আরব্য রজনী পর্ব ৬৭ ( Part 67 ) Arabyarajani bangla

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
এরকম উমরে লেড়কিদের বুক তাে হৃষ্টপুষ্ট আপেলের মত হয়। আপেল তাে দূরের কথা, একটি কুলের চিহ্নও নেই। সে তাজ্জব বনে গেল। খুশ বাহার প্রমাদ গুণল। ভাবল দাহিয়া এবার খােজাদের ডেকে জোর করে বােরখা খুলে তার স্বরূপ আবিষ্কার করে ছাড়বে। উপায়ান্তর না দেখে সে ধপ করে পালঙ্ক থেকে নেমে দাহিয়ার গাের দুটো জড়িয়ে ধরে কাদতে লেগে যায়। চোখের পানি ঝরাতে ঝরাতে বলে—আমি মাফি মাঙছি। আমি লেড়কি নই, লেড়কা। হারেমে ঢােকার সুবিধার জন্যই আমাকে এরকম চাতুরির আশ্রয় নিতে হয়েছে। গোস্তাকি মাফ করবেন। আমার বিবি, আমার কলিজা এ-হারেমে বন্দিনীর মত দিন গুজরান করছে।'

‘তাজ্জব ব্যাপার। তােমার বাৎ ঠিক সমঝে উঠতে পারছি না। খােলসা করে বল।
-“আমার বিবি খুশ নাহার। আমার আব্বা বাদীর বাজার থেকে তাকে আর তার আম্মাকে খরিদ করে নিয়ে এসেছিল। আমি তখন সবে পয়দা হয়েছি। আর খুশ নাহার তার আম্মার কোলে। আমার উমর যখন বারাে সাল তখন আমাদের শাদী হয়।
আমার বিবি নাহার-এর মত খুবসুরৎ লেড়কি অন্য কোথাও আছে কিনা মালুম নেই, তবে কুফা নগরে অবশ্যই ছিল না। তাই সে কুফার সুবাদারের নজরে পড়ে। সে ছল চাতুরীর মাধ্যমে আমার বিবিকে ভাগিয়ে এনে খলিফার হারেমে চালান করে দেয়। খলিফার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তাকে জানিয়েছে, বাদীর বাজার থেকে সে খুশ নাহারকে খরিদ করেছে। আর নাহার কোনও বাদশাহের লেড়কি এমন বাৎ-ও খলিফাকে সে জানিয়েছে।
এদিকে সে-বৃদ্ধা খুশ বাহার’কে হারেমে ঢুকিয়ে দিয়ে খুশ নাহারকে তলব করল। সে এলে তাকে খুশ বাহার-এর কামরায় ভেজবে।
এমন সময় ভাের হয়ে আসছে দেখে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
              দুশ’ সাতচল্লিশতম রজনী 
রাত্রি একটু গভীর হলেই বাদশাহ শারিয়ার কিসসা শােনার অত্যুগ্র আগ্রহ নিয়ে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় আসেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, খুশ বাহার-এর দুঃখের কথা শুনে খলিফার বহিন দাহিয়া দিলে ব্যথা অনুভব করল। সে তার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলল-“বেটা, কোন ডর নেই। আমার দেহে একবিন্দু খুন থাকতে কেউ তােমার গায়ে হাত দিতে পারবে না। তােমার বিবিকে তুমি যাতে ফিন ফিরে পাও তার কোশিস আমি করব। আর তুমি তাকে ফিরে পাবেও। আমার ভাইজান মহা ধার্মিক। অন্যের বিবি জোর করে ছিনিয়ে এনে ভােগ করার পাত্র তিনি নন। আর এ-ও বলছি বেটা, যদি সুবাদারের কুকর্মের জন্য কুফায় তার এতটুকুও সম্মান ও প্রতিপত্তি হানি হয়ে থাকে, তবে তিনি অবশ্যই তার প্রতিকার করবেন। এতবড় অন্যায়-অবিচার তিনি কিছুতেই হজম করবেন না।
এবার বৃদ্ধা খুশ নাহারকে নিয়ে তার নির্ধারিত কামরায় এল। কিন্তু হায় খােদা কামরা যে খালি। কোথায় গেল সে? তবে কি কামরা চিনতে না পেরে অন্য কোন কামরায় ঢুকে পড়ল? তবে যে কেলেঙ্কারী ঘটে যাবে। খুশ নাহার’কে দাঁড় করিয়ে বুড়ি উদভ্রান্তের মত ছুটোছুটি করে তার খোঁজ করতে লাগল। এত বড় ইমারত। কানাগলির মত পথ। এখানে কোন কামরায় ঢুকে পড়লে তার হদিস পাওয়া সত্যি অবিশ্বাস্য ব্যাপার।
কোথাও খুশ বাহার-এর হদিস পাওয়া গেল না। অনন্যোপায় হয়ে খুশ নাহার চোখের পানি ফেলতে ফেলতে হতাশ জর্জরিত দিল নিয়ে নিজের কামরায় ফিরে এল।
এক বাদী এসে খুশ নাহার’কে বলল—‘দাহিয়া মালকিন আপনাকে তলব করেছেন।
ডরে কাঁপতে কাঁপতে খুশ নাহার দাহিয়ার কামরায় গেল। তার ডর ছিল খুশ বাহার নির্ঘাৎ ধরা পড়েছে। এবার উভয়ের বিচার এক সঙ্গে হবে। তাই জরুরী তলব। তার কি হবে জানা নেই। তবে তার স্বামী খুশ বাহার-এর যে গর্দান যাবে এতে কিছুমাত্রও সন্দেহ তার নেই। বাঁদীটির পিছন পিছন খুশ নাহার দাহিয়ার কামরায় ঢুকতেই দাহিয়া ছুটে এসে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। এবার পালঙ্কের দিকে তার মুখটি ফেরায়। মুচকি হেসে বলে—“কি গা বেটি, চিনতে পারছ? তােমরা এবার বিরহজ্বালা ভুলে গল্পগুজব কর। আমি আর মিছে তােমাদের পিয়ার মহব্বতের মধ্যে সং-এর মত দাঁড়িয়ে থেকে ঝুট ঝামেলার কারণ হ’ব না। কথা বলতে বলতে দাহিয়া। বাঁদীটিকে নিয়ে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
দাহিয়া বিদায় নিলে খুশ বাহার ও খুশ নাহার পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে হরদম চোখের পানি ফেলে চলল। আকস্মিক আনন্দটুকু সামলে নিয়ে কোন কথাই কেউ বলতে পারল না।
এখন খুশ নাহার সুস্থ হয়ে উঠেছে স্বাভাবিকতা ফিরে পেয়েছে। খবর পেয়ে খলিফা হরেমে এলেন। তার বহিন দাহিয়া তাকে অভ্যর্থনা করল।
খুশ নাহার-এর কাছাকাছি পালঙ্কের ওপর বােরখা পরিহিত অন্য একজনকে দেখে খলিফা বিস্মিত হলেন। নাকাবের ফাঁক দিয়ে তার খুবসুরৎ মুখের যেটুকু দেখা যাচ্ছে তাতেই খলিফার দিমাক ঘুরে যাবার জোগাড়। তিনি দাহিয়াকে বললেন-বহিন, এ খুবসুরৎ লেড়কি কে বটে?
দাহিয়া নির্দ্বিধায় জবাব দিলখুশ নাহার-এর দোস্ত। জিগরী দোস্ত। কুফা থেকে এসেছে। একে অন্যকে ছেড়ে থাকতে পারে না। তাই উদভ্রান্তের মত ছুটে এসেছে।
—“ইয়া আল্লাহ! শােভন আল্লাহ! একই সঙ্গে দু-দুটো খুবসুরৎ লেড়কি! এক কাজ কর, এ নতুন বাঁদীটিকে আমার রক্ষিতার স্থান দিলাম। আমার শাদী করা বেগম বনে সে থাকবে। খুবসুরৎ লেড়কি বটে!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাহিয়া বলল—বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা বন্দোবস্ত ভাইজান! এর যা সুরৎ তাতে এরকম মর্যাদাই প্রাপ্য। ভাইজান,তােমাকে একটি ছােট্ট কিসসা শোনাচ্ছি। কিসসাটি এক বড় লেখকের কিতাবে এক সময় পড়েছিলাম। 
 ‘শােনাও। শুনি তােমার কিসসাটি কেমন।
–‘ভাইজান, কুফা নগরে এক নামজাদা বণিক বাস করত। বণিকের নাম বাহার। তার একমাত্র বেটা। নাম তার খুশ বাহার। বচপন থেকে সে তাদের বাড়ির এক বাঁদীর লেড়কির সঙ্গে মানুষ হতে থাকে। তারা তখন ভাইয়া বহিন-এর মত ছিল। বাঁদীর সে লেড়কির নাম খুশ নাহার। দু'জনই খুবসুরৎ। খুশ বাহার-এর উমর যখন বারাে তখন তার বাপজান বলল-বেটা, তােমাদের দু'জনেরই উমর হয়েছে। এখন থেকে তােমরা আর ভাইয়া-বহিন সম্পর্ক বজায় রাখবে না। আর খুশ নাহার তােমার সহােদরা নয়। সেদিনই তারা প্রথম সহবাস করল। দেখতে দেখতে তাদের উমর বেড়ে গেল। খুশ নাহার সতেরতে পা দিল। তার দেহে তখন যৌবনের জোয়ার। তার সুরৎ আরও খােলতাই হ’ল। তার সুরতের কথা কুফা নগরের সুবাদারের কানে গেল। তার মাথায় কুমতলব ঢুকল। সে এক শয়তানী বুড়িকে প্রচুর সােনার দিনার ইনাম দিয়ে খুশ বাহার-এর বিবি খুশ নাহার’কে ভাগিয়ে নিয়ে এল। ধূর্ত সুবাদার এবার নিজের কাজ হাসিল করার জন্য নাহার’কে দামাসকাসে খলিফার হারেমে পাঠিয়ে দিল। খলিফাকে ভেটস্বরূপ খুবসুরৎ নাহার’কে ভেজে দিল। সেই থেকে খুশ নাহার খলিফার হারেমে চোখের পানি ঝরাচ্ছে। আর পিয়ারী বিবিকে হারিয়ে খুশ বাহার চোখের পানি ঝরাচ্ছে কুফা নগরে।
তারপর একদিন খুশ বাহার এক হেকিম ও জ্যোতিষীর সঙ্গে বিবির খোঁজে দামাকাসে হাজির হয়। সে একদিন জানতে পারল তার কলিজার সমান বিবি খুশ নাহার খলিফার হারেমে বন্দিনী জীবন গুজরান করছে। তার বিরহে তার বিবিও চোখের পানি ফেলে ফেলে মৃত্যুর হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। এবার সে নানা ফন্দি ফিকির করে জানের মায়া তুচ্ছ করে খলিফার হারেমে ঢুকে পড়ল। তার মেহবুবা, তার কলিজার সমান বিবির সঙ্গে মিলন হ’ল।
খবরটি খলিফার কানে গেল। তিনি গুলিখাওয়া শেরের মত ছুটে এলেন হারেমে। হাতে তার কোষমুক্ত তরবারি। তিনি কোন বিচার না করে হাতের তরবারি দিয়ে দু'জনের গর্দান নিলেন। কোন যুক্তিই তিনি দিলেন না। ভাইজান, লেখক কিসসাটি এখানে এভাবে শেষ করেছেন।
খলিফা কিসসাটি শুনে গম্ভীর মুখে বসে রইলেন।
দাহিয়া এবার চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—‘ভাইজান, কিসসার লেখক কিসাটি শেষ করে কোন মন্তব্যই করলেন না। ভাইজান, একটি বাৎ তােমাকে জিজ্ঞাসা করলে জবাব পাব?’ 
খলিফা যেন এতক্ষণ কিসসাটির মধ্যে নিজেকে পুরােপুরি ডুবিয়ে রেখেছিলেন। বহিনের কথায় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে থতমত খেয়ে বলে উঠলেন –“কি–“কি? কোন বাৎ বহিন ?
‘তুমি যদি খলিফা হতে, তােমার হারেমে যদি এরকম ব্যাপার ঘটতাে তবে তুমি খুশ বাহার ও খুশ নাহার-এর বিচার কিভাবে করতে বল তাে?  
খলিফা আবদ-অল মালিক ইবন সারবান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—‘বহিন, আমি নির্দ্বিধায় বলছি, খলিফা অবশ্যই গলত কাম করেছেন। কোন লােকের গর্দান নেবার আগে তাকে অবশ্যই কিছু না হলেও ব্যাপারটি নিয়ে এক শ’বার ভাবা উচিত ছিল। এমনও তাে দেখা যায় জান নেবার আগে সহস্রবার ভাবনা চিন্তার পর তাকে নির্দোষ প্রতিপন্ন করা হয়েছে। আর আমার কথা যদি জানতে চাও বহিন তবে আমি তরবারি ব্যবহার না করে ফুলের মালাই ব্যবহার করতাম। তাদের মহব্বতের ইনাম স্বরূপ ফুলমালা নিজে হাতে খুশ বাহার আর খুশ নাহার-এর গলায় পরিয়ে দিতাম।  মুহূর্তকাল নীরবে ভেবে নিয়ে খলিফা আবার বলতে শুরু করলেন—“দেখ, ব্যাপারটি এমনভাবে ভাবা যেতে পারে। পহেলা নম্বর তারা আশৈশব মহব্বতের জোরে বাঁধা হয়ে রয়েছে, দুসরা তারা তাে তখন খলিফার প্রাসাদে মেহমান। মেহমানের জান খতম করা তাে দুরের কথা তাকে মন্দ বাৎ বলাও গুণাহ। তিসরা খলিফাকে সর্বদাই ধীরস্থির ও ন্যায়ের পূজারী হতে হবে, বহিন। অতএব আমার বিচারে ঐ খলিফাকে আমি নির্বোধ, অবিবেচক ও অপদার্থ ছাড়া কোন আখ্যাই দিতে পারি না।
খলিফার কথা শেষ হতে না হতেই তার বহিন দাহিয়া তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে আবেগে উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে বলল-“ভাইজান, তুমি না জেনেই তােমার নিজের বিচার করে ন্যায়ের পথকে আঁকড়ে ধরেছ। আমাদের ধর্মাশ্রয়ী পুণ্যাত্মা আব্বাজীর সুযােগ্য বেটা তুমি। তােমার মুখ থেকে আমি বিচারের এরকম রায়ই আশা করেছিলাম।
খলিফা চোখ দুটো কপালে তুলে সবিস্ময়ে বলতে লাগলেন—“আরে বহিন, তুমি একরছ কি? ব্যাপার কি ? আমার তাে কিছুই মালুম হচ্ছে না! তুমি নির্ভয়ে বল, ব্যাপার কি? তুমি তাে জান বহিন কারাে গুস্তাকিই আমি কোনদিন মাফ করি নি, করবােও না।
দাহিয়া এবার বােরখায় ঢাকা খুশ বাহার’কে দেখিয়ে বলল—‘ভাইজান এ-ই আমার কিস্সার নায়ক খুশ বাহার। ছদ্মবেশ ধারণ করে জানের মায়া তুচ্ছ করে তার কলিজার সমান বিবি খুশ নাহার-এর সঙ্গে মিলিত হতে ছুটে এসেছে। ধরা পড়লে জান খতম হবে জেনেও সে কোন পরােয়া না করে তােমার হারেমে ঢুকে পড়েছে। আর যে সুবাদার খুশ নাহার’কে ভাগিয়ে এনে তােমাকে ভেট পাঠিয়েছে সে হচ্ছে কুফা নগরীর বর্তমান সুবাদার শয়তান ইউসুফ অল- থাফাকী। ভাইজান, আশা করি তােমার ইয়াদ আছে, সে তােমাকে লিখেছিল, দশ হাজার সােনার দিনারের বিনিময়ে সে খুশ নাহার’কে এক সওদাগরের কাছ থেকে খরিদ করেছে, ঠিক কিনা? আশা করি তুমি তাকে উচিত শাস্তি দিয়ে ন্যায় বিচারের নয়া নজির স্থাপন করবে। আর এদের গােস্তাকি মাফ করে দেবে। এরা উভয়ে উভয়কে পিয়ার-মহব্বৎ করে, এ-ই এদের একমাত্র গােস্তাকি। আর এরা এখন তাে তােমার প্রাসাদে মেহমান। আমার কথা বল্লাম। ভাইজান, এবার তােমার বিচার যা হয় কর।
–বহিন, আমার মতামত তাে আমি অনেক আগেই ব্যক্ত করেছি।খলিফা এবার হাসিমুখে এগিয়ে গিয়ে খুশ বাহার আর খুশ নাহার-এর দুটো হাত মিলিয়ে দিয়ে উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে বলেন-“তােমাদের পুনর্মিলন আমাকেই সবচেয়ে বেশী খুশী করেছে। খােদা-তাল্লা তােমাদের ভবিষ্যৎ জীবন মধুময় করে তুলুন।
এবার খলিফা খুশ বাহার ও খুশ নাহারকে সাতদিন নিজের প্রাসাদে মহা আদর যত্নে মেহমান করে রাখলেন।
সাতদিন বাদে বহুমূল্য ইনাম সঙ্গে দিয়ে তাদের কুফা নগরীতে ভেজলেন। আর কুফার সুবাদারকে ? তাকে বরখাস্ত করলেন। তার পদে খুশ বাহার-এর আব্বা বাহার’কে নিযুক্ত করে ন্যায় বিচারের নতুন নজির গড়লেন। কিসসা শেষ করে বেগম শাহরাজাদ চুপ করলেন।
বাদশাহ শারিয়ার আবেগে-উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে বললেন-‘বেগম, তােমার কিসসা আমার দিল কেড়ে নিয়েছে। রাতের পর রাত তােমার কিস্সা শােনার জন্য আমি তৈরী। বেগম শাহরাজাদ এবার বললেন—“জাঁহাপনা, এবার যে কিসসা বলব তা শুনলে আপনার দিল্ খুশীতে ভরে যাবে। কিন্তু আমার ডর লাগে, এভাবে রাতের পর রাত কিসসা শুনলে যদি আপনার মধ্যে অনিদ্রা রােগ ভর করে? এতেই তাে আপনার চোখ থেকে নিদ ঘুচে গেছে।
‘তা হােক বেগম সাহেবা। আমি কোন কিছুর পরােয়া করি না । অনিদ্রা রােগের ডরে তাে আর তােমার এরকম কিসসা শােনার লােভ সম্বরণ করা সম্ভব নয়। এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ বললেন—“জাঁহাপনা, ভাের হয়ে এল বলে। আজ আর নতুন কিসসা শুরু করার সময় নেই। কাল রাত্রে আপনাকে আলা অলদিন এবং আবু সামাত’-এর কিসসা শােনানাের ইচ্ছা রাখছি। 
আলা অল-দিন এবং আবু সামাতের কিস্সা।
               দুশ’ পঞ্চাশতম রজনী 
রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার কিসসা শােনার অত্যুগ্র আগ্রহ নিয়ে অন্দর মহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম শাহরাজাদ নতুন কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাঁহাপনা, কায়রাে নগরে কোন এক সময়ে এক লব্ধ প্রতিষ্ঠ বণিক বাস করত। তার নাম সামস-অল-দিন তার সদাচারণের জন্য নগরের বণিক সম্প্রদায় থেকে শুরু করে প্রতিটি আদমি তাকে খুব খাতির করত।
বণিকটি এক জুম্মাবারে শাস্ত্রের বিধান অনুয়ায়ী নাপিত ডেকে মাথা ন্যাড়া করল, গোঁফ চেঁছে ফেলল। সর্বদা সে এরকমভাবে শাস্ত্রের বিধান পালন করে চলত। নাপিতের কাজ শেষ হলে বণিক এবার তার কাছ থেকে আরশি নিয়ে মাথা ও গোঁফ দেখতে গিয়ে ইয়া লম্বা শনপাটের মত সাদা দাড়ি দেখে তার দিল মােচড় মেরে ওঠে। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপন মনে বলে ওঠে সত্যি তবে উমর হয়েছে। সন্ধ্যা না হলেও বিকেল তাে অবশ্যই হয়ে গেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবার সে বলল-“হায় বেচারা সামস-অল-দিন, তােমার গােরে যাবার সময় ঘনিয়ে আসছে। এবার জিন্দেগীর খেল খতম হয়ে যাবে। কিন্তু জিন্দেগীতে কি তুমি লাভ করলে? ধনদৌলত অনেকই তাে কামিয়েছ কিন্তু এসবের কি গতি হবে? জিন্দেগী ভর যদি বালবাচ্চার মুখই না দেখলে তবে ধন-দৌলত কার জন্য রেখে যাচ্ছ ? কার ভােগে লাগবে এসব? একদিন তােমার প্রদীপের তেল-ফুরিয়ে যাবে। বাতি যাবে নিভে। ব্যস, সব খেল খতম। তােমার নাম, তােমার স্মৃতি সবার দিল থেকে মুছে যাবে। তােমার কোন চিহ্নও রইবে না।
সাম-অল-দিন তারপর বিষন্ন মনে মসজিদে গিয়ে নামাজ সারল। বাড়ি ফিরলে তার বিবি বলল—“কিগা, আজ ফিরতে এত দেরী হ’ল যে?'
সামস-অল-দিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—“আর বেশী ব্যস্ততায় কি-ই বা লাভ, বল ? আমার জিন্দেগীর খুশী-আনন্দের কি-ই বা আছে। যে কয়দিন দুনিয়ায় আছি কোনরকমে জানটাকে টিকিয়ে রাখা ছাড়া কিছু তাে নয়।
বণিকের বিবি স্বামীর এরকম হেয়ালীপূর্ণ ঔদাসীন্যে কেমন যেন অকস্মাৎ মিইয়ে গেল। দিলটি বিষিয়ে উঠল। এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে হাত রেখে সােহাগ দেখিয়ে বলল—“আজ কি হয়েছে গা তােমার ? কথার মধ্যে কেমন যেন হতাশার ছাপ। ব্যাপার কি খােলসা করে বল তাে?'
–‘খােলসা করে বলার আবার কি আছে? বেশ একটু রাগত স্বরেই বণিক কথাটি ছুঁড়ে দিল—“আমার যত অশান্তির মূল তাে তুমি। হ্যা, একমাত্র তুমিই। রােজ বাজারে যাই। দেখি আমার সমবয়সী সওদাগররা তাদের বালবাচ্চাদের নিয়ে দোকানে আসে। আমার কলিজা মােচড় মেরে ওঠে। বুকের মধ্যে জ্বালা ধরে যায়। তখন ভাবি, দুনিয়ায় আর থেকে কি-ই বা ফায়দা? এর চেয়ে গােরে গেলে হয়ত অনেক বেশী শান্তি পাওয়া যাবে। স্বামীর গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে তার বিবি বলল—‘শােন, সবই খােদাতাল্লার মর্জি। তার মর্জির বিরুদ্ধে তাে আমাদের কিছুই করার নেই।
-চুপ কর! খােদাতাল্লার দোহাই দিয়ে নিজের থাক আমাকে একটু একেলা থাকতে দাও। ঝুটমুট আমাকে বিরক্ত


( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments