গল্পের পরবর্তী অংশঃ
উড়ন্ত শয্যা সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিয়ে শূন্যে ভাসল বিদ্যুৎবেগে উড়ে চলে এল আলেকজান্দ্রিয়ায়। | আবু সামাত উড়ন্ত শয্যা থেকে নেমেই সামনে বাগদাদের সে বৃদ্ধ হাবিলদারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেল।
হাবিলদার তাকে আলিঙ্গন করে বলল-বেটা, আসলি চোর ধরা পড়ে গেছে। বিচারে তার ফাসি হয়েছে।'
বৃদ্ধ হাবিলদার এবার তার কাছে এক এক করে সব ঘটনা খােলসা করে বলল । রাজকুমারী এবার উড়ন্ত শয্যায় আৰু সামাত এবং হাবিলদারকে তুলে নিল। উড়ন্ত শয্যাটি এবার তেমনি বিদ্যুতের বেগে উড়ে কায়রাে নগরে বণিক সামস অল-দিন-এর বাড়ির দরওয়াজায় গিয়ে নামল।
আবু সামাত-এর আম্মা দরওয়াজা খুলেই চমকে যায় । লেড়কাকে সামনে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে বুকে জড়িয়ে ধরে।
তিনদিন বিশ্রাম করে আবু সামাত তার আব্বা আর আম্মাকে নিয়ে, মােট পাঁচজন উড়ন্ত শয্যায় উঠে বসল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি বাগদাদে খলিফা-র প্রাসাদের সামনে এসে থামল।
আবু সামাতকে কাছে পেয়ে খলিফা যেন আশমানের চাঁদ হাতে পেলেন। খুশীতে একেবারে ডগমগ। তিনি সামস অল-দিন, আবু সামাত এবং তার বেটা আসলানকে তার সুলতানিয়তের উচ্চ পদে নিযুক্ত করলেন। সবাই খুশী।
আবু সামাত পাত্তা লাগিয়ে জানতে পারল নসীবের পরিবর্তনের সবের মূলে মাহমুদ গােপনে কাজ করে চলেছে। সে তাকে কাছে ডাকল। খলিফাকে বলে তাকেও উচ্চপদে নিযুক্ত করার বন্দোবস্ত করল। আবু সামাত এবার থেকে তার তিন বিবি জুবেদা, যুঁই ও মরিয়াম এবং একমাত্র লেড়কা আসলান’কে নিয়ে সুখে ঘর-সংসার করতে লাগল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা শেষ করে কিছু সময়ের জন্য নীরব হলেন।
দুনিয়াজাদ তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল—‘বহিনজী, এবার এরকমই আর একটি বহুৎ আচ্ছা কিসসা শােনাও।
বেগম শাহরাজাদ জানলা দিয়ে প্রাসাদ সংলগ্ন উদ্যানের দিকে মুহুর্তের জন্য দৃষ্টি ফেরালেন। বুঝলেন ভাের হতে বেশি দেরী নেই। তিনি এবার তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকা বাদশাহ শারিয়ার-এর চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললেন—‘জাহাপনা, ভাের হয়ে এল বলে। আজ আর নতুন কিসসা শুরু করার সময় নেই। কাল আপনাকে আবু নসাব-এর কিসসা শােনাব। ভাের হ’ল। বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহল ত্যাগ করলেন।
আবু ন সাবের কিস্সা
দুশ’ সত্তরতম রজনী
গভীররাত্রে কিসসা শুরু করতে গিয়ে বেগম শাহরাজাদ বললেন—জাহাপনা এবার আপনাকে শোনাচ্ছি খলিফা হারুণ অল-রসিদ-এর সভাকবি আবু নসাব-এর কিসসা। আর জাহাপনা আমি এখন যা কিছু বলব সবই তার অভিজ্ঞতার কিস্সা। আবু নসাব খলিফার সভাকবি হিসেবে বহুৎ যশ অর্জন করেছিল। কিন্তু এ-গুণের পাশাপাশি তার চারিত্রিক দোষে তাকে অপযশও কম কুড়ােতে হয় নি। আদতে সে ছিল একজন দুশ্চরিত্র শয়তান গােছের আদমি।।
বাদশাহ শারিয়ার বেগমকে চুম্বন করে বললেন—কিসসা শুরু করার আগেই যে আসর জমিয়ে দিলে! বহুৎ আচ্ছা! লেকিন বেগম-সাহেবা, আজ সকাল থেকেই দিলটি কেমন ভারী ভারী লাগছে। দিল চাইছে কিছু উপদেশ ও জ্ঞানলাভ করা যায় এ কিসিমের কিসসা শুনতে।
—“জাঁহাপনা, আমি এরকম কিসসাই আজকের জন্য বেছে রেখেছি।'
—'বহুৎ আচ্ছা বেগম সাহেবা! বহুৎ আচ্ছা! তবে তােমার কিসসা শুরু কর।
বেগম শাহরাজাদ বাদশাহ শারিয়ার-এর চুলে আঙুল দিয়ে বিলিকাটা অব্যাহত রেখে এবার বললেন—“জাঁহাপনা, কোন এক কালে বাগদাদ নগরে এক বণিক বাস করত। খুবই প্রতিষ্ঠিত অগাধ ধনদৌলতের মালিক। তার কোন কিছুরই অভাব ছিল না। কিন্তু এতকিছু থাকলেও তার দিলে এক তিলও শান্তি ছিল না। সব পেয়েও না পাওয়ার বেদনা তার কলিজাটিকে সর্বদা কুঁরে কুঁরে খেত। এত বিষয় সম্পত্তি থাকতেও কারাে দিলে জমাটবাঁধা নিরবচ্ছিন্ন দুঃখ-হতাশা থাকতে পারে এ যে একেবারেই অভাবনীয় ব্যাপার। তবু বণিকের দিলে যে শান্তি ছিল না, মিথ্যা নয়। তার অশান্তির একমাত্র কারণ সে ছিল নিঃসন্তান। বালবাচ্চা কিছু ছিল না। একটিমাত্র লেড়কার জন্য তার দিল হরবখত উদাস-ব্যাকুল থাকত।
বণিকের শির ক্রমে সফেদ হতে শুরু করেছে। দাঁতও দু’-একটি নড়বড়ে। সূর্য পাটে বসতে শুরু করেছে। কিন্তু হায়! আজও বালবাচ্চা কিছু হ’ল না। বণিক তার অপূর্ণ সাধ পূর্ণ করতে কোশিসও কম করে নি। একের পর এক বিবি আমদানি করেছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। একদিন বণিকের প্রায় বেড়ানাে মুখে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল। তার ছােট-বিবি অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে। যথা সময়ে সে টুকটুকে এক লেড়কা পয়দা করল। বণিক আলাতায়াকে দু' হাত তুলে সুকরিয়া জানাল।
বণিক আর তার ছােট-বিবি বহুৎ চিন্তা ভাবনা বাছাবাছির পর সদ্যোজাত লেড়কার নামকরণ করল আবু অল-হুসন।
বণিক লেড়কাকে সর্ববিদ্যায় বিশারদ করার জন্য নামকরা এক মৌলভী রেখে দিল। পড়ালিখার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধনুর্বিদ্যায়ও তালিম দেওয়া হতে লাগল। অল্পদিনের মধ্যেই সে বাগদাদ নগরের সেরা ধনুর্বিদরূপে চিহ্নিত হয়ে গেল। একদম অব্যর্থ তার লক্ষ্য। কেবল গুণের বিচারেই নয়। সুরতের বিচারেও মহল্লায় তার সমকক্ষ কেউ ছিল না।
বৃদ্ধ বণিক যেন নয়া জিন্দেগী ফিরে পেয়েছে। লেড়কাকে নিয়ে দিনভর খুশীতে মজে থাকে।
কিছুদিন যেতে না যেতেই বৃদ্ধ বণিকের দিলে এক নতুনতর হতাশার সঞ্চার হ’ল। হরবখত গালে হাত দিয়ে বসে ভাবে, তার তাে গােরে যাবার সময় ঘনিয়ে এসেছে। স্থাবর-অস্থাবর যা কিছু আছে সব কিছু বিলকুল ছেড়েছুঁড়ে বেহেস্তে চলে যেতে হবে। বৃদ্ধ বণিক এক বিকালে লেড়কা আবু হুসন’কে তলব করল। পাশে বসাল। তার গায়ে-মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল-“বেটা, আমার দিন ফুরিয়ে এসেছে। এখন শুধুমাত্র আল্লাল্লার তলবের অপেক্ষায় আছি। তােমার জন্য বিষয় সম্পত্তি যা রেখে যাচ্ছি তা সাত পুরুষ পায়ের ওপর পা তুলে খেলেও ফুরবার নয়। এদিক থেকে আমার আপসােসের কিছু নেই। তবে তােমার কাছে আমার একটিমাত্র উপদেশ রইল—বেহিসাবী হবে না । প্রয়ােজনের অতিরিক্ত ব্যয় করবে না। তবে হ্যা, নিজেকে তকলিফ দিয়ে ধনদৌলত জমাতে বলছি না। আল্লতাল্লার ওপর ভরসা রেখে দিন গুজরান করবে। ইয়াদ রাখবে, তার দোয়াতেই জিন্দেগীতে সুখী হওয়া যায়।
অচিরেই বণিক দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে বেহেস্তের পথে পা বাড়াল।
আবু হুসন আব্বাকে হারিয়ে বহুৎ চোখের পানি ঝরাল। ইয়ার দোস্তরা হরবখত পাশাপাশি কাছাকাছি থেকে তাকে বহুভার সান্ত্বনা দিল।
কিছুদিনের মধ্যেই আবু হুসন আব্বার শােক সামলে উঠতে পারল। তার ইয়ার-দোস্তরা তার মকানে স্থায়ী আস্তানা গাডল। খানাপিনার দেদার বন্দোবস্ত।
অচিরেই আবু হুসন-এর দিল থেকে আব্বার উপদেশাবলী ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। দু হাতে দিনার ওড়াতে লাগল। ইয়ার দোস্তরা মজা লুঠতে লাগল। সুলতানী খানা, দামী সরাব আর নিত্য নতুন নাচনেওয়ালির আমদানি হতে লাগল তার মকানে । ঝাড়বাতি ঝুলাতেও ভুলল না। তার আব্বাজীর রেখে যাওয়া দিনারের পাহাড়ের শির নিচু হতে হতে এক সময় জমিনে এসে ঠেকল। ব্যস, বিলকুল ভো ভা হয়ে গেল। এক সময় কেবলমাত্র একটি বাঁদী তার সম্বল হ’ল।
তার খুবসুরৎ এক বাঁদী ছাড়া আবু হুসন-এর যা কিছু ছিল তার নসীব এক এক করে সব ছিনিয়ে নিল। বাঁদীটির নাম হাফিজা।
আবু হুসন-এর চোখে নিদ উধাও হয়ে গেল। নিরবচ্ছিন্ন হতাশা আর হাহাকার তার সর্বক্ষণের সঙ্গী। তবে বাঁদী হাফিজার সুরৎ তামাম বাগদাদ নগরে সবচেয়ে সেরা। অনন্যা। হাফিজা এক সকালে হুসন’কে আদর সােহাগ করতে করতে, বলল— হরবখত গালে হাত দিয়ে মনমরা হয়ে ভেবে কি লাভ। বল তাে? যা করলে কাজের কাজ হতে পারে তার ফন্দি ফিকির কর। আমি কি বলছি শােন—আমাকে দিয়ে তােমার মুশকিল আশান হতে পারে। নসীব ফিরে যাবে।
আবু হুসন সবিস্ময়ে তার মুখের দিকে তাকায়।
হাফিজা বলে চলে—“হ্যা, যা বলছি শােন—আমাকে খলিফা হারুণ-অল-রসিদ-এর কাছে নিয়ে চল। তাকে বলবে, মাত্র দশ হাজার দিনার পেলেই তুমি আমাকে বেচে দিতে রাজী আছ। তাকে বলবে, বাঁদীর সুরতের তুলনায় দাম কমতিই আছে। বাঁদী-বাজারে গিয়ে নিলাম তুললে বহুৎ দিনার আমদানি হতে পারে বটে। কিন্তু কার কাছে, কোন মুলুকে চলে যাবে তার ঠিক ঠিকানা নেই। আপনার হারেমে থাকলে, কষ্ট পাবে না। আমার দিল ঠাণ্ডা থাকবে। এ বাৎ তাে সাচ যে, আপনি ছাড়া বাঁদী হাফিজার গুণের কদর দেয়ার মত সমঝদার আদমি তামাম বাগদাদে দোসরা কেউ নেই। আপনার দিল চাইলে এর গুণ হাজারবার যাচাই করে নিতে পারেন। ব্যস, কাজ হাসিল।
মুহূর্তকাল ভেবে নিয়ে বাঁদী হাফিজা এবার বলল–লেকিন এক বাৎ খেয়াল রাখবে। খলিফা দর নিয়ে কচলাকচলি করলে তুমি একদম রাজী হবে না। গাঁট হয়ে বসে থাকবে—পাক্কা দশ হাজার
দিনার।'
আবু হসন পড়ল মহামুশকিলে। এক দিকে কলিজার সমান বাদী হাফিজার প্রতি পিয়ার মহব্বৎ আর অন্যদিকে আর্থিক অভাব অনটন। বহুৎ লড়ালড়ির পর সিদ্ধান্ত পাকা করে ফেল। খলিফার কাছে বাদী হাফিজা’কে বেচেই দেবে।
সন্ধ্যার কিছু আগে আবু হুসন বাদী হাফিজাকে সাজিয়ে গুজিয়ে খলিফার কাছে হাজির হল। সে হাফিজার শিখিয়ে দেয়া বুলি মুখস্থ বিদ্যার মত খলিফার কাছে আওড়ে গেল।
খলিফা আবু হুসন-এর মুখ থেকে বাদী হাফিজা-র গুণের ফিরিস্তি শুনে মুচকি হেসে বললেন-“হাফিজা, তােমার যে সব গুণের কথা শুনলাম তার দু'-চারটে নমুনা যে চাই।'
হাফিজা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল--জাহাপনা, ফরমাশ করুন, কি জানতে উৎসাহী।
-তােমার পাণ্ডিত্য, কোন্ কোন্ বিষয়ে আগে বল।'
--‘জাহাপনা, সঙ্গীত, ব্যাকরণ, কাব্য, গণিত, জ্যামিতি, আইন, সমাজবিদ্যা কলাবিদ্যা, সামরিকবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যা—কোন বিষয়ে আপনি জানতে উৎসাহী মেহেরবানি করে বলুন।
‘সঙ্গীতে তােমার দখল কেমন, বল তাে।'
–‘জাঁহাপনা, সঙ্গীতের তাে হরেক শাখা। তবে সবচেয়ে কঠিন যে কালােয়াতী তাতেও আমার দখল যথেষ্টই আছে। আর সেতার, পাখােয়াজ ও বীণা প্রভৃতি আমার হাতে পড়লে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আবার নাচেও আমার পারদর্শিতা রয়েছে।
–‘বহুৎ আচ্ছা! তােমার বাগ্মীতায় আমি মুগ্ধ। খলিফা এবার বাদী হাফিজা-র বিভিন্ন বিষয়ের পাণ্ডিত্য পরীক্ষা করার জন্য তার সুলতানিয়তের কয়েকজন বিশিষ্ট পণ্ডিতবিশেষজ্ঞকে তলব করলেন।
খলিফার বিশালায়তন এক কামরায় পণ্ডিত-বিশেষজ্ঞগণ সমবেত হলেন। কারােরই মালুম নেই খলিফা কেন হঠাৎ তাদের তলব করেছেন। | এক সময় উজির জাফর’কে নিয়ে খলিফা সেখানে এলেন। তার পিছন পিছন আবু হুসন বাদী হাফিজা’কে নিয়ে সেখানে হাজির হ’ল। হাফিজা খলিফার দিকে এগিয়ে গিয়ে আনত মস্তকে সশ্রদ্ধ কুর্ণিশ করল।
খলিফা এবার উপস্থিত পণ্ডিত-বিশেষজ্ঞদের উদ্দেশ্যে বললেন—“আজ আপনাদের তকলিফ দিয়ে আমার প্রাসাদে নিয়ে আসার একমাত্র উদ্দেশ্য, একটি জনানার পাণ্ডিত্য পরীক্ষা করা। আপনারা নিজ নিজ পছন্দ মাফিক প্রশ্ন তাকে করতে পারেন।
উপস্থিত সবাই ঘাড় কাৎ করে খলিফার প্রশ্নের জবাব দিলেন। হাফিজা এবার উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলল —“মহামান্য প্রাজ্ঞজন, আপনাদের মধ্যে যদি কেউ কোরাণ-বিশেষজ্ঞ থাকেন তবে মেহেরবানি করে আমাকে জানতে দিন।
এক বৃদ্ধ হেকিম হাত তুলে হাফিজার জিজ্ঞাসা নিরসন করলেন।
—“তবে মেহেরবানি করে আপনিই আমাকে প্রথম যা কিছু জিজ্ঞাস্য বলুন।
–‘বহুৎ আচ্ছা! বেটি, বল তো পবিত্র কিতাব কোরাণ শরিফ মােট কয়টি পরিচ্ছেদে সমাপ্ত ? আর তাতে কতগুলি বর্ণ এবং অক্ষরের উল্লেখ রয়েছে? এসব বাৎ না হয় পরে হবে। আগে বল তাে বেটি, তােমার ইমাম কে? তােমার মালিক কে? আর তােমার পয়গম্বরই বা কে? কাদের তুমি ভ্রাতৃজ্ঞান কর ? তােমার নীতি কি ? তােমার নির্দিষ্ট পথ ও দিক কোনটি?
-“হুজুর, আমি এক এক করে আপনার বিলকুল সওয়ালের জবাব দিচ্ছি। পবিত্র কিতাব কোরাণ আমার ইমাম। কোরাণই আমার কানুন। আল্লাহকে আমি একমাত্র মালিক জ্ঞান করি। আর আমার পয়গম্বর মহম্মদ। মক্কার কাবাহ আমার দিক। আমার নীতি পয়গম্বরের উপদেশাবলী। আমার ধর্মে বিশ্বাসী আদমি মাত্রই আমার ভাই। আর সুন্নী সম্প্রদায়ের নির্দেশিত পথকেই আমি আমার পথ বলে জ্ঞান করি।
খলিফা মুগ্ধ হয়ে সবিস্ময়ে হাফিজার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইলেন।
হেকিম এবার নতুন একটি সওয়াল ছুঁড়ে দিলেন—‘বেটি, এবার বাতাও তাে কি করে সমঝাতে পার আল্লাহ আছেন?
–‘যুক্তির মারফৎ সমঝানাে যায়। যুক্তি দো কিসিমকা। পহেলা যুক্তি পাই দিল থেকে আর দুসরা অর্জনের ব্যাপার। জ্ঞানবুদ্ধিই এর সহায়ক।
–‘এবার বাতাও যুক্তি কোথা থেকে আসে?
—“দিল। দিল থেকে। তবে মস্তিষ্ক তাকে উৎসাহ-উদ্দীপনা জোগায়।
ইসলাম ধর্মে কয়টি কর্তব্যের নির্দেশ রয়েছে ও কি কি ? –‘পাঁচটি কর্তব্য অবশ্য পালনীয়। পহেলা—ধর্মবিশ্বাস —আল্লা এক এবং অদ্বিতীয়, দুসরা—মহম্মদ আল্লাহর পয়গম্বর। তিসরা—দান, চৌথা—প্রার্থনা আর পঞ্চম—রােজা। সে সঙ্গে মক্কায় তীর্থযাত্রার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
–‘ধর্মের ব্যাপারে কোন্ কোন্ আচরণ প্রশংসনীয়, বাতাও।
–এতে ছয় আচরণের উল্লেখ মেলে। (ক) নামাজ, (খ) উপবাস, (গ) দান, (ঘ) নিষিদ্ধ দ্রব্যাদি বর্জন, (ঙ) রিপু দমন এবং সব শেষে (চ) ধর্মযুদ্ধে যােগদান।
–নামাজ কেন অত্যাবশ্যক বাতাও তাে।
-নামাজের উদ্দেশ্য আল্লাহর কাছে ধর্মের অর্ঘ্য নিবেদন করা। গুণ কীর্তনের মাধ্যমে তার মহিমা প্রচার করা। আর আত্মার শান্তির প্রয়াসী হওয়া।
–বেটি, এবার বাতাও তাে বিশ্বাস কিভাবে দৃঢ় হয় ? -নামাজের মাধ্যমে বিশ্বাস সুদৃঢ় হয়।
-নামাজের মাধ্যমে কোন্ কোন্ কিসিমের লাভ হতে পারে বলে তুমি মনে কর?
‘পার্থিব লাভ নামাজের মাধ্যমে হতে পারে না। নামাজের মুখ্য ভূমিকা হচ্ছে, আমি এবং আল্লাহর মধ্যে অপার্থিব যােগসূত্র স্থাপন করা। দশটি অলৌকিক লাভ নামাজের মাধ্যমে হয়—(ক) দিলে সহানুভূতির সঞ্চার করে, (খ) দিলকে প্রস্ফুটিত করে, (গ) মুখাবয়বে প্রশস্তি আনয়ন করে, (ঘ) দিলে দয়া-মায়ার সঞ্চার ঘটে, (ঙ) শয়তানকে দূরে হটিয়ে দেয়, (চ) বিমারিকে বাধা দেয়, (ছ) অশুভকে বিনাশ করে, (জ) বােধশক্তিকে সুদৃঢ় করে, (ঝ) শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করে এবং (ঞ) আত্মা ও আল্লাহর ব্যবধান ক্রমে হ্রাস পেতে থাকে।
‘বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা! এবার বাতাও তাে নামাজের গােপন কথা কি ?
—“রুজু। রুজু করার আগে দিলকে করুণা ও সহানুভূতিসম্পন্ন করে তোেলা অত্যাবশ্যক।
-এবার বাতাও তাে বেটি, কেউ যখন রুজু করতে প্রবৃত্ত হয় তখন জীন বা শয়তানরা কি করে থাকে ?
-“কেউ যখন রুজু করতে প্রবৃত্ত হয় তখন শয়তান তার বা দিকে অবস্থান করে। আর জীন অবস্থান করে ডানদিকে। কিন্তু আল্লাহর নামে নামাজ শুরু হওয়ামাত্র শয়তান চট করে কেটে পড়ে। কিন্তু জীন তার কাছে এগিয়ে আসে, চারদিক থেকে চারটি বাতি তার শিরে তুলে ধরে। আল্লাহর গুণকীর্তন করে আর আদমির গুনাহকে মার্জনা করার জন্য কোশিস করে। সে আদমি যদি রুজু করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে ভুলে যায় তবে শয়তান তার ঘাড়ে চেপে বসে। আর সর্বশক্তি নিয়ে আত্মার নিপীড়ন শুরু করে। সন্দেহের ইঙ্গিত এবং চেতনা প্রশমিত করার উৎসাহ প্রদর্শন করে থাকে।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিস্সা বন্ধ করলেন।
দু’শ’ তিয়াত্তরতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ আবার কিসসা শুরু করলেন—জাঁহাপনা, হাফিজা তার বক্তব্য অব্যাহত রাখল। সে এবার বলল-রুজুর সময় পানি দিয়ে সর্বাঙ্গ ধৌত করে নেওয়া উচিত। মােদ্দা কথা, দৃশ্য ও অদৃশ্য যত চুল দেহে আছে সবই যেন

0 Comments