গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
-শােভন আল্লাহ! বহুৎ গলতি হয়ে গেছে হুজুর। এরকম ভাবনা তাে আমার দিমাকে আসে নি! আদৎ কথা কি জানেন হুজর বিপদের মুখে এতসব সমানপত্র আর আব্বাজানের চিঠি হাতে পেয়ে। আমার দিমাক ঘুরে গিয়েছিল। খুশীর মেজাজে আমার বুদ্ধিবিবেচনা বিলকুল গাড্ডায় ঢুকে গিয়েছিল। এবার মেহেরবানি করে বলুন তাে, এতসব সমানপত্র কে পাঠিয়েছিলেন?
মুচকি হেসে হারুণ অল রসিদ-এর সভাকবি এবার বলল ‘শােন আবু সামাত, তােমার সুরতের সমান তােমার মগজ যদি থাকত তবে তুমি খলিফার উজিরের পদলাভ করে তার পাশাপাশি অবস্থান করার যােগ্যতা লাভ করতে। যাকগে তােমার কৌতূহল নিবৃত্ত করতে গিয়ে বলছি-‘ইনি খলিফা হারুণ অল-রসিদ-এর উজির মান্যবর জাফর আলি বারসাকী, আমি তারই সভাকবি আবু নাসার আর ঐ যে দেখছ, সে খলিফার দেহরক্ষী মাসরুর। আর যিনি একটু আগে কামরা ছেড়ে গেছেন তিনি স্বয়ং মহামান্য খলিফা হারুণ-অল রসিদ। এবার তােমার দিলে স্বভাবতঃই প্রশ্ন জাগতে পারে, খলিফা তােমার মধ্যে এমন কি দেখলেন যার জন্য দরাজ হাতে তােমাকে খয়রাতি দিতে গেলেন? এ সওয়ালের একটিই জবাব, তােমার খুবসুরৎ চেহারা, মিষ্টি-মধুর আচরণ আর অনন্য আদব কায়দাই খলিফার দিলে দাগ কেটেছে।
তার কথা শেষ হতে না হতেই খলিফা হারুণ অল-রসিদ আবার ঘরে ঢুকলেন। আবু সামাত আনত মস্তকে খলিফাকে কুর্ণিশ করে করজোড়ে নিবেদন করল--‘জাঁহাপনা, বান্দার গােস্তাফী মাফ করবেন। আমি অবিবেচকের মত বাৎ বলে আপনার ইজ্জতে ঘা দিয়েছি। আপনার মহানুভবতার যে পরিচয় পেয়েছি, চরম সঙ্কট থেকে আপনি যে আমার জান ও ইজ্জত রক্ষা করেছেন সে বাৎ জিন্দেগীভর আমার দিলে গাঁথা থাকবে।
বিদায় নেবার পূর্বমুহুর্তে আবু নাসার এগিয়ে এসে অনুচ্চ কণ্ঠে বলল ——‘আবু সামাত, ইয়াদ থাকে যেন-কাল ভােরে খলিফার সঙ্গে অবশ্য দরবারে দেখা করবে।
সকাল হ’ল। জুবেদা স্বামীকে খলিফার দরবারে যাবার জন্য নিজে হাতে সাজ পােশাক পরিয়ে তৈরী করে দিল। খলিফা হারুণ অল-রসিদ তার পার্ষদদের নিয়ে দরবারে মসনদে বসে। আবু সামাত সেখানে হাজির হয়ে আনত মস্তকে খলিফাকে কুর্নিশ সেরে তার পায়ের কাছে ছােট্ট একটি বাক্স রাখল। তাতে খলিফার প্রেরিত খয়রাতি সামগ্রীর মধ্যে থেকে সবচেয়ে ভাল নক্সাযুক্ত একটি উপহার আছে। খলিফা উপস্থিত পার্ষদদের উদ্দেশ্যে বললেন—“আজ থেকে এ-কিশাের আবু সামাত’কে আমার সুলতানিয়তের সওদাগর সভার সভাপতির পদে অভিষিক্ত করছি।
খলিফার হুকুমে তামাম বাগদাদ নগরে ঢােল পিটিয়ে সওদাগর সভার নবনিযুক্ত সভাপতি আবু সামাত-এর নাম ঘােষণা করা হল। আবু সামাত খলিফার বদান্যতা লাভ করে তার কাছাকাছি পাশাপাশি থাকার সুযােগলাভে ধন্য হ’ল।।
আবু সামাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—“হায় আবু সামাত, তােমার বাসনা পূরণ হ’ল না। তুমি চেয়েছিলে বাগদাদ বাজারে বড়সড় একটি দোকান খুলে বসবে। তােমার সেবাসনা অঙ্কুরেই শুকিয়ে গেল। তুমি বনে গেলে একেবারে সওদাগর সভার সভাপতি!'।
কিছুদিন যেতে না যেতেই প্রাসাদের প্রধান সরাবজী দেহ রাখলেন; বেহেস্তে চলে গেলেন। খলিফা এবার আবু সামাতকে আর একটু পদোন্নতির সুযােগ দান করলেন। তাকে প্রধান সরাবজীর পদে বহাল করলেন। একটি রাত্রিও ভালভাবে কাটতে পারল না। সকালে দরবারে এসে এক রাজকর্মচারী খলিফাকে কুর্নিশ করে খবর দিল— ‘জাঁহাপনা, প্রাসাদের প্রধান সচিবের দেহাবসান ঘটেছে।'
দরবারে আবু সামাত-এর তলব হ’ল। সে পড়ি কি মরি করে দরবারে হাজির হ’ল। খলিফা বললেন—“আবু সামাত, আজ থেকে। তােমার ওপর প্রাসাদের প্রধান সচিবের দায়িত্বভার অর্পিত হল। প্রাসাদের সার্বিক দায়িত্ব তােমার ওপর অর্পিত হ’ল। এ সুবাদে আজ থেকে তােমার বেতনও দ্বিগুণ করা হল।
কিসসার এ-পর্যন্ত বলতে না বলতে ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
দুশ’ সাতষট্টিতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার উপস্থিত হলে বেগম শাহরাজাদ আবার কিসসা শুরু করলেন শুনুন জাঁহাপনা, আবু সামাত খলিফার প্রাসাদে সারাদিন থেকে প্রধান সচিবের দায়িত্ব
পালন করতে লাগল। কেবলমাত্র রাত্রিটুকুর জন্য নিজের ঘরে বিবির কাছে ফিরে যায়।
একদিন খলিফা আবু সামাত’কে বললেন-‘আজ প্রাসাদে নাচাগানার মজলিশের আয়ােজন কর। সন্ধ্যার কিছু পরে শুরু হ’ল নাচা-গানার মজলিশ। পর্দার আড়াল থেকে খলিফার এক বাদী সুরেলা কণ্ঠে গানা ধরল। গানার কথা ও সুরের মূৰ্ছনায় সবাই মশগুল। আবু সামাত-ও একেবারে মাতােয়ারা। খলিফা তার কানের কাছে মুখ নিয়ে প্রায় ফিসফিসিয়ে বলেন—“কি হে আবু সামাত, ব্যাপার তাে সুবিধের বােধ হচ্ছে না। মালুম হচ্ছে, তুমি আমার বাঁদীর সুরৎ আর সুরের মূৰ্ছনায় একেবারে মজে গেছ!’ আবু সামাত মুচকি হেসে জবাব দিল-জাহাপনা যদি মজেন তবে তাে নিয়ম মাফিক বান্দাও মজতে বাধ্য।
‘না, না দোস্ত, হাল্কা কথায় পাশ কাটিয়ে গেলে তাে চলবে না।। আমি খুশী হয়ে আজ থেকে এ বাদীকে তােমার হাতে তুলে দিলাম।
খলিফা এবার খােজাকে তলব করলেন। সে এলে হুকুম করলেন-‘এক কাজ কর, দিল কা পেয়ার-এর ধন দৌলত আর সমানপত্র যা কিছু আছে সব এ হুজুরের ঘরে দিয়ে আয়। আর গানা শেষ হলে তাকেও চল্লিশজন দাসীবাদীসহ তার ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসবি।
আবু সামাত প্রায় হাতে পায়ে ধরে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল‘খােদা মেহেরবান, জাঁহাপনা এ-অধমের প্রতি এ-অবিচার ভুলেও করবেন না। জাঁহাপনার ভােগের সামগ্রী স্পর্শ করে আমি দোজাকের পথ সাফসুতরা করে রাখতে চাই না। এ যে আমার পক্ষে ভাবাই গুনাহ!
খলিফা হেসে বললেন—“তােমার ডর কোথায় আমার বুঝতে বাকী নেই। তােমার বিবি আর একটি লেড়কিকে ঘরে তুলে হিংসায় জ্বলেপুড়ে মরবে, ঠিক কি না?
–না, জাঁহাপনা, সেরকম ডর আমার নাই।
এবার খলিফা উজির জাফর’কে হুকুম করলেন, দশ হাজার দিনার দিয়ে বাঁদী-বাজার থেকে একটি খুবসুরৎ বাঁদী খরিদ করে নিয়ে আসার জন্য। বৃদ্ধ উজির জাফর জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে খলিফার মুখের দিকে তাকাল।
খলিফা এবার বললেন--“আবু সামাত-এর কাজে খুশী হয়ে তােমার খরিদ করা বাদীকে ইনামস্বরূপ তাকে দেব।”
খলিফার হুকুম তামিল করতে উজির আবু সামাত'কে নিয়ে বাঁদী-বাজারে গেল। বাঁদীর মেলা দেখিয়ে সে বলল —“আবু সামাত, বাজার ঢুঁড়ে দেখ। তােমার পছন্দ মাফিক একটি বাঁদী খরিদ কর। দাম যা লাগে তার জন্য আমি আছি।'
সেদিন কোতােয়াল আমির খলিদ বাঁদী-বাজারে এসেছে তার একমাত্র লেড়কার জন্য পছন্দ মাফিক খুবসুরৎ একটি বাঁদী খরিদ করতে। লেড়কাটি তার সঙ্গেই রয়েছে। বছর চৌদ্দ উমর। হুতুম পেঁচার মত থ্যাবড়া মুখ। হোদল কুতকুতের মত চেহারার আদল। তারা যে লেড়কির কাছে গিয়ে দাঁড়ায় সে-ই নাক সিটকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তাই উপায়ান্তর না দেখে বাঁদীবাজারে হাজির হয়েছে। পেঁচামুখাে লেড়কাটার নামও জব্বরবড়ফট্টাই। কোতােয়ালের বিবিই জোর জুলুম করে তাকে বাঁদী-বাজারে পাঠিয়েছে।
বড়ফট্রাই-এর আম্মা নাকি গতরাত্রে আবিষ্কার করেছে লেড়কার শরীরের পুরুষত্বের আবির্ভাব ঘটেছে। বিছানার চাদরে দাগ। স্বপ্নদোষ হয়েছে। তাই ঠেলেধাক্কে লেড়কাকে সঙ্গে দিয়ে কোতােয়ালকে বাঁদী-বাজারে পাঠিয়েছে।
এবার দালালরা একের পর এক বাঁদী এনে কোতােয়ালের লেড়কা ও আবু সামাত’কে দেখাতে লাগল। কিন্তু কোনটিকেই উঁশা-আনকোরা বলে কারাে মনে হ’ল না।
কিছুক্ষণ বাদে দালালদের সর্দার এক লেড়কিকে নিয়ে এল। তাকে দেখামাত্রই বড়ফট্টাই-এর জিভ দিয়ে পানি গড়াবার উপক্রম হ’ল। তার আব্বাকে বলল—এটিই একমাত্র ডাঁশা মাল। একেই আমি খরিদ করতে চাই।
আবার বাঁদীটিকে আবু সামাত-এর কলিজায়ও নাড়া দেয়। সে উজিরকে বলে—একে নেয়া যায়। জব্বর লেড়কি।'
উজির জাফর বাঁদীটির দাম জিজ্ঞাসা করলে দালালদের সর্দার বলল —‘জী পাঁচ হাজার দিনার। বড়ফট্টাই সঙ্গে সঙ্গে ছয় হাজার দিনার হেঁকে বসল। আবু সামাত বলল —আট হাজার দিনার।
এবার সাড়ে আট হাজার দিনার হেঁকে বসল বড়ফট্টাই।
আবু সামাত বলল –বহুৎ আচ্ছা, নয় হাজার এক দিনার আমার দর রইল। এবার উজির জাফর মুখ খুলল —“আমি পুরােপুরি দশ হাজার দিনার।
শেষ পর্যন্ত আর দর না ওঠায় দালালদের সর্দার দশ হাজার দিনার নগদ বুঝে পেয়ে বাঁদী যুঁই’কে বিক্রি করে দিল।
ব্যাপারটি বড়ফট্টাই সহ্য করতে না পেরে বাজারময় দাপিয়ে বেড়াতে লাগল।
আবু সামাত বাদী যুঁইকে নিয়ে ঘরে ফিরল। জুবেদার-এর সঙ্গে সদ্য কেনা বাদী যুঁই-এর আলাপ করিয়ে দিল। স্বামীর পছন্দ মাফিক খরিদ করে আনা বাঁদীকে অবজ্ঞা করতে না পেরে কাছে ডেকে গল্প করল, নাম-ধাম জিজ্ঞাসাবাদ করল।
সামাত জুবেদার-এর আচরণে মুগ্ধ হয়। বাদীকে দ্বিতীয় বিবি হিসাবে গণ্য করা হবে জুবেদা’কে সে বলল ।
জুবেদা বাদী যুঁইকে নিজে হাতে সাজগােছ করে স্বামীর কামরায় পাঠাল। আবু সামাত-এর সঙ্গে সহবাস করায় প্রথম রাত্রেই যুই অন্তঃসত্ত্বা হয়।
এদিকে কোতােয়াল পড়ল মহাফাপরে। লেড়কা বড়ফট্রাইকে কিছুতেই সামলাতে পারছেনা। তার এক বাৎ—ঐ বাদীকে আমার চাই-ই-চাই। নইলে আমি নিজের হাতে জান খতম করব।
লেড়কার কাণ্ডকারখানা দেখে তার আম্মা গলা ছেড়ে কাঁদতে বসে গেল। কঁদবেই তাে। একমাত্র লেড়কা আত্মহত্যা করলে সে কাকে নিয়ে থাকবে? জিন্দেগী যে বরবাদ হয়ে যাবে। তার কান্না শুনে মহল্লার অনেকেই ছুটোছুটি করে এল। সমবেদনা জানাল। বহুভাবে তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। কেউ আবার একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলল——-“একজনের মুখের গ্রাস হতচ্ছাড়াটি কি করে যে কেড়ে নিল, তাজ্জব ব্যাপার!
মহল্লার যারা দুঃখ প্রকাশ করতে ছুটে এসেছিল তাদের মধ্যে এক শয়তানী বুড়িও ছিল। তাকে সবাই সিধেল চোর আহমদ-এর আম্মা বলেই জানে। তার শয়তানী বুদ্ধি ও কাজকর্মের জন্য মহল্লার সবাই সমীহও করে খুবই। তবে ভক্তিতে অবশ্যই নয়, ডরে। বড়ফট্টাই-এর আম্মাকে শয়তানী বুড়িটি বলল
-বেটি ঘাবড়াও মাৎ। তােমার লেড়কার সাধ আমি পূরণ করে দেব। জানই তাে, আমার বেটা আহমদ পহেলা নম্বরের সিধেল চোর। সে পারে না এমন কাজই নেই।
বড়ফট্টাই-এর আম্মা বুড়ির হাত দুটো চেপে ধরে চোখের পানি ঝরিয়ে বলল
—“তবে যে করেই হােক আমাকে কাজটি হাসিল করে দেয়ার কোশিস কর। তােমার বেটাকে দিয়ে বাঁদী যুঁই'কে চুরি করিয়ে আন। নইলে আমার লেড়কাকে আর জিন্দা রাখা যাবে না।
–“কিন্তু বেটি, আমার ইচ্ছা থাকলেও নাচার। তােমার স্বামী যে আমার বেটাকে কয়েদখানায় আটকে রেখেছে। সে বাইরে থাকলে একাজ তার কাছে একেবারে মামুলি।'
রাত্রে শােবার আগে কোতােয়ালের বিবি খুব করে সাজগােছ করল। চোখে সুরমা টানল, দামী সালােয়ার-কামিজ চাপাল। আতর ছিটিয়ে দিল সারা গায়ে। বাতাস পর্যন্ত খুসবুতে ভরে গেল। সে স্বামীর কামরায় যাওয়া মাত্র তার স্বামী কোতােয়াল নওজোয়ানের মত অত্যুগ্র আগ্রহ সহকারে বিবিকে বুকে টেনে নিল। লাস্যময়ী জনানা আড়ষ্ট হয়ে থাকে। স্বামীকে বলে—তুমি কথা দাও আমার একটি অনুরােধ রাখবে।
কোতােয়াল খালিদ-এর কলিজা তখন দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছে। আর খুনে লেগেছে মাতন। সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল-- ‘খােদার নামে কসম খেয়ে বলছি, তুমি যা বলবে আমি তা-ই করব। তােমার মর্জি অবশ্যই পূরণ করব।
‘আহমদ-এর বুড়ি মা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে চলেছে। লেড়কার শােকে সে আজ গােরে যেতে বসেছে। তাকে খালাস করে দিতে হবে, বল রাজী?'
প্রৌঢ় খালিদ-এর ক্লেদ ইতি মধ্যেই নির্গত হয়ে গেছে। তবু - বলল —“জবাব যখন দিয়ে ফেলেছি, খেলাপ করতে পারব না। আহমদকে কয়েদখানা থেকে খালাস করে দেব।
পরদিন সকালে কোতােয়াল খালিদ কয়েদী আহমদকে নিয়ে খলিফার দরবারে হাজির হ’ল। খলিফা তার বৃত্তান্ত শুনে তার হাতকড়া খুলে দেয়ার আদেশ করলেন। আর কোতােয়ালকে বলল —এর বুদ্ধি বিবেচনা পাকা আর চুরি, ডাকাতি আর রাহাজানি প্রভৃতি কাজের ফন্দিসন্দি ভাল জানে। অতএব একে আমি কোতােয়াল-প্রধানের পদে নিযুক্ত করলাম। আহমদ অবনতমস্তকে খলিফাকে কুর্নিশ করল। একেই বলে নসীব। কেবলমাত্র কয়েদখানা থেকে মুক্তিই নয় কোতােয়ালের চাকরি জুটে গেল।
আহমদ খুশীতে নাচতে নাচতে ঘরে ফিরল। তার আম্মা বলল -বেটা, এবার একটি কাজ যে করতে হবে তােকে।
বুড়ি এবার বড়ফট্টাইর ঘটনাটি লেড়কার কাছে বল্ল-যুঁইকে যে করেই হােক চুরি করে বড়ফট্টাইর ঘরে তুলে দিতে হবে।
আহমদ তার আম্মাকে আশ্বাস দিল। সামান্য কাজটি সে শীঘ্রই সেরে দেবে। সেদিন ছিল মাসের পয়লা তারিখ। সে তারিখে খলিফা তাঁর প্রধান বেগমের কামরায় যান। রাত্রিবাস করেন।
সন্ধ্যায় কিছু পরে খলিফা খােশ মেজাজে তার প্রধানা বেগমের কামরায় গেলেন। কামরাটির পাশেই ছােট্ট একটি খালি কামরা। সেকামরায় খলিফা তার গলার রত্নহারটি খুলে রাখলেন। বহুমূল্য মণি মাণিক্য তাতে। আর এমন সব হীরা যা আন্ধারে চকচক করে। আর একটি অত্যাশ্চর্য বাতি কামরার আন্ধার কেটে যায়।
খলিফা তার রত্নহার খুলে বেগমের কামরায় গেলেন। এদিকে আহমদ প্রাচীর টপকে ভেতরে ঢােকে। গুটিগুটি ছােট্ট কামরাটিতে ঢুকে রত্নহারটি নিয়ে চম্পট দিল। রত্নহারটি নিয়ে আহমদ এবার সােজা আবু সামাত-এর মকানে হাজির হয়। ভেতরে ঢুকে যায়। কামরার পিছনের দেয়ালের একটি শ্বেত পাথরের টুকরাে খুলে ফেলল। এবার রত্নহারটি সেখানে রেখে পাথরটিকে আবার আগের মতই বসিয়ে দিল। ব্যস কাজ হাসিল করে চুপিচুপি সটকে পড়ে। এবার ইবরাহিম-এর দোকানে গিয়ে গলা পর্যন্ত সরাব গিলল।
সকাল হলে খলিফা প্রধান বেগমের কামরা থেকে বেরােলেন। ছােট্ট কামরাটিতে গিয়েই থমকে যান। রত্নহারটি নেই। যারপরনাই বিস্মিত হন। তার ব্যবহারের জিনিসে হাত দেয় এতবড় দুঃসাহস! ক্রোধে ফেটে পড়ার উপক্রম হলেন তিনি।
খলিফার রত্নহার খােয়া গেছে। প্রাসাদ তােলপাড় করা হতে লাগল। প্রাসাদের হারেমে চোর! অভাবনীয় কাণ্ড! তলব করা হল সব খােজাদের, সবারই মুখ কালাে। কেউ স্বীকার করল না। খলিফা গুলিবিদ্ধ শেরের মত গর্জে উঠলেন—সবাইকে এক এক করে শূলে চড়াব—কোতল করব।
খলিফা উজির জাফর’কে ডাকলেন। ব্যাপারটি তার কাছে বললেন, কোতােয়াল খালিদ তখনই নবনিযুক্ত কোতােয়াল আহমদকে নিয়ে সেখানে হাজির হয়।
খলিফা এখন রাগে গগস করতে করতে খালিদ কে বললেন‘শােন, কাল রাত্রে বেগমের কামরা থেকে আমার রত্নহার খােয়া গেছে। তােমরা এতগুলাে লােক থাকতে বিশেষ করে তােমার মত একজন জাঁদরেল কোতােয়াল থাকতে কি করে এমন অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটে, বুঝতে পারছি না!
‘জাহাপনা' খালিদ কোন কথা বলার আগেই খলিফা আবার বলতে লাগলেন--‘শােন, যে-রত্নহারটি খােয়া গেছে তা আমার খুবই প্রিয়। মনে করতে পারাে সেটি আমার কলিজার সমান। অতএব যেখানে থাক, পাতালের অতল গহূরে লুকিয়ে রাখলেও আমি সেটি চাই। যদি না পার তবে জেনে অবশ্যই তােমার গর্দান যাবে। আজকের দিনের মধ্যেই সে-চোরকে আমার সামনে হাজির করতে হবে, খেয়াল থাকে যেন। আর যদি ব্যর্থ হও তবে তােমার কাটামুণ্ডটি প্রাসাদের প্রধান ফটকের সামনে ঝুলিয়ে দেয়া হবে।
খলিফার ফতােয়া শুনে আমীর খালিদ-এর অবস্থা তখন কাপড়ে-চোপড়ে হওয়ার জোগাড়। হওয়ার কথাও বটে। এতবড় বাগদাদ নগরে চোর কোথায় ঘাপটি মেরে রয়েছে কে জানে। সে ধরেই নিল এ-যাত্রায় আর জান রাখা যাবে না। কোরবানির পশুর মত কাপতে কাঁপতে, বার কয়েক ঢােক গিলে সে এবার মুখ খুলল—জাহাপনা, আপনি তাে কাল আহমদকে প্রধান কোতােয়াল
( চলবে )

0 Comments