গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
সবার সঙ্গে কিছু জান পরিচয় হওয়া খুবই দরকার। কেনা-বেচার তারিকাগুলাে সম্বন্ধে জ্ঞানগম্যি থাকা দরকার। আমার যা তবিয়ৎ, কবে কি হয়ে যায়, কে জানে।
সামস্-অল-দিন এবার লেড়কাকে ডেকে বলল-“বেটা কাল আমার সঙ্গে দোকানে গিয়ে কারবারের তারিকাগুলাে আস্তে আস্তে শিখে নেবে। আমার বাৎ শুনে তােমার দিল হয়ত খুশীতে ডগমগ হয়ে উঠছে। তবে হুশিয়ার। দুষ্ট লােকের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলবে। কে তােমার দোস্ত আর কে বেইমানী করতে পারে তা তােমার মৌলভী সাহেবের কাছ থেকে শেখা বিদ্যা প্রয়ােগ করে যাচাই করে নেবে।
কিসসার এ পর্যন্ত বলার পর ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
দু’শ’ চুয়ান্নতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শাহরিয়ার বেগম শাহরাজাদ এর কামরায় হাজির হলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, পরদিন ভােরে সামস-অল-দিন তার লেড়কা আবু সামাত’কে খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে বাজারে নিজের দোকানে নিয়ে গেল। দোকানের গদিতে নিজে সামনে বসে, আর লেড়কাকে বসায় পিছনে, আবডালে। দোকানের খরিদ্দার ও পথচারীরা আবু সামাত-এর দিকে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে। কেউ বা পঞ্চমুখে তার সুরতের প্রশংসা করে।
সেদিন সে-নেশাখাের লােকটি সামস-অল-দিন-এর দোকানে আসে। তার নেশা তখন একেবারে তুঙ্গে। আবু সামাত’কে দেখে সে চোখ দুটো কপালে তুলে বলে-“কি হে ব্যাপারী, এ কে ? আশমানের চাঁদ যে জমিনে নেমে এসেছে। কে, চিনতে পারলাম না তাে?
লােকটি চরস টেনে একেবারে কুঁদ। সে-ই যে দাওয়াই বানিয়ে দিয়ে ব্যাপারীর লেড়কা পয়দা হওয়ার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল সে খেয়াল তার নেই। খেয়াল থাকার মত এখন অন্ততঃ তার অবস্থা নয়। সে মস্করা জুড়ে দেয় ব্যাপারীর চুল-দাড়ি সফেদ হলে কি হবে।
শরীরে এখনও হাতীর তাগদ ধরে নইলে এ বয়সে এমন খেল দেখাতে পারে কখনও! একে বলে চরসের নেশা। গাঁজা-চরসের নেশাই এমন পাজী। একবার কোন প্রসঙ্গ শুরু করলে আর তার মুখের লাগাম থাকে না। একই কথা তার জিভের ডগায় চক্কর মেরে বেড়ায়। শুধু নিজে বলেই ক্ষান্ত দিল না। পথচারী ও অন্যান্য দোকানীদের ডেকে বলতে লাগল—এই দেখ, বুড়া হাড্ডির খেল দেখ! অমাবস্যায় পূর্ণিমার চাঁদের হাট বসিয়েছে ব্যাপারী সামস-অল-দিন।
মাতালটি নিজের রসিকতায় নিজেই হাে হাে রবে হাসতে থাকে। তবে কিছু কিছু দোকানীও তার সঙ্গে তাল যে দিল না তা-ও নয়। এবার বাজারের দোকানীদের মাথায় ব্যাপারটি খেলতে থাকে। তারা এক জায়গায় জড়াে হয়ে আলােচনা করে, বুড়াে সামস-অলদিন এ লেড়কাকে পেল কোথায়? লেড়কার এত উমর হ’ল, কেউ জানল না, শুনল না? দোকানীদের সভায় সামস-অল-দীন-এর তলব পড়ল। মাতাল সামসাম ঠোটের কোণে বিদ্রপের হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল—‘সভার মাঝখানে আমি ব্যাপারী সমিতির সভাপতি সামস অল-দীন-এর ইজ্জৎ হানি করতে চাই না। কিন্তু আপনারা সবাই বিচক্ষণ ব্যক্তি। বিচার-বিবেচনা করে দেখুন—তিনি হঠাৎ চৌদ্দ পনের সাল উমরের লেড়কাকে কোথায় পেলেন? আমার মতে, এরকম এক অসৎ আদমিকে ব্যাপারী সমিতির সভাপতির পদে না রেখে অন্য কাউকে এ-পদে বহাল করা হােক।'
মাতাল হলেও সামসাম অকাট্য যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। তাকে খণ্ডন করা কারাে পক্ষেই সম্ভব হ’ল না। ব্যাপারটি অনেক দূর গড়াল বটে। দোকানীরা এবার থেকে সামস-অল-দীন’কে সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে চলতে লাগল। বাৎচিৎ, হাসি-মস্করা করা তাে দূরের কথা কেউ তার দোকানের দিকে তাকায়ও না। একদিন যে নেশাখাের দালাল তার সবচেয়ে বড় হিতাকাঙ্ক্ষী ছিল সে-ও ঘাড় ঘুরিয়ে তার দোকানের সামনে দিয়ে চলে যায়। সামস-অল-দীন অন্ততঃ নেশাখাের দালাল সামসাম-এর এরকম আচরণকে দিল থেকে মেনে নিতে পারল না। সেদিন বিকালেই সামসাম তার দোকানের সামনে দিয়ে যাবার সময় হাঁক দিল-ও সামসাম ভাইয়া, আদৎ ব্যাপার কি বল তাে? আজ সকালে আমাকে সবাই ফতিয়াহ শুনিয়ে গেল। তােমরা কেউ আমার দোকানের ত্রিসীমানায়ও আসছ না। হয়েছে কি, খােলসা করে বল তাে।
বার কয়েক ক্ষয়কাশের রােগীর মত খুক খুক করে কেশে সামসাম বলল-“কি জানি ভাইয়া, আমি তাে কিছু জানি না। কিন্তু এমন তাজব সব কথা বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে যা কান পেতে শােনা যায় না। শুনলে গা ঘিন ঘিন করে। আপনার মত এক ধর্মাশ্রয়ী এক বুড়া আদমির নামে এমন সব বাৎচিৎ শুনে আমারও উল্টি আসছিল। সামস-অল-দীন-এর মুখ চকের মত ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কলিজাটি মােচড় মেরে উঠল। নিজেকে একটু সামলে সুমলে নিয়ে এবার বলল-“কিন্তু আমার গুস্তাকী কি তা-তাে জানা দরকার। এমন কি গুনাহ আমি করলাম যে, সবাই আমার দিকে বিদ্রুপের দৃষ্টিতে চাইছে?
সামসাম এবার সামস-অল-দীন-এর দিকে ঝুঁকে, গলা নামিয়ে বলল—“দেখুন আমি আপনার জিগরী দোস্ত। আমার কাছে ছাপাবার কিছু নেই, মানছেন তাে?'
‘হ্যা, আমিও তােমাকে তামাম দুনিয়ায় আমার জিগরী দোস্ত, সবচেয়ে বড় হিতাকাঙ্ক্ষী মনে করি।
-“তাই যদি হয় তবে মন খােলসা করে বলুন তাে, এমন খুবসুরৎ লেড়কাটিকে কোন্ কাজে দোকানে এনে বসিয়েছেন? অন্য সবাই যেসব ঝুট বাৎ চাউর করে বেড়াচ্ছে আমি তার তীব্র প্রতিবাদ করেছি। সবাই আপনার বিরুদ্ধে পঞ্চমুখে কুৎসা রটাচ্ছিল। একমাত্র আমিই আপনার পক্ষে মােসাবিদা করি। আমি গলা চড়িয়ে বলেছি, বুড়াকালে ব্যাপারী সামস-অল-দীন যদি কোন খুবসুরৎ কচি লেড়কার প্রতি আসক্ত হয়েই থাকেন তবে সে খবর সবার আগে আমার কাছেই আসত। কারণ, কায়রাে নগরে যেসব বুড়াে হাবরার এসব বিমারি রয়েছে তা আমার নখদর্পণে। আমি ছাড়া কে কচি ও খুবসুরৎ লেড়কাকে জোগান দেবে? ঘাবড়াবেন না সাহাব, আমি বলেছি, কচি লেড়কাটি নির্ঘাৎ তার বিবির কোন নিকট আত্মীয়। তবে আপনার রুচি জব্বর সাহাব। বেড়ে লেড়কা জোগাড় করেছেন। তামাম কায়রাে নগর ঢুঁড়ে এলেও এমন খুবসুরৎ কচি লেড়কা দ্বিতীয় আর একটি মিলবে না।
ইতিমধ্যে ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
দুশ’ পঞ্চান্নতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসা শুরু করলেন—“জাহাপনা, এবার কিসসা বলছি শুনুন, মাতাল সামসাম-এর মুখ থেকে অপ্রীতিকর বাৎ শুনে সামসঅল-দীন তীব্র প্রতিবাদ করল—তােমাকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি, মুখ সামলে বাৎ করবে সামসাম! তুমি কি অতীতের সব বাৎ গুলে খেয়েছ? লেড়কা পয়দা করার দাওয়াই তুমিই না একদিন আমাকে বানিয়ে দিয়েছিলে, ভুলে গেছ?’
‘তা দিয়েছিলাম বটে সাহাব। কিন্তু লেড়কা কি চৌদ্দ-পনের সাল তার আম্মার পেটেই ছিল ? কবে তিনি লেড়কা বিয়িয়েছেন, শুনি নি তাে। আর এতদিন চোখেও তাে দেখি নি।
‘আমার বাৎ খেয়াল কর সামসাম। তােমার বানানাে দাওয়াই খেয়ে আমার বিবি এ-লেড়কা পয়দা করে। তারপর থেকে চৌদ্দপনের সাল তাকে আমি কামরায় আটক রেখেছিলাম। শয়তান আদমির কুনজরে পড়ে এ ডরেই আমি তাকে কামরা থেকে বেরােতে দিতাম না। আজ এই প্রথম একে দোকানে এনে বসিয়েছি। কারবার, তারিকা সব জানা দরকার। আমি গােরে গেলে একেই তাে কারবার দেখতে হবে। আমার বিষয় সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী তাে এ-ই হবে। তােমাকে বলি বলি করেও এতকাল বাৎটি বলা হয়ে ওঠে নি। তুমিই তাে আমার মুখে হাসি ফুটিয়েছ সামসাম, অস্বীকার করতে পারবে না। এই যে এক হাজার সােনার দিনার তােমাকে ইনাম স্বরূপ দিলাম। এই নাও-ধর। এবার মাতাল সামসাম-এর পুরাে ব্যাপারটি মনে পড়ে। না, আর কোন দ্বিধা থাকতে পারে না। এ-লেড়কা বুড্ডা সামস-অলদীন-এরই বটে।
সে এবার দোকানে দোকানে ঘুরে সবাইকে ব্যাপারটি বলে নিজের ভুলের জন্য মাফ চায়। দোকানীরাও সামস-অল-দীন-এর কাছে এসে ত্রুটি স্বীকার করে মাফ চেয়ে যায়। পরদিন সামস-অল-দীন বাজারের সব দোকানীকে নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াল। তখন নিমন্ত্রিতদের মধ্যে সামস অল-দীন-এর এক আমীর খদ্দেরও উপস্থিত ছিল। মাহমুদ তার নাম। অগাধ ধন-দৌলতের মালিক।
মাহমুদ মাঝবয়সী। অতি অমায়িক সজ্জন।
খানাপিনা সেরে বিশ্রাম করার সময় মামুদ কিশাের আবু সামাত’কে কাছে ডেকে বলে—“তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে বেটা? আমরা এতক্ষণ কী সুন্দর এক কিসসা শুনছিলাম! তুমি থাকলে শুনতে পেতে।
–“কিসসা? কিসের কিসসা ? কেমন কিসসা হচ্ছিল ?
—সে বহুৎ কিসিমের কিসসা । বাগদাদ, দামাস্কাস আর আলেপ্পা প্রভৃতি মুলুকের চটকদার বহু কিসসা। আচ্ছা তােমার আব্বা তাে বহুৎ বড় বণিক। অবশ্যই তুমিও তার সঙ্গে বহুৎ মুলুক ঢুঁড়ে বেড়িয়েছ। সে সব মুলুকের কিসসা কিছু বল না শুনি।
‘আমি? আমি শােনাব কিসসা! শােভন আল্লা! আপনারা হয় তাে জানেন না, আমি পয়দা হওয়ার পর থেকে আমাকে কামরায় আটক করে রাখা হয়েছিল। কোন আদমির সঙ্গেই আমাকে মেলামেশা করতে দেয়া হয় নি। সবে দু’দিন আগে আমাকে কামরা থেকে বের হতে দেয়া হচ্ছে। আমার আম্মা জেদ না ধরলে আব্বাজান আমাকে এখনও দোকানে নিয়ে যেতেন না।
--সে কী? হায় খােদা! খােদা হাফেজ! দুনিয়ার রূপ-রসগন্ধ থেকে তিনি তােমাকে এতদিন বঞ্চিত রেখেছিল? ঘর ছেড়ে না বেরােলে দুনিয়াকে কি বােঝা যায় কখনও ?'
‘আপনার বাৎ সাচ্চা, মানছি। কিন্তু ঘরের আকর্ষণ আবার আলাদা।
-বেচারা! তুমি বাছা কূপমণ্ডুক হয়েই রইলে। একমাত্র লেড়কিরাই চারদেয়ালে ঘেরা কামরায় আটকা পড়ে থাকে।
মাহমুদ-এর কথায় আবু সামাত-এর পৌরুষে ঘা লাগে। আম্মার কাছে ছুটে এসে মাহমুদ-এর ব্যঙ্গোক্তির কথা বলে। রাগে ফুসতে ফুসতে বলে—“আমি আর বন্দী-জীবন যাপন করব না। তােমরা আমাকে বাধা দিলে একদিন বুকে ছুরি বসিয়ে আত্মঘাতী হয়ে যাব বলে দিচ্ছি।' তার আম্মার চোখে পানি দেখা দিল। লেড়কাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল—“আমি তােমার আব্বাজানের সঙ্গে পরামর্শ করব। তিনি যাতে তােমার বিদেশ যাত্রার বন্দোবস্ত করেন, তদ্বির করব। তিনি রাজী না হলে আমি আমার গহনাপত্র বিক্রি করে সওদাগরি সমানপত্র কিনে তােমার পরদেশে যাত্রার বন্দোবস্ত করে দেব, কথা দিচ্ছি।
এবার আবু সামাত-এর মা বাড়ির নােকরকে ডেকে বলল—‘গুদাম খুলে দেখ, কাপড় চোপড় কি আছে। সব বের কর।
এদিকে মেহমানরা ভােজ খেয়ে বিদায় নিলে সামস-অল-দীন অন্দরমহলে এল। সামস-অল-দীন দেখল নােকররা গুদাম থেকে কাপড় চোপড়ের গাঁটরি টানাটানি করে বের করছে। জিজ্ঞাসাবাদ করে জানল, আৰু সামাত-এর মায়ের নির্দেশেই তারা এসব করছে।
ব্যস্ত পায়ে সামস-অল-দীন অন্দরমহলে এল।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
দুশ’ সাতান্নতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ আবার কিসসা শুরু করলেন—‘জাহাপনা,সামস্-অল-দিন বিবির কাছে এসে বেশ একটু রাগত স্বরেই বলল—এসব হচ্ছে কি শুনি? গুদাম থেকে সব কাপড়ের গাঁটরা বের করা হচ্ছে যে বড় ?
আবু সামাত-এর আম্মা ঠাণ্ডা মাথাতেই জবাব দিল শােন তােমার বেটার উমর হয়েছে, সে বাণিজ্যে যেতে চায়, তাই সমানপত্র বের করে দিচ্ছি।'
-বাণিজ্যে যাবে! সে কী কথা! কোথায় যেতে মন করেছে?
-“বলছে তাে দামাস্কাস, বাগদাদ আর আলেপ্পা প্রভৃতি মুলুকে যাবে।
–‘ইয়া আল্লা! বলছ কী বিবিজান! আমি কিছুতেই তাকে পরদেশে যেতে দিচ্ছি না।
এবার সে আবু সামাত’কে ডেকে বলল-বেটা, শুনলাম তােমার পরদেশে যেতে মন চাইছে? এসব বদখেয়াল শির থেকে নামাও। আমাদের পয়গম্বরের বাণী—যে নিজের মুলুকে থেকে সুখ-ভােগের সন্ধান করে সে-ই যথার্থ সুখ লাভ করে। নিজের মুলুক ছেড়ে তােমার অবশ্যই -
আব্বার মুখের বাৎ ছিনিয়ে নিয়ে আবু সামাত বলল‘আব্বাজান, আপনি হয়ত আমাকে আপনার অবাধ্য লেড়কা মনে করবেন, কিন্তু আমি নাচার। যাবাে যখন মন করেছি আমি যাব-ই যাব। এতে যদি আমাকে রিক্ত হাতে ঘর থেকে পা ফেলতে হয় তাতেও পিছুপা হব না।' দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামস-অল-দিন বলল—“বহুৎ আচ্ছা, আমি পঞ্চাশ গাটরি কাপড়া সাথে দিয়ে দিচ্ছি। কোন্ নগরে, কোন্ কিসিমের কাপড়া বিকাবে সব বাৎলে দেব। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে পথ পাড়ি দেবে। খােদাতাল্লা তােমার সহায় হােন। খেয়াল রাখবে, মরুভূমির ভয়ঙ্কর সব কুত্তা জীবন সংশয় করে তােলে। আর বাদাবী ডাকুরা যেন তােমার জান খতম আর সমানপত্র লুঠতরাজ না করে।
ছয়টি উটের পিঠে সমানপত্র তােলা হ’ল। আবু সামাত-এর আম্মা চোখের পানি দিয়ে লেড়কাকে বিদায় জানাল। কামিজের তলা থেকে একটি ছােট্ট পুটুলি বের করে লেড়কার হাতে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল—এতে এক হাজার সােনার দিনার আছে। বিপদ আপদে কাজে লাগিও। আর উট চালকদের সর্দার কামাল এর বুদ্ধি পরামর্শ মত কাজ করবে।
আব্বা আর আম্মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবু সামাত উটের পিঠে উঠল। আবু সামাত বিকেলের দিকে কায়রাে নগরের সীমানা পেরিয়ে অগ্রসর হতে লাগল। মাহমুদ লােক মারফৎ খবর পেয়েছে আবু সামাত সমানপত্র নিয়ে পরদেশে বাণিজ্য করতে চলেছে। সে তাকে অনুসরণ করল।
কায়রাে নগর থেকে প্রায় তিন ক্রোশ দূরে আবু সামাত-এর সঙ্গে মাহমুদ-এর ভেট হয়। মাহমুদ-এর উট, ঘােড়া আর খচ্চরের এক বিশাল বাহিনী। পথ পাড়ি দিতে দিতে সে স্বগতােক্তি করছে—“মাহমুদ তুমি মরুপ্রান্তরে যথেচ্ছ আচরণ কর। কেউ দেখবে না, আড়িও পাতবে না কেউ। তােমার সঙ্গে এক নিরীহনম্র কিশাের। তাকে নিয়ে আনন্দ-সায়রে ডুবে থাক, বাধা দেবার কেউ-ই নেই। দেদার মজা লুঠে নাও। আবু সামাত এক বিস্তীর্ণ প্রান্তরে তাঁবু ফেলল। তার অদূরে তাঁর ফেলল মাহমুদ। মাহমুদ আবু সামাত-এর উটের দলের সর্দার কামাল’কে ডেকে বলল—“তােমরা তাে দলে মাত্র কয়েক জন। আলাদা খানা পাকাবার দরকার নেই। আমার বাবুর্চি যা খানা পাকাবে তা দিয়েই সবার চলে যাবে। সন্ধ্যার কিছু পর মাহমুদ কামালকে তলব করে বলল—'এক কাজ কর, তােমাদের মনিবকে একবারটি আমার তাঁবুতে আসতে বলবে কি?
মাহমুদ-এর আমন্ত্রণে আবু সামাত তার তাঁবুতে এল। একা নয়, কামাল এল সঙ্গে। মাহমুদ সন্তুষ্ট হ’ল না। মুখ ব্যাজার করে মামুলি কিছু বাৎচিৎ করল। উদ্দেশ্য সিদ্ধ হ’ল না। আবু সামাত আবার তাঁবু তুলে যাত্রা করল। মাহমুদও সদলবলে তার পিছু নিল।
আবু সামাত দিনের শেষে আবার তাঁবু গাড়ল। তার কিছু দূরে মাহমুদ-এর তাঁবু পড়ল। মাহমুদ আবার আবু সামাত’কে তার তাঁবুতে আমন্ত্রণ জানাল। আবু সামাত এল কিন্তু একা নয়। কামাল তার সঙ্গে এঁটুলির মত লেগে রইল। মহা মুশকিল। আবার মামুলি বাৎচিৎ সেরে মাহমুদ তাকে বিদায় দেয়। এরপর থেকে আবু সামাত যতবার তলব পেয়ে মাহমুদ-এর তাঁবুতে যায় ততবার কামাল ছায়ার মত তাকে অনুসরণ করতে থাকে। মাহমুদ কিন্তু হতাশ হয়ে হাল ছাড়ল না। এভাবে নানা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আবু সামাত দামাস্কাস নগরে উপস্থিত হ’ল। মাহমুদ রইস আদমি। অগাধ ধন দৌলতের মালিক। দামাস্কাস, কায়রাে, বাগদাদ এবং আলেপ্পায় তার একটি করে প্রাসাদোপম মকান রয়েছে। ইয়ার দোস্তদের নিয়ে এসব মকানে এসে আনন্দ ফুর্তি করে যায়।
দামাস্কাস নগরের মুখে আবু সামাত তাঁবু গাড়ল। আর মাহমুদ তার নিজের পাক্কা মকানে গিয়ে আশ্রয় নিল। সন্ধ্যার কিছু আগে এক নােকরকে ভেজল আবু সামাত-এর তাঁবুতে। সে আবু সামাত’কে বলল—“আমার মালিক আপনাকে তলব করেছেন। বলেছেন, আপনাকে একেলা যেতে। এক সাথে খানাপিনা সারবেন।
‘বহুৎ আচ্ছা। একটু অপেক্ষা কর। আমার উট চালকদের বুড়াে সর্দার কামাল’কে একবারটি জিজ্ঞেস করে আসি। একটু বাদে ফিরে এসে বলল—‘দুঃখিত। আমার যাওয়া সম্ভব নয়। আমাকে একেলা ছাড়তে কামাল-এর মন নাই।
দামাস্কাসের কারবার মিটিয়ে আবু সামাত আবার তাঁবু তােলে। মাহমুদও তাকে অনুসরণ করে।
এবার আলো নগরীতে এসে আবু সামাত তাঁবু গাড়ল।
( চলবে )

0 Comments