সহস্র এক আরব্য রজনী ৭৭ (Part 77 ) Alif laila bangla

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ আবার কিসসা শুরু করলেন—জাঁহাপনা, হাফিজা তার বক্তব্য অব্যাহত রাখল। সে এবার বলল-রুজুর সময় পানি দিয়ে সর্বাঙ্গ ধৌত করে নেওয়া উচিত। মােদ্দা কথা, দৃশ্য ও অদৃশ্য যত চুল দেহে আছে সবই যেন পানিতে ভেজে, এমন কি যৌন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও যেন ভালভাবে পানি দিয়ে ধৌত হয়। এসব ধৌত হওয়ার পর তবে পা ধৌত করতে হয়।'

-রােজা সম্বন্ধে তােমার ধারণা কি ?
--রােজা পালন করা হয় রমজান মাসে। তখন হররােজ সূর্যাস্তের আগে আহারাদি, পান এবং মৈথুন করা নিষেধ। যতদিন নতুন চাদ দৃশ্য না হবে ততদিন এ-উপবাস পালন করার বিধান রয়েছে। একমাত্র কোরাণ পাঠ, অর্থাৎ কোরাণ ব্যতীত অন্য কোন কিতাব পাঠ থেকে বিরত থাকতে পারলে খুবই ভাল হয়।
---“ইসলাম শাস্ত্র বলেছে কোন কোন বস্তু রােজাকে কলুষিত করে না—কি কি?'
–“শিরে তেল মালিশ, শুর্মা, কাজল প্রভৃতির ব্যবহার, রাস্তার ধূলােবালি, দিনে অথবা রাত্রে বীর্যপাত। থুথু গিলে ফেলা, খুনঝরা, সম্ভোগ এবং অমুসলমান জনানার প্রতি নজর দেয়া—এদের দ্বারা রােজা কলুষিত হয় না। কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় এতে রােজা কলুষিত হয়।
–“পবিত্র তীর্থযাত্রা সম্বন্ধে তােমার মুখ থেকে কিছু শুনতে চাই বেটি।
‘প্রত্যেক সাচ্চা মুসলমানকে তামাম জিন্দেগীতে অন্ততঃ একবার মক্কায় তীর্থ করতে যাওয়া উচিত। তবে তীর্থে যাওয়ার আগে কতগুলাে নির্দেশ অবশ্য পালনীয়— (ক) মস্তক মুণ্ডন করা, (খ) দরবেশের পােশাকাদি পরিধান করা, (গ) নখ কাটা, (ঘ) জনানাদের সঙ্গে ব্যবহারিক বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং (ঙ) মুখাবয়ব আবৃত রেখে চলাফেরা করা। তবে হ্যা, এর সঙ্গে আরও কিছু বিধি নিষেধ সুন্নী সম্প্রদায় পালন করে থাকে।
-আত্মিক পলায়ন বিষয়ে কিছু বাতাতে পার ?
—“অবশ্যই। আত্মিক পলায়ন বলতে বুঝায় জনানা থেকে দূরে থাকা, উদবাসন আর মৌনব্রত পালন করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন পবিত্র মসজিদে অবস্থান করা। তবে ধর্ম একথা স্বীকার করে না।
–‘বেটি, এবার বল তাে পবিত্র ধর্মযুদ্ধ বলতে কি বুঝায় ?
-ইসলাম যদি কোনভাবে বিধর্মীর দ্বারা বিপন্ন হয় তবে তার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘােষণা করা হয়ে থাকে। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে ধর্মযুদ্ধে আক্রমণ করার নির্দেশ নেই। আত্মরক্ষাই এর একমাত্র উদ্দেশ্য। যে সাচ্চা মুসলমান হবে সে অস্ত্রহাতে এগিয়ে যাবে, ভুলেও পলায়নের কোশিস করবে না।
-এবার বল তাে‘রােজা'র আক্ষরিক অর্থ কি? আর দানের অর্থ?’
–‘বিরত থাকা। দানের অর্থ হচ্ছে নিজেকে সমৃদ্ধ করে তােলা।
—বহুৎ আচ্ছা, এবার বল তাে যুদ্ধ বলতে কি বুঝায় ? -“আত্মরক্ষার জন্য প্রতিরােধে ব্ৰতী হওয়া। ‘বেটি, রুজু করার অর্থ কি, বল তাে? -ভেতরের ও বাইরের মলিনতাকে ধৌত করে নেয়া।
-বহুৎ আচ্ছা। বহুৎ আচ্ছা। এবার বৃদ্ধ হেকিম সােল্লাসে বলল –‘জাহাপনা, এ-লেড়কির কোরাণ বিষয়ের জ্ঞান আমাকে যারপরনাই মুগ্ধ করে দিয়েছে। এর পাণ্ডিত্যের প্রতি আমি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছি। হাফিজা ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল—“আপনি তাে আমাকে হরেক কথাই জিজ্ঞাসা করলেন। এবার যদি অনুমতি দেন তবে একটি প্রশ্ন আপনাকে করতে চাচ্ছি।
—“জরুর।—জরুর প্রশ্ন করতে পার বেটি।
‘মেহেরবানি করে আমাকে সমঝয়ে দিন, ইসলামের বনিয়াদ বলতে আমরা কি সমঝাব?’
–‘শােন বেটি, ইসলাম ধর্ম মূল চারটি বনিয়াদের ওপর খাড়া আছে। যেমন ধর —(ক) ধর্মের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। আর এটি জ্ঞানগর্ভ যুক্তির মাধ্যমে প্রতিভাত হয়। (খ) কর্তব্যবােধ, বিচক্ষণতা ও ন্যায়পরায়ণতা। (গ) সাধুতা এবং (ঘ) যাবতীয় অঙ্গীকার পালন করা।
‘যদি অনুমতি করেন তবে আপনার কাছে আর একটি প্রশ্ন রাখার ইচ্ছা রয়েছে। আমি এখন যে-প্রশ্নটি উত্থাপন করব তার যথাযথ উত্তর দান যদি করতে না পারেন তবে আপনার শিরােপার অধিকারী কিন্তু আমাকে করতে হবে। রাজী তাে? আমার এবারের প্রশ্নটি হচ্ছে বলুন তাে ইসলাম ধর্মের শাখা কয়টি?
বৃদ্ধ কোরাণ বিশারদ প্রশ্নটি শােনার পরই আচমকা ফুটো বেলুনের মত একেবারে চিপসে গেল। ফ্যাকাশে মুখে অসহায়তার ছাপ ফুটিয়ে তুলে নীরবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। খলিফা বৃদ্ধের অক্ষমতার কথা বুঝতে পেরে বললেন-“হে শাস্ত্রজ্ঞ নারী, তুমিই আমাদের ইসলাম ধর্মের এ নিগুঢ় তথ্যের কথা শােনাও। যদি আমাদের খােলসা করে সমঝয়ে দিতে পার তবে কোরাণ বিশারদের শিরােপার অধিকারী অবশ্যই তুমি হচ্ছ।
হাফিজা এবার যথােচিত বিনম্র-বিনয়ের সঙ্গে নিজের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলল—জাহাপনা, বলছি, তবে ধৈর্য ধরে শুনুন ইসলাম ধর্ম মােট কুড়িটি শাখায় বিভক্ত। মহামান্য খলিফা যদি প্রতিটি শাখার নাম ও বিশদ বিবরণ শুনতে আগ্রহী হন তবে আপনার সময়-সুযােগ মত আমি আলােচনা করব প্রতিশ্রুতি দান করছি।
খলিফা উল্লসিত হয়ে বললেন—বহুৎ আচ্ছা। বহুৎ আচ্ছা! এবার কোরাণ বিশারদকে তার শিরােপা খুলে হাফিজাকে দান করার কুম দিলেন। কোরাণ বিশারদ নিজের প্রতিশ্রুতি ও খলিফার হুকুম তামিল করতে গিয়ে বিষমুখে হলেও নিজের শিরােপা খুলে হাফিজার সামনে ধরল। এবার অবনত মস্তকে সভাকক্ষ ত্যাগ করল।
খলিফার হুকুম নিয়ে অন্য আর এক বিশারদ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। হাফিজা’কে লক্ষ্য করে বলে, আহার্য গ্রহণ করতে গিয়ে আমাদের কোন্ কোন্ নিয়মকানুন পালন করা উচিত?
—জী, খানাপিনা শুরু করার পূর্ব মুহুর্তে পানি দিয়ে হাত-মুখ ভাল করে ধুয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হয়। খানাপিনা সারার সময় বাঁ-দিকে হেলে বসা চাই। খানাপিনা গ্রহণ করার সময় বাঁদিকে সামান্য কাৎ হয়ে বসা বিধেয়। আর কেবলমাত্র বৃদ্ধাঙ্গুলি, মধ্যমা এবং তর্জনী ব্যবহার করে খানা মুখে তুলতে হয়। খানা গ্রহণ করার সময় অন্য কারাে দিকে দৃষ্টিপাত করতে নেই। কারণ, এতে মনে হতে পারে তার খানার ব্যাপারে হয়ত কেউ কিছু ভাবছে। ফলে ক্ষুধা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
‘এবার বল তাে ‘অল্প একটু’, ‘অর্ধেক’ এবং ‘তুচ্ছাতি তুচ্ছ’ বলতে কি বুঝায়?
–‘অল্প একটু বলতে ‘ধর্মাত্মা’, অর্ধেক বলতে ‘ভণ্ড সাধক আর তুচ্ছাতি তুচ্ছ বলতে ‘বিধর্মীকে বুঝায়। বহুৎ আচ্ছা! কোথায় বিশ্বাসের সন্ধান মিলতে পারে, বল তাে?
—“বিশ্বাস মােট চারটি জায়গায় অবস্থান করে। জায়গা চারটি। হচ্ছে—(ক) মস্তক, (খ) হৃদয়, (গ) জিহ্বা ও (ঘ) ধর্মানুসারী।
-এবার আমাকে সমঝয়ে দাও হৃদয় কয় প্রকার ও কি কি ?
—“অগণিত। তবে যারা সাচ্চা মুসলমান তাদের হৃদয় সর্বদা পবিত্রতা রক্ষা করে চলে আর বিধর্মীদের হৃদয় পবিত্রতা রক্ষার জন্য ভাবিত নয়। ইতিমধ্যে প্রভাতের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
               দু’শ’ ছিয়াত্তরতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলে বেগম কিসসা শুরু করলেন—জাহাপনা, বিশেষজ্ঞের প্রশ্নের সুচিন্তিত ও নির্ভুল জবাব দিয়ে হাফিজা তার হর্ষ উৎপাদন করতে লাগল। সে সােল্লাসে বলে উঠল—‘বেটি, তােমার শাস্ত্র বিষয়ে জ্ঞানের পরিচয় পেয়ে আমি যথার্থই মুগ্ধ। এমন অমিত জ্ঞান আমি অন্ততঃ কারাে মধ্যে আজ পর্যন্ত পাই নি।
হাফিজা এবার বিনম্র-বিনয়ে শাস্ত্রজ্ঞকে বলল —এবার আমি আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে উৎসাহী, তবে শর্ত থাকবে আমার প্রশ্নের যথাযথ জবাব দিতে ও অক্ষম হলে আপনার শিরােপাও আমার প্রাপ্য হবে। এবার বলুন তাে, ধর্মীয় কোন্ কর্তব্য সর্বাগ্রে পালন করা বিধেয় ?
বিশেষজ্ঞ মুখ চুণ করে অসহায় দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইল। খলিফার নির্দেশে সে নিজের শিরােপা খুলে হাফিজার হাতে তুলে দিল। হাফিজা এবার নিজের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে খলিফার দিকে তাকিয়ে বলল —“জাহাপনা, সর্বাগ্রে যে-কর্তব্য পালন করতে হয় তা হচ্ছে—ধর্মীয় কর্তব্যগুলাের মধ্যে সর্বাগ্রে ‘রুজু কর্তব্য পালন করা বিধেয়। এর মাধ্যমে দেহ-মনে শুদ্ধি আনয়ন করা সম্ভব।
উপস্থিত সবাই নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিল, হাফিজাই সমসাময়িক কালের সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্ত্রজ্ঞ।
এবার অন্য এক শাস্ত্রজ্ঞ সদম্ভে হাফিজার কাছে প্রশ্ন রাখল -বেটি, আমরা সবাই তাে একবাক্যে তােমার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিলাম। এবার কোরাণ সম্বন্ধে আমরা তােমার মুখ থেকে কিছু নিগূঢ় তথ্য শুনতে আগ্রহী।
হাফিজা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। খলিফা ও উপস্থিত শাস্ত্রজ্ঞদের যথােচিত সম্ভাষণ করে বলল-কোরাণ সম্বন্ধে আলােকপাত করতে গিয়ে সর্বাগ্রে বলতে হয়—কোরাণ এক শ’ চোদ্দটি অধ্যায়ে বিভক্ত। তাদের মধ্যে সত্তরটি রচিত হয়েছে মক্কায়। অবশিষ্ট চুয়াল্লিশটি রচিত হয়েছে মদিনায়। সত্তরটি অধ্যায় আবার দু’ শ’ একুশটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত। এদের প্রত্যেক দশক নামে চিহ্নিত। আর কোরাণে মােট ছ’ হাজার দু’ শ’ ছত্রিশটি স্তবক বর্তমান। আর শব্দ সংখ্যা সর্বমােট উন-আশি হাজার চারশ’ উনচল্লিশটি। অক্ষর সংখ্যা সর্বমােট তিন লক্ষ তেইশ হাজার দু’শ’ সত্তরটি। শাস্ত্রজ্ঞ এবার হাফিজার কাছে পয়গম্বরদের সংখ্যা ও তাদের নাম জানতে চাইল।
তার জিজ্ঞাসা নিরসন করতে গিয়ে বলল –শুনুন, আমাদের মােট পঁচিশজন পয়গম্বর ছিলেন। তাদের নামও কি শুনতে চাইছেন?
—“জরুর। কি তাদের নাম, বলতে শুনি?
‘পয়গম্বরদের মধ্যে সর্বাগ্রে আদম-এর নাম করতে হয়। তারপর যথাক্রমে নাম করতে হয়—নােয়াহ, ইসমাইল, আইজ্যাক, জ্যাকব, যােসেফ, ইলিসা, জোনাহ, লাভ, সালিহ, হুদ, সােয়াইব, ডেভিড, সলােমন, ধুল, কাফ্ল, ইদ্রিস, ইলিয়াস, ইয়াহিয়া, জ্যাকারিয়া, জোব, মােসেস, আরুন, জেসাস ও মহম্মদ।
‘বহুৎ আচ্ছা! এবার বল তাে পয়গম্বর বিধর্মীর বিচার কিভাবে করে থাকেন?
—‘পয়গম্বর বলেছেন, ইহুদীদের বক্তব্য খ্রীস্টানরা ভ্রান্ত পথে গমন করে। আবার ইহুদীরা ভ্রান্ত মত পােষণ করেন খ্রীস্টানদের সন্বন্ধে। সত্য বলতে গেলে তাদের উভয়ের বক্তব্যই নির্ভুল।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
               দু’ শ’ আটাত্তরতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ আবার কিসসা শুরু করলেন—“জাঁহাপনা হাফিজা এবার বলল —আমি এবার একটি প্রশ্ন মহাপণ্ডিত ও শাস্ত্ৰজ্ঞের কাছে করতে চাইছি। মেহেরবানি করে। বলুন তাে কোরাণের কোন্ স্তবকে কাফ অক্ষরটি তেইশবার ব্যবহার করা হয়েছে, মিম ষোল বার এবং অন্য একটি অক্ষর চল্লিশবার ব্যবহার করা হয়েছে?’  
এ-শাস্ত্রজ্ঞটিও অন্যান্যদের মতই আনত মস্তকে দাঁড়িয়ে রইল। ফলে খলিফার নির্দেশে তাকেও শিরােপা খুলে হাফিজার হাতে তুলে দিতে হল। খলিফা এবার সাড়ম্বরে ঘােষণা করলেন—‘আমার তামাম সুলতানিয়তে হাফিজা-ই সর্বশ্রেষ্ঠা শাস্ত্রজ্ঞা। খলিফা খুশী হয়ে হাফিজাকে ইনামস্বরূপ দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করলেন। এবার খলিফা হাফিজাকে জিজ্ঞাসা করলেন—‘মন খােলসা করে বল তাে হাফিজা, তুমি কি আমার হারেমে যেতে ইচ্ছুক? সেখানে বাদশাহী মর্যাদা পাবে। আর যদি দিল চায় তবে এ-যুবকের সঙ্গেও বাস করতে পার, ভেবে দেখ।
‘খােদা মেহেরবান, আমি যেখান থেকে এসেছি, সেখানেই ফিন ফিরে যেতে আগ্রহী।
–‘বহুৎ আচ্ছা! আমি খুশী হয়ে আরও পাঁচ শ’ সােনার দিনার ইনাম দিচ্ছি। আমি তােমার মহব্বতের মূল্যবােধে খুশী হয়েছি। আমার হারেমে সুখ বিলাসের চেয়েও তােমার কাছে মহব্বতের মুল্য যে ঢের বেশী তা জেনে আমি যারপরনাই মুগ্ধ। তােমার মেহবুবা আবু অল-হুসনকে আমি আমার দরবারে উচ্চ পদ দান করলাম । 
এবার হাফিজা সদ্যপ্রাপ্ত শিরােপা ও সােনার মােহরগুলাে নিয়ে আবু হুসন-এর সঙ্গে সভাকক্ষ ছেড়ে গেল।
সভাস্থ সবাই একবাক্যে স্বীকার করে নিল তামাম দুনিয়ায় আব্বাস-এর বংশধরের এ কাজ বাস্তবিকই অতুলনীয়।
বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর মুখ থেকে কিসসার নায়িকা হাফিজার অগাধ শাস্ত্রজ্ঞান ও উপস্থিত বুদ্ধির কথা শুনে সােল্লাসে বলে উঠলেন—তােফা-তােফা! আবার খলিফার কীর্তিকথাও অনন্য, শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়।'
বেগম শাহরাজাদ এবার বললেন—জাহাপনা, এবার আবু নসাব-এর অনন্য কীর্তির কথা আপনার দরবারে পেশ করছি।”
            আবু নসাবের অনন্য কীর্তিকথা 
আবু নসাব-এর কিসসা শুরু করতে গিয়ে বেগম শাহরাজাদ বললেন- “জাঁহাপনা, একরাত্রে খলিফা বিনিদ্র রাত্রি গুজরান করছিলেন। রাত্রি গভীর থেকে ক্রমে গভীরতর হয়ে এল। কিন্তু ঘুম আসা তাে দূরের কথা, কিছুতেই দু চোখের পাতা এক করতে পারছিলেন না।
অনন্যোপায় হয়ে অস্থিরচিত্ত খলিফা পালঙ্ক থেকে নেমে পড়লেন। কামরা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। একাই হাঁটতে হাঁটতে প্রাসাদ ছেড়ে বাগিচার দিকে হাঁটতে লাগলেন।
বাগিচায় পৌছে দেখলেন বাগিচার অদূরবর্তী তার হাবেলীর জানলা দিয়ে আলাে দেখা যাচ্ছে। কৌতূহল হল।
খলিফা কৌতূহলী মন নিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন। হাবেলীর দরওয়াজা খােলা। খােজা প্রহরী দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমে অচৈতন্য। অতি সন্তর্পণে পা টিপে টিপে ঘুমন্ত খােজা প্রহরীটিকে ডিঙিয়ে তিনি কামরার ভেতরে ঢুকে গেলেন।
কামরায় পা দিয়েই খলিফা থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তার চোখে পড়ল পালঙ্কের মাথার দিকে একটি ছােট্ট জলচৌকির ওপর সরাবের পাত্র। পাশে মনলােভা পেয়ালা।
খলিফার কৌতুহল চরমে উঠল। তিনি দু’পা এগিয়ে পালঙ্কের গা-ঘেঁষে দাঁড়ালেন। পালঙ্কের পর্দা তুলতেই সচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সর্বাঙ্গে এক অবাঞ্ছিত শিহরণ অনুভব করলেন। 
কি দেখলেন তিনি যার জন্য এমন করে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়লেন তিনি? 
দেখলেন—যেন এক বেহেস্তের হুরী পালঙ্কের ওপর শরীর এলিয়ে দিয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। অনন্যা।
হারুণ-অল রসিদ আগের মত সন্তর্পণেই পিছিয়ে এলেন। সরাবের পাত্র ও পেয়ালা হাতে তুলে নিলেন। সরাব ঢেলে পেয়ালা পূর্ণ করলেন। খুবসুরৎ লেড়কিটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই তিনি সরাবের পেয়ালাটি ঠোটের কাছে তুলে নিলেন। ধীরে ধীর সবটুকু সরাব গলায় ঢেলে দিলেন। একটিমাত্র ভাবনাই তার শিরে বার বার চক্কর মারতে লাগল—কে এ বেহস্তের হুরী--খুবসুরৎ লেড়কি ? কে এখানে একে আনল? কোখেকেই বা আনল?
খলিফা কৌতূহলের শিকার হয়ে ফিন পালঙ্কের কাছে এগিয়ে গেলেন। আলতাে করে লেড়কিটির কপালে হাত রাখলেন। আধফোটা পদ্মের মত চোখ দুটো মেলে তাকাল। কেবল মুহূর্তের জন্য। প্রথম দর্শনেই খলিফাকে চিনতে পারল। হুড়মুড় করে উঠে বসল। চোখে-মুখে তার জমাটবাঁধা আতঙ্কের ছাপ। ডরে তিরতির করে কাপতে লাগল। কোনরকমে পােশাক আশাক একটু সামলে নিয়ে বেনিয়ার পুটুলির মত ডরে জড়ােসড়াে হয়ে পালঙ্কের একপাশে বসে রইল। খলিফা কামরার কোণে দাঁড় করানাে একটি তানপুরা দেখতে পেয়ে কৌতূহলাপন্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—“তুমি কি গানা গাইতে পার?
‘পারি। পারি জাহাপনা।
–তােমার পরিচয় জানার জন্য আমার দিল্ কৌতূহলে ভরপুর হলেও এখন আর সে কথা তুলে সময় নষ্ট করতে চাই না। এখন তােমার সুরেলা কণ্ঠের একটি গান শােনাও সুন্দরী।
খুবসুরৎ লেড়কিটি গানা ধরল। গানা নয় তাে যেন তার কণ্ঠ দিয়ে মধু ঝরতে লাগল। তন্ময় হয়ে খলিফা তার গান শুনতে লাগল। একের পর এক একুশটি রাগরাগিনী গেয়ে শােনাল।

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments