আরব্য রজনী পার্ট ৬৮ ( Part 68)

পরবর্তী অংশ ঃ 
-চুপ কর! খােদাতাল্লার দোহাই দিয়ে নিজের থেকে আমাকে একটু একেলা থাকতে দাও। ঝুটমুট আমাকে বিরক্ত করতে এসাে না। নিজের কাম কাজ কর গে। চল্লিশ সাল আগে শাদী হয়েছে। আজ পর্যন্ত যে একটি লেড়কা বিয়াতে পারল না তার মুখে আর বড় বড় বাৎ সাজে না। তাদের তাে খােদাতাল্লার ওপর দোষ চাপানাে ছাড়া আর কোন হিম্মৎ নেই। আমি বহুবার আর একটি শাদী করে নতুন বিবি আনতে চেয়েছিলাম। তুমি বার বারই চোখের পানি ফেলে পথ আগলে দাঁড়িয়েছ। কি ফায়দা হ’ল? আমার জিন্দেগী বরবাদ হ’ল। ব্যস, খেল খতম। তােমার তাে নিজে থেকেই বলা দরকার ছিল দেখ, আমার বাল বাচ্চা পয়দা করার হিম্মৎ নেই, তুমি বরং আর একটি শাদী করে শখ মেটাও। তুমি আটকুঁড়ি। তােমার হাতে খাওয়া, তােমার সঙ্গে সহবাস করা তাে দূরের কথা তােমার মুখ পর্যন্ত দেখার মত উৎসাহ আমার নেই। তােমাকে ছুঁতে আমার গা ঘিনঘিন করে। তােমার মত বাজা জনানার মুখ দেখলেও অযাত্রা। গুনাহ হয়। তুমি আর আমার সামনে ও-পােড়া মুখ নিয়ে এসে কোনদিন দাঁড়িয়াে না।

বণিকের বাৎ তার বিবির ইজ্জতে লাগল। সে এবার উগ্রমূর্তি ধারণ করল। রীতিমত রুখে দাঁড়াল-“দেখ, তখন থেকে যা নয় তাই বলে যাচ্ছ। মুখ সামলে বাৎচিৎ বলবে, হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি। নিজের হিম্মৎ নেই, আর যত কসুর আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজে খালাস হয়ে যাচ্ছে। তােমার শরম হয় না! এক রাত্রির জন্য কি তুমি আমাকে সম্ভোগের সুখ দিতে পেরেছ ? আমাকে তুমি ‘আটকুঁড়ি’, ‘বাজা’ যা নয় তা-ই বলে গালমন্দ করছ। কিন্তু কেন ? কেন আমি লেড়কা বিয়াতে পারছিনা একবার চিৎ হয়ে শুয়ে ভেবে দেখ তাে।
বণিক নীরবে দাড়ি হাতাতে থাকে।
তার বিবি বলে চলল—“আমি আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি— তােমার হীন বীর্যতার জন্যই আমরা লেড়কা পয়দা করতে পারি নি। আমার কোন গলতি নেই। তােমার হিম্মৎ থাকলে আমি অবশ্যই লেড়কা পেটে ধরতে পারতাম। বণিক নীরব চাহনি মেলে বিবির তেজ দেখতে লাগল।
তার বিবি আজ মুখ একবার যখন খুলেছে তখন এর শেষ না দেখে ছাড়বে না। সে এবার বলল-“শােন, আমার বাৎ শােন। লম্বা-চাওড়া বাৎ রেখে ভাল কোন হেকিমের কাছে যাও। নিজের ইলাজ করাও। শুক্র বৃদ্ধির দাওয়াই খাও। যদি তােমার বীর্য বাড়ে তবে দেখবে আমি ঠিক লেড়কা পেটে ধরতে, বিয়াতে পারব। বিবির উচিত কথা শুনে বণিক এবার ফুটা বেলুনের মত একেবারে চিপসে গেল।  বার কয়েক ঢােক গিলে বণিক এবার বলল—কথাটি হয়ত ঠিকই বলেছ বিবি। হয়ত আমার দোষেই আমরা নিঃসন্তান হয়েছি। আমার বীর্যের তেজই বােধ হয় নেই। তেজমরা বীর্যে তাে লেড়কা পয়দা হতে পারে না। তােমার কাছে কোন ঠিকানা আছে বিবি, যার দাওয়াই খেলে বীর্য গাঢ় হয়। শরীর ও দিল্ চাঙা হয়ে ওঠে? সম্ভোগের তৃষ্ণা জাগে ?
–‘আমি কি করে বলব? আমি কি হেঁকিমি বিদ্যা জানি নাকি ? কতসব বড় বড় হেকিম রয়েছে। তাদের কাছে যাও।'
-“কিন্তু কোথায়, কোন হেকিমের কাছে গেলে কাজ হবে
তাকে বাৎ শেষ করতে না দিয়েই তার বিবি বলল—তামার কত ইয়ার-দোস্ত রয়েছে, তাদের সঙ্গে বাৎচিৎ করলে ঠিক পাত্তা মিলে যাবে। ভাল হেকিমের কাছে পৌঁছতে পারলে—কাজ হাসিল হবে বলেই আমার বিশ্বাস।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।


                    দুশ’ একান্নতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, বিবির কথা শুনে বণিকের টনক নড়ল। সে পরদিন দোকান খােলার আগেই এক হেকিমের দরওয়াজায় হাজির হ’ল। দাওয়াই নেয়ার জন্য হাতে করে একটি বাটিও নিয়ে গেছে। আজ যা হােক একটি হিল্লে করে তবে ঘরে ফিরবে। বুড়াে হেকিম তার চাঁদির চশমার ফাঁক দিয়ে নিস্তেজ চোখের মণি দুটো মেলে বণিকের দিকে তাকিয়ে বলল—“কি বিমারি ? তকলিফ কি?’ বণিক হাত কচলে, আমতা আমতা করে বলল--‘হেকিম সাহেব, এমন এক দাওয়াইয়ের বন্দোবস্ত করে দিন যা খেলে শরীরে তাগদ বাড়ে, শুক্র বৃদ্ধি হয়, বালবাচ্চা পয়দা করা যায়।
বণিক সামসু-অল-দিন-এর মুখে এমন বাৎ শােনার জন্য বুড়াে হেকিম তৈরী ছিল না। তার মত একজন সদাশয় ধর্মাশ্রয়ী ব্যক্তির মুখে এ রকম সব বাৎ শুনে বুড়াে ভাবল, বুঝি বুড়াে মানুষ পেয়ে একটু মজাক করতে এসেছে। তাই বুড়ােও মজাক করার লােভ সামলাতে না পেরে বলে উঠল—কী সর্বনেশে কাণ্ড! আর মাত্র একদিন, কালও যদি আসতেন বণিক সাহেব, পুরােটাই আপনাকে দিয়ে দিতে পারতাম। কাল একের পর এক রােগী এসে সবটুকু নিয়ে চলে গেছে। ইস কাল আসতে পারলেন না! আদতে ও দাওয়াইয়ের চাহিদা খুব বেশী কিনা। চাহিদা বেশী, কিন্তু যােগান কম হলে যা হয়, বুঝতেই তাে পারছেন। খুব শরমের বাৎ। আপনি বরং পাশের হেকিম সাহেবের কাছে যান, হয়ত মিললেও মিলে যেতে পারে।
বণিক এবার পর পর কয়জন হেকিমের ঘরে গেল। কিন্তু ফয়দা কিছুই হল না। সবাই মুচকি হেসে একই বাৎ বলে তাকে বিদায় জানাল । 
বণিক শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে নিজের দোকানে ফিরে এল। কিছুক্ষণ পর এক মাতাল তার দোকানে এল। দালালী কারবার করে। সামসাম তার নাম। আফিং, চরস থেকে শুরু করে গাঁজা, ভাঙ, সরাব কোন নেশাই তার বাদ নেই। আর ফাজিল কাজেরও শিরােমণি বলে পরিচিত মহলে সে চিহ্নিত। কিন্তু বণিক সামসঅল-দিন’কে ধর্মাশ্রয়ী বলে খুবই সমীহ করে। দোকানে পা দিয়েই দালাল সামসাম বণিক সামস্-অল-দিনকে মনমরা হয়ে বসে থাকতে দেখে বলল-“কি বণিক সাহেব, এমন মুখ ব্যাজার করে বসে যে, ব্যাপার কি?
বণিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল–সামসাম, আমার নজদিকে এসে বস। আমার দুঃখের কিসসা তােমাকে শােনাচ্ছি। দালাল সামসাম এগিয়ে যতদূর সম্ভব বণিকের কাছাকাছি গিয়ে বসল।
বণিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগল—‘সামসাম ভাইয়া, আজ থেকে চল্লিশ সাল আগে আমার শাদী হয়েছে। কিন্তু আমার নসীব এতই মন্দ যে, কোন বালবাচ্চার মুখ দেখতে পেলাম না। আমার বিবি বলল—আমার নাকি বীর্যের দোষ হয়েছে। শুক্ৰহীনতা। লেড়কা পয়দা করার হিম্মৎ নেই। আজ সকালে বাজারের সব ক'টি হেকিমের দরওয়াজায় ঢুঁড়ে বেরিয়েছি। কিন্তু কেউ-ই দাওয়াই দিতে পারল না। সবাই একই বাৎ শােনাল—কাল ছিল, আজ ফুরিয়ে গেছে।”
বণিকের দুঃখর কথা শুনে সামসাম দুঃখ পেল না, আবার মন খুলে হেসে আনন্দও করতে পারল না। সে বলল—“আপনি এ নিয়ে দিল খারাপ করবেন না। এ বিমারির দাওয়াই আমার ভালই জানা আছে। বেশী নয়, একটিমাত্র দিনার আমাকে দিন। সমান পত্র খরিদ করে নিয়ে আসি। তারপর আমি নিজে হাতে দাওয়াই বানিয়ে আপনার ইলাজ শুরু করে দেব। নির্ঘাৎ ফল পেয়ে যাবেন। 
বণিক সােল্লাসে বলে উঠল-শােভন আল্লাহ! শােন সামসাম, খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি, তুমি যদি আমার বিমারি সারিয়ে লেড়কা পয়দা করার হিম্মৎ করে দিতে পার তবে আমি তােমাকে এমন ইনাম দেব যে, তােমার নসীব একেবারে ফিরে যাবে।
দালাল সামসাম এবার একটির পরিবর্তে দুটো সােনার দিনার নিয়ে বিদায় নিল। কিছুক্ষণ বাদে কিছু সমানপত্র নিয়ে সে ফিরে এল। দাওয়াই বানাল। দাওয়াইয়ের বাটিটি বণিকের হাতে দিয়ে বলল—“রাত্রে নিদ যাওয়ার ঠিক দু'ঘণ্টা আগে এক দাগ খাবেন। তবে দাওয়াই খাওয়ার তিনদিন আগে রােজ একটি করে কবুতরের দো-পিয়াজি খেতে হবে। আরও আছে। আর খাবেন গোল অণ্ডকোষ ভাজা আর পাকা রুই মছলির কালিয়া। বাস, দেখবেন আপনার শরীরে একেবারে শেরের মত তাগদ আসবে। বালবাচ্চা পয়দা করার মত ক্ষমতা জন্মাবে। যদি আমার দাওয়াই কাজ না করে, ফয়দা না পান তবে আমার মুখে থুথু ছুঁড়ে দেবেন। তবে হ্যা, যা-যা বললাম ঠিক ঠিক মত করবেন।
বণিক ভাবল, লােকটি নেশা-ভাঙ করে দিন গুজরান করে। আর আউরত নিয়ে পড়ে থাকে। এ সব ব্যাপারে তার জ্ঞান গম্মি কিছু থাকলে থাকতেও পারে।
দাওয়াইয়ের বাটি নিয়ে বণিক সামস-অল-দিন ঘরে ফিরল। এবার সামসাম-এর নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে শুরু করল।
রােজের খানাপিনার মধ্যে প্রাধান্য পেল কবুতরের দোপিয়াজি, ভেড়ার অণ্ডকোষ ভাজা আর পাকা রুই মছলির কালিয়া।
তিনদিন নিয়ম মাফিক খানাপিনা করার পরই তার শরীর গরম হয়ে উঠল। সত্যি সে যেন শেরের তাগদ লাভ করেছে। এবার এক দাগ দাওয়াই খেয়ে বিবির সঙ্গে শুয়ে পড়ল। মনের সুখে সম্ভোগ করল। তার বিবি তাে তার যৌবনশক্তির পরিচয় পেয়ে একেবারে তাজ্জব বনে গেল।
সে-রাত্রেই বণিকের বিবি সন্তানসম্ভবা হ’ল। মাস তিনেক গেলে তারা নিঃসংশয় হ’ল। তিন-তিন মাস তার মাসিক ধর্ম বন্ধ। অতএব বিবির পেটে বাচ্চা এসেছে।
দশ মাস বাদে বণিকের বিবি একটি লেড়কা প্রসব করল। লেড়কাটি খুব তাগড়াই হ’ল। সদ্যোজাত লেড়কাকে দেখলে মনে হয় এর উমর বুঝি এক সালের কম নয়।
লেড়কা জন্মাবার তিনদিন-তিনরাত্রি বাদে মহল্লার সবাই পেটপুরে মিঠাই খেয়ে গেল। সপ্তম দিনে কামরায় নিমক ছড়িয়ে দেওয়া হল।


লেডকা দেখে বণিকের মনে খুশী যেন আর ধরে না। লেড়কাকে কোলে নিয়ে বণিক বলল—‘লেড়কার আম্মা, লেড়কার নাম কি রাখবে, ভেবেছ কিছু?
বণিকের বিবি বলল—“যদি লেড়কি হত তবে আমি একটি জুতসই নাম রাখতাম। লেড়কা পয়দা হয়েছে। অতএব তুমিই এর নাম রাখ।
লেডকার বাঁ-উরুতে একটা তিল রয়েছে দেখে বণিক আনন্দে লাফাতে থাকে। অনেক ভেবে চিন্তে সে লেড়কার নাম রাখল ‘আলা অল-দিন আবু সামাত। কিন্তু নামটি বড্ড বড়। তাই তার ডাক নাম হ’ল—“আবু সামাত'।
চার বছর বয়সেই আবু সামাত সিংহ শাবকের মত ইয়া মােটাসােটা হয়ে উঠল। পাড়ার লােক, বিশেষ করে বালবাচ্চারা তাে তার বাড়িই ছাড়তে চায় না। বণিক তার বিবিকে বার বার বলে বাচ্চাকে একটু সামলে সুমলে রেখাে আবু সামাত-এর মা। সবার মন তাে আর সমান নয়। নজর লাগতে পারে। তখন কিন্তু আর কেঁদেও কূল কিনারা পাবে না।
বণিকের কথায় তার বিবির টনক নড়ল। এবার থেকে যখন তখন শিশু আবু সামাত’কে আর যার তার সামনে বের করা হয় না। অধিকাংশ সময়ে তাকে অন্দরমহলেই রাখা হয়। পাঁচ পাঁচটি বাঁদী নিযুক্ত করা হ’ল শিশুর পরিচর্যার জন্য। সুলতান বাদশার হালে সে মানুষ হতে থাকে। বয়স একটু বাড়লে নামজাদা মৌলভীর হাতে আবু সামাত-এর পাঠাভ্যাসের দায়িত্ব দেয়া হল। এখনও তাকে অন্ধকার ঘরে, সবার চোখের আড়ালে রাখা হ’ল। এক সময় আবু সামাত বাল্যের দিনগুলাে ডিঙিয়ে কৈশােরে পা দিল। তার উমর চৌদ্দ পেরিয়ে পনেরয় পড়ল। গোঁফের রেখা উকি দিল। একদিন পরিচারক খানা সাজিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে শিকলটি তুলে দিতে ভুলে গেল। আবু সামাত গুটি গুটি কামরার বাইরে চলে এল। তার দিল চায় সবার সঙ্গে বিশেষ করে সমবয়সীদের সঙ্গে একটু-আধটু মেলামেশা করতে। তাই সে সুযােগের সদ্ব্যবহার করল।
আবু সামাত হাঁটতে হাঁটতে তার আম্মার কামরায় চলে এল। তার আম্মা তখন মহল্লার কয়েকটি আউরত এবং লেড়কির সঙ্গে বাৎচিৎ করছে। আচমকা এক উঠতি বয়সের লেডকাকে কামরায় ঢুকতে দেখে সবাই শশব্যস্ত হয়ে বােরখা টানাটানি করে ঢেকেঢুকে বসার জন্য ব্যস্ত হয় পড়ল।
একজন তাে অনুচ্চ কণ্ঠে বলেই উঠল—ইয়া খােদা, কী বেআক্কেলে লেড়কারে বাবা! একেবারে বে-ইজ্জতের ব্যাপার! আচমকা জনানাদের কামরায় ঢুকে এল!
আবু সামাত-এর আম্মা কথাটি যেন শুনতে পায় নি এরকম ভাব দেখিয়ে, মুচকি হেসে বলল-এর সঙ্গে বােধ হয় তােমাদের জান পরিচয় নেই। আমার লেড়কা। একমাত্র লেড়কা। এর সামনে শরমের কিছু নেই। দাস-দাসী ছাড়া বাইরের কোন লেডকা লেড়কিদের সঙ্গে মেলামেশা করতে দেই নি।
“তাই বুঝি? আমরা তাে দেখিনি কোনদিন। আপনিও কোনদিন এর কথা বলেন নি। কথা বলতে বলতে তারা মুচকি হেসে নাকাব সরিয়ে দেয়।
বণিকের বিবি উঠে গিয়ে লেড়কার কপালে ও গালে চুমু খেয়ে বলল-বেটা এখানে থেকো না। তােমার নিজের কামরায় চলে যাও।'
তার উপস্থিতি বার মধ্যে অস্বস্তির সঞ্চার করছে দেখে তার আম্মা আরও ব্যস্ত হয়ে তাকে নিজের কামরায় পাঠাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল। তার আম্মা বান্ধবীদের উদ্দেশ্যে ম্লান হেসে বলল--মহল্লার লেড়কাদের সঙ্গে মিশলে খারাপ হয়ে যেতে পারে আশঙ্কায় তাকে সর্বদা ঘরের মধ্যেই রাখা হয়। নাহানা, খানাপিনা, লিখাপড়া সবই ঘরের মধ্যে সারে। বড় হয়ে, নিজের ভাল-মন্দ বােঝার উমর না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই তাকে মানুষ করা হবে। আবার কোন নষ্ট লেড়কির পাল্লায় পড়েও জিন্দেগী বরবাদ করে ফেলতে পারে। আজই প্রথম তাকে আমার কামরায় আসতে দেখলাম।
আবু সামাত কামরা ছেড়ে গেলে সবাই বলল-'খুবসুরৎ লেড়কা। বহুৎ আচ্ছা লেড়কা তাে হয়েছে আপনার। খােদাতাল্লা একে দীর্ঘায়ু দান করুন।
এক মাস পরে আবু সামাত আবার তার আম্মার কামরায় এল। দুয়ারে এক নফর এক খচ্চরের জীন-লাগাম পরাচ্ছে দেখে, আবু সামাত-এর কৌতূহল হয়। সে আম্মাকে বলে—“আচ্ছা, ঐ জানােয়ারটাকে এরকম করে বাঁধাছাদা করছে কেন?’ 
তার আম্মা বলে, তােমার আব্বার দোকান থেকে ফেরার সময় হয়ে গেছে। তাকে খচ্চরটি আনতে যাবে।
-“আব্বা কি করেন? তার কিসের কারবার ? বাজার কোথায় ?
‘বেটা, তােমার আব্বা মস্তবড় এক বণিক, তামাম কায়রাে নগরে তার' খুবই সুখ্যাতি। পাইকারী কারবার। আর তােমার আব্বা বণিক সমিতির প্রধান। তার অনুমতি নিয়ে তবে বণিকদের কায়রাের বাইরে বাণিজ্য করতে যেতে হয়। তিনি খুবই রইস আদমী।
ইয়া আল্লা! খােদা মেহেরবান, তিনি আমাকে রইস আদমি, সম্রান্ত বণিকের ঘরে পাঠিয়েছেন। আচ্ছা আম্মা, আমাকে আর কতকাল এভাবে কামরায় বন্দী হয়ে থাকতে হবে? কবে আমি আব্বার সঙ্গে দোকানের গদিতে গিয়ে বসতে পারব?’
-বহুৎ আচ্ছা বাৎ! তােমার আব্বা দোকান থেকে ফিরলে তার সাথে বাৎচিং করা যাবে খন। অস্থির হওয়ার কি আছে, বুঝছি না তাে!'
সামস-অল-দিন সন্ধ্যার পর দোকান থেকে ফিরলে তার বিবি লেড়কার ইচ্ছার কথা তার কাছে পেশ করল।
সামস-অল-দিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-‘শােন, আমারও মন চায় বেটা আমার সাথ সাথ থাকুক। কিন্তু বােঝ তাে, সবাই চারদিকে শকুনের মত চোখ নিয়ে সব বসে। বেটা আমার যদি কারাে কুনজরে পড়ে যায়, সর্বনাশের চূড়ান্ত হয়ে যাবে।
-তােমার বাৎ আমি মানছি। কিন্তু লেড়কাকে এভাবে ঘরে বন্দী করে রাখলে আখেরে কি ফল দাঁড়াবে তা-ও তাে ভাবা দরকার।
-“বিবিজান বাইরের কোন খোঁজ খবরই তাে রাখ না। এই তাে সেদিন, ওপাড়ার এক লেড়কার ওপর ডাইনীর নজর পড়েছিল। ব্যস, দু’দিনেই খতম। বালবাচ্চা যত গােরে যায় সবই প্রায় একই কারণে। এর পরও কি তুমি বলবে।
–“মানছি। তাই বলে লেড়কাকে তুমি বাইরে বেরােতে না দিয়ে ঘরে আটক করে রাখবে? দুনিয়ায় আপন আপন নসীব নিয়ে সবাই পয়দা হয়। ঘরে আটক করে রাখা তাে দূরের কথা পায়ে বেড়ি পরিয়ে রাখলেও নসীবের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জো নেই। তা নিয়ে ঝুটমুট ঝামেলা করলে ফয়দা তাে হবার নয়। তাছাড়া তােমার উমর বাড়ছে। বুড্ডা হচ্ছ। একদিন না একদিন গােরে যেতেই হবে। তখন তােমার কারবারের মালিকানা তাে তােমার বেটার ওপরই বর্তাবে। কায়রাে নগরের কেউ আজ পর্যন্ত তােমার লেড়কার মুখ দেখে নি। হঠাৎ একদিন দোকানে গিয়ে বসলে অন্য কারবারীরা তাকে তােমার লেড়কা বলে মানবে কি? তােমার কর্মচারীরাও তাকে অস্বীকার করতে পারে, ঠিক কিনা ? তারপর কারবারের হাল-হালচালও তাে শেখা দরকার। আমি না হয় বললাম, এ আমার বেটা। সবাই যদি বলে না, এ আবু সামাত সামস-অল-দিন-এর ঔরসজাত সন্তান নয়, তখন? তখন তাে সরকারের ফৌজদার এসে তােমার দোকানে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে যাবে। তখন তােমার বেটা আর আমার তাে তখন ছােবড়া চোষা ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না, আবু সামাত-এর বাপ। বণিক গম্ভীর হ’ল। বিবির বাৎ শুনে তার কিছুটা হুঁশ হ'ল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলে—“হ্যা, বাৎ সাচ্চা বটে। আমি তাে এদিকটা কোনদিন ভেবে দেখি নি বিবিজান। সাচ্চাবাৎ বটে, আউরতদের বিষয় আশয়ের জ্ঞান খুব পাকা। এবার আর একটু ভেবে নিয়ে বলল-সাচ্চাবাৎ বটে। কালই আবু সামাতকে কারবারে নিয়ে গিয়ে বসাব। সবার সঙ্গে কিছু জান পরিচয় হওয়া খুবই দরকার। কেনা-বেচার তারিকাগুলাে সম্বন্ধে জ্ঞানগম্যি থাকা
( to be continued ) 


Post a Comment

0 Comments