গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
বাঁদীটির বাৎ শুনে আমার আম্মার মুখও কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। টু-শব্দটি ও করলেন না। এক সময় রেগেমেগে আমার গালে এক থাপ্পড় কষিয়ে দিয়ে বললেন-“হতচ্ছাড়ি ফিন যদি দাসীবাদীদের সঙ্গে এসব ব্যাপার নিয়ে বাৎচিৎ করতে যাও তবে আর রক্ষে রাখৰ না, বলে দিচ্ছি।
ব্যস, তার পর থেকে এ ব্যাপারে আমিও মুখে কলুপ এঁটে দিলাম, কারাে সাথে আর এসব ব্যাপারে নিয়ে বাৎচিৎ হয় নি।
বদর হেসে বলল—এখন তােমার বয়স হয়েছে। সবই বুঝতে পারবে। আমি এক এক করে সব তােমাকে শিখিয়ে দেব। কোন অঙ্গ কোন কাজে ব্যবহার করতে হয় সবই খােলসা করে বলব।
এবার বদর তাকে অবশিষ্ট রাত্রিটুকু প্রতিটি অঙ্গের ব্যবহার ও তাদের গুরুত্বের কথা খােলসা করে বুঝিয়ে দিতে লাগল।
এমন সময় প্রাসাদের বাইরের আখরােট গাছের ডালে পাখীর ডানা ঝটপটানি শুরু হয়ে গেল। হায়াৎ বুঝতে পারল, ভােরের পূর্বাভাষ। হায়াৎ এবার উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলল-“বহিনজী, তুমি দরবারে চলে গেলেই আমার আব্বা এ-কামরায় আসবেন। আম্মাও সঙ্গে থাকবেন। আমার তােয়ালেতে খুন দেখতে চাইবেন। তখন কি জবাব দেব?’
বদর বলল-“ঠিক আছে। তােমার মুশকিল আসান করে দিচ্ছি। এবার সে পাশের পাখির খাঁচা থেকে একটি পাখি ও তােয়ালে নিয়ে হামামে গেল। পাখিটিকে হত্যা করে তার দেহের কিছুটা খুন তােয়ালের গায়ে লাগাল। আর কিছুটা খুন হায়াৎ-এর দু’পায়ের ফাঁকে লাগিয়ে দিল। এবার তােয়ালেটি তার হাতে দিয়ে বলল—দেখতে চাইলে এটি তাঁদের হাতে তুলে দিও। ব্যস, কাজ হাসিল।
হায়াৎ বলল—‘ঝুট মুট পাখিটিকে হত্যা করলে। তুমি মন করলেই আমার শরীরের খুনই বের করে তােয়ালেতে লাগিয়ে দিতে পারতে।
‘তা অবশ্য পারতাম ঠিকই। কিন্তু এটি কামার অলজামানের সম্পত্তি। আমি সেখানে হস্তক্ষেপ করতে উৎসাহী নই।
ভাের হ’ল। বদর সাজগােছ করে দরবারে চলে গেল। কিছুক্ষণ বাদেই বৃদ্ধ সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী অন্দরমহলে হায়াৎ-এর কামরায় এলেন।
হায়াৎ খুনমাখা তােয়ালেটি আম্মার দিকে এগিয়ে দিল। তিনি এবার তার উরুতে শুকানাে খুনের দাগ দেখে উৎফুল্ল হলেন।
সম্রাট এবার খুশীতে ডগমগ হয়ে সম্রাজ্ঞীকে নিয়ে হায়াৎ-এর কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। এদিকে বদর-এর শাসনকার্যে উজির-নাজির ও অন্যান্য পারিষদরা তাে খুশী হয়েছেনই এমন কি প্রজাদের মুখেও হাসির ঝিলিক দেখা দিল।
বদর-এর দিলে অন্য কোন দুঃখ নেই। একটি মাত্র দুঃখই তার ভেতরটি কুরে কুরে খাচ্ছে—“কামার-অল জামান কবে ফিরে আসবে, তাকে বুকে টেনে নেবে। জাহাজ ছাড়া খালিদানে যাওয়া সম্ভব নয়। আর ইবনী দ্বীপ না ছুঁয়ে কোন জাহাজই যায় না, বন্দর কর্তৃপক্ষকে বদর কড়া হুকুম দিয়ে রেখেছে, কোন জাহাজ খালিদানে গেলে অবশ্যই যেন ভাল করে তল্লাসী চালায়। কামার অল-জামান বুড়াে মালীর কুঠরীতে বসে নসীবের সঙ্গে মিতালী করে দিন গুজরান করছে। কবে খালিদানের জাহাজ আসবে, তার নসীব ফেরাবে। তারপর সে তার মেহবুবা বদরকে বুকে ফিরে পাবে।
এদিকে খালিদানের সুলতান শাহরিমান মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে চলেছেন। তিনি লেড়কাকে ফিরে পাবার ভরসা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি নিঃসন্দেহ তার লেড়কা কামার অল-জামান আর জিন্দা নেই। আরব দুনিয়ার প্রতিটি সুলতানিয়তে আদমি ভেজে খবর লাগিয়েছেন,পাত্তা মেলে নি। শেষ পর্যন্ত সুলতান শাহরিমান-এর নির্দেশে তার তামাম সুলতানিয়তে শােক দিবস পালন করা হয়।
সুউচ্চ এক মিনার বানিয়ে লেড়কার স্মৃতিরক্ষার ব্যবস্থা করা হয় ।
এদিকে মালী রােজ সকালে একবার করে বন্দরে যায়, খোঁজ নেয় খালিদানে কোন জাহাজ যাচ্ছে কিনা, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে হতাশ হয়ে ফিরে আসে। এক বিকালে কামার অল-জামান জানালার ধারে বসে নিজের নসীবের কথা ভাবছে। এমন সময় বাগিচার গাছে কয়েকটি পাখির লড়াই বাঁধল। একটি পাখি লড়াইয়ে হেরে গিয়ে জান দিল।
কিছু সময় বাদে দুটো পাখি এল। তারা মৃত পাখিটির জন্য কিছু সময় কিচির-মিচির করে দাপাদাপি করল। শােক প্রকাশের পর ঠোট দিয়ে মাটি খুঁড়ে মৃত পাখিটিকে তারা গাের দিল।
কিছু সময় আবার চুপচাপ। তারপরই কয়েকটি পাখি খুনী পাখিটিকে তাড়া করে সেখানে নিয়ে এল। তার পেট চিরে দিল। তারপর তারা আবার কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। কামার অল জামান এবার বাইরে বেরিয়ে এল। দেখল মৃত পাখিটির পেট চিরে নাড়িভুড়ি বের করে দিয়েছে। তার পরিস্থিতি দেখতে গিয়ে হঠাৎ তার নজরে পড়ল তার নাড়িভূঁড়ির দিকে। সে অবাক হ’ল।
এমন সময় ভাের হয়ে আসছে বুঝতে পেরে বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।
দু’শ ষােলতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, কামার অল-জামান মৃত পাখিটির নাড়িভুড়ির মধ্যে চকচকে একটি বস্তু দেখতে পেল। চিনতে অসুবিধা হ’ল না যে, এই পাথরটিই তার বিবি বদর-এর কোমরে ছিল। গ্রহরত্ন। ব্যস্ত হতে পাথরটি তুলে নিল। আর দেরী নয়, সােজা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।
কামার অল-জামান ফিরে পাওয়া অমূল্য নিধি পাথরটিকে বেশ শক্ত একটি সুতাে দিয়ে নিজের গলায় পরে নিল।
কামার অল-জামান এবার আপন মনে বলে উঠল—“এবার আমার মন থেকে সব দ্বিধা-সঙ্কোচ দূর হয়ে গেছে। আমি এবার নিঃসঙ্কোচে বদর-এর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারব। সবই খােদাতাল্লার মর্জি। তিনি গ্রহরত্নটিকে ছিনিয়ে নিয়ে আমার নসীবে দুঃখ-দুর্দশা দিয়েছেন। আবার তিনিই ফিরিয়ে দিয়ে দুর্দশা লাঘবের ব্যবস্থা করে দিলেন। আমার চোখের মণি, আমার খােয়াবের হুরী, আমার কলিজা বদর-এর সামনে যেতে এখন আর আমার কোন দ্বিধাই রইল না।
কামার অল-জামান ভাবল, পাথরটি গলায় ঝুলিয়ে রাখলে বিপদের সম্ভাবনা যথেষ্টই থেকে যায়। লােকের নজরে পড়তে পারে। কিন্তু উপায়? অনেক ভেবেচিন্তে চমৎকার একটি ফিকির মাথা থেকে বের করল। একটি রুমালের মধ্যে পাথরটিকে রেখে শক্ত করে গিট দিল। এবার সেটিকে হাতে তাগার মত করে বেঁধে নিল। ব্যস, নিশ্চিন্ত।
ভােরে নাস্তা সারতে সারতে বুড়াে মালী বলেছিল ঘরে খানা পাকাবার মত কাঠ নেই। বাগানে একটি শুকনাে গাছ আছে বটে। কিন্তু সেটিকে চেলা করার সামর্থ্য তার নেই। বুড়াে হাড়ের কর্ম নয়। কিন্তু নগরের লােকজনও জানের মায়ায় পালিয়েছে। কামার তাদের পাবে কোথায় ?
বুড়াের কথায় জামান বলেছিল—“আমি বাদশাহের লেড়কা বটে। কাঠ কাটার অভ্যাস নেই সত্য, গায়ে তাে তাগদ কম নয় আমি ঠিক চেরাই করে ফেলব।
জামান এবার একটি কুড়ল নিয়ে বাগানে ঢুকল। বাগানে গিয়ে মরা গাছটির গায়ে কুড়ুল দিয়ে ঘা মারতে অদ্ভুত এক কাণ্ড ঘটে গেল। গাছটির গা থেকে ঝনঝন আওয়াজ বেরিয়ে এল।
জামান-এর কৌতূহল হল। গাছটির গােড়া থেকে সামান্য মাটি সরাতে না সরাতেই ব্রোঞ্জের একটি মােটা পাত্র তার চোখে পড়ল। অবিশ্বাস্য রহস্যজনক পাত্রটি সরাতেই তার চোখের সামনে একটি সিঁড়ি ভেসে উঠল। সােজা নিচের দিকে নেমে গেছে।
জামান-এর কৌতুহল উত্তরােত্তর বেড়েই চলল। সে সিঁড়িটি বেয়ে নিচে নামতে লাগল। রইল পড়ে তার গাছ কাটা। এবার জামান-এর চোখের সামনে একটি গুহা ভেসে উঠল। গুহার মুখে একটি প্রস্তর ফলকে লেখা আছে থামু ও আদ-দের নাম আর সাল তারিখ। আর সামান্য এগিয়ে দেখল ইয়া পেল্লাই পেল্লাই গােটা কুড়ি তামার জালা।
জামান জালাগুলির কাছে এগিয়ে গেল। একটির ঢাকনা খুলে দেখল গলা পর্যন্ত সােনার মােহরে ভর্তি। আর একটির ভেতরে সােনার তাল বোেঝাই। এবার সে একের পর এক জালার ঢাকনা গুলল। দেখল তাদের দশটিতে সােনার তাল আর বাকি দশটিতে সােনার মােহর ঠাসা।
কামার অল-জামান ভাবল ইয়া আল্লা! এত ধন দৌলত মাটির তলায় পুঁতে রেখে এখানকার সুলতানরা বেহেস্তে পাড়ি জমিয়েছে। এখন বিদেশী কাফেররা পুরাে শহরের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে। কোনক্রমে টের পেলে সব ধন দৌলত আত্মসাৎ করবে।
জামান সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল। ব্রোঞ্জের পাত্রটিকে আগের মতই গর্তের মুখে চাপা দিল। তারপর সতর্কতার সঙ্গে মাটি ও লতাপাতা চাপা দিয়ে দিল।
সন্ধ্যার কিছু পরে বুড়াে মালী জাহাজঘাটা থেকে ফিরে এল তার চোখ-মুখে খুশীর প্রলেপ। বলল--হুজুর, আপনার নসীব ফিরতে চলেছে। আজ এইমাত্র এক জাহাজের ক্যাপ্টেনের সাথে বাৎচিৎ হ’ল। আপনাকে এবনি দ্বীপে নামিয়ে দিতে সম্মত হয়েছেন। এবনি যেতে পারলে আর ভাবনার কিছু থাকবে না। সেখান থেকে হরদমই খালিদানের জাহাজ ছাড়ে। তখন আর আপনার মুলুক খালিদানে যাওয়ার কোন প্রতিবন্ধকতাই থাকবে না ।
জামান নিজের দিলের উচ্ছাস-আবেগ চেপে রাখতে না পেরে বলল—“চাচাজী, আপনার ওমর হয়েছে। দুনিয়ার ভােগ লালসা আপনার কাছে মূল্যহীন, খুবই সত্য। তবু বলছি আমাদের নসীব খুব সহায়, আমার সঙ্গে চলুন। একটি তাজ্জব ব্যাপার দেখাচ্ছি। কথাটি বুড়াে মালির উদ্দেশে ছুঁড়ে দিয়েই জামান তাকে টানাটানি করে ধরতে গেল ছেচড়াতে হেঁচড়াতে নিয়ে চলল পাতালপুরীর সে রত্নভাণ্ডারটির কাছে। এমন সময় রাত্রি শেষ হয়ে ভােরের পূর্বাভাষ দেখা দেয়। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করেন।
দুশ’ উনিশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ আবার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, পাশাপাশি কুড়িটি জালা ভর্তি সােনার তাল আর সােনার মােহর দেখে বুড়াে মালীর তো দিমাক খারাপ হয়ে যাবার জোগাড় হ’ল। সে রীতিমত আঁৎকে উঠে বলল-“শােভন আল্লাহ! একী বাস্তব, নাকি আমি খােয়াব দেখছি বেটা! এত ধন দৌলত আদমিদের কোন কাজে লাগে?
‘জিন্দেগীকে ভােগ কর । এসব ধন দৌলত আপনার। যে কয়দিন দুনিয়ায় থাকবেন দু'হাতে খরচ করবেন।
–না বেটা। এসবে আমার জরুরৎ নেই। এসব আমার দিমাক খারাপ করে দেবে। আমি পাগল হয়ে যাব। এসব আপদ আমার সুখ-শান্তি ছিনিয়ে নেবে। কয়দিনই বা দুনিয়ায় থাকব। এই তাে বেশ আছি।এসবে আমার কোন জরুরৎ নেই। বেটা, তােমার ওমর কম। বহুদিন দুনিয়ায় থাকবে। তুমি এসব নিয়ে নাও। তুমি যাবার আগে আমাকে সামান্য কিছু দিনার দিয়ে যেও। একটি কফিন কিনে রেখে দেব। গাের দেয়ার সময় যেন সেটি দিয়ে আমার লাশ ঢেকে দেয়। ব্যস, আর কিছু চাই না। -কিন্তু আমিই বা একা নিতে যাব কেন। আধাআধি ভাগ করা হােক। আধা আপনার আর আধা আমার। আপনি না নিলে আমিও এগুলাে ছোঁব না।
বুড়াে মালী পড়ল মহাফাঁপরে। অসহায় দৃষ্টিতে জামান-এর এ দিকে তাকিয়ে এবার তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল—“তবে বেটা, তুমি যা ভাল বোঝ কর।
জামান এবার কাঠ দিয়ে গােটা কুড়ি বাক্স বানিয়ে ফেলল। এবার হাতের গ্রহরত্নটির দিকে চোখ পড়তে ভাবল—এমন একটি অমল্য সম্পদ এভাবে সবার চোখের সামনে রেখে দেয়া মােটেই - উচিত নয়। হাত থেকে পাথরটি খুলে একটি কাঠের বাক্সের ভেতরে সেটি রেখে দিল। এবার তার ওপর সােনার মােহর ঢেলে দিল। এবার বাক্সগুলির ওপরে কিছু কিছু কাচা জলপাই দিয়ে মুখ বন্ধ করে দিল। গ্রহরত্নের বাক্সটির ওপরে এক টুকরাে চামড়া পেরেক দিয়ে আটকে দিয়ে চিহ্ন করে রাখল।
খুব ভােরে বুড়াে মালী জাহাজঘাটা থেকে কয়েকজন কুলী ডেকে আনবে কথা হ'ল। কিন্তু মাঝরাত্রের আগেই তার দারুণ জ্বর এল। জামানকে কিছু বলে তাকে ব্যতিব্যস্ত করতে চাইল না। জ্বর গায়ে নিয়েই বুড়াে মালী ভােরে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল কুলীর খোঁজে। কুড়িজন কুলী নিয়ে এল।
কুলীরাও প্রত্যেকে এক একটি করে কাঠের বাক্স মাথায় নিয়ে জাহাজ ঘাটের উদ্দেশে রওনা হ’ল।
জামান কুলীদের বলে দিয়েছে বাক্সগুলাে যেন একেবারে জাহাজে তুলে দেয়। এমন সময় প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় পাখিদের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। বেগম শাহরাজাদ বুঝলেন ভাের হয়ে এলাে বলে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।
দুশ’ বাইশতম রজনী
রাত্রি গভীর হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কোনরকম ভূমিকার অবতারণা না করেই কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাহাপনা, কুলীরা কুড়িটি কাঠের বাক্স নিয়ে জাহাজঘাটে হাজির হ’ল। এক এক করে সব ক'টি বাক্স জাহাজের ডেকে নিয়ে পাশাপাশি সাজিয়ে রাখল।
জামান কুলীদের বলে দিয়েছিল খুব ভােরে সে জাহাজে পৌছে যাবে। তার জন্য জাহাজ ছাড়ার বিলম্ব হবে না। জামান রাত্রে সামান্য খানাপিনা সেরে নিল। বুড়াে মালী কিছুই মুখে দিল না। তার গায়ে অস্বাভাবিক জ্বর। জামান গায়ে হাত দিয়ে দেখে হাত যেন পুড়ে যাচ্ছে। বুড়াে মালী জ্বরে একেবারে বেহুঁশ ।
জামান সারারাত্রি বুড়াে মালীর শিয়রে বসে কাটাল। নিজেই টোটকা ওষুধ দিল। কিছু জঙ্গলী পাতা বেটে রস করে তাকে খাইয়ে দিল। কোন কাজই হ’ল না। শেষ রাত্রের দিকে বুড়াে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।
জামান একাই কোদাল দিয়ে বাগিচার একপ্রান্তে একটি গর্ত তৈরী করল। বুড়ােকে গাের দিয়ে দিল।
জামান-এর কাজ মিটতে মিটতে অনেক বেলা হয়ে গেল। খুব ভােরে জাহাজ ছাড়ার কথা ছিল। তার জাহাজের কথা খেয়ালই ছিল না। যখন হুঁশ হ’ল তখন সূর্য গুটিশুটি আকাশের অনেক ওপরে উঠে গেছে। সে জাহাজ ঘাটের দিকে ঊর্বশ্বাসে ছুটল। হায়নসীব!জামান জাহাজঘাটে গিয়ে দেখে জাহাজ ভাগল। নির্দিষ্ট সময়েই জাহাজ ছেড়ে দিয়েছিল। ইতিমধ্যে জাহাজ প্রায় মাঝ দরিয়ায় পৌছে গেছে। তার দু'চোখের কোল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। চোখের পানি মুছতে মুছতে জামান আবার বাগিচায় ফিরে এল। এক সময় শিশুর মত গলা ছেড়ে কাদতে কাদতে বলতে লাগল—“হায় আমার নসীব। আমি আর আমার মেহবুবা বদরকে ফিরে পাব না। আমি গ্রহরত্নটি হাতে পেয়েও নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য আবারও খােয়ালাম! একমাত্র খােদা মেহেরবানের দোয়া হলে তবেই আমি বদরকে ফিরে পাব। পাওয়া ধন হারালাম আমি। জামান আবার কুডিটি কাঠের বাক্স বানিয়ে ফেলল। বুড়াে মালীর অংশের সােনার মােহর ও সােনার তালগুলাে বাক্সে ভরল। এবার নতুন করে বাগিচার কাজে নিজেকে নিয়ােগ করল।
এদিকে জাহাজ এবনি দ্বীপে নােঙর করল। বাক্সগুলির প্রত্যেকটির গায়ে কামার অল-জামান-এর নাম বড় বড় হরফে লেখা।
বদর বাক্সগুলাে দেখে তাে রীতিমত আনন্দে-আহ্লাদে ডগমগ। ভাবল, এতদিন পর জামান-এর দেখা পাওয়া গেল। জাইজের ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞাসা করে সে জানতে পারল, এ-জাহাজেই জামান-এর আসার কথা ছিল। কিন্তু জাহাজঘাটে সে পৌঁছোবার আগেই জাহাজ ছেড়ে দিয়েছে, ফলে এতগুলাে বাক্স মালিকহীন অবস্থায় জাহাজে পড়ে রয়েছে। বদর মর্মাহত হ’ল। এতদিন পর স্বামীকে ফিরে পেয়েও হাতছাড়া হয়ে গেল।
বদর জাহাজের ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে কিছু জলপাই কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করল।
বদর এক বাক্স জলপাই কিনতে চাইল। ক্যাপ্টেন বলল-জাহাপনা, আমি তাে জলপাই বিক্রি করতে পারব না। তবে জাহাপনা যদি নিতান্তই একটি বাক্স নিয়ে যেতে চান তবে নিজের দায়িত্বে নিয়ে যেতে হবে।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
রাত্রির প্রথম প্রহর শেষ হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, বদর ক্যাপ্টেনকে বলল—একটি নয়। আমি সবগুলি জলপাইয়ের বাক্সই কিনে নিতে চাই।' ক্যাপ্টেন বলল—“জাহাজের সবক’টি বাক্স জলপাই যদি কেনেন তবে প্রতিটি বাক্সের জন্য এক হাজার করে দিরহাম মূল্য দিতে হবে। কুড়িটি জলপাইয়ের বাক্সের জন্য মােট কুড়ি হাজার দিরহাম দাম দিতে হবে। বদর এবার বাক্সগুলি কুলির মাথায় চাপিয়ে প্রাসাদে নিয়ে এল। বাঁদীদের দিয়ে দুটো বড় বড় থালা আনাল। একটি বাক্স খুলে জলপাই বের করে থালায় রাখতে লাগল। আশ্চর্য ব্যাপার! জলপাইগুলাের গায়ে সােনার গুঁড়াে মাখানাে।
আর একটি বাক্স খুলে একই অবস্থা দেখতে পেল। বাঁদীদের বলে-‘তাজ্জব ব্যাপার দেখছি! এক কাজ কর। সবগুলি বাক্স খুলে জলপাইগুলি মেঝেতে ঢেলে ফেল তাে দেখি, ব্যাপার কি!’
এক এক করে বাক্সের মুখ খুলে জলপাই বের করতেই সবাই তাজ্জব বনে গেল। সামান্য ক’টি জলপাই ওপরে সাজানাে। ব্যস, তারপরই সােনার মােহর আর সােনার তালে বাক্সগুলি ভর্তি। সবশেষে একটি বাক্স উপুড় করতেই তার হারানাে গ্রহরত্নটি বেরিয়ে পড়ল। পাথরটি হাতে নিয়ে বদর বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল। ভাবল, কী করে এটি সম্ভব হ’ল! এখানে এ-পাথরটি এল কি করে! তার চিনতে ভুল হবার কথা নয়। বহুদিনের পরিচিত পাথর যে, চিনতে ভুল হবার তাে কথা নয়। হায়াৎ তখন বদর-এর পাশে দাঁড়িয়ে। হাতের পাথরটি তাকে দেখিয়ে বলল—‘জান হায়াৎ, এ-পাথরটি মন্ত্রপূত। দৈব পাথর। যেদিন হারিয়েছি সেদিন আমার স্বামীকেও খােয়াতে হয়েছে। পাথরটি যখন ফিন হাতে পেয়েছি তখন তিনিও শীঘ্রই আমার কাছে ফিরে আসবেন।
বদর জাহাজের ক্যাপ্টেনকে তলব দিল।
সম্রাটের তলব পেয়ে মাঝ বয়সী ক্যাপ্টেন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। বদর বলল-এ-বাক্সগুলির মালিক কি আপনার পরিচিত ? তার পেশা কি? সেখানকার স্থায়ী অধিবাসী কি?
—“জাহাপনা, জাহাজে তাঁরও আসার কথা ছিল। কিন্তু সময়মত তিনি পৌঁছাতে না পারায় প্রমাদ ঘটল। বাধ্য হয়ে তাকে ফেলেই জাহাজ ছাড়তে হল।
‘আপনি এক কাজ করুন, জাহাজ ফিরিয়ে নিয়ে যান। এর জন্য আপনার যে ক্ষতি হবে আমি তা পুষিয়ে দেব। তবে তাকে কিন্তু নিয়ে আসা চাই। তার এতগুলাে জলপাই আমি ভােগ করব
—এ কাজটি যেন ঠিক নয় বলেই আমার দিল্ বলছে। আর শুনুন, যদি কাজ হাসিল করতে পারেন তবে বহুৎ ইনাম পাবেন।
ক্যাপ্টেন ঘাড়কাৎ করে সম্মতি জানাতে গিয়ে বলল—“আমার কোশিসের কোন ঘাটতি থাকবে না হুজুর। আসলে ব্যাপারটি তাে ওনার ওপর নির্ভর করছে।
—“আমি কোন ধান্দার বাৎ শুনতে রাজী নই। যেমন করে হােক, তাকে আমার সামনে হাজির করতেই হবে। ফিরে এসে ধানাইপানাই শুরু করবেন, বহুৎ কোশিস করেছিলাম, উনি আসেন নি, শুনব না। তাই যদি হয় তবে কিন্তু আমার বন্দরে জাহাজ ভেড়ানাে বন্ধ হয়ে যাবে। আর যদি আমার বাৎ অবজ্ঞা করে জাহাজ ভেড়ান তবে কিন্তু গর্দান যাবে, হুঁশ থাকে যেন। সে সঙ্গে আপনার জাহাজের খালাসীদেরও কোতল করব।
এমন সময় প্রভাত হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
দুশ’ আটাশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ আবার কিসসা শুরু করলেন। তিনি বললেন—জাহাপনা, জাহাজের ক্যাপ্টেন বদর এর হুকুম তামিল করতে জাহাজ নিয়ে ছুটল বিধর্মী অধিকৃত মুলুকটির উদ্দেশে।
কয়েকদিন এক নাগাড়ে জাহাজ চালিয়ে ক্যাপ্টেন এক সকালে বন্দরে জাহাজ ভেড়াল।
এদিকে কামার অল-জামান একমাত্র হিতাকাঙ্ক্ষী বুড়াে মালির মৃত্যুতে খুবই ভেঙে পড়েছে। সে বিমর্ষ মনে কোনরকমে দিন গুজরান করছে। আর থেকে থেকে মােহরের বাক্সগুলির দিকে। নজর রেখে চলেছে।
ক্যাপ্টেন কয়েকজন খালাসিকে সঙ্গে নিয়ে খোঁজ করে করে কামার অল-জামান’কে খুঁজে বের করল। সে বলল আমার জাহাজে আপনার যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আপনার হদিস না পেয়ে জাহাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। আপনার জলপাইয়ের বাক্সগুলি খালিদানের সম্রাটের প্রাসাদে রয়েছে। সম্রাটের হুকুমেই আপনার কাছে ছুটে আসতে বাধ্য হয়েছি। আমার প্রতি কড়া হুকুম। আপনাকে খালিদানের সম্রাটের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
--‘বহুৎ আচ্ছা। চলুন, আমি অবশ্যই যাব। তবে আমার ঘরে আরও কুড়ি বাক্স জলপাই রয়েছে। আপনি মেহেরবানি করে আপনার খালাসিদের দিয়ে জাহাজে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করলে বহুৎ খুশী হ’ব।
ক্যাপ্টেনের জাহাজের খালাসিরা মােহরভর্তি বাক্সগুলিকে জাহাজে নিয়ে গেল। কামার অল-জামানকে নিয়ে জাহাজ ছাড়ল।
জাহাজ খালিদানের অন্তর্গত এবনি বন্দরে নােঙর করল।
ক্যাপ্টেনের মেজাজ রীতিমত শরিফ। খালিদানের সম্রাটের হুকুম তামিল করতে পেরেছে। আর কিছু না হােক গর্দানটি বাঁচল।
ক্যাপ্টেন এবার কামার অল-জামান’কে নিয়ে সম্রাটের প্রাসাদে হাজির হ’ল।।
কামার অল-জামানকে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে দেখামাত্র বদর তাকে চিনতে পারল—তার হৃদয় দেবতা।
জামান আচমকা বদর’কে দেখে চিনতে পারল না। চেনার কথাও তাে নয়। সে যে সম্রাটের পােশাকে সজ্জিতা।
বদরের হৃদয় দেবতা, যার জন্য দিনের পর দিন রাতের পর রাত চোখের পানি ঝরিয়েছে তাকে দেখে কোনরকম উচ্ছ্বাসই প্রকাশ করল না। নিজেকে অনেক কষ্টে সংযত রাখল। ক্যাপ্টেন বা অন্যান্যদের উপস্থিতিতে নিজেকে সংযত না রেখে উপায়ই বা কি? বদর-এর হুকুমে তার পরিচারকরা জাহাজ থেকে জলপাই বােঝাই কুড়িটি বাক্স প্রাসাদে নিয়ে এল।
ক্যাপ্টেন তার প্রাপ্য এক হাজার সােনার দিনার ইনাম-স্বরূপ নিয়ে কুর্ণিশ সেরে বিদায় নিল।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিস্সা বন্ধ করলেন ।
দু’শ’ ত্রিশতম রজনী
রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর শুরু হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশটুকু শুরু করতে গিয়ে বললেন--“জাহাপনা, কেবলমাত্র বদরই নয়, কামার অল-জামানকে কাছে পেয়ে কেবল বদরই খুশী হ’ল তা নয়, হায়াৎ-ও কম খুশী হ’ল না। সে-ও খুশীতে ডগমগ। সে বদরকে চুম্বনে চুম্বনে অস্থির করে তুলল।
ক্যাপ্টেন বিদায় নিলে কামার অল-জামান বদর-এর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইল। বদর দু’জন পরিচারককে তলব করল। তারা এলে কামার অল-জামান’কে দেখিয়ে বদর বলল—একে হামামে নিয়ে গিয়ে আচ্ছা করে গােশল করাবে। তারপর দামী পােশাক পরিয়ে কাল সকালে আমার কামরায় নিয়ে আসবে। বদর-এর কামরায় এবার বৃদ্ধ উজিরের তলব পড়ল। বৃদ্ধ উজির হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে সম্রাট বদরকে কুর্ণিশ সেরে হুকুমের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল।
বদর এবার জামানকে দেখিয়ে বলল—এক কাজ করবে, এর জন্য খুব সুন্দর একটি প্রাসাদ বানাবার ব্যবস্থা কর। আর একশ’টি নফর নােকর নিযুক্ত কর। আর উজিরের সমান বেতনের ব্যবস্থা কর। আর উট, খচ্চর ও ঘােড়া যা কিছু দরকার বন্দোবস্ত করে দেবে।
পরদিন বদর আবার আগের মতই কামার অল-জামান-এর ছদ্মবেশ ধারণ করে দরবারে উপস্থিত হ’ল। আর পাশে রক্ষিত একটি বহুমূল্য আসনে জামান’কে বসতে দিল।
জামান যার পর নাই বিস্মিত হয়। ভাবে, ব্যাপার কি আমাকে সম্রাট এত খাতির করছে কেন? কোন বড়রকম মতলব না থাকলে তো এমনটি হবার কথা নয়। কিন্তু মতলবটি কি? কোন গােপন গৃঢ় রহস্য না থাকলে অবশ্যই তাকে এত খাতির করার কথা নয়। আবার ক্যাপ্টেনকেও কড়া নির্দেশ দিয়েছিল যে-কোনভাবে আমাকে যেন এর সামনে হাজির করা হয়। কাজ হাসিল করে ক্যাপ্টেন এক হাজার সােনার দিনার নিয়ে গেছে। কম কথা! কিন্তু কেন আমার জন্য কম বয়সী সম্রাটের এত আগ্রহ?
জামান এবার ভাবে তবে কি আমার খুবসুরৎ সুঠাম দেহ দেখে যুবক সম্রাট মজে গেছে? আমার সঙ্গে দোস্তী করতে উৎসাহী? কিন্তু এসব ধান্দার মধ্যে আমি থাকতে রাজী নই। এর খেয়ালের খােরাক জোগাবার মত সময় বা দিল কোনটিই আমার নেই। এ মুহুর্তে আমার সবচেয়ে বড় চিন্তা, বিবি বদর’কে তল্লাস করে বের করা। ধন দৌলত আর ইনামের প্রত্যাশী আমি অন্ততঃ নই। একটু বেগড়বাই কিছু মালুম হলেই বসনে পদাঘাত করে এখান থেকে।
(চলবে )

0 Comments