আরব্য রজনী পার্ট ৭৫ ( Part 75) Sahasra Ak Arabya Rajani

গল্পের পরবর্তী অংশঃ 
যুঁই-এর দিল কেঁদে ওঠে। চোখের পানি মুছতে মুছতে বল্ল —আবু সামাত আমাকে শাদী করে বিবির মর্যাদা দিয়েছিল, আপনার তাে অজানা নয় হুজুর। আপনি যখন আমাকে নিলামে খরিদ করে নিয়ে আসেন তখন এ-লেড়কা আমার পেটে ছিল।

---“হ্যা, আবু সামাত-এর মতই লেড়কার সুরৎ হয়েছে বটে। 
যুই আমতা আমতা করে বলল —“আজ থেকে আসলান আপনারই বেটা। আপনি একে শিক্ষা দীক্ষা দিয়ে তৈরী করে নিন। 
যুই-এর বাৎ শুনে খালিদ-এর কলিজা নেচে ওঠে। মুখে দেখা দেয় খুশীর ঝিলিক। 
- বহুৎ আচ্ছা, আজ থেকে আমি একে দত্তক নিলাম। একটি অনুরােধ, মেহেরবানি করে কারাে কাছে এর আদৎ পরিচয় যেন কোনদিন প্রকাশ কোরাে না। ব্যস, আর কিছু নয়।
যুঁই ঘাড় কাৎ করে সম্মতি জানাল।
       খালিদ এবার থেকে আসলান’কে নিজের বিবির, নিজের ঔরসজাত লেড়কার মত করে লালন পালন করতে লাগল। লেখাপড়া, অস্বশিক্ষা আর খেলকুদ তাকে শেখাতে লাগল। কোরাণ-এর পাঠ দান করার জন্য নগরের সবচেয়ে বড় মৌলভীকে নিয়ােগ করল।
দেখতে দেখতে আসলান নওজোয়ান হয়ে উঠল। তার সর্ববিষয়ে পাণ্ডিত্য ও খ্যাতির কথা খলিফার কানে গেল। তিনি খুশী হয়ে তাকে আমীরের উপাধি দান করলেন।  
নসীবের খেল। এক বিকালে সরাবের দোকানের সামনে আসলান-এর সঙ্গে আহমদ-এর দেখা হয়ে গেল। আহমদ তাকে অনুনয় বিনয় করে সরাব খাওয়াল। গলা পর্যন্ত সরাব গিলে দু'জন ভাটিখানা থেকে বেরিয়ে এল। ইতিমধ্যে রাত্রি হয়ে গেছে। চারদিকে জমাটবাঁধা অন্ধকার। আহমদ কোর্তার জেব থেকে ছােট্ট একটি চিরাগ বের করল। তার ঢাকনাটি খুলতেই বেরিয়ে এল এক টুকরাে হীরার উজ্জ্বল দ্যুতি। তাজ্জব ব্যাপার তাে! আসলান অবাক মানে। তাজ্জব বনার ব্যাপারই বটে। তেল, মােম কিছু নেই অথচ জ্বলছে। সে আহমদ-এর হাত থেকে নিয়ে কৌতুহলের সঙ্গে চিরাগটিকে দেখতে লাগল।
আহমদ বলল -এর জন্য একটি নিরীহ নিরপরাধ আদমিকে জান দিতে হয়েছে, জান?’ 
–“জান দিতে হয়েছে। চোখের তারায় বিস্ময়ের ছাপ এঁকে আসলান আহমদ-এর গর্বোজ্জল চোখ দুটোর দিকে তাকায়।
–‘জরুর। আহমদ এবার সরাবের নেশার ঘােরে আবু সামাত-এর ফাসির কিসসা তার কাছে সবিস্তারে বর্ণনা করল।।
সামান্য একটি স্বার্থের খাতিরে কেউ এরকম নীচ ও জঘন্যতম কাজ করতে পারে আসলান ভাবতেও উৎসাহ পাচ্ছে না।
আসলান ঘরে ফিরে তার আম্মার কাছে আহমদ-এর মুখ থেকে শােনা তার আব্বার কাহিনী ব্যক্ত করল।
লেড়কার মুখ থেকে স্বামীর নসীবের বাৎ শুনে যুঁই আর্তনাদ ক'রে মেঝেতে আছাড় খেয়ে পড়ে যায়। সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে।বেগম শাহরাজাদ কিসসার এ পর্যন্ত বলার পর ভাের হয়ে গেল। বেগম কিসসা বন্ধ করলেন।
দুশ উনসত্তরতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে যুঁই লেড়কাকে আদর করে বলল—‘বেটা, তােমার বাৎ শুনে আমার দিল বলছে, খােদাতাল্লা বুঝি আমাদের ওপর প্রসন্ন হয়েছেন। সত্য আর গুনাহ কোনদিন গােপন থাকে না। আজ না হােক কাল তা প্রকাশ পাবেই। আর তােমাকে আর একটি বাৎ বলছি, খালিদ তােমার আসলি আব্বা নন। তার ঔরসজাত সন্তান নও তুমি। আমার কাছ থেকে তােমাকে দত্তক নিয়েছেন। তােমার আব্বা আবু সামাত। খলিফার রত্নহার গায়েব হওয়ার দায় তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। ঝটমুট তাকে অপরাধী করে ফাঁসির দডিতে লটকে দেওয়া হয়েছিল। তােমার আব্বার জিগরী দোস্ত হাবিলদার। তার সাথে ভেট কর। সবকিছু খােলসা করে তাকে বল। আর আল্লাতাল্লার নামে কসম খেয়ে তাকে সাফ সাফ বলে দেবে, আব্বার হত্যাকারীর ওপর বদলা তুমি নেবেই নেবে।
আসলান হাবিলদারের সাথে ভেট করল। তার মুখে সবকিছু শুনে সে গুলিবিদ্ধ শেরের মত গর্জে উঠল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল—‘বেটা, সবই আল্লাতাল্লার মর্জি। তার ওপর আস্থা রেখে এগিয়ে যাও। রহস্যভেদের প্রয়াস কর। তিনিই এর হিল্লা করে দেবেন।
পােলাে খেলা হচ্ছে।
খােদা ভরসা। সেদিনই, হিল্লা হয়ে গেল। আসলান খলিফার দলে খেলায় অংশ নিয়েছে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে প্রধান কোতােয়াল ও তার দলবল। খেলা চলাকালীন একটি বেকায়দা বল এসে খলিফার একটি চোখ প্রায় অন্ধ করে দিচ্ছিল। অদ্ভুত কৌশলে আসলান বলটি রুখে দিয়ে ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা থেকে খলিফাকে রক্ষা করল। তার ঠিক পরমুহূর্তেই আসলান শরীরের সর্বশক্তি প্রয়ােগ করে এমন এক বল মারল যে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সে খেলােয়াড়টির মেরুদণ্ড গুড়িয়ে গেল। খলিফা সােল্লাসে চিল্লিয়ে ওঠেন—‘সাবাস নওজোয়ান! সাবাস খালিদ-এর বেটা!'
খেলা সাঙ্গ হলে খলিফা তার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন—বহুত আচ্ছা বেটা। তােমার খেলার কৌশল আমাকে মুগ্ধ করেছে। আসলান মৌকা বুঝে দুম করে বলে উঠল—“জাঁহাপনা, আমার পিতৃহন্তার বিচার চাই। আপনার দরবারে আমি সুবিচার প্রার্থী। খালিদ আমার আব্বা নন। আমি তার দত্তক সন্তান। বিলকুল ঝুটমুট আপনি আমার আব্বাকে ফাঁসির দড়িতে লটকে দিয়েছেন।
খলিফা সবিস্ময়ে আসলান-এর মুখের দিকে তাকালেন। আসলান এবার বলল—জী জাহাপনা, আমার আব্বা আবু সামাত। আপনি মিথ্যা চুরির দায়ে তাকে ফাঁসি দিয়ে নিজের নামকে কলঙ্কিত করেছেন। আমার বাৎ বিশ্বাস না হলে আহমদ-এর কোর্তার জেব তল্লাসী করলেই বামাল মিলে যাবে।
খলিফার হুকুমে এক সিপাহী আহমদ-এর কোর্তার জেব থেকে সে-চিরাগ বাতিটি বের করল।
চিরাগ বাতির ঢাকনাটি খুলতে খলিফার দীর্ঘদিনের সাথী হীরের টুকরােটি জ্বলজ্বল করে উঠল।
খলিফা ক্রোধে ফেঁটে পড়ার জোগাড় হলেন। গর্জে উঠলেন—‘বেইমান কাহিকার! এ হীরা কোথায় পেলি, বল।
–‘জাঁহাপনা, আমি এ-হীরা দোকান থেকে খরিদ করেছিলাম।
খলিফার ক্রোধ পঞ্চমে চড়ে গেল। অধিকতর ক্রোধে এবার গর্জে ওঠেন—“সিপাহী, চালাও চাবুক। চাবুকের ঘায়ে এর পিঠ থেকে খুন বের করে দাও। শয়তান বেইমান কাহিকার! দোকানে এ-হীরা বিক্রি হয়, তাই না? জোরসে চাবুক চালাও। চাবুকের ঘায়ে আহমদ মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। কাৎরাতে কাৎরাতে সে স্বীকার করল, বেগমের পাশের কামরা থেকে সে-ই খলিফার ব্যবহৃত রত্নহার ও অন্যান্য হার চুরি করেছিল। আজব চিরাগবাতিটির লােভ সম্বরণ করতে না পেরে এটি ছাড়া বাকী সব আবু সামাত-এর মকানের দেয়ালে লুকিয়ে রেখেছিল। আর এ-ও স্বীকার করল—তারই কসুরে নিরীহ-নিরপরাধ আবু সামাতকে ফাঁসির দড়ি গলায় পরতে হয়েছে।
খলিফা এবার আসলানকে বললেন—“তুমি নিজে হাতে একে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে পিতৃহন্তার প্রতিশােধ গ্রহণ কর।'
আসলান এবার হাবিলদারের সহায়তায় চোরের শিরােমণি আহমদ’কে সবার সামনে ফাঁসির দড়িতে লটকে দিল। আসলান এবার চোখের পানি মুছতে মুছতে খলিফাকে বলল —‘জাঁহাপনা দয়া করে আমার আব্বাকে ফিরিয়ে এনে দিন।
খলিফার চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল।
আসলান বলল —“জাঁহাপনা, আমি জানি, আমার আব্বা আবু সামাত এখনও জিন্দা—বহাল তবিয়তে আছেন।
‘অসম্ভব! আবু সামাত জিন্দা আছে? বহাল তবিয়তে আছে? এ কভি নাহি হাে সেকতা—অসম্ভব। আমার হুকুমে তার ফাসি হয়ে গেছে। গাের দেয়া হয়েছে। তবে হ্যা, ফাসির পরদিন আমি উজির জাফর’কে নিয়ে তার লাশ দেখে ভড়কে গিয়েছিলাম। কেমন সন্দেহ হয়েছিল, লাশটি যেন আবু সামাত-এর বলে মনে হচ্ছিল না। তবু বিশ্বাস না করে উপায় ছিল না। বুকের ভেতরে দ্বিধা কিছু না কিছু রয়েই গেল।'
খলিফার চোখে পানি দেখে হাবিলদার সাহস পেল। এগিয়ে এসে সে বলল -জাহাপনা, আমার গুস্তাকী মাফ করবেন, আমি সেদিন সজ্ঞানে আপনার হুকুম তামিল করি নি। সেদিন আবু সামাতকে সরিয়ে ফেলে অবিকল তারই মত দেখতে এক আসামীকে ফাসীর দড়িতে লটকে দিয়েছিলাম। তবে এটুকুই সান্ত্বনা, সে-আদমিটি ফাঁসির আসামীই ছিল বটে। তারপর আবু সামাত কে আমি গােপনে আলেকজান্দ্রিয়ায় চালান করে দেই। সে এখন সেখানে এক দোকান খুলে বসেছে। হাবিলদারের বাৎ শুনে খলিফা হারুণ অল-রসিদ খুশী হয়ে তাকে উপযুক্ত ইনাম দিয়ে সন্তুষ্ট করেন।  
এদিকে আবু সামাত চৌদ্দ সালের মধ্যে তার দোকানটিকে রমরমা করে তােলে। দশগুণ পুঁজি হয়। তারপর তার দিল কারবারের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। ক্রমে কারবার গুটিয়ে ফেলতে লাগল।
এক সকালে তার দোকানের সামনে জাহাজের এক ক্যাপ্টেন হাজির হয়। একটি পাথরের টুকরাের দিকে লােলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সেটি কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করল। ক্যাপ্টেন নিজে থেকেই আশি হাজার দিনার দিতে সম্মত হ'ল।'
‘ইয়া খােদা!' আবু সামাত যেন একেবারে আশমান থেকে জমিনে পড়ল। হবার কথাই তাে বটে। সামান্য একটি পাথরের টুকরাের দাম আশি হাজার দিতে চাইলে চোখ দুটো তাে কপালে উঠবেই।' আবু সামাত ক্যাপ্টেনকে নিজের ভেতরের বিস্ময়টুকু বুঝতে দিয়ে দুম করে বলে উঠল—এত সস্তায় এ-পাথর খরিদ করতে পারবে না মিঞা। পানিও এর চেয়ে জাদা দামে বিক্রি হয়। আপনার দিমাক টিমাক খারাপ হয়েছে নাকি?'
‘কই বাৎ নেহি, আরও দশ হাজার বেশী নাও। আবু সামাত এবার বার কয়েক লােক দেখানাে আমতা আমতা করে শেষ পর্যন্ত রাজী হয়ে গেল।
ক্যাপ্টেন বলল—“কিন্তু ভাইয়া, মেহেরবানি করে তােমাকে একবারটি আমার সঙ্গে জাহাজে যেতে হবে। এক হাতে পাথর নেব আর অন্য হাতে দাম চুকিয়ে দেব। মেহেরবানি করে- 
‘বহুৎ আচ্ছা, যাব। চলুন, পাথরটি নিয়ে আপনার সাথেই যাচ্ছি। 
জাহাজে পৌছে ক্যাপ্টেন আবু সামাতকে একটি বেঞ্চে বসতে দিয়ে মােহর আনার অজুহাতে ভেতরে চলে গেল।
সময় এগিয়ে চলে। ক্যাপ্টেন গেছে তাে গেছেই। ফেরার নামটিও করে না। আবু সামাত-এর দিলটি মােচড় মেরে ওঠে। সে নিঃসন্দেহ হ'ল, নির্ঘাৎ জোচ্চরের পাল্লায় পড়েছে। ইতিমধ্যে জাহাজ মাঝ দরিয়ার দিকে এগিয়ে চলেছে। পালিয়ে আসার পথও বন্ধ।
আবু সামাত জাহাজে বন্দী হ’ল। দীর্ঘ সময় বাদে ক্যাপ্টেনের মুখ দেখা গেল. ক্যাপ্টেন চোখে-মুখে বিদ্রপের ছাপ এঁকে বল্ল-“আবু সামাত, চিনতে পারছ? থাক এখন না-ই বা ধরা দিলাম। সময় মত বিলকুল পরিষ্কার হয়ে যাবে। এখন শুধু জেনে রাখ, জাহাজ জেনেভায় চলেছে। তারপর তােমার নসীবই আমাকে কর্তব্য বলে দেবে। তােমারও মালুম হবে, নসীবে কি লেখা আছে।' 
জেনেভা বন্দরে জাহাজ নােঙর করতেই এক বৃদ্ধা লাঠি ভর দিয়ে জাহাজে উঠে এল। তার সঙ্গে দু’জন তাগড়াই প্রহরী। আবু সামাত বৃদ্ধার হুকুমে জাহাজ থেকে নেমে এক গীর্জায় হাজির হল। বৃদ্ধা বলল—‘পাশে একটি মঠ আছে, নিশ্চয়ই দেখতে পেয়েছ? এবার থেকে তােমার কাজ হবে এ-গীর্জা ও মঠের নফরের কাজ করা। কাঠ কেটে আনা থেকে শুরু করে খানাপাকানাে, বাসনকোসন মাজা আর মঠ ও গীর্জা সাফসুতরা করা তােমার দৈনন্দিন কাজ। তিনশ’ সত্তর জন আদমি এখানে খানাপিনা করে। একা তােমাকে সব সামলাতে হবে। আর বিকালের আগে যখন একটু ফুরসৎ পাবে ফুলগাছে পানি দেবে।
বিকালেও কাজ আছে! ইয়া পেল্লাই একটি গদা তােমাকে দেয়া হবে। সেটি কাঁধে নিয়ে গীর্জার সামনের পথে দাঁড়িয়ে পথচারীদের প্রার্থনায় যােগদান করার জন্য অনুরােধ করবে। যদি কেউ ওজর আপত্তি করে তবে জোর জুলুম করতে হবে। বেশী বেগড়বাই করলে গদা দিয়ে দমাদম পিটতে শুরু করবে।
আবু সামাত ভয়ডর মিশ্রিত জিজ্ঞাসার ছাপ চোখের তারায় একে নীরবে রহস্যময়ী বৃদ্ধাটির দিকে তাকিয়ে রইল।  বৃদ্ধাটি আবার মুখ খুল্ল–কেন পিটতে যাবে, ভাবছ?
আদতে আমরা চাই না এখানে অ-খ্রীস্টান, মানে কোন বিধর্মা বসবাস করুক। এ নগরে বসবাস করতে হলে ধর্মযাজকদের আশীর্বাদ শিরে নিয়ে নিজেকে ধন্য জ্ঞান করতে হবে। যা কিছু বল্লাম প্রতিটি কথা দিলে গেঁথে রাখার কোশিস করতে খেয়াল রাখবে।
কথা ক'টি আবু সামাত-এর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বৃদ্ধা নিস্তেজ চোখ দুটো দরওয়াজার দিকে ফেরাল। এবার লাঠি ভর দিয়ে চৌকাঠ | ডিঙিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
আবু সামাত ভাবল, আমার নসীব আমাকে এ-কোন্ কয়েদখানায় এনে ফেলল । কি করে যে এ ফাটক থেকে খালাস পাব, আল্লাতাল্লাই জানেন।  আবু সামাত গীর্জার ভেতরে এক পাইন কাঠের চৌকির ওপর বসে চোখের পানি ফেলতে লাগল। এমন সময় অদৃশ্য এক নারীকণ্ঠের গানা তার কানে এল। দিল উজাড় করে গাইছে।
দু' পা এগিয়ে গিয়ে আবু সামাত থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। আপন মনে বলে উঠল-‘ইয়া আল্লাহ! এ যে সেই লেড়কিটি! আমি কি খােয়াব দেখছি!'  আবু সামাত অনুচ্চ কণ্ঠে কথাটি বললেও লেড়কিটি ঠিক শুনতে পেয়ে গেছে। 
ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে লেড়কিটি বলল —‘স্বপ্ন কেন দেখতে যাবে গাে? তুমি তাে জেগে, দিব্যি জেগে আছ গাে। এ নগরটির নাম জেনেভা। জাহাজের ক্যাপ্টেনকে দিয়ে ফন্দি ফিকির করিয়ে আমিই তােমাকে এখানে আনিয়েছি। আমার বাবা এখানকার সম্রাট। আমি রাজকুমারী হুসন মরিয়াম। আমি যাদুবলে তােমার রূপ আর যৌবন দেখতে পাই।। তখন থেকেই তােমার প্রেমে পড়ি। তােমার রক্ত-মাংসের শরীরটিকে চাক্ষুষ করার বড় শখ ছিল। কাছে আনিয়েছি। আমার গলার এ-পাথরটি দেখতে পাচ্ছ, দৈব পাথর এটি। আমার হুকুমেই জাহাজের ক্যাপ্টেন তােমার অগােচরে তােমারই দোকানে এটিকে লুকিয়ে রেখেছিল। শােন, তােমাকে যখন কাছে আনতেই পেরেছি, তুমি আমাকে বিয়ে কর। তারপর তুমি যা চাও তা-ই পাবে। তােমার সব ইচ্ছাই আমি পূরণ করব।
—“আমার ইচ্ছা পূরণ করবে। আমি ফিন আলেকজান্দ্রিয়া নগরে ফিরে যেতে পারব, কথা দেবে?
—“অবশ্যই ফিরে যেতে পারবে। —“তবে আমি তােমাকে শাদী করতে রাজী। পাদরীকে তলব দেয়া হ’ল। আবু সামাত আর রাজকুমারীর শাদী হয়ে গেল।
-এবার বল, তুমি আলেকজান্দ্রিয়ায় ফিরতে চাও, বল ? —“চাই। এখনি ফিরতে চাই।'
মরিয়াম এবার তার দৈব পাথরটি সূর্যের দিকে উঁচু করে ধরল। হাতের বুড়াে আঙুল দিয়ে সেটিকে ঘষতে ঘষতে অনুচ্চকণ্ঠে মন্ত্র বলতে লাগল।
চোখের পলকে একটি উড়ন্ত শয্যা নেমে এল। তারা দু'জনে তাতে উঠল। রাজকুমারী আবার পাথরটি ঘষতে ঘষতে বলল —“আলেকজান্দ্রিয়া।
উড়ন্ত শয্যা সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিয়ে শূন্যে ভাসল বিদ্যুৎবেগে
(চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments