গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
দামাস্কাসের কারবার মিটিয়ে আবু সামাত আবার তাঁবু তােলে। মাহমুদও তাকে অনুসরণ করে।
এবার আলেপ্পা নগরীতে এসে আবু সামাত তাঁবু গাড়ল। মাহমুদ এখানে এসেও নােকরকে পাঠিয়ে একই কায়দায় আৰু সামাত'কে আমন্ত্রণ জানায়। কামাল-এর নির্দেশে আৰু সামাত এবারও একই কারণে নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে।
এভাবে বার বার আশাহত হওয়ায় মাহমুদ-এর দিলে জেদ চেপে যায়।
আলেপ্পা ছেড়ে যেখানে আৰু সামাত প্রথম তাঁৰু ফেলল সেখানে মাহমুদ নিজে হন্তদন্ত হয়ে তার তাঁবুতে আসে। একই কৌশলে তাকে নিজের তাঁবুতে আমন্ত্রণ জানায়। বলল—“আজ আমার বাবুর্চি বহুৎ কিসিমের মুখরােচক খানা পাকাচ্ছে। দু’জনে এক সঙ্গে বসে খানাপিনা করব, আমার দিল চাইছে। আজ আর কোন ওজর আপত্তিই শুনছি না।'
তার মুখের ওপর না বলতে সঙ্কোচ বােধ হ’ল। আমতা আমতা করে বলল—“ঠিক আছে, যাব।” আৰু সামাত চোস্ত-কোতা চাপিয়ে বেরােবার উদ্যোগ করছে। এমন সময় কামাল এসে পথ রুখে দাঁড়ায়। বেশ চোখ গরম করেই বলে—“বেটা, তুমি দেখছি সাচ্চা বেকুব! তামাম কায়রাের আদমি তাকে সর্বভুক’ বলে চেনে। একবার ভেবেও দেখলে না, আমি কেন বার বার নিষেধ করছি! আমি তােমাকে কিছুতেই মত দিতে নারাজ।
-“কিন্তু আমি যে রাজী হয়েছি। সবাই যা-ই বলুক না কেন, সে তাে আর আমাকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে না।
ইতিপূর্বে অনেককে কিন্তু সে চিবিয়েই খেয়েছে বেটা। আমার বাৎ শােন। রুখ যাও। আবু সামাত কিছুতেই দমল না। জবান দিয়েছে’, ‘কথার খেলাপ হবে’ এরকম সব যুক্তি দেখিয়ে জোর করে সে মাহমুদএর তাবুর উদ্দেশে ছুটল।
মাহমুদ আবু সামাত’কে নিয়ে একটি তাঁবুতে ঢােকে। টেবিলে হরেক কিসিমের খানা সাজানাে। গলা পর্যন্ত ঠেসে উভয়ে খানা পিনা সারল। দামী সরাব গিলল পেয়ালার পর পেয়ালা। সরাবের নেশায় মাহমুদ টলতে লাগল। আচমকা মাহমুদ হাত বাড়িয়ে আবু সামাত-এর মুখটিকে নিজের মুখের কাছে নিয়ে আসে। চুমু খেতে চেষ্টা করে। নেশা ধরলেও জ্ঞান তার পুরােমাত্রায় রয়েছে। তার ওপর কামাল-এর কথাগুলাে তাে মাথায় চক্কর মারছে। সে মাহমুদ এর মুখটিকে সজোরে এক ধাক্কা দিয়ে গর্জে ওঠে—এসব কি বে-আদবি! পিছিয়ে যান বলছি।
মাহমুদ-এর মন তখন চাঙা। হিংস্র শেরের মত দু’হাতে আবু সামাত-এর গলাটি জড়িয়ে ধরে। সজোরে তার মুখটিকে কাছে আনতে প্রয়াসী হয়। আবু সামাত ততােধিক বল প্রয়ােগ করে মুখ সরিয়ে নিয়ে গর্জে ওঠে—‘আপনার মতলবটা কি শুনি? এসব বেআদবির অর্থ কি ? কি চাইছেন?' কথা বলতে বলতে শরীরের সর্বশক্তি নিয়ােগ করে আবু সামাত মাহমুদকে এক ধাক্কা মেরে ছিটকে ফেলে দিল। এবার এক ফাঁকে তাবু থেকে বেরিয়ে আসে। এদিকে কামাল তার তাবুর বাইরে নিরবচ্ছিন্ন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে মাহমুদ-এর তাবুর দিক মুখ করে বসেছিল।
আবু সামাত উদভ্রান্তের মত ছুটতে ছুটতে তাবুতে ফিরে আসে। কামাল এগিয়ে যায়। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে—“বেটা, কি সমাচার। খােদার কসম, বল তাে ব্যাপার কি? আবু সামাত কণ্ঠস্বরে স্বাভাবিকতা আনার চেষ্টা করে করে। বলে—ব্যাপার আবার কি হবে? কিছু না। বহুৎ খানা পিনা হল। ব্যস, আর কিছু না।
কামাল তার নিস্তেজ চোখের মণি দুটো মেলে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আবু সামাত কণ্ঠস্বরে ব্যস্ততা প্রকাশ করে বলল-“আর এক মুহূর্তও দেরী নয়। যত শীঘ্র সম্ভব তাবু গুটিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে পড়া যাক।
—“বেটা তুমি মুখে বলছ বটে কিছু হয় নি, যাক গে, সমস্যা হচ্ছে এখন আর ওকে এখানে রেখে আমাদের একা পথ চলা নিরাপদ নয়। আর এ-মরুভূমির পথটিও সুবিধের নয়। বাদাবী ডাকুদের হামলা হুজ্জতি প্রায়ই হয়। বুড়াে কামাল-এর কথায় আবু সামাত মত পাল্টাল না। রাত্রেই তাবু গুটিয়ে তারা বাগদাদের উদ্দেশে যাত্রা করল। বাগদাদের ক্রোশ ছয়েক দূরে সূর্য অস্ত গেল। আবু সামাত সেখানে তাঁবু গাড়তে চাইল। কামাল বাধা দিল। জায়গাটি ভাল নয়। সে রাত্রের মধ্যেই বাগদাদে পৌছে যাবার পরামর্শ দিল। কারণ, এখানে মরুকুত্তার খুবই হামলা হয়। একবার তারা দলবেঁধে চড়াও হলে কামড়ে মাংস ছিড়ে খেয়ে নেয়। একটু জোর কদমে চললেই নগরের দরওয়াজা বন্ধ হওয়ার আগেই বাগদাদে পৌছে যাওয়া যাবে, কামাল বলল। কামাল-এর যুক্তি আবু সামাত-এর মনঃপূত হ’ল না। সে বলল—ইয়া আল্লা! মাঝরাত্রে বাগদাদ নগরে পৌছব—অসম্ভব। এত ব্যস্ততার কিছু নেই। সকালে সূর্য ওঠার সময় বাগদাদে পৌছলে তার শােভা দিল খুশ করবে, সন্দেহ নেই। তুমি তাে জান চাচা, কেবল সওদা করার উদ্দেশ্যেই আমি মুলুক ছেড়ে বেরােয় নি। আরব-দুনিয়াকে দেখে দিল আর চোখকে ধন্য করতে চাই।
আবু সামাত তাে আদতে কামাল-এর মালিক। বেশী ওজর আপত্তি করা ঠিক নয় ভেবে সে মুখে কলুপ এটে দিল।
সেখানেই তাঁবু গাড়া হ’ল। রাত্রে খানাপিনার পর সবাই নিদ গেল। আবু সামাত একটি পাকা বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে তাবুর বাইরে পায়চারি করে বেড়াতে লাগল। মরুভূমির ফুরফুরে বাতাস আর চাদনি রাত তার দিকে উতালা করে দিল। এক পা-দু’পা করে এগােতে লাগল। আচমকা ঘােড়া হাঁকিয়ে একদল বাদাবী ডাকু আবু সামাত-এর তাবুর ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। তরবারির আঘাতে সবাইকে কচুকাটা করে সমানপত্র, খচ্চর ও উটগুলাে নিয়ে তারা চম্পট দিল।
আবু সামাত দূরে দাঁড়িয়ে মর্মান্তিক দৃশ্যটি নীরবে প্রত্যক্ষ করল। তার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল। ভাবল, এখানে থাকা মােটেই আর নিরাপদ নয়। আবার কোন দল হুজ্জতি করতে এসে তাকেও সাবাড় করে দেবে। উপায়ান্তর না দেখে সে একাই রাতের আন্ধারে বাগদাদের পথে হাঁটতে লাগল। কিছু দূর গিয়ে দামী পােশাক গা থেকে খুলে ফেলে একটি মাত্র কামিজ ও ইজের পরে সে আবার হাঁটা জুড়ল। কামিজে ধূলােবালি মেখে, চুল উসকো খুসকো করে ভিখারীর বেশে সে ভােরের কিছু আগে বাগদাদ নগরের সদর দরওয়াজায় পৌছল। সদর-দরওয়াজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে এক বাগিচা দেখতে পেল। এক চবুতর পেয়ে গা এলিয়ে দেয়। ঘুমে বিভাের হয়ে পড়ে।
এদিকে মাহমুদও চুপ করে বসে নেই। অন্য এক আড়াআড়ি পথ ধরে বাগদাদের দিকে এগােতে থাকে। পরদেশীরা এ-পথ জানে না। এ-মুলুকের সব পথই তার নখদর্পণে। আর বাদাবী ডাকুরা এদিকে আসে না। তারা তাে ভালই জানে, পরদেশী সওদাগররা সমানপত্র নিয়ে এ-পথে বড় একটা যাতায়াত করে না। মাহমুদ বহাল তবিয়তে সদলবলে বাগদাদে পৌছে গেল। নগরে ঢােকার মুখে সবাই বাগিচায় ঢুকে হাত-মুখ ধুয়ে সাফসুতরা হয়ে নেয়। মাহমুদও ক্লান্ত দেহে সবাইকে নিয়ে বাগিচায় ঢুকল। উদ্দেশ্য হাত-মুখে পানি দিয়ে একটু জিরিয়ে নেবে। ফোয়ারার কাছাকাছি। গিয়েই সে আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ভিখারীর বেশে আবু সামাতকে চবুতরের ওপর শুয়ে নিদ যেতে দেখে আঁৎকে ওঠে।
এক রাত্রির মধ্যে তার এ-হাল হওয়া যে কল্পনাতীত ব্যাপারই বটে। খুশীতে তার কলিজাটি নাচানাচি শুরু করে দিল। ভাবল হতচ্ছাড়া কামাল নির্ঘাৎ এখন আর তার সঙ্গে নেই। বাগদাদে তার নিজের মকানে একে নিয়ে তোলা এখন আর কোন সমস্যাই নয়। সব খুইয়ে এখন আর বেগড়বাই করাও এর পক্ষে সম্ভব নয়। মাহমুদ যখন আপন ভাবনায় মসগুল তখন হঠাৎ আবু সামাত চোখ মেলে তাকায়। এতক্ষণ বিশ্রী একটি খােয়াব দেখছিল। আতঙ্কে নিদ চটে যায়। চোখে-মুখে শয়তানের হাসি ফুটিয়ে মাহমুদ বলল- কি হে, তােমার এ-হালৎ হ’ল কি করে? এখানে একা শুয়ে যে, হয়েছে কি ?
আবু সামাত উঠে বসল। চোখের পানি ঝরিয়ে গত রাত্রের মর্মান্তিক ঘটনার কথা সবিস্তারে তার কাছে ব্যক্ত করল। মাহমুদ চোখে-মুখে কৃত্রিম আক্ষেপের ছাপ ফুটিয়ে তুলে বলল-নসীবে যা ছিল ঘটেছে, কি আর করবে। নসীবের সঙ্গে লড়াই করে জেতা যায় না। সমানপত্রের জন্য ঘাবডিয়াে না। আমি তার চেয়ে ঢের বেশী সমানপত্র তােমাকে দিয়ে দেব’খন। কি আর করবে। এখানে, আমার এক মকান আছে, জানই তাে। চল, নাস্তা সেরে বিশ্রাম করে চাঙা হয়ে নাও। তারপর যা হয় ভেবেচিন্তে স্থির কোরাে।
আবু সামাত আমতা আমতা করতে লাগল। মাহমুদ একরকম জোর করেই তাকে ঘােড়ার পিঠে তুলে নিল।
মকানে নিয়ে গিয়ে মাহমুদ দোকান থেকে ভাল খানা খরিদ করিয়ে আনায়। তারপর আবু সামাত’কে নিয়ে এক সঙ্গে বসে নাস্তা সারে। দামী সরাব পান করতে দেয়। নিজেও কয়েক পেয়ালা গলায় ঢালে। মাহমুদ এবার ষাঁড়ের মত গলায় খিস্তি খেউড়ের গানা গাইতে থাকে। যত্তসব কাচা খিস্তি এক জায়গায় জড়াে করে গানের ভঙ্গিতে গাওয়া যাকে বলে। এ ধরনের কথাবার্তা সে কস্মিনকালেও শোনেনি। তার গা-পিত্তি জ্বলে যায়। সে এক লাফে কামরা থেকে বেরিয়ে সদর-রাস্তায় নেমে যায়। মাহমুদ বাধা দিতে চেষ্টা করে। সরাবের নেশা প্রতিবন্ধকতা করে। পা টলতে থাকে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতে চায়। দেয়াল ধরে কোনরকমে টাল সামলায়। ততক্ষণে আবু সামাত অনেক দূর চলে যায়। জনতার ভিড়ে মিশে লম্বা লম্বা পায়ে সে হাঁটতে থাকে। আবু সামাত সারা দিনমান পথে পথে হারা উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়ায়। রাত্রে একটি মসজিদে ঢুকল। কিছুক্ষণের মধ্যে দু’ আদমি তার পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। তাদের এক জন অতি বৃদ্ধ। চুল-দাড়ি সব পাকা। হাতে একটি লণ্ঠন। নিস্তেজ চোখের মণি। দুটো ছেলে আবু সামাত-এর দিকে তাকিয়ে বলল—“বেটা, তুমি কি পরদেশী-মুসাফির?’
আবু সামাত হাত কচলে বলল-“হ্যা। কায়রাে মুলুকে আমার ঘর। আমার আব্বা সওদাগর। তার নাম সামস-অল-দীন। কায়রাের ব্যাপারী সমিতির সভাপতি।
বৃদ্ধ তার সঙ্গীটির দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে এবার নীচু গলায় বলল-“আল্লাহ বােধ হয় আমাদের দিকে নজর দিয়েছেন। নইলে এত সহজে এক পরদেশী যুবককে পাব ভাবতেই পারি নি। ব্যাপারটি তাজ্জবই বটে।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
দু’শ’ একষট্টিতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ আবার কিসসা শুরু করলেন—“জাহাপনা, পাকা চুল-দাড়িওয়ালা বুড়ােটি, আবু সামাত’কে নিয়ে মসজিদের মেঝেতে বসল। তারপর বলল—'বেটা, বােধ হয় আল্লাতাল্লার মর্জিতেই তুমি এখানে হাজির হয়েছ। তােমার কাছে আমার একটি আব্দার আছে বেটা। একটি কাজ তােমাকে করে দিতে হবে। তবে মাগনা করাব না। ইনাম পাবে। পাঁচ হাজার সােনার দিনার নগদ দেব। এক হাজার দিনারের সমানপত্র আর এক হাজার দিনার দামের একটি ঘােড়া পাবে।
বৃদ্ধের বাৎ শুনে আবু সামাত অবাক মানে। ভাবে তাকে দিয়ে তারা এমন কোন কাজ হাসিল করতে চাইছে যার বিনিময়ে এত কিছু ইনাম দিতে ইচ্ছুক? সে আমতা আমতা করে বলে-“দেখুন, আমার হালৎ এখন ভিখ মাঙ্গার চেয়েও শােচনীয়। অর্থকড়ি আমার দরকার খুবই কিন্তু আমার তাে কোন কাজেরই অভিজ্ঞতা নেই। অতএব আপনাদের কোন উপকারে আমি লাগতে পারব বলে মনে করি না।
–‘বেটা, তােমাকে কিছু ভাবতে হবে না। তােমার চোখ-মুখ দেখেই আমার মালুম হয়েছে, তুমি পারবে।'
-“কিন্তু কাজটি কি তা-ও তাে আমার জানা দরকার।
-বেটা ইসলাম ধর্মের নিয়ম কানুন হয়ত তােমার জানা আছে বিবিকে পহেলা দফে তালাক দেওয়ার পর তিন মাস বাদে তাকে ঘরে তােলা যায়। দুরা দফে তালাক দিলেও একই নিয়মে তাকে ঘরে তােলা সম্ভব। কিন্তু তিন তালাক সারা হয়ে গেলে তাকে আর ঘরে তােলার বিধান শাস্ত্রে নেই। কিন্তু তার ব্যবস্থাও করে দেওয়া আছে। কারাে সঙ্গে সে বিবিকে শাদী দিয়ে দিতে হয়। নতুন স্বামীর সঙ্গে একরাত্রি বাস করতে হবে। তারপর তার দ্বিতীয় স্বামী তিন তালাক দিয়ে দিলে তখন আর প্রথম স্বামীর সঙ্গে নিকা বসার কোন বাধা থাকে না।
—সে না হয় বুঝলাম কিন্তু আমাকে কি করতে হবে, আগে শুনি।
–হ্যা বেটা, যে কথা বলতে চাইছি—কিছুদিন আগে আমার লেড়কির সহিত এর খুব বিবাদ হয়। এর সঙ্গে লেড়কির শাদী দিয়েছিলাম। রাগ সামলাতে না পেরে এ-লেড়কাটি আমার বেটিকে এক সঙ্গে তিন তালাক দিয়ে দেয়। ঝামেলা চুকে গেল। আমার লেড়কি বােরখা পরে ফেলল। তার স্বামী তার কাছে পরপুরুষ বনে গেল। লেড়কি আমার মকানে ঘুরে এল। কিন্তু তার তালাক দেওয়া এ-স্বামীটির দিমাক ঠাণ্ডা হলে কপাল চাপড়ে কাদতে বসল। চোখের পানি সেই থেকে ঝরিয়েই চলেছে। সব রাস্তা তাে তিন তালাকে বন্ধ করে দিয়েছে। এখন ফিকির তল্লাস করে বেড়াচ্ছে। আমি তাে জানি, দিমাক গরম করে হঠাৎ কাজটি করে বসেছে। আদতে তারা একে অন্যকে কলিজার চেয়েও পিয়ার মহব্বৎ করে। তা নইলে তিন তালাক দেয়া লেড়কিকে ফিরে পাওয়ার জন্য কেউ এমন উতলা হয়, তুমিই বল বেটা?’
–বুঝলাম। তারপর ?
-বেটা, তােমাকে একটু সদয় হতেই হবে। তবে তােমাকে দেখে মনে হচ্ছে, খুবই দৈন্যদশা চলছে তােমার। এমন সময়ে যদি এতগুলাে দিনারই কেবল নয়, এক রাত্রের জন্য হলেও খুবসুরৎ একটি লেড়কিকে ভােগ করার সুযােগ হাতের মুঠোয় পেয়ে ছেড়ে দাও তবে বােধ হয় তােমার পক্ষে ঠিক হবে না। বেটা রাজী হয়ে যাও। তােমারও অবস্থা ফিরুক আর এ নওজোয়ানটিও তার কলিজার সমান বিবিকে বুকে ফিরে পাক। নিজের শােচনীয় আর্থিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে আবু সামাত অসম্মানজনক ও অপ্রীতিকর প্রস্তাব হলেও বৃদ্ধকে মত দিয়ে দিল। বৃদ্ধের পাশে বসে থাকা নওজোয়ানটির মুখে হাসি ফুটল। সে আচমকা আবু সামাত-এর হাত দুটো চেপে ধরে উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে বলে উঠল—“খােদা মেহেরবান! আপনার দোয়ায় আজ আমাদের মস্তবড় এক সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। ধন দৌলত দিয়ে আপনার এ ঋণ শােধ হবার নয়। আদতে তখন আমার মাথায় খুন চেপে গিয়েছিল। সামলাতে না পেরে ঝোকের মাথায় কাজটি করে ফেলি। তারপর দিমাক একটু ঠাণ্ডা হলে নিজেই নিজের হাত কামড়াতে থাকি। মুসলমানের লেড়কা। জবান তাে আর পাল্টাতে পারি না। ব্যস, পড়ে গেলাম গাড্ডায়। এবার একটু আমতা আমতা করে নওজোয়ানটি বলল-“দেখুন বাৎচিৎ পাকা হয়ে গেল বটে। আপনার সঙ্গে শাদী মিটেও গেল, কিন্তু যদি রাতারাতি আপনার দিল বিগড়ে যায়? যদি আপনি আর তাকে তিন তালাক দিতে রাজী না হন, তখন? বিবির সুরৎ যদি আপনার দিল গলিয়ে দেয়। তাই যদি শাদীর আগে লিখিত চুক্তি করে নেয়া যায়। তবে আপনি গররাজী নন তাে?”
চুক্তি? কেমন হবে সে-চুক্তি, শুনতে পারি কি?
-মনে করুন, শাদী হয়ে গেল। আপনি শাদীর পর তাকে আর তিন তালাক দিয়ে ছাড়লেন না। তাই যদি হয় তবে আপনাকে একটি জরিমানা দিতে হবে। স্বাক্ষর করে দেবেন শর্ত ভঙ্গ করলে দশ হাজার সােনার দিনার দিতে আপনি বাধ্য থাকবেন। আমি তখন সে পরিমাণ অর্থ আপনার কাছে দাবী করব। প্রয়ােজনে আইনের সাহায্য নেব।
—“তাই বলুন, এরকম শর্ত? সরবে হেসে আবু সামাত বলে উঠল, আমি এতে এক পায়ে খাড়া। শর্ত ভঙ্গ করলে তবে তাে জরিমানা দাবী বা শাস্তির ব্যাপার। পাগল, ও পথই আমি মাড়াচ্ছি না। বৃদ্ধ এবার তাদের দুজনকে নিয়ে কাজীর দরবারে হাজির হ’ল। শাদীর কবুলনামা ও চুক্তিনামা বানানাে হ’ল। স্বাক্ষরও হ’ল।
বৃদ্ধ এবার তার নতুন জামাতাকে নিয়ে ঘরে ফিরল। লেড়কিকে সব বৃত্তান্ত খােলসা করে বলল।
লেড়কির আম্মা আবু সামাত’কে বসিয়ে রেখে লেড়কিকে সাজিয়ে গুছিয়ে পাঠাবার নাম করে চলে গেল।
এদিকে বেচারী নওজোয়ান পুরনাে স্বামী তাে হিংসায় জ্বলে পুড়ে খাক হতে লাগল। এক রাত্রির জন্য হলেও তার বিবিকে অন্য এক নওজোয়ান সম্ভোগ করবে, কোন স্বামী সহ্য করতে পারে! উপায়ান্তর না দেখে সে এক ডাইনী বুড়িকে ধরে নিয়ে এল। কথা দিল, প্রচুর ইনাম দেবে। একটি মাত্র রাত্রি বাসর ঘরে থেকে সদ্য বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর কামকাজ—দাপাদাপি বন্ধ করার জন্য।
এদিকে বাসর ঘরে আবু সামাত পালঙ্কের ওপর বসে স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করছে। একটি মাত্র রাত্রির সুযােগ এরই মধ্যে যেটুকু মজা লুঠে নেওয়া যায়।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
দুশ’ বাষট্টিতম রজনী
রাত্রি একটু গভীর হলে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন-জাহাপনা, আবু সামাত পালঙ্কের ওপরে বসে সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করছে। এমন সময় লাঠি ভর দিয়ে ডাইনী বুড়ি সে কামরায় ঢুকল। আবু সামাতকে জিজ্ঞাসা করল–‘বেটা, যে-লেড়কিটিকে তার স্বামী তালাক দিয়েছে তাকে কোন কামরায় মিলতে পারে বলতাে? আর বােলােনা, দাওয়াই মালিশ করে কি আর কুষ্ঠরােগের আরাম
( চলতে থাকবে )

0 Comments