সহস্র এক আরব্য রজনী পর্ব ৬৬ ( আলিফ লায়লা )
পরবর্তী অংশঃ
পারসী-বুড়াে নিজেকে বিশেষ সাজে সাজিয়ে নিল। মাথায় আজব কায়দায় একটি পাগড়ীও বেঁধে নিল। আর খুশ বাহারকে পরাল নীল রেশমী কামিজ আর কাশ্মিরী কোর্তা। আর হাতে বেঁধে দিল গুনাবী জরির কাজ করা রেশমী রুমাল। হেকিমের সহকারীর মত পােশাকই বটে।
পারসী-বুড়াে বলল--শােন, তুমি আমাকে আব্বা সম্বােধন করবে। আর আমি তােমাকে সবার কাছে আমার বেটা বলে পরিচয় দেব।” কিছুদিনের মধ্যে তামাম দামাস্কাস নগরে তাদের হেকিমি ইলাজের কথা ছড়িয়ে পড়ল। আরও প্রচার হ’ল পারসী হেকিম বুক, নাড়ি প্রভৃতি পরীক্ষা না করে কেবলমাত্র রােগীর থুথু পরীক্ষা করে রােগ নির্ণয় ও তার ইলাজ করতে পারে। অত্যাশ্চর্য হিম্মৎই বটে। এমন এক হেকিমের নাম-যশের কথা কেনই বা বাতাসের কাধে ভর দিয়ে ছড়িয়ে পড়বে না?
এক সকালে পারসী বুড়াের দোকানের সামনে এক খানদানি পরিবারের আউরত এক খচ্চরের পিঠ থেকে নামল। সুসজ্জিতা বৃদ্ধা বৃদ্ধা দোকানে এলে খুশ বাহার তাড়াতাড়ি একটি কুরশি এগিয়ে দিয়ে তাকে বসতে বলে। বৃদ্ধা বসে।
আউরতটি এবার তার বােরখার ভেতর থেকে একটি জলের বােতল বের করল। পারসী-বুড়াের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে ওতে প্রস্রাব আছে। আবার মুহূর্তকাল তার মুখের দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে পারসী-বুড়ােকে বলল -“আচ্ছা, আপনাকে যেন কোথায় দেখেছি মনে হচ্ছে। আপনি ইরাক ছেড়ে এসে এখানে ব্যবসা ফেঁদেছেন, তাই না?
–‘হ্যাঁ, আপনার অনুমান অভ্রান্ত। আমি সেখানে আপনার নফর ছিলাম।
–“ছিঃ! এমন কথা বলতে নেই। এ দুনিয়ার কেউ কারাে নফর নােকর নয়। যাক গে, আমি যে কাজে এসেছি। এতে খলিফার সদ্য কেনা বাঁদীর প্রস্রাব রয়েছে। দীর্ঘদিন জ্বর। বহুৎ হেকিম ইলাজ করেছে। সারে নি। শেষ ভরসা যখন আপনি তখন দেখুন তার বিমারি ইলাজ করে যদি আরাম দিতে পারেন। আপনার নাম-যশের বাৎ শুনে খলিফার বহিন দাহিয়া আমাকে আপনার দরবারে ভেজলেন।
মুহূর্তকাল নীরবে ভেবে পারসী-বুড়াে বলল-'দেখুন, আমার ইলাজ একটু আলাদা কিসিমের। ইলাজ করতে হলে বিমারির ব্যাপার স্যাপার শােনার আগে রােগী বা রােগিণীর নাম জানা দরকার। কারণ দরকার হলে আমি ঝাড়ফুকও করি কিনা।
‘রােগিণীর নাম খুশ নাহার।’
নামটি কানে যেতেই পারসী-বুড়াে মুহুর্তের জন্য একটু সচকিত হয়ে পড়ল। পর মুহুর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে এক চিলতে কাগজ নিল। এবার কলম দিয়ে আঁচড় কেটে কেটে কতগুলাে সংখ্যা লিখল। তাদের কতগুলি লালকালি আর কতগুলি লিখল সবুজ কালি দিয়ে। এবার লাল ও সবুজ সংখ্যাগুলি যােগ করল। তারপর আরও কিছু সংখ্যা তার সঙ্গে যােগ করল। এবার ক্রমান্বয়ে বিয়ােগ গুণ, ভাগ প্রভৃতি অনেক কিছুই করল। সবই ঝটপট সেরে ফেলল।
আগন্তুক বৃদ্ধা সবিনয়ে তার কাণ্ড কারখানা দেখতে লাগল।
খুশ বাহার পারসী বুড়াের পাশে চোখে-মুখে গাম্ভীর্যের ছাপ এঁকে বসে রইল। পারসী-বুড়াে এবার মুখ খুলল—“দেখুন, বিমারি আমি ধরে ফেলেছি। জ্বর বা অন্য উপসর্গ যা কিছুই থাক না কেন, তার আসল বিমারি বুকে। বুকের—।
তাকে কথাটি শেষ করতে না দিয়েই বৃদ্ধা বলল—“ঠিক বাৎ বটে। ওর বুকের মধ্যে নাকি সর্বদা ধড়ফড় করে। হরদম ধড়ফড় করে।
পারসী বুড়াে আবার গম্ভীর হয়। বিড়বিড় করে কি সব বলে, তারপর এক সময় আবার মুখ খােলে—“দেখুন, ইলাজ শুরু করার আগে আমাকে আরও কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। যেমন ধরুন, সে কোন্ দেশের লেড়কি? কোত্থেকে এবং কিভাবে এখানে এসেছে? আর তার উমরই বা কত ?
–“দেখুন হেকিম সাহেব, আমি যা কিছু বলব সবই খুশ নাহার এর মুখ থেকে শােনা কথা। শুনেছি, কুফা নগরেই নাকি তার জন্ম আর উমর সম্বন্ধে শুনেছি ষোল সালের কাছাকাছি। যে সালে কুফা নগর আগুনে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল সে-সালেই নাকি সে পয়দা হয়েছিল। আর দামাসকাস নগরে এসেছে মাত্র কয়েক হপ্তা আগে। খুশ বাহার সব কিছু শুনে ভিমরি খাওয়ার জোগাড়। তার সর্বাঙ্গে ঘাম দেখা দিয়েছে। বিন্দু বিন্দু ঘাম কপাল জুড়ে ভেসে উঠেছে। পারসীবুড়াে এবার খুশ বাহার-এর দিকে তাকিয়ে বলল—“বেটা, বােতল নাও। সাত নম্বর দাওয়াই বানাও। খুব হুশিয়ার, একটু হেরফের হলে ফেলে দিয়ে ফিন বানাবে।
আগন্তুক বৃদ্ধা এবার পারসী বুড়াের সঙ্গে একটু গল্প করে সময় কাটাবার ধান্দা করল। বলল-এ লেড়কা খুবসুরৎ দেখছি! আপনার বেটা বুঝি? যার জন্য দাওয়াই নিচ্ছি সে-ও খুবসুরৎ।
-হ্যা, আমার বেটা। আপনার নফর বটে।
-একদিন আপনার এ খুবসুরৎ বেটাও বড় হেকিম হয়ে উঠবে।”
খুশ বাহার দাওয়াইয়ের বােতল ভরল ও কয়েকটি পুরিয়া বানাল। সুযােগ বুঝে পুরিয়ার কাগজের গায়ে কুফা অঞ্চলের ভাষায় নিজের নাম, ঠিকানা প্রভৃতি লিখে দিল। দুর্বোধ্য হরফ। যারা এ-ভাষা বােঝে না তাদের চোখে কেবলমাত্র কয়েকটি কালির আঁচড় ছাড়া কিছু নয়। এবার দাওয়াইয়ের বােতল ও পুরিয়া বৃদ্ধার হাতে তুলে দিল। বৃদ্ধা রুমাল থেকে দশটি সােনার দিনার পারসী-বুড়াের হাতে গুঁজে দিয়ে ব্যস্ত পায়ে দোকান থেকে বেরিয়ে আবার খচ্চরের পিঠে উঠল।
বৃদ্ধা খুশ নাহার-এর কামরায় গিয়ে তার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলল-“চোখের পানি মােছ বেটি। এই দেখ, তােমার জন্য বড়িয়া দাওয়াই নিয়ে এসেছি। মােক্ষম দাওয়াই। যেমন খুবসুরৎ বুড়াে হেকিম তেমনি খুবসুরৎ তার নওজোয়ান বেটা। এক পুরিয়া খাবে তাে বিমারি পালাতে পথ পাবে না।
খুশ নাহার বৃদ্ধাকে সত্যিকারের আপনজন ভাবে। তামাম প্রাসাদে একমাত্র একেই একটু-আধটু বিশ্বাস করে। ভালও বাসে খুবই। দাওয়াইয়ের একটি পুরিয়া খােলামাত্রই খুশ নাহারের চোখে মুখে খুশীর ছাপ ফুটে ওঠে। সে পুরিয়ার গায়ের লেখা বার বার পড়তে লাগল—“আমি খুশ বাহার। আমার আব্বা কুফার বণিক। আচমকা তার মাথাটি চক্কর মেরে ওঠে। কোনরকমে দেওয়াল ধরে নিজেকে সামলে নেয়। তারপর গলা নামিয়ে বৃদ্ধাকে বলে—“আচ্ছা, হেকিমের লেড়কাটির সুরৎ কেমন? ওমর কত ?
‘খুবসুরৎ। আর ওমর সতের সালের কাছাকাছি। বৃদ্ধাটি একটু আগে তাকে যেমন দেখে এসেছে বিলকুল তাই বর্ণনা দিল। সে সঙ্গে বলল—তার মুখের একটি কালাে তিল তার সুরৎ-কে আরও অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সবকিছু শুনে খুশ নাহার বৃদ্ধাকে আলিঙ্গন করে বলল-“তােমার দাওয়াই আমার অসুখ অনেক কমিয়ে দিয়েছে। এবার পুরিয়ার গায়ে ছত্র কয়টি দেখাল।
খুশ নাহার সুস্থ, বিলকুল সুস্থ। বৃদ্ধার মুখে খুশ নাহার-এর রােগ নিরাময়ের খবর শুনে খলিফা তাে আহাদে একেবারে গদগদ। সে সন্তুষ্ট হয়ে দাওয়াইয়ের দাম ছাড়াও ইনামস্বরূপ এক হাজার সােনার দিনার হেকিমকে পাঠিয়ে দিল।
_ বৃদ্ধা পারসী-হেকিমের কাছে যাওয়ার সময় খুশ নাহারও একটি পুরস্কার পাঠিয়ে দিল। একটি ছােট্ট কাগজের বাক্স তার হাতে দিয়ে বলল--এক কাজ করবেন, এটা হেকিমের বেটার হাতে দেবেন। খবরদার অন্য কারাে চোখে যেন এটি না পড়ে।
বৃদ্ধা পারসী বুড়াের দোকানে গিয়ে খুশবাহারের হাতে খুশ নাহার-এর বাক্সটি তুলে দিল।
খুশ বাহার চিঠি পড়ল। তাতে খুশ-নাহার লিখেছে, সে শয়তানী ভণ্ড বুড়ি কিভাবে তাকে সুবাদারের হাতে তুলে দেয়। তারপর সুবাদার তাকে দামাস্কাসে খলিফার প্রাসাদে পাঠায়। খলিফার ইচ্ছার কথাও লিখতে সে ভুলল না। চিঠিটি পড়া শেষ হতে না হতেই খুশ বাহার চোখের পানি ফেলতে ফেলতে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। পরমুহূর্তেই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল। ব্যাপার দেখে বৃদ্ধা তাজ্জব বনে যায়। পারসী-বুড়ােকে জিজ্ঞাসা করে—‘আপনার বেটার চোখে পানি, সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল— ব্যাপার কি ?
– এ-ই তাে স্বাভাবিক। যাকে আপনি খলিফার বাঁদী ভাবছেন, যার জন্য দাওয়াই নিয়ে গেলেন, তার আদৎ পরিচয় জানেন কি ? সে -এ লেড়কার পিয়ারের বিবি। শাদীকরা বিবি। কুফার হতচ্ছাড়া পাজী সুবাদার ফন্দি করে বুড়িকে দিয়ে তার মকান থেকে ভাগিয়ে নিয়ে আসে। তারপর খলিফার ভােগের সামগ্রী হিসাবে দামাস্কাসে চালান করে দেয়। বিবির বিরহে লেড়কাটির হালৎ খুবই খারাপ দেখে আমি তাকে এখানে নিয়ে আসি। এ আমার বেটা তাে নয়ই, এমন কি আত্মীয়ও নয়। আদতে এক বণিকের বেটা। কুফায় এর ঘর। আর নাম খুশ বাহার। । বৃদ্ধা খুশ বাহার ও খুশ নাহার-এর মর্মান্তিক বৃত্তান্ত শুনে চোখেমুখে বিষাদের ছাপ এঁকে গম্ভীর হয়ে বসে রইল।
পারসী-বুড়াে বলে চলল—সবই তাে শুনলেন। এবার আপনার সাহায্য-সহযােগিতা পেলে এরপক্ষে পিয়ারের বিবিকে ফিরে পাওয়া সম্ভব হতে পারে। এবার জেব থেকে খলিফার দেওয়া ইনাম একহাজার সােনার মােহর বুড়ির হাতে দিয়ে সে বলল—এগুলাে আপনাকে ইনামস্বরূপ দিচ্ছি। যদি এ-লেড়কার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় তবে আরও বহুৎ কিছু দিয়ে আপনাকে খুশী করে যাব। কোশিস করে দেখুন, যদি দু-দুটো নওজোয়ানের জান বাঁচাতে পারেন।
এমন সময় প্রভাতের সূচনা হচ্ছে দেখে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
দুশ’ পঁয়তাল্লিশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় যামে বেগম শাহরাজাদ আবার তার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, বৃদ্ধা মােহরের পুঁটুলিটি হাতে নিয়ে বলে,-“হেকিম সাহেব, আমার কোশিসের ঘাটতি হবে না। কিন্তু কাজ হাসিল হওয়া বা না হওয়া তাে নসীবের ব্যাপার। বৃদ্ধা আবার খচ্চরের পিঠে চেপে প্রাসাদে ফিরে আসে। খুশ নাহার-এর দিলে খুশীর ঝিলিক। মুখে হাসির রেখা। তার দিল বলছে সে আবার তার প্রাণপ্রতিম খুশ বাহার-এর কাছে ফিরে যেতে পারবেই।
বৃদ্ধা বলে—“বেটি, তুমি যদি আগে এসব কথা একটিবার আমার কাছে ফাস করতে তবে হয়ত এতদিনে তােমার তকলিফ দূর হয়ে যেত। আমার ওপর ভরসা রাখ। আমি এ-পরিস্থিতিতে নিজের বেটির জন্য যা করতাম, তােমার মুক্তির জন্যও একই ভাবে কোশিস করব। খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি, যত তকলিফই আমার হােক না কেন তােমাকে তােমার বাঞ্ছিতের কাছে পৌছে দেবই দেব।'
খুশ নাহার চোখের পানি মুছতে মুছতে বৃদ্ধাকে জড়িয়ে ধরে। চোখের কোল বেয়ে আবার পানির ধারা নেমে আসে। আনন্দাশ্রু।
দু’দিন বাদে বৃদ্ধা ফিন পারসী-বুড়াের দোকানে আসে। খচ্চরের পিঠ থেকে একটি পুটুলি নামিয়ে আনে। এতে এক প্রস্থ আউরতের পােশাক। সালােয়ার, কামিজ, বােরখা প্রভৃতি। বৃদ্ধা পুটুলিটি খুলে পােশাকগুলাে খুশ বাহার’কে পরিয়ে আউরত সাজিয়ে নিল। বৃদ্ধাটি এবার খুশ বাহার’কে নিয়ে পথে নামল। পথ চলতে চলতে এক সময় বলল-“বেটা, লেড়কিরা কিভাবে পাছা দুলিয়ে দুলিয়ে হাঁটে পরখ করে নাও। সেভাবে হাঁটার কোশিস কর। এবার আগে আগে হাঁটছে এরকম একদল লেড়কিকে দেখিয়ে বলল-“ওই দেখ, ওরা হাঁটার সময় পাছাদুটো কেমন ক্রমান্বয়ে ওঠা-নামা করছে। কোশিস কর বিলকুল তাদের মত করে হাঁটতে।
খুশ বাহার লেড়কিদের হাঁটার ঢঙ ঢঙ কিছুটা রপ্ত করে নিল এবং নিজের হাঁটা চলার মধ্যে তা ফুটিয়ে তুলল। ' এবার বৃদ্ধা খুশ বাহারকে নিয়ে খলিফার প্রাসাদে ঢুকল। আউরতদের হারেমে ঢােকার কোন বাধা নেই। ফলে-বৃদ্ধা খুশ বাহারকে নিয়ে অনায়াসে হারেমে ঢুকে গেল।
হারেমে ঢুকে বৃদ্ধা অঙ্গুলি-নির্দেশ করে খুশ বাহার কে বলল-- এক কাম কর, ওই যে দরওয়াজাটি দেখছ সেটি দিয়ে সােজা ঢুকে যাবে। তারপর একটি লম্বা রােয়াক চোখে পড়বে। রােয়াক শেষ করে বাঁ-দিকে ঘুরবে। তারপর সামান্য এগিয়ে দেখবে ডান-দিকে আর একটি রােয়াক। সামান্য যেতেই পাশাপাশি অনেকগুলাে দরওয়াজা দেখতে পাবে। প্রথম পাঁচটি দরওয়াজা বাদে ষষ্ঠ দরওয়াজা ঠেলে কামরায় ঢুকে যাবে। একটু বাদেই আমি খুশ নাহার’কে পাঠিয়ে দেব। ধৈর্য ধরতে হবে, আমি সুযােগের সন্ধানে থাকব। তারপর খােজা আর প্রহরীদের সাহায্যে তােমাদের দু'জনকে প্রাসাদ থেকে পাচার করার বন্দোবস্ত করব।
খুশ বাহার বৃদ্ধাকে সুকরিয়া জানিয়ে ধীর-পায়ে, লেড়কিদের মত পাছা দোলাতে দোলাতে এগিয়ে চলল। বৃদ্ধার নির্দেশ অনুযায়ী চলার পর পাশাপাশি দরওয়াজাগুলির কাছে এক সময় হাজির হ’ল। এবার পর পর পাঁচটি দরওয়াজা ছেড়ে ষষ্ঠ দরওয়াজায় সামান্য চাপ দিল। দরওয়াজা খুলে গেল। খুশ বাহার ভেতরে ঢুকে পালঙ্কের ওপর লেড়কিদের ঢঙে বসল।
এবার খুশ বাহার-এর ধৈর্য পরীক্ষা। নীরব প্রতীক্ষা। কখন তার মনময়ুরী দরওয়াজা ঠেলে কামরায় ঢুকবে। তাকে আলিঙ্গন করে কলিজার জ্বালা নেভাবে।
এমন সময় প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় পাখিদের কিচির মিচির শুরু হয়ে গেল। ভােরের পূর্বাভাষ। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
দুশ’ ছেচল্লিশতম রজনী,
রাত্রি একটু গভীর হতেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদএর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, খুশ বাহার কামরায় ঢুকে পালঙ্কের ওপর বসল। এবার চারদিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে কামরাটিকে দেখতে লাগল। তার মনে খটকা লাগল। এত বড় কামরায়ই কি বৃদ্ধা তাকে ঢুকতে বলেছে? এমন বিশাল একটি কামরা তাে কারাে শােবার কামরা হতে পারে না। ভুল করে অন্য কামরায় ঢুকে কেলেঙ্কারী বাঁধিয়ে বসে নি তাে? তা ছাড়া এক ধারে একটি মসনদও রয়েছে। ডরে তার কলিজা শুকিয়ে যাবার জোগাড় হ’ল। সে ধরেই নিল-পিয়ারীকে পাওয়ার আগেই তার মােউৎ এসে হাজির হবে। হয় গর্দান যাবে, না হয় শূলে চড়িয়ে জান খতম করবে। খুশ বাহার ব্যাপারটি নিয়ে অনেক ভাবনা চিন্তা করল। কিন্তু কোন পথ বের করতে না পেরে নসীব সম্বল করে পালঙ্কের ওপর বসেই রইল।
কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই খেল শুরু হয়ে গেল। কার যেন পায়ের শব্দ তার কানে এল। উৎকর্ণ হয়ে ব্যাপারটি সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হবার কোশিস করল। হ্যা, অনুমান অভ্রান্ত। পায়ের শব্দটি তার দিকেই এগােচ্ছে বটে। তার কলিজাটি দাপাদাপি শুরু করে দিল। ডরে গলা পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। চোখ বন্ধ করে খােদাতালার নাম করতে লাগল। । কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই এক বৃদ্ধা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। বৃদ্ধাটি-ই দাহিয়া খলিফার বহিন।
দাহিয়া কামরায় ঢুকেই বােরখা পরা এক আউরত-কে পালঙ্কের ওপর বসে থাকতে দেখল। তাজ্জব বনে যায়। দু’পা এগিয়ে এসে বলল-“তুমি কে গা? আর হারেমের মধ্যে বােরখা চাপিয়ে বসে কেন? হারেমে বোেরখার জরুরৎ তাে নেই। কে তুমি? হারেমে পরপুরুষের যে প্রবেশাধিকার নেই তা-ও তােমার মালুম নেই বুঝি ? বল তাে, কে তুমি? খুশ বাহার-এর মুখ দিয়ে রা সরে না। থরথরিয়ে কাপতে থাকে। বুকের মধ্যে ধড়ফড়ানি শুরু হয়ে যায়। বলবেই বা কি? আর কি করেই বা বলবে? সে যে দাহিয়ার কণ্ঠ শুনেই পৌনে মরা হয়ে গেছে।
পালঙ্কে বসা বােরখাপরা আউরত-টির কাছ থেকে কোন জবাব পেয়ে দাহিয়া আবার আগের মত স্বাভাবিক স্বরে বলে-“কি গা বেটি, কিছু কইছ না কেন? শরম লাগছে? ধুৎ শরমের কিছু নেই। এবার হাত বাড়িয়ে নাকাবটি সরিয়ে বলল—“ইয়া আল্লা’ কী সুরৎ তােমার! এমন এক মুখ বােরখা দিয়ে ঢেকে রাখছ! খুশ বাহার তবু নির্বাক। পাথরের মূর্তির মত বসে রইল।
দাহিয়া বলল—“তুমি খলিফার বাদী? তােমাকে খলিফা বরখাস্ত করেছেন ? তােমার কসুর কি ছিল? ঠিক আছে, আমি খলিফাকে বলে কয়ে ফিন তােমাকে বহাল করে দেব। আমি খলিফার সহােদরা। আমার নাম দাহিয়া। কি তােমার তকলিফ আমার কাছে খােলসা করে বল। খুশ বাহার এবারও নির্বাক। মুখ নিচু করে, কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে।
দাহিয়া এবার আরও কাছাকাছি এগিয়ে যায়। সহানুভূতির স্বরে বলে--‘খােল, বােরখা খুলে দাও। এবার সে ধরতে গেলে জোর করেই তার গা থেকে বােরখা খােলার কোশিস করে। আর খুশ বাহার দু’হাতে মুঠো করে বােরখা ধরে থাকে। ব্যস, দাহিয়া জুলুম করতে লেগে যায়। দাহিয়া হঠাৎ ভড়কে যায়। বােরখা খােলার চেষ্টা করতে গিয়ে দাহিয়া বুঝল খুশ বাহার-এর বুকটি লেড়কাদের মত সমান। এরকম উমরে লেড়কিদের বুক তাে হৃষ্টপুষ্ট আপেলের মত হয়। আপেল তাে দূরের কথা, একটি কুলের চিহ্নও নেই। সে তাজ্জব বনে গেল।
( চলবে )

0 Comments