আরব্য রজনী পর্ব ৭২ ( Part 72 ) Arabyarajani

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
—“তা হােক গে। আমি কথা দিচ্ছি, ফিকির কিছু একটি বের আমি করবই করব। সমস্যা যাতে দুর হতে পারে তার ফিকির-না,তােমাকে ছাড়তে পারব না। তােমাকে ছাড়ার আগেই যেন আমি গােরে যাই।
-“তাজ্জব ব্যাপার ! এমন কোন্ ফিকির তুমি বের করবে যাতে আমার জান বাঁচতে পারে? আমি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছি, বলামই তাে তােমাকে।

‘এত সহজে ভেঙে পড়লে কখনও চলে, বল? একটু বাদে আমার আব্বা তােমাকে কাজীর দরবারে নিয়ে যাবে শাদীর কবুল নামা বাতিল করে তিন তালাকের দলিলে স্বাক্ষর করানাের জন্য। তুমি গাে-বেচারার মত আমার আব্বার সঙ্গে কাজীর বাড়ি যাবে। তারপর কাজীকে সুযােগ মত বলে দেবে—আমি বিবিকে তালাক দিতে রাজী নই। তােমার বাৎ শুনেই কাজী চমকে উঠবেন। সবিস্ময়ে তােমার দিকে তাকিয়ে কাজী তখন বলবেন—“আহাম্মক কাহিকার। সামান্য একটি লেড়কির জন্য নগদ পাঁচ হাজার সােনার মােহর, এক হাজার সােনার দিনার দামের সমানপত্র আর একটি ঘােড়া যার দাম এক হাজার দিনার—সব ছেড়ে ছুঁড়ে দেবে! বেকুব বে-আক্কেল কাহিকার! কাজীর কথায় একদম ঘাবড়াবে না। তার বাং খতম হওয়া মাত্র জবাব দেবে–“হুজুর, যাকে তালাক দিয়ে ছেড়ে দিতে বলছেন তার একগাছি চুলের দামই যে দশ হাজার দিনার।
       কাজী তােমার বাৎ শুনেই গম্ভীর হয়ে যাবেন। তারপর একটুআধটু উষ্মা প্রকাশ করে বলবেন—‘বহুৎ আচ্ছা, তুমি যা ভাল বােঝ তাই কর। আমার বেগড়া দেবার কিছুমাত্রও কারণ নেই। তবে হ্যা, কানুন তােমার পক্ষ নেবে। কারণ, শাদী করা বিবিকে আইন সম্মতভাবে ভােগ-দখল করার পুরাে অধিকার তােমার রয়েছে। কিন্তু অন্য দিক থেকে তােমাকে এরা গাড্ডায় ফেলতে কোশিস করবে। চুক্তি করেছ। চুক্তি ভঙ্গ করলে তুমি দশহাজার দিনার আক্কেল সেলামি দেবে, চুক্তি করেছ। চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছ। চুক্তির অর্থ দিতে না পারলে সােজা গারদে পুরে দেবে। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবু সামাত বল্ল -“আরে, এ-কথাই তাে আমি এতক্ষণ ধরে তােমাকে বােঝাতে চাইছি বিবিজান। তবে আর তুমি আমাকে কি ফিকির বাৎলালে? জুবেদা মুচকি হেসে বলল—আরে ঘাবড়াও মাৎ। এবার কি বলছি শােন। কাজী আদতে আদমী হিসাবে বহুৎ আচ্ছা। শিক্ষাদীক্ষাও বহুৎ নিয়েছে। জ্ঞান-গম্যিও যথেষ্টই। তবে তার একটিমাত্র রােগ রয়েছে—খুবসুরৎ লেড়কা দেখলে তার দিমাক খারাপ হয়ে যায়। কলিজা আছাড়ি পিছাড়ি করে।


–ওরে ব্বাস! এখানে এসেও কি ‘সর্বভুক’-এর কবলে পড়তে হবে ? ইয়া আল্লা! এ আবার কার খপ্পরে পড়তে চলেছি!' চমকে উঠে আবু সামাত অনুচ্চ কণ্ঠে বলল।
জুবেদা ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বল্ল—“কিগাে, একেবারে চমকে উঠলে যে? পূর্ব অভিজ্ঞতা কিছু আছে নাকি গাে? কোথায় ; কার খপ্পরে পড়েছিলে, বল তাে।
‘নেই আবার! জিন্দেগী বরবাদ হতে চলেছে, নেই আবার। ইতিপূর্বে আমি ভয়ঙ্কর এক সর্বভুক’-এর খপ্পরে পড়েছিলাম। কোনরকমে পিছলে সটকে পড়েছিলাম। এখন ফিন আর এক ‘সর্বভুক’-এর পাল্লায় পড়তে চলেছি। অসম্ভব! কভি নাহি হােগা। কিছুতেই আমি পারব না। এ ফিকির বাতিল করে অন্য কোন ধান্দা বাৎলাও। বুড়াে হাবড়া কাজীর লােচ্ছামি কিছুতেই আমার দ্বারা বরদাস্ত করা সম্ভব নয়।
        জুবেদা স্বামীকে আবার সশব্দে চুমু খেল। আঙুল দিয়ে চুলের বিলি কাটতে কাটতে বলল —কেন এত সহজে ভেঙে পড়ছ, বল তাে? তােমার দিলকে শক্ত করার ওপর আমাদের দু'জনের শান্তিসুখ নির্ভর করছে, বুঝছ না কেন! শােন, কাজী যখন আক্কেল সেলামীর দশহাজার দিনার দিয়ে দিতে বলবে তখন তুমি দু’পা সরে গিয়ে কাজীর গা-ঘেঁষে দাঁড়াবে। কাঁদো কাঁদো সুরে বলবে,—“হুজুর, মেহেরবানি করে আমাকে কিছু সময় দিন। দেখবে, তােমার গায়ের ছোঁয়া পেয়ে কাজী গলে একেবারে জল হয়ে যাবে। আর দুম করে একেবারে আশাতীত সময় তােমাকে দিয়ে বসবে। 
কয়েক মুহূর্ত নীরবে কাটিয়ে জুবেদা এবার বলল —“কিছু দিন সময় পেলে ধীরে সুস্থে যা হোক ফিকির একটি হয়েই যাবে।
‘বহুৎ আচ্ছা! বেড়ে ফিকির বাৎলেছ!’ 
           এমন সময় এক নােকর এসে আবু সামাত’কে ডেকে নিয়ে গেল। জুবেদার আব্বা তাকে কাজীর কাছে নিয়ে গেল। কাজী অবিশ্বাস্য বন্দোবস্ত করে দিল। এক চোটে দশদিন সময় দিয়ে দিল। আরও বলল-দশদিন পরও যদি আক্কেল সেলামির দশহাজার দিনার শােধ করতে না পার তবে ভেবাে না, আমিই না হয় তা শােধ দিয়ে দেব।
আবু সামাত কাজ হাসিল করে ফিরে এসেছে শুনে জুবেদা আনন্দে গদগদ হয়ে তার বুকে ঝাপিয়ে পড়ল।
বৃদ্ধ জোরদার খানাপিনার বন্দোবস্ত করল।
রাত্রে নাচা-গানার বন্দোবস্তও হ'ল। নাচা-গানা যখন পুরােদমে চলছে তখন দরওয়াজায় কড়া নাড়ার শব্দ হ'ল। সামাত দরওয়াজা খুলে দিতে পা-বাড়ায়।
খলিফা হারুণ অল-রসিদ এক পারসীক দরবেশের ছদ্মবেশ ধারণ করে তার উজির জাফর, সভাকবি আবুনাসাব এবং দেহরক্ষী মাসরুর’কে নিয়ে রাত্রের অন্ধকারে বাগদাদের পথে হাওয়া খেতে বেরিয়েছেন। জুবেদাদের বাড়ির দরওয়াজার কাছাকাছি এসে খলিফা থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। উজির জাফরকে বললেন-'তােফা! তােফা! বহুৎ আচ্ছা গানা হচ্ছে ! চল দেখি ব্যাপার কি।
আবু সামাত দরওয়াজা খুলে দেখে চারজন পারসীক দরবেশ। দরবেশদের একজন বল্ল-“যদি মেহেরবানি করে একটু গানা শােনার বন্দোবস্ত করে দাও—দূর থেকে গান শুনে দিলটি নেচে উঠল কিনা।'
--তাতে কি আছে, আসুন ভেতরে আসুন। তাদের ভেতরে নিয়ে গিয়ে আবু সামাত হাত কচলে বলল—“আমাদের গান আপনাদের দিলকে স্পর্শ করেছে শুনেই আমরা খুশী। আদতে আমরা কেউ-ই পেশাদার গাইয়ে নই। আজ আমাদের খুশীর দিন কিনা, তাই দিল্ খুলে একটু গান বাজনা' পারসী দরবেশদের সর্দার গােছের আদমি অর্থাৎ খলিফা বললেন—“খুশীর দিন? ঠিক মালুম হল না তাে। কিসের খুশী? কেন এমন দিলজোড়া খুশী, বলতাে বেটা!'
আবু সামাত এবার তার আপন মুলুক কায়রাে নগর থেকে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর থেকে শুরু করে কাজীর কাছে আক্কেল সেলামির দশ হাজার দিনার দেয়ার জন্য দশদিনের সময় পাওয়া পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে সবিস্তারে বর্ণনা করল।
          আবু সামাত-এর চেহারা ছবি, কথা বলার কৌশল, সৌজন্য বােধ এবং নিরীহ নম্র ও সহজ সরল আচরণে পারসী দরবেশের পােশাকধারী খলিফা হারুণ-অল-রসিদ যারপরনাই মুগ্ধ হন। তিনি মুচকি হেসে বললেন-“বেটা দশ হাজার দিনারের জন্য ঘাবড়িয়ো না। আমরা সবাই কোশিস করে তােমার দেনা শােধ করে দেব।'
আবু সামাত হাত কচলে বল-বহুৎ সুকরিয়া, আপনাদের সহানুভূতির কথা জিন্দেগীভর স্মরণ রাখব।'
-দেখ বেটা, রাত দুপুরে অর্থকড়ির ঘ্যান ঘ্যানানি আর ভাল লাগছে না। যার জন্য তােমাদের বিরক্ত করতে এসেছি। তােমার বিবিকে বল আচ্ছা দেখে দুটো গান শুনাতে।
জুবেদা তার কিন্নর কণ্ঠে একের পর এক মিষ্টি মধুর গান গেয়ে চলল। কি করে যে রাত্রি কেটে গেল কেউ বুঝতেই পারল না। জানালার পাশের গাছের ডালে পাখিরা কিচির মিচির করে ভােরের পূর্বাভাষ ঘােষণা করল।
খলিফা হারুণ-অল-রসিদ কামরা ছেড়ে যাবার আগে একশ সােনার মােহরের একটি পুটুলি খাটের কোণায় চুপি চুপি রেখে পথে নামলেন।
            ভাের হলে আবু সামাত সােনার মােহরের পুটুলিটি দেখতে পেল। এমন সময় দরওয়াজার কড়া নাড়ার শব্দ শুনে সে এগিয়ে গিয়ে দরওয়াজা খুলতেই দেখে পঞ্চাশটি খচ্চর সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে। প্রত্যেকের পিঠেই সমানপত্র। আর একটি তাগড়াই খচ্চরের পিঠে বসে রয়েছে আবু সিনার বান্দা। খুবসুরৎ নওজোয়ান। আবু সামাত কে দেখেই নওজোয়ানটি খচ্চরের পিঠ থেকে এক লাফে নেমে নতজানু হয়ে তাকে আদাব জানিয়ে বল্ল—“আমি কায়রাে থেকে আসছি। আপনার আব্বাজান আপনার বিবির জন্য পঞ্চাশ হাজার দিনারের উপঢৌকন পাঠিয়েছেন। আর এ-চিঠিটি আপনার জন্য কথা বলতে বলতে সে আবু সামাত-এর হাতে একটি চিঠি গুজে দিল।


আবু সামাত চিঠি খুলে পড়তে লাগল। চিঠির বক্তব্য—তার আব্বা লােকমুখে তার বিপদের কথা শুনে বড়ই ভাবিত। ডাকুদের হাতে সবকিছু খুইয়ে নিঃস্ব অবস্থায় পরদেশে কিভাবে দিন গুজরান করছে তা নিয়েই সে ভেবে অস্থির। তার বিবির জন্য পঞ্চাশ হাজার দিনার মূল্যের উপঢৌকন পাঠিয়েছে। আর তার আম্মা পাঠিয়েছে বহুমূল্য অলঙ্কারাদি। তারা সবচেয়ে বেশী মর্মাহত হয়েছে সে অর্থাভাবে কোন এক তালাক দেওয়া লেড়কিকে শাদী করায়। শুধু তা-ই নয় তাকে তিন তালাক দিয়ে আবার তার আগের স্বামীর হাতে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে বলে। রুচিশীল সম্রান্ত আদমীদের কাজ এ নয়। শাদী হয়ে যাওয়ার পর সে তাে তার আইন সম্মত বিবি হয়ে যায়। অতএব সে নিজ ইচ্ছায় তাকে ত্যাগ না করলে কেউ-ই তাকে স্বামীর বুক থেকে ছিনিয়ে নিতে পারে তামাম দুনিয়ায় এমন কোন আইন নেই। বিবি যদি সত্যই তার পছন্দ মাফিক হয়ে থাকে তবে কিছুতেই যেন সে তাকে ত্যাগ না করে। আর সালিম-এর সঙ্গে যা কিছু পাঠিয়েছে তার অর্থমূল্য পঞ্চাশ হাজার দিনারেরও বেশী। যদি দরকার হয় এ থেকে শর্তের অর্থ মিটিয়ে দিয়ে বিবিকে যেন যথােচিত সম্মানের সঙ্গে ঘরে নিয়ে যায়। চিঠিটি হাতে নিয়েই আবু সামাত এক দৌড়ে তার বিবির কাছে যায়। তাকে চিঠিটি দেখায়। আর বলে তার আগের স্বামীর দশ হাজার দিনার এখন অনায়াসে শােধ দিতে পারবে।
জুবেদা স্বামীকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়ার কোশিস করে। ঠিক তখনই জুবেদার আব্বা তার আগের জামাতাকে নিয়ে কামরায় ঢােকে।
জুবেদা জিভ কেটে সসঙ্কোচে আবু সামাতকে ছেড়ে দু'পা সরে দাঁড়ায়।
জুবেদার আব্বা বলে—“বেটা সামাত, তুমি আমার জামাতা বাবাজীর কথা কিছু ভাব। রাগের মাথায় সে না হয় আমার বেটিকে তিন তালাক দিয়েই দিয়েছিল। সবই তাে তােমাকে বার বার বলা হয়েছে। এখন সে আমার বেটির বিরহে একেবারে মুষড়ে পড়েছে। তুমি তার বিবিকে ফিরিয়ে না দিলে তার পক্ষে এখন জান টিকিয়ে রাখাই সমস্যা। তুমি যদি ওর বাঞ্ছা পূরণ কর তবে সারা জিন্দেগী তােমার বান্দা হয়ে থাকবে। তুমি কি চাও ওর জিন্দেগী বরবাদ- 
       তাকে কথাটি খতম করতে না দিয়েই আবু সামাত বলে উঠল-দেখুন, এ কী তাজ্জব বাৎ বলছেন! কে, কার জিন্দেগী খতম করতে পারে ? আর কে-ই বা জিন্দেগী ভর কারাে বান্দা হয়ে থাকে, বলুন। এসব হচ্ছে গিয়ে মামুলি বাৎ। এবার কাজের কথা শুনুন, আল্লাহর দোয়ায় এখন আমার আর অর্থাভাব নেই। তাই জুবেদা-র আগের পক্ষের স্বামীকে শর্তের চেয়ে অনেক বেশী অর্থ দিতে চাচ্ছি। পথে সমানপত্র নিয়ে পঞ্চাশটি খচ্চর দাঁড়িয়ে রয়েছে, দেখে আসুন। সবই আমি তাকে দিয়ে দিচ্ছি। সে সঙ্গে বান্দা সালিম’কেও উপরি পাওনা হিসাবে পেয়ে যাবে। আর একটি বাৎ, আপনারা জুবেদার সঙ্গে বাৎচিৎ করে দেখুন, সে কি চায়। সে যদি এর সঙ্গে ঘর করতে রাজী থাকে তবে আমি নিঃশর্তে তাকেও ছেড়েছুড়ে চলে যাব। আমি কোন কিছুতেই গররাজী নই।
       জুবেদার আব্বা আবু সামাত-এর বাৎ শুনে তাজ্জব বনে গেল। যেন একেবারে আশমান থেকে পড়ল। এবার দু’পা’ এগিয়ে গিয়ে জুবেদার কাছে গেল। তার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বলল‘বেটি, তােমার কি মত, খােলসা করে বল। তুমি কার সঙ্গে ঘর করতে মন করেছ? তােমার বিরহে তােমার প্রথম পক্ষের স্বামী যে পাগলা হয়ে খানাপিনা ছেড়ে দিয়েছে। তােমাকে ফিরে পাবার জন্য কবুল করেছে। আমার বাৎ শােন বেটি, গােসসা হলে এমন কথা, এমন কাজ অনেক স্বামীই করে থাকে। দিমাক ঠাণ্ডা হলে পস্তায়। এর হালাৎ-ও হয়েছে ঠিক তা-ই। তুমি জিদ ছাড়। একে মাফ করে দাও। আবার নতুন করে তােমরা দুজনে ঘর-সংসার শুরু কর। 
        জুবেদা কামিজের কিনারায় আঙ্গুল দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল—“আব্বা, এখন আর আমি জিদটিদের কথা ভাবছি না। আসলে যাকে নিয়ে এতদিন ঘর করলাম সে একেবারেই বেকুব। বলতে পার কাণ্ডজ্ঞানরহিত। তুমি বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, ও একটি দিনের জন্যও তােমার বেটির দিলকে খুশী করতে পারেনি, পারেনি মুহুর্তের জন্যও মুখে হাসি ফোটাতে। তুমি আমার আব্বা, এর চেয়ে খােলাখুলি তােমাকে কি করে বােঝাই, দিমাকে আসছেনা, আর আমার নতুন স্বামী-সে সত্যিকারের মরদ। একটি লেড়কিকে খুশী করতে যা কিছু দরকার সবই তার মধ্যে রয়েছে। এতদিন আমি যে-যৌবনজ্বালা নিয়ে পলে পলে দগ্ধ হচ্ছিলাম একটিমাত্র রাত্রের দুটি প্রহরের মধ্যে ও আমার কলিজার জ্বালা-যন্ত্রণায় পানি ছিটিয়ে ঠাণ্ডা করে দিয়েছে। আমি পরম তৃপ্তি লাভে দিল ভরিয়ে নিয়েছি। জিন্দেগীতে যে এত খুশী, এত আনন্দ আর এত পরিপূর্ণ তৃপ্তি আছে আগে জানতাম না। আমার আগের স্বামী নিতান্ত পঙ্গুর মত পথ চলতে গিয়ে মাঝপথেই পা হড়কে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেত। সে না পেত আত্মতৃপ্তি, না পারত আমাকে তৃপ্তি দিতে। তারপর অতৃপ্তির জ্বালা কলিজায় নিয়ে উভয়ে রাতভর নিরবচ্ছিন্ন ছটফটানির মধ্যে দিয়ে কাটাতাম। সকাল হ'ত। আবার আসত রাত্রি। আবার শুরু হত না পাওয়ার যন্ত্রণায় দগ্ধ হওয়া। আকুল হয়ে তৃপ্তি চাইতাম। কিন্তু রাত্রি কাটত শুন্যতা আর হতাশার মধ্যে। আমি আজ নতুন করে জীবনকে উপভােগ করার নিশানা পেয়েছি। তুমি আব্বা হয়ে বেটিকে কি সে পথ থেকে ফিরে এসে আবার হতাশার সাগরে ডুব দিতে বলছ? তার চেয়ে ওকে বরং অন্য জায়গায় ধান্দা করতে বল। আমাকে জিন্দেগীর সুখটুকু নিঙড়ে নিতে দাও।
          জুবেদার বাৎ চলাকালীনই তার আগের স্বামী কপাল চাপড়ে, ইয়া আল্লা বলে মেঝেতে বসে পড়ল।  আবু সামাত তার মনমৌজী বিবিকে নিয়ে সুখে ঘর-সংসার করতে লাগল। প্রতিটি রাত্রি তাদের কাছে যেন নতুন বলে মনে হয়ে চলেছে। তাদের কারােরই চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে সামান্যতম ফাক রইল না। নিরবচ্ছিন্ন খুশীতে তাদের জিন্দেগী তিলে তিলে পরিপূর্ণতার পথে এগিয়ে চল।
আবু সামাত আর জুবেদার শাদীর পর নয়দিন কেটে গেল। দশমদিন সকালে আবু সামাত বলল—কী তাজ্জব ব্যাপার, দেখেছ বিবিজান! ওই চারজন দরবেশ, বিশেষ করে তাদের দলের সর্দারটি। কী ধাপ্পাই না দিয়ে গেল। হতচ্ছাড়া বলে গেল, তােমার আক্কেল সেলামির দশ হাজার দিনার আমরা সবাই মিলে বন্দোবস্ত করে দেব। ব্যস, তারপর একেবারে বেপাত্তা! তার ভরসায় থাকলে আমাকে গারদে ঢুকতে হত।
সন্ধ্যার আন্ধার নেমে আসার কিছু পরে আবু সামাত-এর ঘরে গান বাজনার মজলিস বসল। পুরােদমে গানা চলেছে এমন সময় দরওয়াজায় কড়া নাড়ার শব্দ হ’ল। আবু সামাত দরওয়াজা খুলেই দেখে সেই চারমূর্তিমান দরবেশ দাঁড়িয়ে। সে চোখে-মুখে বিদ্রুপের ছাপ ফুটিয়ে বলে উঠল—‘ধাপ্পাবাজদের বাদশারা আসুন—আসুন। খােদাতাল্লার দোয়ায় আপনাদের সাহায্য ছাড়াই আমার মুশকিল আশান হয়ে গেছে। অর্থের সমস্যা ইতিমধ্যেই মিটিয়ে ফেলতে পেরেছি। এবার মুহূর্তের জন্য ভেবে বল—“আপনারা যতই ফেরেববাজ, ধাপ্পাবাজই হােন না কেন আমার গরীবখানার মেহমান তাে বটে। আসুন, ভেতরে এসে বসুন আর দিল ভরে গান-বাজনা শুনে যান। 
      আবু সামাত এবার জুবেদার দিকে ফিরে বল্ল—“আমাদের সেফেরেববাজ মেহমানরা এসেছেন। আচ্ছা গানা কিছু গেয়ে শােনাও। আন্ধার রাতে তকলিফ করে এদের আসাটি যেন পুষিয়ে যায়।
জুবেদা সাধ্যাতীত দরদ দিয়ে, দিল উজাড় করে গান গাইল। তার গান শুনে মেহমান দরবেশরা খুশীতে ডগমগ।
গানা থামালে খলিফার সভাকবি আবু নাসার এবার ঠাণ্ডা গলায় আবু সামাত’কে মুচকি হেসে বলল —“তুমি কি করে বুঝলে যে, তােমার আব্বা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কায়রাে থেকে তােমার জন্য পঞ্চাশটি খচ্চর আর ঐসব সমানপত্র পাঠাতে পেরেছেন? তােমার কি মালুম নেই যে, যত সংক্ষিপ্ত পথ ধরে, যত শীঘ্র পথ পাড়ি দিয়েই আসা যাক না কেন পঁয়তাল্লিশ দিনের আগে কায়রাে থেকে কিছুতেই বাগদাদে আসা সম্ভব নয় ?
‘হ্যা, ঠিক বটে। ঘাড় নেড়ে ফ্যাকাসে মুখে আবু সামাত জবাব দিল।
     -এবার বিবেচনা কর, মাত্র দিন দশেক আগে তুমি ডাকুদের হাতে তােমার আদমিদের ও সমানপত্র খুঁইয়েছ। এত কম সময়ে তার কাছে খবরটি কি করে পৌঁছল, একবার ভেবেও দেখলে না? হিসাব জুড়লে দেখা যাবে এখান থেকে কায়রাে যেতে দেড় মাহিনা লাগবে। আবার কায়রাে থেকে ফিরতেও দেড় মাহিনার ব্যাপার।। এবার হিসাব জোড় তাে—তিন মাহিনা হয় কিনা ?
-শােভন আল্লাহ! বহুৎ গলতি হয়ে গেছে হুজুর। এরকম


Post a Comment

0 Comments