আলিফ লায়লা পার্ট ৬০ ( Part 60 ) Alif laila bangla part 60

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
পরে কেউ শাহজাদা জামানকে খুঁজতে এসে এগুলাে দেখেই ধরে নেবে হয় তাকে কেউ খুন করেছে, নতুবা কোন হিংস্র জন্তু জানােয়ারের কবলে পড়ে জান খুইয়েছে।
এবার শাহজাদা জামান-এর কাছে ব্যাপারটি পরিষ্কার হ’ল। সারজাবন-এর বুদ্ধির তারিফ করল বহুভাবে।
ব্যস। আর দেরী নয়, এবার তারা ঘােড়ার পিঠে উঠে বসল। তীরবেগে ঘােড়া ছুটিয়ে দিল।

পথ চলতে চলতে সারজাবন বলল -“দোস্ত, সকালে তােমার লােকজন ঘুম থেকে উঠে আমাদের খোঁজাখুঁজি করবে। তারপর পথের ধারে তােমার খুনমাখা পােশাক দেখতে পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে সুলতানের কাছে ছুটে গিয়ে দুঃসংবাদটি দেবে। তারপরই চারদিকে সৈন্য সামন্ত তােমার তল্লাসে বেরিয়ে পড়বে। তার আগেই আমাদের বহুদূরে, তাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে হবে। প্রায় এক মাস ঘােড়া ছুটিয়ে তারা সম্রাট ঘায়ুর-এর রাজধানীতে পা দিল। সারজাবন শাহজাদা কামার অল-জামান-কে নিয়ে সম্রাট ঘায়ুর-এর দরবারে উপস্থিত হ’ল। সারজাবন তার পরিচয় দিল। এক বিশ্ববিখ্যাত জ্যোতিষী বলে। সে জোর দিয়েই বলল —“আগন্তুক এক জ্যোতিষী, তামাম দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ জ্যোতিষী। বহুৎ দূরবর্তী মুলুক থেকে একে অনুরােধ করে আনানাে হয়েছে। এর দৃঢ় বিশ্বাস, রাজকুমারী বদর-এর বিমারি ইলাজ করে সারিয়ে তুলতে পারবেই।'

সুদর্শন যুবক কামার অল-জামানকে সবাই বারণ করল এরকম এক দুঃসাহসিক কাজে যেন হাত না দেয়। বহু মুলুক থেকে হেকিমবৈদ্য জ্যোতিষী এসেছিল, ইলাজ করল। কিন্তু তার রােগ নিরাময় করতে না পেরে সম্রাটের ঘাতকের হাতে জান দিয়েছে।

কামার অল-জামান কিন্তু কোন বাধা নিষেধকেই পাত্তা দিল না। সে সম্রাটের দরবারে হাজির হয়ে যথােচিত ভঙ্গিতে কুর্নিশ জানিয়ে জ্যোতিষী বলে নিজের পরিচয় দিল। আর দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, রাজকুমারীর বিমারি সে সারাতে পারবেই।

সম্রাট ঘায়ুর আগন্তুক ভিনদেশীয় জ্যোতিষী নওজোয়ান কামার অল জামান-এর দিকে নিস্পলক চোখে তাকিয়ে রইলেন। এমন খুবসুরৎ যে কোন পুরুষ মানুষের হতে পারে তা যেন তার কল্পনারও অতীত। বিস্ময়-বিমূঢ় অবস্থায় পাথরের মূর্তির মত তাকিয়েই রইলেন।

এক সময় স্বাভাবিকতা ফিরে পেয়ে বললেন—“বেটা তােমার ওমর দেখছি খুবই কম। নওজোয়ান। প্রথম দর্শনেই তােমার ওপর আমার কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে। আমার বেটির যােগ্য পাত্রই বটে। কিন্তু আমার শর্তের কথা শুনেছ কি? যদি আমার বেটির তাজ্জব বিমারি সারাতে না পার তবে তােমার নসীব তােমাকে কোথায় টেনে নিয়ে যাবে, ভেবে দেখেছ কি ? কামার অল-জামান এবার স্মিতহাস্যে বলল—‘আপনি আমার জন্য মিছে ঘাবড়াবেন না। আমি সবকিছু শুনে, নিজের দিলের সঙ্গে বােঝাপড়া করে তবেই আপনার দরবারে হাজির হয়েছি।

সম্রাট ঘায়ুর এবার এক খােজা প্রহরীকে দিয়ে আগন্তুক জ্যোতিষী কামার অল-জামান’কে রাজকুমারী বদর-এর কামরায় পাঠিয়ে দিলেন। কামার অল-জামান রাজকুমারী বদর-এর কামরার দরওয়াজায় এসে দাঁড়াল। জামান প্রথমেই কামরার ভেতরে গেল না। সঙ্গের যােদ্ধাকে দিয়ে একটি কুরশি আর কাগজ-কলম আনাল।

জামান এবার কুরশিতে বসল। কাগজ-কলম নিয়ে চিঠি লিখতে শুরু করল।

এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

                দু'শ চারতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ আবার তার কিসসা শুরু করলেন—“জাহপনা শাহজাদা কামার অল-জামান চিঠি লিখতে লাগল। তার চিঠির বক্তব্য মােটামুটি এরকম

      —মান্যবর সম্রাট ঘায়ুর-এর লেড়কি বদর-এর উদ্দেশ্যে খালিদানের সুলতান শাহরিমান-এর লেড়কা কামার অল-জামান এর চিঠি। মেহবুবা, তুমি তাে বােঝ না, জানও না এক অব্যক্ত ব্যথাবেদনা কিভাবে আমার কলিজাটিকে পীড়িত করছে। আমার কলিজা জ্বলেপুড়ে খাক হচ্ছে কেবলমাত্র তােমার অদর্শনে। আর এরই জন্য আমি উন্মাদদশা প্রাপ্ত হয়েছি। কলমের মাধ্যমে আমার দিলের ব্যথা-বেদনা তােমার কাছে প্রকাশ করা সাধ্যাতীত। সে অত্যাশ্চর্য মিলনের শুভরাত্রির পর থেকে আমি হরবকত তােমার বিরহ-জ্বালায় দগ্ধ হচ্ছি। সবাই বলে আমি নাকি উন্মাদ হয়েছি। কি করে তাদের বুঝাব, আমার দিলের কথা, কলিজায় ব্যথার কথা? তুমি আমার আঙ্গুলে এ-পান্নার অঙ্গুরীয়টি পরিয়ে দিয়েছিলে। চিঠির সঙ্গে পাঠালাম। দেখ তাে, চিনতে পার কিনা! আমার দিল আজ দরিয়ার মত অস্থির হয়ে উঠেছে। কবে যে তােমার কমল বদন দু'চোখ ভরে দেখতে পাব, জানি না। মধুর চুম্বন রইল।

                                                                                                                                 ইতি- 

                                                                                                                           তোমার মেহবুব 

                                                                                                                          কামার অল-জামান 

সবশেষে আর একটি পংক্তি সংযােজন করল আর শােন, নগরে ঢােকার মুখের মুসাফিরখানায় আমি মাথা গুজেছি। 

চিঠি লেখা শেষ করে একটি খামে চিঠিও নিজের হাতের পান্নার অঙ্গুরীয়টি তাতে ভরে খােজা-প্রহরীটিকে দিয়ে কামরার ভেতরে রাজকুমারী বদর-এর কাছে পাঠিয়ে দিল। খােজাটি কামরার ভেতরে ঢুকে পালঙ্কের ওপর বিমর্ষমুখে অৰ্দ্ধশায়িতা রাজকুমারী বদর-এর হাতে খামটি দিয়ে বলল—এক জ্যোতিষী দরওয়াজার বাইরে অপেক্ষা করছেন। তিনি এ-চিঠিটি দিয়ে বললেন, আপনাকে না দেখেই নাকি আপনার বিমারি সারিয়ে তুলতে পারবেন। তিনিই এ-চিঠিটি আপনাকে দিলেন। বদর ব্যস্ত-হাতে খামের মুখটি ছিড়তেই তার ভেতর থেকে পান্নার অঙ্গুরীয়টি বেরিয়ে এল। এক পলকে অঙ্গুরীয়টি দেখেই চিনতে পারে। এটিই—হ্যা, এটিই তিনি তার জান, তার কলিজার সমান মেহবুবাকে সে-বিশেষ রাত্রে, জীবনের প্রথম সম্ভোগের মুহূর্তে পরিয়ে দিয়েছিল।

রাজকুমারী বদর আর চিঠিটি পড়ারও প্রয়ােজন বােধ করল না। এক লাফে দরওয়াজার বাইরে বেরিয়ে এসে শাহজাদা কামার অল-জামানকে জড়িয়ে ধরল। তার দু’চোখের কোল বেয়ে নেমে এল পানির ধারা। কামার অল-জামান-এর দু’চোখেও পানি ভিড় করল। কারাে মুখে কোন কথা নেই। কেবল অনুভবের মধ্য দিয়ে উভয়েই সুখে শান্তি নিঙড়ে নিতে লাগল। সে সঙ্গে কামার অল-জামান তার মেহবুবা বদর’কে চুম্বনে চুম্বনে আকুল করে দিতে লাগল। এদিকে কপােত-কপােতির প্রেম-মিলনের দৃশ্য চাক্ষুষ করে খােজা প্রহরীটি তাে শরমে এতটুক হয়ে গেল। সে উদভ্রান্তের মত ছুটতে ছুটতে দরবারে হাজির হ’ল। সম্রাটের কাছে সাধ্যমত লজ্জাশরম বজায় রেখে আগন্তুক নওজোয়ান জ্যোতিষী এবং রাজকুমারীর ব্যাপার স্যাপার বর্ণনা করল।

সম্রাট ঘায়র আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। মাথার মুকুট পড়ে রইল, জুতা পরতেও ভুলে গেলেন। পােশাক আশাকের দিকে খেয়াল নেই। ব্যস্ত-পায়ে হারেমের উদ্দেশে ছুটলেন।

দরওয়াজার সামনেই কপােত-কপােতির দেখা পেয়ে গেলেন। তার বুকে আশান্ত সাগরের ঢেউ বয়ে চলেছে। আবেগে-উচ্ছাসে অভিভূত হয়ে তিনি কামার অল-জামান’কে দু'হাতে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কামার অল-জামান-এর মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলল—‘আমার নাম কামার অল-জামান। আমার আব্বা বাদশাহ শাহরিমান। খালিদানের বাদশাহ। এবার সে প্রথম থেকে সব কাহিনী বিস্তারিত ভাবে তার কাছে ব্যক্ত করল।

শাহজাদা কামার অল-জামান মুসলমান। ইসলাম ধর্মাবিলম্বী। অতএব তার শাদী ইসলামের বিধান অনুযায়ীই হওয়া দরকার।

সম্রাট ঘায়ুর-এর নির্দেশে নগরের প্রধান কাজীকে তলব দিয়ে আনা হ’ল। মুসলমানদের শাদীর রীতি-নীতি অনুযায়ী শাদীর কবুল নামা তৈরী করা হল।

সম্রাট ঘায়ুর জাকজমকের সঙ্গে রাজকুমারী বদর ও শাহজাদা কামার অল-জামান-এর শাদী দিলেন।

কামার অল-জামান ও বদর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নতুন করে, মধুযামিনী যাপন করল। সম্ভোগসুখ উপভােগ করল। একে অন্যের কণ্ঠলগ্ন হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।

রাত্রির চতুর্থ প্রহরে, ভাের হওয়ার মুখে কামার অল-জামান তার আব্বাজান সুলতান শাহরিমানকে খােয়াবের মধ্যে দেখতে পেল। তিনি যেন তাদের পালঙ্কের পাশে, শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছেন। কেঁদে কেঁদে তার দু'চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে তিনি বলছেন-“বেটা, তােমার শােকে আমি আজ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চলেছি। তুমি মাত্র একবারের জন্য এসে আমাকে দেখা দাও। গােরে যাওয়ার আগে আমাকে একবার চোখের দেখা দিয়ে যাও। আমার মসনদ, সুবিশাল প্রসাদ, বিশালায়তন সুলতানিয়ৎ—সবকিছু আজ আমার কাছে মূল্যহীন। এসব দিয়ে হবেই বা কি? সবই আছে, আমার কলিজা তুমিই কেবল নাই। সবকিছু থাকতেও আমার বুকটি আজ মরুভূমি হয়ে গেছে। এসাে বেটা, শুধু একটিবার দেখা দিয়ে যাও।

বিকট আর্তনাদ করে কামার অল-জামান পালঙ্কে উঠে বসে পড়ে।

রাজকুমারী বদর-এর ঘুম ভেঙে যায়। সে স্বামীর আকস্মিক আচরণে বিচলিত হয়ে পড়ে। সে নানা প্রশ্নের মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগল, কোন ভয় সূচক স্বপ্ন দেখেছে, নাকি আকস্মিক কোন ব্যথা-বেদনার উদ্ভব হয়েছে?

এমন সময় রাত্রি অবসান হ’ল, বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।

                          দু’শ ছয়তম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার আবার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, বিবির পীড়াপীড়িতে কামার অল-জামান মুখ খুলল—“শােন, কালই আমরা যাত্রা করব। নিজের মুলুকে না যাওয়া পর্যন্ত আমার দিল্ শান্ত হবে না। এইমাত্র খুবই খারাপ এক খােয়াব দেখলাম। আমার আব্বাজী আমার শোকে একেবারে মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন। কালই আমরা যাত্রা করতে চাই। তুমি কি বলছ, মেহবুবা?’ 

‘তােমার আর আমার তাে আলাদা মত হতে পারে না। আমরা যে এখন থেকে একই মত আর পথের পথিক। তােমার অবর্তমানে সুলতান শোকে অভিভূত হয়ে পড়বেন এ-তাে খুবই স্বাভাবিক। আমি ঘুম থেকে উঠেই আব্বাকে তােমার খােয়াবের কথা বলব। তিনি সানন্দে আমাদের যাত্রার ব্যবস্থা করে দেবেন।

বদর ঘুম থেকে উঠেই খােজা ভৃত্যটিকে সম্রাট ঘায়ুর-এর কাছে ভেজল। তাকে দেখেই সম্রাট আতঙ্কিত হলেন। ভাবলেন আবার কোন দুঃসংবাদ নয় তাে! খােজা বলল-“রাজকুমারী আপনার সঙ্গে খুবই জরুরী আলােচনা করতে ইচ্ছুক। আপনি মেহেরবানি করে যদি--- 

সম্রাট ব্যস্ত পায়ে অন্দরমহলে বদর-এর কামরায় এলেন। বদর পিতার কাছে স্বামীর ইচ্ছার কথা জানাল। আর সে সঙ্গে খােয়াবের কথাও বলতে ভুলল না।

কন্যার কথা শুনে সম্রাট ঘায়ুর-এর চোখে জল দেখা দিল। অগত্যা স্নেহ কন্যার আসন্ন বিচ্ছেদের কথা শুনেই তার চোখ দুটো পানিতে ভারী হয়ে এল। যাকে একদিনের জন্যও চোখের আড়াল করেন নি তাকে আজ পরের ঘরে পাঠাতে হচ্ছে। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বললেন—'বেটি তােমার অদর্শনে আমার দিলের অবস্থা কি হবে আশা করি তােমাকে বলে বােঝাতে হবে না। এক সাল বাদে আবার এসে আমাকে দেখে যেয়াে।'

রাজকুমারী বদর পিতাকে জড়িয়ে ধরে দু’গালে চুম্বন করে। তার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে কান্নাভেজা চোখে বলে-'আব্বা, তােমার অদর্শনে আমিও কি কম ব্যথিত মর্মাহত হ’ব বল?'

–‘বেটি, এ-ই যে আল্লাহর বিধান। সমাজের অলঙ্ঘনীয় নিয়ম। লেড়কিদের ভবিতব্য। লেড়কি হয়ে যখন জন্মেছিস তখন আজ না হােক কাল পরের ঘরে যে যেতেই হবে। দুপুরের কিছু পরে সম্রাট ঘায়ুর সাশ্রনয়নে বেটি ও জামাতাকে বিদায় দিলেন।

নগরের পথ অতিক্রম করার সময় দু’পাশের কৌতুহলী প্রজারা দেখল রাজকুমারী আব্বার বিচ্ছেদ বেদনায় কাতর। চোখের পানি বাঁধন হারা বন্যার পানির মত অনবরত পড়েই চলেছে। নগর ছাড়িয়ে তারা এবার প্রান্তরের পথে নামল। ইতিমধ্যেই রাজকুমারী চোখের পানির ভাটা পড়ে গেছে। ঠোটের কোনে দেখা দিয়েছে হাসির ছােপ। লেড়কিদের আবাল্যের চিন্তা সেজেগুজে স্বামীর বুকে মাথা রেখে শ্বশুরবাড়ির পথে পাড়ি জমানাে। বর এর সে খােয়াব আজ বাস্তবায়িত হতে চলেছে। একী কম কথা। কম আনন্দের? 

এক নাগাড়ে ত্রিশদিন উটের পিঠে কাটিয়ে তারা একদিন এক বিস্তীর্ণ প্রান্তরের কাছে তাবু গাড়ল। সঙ্গে অনুচররা ব্যস্ত হাতে সব ব্যবস্থা করল। পাশেই একটি ছােট্ট নদী। পানির অভাব পূরণ করা যাবে।

উটের পিঠে সুন্দর হাওয়া থাকলেও ক্রমাগত বদর-এর পিঠে, কেবল পিঠেই নয়, সর্বাঙ্গে ব্যথা। এবার তাবুর নিচে একটু টান টান হয়ে শুতে পারায় যেন একটু স্বস্তি পেল।

সঙ্গী পরিচারকদের তাবুগুলাে একটু দূরে খাটানাের ব্যবস্থা করা হ’ল। হৈ হট্টগােল রাজকুমারীর নিদের ব্যাঘাত যদি হয় এরকম ভেবেই এ ব্যবস্থা।

তাঁবুর ভেতরে মখমলের চাদর পেতে বিছানা তৈরী করে রাজকুমারী বদর ঘুমে আচ্ছন্ন।

কামার অল-জামান তাঁবুর ভেতরে ঢুকে দেখল, খুবই পাতলা, একটি রেশমী সেমিজ আর কাঁচুলী পরিহিতা বদর ঘুমে বিভাের।

জামান তার পাশে বসল। তাঁবুর ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢুকে বদরএর গায়ের পাতলা ফিনফিনে সেমিজটির অনেকখানি উড়ে গিয়ে মাঝে মাঝে তার শরীরের অদৃশ্য অংশ দৃশ্য করে তুলছে। দীর্ঘ একমাস তারা পাশাপাশি কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও সম্ভোগ-সুখ তাে দূরের কথা, কেউ কাউকে চুম্বন বা আলিঙ্গন পর্যন্ত করতে পারে নি। ফলে জামান-এর মধ্যে কামতৃষ্ণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। চিত্তে জাগে অদম্য চাঞ্চল্য। কিন্তু চারদিকে পরিচারকরা ঘােরাফেরা করছে। এর মধ্যে! ছিঃ! এযে বনের জন্তু-জানােয়ারের সামিল কাজ হবে। জামান অনন্যোপায় হয়ে ঘুমন্ত বিবির পাশে বসল। তার সবাঙ্গে হাত বুলাতে লাগল। স্পর্শ সুখ। একেবারে না পাওয়ার চেয়ে যতটুকু পাওয়া যায়।

ক্রমে জামান-এর দেহ-মন উত্তপ্ত হতে থাকে। বার বার হাত বােলাতে বােলাতে বদরের কোমরের কাছে শক্ত একটি বস্তু তার হাতে বাঁধল।

জামান সেমিজটি সামান্য ফাঁক করে শক্ত বস্তুটিকে দেখার চেষ্টা করল। একটি পাথর। নিশ্চয়ই মাহামূল্যবান কোন পাথর। নইলে রাজকুমারী এতযত্ন করে এটিকে কোমরে ধারণ করতেই বা যাবে কেন? খুব সম্ভবতঃ কোন দৈবশক্তি সম্পন্ন পাথরটাথরই হবে। নইলে শরীরের এত জায়গা থাকতে কোমরেই বা সে বাঁধতে যাবে কেন?

পাথরটির গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে জামান ভাবল, বদর-এর পাতানাে ভাই সারজাবন হয়ত পাথরটি তাকে ব্যবহার করতে বলেছে। কারণ, সে তো জোতিষী চর্চা করে। গাছের শিকড়বাকড় আর পাথর নিয়েই তার কারবার। পাথরের দ্রব্যগুণ তাে থাকেই। বহুৎ বিপদ আপদের হাত থেকে পাথর মানুষকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখে এরকম কথা সর্বযুগে তামাম দুনিয়ার আদমিরা জানে  ।

জামান এবার কৌতুহলীমন নিয়ে ঘুমন্ত বদর-এর কোমর থেকে পাথরটি খুলে নিল।

সূর্যের আলােয় ভালাে করে পাথরটিকে দেখার জন্য তাবুর বাইরে এল। হাতে নিয়ে বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল। এমন সময় ঘটল এক অকল্পনীয় ব্যাপার। অতর্কিতে একটি পাখী

ছোঁ মেরে পাথরটিকে নিয়ে উড়ে গেল, চোখের পলকে ব্যাপারটি ঘটে গেল। চোখের পলকে একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন। বাদশাহ শাহরিয়ার সূর্য ওঠার আগে পর্যন্ত বেগমের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে রইলেন। বেগম আঙ্গুল দিয়ে তার চুলে বিনি কেটে দিতে লাগলেন। বাদশাহের চোখে তন্দ্রা ভাব এল।

                   দুশ’ সাততম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ আবার তাঁর কিসসা শুরু করলেন—“জাঁহাপনা,কামার অল-জামান-এর হাত থেকে ছোঁ মেরে পাথরটি নিয়ে পাখিটি উড়তে উড়তে সুউচ্চ একটি গাছের ডালে গিয়ে বসল।

জামান দূর থেকে দেখতে পেল হতচ্ছাড়া পাখিটি গাছের ডালে বসে তারই দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

পাথরটিকে হারিয়ে জামান-এর মন যার পর নাই বিষিয়ে উঠল। আতঙ্কিতও কম হ’ল না। এমন একটি অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটতে পারে সে কল্পনাও করতে পারে নি। এখন উপায়? রাজকুমারী ঘুম থেকে জেগে অবশ্যই পাথরটির খোঁজ করবে। না পেয়ে অস্থির হয়ে উঠবে। কি বলে তাকে প্রবােধ দেবে। আর নিছক প্রবােধের ব্যাপার তাে নয়। পাথরটি সে হয়ত নিজের কলিজার চেয়েও বেশী ভলবাসে।

জামান অনন্যোপায় হয়ে উদ্ভ্রান্তের মত গাছটির দিকে ছুটে যায়। একটি পাথরের টুকরাে কুড়িয়ে নিয়ে পাখিটিকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারে। কাজ যেটুকু হ’ল পাখিটি উড়ে গেল। পাথরটিকে ছাড়ল না। তবে আশার বিষয়, পাখিটি উড়ে বেশীদূরে গেল না। সামান্য দূরবর্তী অন্য একটি গাছের ডালে গিয়ে বসে বেরসিকের মত লেজ নাড়তে লাগল। জামান আর একটি ঢিল তুলে নিয়ে তাকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারে। এবারও ঘায়েল করতে পারল না। পাখিটি উড়ে গিয়ে অন্য একটি ঘাছের ডালে বসল। পাখিটি যেন তার সঙ্গে রসিকতায় মেতেছে। জামান আর একটি পাথর ছুঁড়ে মারলে। সে এবার সে গাছেরই ডাল পরিবর্তন করে অন্য এক জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নিল।

পাখিটি বার বার উড়ে গিয়ে যখন যে ডালেই বসুক না কেন, এমন ভঙ্গিতে বসছে জামান যেন পাথরটিকে স্পষ্ট দেখতে পায়। সে আশান্বিত হয়। পাখিটির পিছন যেন না ছাড়ে প্রতিবারেই জামান-এর মনে হয় এবার নির্ঘাৎ সে পাখিটিকে ঘায়েল করতে পারবে। ব্যর্থ, বারবারই সে ব্যর্থ হতে লাগল। কিন্তু এতবার ব্যর্থ হয়েও প্রতিবারেই তার মধ্যে আশার সঞ্চার ঘটছে।

বার বার এগাছ-গাছ করে করে পাখিটি এক সময় অদূরবর্তী এক পাহাড়ের অনুচ্চ এক চূড়ায় গিয়ে আশ্রয় নিল। জামান-এর শিরে তখন খুন চেপে গেছে। সে তরতর করে পাহাড়ের গা-বেয়ে ওপরে উঠে যায়। আবার শুরু করে পাথর ছোঁড়া। পাখিটি এখানেও রসিকতায় মাতল। জামান পাথর ছুঁড়তেই উড়ে গিয়ে আবার অন্য একটি চুড়ায় গিয়ে বসল।

পাখিটির পিছন পিছন ছুটে জামান একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ল।

তার বহু আকাঙ্ক্ষিত পাথরটি কিন্তু হতচ্ছাড়া পাখিটির ঠোটেই রয়ে গেল। দীর্ঘ কয়েক ঘন্টা কেটে গেল। পাখির পিছনে ছুটতে গিয়ে কখন যে বিকেল গড়িয়ে প্রকৃতির কোলে আলাে-আধারির খেলা শুরু হয়ে গেছে তা সে খেয়ালই করে নি। ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল। গা দিয়ে অঝােরে ঘাম ঝরছে। কিন্তু এ-অবস্থায় বদর-এর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে কোনমুখে। তাকে বলবেই বা কি? পাথরটির শোকে সে হয়ত এরই মধ্যে কাতর হয়ে পড়েছে। এখন উপায়?

এদিকে অন্ধকার ক্রমে ভয়াবহ রূপ নিয়ে দেখা দিল। কয়েক মূহুর্তের মধ্যে জমাটবাঁধা অন্ধকারে প্রান্তর, বনভূমি, পাহাড় সব তলিয়ে গিয়ে একাকার হয়ে এল। নিজের হাতটিকে পর্যন্ত ভালভাবে দেখা যায় না। এখন উপায়? এ-অবস্থায় ঘন ঘন চড়াই উৎরাই অতিক্রম করে নিচে নামতে গেলে যেকোন মুহূর্তে পা হড়কে প্রাণনাশ হওয়ার সম্ভাবনা। আর আল্লাহর দোয়ায় তা যদি-ও না হয় তবে পথ হারিয়ে সারারাত্রে দূরবর্তী কোন স্থানে পৌছে যাওয়া কিছুমাত্রও বিচিত্র নয়। এখন আর শত কোশিস করেও তাবুর খোঁজ পাওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু উপায়ই বা কি? আর হিংস্র জন্তু-জানােয়ারের খপ্পরে পড়লে তাে আর কথাই নেই। এক মুহুর্তে সব খেল খতম।

এদিকে রসরাজ পাখিটি অন্ধকারে গাছের ডালে বসে পাখা ঝাপটাচ্ছে। তার মুখের পাথরটি সাপের মাথার মনির মত চকচক করছে। তার খুন টগবগিয়ে ওঠে। শিরা উপশিরাগুলি দপ দপ করতে থাকে। একটি পাথর কুড়িয়ে নিয়ে পরম আক্রোশে পাখিটিকে তা লক্ষ্য করে জামান ছুড়ে মারল। পাখি বিকট এক আওয়াজ করে আবার অন্য একটি ডালে গিয়ে বসল। আরও বার কয়েক ঢিল মারার পর জামান আর ভরসা পেলনা। অন্ধকারে যেকোন মুহূর্তে পা-হড়কে পড়ে যেতে পারে আশঙ্কায় একটি পাথরের ওপরে বসে হাঁপাতে লাগল। কখন যে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল বুঝতেই পারে নি।

ভাের হ’ল। জামান চোখ মেলে তাকাল। দেখল, একটি প্রশস্ত পাথরের ওপর সে শুয়ে রাত্রি কাটিয়েছে।

ভােরের আলাে ফুটে উঠতেই জামান উঠে বসল। ওপরের দিকে মুখ তুলতেই দেখতে পেল পাখিটি গাছের ডালে বসে লেজ নাড়ছে। তার মুখের পাথরটি তখনও জ্বল জ্বল করছে। ভােরের রক্তিম সূর্যের আলাে পড়ে সেটির চাকচিক্য যেন আরও বহুলাংশে বেড়ে গেছে।

জামান আবার একটি পাথর তুলে নিয়ে পাখিটিকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারল। সে এখন রীতিমত মরিয়া হয়ে উঠেছে। একের পর এক ঢিল ছুঁড়ে চলল। আর পাখিটিও ডাল বদলে তার চোখের সামনে বসে লেজ নাড়তে থাকল।

এভাবে এগাছ-গাছ করতে করতে পাখিটি জামানকে প্রলােভন দেখাতে দূরে, বহুদূরে নিয়ে চলে যায়। দুপুরের আগে জামান একটি আপেল আর চেরীফলের গাছ দেখতে পেল। লাল টসটসে চেরীফল আর মনলােভা পাকা আপেল দেখে কয়েকটি ছিড়ে ক্ষিধে নেভাল। গণ্ডুষ ভরে ভরে ঝর্ণার পানি খেল, এমনি করে পাখিটির পিছনে ছুটে ছুটে দুটো দিন কেটে গেল। চেরী গাছের নীচে শুয়ে জামান রাত্রি কাটাল। সকাল হ’ল। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে হতচ্ছাড়া পাখিটি চেরী গাছের ডালে বসে লেজ নাড়ছে। জামান আবার পাথর নিয়ে পাখিটির পিছন-তাড়া করতে লেগে যায়। সে এবার আরও মরিয়া হয়ে লেগেছে। শিরে খুন চেপে গেছে। যা হােক একটি হিল্লা করে তবে ছাড়বে। তার পক্ষে সামান্য একটি পাখির কাছে হার মানা কি করেই বা সম্ভব? সুলতান শাহরিমান-এর লেড়কা হয়ে সামান্য একটি পাখির কাছে হার মানার কথা ভাবতেই পারে না। কিন্তু তাকে বাগে নেওয়া কিছুতেই সম্ভব হল না।

এদিকে পাখিটি জামানকে প্রলুব্ধ করে করে একেবারে সমুদ্রের ধারে এনে ফেলল। তার সর্বাঙ্গ দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। শরীর আর চলে না। মাথা ঝিমঝিম করছে। নচ্ছার পাখিটি সমুদ্রের তীরবর্তী একটি আখরােট গাছের ডালে বসে মৃদু মৃদু লেজ নাড়াচ্ছে। তার কাণ্ড দেখে জামান-এর গা-পিত্তি জ্বলে গেল। একটি মাটির ডেলা তুলে নিয়ে শরীরের সর্ব শক্তি নিয়ােগ করে পাখিটিকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারল। পাখিটি এবার বার কয়েক পাখা ঝাপটেই ঊর্ধ্বাকাশের দিকে উড়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে এবার।

( চলবে )

গল্প গুলি ভাল লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না । নীচে হোয়াটস অ্যাপ এ শেয়ার এর লিঙ্ক আছে । 

Post a Comment

0 Comments