিছু ঘটেছে সবই তােমার কাছে ব্যক্ত করব।
ভাইয়া, গােড়াতেই বলে রাখছি, আমি সাত-সাতবার সমুদ্রযাত্রা করেছি। কত দুর্ভাগ্য আর দুঃসাহসিকতা যে আমার সমুদ্র যাত্রার কাহিনীর সাথে জড়িয়ে রয়েছে তা শুনলে কেবলমাত্র তুমিই নও, যে শুনবে তারই বুকে বিস্ময় দানা বাঁধবে। ভাইয়া, আমার সমুদ্রযাত্রার সে সব বিস্ময়কর কাহিনীর কথা! তােমাকে এক এক করে সবই বলব। | প্রবীণ সিন্দবাদ নাবিক এবার উপস্থিত মেহমানদের উদ্দেশ্যে বলল—‘আমার আব্বা ছিলেন একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠিত সওদাগর। দু’হাতে দিনার কামিয়েছেন। গরীবদের প্রতি তার দরদ ছিল অতুলনীয়। তাদের জন্য গাঁটের কড়ি ব্যয় করতেও কুণ্ঠিত হতেন না ।
আমার আব্বা গােরে যাবার সময় আমার জন্য দিনারের পাহাড় জমিয়ে রেখে গিয়েছিলেন। বিরাট মকান, জমি জিরাত আর নগদ অর্থ মিলে তিনি আমার জন্য যা রেখে দিয়ে গিয়েছিলেন তা চৌদ্দ পুরুষ ধরে পায়ের ওপর পা তুলে খেলেও শেষ হবার নয়।।
আব্বার মৃত্যুকালে আমার উমর ছিল খুবই কম, নাবালক। আমাকে এবং আমার বিষয়-সম্পত্তি দেখভাল করার জন্য আমার এক আত্মীয় উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে এগিয়ে এলেন। স্বেচ্ছায় আমার সার্বিক দায়িত্বভার ঘাড়ে তুলে নিলেন।
আমি সাবালক হলে আমার আব্বার রেখে যাওয়া বিষয় আশয় আমার নিজের হাতে তুলে দিলেন হিতাকাঙক্ষী সে নিকট আত্মীয়টি। একে উমর কম। তারওপর অগাধ বিষয় আশয় হাতে

0 Comments