আরব্য রজনী পার্ট ৬৪ ( Part 64 ) Arabyarajani bangla

ALIF LAILA BANGLA PART 64 আলিফ লায়লা পার্ট ৬৪ সহস্র এক আরব্য রজনী পার্ট ৬৪
পরবর্তী অংশ ঃ 
একটু বেগড়বাই কিছু মালুম হলেই বসনে পদাঘাত করে এখান থেকে কেটে পড়ব, সাফ কথা। কৌতূহলের শিকার হয়ে একদিন জামান সম্রাট বদর’কে বলল-জাহাপনা, আমি আপনার আচরণে তাজ্জব না হয়ে পারছি না। আপনি আমাকে যে খাতির যত্ন করছেন তাতে আমি কেবলমাত্র অবাকই হচ্ছিনা, বিব্রতও বােধ করছি। আর আমাকে যে আপনার মসনদের পাশে আসন দিয়েছেন তাতে তাে কেবলমাত্র আপনার একান্ত প্রিয়জনদের প্রাপ্য।

জাহাপনা, আমাকে উজিরের সমান পদে বহাল করেছেন কিন্তু এ-কাজ তাে কোন যুবকের অবশ্যই নয় পাকা চুল দাড়িওয়ালা কোন আদমিরই এ-পদে বহাল হওয়ার কথা। কিছু মনে করবেন না, আপনার দিলে আমাকে নিয়ে যদি কোন মতলব থাকে তবে মেহেরবানি করে সাফ সাফ বাতিয়ে দিন।
মুচকি হেসে বদর বলল-“খুবসুরৎ নওজোয়ান, তুমি যা কিছু বললে খুবই সাচ বাৎ বটে। আমার কাম কাজের পিছনে কারণ তাে কিছু না কিছু আছেই। আসলে তােমার সুরৎ-ই আমার কলিজায় জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে।
‘আল্লাতাল্লা আপনার মঙ্গল করুন। আপনার দোহাই, আমাকে এ-বন্ধন থেকে মুক্তি দিন। আমার এক বিবি রয়েছে। আজ সে নিরুদ্দেশ। তাকে আমি নিজের কলিজার চেয়ে বেশী পেয়ার মহব্বৎ করি। তার বিরহে আমি জ্বলে পুড়ে খাক হচ্ছি, তাই মেহেরবানি করে আমাকে আপনার মহব্বতের বন্ধন থেকে মুক্তি দিন । জাহাপনা আপনি আমার সুখ-উৎপাদনের জন্য যা কিছু করেছেন তার জন্য আমি সর্বান্তকরণে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি।
সম্রাট বদর হাত বাড়িয়ে উজিরের একটি হাত চেপে ধরে আবেগ-মধুর স্বরে বলে উঠল—“পরদেশী নওজোয়ান উজির, দিমাক ঠাণ্ডা করে বস। তােমার সুরৎ দেখে আমি মুগ্ধ। তাই তােমাকে কাছ ছাড়া করছিনা। তােমার পটলচেরা চোখ দুটো আমার কলিজায় জ্বালা ধরিয়ে দেয়। তুমি যদি সত্যই নওজোয়ান হও তবে কেন মিছে নিজেকে শম্বুকের মত গুটিয়ে নিচ্ছ। আর একটি বাৎ নিশ্চয়ই স্বীকার করবে, নসীবকে অস্বীকার করা যায় না । 
জামান সচকিত হয়ে বলে—এ কী তাজ্জব কথা বলছেন জাঁহাপনা। আপনি এক নওজোয়ান, আমিও তা-ই। আপনার হারেমে তাে বহুৎ খুবসুরৎ আউরৎ রয়েছে। তাদের ছেড়ে আপনি আমার মত এক নওজোয়ানের মহব্বতে মজে গেছেন! ব্যাপারটি তাে মােটেই স্বাভাবিক নয় জাহাপনা। আপনি তাদের সাথে মহব্বতের খেলায় মাততে পারেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা যা কিছু দিল চায় করতে পারেন, বাধা নেই। গােস্তাকী মাফ করবেন জাঁহাপনা আমার কিছুতেই মালুম হচ্ছে না, কেন আপনি আমার মত এক নওজোয়ানের ঘাড়ে চেপে বসলেন। আমাকে ছেড়ে দিন। আমি আমার নিজের ধান্দায় চলে যাই। এসব ঝুট ঝামেলায় আমার দিল উত্যক্ত হয়ে উঠছে।
মুচকি হেসে বদর বলল—হয়ত তুমি সাচ বাৎ-ই বলেছ নওজোয়ান। কিন্তু আলাদা আলাদা আদমির রুচিবােধও আলাদা হয়, স্বীকার করছ কি? রুচির সঙ্গে তাল রেখে তার প্রবৃত্তিও বদলে যায়।
‘হায়, আল্লাহ!’ জামান আপন মনে বলে উঠল। সে নিঃসন্দেহ হ’ল, সম্রাটের দিমাক কিছু গড়বড় হয়ে গেছে। এখন অন্ততঃ তাকে ভাল কিছু সমঝানাে যাবে না। তাই অনন্যোপায় হয়েই তখনকার মত প্রসঙ্গটি ধামাচাপা দিল। সে-ও মনস্থির করল। পরিস্থিতির চাপে পড়ে যদি কিছু তাজ্জব কাণ্ডকারখানা অভিজ্ঞতা লাভ করা যায় তা-ই হােক। এমন সময় প্রভাত হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা। বন্ধ করলেন।
                         দু’ শ’ চৌত্রিশতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ আবার কিসসা শুরু করলেন—“জাঁহাপনা, সম্রাট বদর-এর বাৎ শুনে কামার অলজামান বলল—জনাব, আপনার প্রস্তাবে আমি সম্মতি দিতে পারি, তবে একটি শর্ত আছে। আপনাকে কসম খেতে হবে, আমাকে নিয়ে আপনি যে কোনভাবে, যে কোন কৌতুহল চরিতার্থ করার খেলায় মাতামাতি করতে পারেন, আমি কিছুমাত্রও আপত্তি করব না। কিন্তু কেবলমাত্র একবারই করবেন, প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। আল্লাতাল্লার মর্জি। তার মর্জি মাফিকই এসব হচ্ছে, জানি।
বদর ম্লান হাসল।
সুন্দরী বদর জামানকে নিজের কামরায় তলব করল। জামান এলে মুচকি হেসে বলল—“তুমি তাে জবান দিয়েছ, আমাকে মর্জি মাফিক যে কোন কাজ করতে দেবে, ঠিক কিনা?
জামান নির্বাক। 
বদর এবার অতর্কিতে জামান-এর বুকের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। দু'হাতে আলিঙ্গনাবদ্ধ করল। ঠোটে ঠোট লাগিয়ে উন্মাদিনীর মত তার কপালে, ঠোটে ও গালে একের পর এক চুম্বন করতে লাগল।
জামান পরম বিতৃষ্ণায় বারবার মুখ বিকৃত করতে লাগল। এক নওজোয়ানের কাছে অন্য এক নওজোয়ানের চুম্বন অবশ্যই সুখদায়ক হওয়ার কথা নয়।
জামান ব্যাপারটির মধ্যে কেমন যেন এক রহস্যের গন্ধ পেল। বদর-এর শরীরটিকে নিয়ে তার মধ্যে গভীর রহস্যের সঞ্চার ঘটল। তার শরীরটিতে কেমন যেন গলতি আছে মালুম হ’ল। পুরুষের শরীর বিশেষ করে অংশ বিশেষ লেড়কিদের মত নরম হওয়ার তাে বাৎ নয়। ভাবে, তবে কি এটি আসলে লেড়কার শরীরই নয়! বদর আবার তাকে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বলে—‘মেহবুব আমার, তুমি কি এখনও আমাকে ঠাহর করতে পারছ না? আমি তােমার হারিয়ে যাওয়া বদর। দু’দুটো—বিশেষ করে একটি রাতের স্মৃতি কি এত সহজে ভুলে গেলে ? তােমার দিল থেকে আমাকে চিরদিনের মত মুছে ফেলেছ?”
জামান চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপ এঁকে নিষ্পলক চোখে বদরএর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বদর এবার তার গা থেকে সম্রাটের ছদ্মবেশ এক এক করে খুলে ফেলল।
কামার অল-জামান-এর সামনে স্মিত হাস্যে দাঁড়াল তার বিবি, তার কলিজা, আর সম্রাট ঘায়ুর-এর লেড়কি বদর। জামান আবেগে-উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে বদর’কে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল—‘পেয়ারী, আমার দীর্ঘদিনের খােয়াব আজ বাস্তবতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। আল্লাতাল্লার দোয়ায় তােমাকে সত্যই আজ বুকে ফিরে পেলাম। সারারাত্রি তারা বিনিদ্র অবস্থায় কাটাল। জামান বলল তার বিচ্ছেদ-বেদনার কথা। আর বদর শােনাল নিজের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা। রাত্রি শেষ হয়ে যায় কিন্তু তাদের কথা ফুরােয় না।
ভাের হ’ল। বদর বিছানা থেকে নেমেই সােজা বৃদ্ধ সম্রাট আরমানুস-এর কামরায় গেল। সব বৃত্তান্ত তার কাছে ব্যক্ত করল। আরমানুস বদর-এর মুখ থেকে সব কিছু শুনে কয়েক মুহূর্ত বাজপড়া রােগীর মত নির্বাক-নিস্পন্দভাবে বসে রইলেন। কি বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না।
বদর এবার হাত কচলে বৃদ্ধ সম্রাট আরমানুস-এর কাছে নিজের বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে বলল-“জাহাপনা, আপনার আদরের বেটি হায়াৎ-এর কুমারীত্ব এখনও অক্ষুন্ন রয়েছে। আপনি তাে কামার অল-জামান’কে জামাতা করতে চেয়েছিলেন। সে তাে আপনার প্রাসাদেই এখন অবস্থান করছে। আপনার দিল চাইলে তাদের শাদীর বন্দোবস্ত করতে পারেন। আমার এতে তিলমাত্র আপত্তিও নেই।
-“কিন্তু বেটি, তােমার জামান- 
-“হায়াৎ'কে আমি ছােট বহিনের মত পেয়ার করি। আমরা দুজনে একই সম্পত্তি জামান’কে ভাগাভাগি করে নেব। কসম খেয়েছিলাম, হায়াৎ হবে জামান-এর দ্বিতীয়া বিবি। বৃদ্ধ সম্রাট আরমানুস এবার কামার অল-জামান-এর কামরায় গিয়ে তার হাতদুটো চেপে ধরে আকুল আবেদন রাখলেন-বেটা আমার বেটিকে তুমি গ্রহণ কর। সে সঙ্গে আমার মসনদ, আমার সাম্রাজ্য, আমার প্রাসাদ আর অগণিত প্রজার দায়িত্বও তােমাকে অর্পণ করতে চাচ্ছি। আপনাদের, বিশেষ করে বদর-এর মতের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাধ আমার নেই, সাধ্যও নেই। বদর-এরও যখন একই মর্জি তখন আমার আপত্তির কারণ নেই।
শুভ মুহুর্তে কামার অল-জামান ও হায়াৎ-এর শাদী হয়ে গেল। বদর তাকে নিজের বুকে টেনে নিল। এবার বলল–বহিন, তুমি হলে জামান-এর খাস বেগম। আর আমি হলাম তার বাদী।
বৃদ্ধ সম্রাট আরমানুস পারিষদদের মধ্যে প্রচার করে দিলেন -কামার অল-জামান-এর সঙ্গে তার একমাত্র বেটি হায়াৎ-এর শাদী হবে আর সেই হবে এ সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি।
সম্রাট আরমানুস-এর প্রাসাদে নতুন করে আলাের রােশনাই বয়ে গেল। ফুল-মালায় প্রাসাদটিকে চমৎকার করে সাজানাে হল। ঝাড়বাতি জ্বলল। সানাই বাজল। কামার অল-জামান-এর সঙ্গে নানা আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে হায়াৎ-এর শাদী হয়ে গেল। শাদীর যাবতীয় ব্যবস্থাপনা বদর নিজে হাতে করল। তার কলিজাটি বার বার মােচড় মেরে উঠল বটে তবু তাকে মুহুর্তের জন্যও বিচলিত হতে দেখা গেল না, সবাই তার ঔদার্যের পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হল।
এক সাল ঘুরতে না ঘুরতেই কামার অল-জামান এবং হায়াৎএর এক টুকটুকে লেড়কা পায়দা হ’ল। আবার বদর-এর গর্ভেও একটি অনিন্দ্য সুন্দর লেড়কা পায়দা হ’ল। তারা একই সঙ্গে সহােদর ভাইয়ার মত মানুষ হতে লাগল। জিন্দেগীভর তাদের মধ্যে হৃদ্যতার সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ ছিল।

বেগম শাহরাজাদ কামার অল-জামান ও বদর-এর কিসসা শেষ হতে না হতেই দুনিয়াজাদ তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে বলল-বহিনজী তােমার কিসসা কী সুন্দর! কিসসা শুনতে শুনতে মনে হয় আমি যেন সে অচিনদেশের নায়ক-নায়িকাদের কাছাকাছি পাশাপাশি বসে সব শুনছি, দেখছিও সব। বেগম শাহরাজাদ বললেন-“তাের একার দিল ভরলেই তাে হ’ল না, আমার আর একজন শ্রোতাও যে রয়েছেন। আমার কিস্সা তাঁর দিলে কতখানি দাগ কাটছে তা-ও তাে জানা দরকার।
বাদশাহ শারিয়ার তার হাতে আলতাে করে একটি চুমু খেয়ে বললেন—“পেয়ারি, তােমার মুখের কিসসা শােনার জন্য আমি পাগলের মত তােমার কামরায় ছুটে আসি, তােমার কিছু মালুম হয় ?' ইতিমধ্যে প্রভাতের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিস্সা। বন্ধ করলেন।
                   খুশ বাহার ও খুশ নাহারের কিসসা
                   দুশ’ সাঁইত্রিশতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার নতুন কিসসা শােনার অত্যুগ্র আগ্রহ নিয়ে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন।
বেগম শাহরাজাদ বললেন—“জাঁহাপনা আজ শুরু করছি খুশ বাহার ও খুশ নাহার-এর কিস্সা। প্রাচীনকালে কোন এক নগরে এক বণিক বাস করত। তার নাম ছিল-বাহার। সে ছিল এক নওজোয়ান। বাহার পালতােলা নাও নিয়ে দুনিয়ার বহুদেশে ঢুঁড়ে ঢুঁড়ে সওদা করত। আর সে সমানপত্র অন্য এক দেশে বেচে বহুৎ সােনার দিনার কামাই করত। নওজোয়ান যথা সময়ে এক খুবসুরৎ লেড়কিকে শাদী করল। এক সাল ঘুরতে না ঘুরতেই বাহার-এর বিবি এক লেড়কা পায়দা করল। তার নামকরণ করা হ’ল খুশ বাহার।
লেড়কা পয়দা হওয়ার সাতদিন বাদে বাহার বাঁদীর বাজারে হাজির হ’ল। তার বিবি লেড়কা নিয়ে কাম কাজ করতে পারে না, তাই একটি বাঁদী তার ঘরে না হলেই নয়। বিবির সেবা যত্ন করবে, বাচ্চা সামলাবে, খানা পাকাবে—এরকম কাম কাজের জন্য এক জনানা জরুরৎ হয়ে পড়েছে। বাহার বাঁদীর বাজারে গিয়ে বহু খোঁজাখুঁজি করে এক মাঝবয়সী, মােটামুটি সুরৎ আছে এমন এক বাঁদীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার পিঠে কাপড়ের ঝােলায় একটি খুবসুরৎ লেড়কি বাঁধা। যে এ-বাঁদীকে কিনবে তাকে লেড়কিটি সহই কিনতে হবে।
বাহার বাঁদীটির দালালকে দাম জিজ্ঞাসা করল।
দালালটি বলল-বাঁদী আর বাচ্চা লেড়কির দাম পঞ্চাশ সােনার দিনার।
বাহার আর দরাদরি না করে দালালের হাতে পঞ্চাশটি সােনার দিনার গুজে দিয়ে বাঁদী আর তার বাচ্চা লেড়কিটিকে ঘরে নিয়ে এল।
বাঁদী দেখে বাহার-এর বিবি খুশী হ’ল বটে তবে অহেতুক এতগুলাে দিনার খরচা হওয়ায় তার কলিজাটি খচখচ করছিল।
বণিক বাহার বিবিকে সমঝাল—‘শােন, ওই বাচ্চা লেড়কিটিকে দেখে আমার দিলে দর্দ হ’ল। কিনেই ফেললাম। ওর সুরৎ দেখেছ; কামরায় আলাের রােসনাই বয়ে যায়। বড় হলে ওর সুরৎ আরও বাড়বে। তােমার বেটার সঙ্গে শাদী দেব। কেমন আচ্ছা মানাবে বল?
—সবই তাে সমঝালাম। কিন্তু এতগুলাে আদমির খরচাপাতিও তো কম হবে না।
–তুমি ঘাবডিও না বিবি। আমি ঠিক সামাল দিয়ে নেব। আমার বাৎ মিলিয়ে নিও, লেড়কিটির বয়স হলে তামাম আরব,পারস্য ও তুরস্কের মধ্যে সুরতের বিচারে সবচেয়ে সেরা হবে।
বণিককে বিবি জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারল বাঁদীটির নাম হাফিজা আর তার বাচ্চা লেড়কির নাম নসীবা।
–‘বহুৎ আচ্ছা নাম তাে! তােমার নাম হাফিজা আর বেটির নাম নসীবা বহুৎ আচ্ছা!  বণিকের বিবি এবার বণিককে বলল—‘শােন, নিয়ম আছে, দাসী-বাঁদী খরিদ করে আনলে তাদের পুরনাে নাম বাতিল করে নতুন নাম দিতে হয়। নামকরণের কথা কিছু ভেবেছ কি ?
বণিক বলল—“তােমার সেবা যত্ন করার জন্য বাঁদী খরিদ করে আনলাম, নামকরণ তাে তােমার পছন্দ মাফিকই করতে হবে বিবিজান। তুমিই যা হােক ভেবে চিন্তে দুটো নাম রেখে ফেল। এর মধ্যে আর আমাকে জড়িও না।
বণিকের বিবি অনেক ভেবেচিন্তে চমৎকার এক নাম বের করল। বণিকের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল—“আচ্ছা, বাচ্চাটির নাম যদি খুশ নাহার রাখা হয় তবে কেমন হবে বল তাে? ‘খুশ নাহার ? বেড়ে নাম! চমৎকার ! আমাদের বেটার নাম খুশ বাহার, আর এর নাম খুশ নাহার—তাজ্জব কাণ্ড করেছ বিবিজান! চমৎকার মিল হয়েছে। এর চেয়ে সুন্দর নাম আর হয় না।
আরও কয়েক সাল কেটে গেল। খুশ বাহার ও খুশ নাহার একটু বড় হ’ল। তারা ভাই বহিনের মত বড় হতে লাগল। তারা জানেও সম্পর্কে তারা ভাই-বহিন।
খুশ বাহার-এর উমর যখন পাঁচ হ’ল তখন বণিক বহুৎ খরচাপাতি করে ঘটা করে বেটার ছুন্নত-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করল। মেহমান আর দোস্তরা গলা পর্যন্ত ঠেসে খানাপিনা করল। দিনের শেষে সবুজ নিশান হাতে কুফা নগর পরিক্রমা করে শিশুর দীর্ঘায়ু কামনা করল। | খুশ বাহারকে ঝলমলে পােশাকে সাজিয়ে সুসজ্জিত একটি খচ্চরের পিঠে বসানাে হয়। আর অন্য একটি খচ্চরের পিঠে চেপে খুশ বাহার তার পাশাপাশি ছিল। এ ভাবেই দোস্ত, মেহমান ও আত্মীয়স্বজন মিছিল করে নগর পরিক্রমা করে।।
এমন সময় ভাের হয়ে এল । বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
                   দুশ’ আটত্রিশতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে এলেন। বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বলেন—'জাঁহাপনা, এক সময় খুশ বাহার-এর উমর এগার পেরিয়ে বারােয় পড়ল।
এক সকালে বণিক খুশ বাহারকে বলল--বেটা, এখন থেকে তুমি খুশ নাহারকে তােমার বহিনের দৃষ্টিতে দেখবে না। সে তােমার আম্মার পেটের লেড়কি, তােমার সহােদরা নয়। খুশ নাহার আমাদের বাঁদী হাফিজা-এর লেড়কি। তবে বাঁদীর লেড়কি হলেও তাকে তােমার সমান আদর যত্নে মানুষ করা হয়েছে। আর তার দেহে যৌবনের চিহ্ন ফুটে উঠতে শুরু করেছে।'
আব্বার কথা শুনে খুশ বাহার সবিস্ময়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বণিক বলে চলল-“হ্যাঁ বেটা, আমরা সাব্যস্ত করেছি, উমর হলে তােমাদের শাদী দেব। তাই এবার থেকে তােমাদের সহজ স্বাভাবিক মেলামেশা আর চলবে না। এবার থেকে খুশ নাহার বােরখা ব্যবহার করবে। বণিক বাহার ও তার বিবির একান্ত ইচ্ছায় খুশ বাহার আর খুশ নাহার সে-রাত্রেই এক সঙ্গে, এক বিছানায় শােয়। সহবাস করে।
দেখতে দেখতে আর পাঁচ-পাঁচটি সাল গুজরান হ’ল। খুশ নাহার পূর্ণ যৌবনা হয়ে ওঠে। তার দেহের যৌবন চিহ্নগুলাে সুডৌল হয়ে উঠল। যৌবনের জোয়ার দেখা দিল তার দেহে। তামাম কুফা নগরে তার মত খুবসুরৎ লেড়কি দ্বিতীয় আর একজনও নেই।
খুশ নাহার কেবলমাত্র সুরতের বিচারেই নয় গৃহকর্মাদি থেকে শুরু করে শিল্পকর্ম, সাহিত্যচর্চা, কোরাণের ওপর দখল প্রভৃতি গুণাবলীর দিক থেকেও সে অনন্যা হয়ে উঠল।
খুশ বাহার ও খুশ নাহার হাসি-আনন্দের মধ্য দিয়ে দিন গুজরান করতে লাগল। তাদের এ রকম অনাবিল আনন্দ ও সুখ বুঝি খােদাতাল্লার সহ্য হ’ল না। অচিরেই তাদের দাম্পত্য সুখে ভাটা পড়ল। কুফা নগরীর সুবেদারের নজর পড়ল রূপসী তন্বী যুবতী খুশ নাহার-এর ওপর। তার সুরতের সঙ্গে অসাধারণ সব গুণের একত্র সমাবেশ ঘটেছে শুনে খুশীতে তার দিল ডগমগ হয়ে ওঠে। তােবা তােবা—নিজের সুখ-ভােগের জন্য অবশ্যই নয়। তবে ? সে ভাবল, যদি লেড়কিটিকে বণিক বাহার-এর ঘর থেকে ভাগিয়ে নিয়ে আসতে পারে তবেই তার নসীব ফিরে যাবে।
খুবসুরৎ খুশ নাহারকে নিয়ে সে সােজা খলিফা আবদ-অলমালিক ইবন সারবান-এর কাছে হাজির করবে। খলিফাকে ভেট দেবে তামাম আরব, পারস্য ও তুরস্কের সেরা সম্পদ। ব্যস, তার নসীবের চাকা এবার ভন্ ভন করে ঘুরতে শুরু করবে। সুবাদার তার মতলবকে বাস্তবায়িত করার জন্য এক বিকালে এক বুড়িকে খুশ নাহার-এর কাছে ভেজল। বুড়ির সঙ্গে তার শলা পরামর্শ হয়ে গেছে, যে কোন ভাবে সে নাহারকে পটিয়ে পাটিয়ে এনে সুবাদারের হাতে তুলে দেবে। তবে এর জন্য অবশ্যই বুড়িকে ইনাম দেবার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হল।
বুড়ি খুশ নাহার-এর কাছে যাবার সময় কিম্ভুতকিমাকার বেশে নিজেকে সাজিয়ে নিল। তার পােশাক পরিচ্ছদ যেমন বিদঘুটে তার সঙ্গে আনুষঙ্গিক যা কিছু সঙ্গে নিল তাও লক্ষণীয়হ বটে। বুড়ি গলায় পরে নিল একটি ইয়া বড় ও মােটা হাড়ের মালা। মাথার চুল উসকো খুসকো। হাতে নিল একটি পেল্লাই চিমটা।
বণিক বাহার-এর বাড়ির সদর-দরজায় গিয়ে বুড়ি তারস্বরে চেঁচাতে লাগল—খােদা হাফেজ! খােদা মেহেরবান। খােদাতাল্লাই একমাত্র সাচ্চা আর বিলকুল ঝুটা। খােদা হাফেজ। দেখতে দেখতে বণিকের বাড়ির দরজায়, কিম্ভুতকিমাকার বুড়িকে ঘিরে পথচারী কৌতূহলী জনতা ভিড় করল। বুড়ির কণ্ঠে বার বার—খােদা হাফেজ। খােদা মেহেরবান’ ধ্বনি শুনে বণিকের লেড়কা খুশ বাহার দরজা খুলেই ধর্মাত্মা বুড়িকে দেখতে পেল। সে বুড়ির দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তাকাল। বুড়ি মুচকি হেসে বলল—“বেটা, নামাজের সময় বয়ে যাচ্ছে। যদি আপত্তি না কর তবে তােমাদের ঘরে নামাজ সেরে নিতে চাচ্ছি।
নামাজ সারবেন? বহুৎ আচ্ছা বাৎ! এ তাে বড়ই খুশীর কথা। আল্লা তাল্লার নাম করবেন আমার ঘরে এতাে অবশ্যই কাম্য। আসুন, ভেতরে আসুন। বুড়ি আরও জোরে গলা চড়িয়ে ‘খােদা হাফেজ! খােদা মেহেরবান’ ধ্বনি দিতে দিতে ঘরে ঢুকে গেল।
ভেতরে ঢুকে বুড়ি বদনার পানি দিয়ে রুজু সারল। তারপর মক্কার দিকে মুখ করে হতচ্ছাড়ি শয়তানী বুড়ি গলা ছেড়ে নামাজ পড়ল।
শয়তানী বুড়ি নামাজের অভিনয় সেরে উঠতে উঠতে বলল—‘খােদা হাফেজ! খােদা মেহেরবান! খােদা তােমায় দোয়া করবেন বেটা।
শয়তানী বুড়ি নামাজ সারল। কিছু সময় বিশ্রাম করল। কিন্তু বিদায় নেবার নামটি পর্যন্ত নেই।
খুশ বাহার ও খুশ নাহার শয়তানী ভণ্ড বুড়ির আচরণে ক্ষুব্ধ না হয়ে খুশীই হয়। তারা নিজেদের মধ্যে আলােচনা করল—এমন এক ধর্মাত্মা বুড়ি যদি তাদের ঘরে দু-চারদিন থাকেও তবু আপত্তি করবে না। নসীবে না থাকলে এমন ধর্মাত্মা মেহমান জোটে না। 
বুড়ি রােয়াকে আসন পেতে বসল। আল্লাহর নামগান শুরু করল–শােন বেটা, আল্লাহর দোয়া বিনা দুনিয়ার গতি নাই। তার কাছে যে নিজেকে বিকিয়ে দিতে পারে, পুরােপুরি বিলিয়ে দিতে পারে তাদের জন্য বেহেস্তের দরওয়াজা খােলাই থাকে। আর দুনিয়ায় যতদিন থাকে ততদিন বেহেস্তের আনন্দ এখানেই ভােগ করতে পারে। | বুড়ি ধর্মকথার মাধ্যমে তাদের, বিশেষ করে খুশ নাহার-এর দিল জয় করে নিল। আবেগে-উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে সে বুড়িকে বলল—“আমাদের মেহমান হয়ে আজ রাত্রিটুক যদি এখানে থেকে যান তবে- 
—বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা বাৎ! আমি ফকিরের মত দিন গুজরান করছি। আমার কাছে এখান-ওখান বিলকুল সমান। তা তােমরা যদি খুশি হও তবে আজ রাত্রিটা তােমাদের মেহমান হয়েই থেকে যাই।'  খুশ নাহার এবার তার স্বামীর কামরায় গিয়ে বলল—“আমার দিল বলছে বুড়ি আল্লাহর পয়গম্বর হয়ে এসেছে। আমাদের নসীব ফিরে যাবে। আমরা কোশিস করে বুড়িকে এখানে রেখে দিতে পারলে—
খুশ বাহার বলল—“তােমার দিল যখন চাচ্ছে, বুড়িরও যদি আপত্তি না থাকে তবে আর আমি মাঝখান থেকে আপত্তি করে বেহেস্তের পথে নিজেহাতে কাঁটা বিছাতে যাব কেন।  ‘বুড়ি রাজী হয়েছে। আজকের রাত্রিটা তাে থাকুক তারপর কাল তার সঙ্গে বাৎচিৎ করে যা হয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
রাত্রে খানাপিনার সময় খুশ নাহার বুড়িকে কিছু খেতে বলল। বুড়ি আপত্তি জানাল। রােজার দোহাই দিয়ে কিছুই মুখে দিল না। বুড়ির ওপর খুশ বাহার ও খুশ নাহার-এর ভক্তি শ্রদ্ধা আরও অনেকগুণ বেড়ে গেল।
খুশ নাহার তাদের পাশের কামরায় বুড়ির থাকার বন্দোবস্ত করে দিল। শয়তানী বুড়ি সেখানে রাতভর নামাজের ভণ্ডামি আর কোরাণ পাঠ করে কাটাল।
সকালে রুজু করে, নামাজ সেরে বুড়ি খুশ বাহারকে বলল—“বেটা এবার আমি বিদায় নিচ্ছি, কি বল ? খােদা তােমাদের দোয়া করবেন। তােমাদের ভালই করবেন।'
খুশ নাহার চোখ দুটো কপালে তুলে সবিস্ময়ে বলল—সে কী, আপনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। আমরা তাে আরও ভেবেছিলাম, এখানেই জীবনের শেষ ক'টা দিন গুজরান করবেন। মেহেরবানি করে এখানেই থেকে যান।
-বেটি, আল্লাহর দোয়া তােমরা পাবে। তােমরা প্রকৃত মুসলমানের গুণাবলী দিলে ধারণ করছ। তােমাদের দিল জুড়ে রয়েছে ধর্ম আর আল্লাতাল্লা। তােমরা তার দোয়া থেকে বঞ্চিত হবে না । তাই তাে তােমাদের মেহমান হয়ে রাত্রিবাস করে গেলাম। আমি নিয়ৎ করেছি, সব দরগা আর মসজিদগুলাে ঘুরে ঘুরে দেখব। তাই আমাকে অনিচ্ছায় হলেও বিদায় নিতেই হচ্ছে। ভবিষ্যতে এদিকে এলে তােমাদের ঘরেই উঠব, কথা দিচ্ছি।'
বেকুব খুশ বাহার! বেকুব খুশ নাহার। শয়তানী বুড়ির ভণ্ডামী ধরতে পারার মত তাদের সে কূটবুদ্ধির একান্ত অভাব। তাদের তাে তার দুরভিসন্ধি সম্বন্ধে সামান্য আঁচ পাওয়ারও কথা নয়। তাদের শান্তি-সুখে আগুন জ্বেলে দেবার জন্যই যে বুড়ির আবির্ভাব আর ভণ্ডামীর আশ্রয় নেয়া তার তিলমাত্র ধারণাও তারা করতে পারল না। 
বুড়ি প্রাথমিক ভণ্ডামী সেরে এবার সুবাদারের কাছে হাজির হ’ল। সে আবেগে উচ্ছাসে অভিভূত হয়ে বলে উঠল—“হুজুর, এমন সুরৎ যে দুনিয়ার কোন লেড়কির হতে পারে তা আমি খুশ নাহারকে দেখার আগে ধারণাই করতে পারিনি। বেহেস্তের হুরী ছাড়া এরকম সুরৎ আর নজরে পড়ে না। আমাদের তল্লাটে তাে নয়ই তামাম দুনিয়া ঢুঁড়ে এলেও কোথাও মিলবে কিনা সন্দেহ। আর তার কণ্ঠ দিয়ে যেন সর্বদা মধু ঝরছে।
বহুৎ আচ্ছা! তা বুড়ি তােমার কাম কাজ কতদূর এগলাে?” -হুজুর সবে তাে কাজে হাত দিয়েছি। খুশ নাহার-এর মত খুবসুরৎ আর গুণবতী লেড়কিকে বশ করতে সময় তাে একটু আধটু লাগবেই। আর কাজটি যদি এতই সােজা হত তবে আপনিই কি আর আমাকে মােটা অর্থ ইনাম দিতে রাজী হতেন, বলুন?
—“যে-কোন ভাবে তাকে আমার হাতে এনে দিতে হবে, খেয়াল থাকে যেন।
–হুজুর, আমার হাতযশের বলে কাজ আমি ঠিকই হাসিল করব। কিন্তু ঝট করে এরকম কঠিন এক কাজ হাসিল করা সম্ভব

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments