গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
কোরবানির পশুর মত কাপতে কাঁপতে, বার কয়েক ঢােক গিলে সে এবার মুখ খুলল—জাহাপনা, আপনি তাে কাল আহমদকে প্রধান কোতােয়াল নিযুক্ত করেছেন। অতএব সবদায়িত্ব তাে তার ওপরই বর্তাচ্ছে। আমি তাে তার অধীনস্থ কর্মচারী ছাড়া কিছু নই। তাই খােয়া যাওয়া রত্নহারটি যদি না-ই পাওয়া যায় তবে তাে তারই শাস্তি হওয়া দরকার, বিবেচনা করে দেখুন।
আহমদ নির্দ্বিধায় বল্ল-জাহাপনা, ব্যাপারটি আমার কাছে কোন সমস্যারই নয়। তবে জাঁহাপনার কাছে আমার একটি প্রার্থনা-
-বল, কি বলতে চাইছ?'
-“আপনি আমাকে হুকুম দিন আমি যেন, নগরের যেকোন বাড়ি, গুদাম আর দোকানে ঢুকে তল্লাস চালাতে পারি। উজির জাফর থেকে শুরু করে কাজী বা আপনার একান্ত প্রিয়জন আবু সামাত এর মকানে পর্যন্ত সব জায়গায় যেন তল্লাস চালাতে পারি।
-“বহুৎ আচ্ছা আমি এখনই তােমার হাতে এরকম ফরমান দিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু খেয়াল থাকে যেন গর্দান আমার চাই-ই চাই। সে গর্দান তােমার নিজের বা রত্নহার যে চুরি করেছে তারই হােক। যদি চোরকে পাকড়াও করতে পার তবে তােমারটা বাঁচবে আর চোরের গর্দান যাবে। আর যদি তা না পার তােমার গর্দান যে যাবে, আশা করি তা আর স্মরণ করিয়ে দিতে হবে না।
আহমদ কিছুমাত্র ঘাবড়ালাে না। স্বাভাবিক কণ্ঠেই সে বলল-“ঠিক আছে, তাই হবে, আপনার বিচার মাথা পেতে নিয়ে চৌদ্দ পুরুষের নামে কসম খেয়ে বলছি জাহাপনা, চোরকে আমি অবশ্যই পাকড়াও করে আপনার দরবারে হাজির করবই। আমার আম্মা রত্নহারটি গায়েব করলেও নিস্তার পাবে না জাঁহাপনা।
আহমদ এবার খলিফার ফরমান আর দু’জন কোতােয়ালের সিপাহীকে সঙ্গে নিয়ে, খলিফাকে কুর্নিশ করে প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে এল।
আহমদ প্রথমেই হাজির হ’ল উজির জাফর-এর মকানে। লােক দেখানাে তল্লাসী চালিয়ে সে তার মকান থেকে বেরিয়ে এল। কিছুই পেল না। পাওয়ার তাে কথাও নয়। আহমদ এবার কাজীর মকানে তল্লাসী চালাল। সেখানেও সে বাঞ্ছিত রত্নহারটি পাওয়া যাবে না তা-তো সে জানেই। এবার সে হাজির হ’ল কোতােয়ালের মকান তল্লাসী করতে। এখানেও লােকদেখানাে, দায়সারা গােছের তল্লাশ সেরে খালিহাতে বেরিয়ে এল।
আহমদ এবার তার দুই সহকারী সিপাহীকে নিয়ে হাজির হ’ল সুলতানের একান্ত প্রিয়জন আবু সামাত-এর মকানে। খলিফার ফরমান আবু সামাত'কে দেখিয়ে তার উদ্দেশ্যের কথা ব্যক্ত করল। অতি বিনয়ের সঙ্গে সে তাকে বলল –কর্তব্য বড় কঠিন দায়। আমি জানি আপনার মত সজ্জন সচরাচর মেলে না। তবু কর্তব্যের তাগিদে আপনার মকানটি একবার তল্লাসী করতেই হবে।
আবু সামাত হেসে বলল —“তল্লাসী করবেন বহুৎ আচ্ছা, যান। মকানের যেখানে খুশী তল্লাসী চালাতে পারেন, কিছুমাত্রও আপত্তি নেই। আমি কিছুই মনে করব না।
আহমদ তার কামরায় ঢুকতে গিয়ে অনুচ্চকণ্ঠে বল্ল-তল্লাসী করব তাে কেবলমাত্র তােমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে নিয়ম রক্ষা করতে। আদত ব্যাপার তাে সেরেই রেখেছি। লােক দেখানাে তল্লাসী চালিয়ে আহমদ সিপাহীদের নিয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে এল। এবার সিপাহীদের বলল-শাবল দিয়ে কামরার বাইরের দেয়াল গুলাে ভাল করে গুতিয়ে গাঁতিয়ে দেখ। আহমদ নিজেও তাদের সঙ্গে হাত লাগাল। কিছুক্ষণ এখানে-ওখানে শাবল ঠুকে সে এক জায়গায় এসে থমকে যায়। সিপাহীদের একজনকে বলল—এ-জায়গাটি যেন কেমন মনে হচ্ছে। ভাল করে শাবল ঠোক তাে দেখি।
আবু সামাত বলল -সন্দেহজনক মনে হলে পাথরটি খুলে ফেললেই তাে হয়।
আহমদ এবার শাবলের মাথা দিয়ে সামান্য গুতাে দিতেই পাথরের টুকরােটি খসে পড়ে গেল। চোখের সামনে একটি গর্ত বেরিয়ে পড়ল। এবার সে গর্তটির ভেতরে ডান-হাত চালান দিয়ে দিল। ব্যস, হাতে করে বের করে আনল খলিফার খােয়া যাওয়া রত্নহারটি।
ব্যাপার দেখে আবু সামাতের ভিমরি যাওয়ার জোগাড় হয়। মাথা চক্কর মেরে ওঠে। মাথায় হাত দিয়ে বসে আর্তনাদ করে উঠল - ইয়া আল্লা! একী তাজ্জব ব্যাপার! এক মুহূর্তও দেরী নয়, ঘটনার বিবরণ লিখে আবু সামাত এবার রত্নহারসহ সেটিকে পাঠিয়ে দিল কোতােয়ালের দরবারে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খলিফা স্বয়ং কাজীকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল আবু সামাত-এর মকানে এলেন। তিনি একেবারে আশমান থেকে পড়লেন। আবু সামাত-শেষ পর্যন্ত এমন বেইমানী করল, তিনি ভাবতেই উৎসাহ পাচ্ছেন না। বিশ্বাস না করেও উপায় নেই। মাল যে তার মকান থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে।
খলিফা দীর্ঘ সময় বিষন্ন মনে নীরবতার মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে এক সময় গর্জে উঠলেন—একে নিয়ে যাও, ফাসি কাঠে ঝুলিয়ে দাও। বুঝুক, বিশ্বাসহন্তার শাস্তি মৃত্যু।
হাবিলদাররা তামাম বাগদাদ নগরে ঢােল পিটিয়ে প্রচার করে দিল, সন্ধ্যায় আবু সামাতকে ফাসিকাঠে ঝােলানাে হবে, তার যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হ’ল। তার দুই বিবিকে সকাল থেকে পথে বের করে দেয়া হল।
খালিদ বাদী যুঁই’কে নিজের মকানে নিয়ে গিয়ে লেড়কার হাতে তুলে দিল, আর জুবেদা? তাকে তার আব্বার কাছে ভেজা হ’ল।
হাবিলদারটি আৰু সামাত’কে খুবই পিয়ার করে। তার সতত্যর কথা হাবিলদার খুব ভালই জানে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, কিছুতেই এরকম একটি নক্কারজনক কাজ তার পক্ষে করা সম্ভব নয়। আদতে নির্ঘাৎ অন্য কোন রহস্য এর পিছনে রয়েছে। কি সে কারণ ? কি সে ফন্দি ? কিন্তু খলিফার হুকুম তামিল না করে নিস্তার নেই।
হাবিলদার এবার সােজা কয়েদখানার সচিবের কাছে হাজির হয়। তাকে বলে—“আপনার জিম্মায় জনা চল্লিশেক কয়েদী রয়েছে। আমি তাদের প্রত্যেককে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে চাই।'
কয়েদখানার সচিৰ ফাটক খুলে দিল। হাবিলদার তল্লাসী চালিয়ে একজনকে পেয়ে গেল যার সঙ্গে আৰু সামাত-এর আদলের অবিকল সাদৃশ্য রয়েছে। তাকে ফাটকের বাইরে আনা হ’ল । আৰু সামাত-এর পরিবর্তে সে বেচারাকেই ফাসিকাঠে ঝুলিয়ে দেয়া হল। স্বয়ং খলিফা থেকে শুরু করে প্রজারা সবাই জানল, আৰু সামাত-এর জীবনাবসান হয়ে গেল।
রাত্রির প্রায় দ্বিতীয় প্রহরে আসল আৰু সামাত’কে হাবিলদার চুপি চুপি নিজের মকানে নিয়ে গেল হাবিলদারের প্রশ্নের উত্তরে আৰু সামাত বলল-“খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি, আমি ঘুণাক্ষরেও এসবের কিছু জানি না। নির্ঘাৎ কোন এক নােংরা মতলব, গােপন অভিসন্ধি এর পিছনে কাজ করছে।
‘বেটা, আমি বিশ্বাস করি তােমার মত একজন আদত মুসলমান এরকম একটি অপকর্ম কিছুতেই করতে পার না। অপরাধী আজ না হােক কাল ধরা পড়বেই, ভেবাে না। তা কিন্তু এখনি প্রমাণ করা যাচ্ছে না। তাই তােমার নিরাপত্তার খাতিরে কিছু দিনের জন্য হলেও এনগর ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে গা-ঢাকা দিয়ে থাক। চারদিকে শত্রুর গুপ্তচর চক্কর মেরে বেড়াচ্ছে। তােমার খোঁজ পেলে তােমার আর আমার উভয়েরই জান খতম করে ছাড়বে। মুহুৰ্তমাত্রও সময় নষ্ট না করে তােমাকে এ জায়গা ছেড়ে যেতে হবে। সাগরের ওপারে আলেকজান্দ্রিয়া নগর। সেখানে গিয়ে কিছুদিনের জন্য গা-ঢাকা দাও। সময় সুযােগ বুঝে আমিই তােমাকে ডেকে নিয়ে আসব। তােমার বিবি জুবেদার জন্য কিছু ভেবাে না। আমার বাড়িতে সযত্নেই থাকবে।
–“কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, রাস্তাঘাট আমার কিছুই জানা নেই। কোন রাস্তায়, কিভাবে যাব।
—“ঘাবড়াও মাৎ বেটা। আমি তােমাকে সঙ্গে করে আলেকজান্দ্রিয়ার জাহাজে দিয়ে আসব।
-বহুৎ আচ্ছা, তবে তা-ই চলুন।
আবু সামাত হাবিলদারের সঙ্গে তাড়াতাড়ি পথে নেমে পড়ল। অক্লান্ত পরিশ্রম করে বাগদাদ নগরী ছাড়িয়ে গেল। আগুনের মত গরম বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে আবু সামাত-এর মত জন্মসূখীর পক্ষে খুবই তকলিফ হতে লাগল।
আরও কিছুদূর এগিয়ে হাবিলদার দু'জন চসমহাের ইহুদীর দেখা পেল। সুদের কারবারী, তার কাছে আসতেই হাবিলদার বলল -ঘােড়া থামাও, তােমাদের তল্লাসী করতে হবে।
সুদখোের ইহুদী দুটো ঘােড়া থেকে নামতেই হাবিলদার আচমকা তরবারির কোপে তাদের গর্দান নামিয়ে দিল।
ইহুদী দুটোর অর্থকড়ি নিতে নিতে হাবিলদার বলল বেটা, এরা এখনি বাগদাদে গিয়ে আমাদের কারসাজির কথা খলিফার কানে দিত। আবু সামাত'কে নিয়ে এবার হাবিলদার নিহত ইহুদীদের ঘােড়ায় চেপে সেখান থেকে চম্পট দিল।
মরু-প্রায় অঞ্চলের দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে হাবিলদার আবু সামাতকে নিয়ে হাজির হল। এক মুসাফির খানায় ঘােড়া দুটোকে জিম্মা রাখল। ঘাটে গিয়ে দেখে আলেক জান্দ্রিয়াগামী বড় একটি পালতােলা নৌকা ছাড়ার উদ্যোগ করছে। হাবিলদার তাকে ইহুদীদের কাছ থেকে পাওয়া সােনাদানা ও মােহর প্রভৃতি যা পেয়েছিল সব আবু সামাত-এর হাতে তুলে দিল। তারপর তার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বল্ল-বেটা আলেকজান্দ্রিয়ায় গিয়ে আমার খবরের আশায় আশায় দিন গুজরান করবে। নসীব আজ হােক কাল পাল্টাবেই। তখন আমি তােমাকে নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করব।'
নৌকা ছাড়ল। হাবিলদার চোখের পানি মুছল। হাবিলদার বাগদাদে ফিরে শুনল-নকল আবু সামাতকে ফাসিকাঠে ঝুলানাের পর খলিফার মধ্যে অদ্ভুত ভাবান্তর ঘটে। নিদারুণ অশান্তির মধ্যে কাল কাটান। তিনি চোখের পাতা আর এক করতে পারেন নি। আবু সামাত এরকম এক জঘন্য কাজ করতে পারে কিছুতেই তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না।
উজির জাফরকে বললেন—“শােন গতকালের ব্যাপারে আমি খুবই মুষড়ে পড়েছি। যার আচার-আচরণ এমন মােলায়েম তার ভেতর এমন যে শয়তান ঘাপটি মেরে রয়েছে মালুম হবে কি করে?'
— জাহাপনা, ব্যাপারটি এখন রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে, রহস্যভেদ না হওয়া পর্যন্ত এরকম ঝাপসাই রয়ে যাবে। আদত কারণ উদ্ধার হলে তবেই—আবু সামাত এক উঁচু বংশােদ্ভূত। মিশরের এক সুপ্রতিষ্ঠিত বণিকের লেড়কা। আমিও ভাবছি এর পিছনে কোন গােপন চক্রান্ত কাজ করেছে।'
খলিফার দৃঢ় বিশ্বাস, অবশ্যই ফাঁসির দড়িতে এর নিষ্কলুষ নওজোয়ানের জান নেয়া হয়েছে, তা যদি হয় তবে তাে খুবই গুনাহ হয়েছে। আবু সামাত-এর লাশটি ভালভাবে নিরীক্ষণ করার জন্য খলিফা ছদ্মবেশে উজির জাফরকে নিয়ে বধ্যভূমিতে হাজির হলেন। কফিনে মােড়া আবু সামাত-এর লাশটি তখনও ফাঁসির দড়িতে ঝুলছে।
উজির জাফর তার মুখ থেকে কফিনের কাপড়টি সরাতেই খলিফা চমকে ওঠেন। তিনি কপালের চামড়ায় চিন্তার ভাঁজ এঁকে বললেন—‘জাফর, আবু সামাত তাে আরও লম্বা ও মােটাসােটা ছিল। উজির জাফর বলল —‘জাঁহাপনা, মরার পর দীর্ঘ সময় পরে। মানুষের চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। লম্বা মানুষও অনেক সময় কিছুটা খর্ব দেখায় ।
–‘কিন্তু আবু সামাত-এর গালে বেশ উজ্জ্বল তিল ছিল। গেল কোথায় ?
– “অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে দেহ বিকৃত হয়ে অনেক কিছুই বদলে যায়। হয়ত এক্ষেত্রে সেরকমই কিছু ঘটেছে।
–“কি জানি—আবার এদিকে তাকিয়ে দেখ, এর পায়ের তলায় উল্কি কাটা। স্পষ্টাক্ষরে দুটো নাম লেখা। এ চিহ্ন তাে জাফর সিয়া সম্প্রদায়ের। আবু সামাত সুন্নি ছিল, আমি নিঃসন্দেহ।
উজির জাফর-এর মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। মুহুর্ত কাল ভেবে নিয়ে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-“খােদাতাল্লা ছাড়া কারাে পক্ষে এ-রহস্যের কিনারা করা সম্ভব নয় জাহাপনা।
বুকভরা হতাশা, দুশ্চিন্তা ও দ্বিধা নিয়ে খলিফা বধ্যভূমি ত্যাগ করে আসেন।
খলিফার নির্দেশে আবু সামাত-এর লাসটি গাের দিয়ে দেওয়া হ’ল। আবু সামাত-এর স্মৃতি খলিফার দিল থেকে তিলে তিলে দূরে সরে যেতে থাকে। আবু সামাত হারিয়ে যায়।
আমরা এবার দু’পা এগিয়ে গিয়ে দেখি আবু সামাত-এর দ্বিতীয়া বিবি যুঁই কি অবস্থায় দিন গুজরান করছে।
হাবিলদার আবু সামাত-এর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে মরে যায় নি। সে এবার যুইকে নিলামে তুলল। আর প্রথম স্ত্রী জুবেদা? তাকে নিজের মকানে নিয়ে গিয়ে তুলল । বড়ফটাই-এর আব্বা বাদী যুঁই’কে নিলামে খরিদ করে নিয়ে গেল।
বড়ফট্রাই-এর আব্বা বাদী যুইকে নিয়ে গিয়ে লেড়কার কামরায়-দিল ভেজে। বড়ফট্টাই তাকে দেখেই কামাতুর চোখে তার দিকে তাকাতে লাগল। কলিজা ছটফটিয়ে ওঠে। জিভ দিয়ে জল গড়াচ্ছে কিনা বােঝা যায় নি অবশ্য। কামজ্বালায় জর্জরিত বড়ফট্টাই আচমকা তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। সজোরে জাপ্টে ধরে বুকের মধ্যে।
বড়ফটাই-এর আচরণে যুঁই যারপরনাই বিরক্ত হয়। তার গা পিত্তি জ্বলে যায়। অধৈর্য হয়ে তাকে এক ধাক্কা দিয়ে ছিটকে দূরে ফেলে দেয়। গাছের গুড়ির মত বড়ফট্টাই-এর দেহটি মেজেতে আছাড় খেয়ে পড়ল। কোমর থেকে ছুরি বের করল। হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে যুইকে ডর দেখায়—‘ফিন যদি এরকম করবি তাে জান একেবারে খতম করে দেব, ইয়াদ থাকে যেন।
বড়ফট্রাই-এর মা চিল্লাচিল্লি শুনে ছুটে এসে যুঁইকে শাসাতে লাগল। যুঁই মুখবুজে হজম করার লেড়কি নয়। সে তম্বি করতে লাগল—এ কি রকম মতলব। এক স্বামীর ঘর করতে এসে অন্য এক আদমির সঙ্গে কোন্ লেড়কি লদকা লদকি করে, বল তাে? আমি বে-ওয়ারিশ মাল নাকি? আমি আবু সামাত-এর শাদী করা বিবি, ইয়াদ নেই? তােমার বেটার কাজ হচ্ছে সিংহীর গুহায় কুত্তা ঢােকার মত।
বড়ফট্টাই-এর আম্মা গলা পঞ্চমে চড়িয়ে দিল—“তােমার মত বজ্জাত লেড়কিকে কি করে শায়েস্তা করতে হয় সে-দাওয়াই আমার কাছে আছে।
বড়ফট্টাই-এর আম্মা এবার যুই এর ঝলমলে পােশাক খুলে নােকরাণীর পােশাক পরিয়ে দিল। এবার হেঁশেলে নিয়ে গিয়ে কাজে লাগিয়ে দিল। খাটিয়ে খাটিয়ে গতর কয়লা করে দেবে।
যুঁই ম্লান হেসে বলল —“তােমার ওই হুতুমমুখাে লেড়কার সঙ্গে সহবাস করার চেয়ে গতর খাটিয়ে পেটের ভাত জোগাড় করা ঢের ইজ্জতের।
ফুলের মত সুরৎ যার তাকে নােকরাণীদের সঙ্গে কাজ করতে দেয়ায় অন্যান্য নােকরাণীরা ব্যাপারটি সুনজরে দেখল না। মায়া হল। সবাই তাকে পিয়ার করে বুকে টেনে নিল। তাকে কোন কাম কাজ করতে দিল না। সবাই মিলে ভাগাভাগি করে তার কাজ করে দিতে লাগল।
এদিকে আছাড় খেয়ে বড়ফাট্টাই-এর কোমরের হাড্ডি সরে গেল। বিছানা নিল। আর ওঠার ক্ষমতাই রইল না।
আগেই বলা হয়েছে বাদী যুঁই-এর গর্ভে আবু সামাত-এর ঔরসজাত সন্তান তিলে তিলে বাড়তে লাগল। দশমাস গর্ভ ধারণ করে সে একটি লেড়কা প্রসব করল। যুই সদ্যোজাত লেড়কার নামকরণ করল আসলান। নােকরাণীদের মহলে আসলান দিনে দিনে চাদের কলার মত বাড়তে লাগল। কেবলমাত্র আম্মার বুকের দুধ সম্বল করে সে গায়ে গতরে বাড়তে লাগল। সে দেখতে যেমন আবু সামাত-এর মত তেমনি গাট্টাগােট্টা হয়ে উঠল। যেন জঙ্গলের সিংহ শাবক কামরায় চলে এসেছে।
এক সকালে বাদী যুঁই জরুরী দরকারে ওপর তলায় যায়। এদিকে আসলান এক পা দু’পা করে সােজা খালিদ-এর কামরায় গিয়ে ঢুকে পড়ল। চাঁদের মত ফুটফুটে লেড়কাটিকে দেখেই তার কলিজাটি মােচড় মেরে ওঠে। আবু সামাত-এর মুখটি চোখের সামনে ভেসে উঠল। শিশু আসলান-এর হাত ধরে কাছে নিয়ে যায়। চুমু খায়। কোলে বসিয়ে আদর সােহাগ করতে থাকে।
যুঁই ফিরে দেখে কামরা ফাকা। আসলান নেই। তার বুকের মধ্যে ধুকপুকানি শুরু হয়ে যায়। কলিজা শুকিয়ে ওঠে। বড়ফট্টাইএর মা ডাইনীর নজরে পড়লে কেলেঙ্কারী হয়ে যাবে। বিষ খাইয়ে মেরে ফেলাও তার পক্ষে অস্বাভাবিক নয়। ব্যস্ত পায়ে খুঁজতে খুঁজতে খালিদ-এর বৈঠকখানায় গিয়ে লেড়কাকে দেখল। কলিজায় জল এল। যুঁইকে দেখে খালিদ জিজ্ঞাসা করল—“তােমার লেড়কা?’
হ্যা, হুজুর?
এর আব্বা কে? আমার নােকরদের কেউ নিশ্চয় ?
যুঁই-এর দিল কেঁদে ওঠে। চোখের পানি মুছতে মুছতে বল্ল —আবু সামাত আমাকে শাদী করে বিবির মর্যাদা দিয়েছিল, আপনার তাে অজানা নয় হুজুর। আপনি যখন আমাকে নিলামে খরিদ করে নিয়ে আসেন তখন এ-লেড়কা আমার পেটে ছিল।

0 Comments