গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
এবার প্রতিজ্ঞা করলাম, আমাকে যে মুক্ত করবে সে-হতচ্ছাড়াকে আমি কোতল করব। আমার বন্দী জীবন অব্যাহতই রইল।' নসীবের ফেরে তুমি এসে এবার হাজির হলে। আমাকে মুক্তি দিলে। কিন্তু আমি যে শপথ করে রেখেছি। শপথ রক্ষা আমাকে করতেই হবে। তােমাকে সুযােগ দিচ্ছি, তুমি নিজেই বেছে নাও কি ভাবে মরতে চাও। আফ্রিদি দৈত্যের কথায় বুড়াে জেলের তাে কলিজা পর্যন্ত শুকিয়ে একেবারে কাঠ। সে করজোড়ে বার বার পাণভিক্ষা করতে লাগল। আফ্রিদি দৈত্য কোন কিছুতেই ভুলবার নয়। বার বারই বলতে লাগল—“তােমার খুশিমত পথ বেছে নাও, কিভাবে তুমি মৃত্যু বরণ করতে আগ্রহী। বুড়াে জেলে কেঁদে কেটে বলতে লাগল—কেন আমাকে জান দিতে হবে? আমি তাে জীন্দেগীতে কোন গুনাহ করিনি যে, আমার অপমৃত্যু ঘটতে পারে। আফ্রিদি দৈত্যর মুখে সেই একই কথা—দেরী কোরাে না! কি ভাবে জান দিতে চাও তাড়াতাড়ি ঠিক করে ফেল।
এবার বুড়াে জেলের মাথায় সুন্দর একটা মতলব এল। সে চোখ মুছতে মুছতে বলল—“তুমি তাে আমাকে খুন করবেই। কিন্তু আমার গুনাহ কি, না-ই বা বললে। পানি থেকে আমি এ-তামার জালাটা তুলেছি। জালার মুখ খুলেছি, মিথ্যা তাে নয়। কিন্তু আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না, তােমার এ-অতিকায় দেহটা এ-জালাটার মধ্যে কি করে ছিল? আমি কেন, এরকম একটা গাঁজাখুরি কথা কেউ কি বিশ্বাস করবে ? অবশ্যই না।' বুড়াে জেলের কথায় আফ্রিদি দৈত্য ক্ষোভে-অপমানে রীতিমত ফুসতে লাগল। জেলের গলাটিপে ধরার জন্য হাত বাড়িয়ে দিল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল—“ঠিক আছে, আগে তােমার সন্দেহ দূর করছি। কথা বলতে বলতে জালাটার মধ্যে নিজের অতিকায় দেহটাকে দিল ঢুকিয়ে। ব্যস, জেলে সঙ্গে সঙ্গে জালাটার মুখ দিল বন্ধ করে। | কিসসার এ অংশ পর্যন্ত বলে বেগম শাহরাজাদ থামলেন। চতুর্থ রাত্রে বাদশাহ আবার এলেন।
শাহরাজাদ কিসসা ফাঁদলেন —“জেলে বুড়াে সে তামার জালাটার মুখ বন্ধ করে আপন মনে হাসতে লাগল। তারপর গলা ছেড়ে বলল-“হতচ্ছাড়া আফ্রিদি, তােকে আবার সাগরের পানিতে ডুবিয়ে দেব। আর নিজে সাগরের ধারে কুটীর বেঁধে বাস করব। অন্য কোন হতভাগা যাতে এখানে জাল ফেলে আর নিজের মৃত্যু ডেকে না আনে। আর ঢােল পিটিয়ে চারদিকের গ্রামবাসীকেও ব্যাপারটা জানিয়ে দেব। দেখব, কে তােকে অথৈ পানি থেকে উদ্ধার করে।
তামার জালাটা ভাঙার ক্ষমতা দৈত্যর নেই। ফলে অসহায়ভাবে জালার মধ্যে হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি করে আর্তনাদ জুড়ে দিল। অনেকভাবে অনুরােধ করতে লাগল—“তােমার কোন ক্ষতিই করব না। তামাম দুনিয়ার হীরে-জহরৎ ধন-দৌলতে তােমার ঘর ভরে দেব।
হেকিম রায়ান, উজির ও বাদশাই উনানের কিসসা
বুড়াে জেলে হেসে বলল -হাকিম রায়ান ও বাদশাহ উনানের উজির-এর কিসসা বলছি শােন—
অতি প্রাচীনকালে রুম দেশে যার নামে সুন্দর এক নগর ছিল। সেখানে প্রবল পরাক্রান্ত এক সুলতান রাজত্ব করতেন। সৈন্যসামন্ত, নােকর-নােকরাণী আর ধনদৌলত কোন কিছুরই অভাব ছিল না তার। কিন্তু দুঃখ তার একটাই ছিল, সারা গায়ে ধগধগে কুষ্ঠ। বহু হেকিম, বৈদ্য, তাবিজ, শেকড় ব্যবহার করেও নসীব ফেরাতে পারেন নি। রােগজ্বালায় দগ্ধে মরতে লাগলেন।
এক সকালে সুলতানের দরবারে এক অতি বৃদ্ধ হাজির হ’ল। রায়ান হেকিম বলে সবাই জানে তাকে। নানা ভাষায় তার পাণ্ডিত্য ছিল। বহু রকম বিদ্যা তার আয়ত্বে ছিল। দরবারে হাজির হয়ে সুলতানকে কুর্নিশ করে বলল —“হুজুরের দুরারােগ্য বিমারির খবর পেয়ে ছুটে আসছি। আমার বিশ্বাস, আপনার বিমারি আমি সারিয়ে তুলতে পারব। কিন্তু আপনাকে অনুরােধ করতেও ভরসা হয় না। আপনি এ দেশের সুলতান। মস্ত বড় আদমি। আমার সঙ্গে জান পহছান নেই। আমার দেওয়া দাওয়াই কোন ভরসায়ই বা সেবন করবেন?
সুলতান বলেন—না-ই থাকল জান পহছান। আমার বিমারি যদি সারিয়ে তুলতে পার বিস্তর ধনদৌলত পাবে। কেবল মাত্র তুমিই নও, তােমার বংশপরম্পরা আমার দরবার থেকে মাসােহারা পাবে। আর আমার দরবারের প্রধান পারিষদ করে রাখব তােমাকে। সুলতান এবার একটা বহুমূল্য শাল হেকিম রায়ানকে উপহার দিলেন।
‘আমার ওপর ভরসা রাখতে পারেন জাহাপনা। আমার দাওয়াই আপনার বিমারি সারিয়ে তুলবেই।
—“তবে কাল থেকেই ইলাজ শুরু কর।। | হেকিম রায়ান গাছগাছড়া নিয়ে বসে গেল দাওয়াই বানাতে। একটা দাওয়াই বানিয়ে একটা ফাপা বাঁশের লাঠির মধ্যে তার কিছু অংশ ঢুকিয়ে নিল। লাঠিটার মুখ বন্ধ করে দিল। অবশিষ্টটুকু অন্য একটা বাঁশের চোঙের মধ্যে রেখে দিল। এবার একটা ফাপা পােলাে বল তৈরি করে তার ভেতরেও কিছুটা দাওয়াই ঢুকিয়ে দিল। | হেকিম এবার লাঠি এবং পােলাে বলটি নিয়ে সুলতানের দরবারে হাজির হ’ল। সেগুলাে সুলতানের হাতে তুলে দিয়ে বলল -জাহাপনা, এদুটো দিয়ে আপনাকে পােলো খেলতে হবে। শরীর ঘেমে গেলে বেশী করে পানি দিয়ে গােসল করে ফেলবেন। ব্যস, আর কিছুই করতে হবেনা। এটাই আপনার বিমারির ইলাজ। এতেই বিমারি সেরে যাবে।'
হেকিম রায়ানের ইলাজের বিধান অনুযায়ী সুলতান উনান তাঁর সভার উজির, আমীর, ওমরাহ প্রভৃতিকে নিয়ে ময়দানে গেলেন। ঘোড়ার পিঠে চেপে শুরু করলেন পােলো খেলা। সর্বাঙ্গ ঘামে জবজবে হয়ে উঠলে খেলা বন্ধ করে প্রাসাদে ফিরে এলেন। ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ভাল করে গােসল করলেন। রাত্রে বিছানা আশ্রয় করতেই আঁখির পাতায় নিদ জড়িয়ে এল। সকালে হেকিম রায়ান সভায় আসতেই উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে সুলতান উনান বললেন—হেকিম সাহেব, তােমার দাওয়াই আমার তবিয়ত অনেকটা ভাল করে দিয়েছে। আরাম মালুম হচ্ছে। রায়ান’কে প্রচুর উপহারে তিনি সন্তুষ্ট করলেন। হেকিম রায়ান-এর পরামর্শ মত সুলতান উনান-এর ইলাজ চলছে। এদিকে ক্রমে তার দেহের কুষ্ঠের দাগগুলি মিলিয়ে যেতে লাগল। রােজই সকালে রায়ান দরবারে উপস্থিত হলে প্রচুর বকশিস দিয়ে সুলতান উনান তাঁকে খুশি করেন। | সামান্য এক হাকিমকে দু'হাতে বকশিস দেবার ব্যাপারটা উজিরের সহ্য হ’ল না। চোখ টাটাতে লাগল। দরবারে উজিরের খাতির সবচেয়ে বেশী ছিল এতদিন। কিন্তু আজ তার জায়গায় সর্বাধিক খাতির পাচ্ছে হেকিম। অসহ্য একেবারেই অসহ্য। উজির ভেতরে ভেতরে দগ্ধে মরতে লাগলেন।
পরদিন সকালে হেকিম রায়ান দরবারে এলে সুলতান উনান মসনদ থেকে উঠে ব্যস্ত-পায়ে এগিয়ে গেলেন। তাকে হাতে ধরে নিয়ে গিয়ে নিজের পাশে বসালেন। এরকম খাতির একমাত্র উজিরেরই প্রাপ্য। এ দৃশ্য উজির ছাড়াও নাজির, আমির, ওমরাহ প্রভৃতিদের অনেককেই ক্ষুব্ধ করল। | ঈর্ষান্বিত উজির রাগে-দুঃখে অপমানে ফুসতে লাগলেন। আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলেন না। ফ্যাকাসে-বিবর্ণ মুখে সুলতানের সামনে এসে কুর্নিশ করে বলেন—“জাহাপনা আল্লাতাল্লার কাছে আপনার সুখী ও দীর্ঘ জীবন কামনা করি। আপনার কাছে একটা আর্জি আছে। যদি অনুমতি করেন—“কি ? কি সে-আর্জি? যা বলতে চাইছেন নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করতে পারেন। | যে ব্যক্তি শ্রদ্ধার সঙ্গে বকশিস গ্রহণ করে না, শ্রদ্ধার লেশমাত্রও যার মধ্যে নেই তাকে দান করার অর্থই হচ্ছে অযােগ্যকে ও অপাত্রে দান করা। _ সুলতান উনান গর্জে উঠলেন—ধানাইপানাই রেখে যা বলতে চাইছেন, খােলসা করে বলুন। কে সে শ্রদ্ধাহীন ব্যক্তি? কাকে দান করে আমি ভষ্মে ঘি ঢালছি?
উজির এবার মনে সাহস অবলম্বন করে, হেকিমের দিকে, অঙ্গুলি নিদের্শ করে বললেন—এ-ই সেই দানের অযােগ্য ব্যক্তি।
এরকম বেইমান তামাম দুনিয়ায় দ্বিতীয় আর একজন আছে কিনা সন্দেহ। আপনি দরাজ হাতে যেভাবে বিলােতে শুরু করেছেন তাতে দেখা যাবে শীঘ্রই আপনার তহবিল শূন্য হয়ে গেছে।'
সুলতান উনান ধমক দিয়ে উঠলেন—মুখ সামলে কথা বলবেন! আপনার স্পর্ধা তাে কম নয়! আমার কাজের সমালােচনা করছেন। আর কার বিরুদ্ধে অভিযােগ করছেন তা হয়ত আপনি নিজেও জানেন
হেকিম সাহেব আমার জান ফিরিয়ে দিয়েছেন। নইলে এতদিনে হয়ত আমার অশ্রয় হ'ত গােরস্থানের মাটির তলায়। উপকারীর ঋণ শােধ হয় না। আমার বিশ্বাস, আমার রাজ্যটা তার হাতে তুলে দিলেও তার প্রাপ্যের চেয়ে কমই দেওয়া হত। আসলে আপনার দিল জুড়ে রয়েছে ঈর্ষা। তাই এরকম উক্তি প্রকাশ করতে পারলেন। এক সময় আমার এক সভাসদ এরকম ঘটনাসম্বলিত বাদশাহ সিদের কিস্সা আমাকে শুনিয়েছিল।
হেকিম রায়ান সুলতানের অনুমতি নিয়ে দরবার কক্ষ ত্যাগ করলেন।
কিসসা বলতে বলতে বেগম শাহরাজাদ দেখেন, প্রাসাদের বাইরের বাগিচায় প্রভাতের আলাে ফুটতে শুরু করেছে। তিনি কিসসা বলা এবার বন্ধ করলেন। | দুনিয়াজাদ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলল–বহিনজী, তােমার মুখের কিসসা যত শুনি ততই যেন শুনতে মন চায়।
বেগম শাহরাজাদ মুচকি হেসে বললেন—'বহিন, যদি আমার জান বাঁচে তবে আরও কত সুন্দর সুন্দর কিসসা শােনাতে পারব।
বাদশাহ মনে মনে বললেন—এমন সুন্দর কিসসা শােনার লােভে অন্ততঃ একে আরও কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
সিনবাদ ও বাজপাখির কিস্সা
পঞ্চমরাত্রে বাদশাহ শারিয়ার-এর আগ্রহে বেগম শাহরাজাদ আবার কিসসা ফঁদলেন—‘জাঁহাপনা, সেই সুলতান উনান তার উজিরকে নানা ভাষায় তিরস্কার করতে লাগলেন। বাদশাহ সিনবাদ যেমন তার প্রাণাধিক প্রিয় বাজপাখিটাকে হত্যা করে অনুশােচনায় জ্বলে পুড়ে খাক হয়েছিলেন আপনি চান আমিও তেমনি জ্বলে পুড়ে মরি?' | সুলতান বললেন—বলছি তবে শুনুন,—কোন এক সময়ে কার নগরে এক বাদশাহ রাজত্ব করতেন। তার নাম ছিল বাদশাহ সিনবাদ। ঘােড়ায় চড়া, মাছ ধরা, শিকার আর খেলকুদ প্রভৃতিতে তিনি খুবই উৎসাহী ও পারদর্শী ছিলেন। তার একটা পােষা বাজপাখি ছিল। প্রাণাধিক ভালবাসতেন তাকে। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা সেটাকে কাছে কাছে রাখতেন। এমন কি শিকারে যাওয়ার সময়ও পাখিটা তার সঙ্গে থাকত। পানি খাওয়ার জন্য একটা সােনার বাটি, সােনার শিকল দিয়ে তার গলায় বেঁধে রাখা হ'ত।।
বাজপাখিটার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক একদিন দরবারে বাদশাহকে এসে বল—“হুজুর, আজকের রাত্রিটা শিকারের পক্ষে বিশেষ উপযােগী। মন চাইলে চলুন, বেরিয়ে পড়া যাক।
লােকলস্কর, অস্ত্রশস্ত্র আর বিশ্রামের জন্য তাঁবু প্রভৃতি গুছিয়ে ইয়ার দোস্তদের নিয়ে বাদশাহ সিনবাদ শিকারের উদ্দেশে যাত্রা করলেন।
এক পাহাড়ের গায়ে প্রশস্ত এবং প্রায় সমতল এক জায়গা দেখে তাবু ফেলা হ’ল। শিকারের জন্য জাল পাতা হ’ল। কিন্তু কার্যত একটা বুনাে-ছাগল ছাড়া জালে কিছুই আটকালাে না।
বাদশাহ সিনবাদ সবাইকে সতর্ক করে দিলেন—বুনাে-ছাগলটাকে যেন পালাতে দেওয়া না হয়। যার কাছ থেকে ওটা পালাবে তার গর্দান নিয়ে ছাড়ব।
খুবই সতর্কতার সঙ্গে জাল গুটিয়ে বুনাে-ছাগলটাকে বাদশাহের কাছাকাছি নিয়ে আসা হ’ল। সেটা পিছনের পা দুটোতে ভর দিয়ে প্রায় সােজা হয়ে বিচিত্র এক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়ল। আর সামনের পা দুটো জোড়া করে বাদশাহের দিকে তুলে ধরল। ব্যাপারটা এমন, সে যেন তাকে সালাম জানাচ্ছে। এতে বাদশাহসহ সবাই সরবে করতালি দিয়ে উঠল। তাদের অন্যমনস্কতার সুযােগের সদ্ব্যবহার করল বুনােছাগলটা। আচমকা এক লাফ দিয়ে বাদশাহকে ডিঙিয়ে একেবারে লম্বা দিল। দ্রুতগতিতে গভীর জঙ্গলের দিকে ছুটছিল। মুহুর্তে বাদশাহ নিজেকে সামলে নিয়ে ঘােড়া ছুটিয়ে বুনাে-ছাগলটার পিছু নিলেন। তার একটামাত্র টুকরাে কথা শােনা গেল –“আমার হাত থেকে পালিয়ে কেউ-ই রেহাই পায় নি। যে করেই হােক তােকে আমি ধরবই ধরব। | বেশ কিছুক্ষণ পর গভীর জঙ্গলে বুনাে-ছাগলটার হদিস মিলল বটে কিন্তু কিছুতেই তাকে নাগালের মধ্যে পেলেন না। কাজ হাসিল করল তার জিগরি দোস্ত বাজপাখিটা। সে বাতাসের বেগে উড়ে গিয়ে সুতীক্ষ্ণ ঠোট দিয়ে বুনাে ছাগলটার চোখের মণি দুটো গেলে দিল। বিকট আর্তনাদ করে সেটা হুমড়ি খেয়ে ঝােপের মধ্যে পড়ে গেল। ব্যস, খেল্ খতম! | বাদশাহ সিনবাদ বহুকষ্ট করে বুনাে-ছাগলটার গা থেকে চামড়া ছাড়িয়ে ঘােড়ার জিনের তলায় লটকে দিলেন। এবার তাঁবুর দিকে যাত্রা করলেন। কিছুদূর এসে তিনি এবং তার বাহন তাগড়াই ঘােড়াটা—উভয়েই পিয়াসে পাগল। পানি বিনা জান রাখা দায়। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর তিনি একটা ঝাকড়া গাছের নিচে ছােট্ট একটা তলাও দেখতে পেলেন। কাছে যেতেই তিনি অবাক মানলেন। তলাওটার পানি যেন খুবই ঘন মনে হ’ল—থকথকে। আটাগােলা সিন্নির মত।
বাদশাহ সিনবাদ তার জিগরি দোস্ত বাজপাখির গলা থেকে সােনার
বাটিটা খুলে ওই থকথকে পানি নিয়ে এলেন। বাজপাখিটার সামনে। ধরলেন পানিভর্তি বাটিটাকে। সে পানি তাে পান করলই না, উপরন্তু ঠোট দিয়ে সজোরে এক ধাক্কা দিয়ে বাটিটাকে দূরে ফেলে দিল। সিনবাদ তার আচরণে খুব বিরক্ত হলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে আবার গিয়ে একবাটি পানি নিয়ে এলেন। এবার ঘােড়াটার মুখের সামনে ধরামাত্র বাজপাখিটা উড়ে গিয়ে ডানা দিয়ে ধাক্কা মেরে বাটিটাকে ফেলে দিল। রাগে গল্প করতে করতে বাদশাহ কটিদেশ থেকে তরবারি টেনে নিয়ে দিলেন সজোরে এক কোপ বসিয়ে। ব্যস, চোখের পলকে তার একটা ডানা কেটে গেল। ফিনকি দিয়ে খুন বেরিয়ে এল। বাদশাহ আপন মনে বলে উঠলেন—এর মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে। নিজে তাে খেলই না, অন্য কাউকেও পানি খেতে দেবে না! বাঃ চমৎকার মতলব! বাজপাখিটার কিন্তু নিজের যন্ত্রণাকাতর দেহের দিকে কিছুমাত্রও নজর নেই। ঘাড় তুলে সে মাথার ওপরের গাছটাকে দেখতে লাগল। বাদশাহ সিনবাদ এবার ঘাড় ঘুরিয়ে গাছটার দিকে চোখ ফেরাতেই চমকে উঠলেন। দেখলেন, গাছের ডালে অসংখ্য ময়াল সাপ ঝুলছে। তাদের মুখ থেকে হরদম লাল জাতীয় তরল পদার্থ বেরিয়ে তলায় পড়ছে। কৃতকর্মের জন্য তিনি অনুশােচনায় জ্বলে পুড়ে খাক হতে লাগলেন। | বিষন্ন মনে বাদশাহ সিনবাদ প্রাসাদে ফিরে এলেন। ছাল ছাড়ানাে বুনাে ছাগলটাকে রান্না করার জন্য রসুইকরকে নিদের্শ দিলেন। আহত বাজপাখিটা এতক্ষণ জীবিত ছিল। এবার মাথা কাৎ করে পড়ে গেল। ব্যস, খতম। বাদশাহ সিনবাদ আর্তনাদ করে উঠলেন—“আমার জিগরি
দোস্তকে আমি নিজে হাতে খতম করেছি!” কিসসা শেষ করে বাদশাহ উনান এবার থামলেন। - উজির এবার সবিস্ময়ে বললেন—“হুজুর, আপনার এ র সঙ্গে আমার বক্তব্যের সম্পর্ক কি, বুঝতে পারলাম না তাে! হয়তাে বলতে চাইছেন, বাদশাহ সিনবাদ তার জান, তাঁর জিগরি দোস্ত বাজপাখিকে নিজে হাতে খুন করার জন্য অনুশােচনায় দগ্ধ হয়েছিলেন, ঠিক কিনা ? কিন্তু হেকিম রায়ান কি আপনার সত্যিকারের জিগরি দোস্ত ? অবশ্যই না। লােকটা ধান্দাবাজ, জাহাপনা, আপনি এখন বুড়াে হেকিমের মােহে অন্ধ। তার দোষ-গুণ সম্বন্ধে বিচার করার মত বিবেচনা বােধ আপনার লােপ পেয়েছে। আপনি কি সেই উজির আর বাদশাহের লেড়কার কিসসা জানেন ? বাদশাহের লেড়কাকে খতম করতে গিয়ে উজির নিজেই জান দিয়েছিলেন। আপনি নিজের কবর নিজেই খুড়তে চলেছেন।
বাদশাহ রায়ান জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে উজিরের দিকে তাকালেন।
উজির তার কিসসা শুরু করলেন—“কোন এক দেশে এক বাদশাহ রাজত্ব করতেন। তার একটা লেড়কা ছিল। শিকার আর ঘােড়ায় চড়ার দিকে তার ছিল খুব ঝোক। এক উজিরের ওপর লেড়কার দেখভালের দায়িত্ব বর্তাল। এ কাজকে উজির মােটেই সুনজরে দেখলেন না। তার সম্মান এতে নাকি ক্ষুন্ন হচ্ছে। এ থেকে তিনি রেহাই পাওয়ার পথ খুঁজতে লাগলেন। দরবারে বসতে না পারলে উজিরের সম্মান থাকে নাকি ছাই।
এক সকালে উজির বাদশাহের লেড়কাকে নিয়ে ঘােড়ার পিঠে চড়ে শিকারে বেরােলেন। পথে তাদের সামনে বিচিত্র দর্শন এক জন্তুকে দেখতে পেলেন তারা। হতচ্ছাড়াটা পথ আগলে দাঁড়িয়ে। বাদশাহের লেড়কা জোর কদমে ঘােড়া ছুটিয়ে দিল জন্তুটাকে ধরার জন্য। কিন্তু পারল না। সেটা চোখের পলকে কোথায় গা-ঢাকা দিল। কিন্তু ফায়দা যেটুকু তা হ’ল সে পথ হারিয়ে ফেলল। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অচেনা পথে কাঁদতে কাঁদতে সে পথ চলতে লাগল। | কিছুদূর যেতেই পথের ধারে এক লেড়কিকে সে দেখতে পেল। ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। খুবসুরৎ দেখতে। সে লেড়কিটাকে জিজ্ঞাসা করল—কে গা তুমি? এমন করে কাঁদছ কেন?'
লেড়কিটা বলল—“আমি হিন্দের শাহজাদী। আমার দলের লােকদের হারিয়ে ফেলেছি। বড়ই অসহায় হয়ে পড়েছি।
বাদশাহের লেড়কা হিন্দের শাহজাদীকে নিজের ঘােড়ার পিঠে তুলে নিল। কিছুদূর গিয়ে পথে একটা ভাঙাচোরা পােড়া বাড়ি দেখতে পেল। | শাহজাদী ঘােড়া থামাতে বলল। সে একবারটি ‘ছােট-বাথরুম’এ যাবে। সে বাড়িটার ভেতরে ঢুকে গেল। বদশাহের লেড়কা ঘােড়া নিয়ে সদর দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও
শাহজাদী ফিরছে না দেখে তার কৌতূহল হ’ল। ঘােড়াটাকে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে পোড়ো বাড়িটার ভেতরে ঢুকে গেল। আড়াল থেকে দেখতে পেল, শাহজাদী এক রাক্ষসীর অবয়ব ধারণ করেছে। ঘরের ভেতরে আরাে দুটে রাক্ষসী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বুড়াে আর বুড়ি রাক্ষসী। মেয়েটা বলল –“আজ তােমাদের জন্য একটা মােটাসােটা মানুষ ধরে এনেছি। জিভ দুটোকে বেশ একটু ঝালিয়ে নিতে পারবে। | বুড়ি রাক্ষসী বলল -তাই বুঝি ? কোথায় রেখেছিস বেটি ? নিয়ে আয়। তার গােস্তে উপােষ ভঙ্গ করি।
কথাগুলাে কানে যেতেই বাদশাহের লেড়কার কলিজা শুকিয়ে গেল। কোনরকমে সে জান নিয়ে ভাগতে চেষ্টা করল। পারল না।
এরই মধ্যে রাক্ষসী-মেয়েটা আগের সে রূপবতীর চেহারা নিয়ে দরজার বাইরে চলে এসেছে। বাদশাহের লেড়কাকে বল—“কি ব্যাপার তােমার চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ, কাপছ, ব্যাপার কি?'
—বােধ হয় আমি শত্রুর ডেরায় এসে পড়েছি।
—‘শত্রুর ডেরায় ? তুমিই তাে বলেছিলে তুমি নাকি বাদশাহের লেড়কা। তবে ধনদৌলত নিয়ে তাদের বশীভূত করে ফেলছ না কেন? শত্রুকে বশ করতে আবার দেরী হয় নাকি?”
—এরা ধনদৌলতে ভুলবার নয়। আমার গায়ের নরম গােস্তের দিকে এদের নজর।
মেয়েটা চমকে উঠল। ভাবল, তবে কি আমার ফন্দি ফিকিরের কথা জানতে পেরে গেছে? তবে তাে একে ভুলিয়ে ভালিয়ে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়া যাবে না। এবার বাদশাহের লেড়কাকে লক্ষ্য করে বল— তবে এক কাজ কর, আল্লাতাল্লার নাম কর। একমাত্র তিনিই যদি পারেন রক্ষা করতে।
বাদশাহের লেড়কা এবার হাঁটুগেড়ে বসে আল্লাতাল্লার নাম করতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত পরে আঁখি খুলে দেখে মেয়েটা এরই মধ্যে ভেগেছে।
বাদশাহের লেড়কা সুযােগ বুঝে সেখান থেকে চম্পট দিল। প্রাসাদে ফিরে সে তার বাবার কাছে ঘটনার বিবরণ দিল। সব শুনে বাদশাহ তাে রেগে একেবরে কাঁই। উজির নিজের কাজে গাফিলতি করার জন্যই তার লেড়কা বিপদে পড়েছিল। এমনও হতে পারে এর সঙ্গে তারও সাঁট রয়েছে। ঘাতক ডেকে তার গর্দান নেবার আদেশ দিলেন। | কিসসা শেষ করে উজির বাদশাহ উনানকে বললেন জাঁহাপনা, আমার মনে যদি এরকম কোন কুমতলব রয়েছে প্রমাণ হয় তবে আপনি আমাকে যে শাস্তি দেবেন হাসিমুখে তা বরণ করে নেব। | এরপরও আমি বলছি, যাকে আপনি দরাজ হাতে পুরস্কার দিয়ে তার
মন ভরতে প্রয়াসী হচ্ছেন, সে আপনার শত্রু ছাড়া মিত্র অবশ্যই নয়। আপনি শুনে রাখুন, সে ভিনদেশের গুপ্তচর। সে আপনার জান খতম করার ফিকির খুঁজছে। এমনকি আমার জান যাওয়াও কিছুমাত্র বিচিত্র নয়। বাদশাহ বলেন—“তবে আমার এখন কর্তব্য কি?
দরবারে আপনার সামনে তাকে হাজির হতে বলুন হুজুর। যত শীঘ্র সম্ভব তার গর্দান নেবার ব্যবস্থা করুন। আপনার গায়ে কাঁটার আঁচড় দেওয়ার আগেই তার জান নিয়ে নিন। | বাদশাহের নির্দেশে এবার হেকিম রায়ান-এর খোঁজে দূত ছুটল। রায়ান খবর পেয়ে নিজেই ব্যস্ত হয়ে দরবারে ছুটে এলেন। হতভাগ্য তাে জানেনও না মৃত্যু তার চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। কেবল হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরার সুযােগের অপেক্ষায় রয়েছে।'
বাদশাহ উনান গম্ভীর স্বরে বললেন—“আপনি কি জানেন হেকিম সাহেব, কোতল করব বলে আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছি।
-কিন্তু আমার অপরাধ কি তা তাে অবশ্যই বলবেন, আশা করি।' | ‘—আমার সভাসদরা আমাকে ফুঁসলাচ্ছে, আপনি নাকি গুপ্তচর | বৃত্তি নিয়ে আমার সভায় অবস্থান করছেন? আমাকে গােপনে খুন করার চক্রান্ত নাকি আপনার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে? তাই আমার জান বাঁচাতে হলে আপনাকে আগেভাগেই কোতল করতে হবে।' কথা বলতে বলতে বাদশাহ করতালি দিয়ে ঘাতককে ডাকলেন।
ঘাতক এসে কুনিৰ্শ করে বাদশাহের সামনে দাঁড়াল।
বাদশাহ উনান বলেন—এ বিশ্বাসঘাতককে কোতল করতে হবে। নিয়ে যাও। | হেকিম রায়ান সবিস্ময়ে বললেন—জাঁহাপনা, আমি আপনাকে দুরারােগ্য ব্যাধিমুক্ত করেছি। তার প্রতিদান দিচ্ছেন আমার গর্দান নিয়ে? চমৎকার আপনার বিবেক, চমৎকার আপনার মানবিকতা!
–‘আমার সাফ কথা শুনুন হেকিম সাহেব, আপনার ওপর থেকে আমার বিশ্বাস উবে গেছে। সামান্য একটা লাঠির সাহায্যে ইলাজ করে আপনি যখন আমার এমন কঠিন বিমারি সারিয়ে তুলতে পেরেছেন তখন আপনার অসাধ্য কোন কাজই নেই। তাই আপনার গর্দান নেবার মাধ্যমেই আমি আমার জীবনের নিরাপত্তা আনতে চাই। ফুলের গন্ধ বা অন্য কোন কিছুর গন্ধ শুকিয়েও আমাকে হত্যা করা আপনার পক্ষে অসাধ্য নয়। –‘জাঁহাপনা, আপনার বিচারে এ-পুরস্কার কি আমার কাজের উপযুক্ত প্রাপ্য বলে মনে করব?
—মৃত্যু—হ্যা, মৃত্যুই আপনার একমাত্র প্রাপ্য। | | হেকিম রায়ান নিঃসন্দেহ হলেন, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। নিশ্চিন্ত মৃত্যুর চিন্তায়, তার দু চোখের কোণ বেয়ে পানির ধারা নেমে এল।
কর্মফল কৃতকর্মের ফল। উপযাচক হয়ে উপকার করতে এসে নিজের জান দিতে হচ্ছে। একেই বলে চরমতম দুর্গতি। গ্রহের ফের ছাড়া আর কি-ই বা একে ভাবা যেতে পারে? চমৎকার বিচার! নসীবের
ঘাতক হেকিম রায়ানকে আর কিছু বলার বা ভাববার সুযােগ না দিয়ে আচমকা একটি কালাে কাপড় দিয়ে তার চোখ দুটো বেঁধে ফেলল। তারপর কোমর থেকে এক ঝটকায় তরবারি খুলে নিয়ে তাকে আঘাত করতে উদ্যত হল।
হেকিম রায়ান আর্তনাদ করে বললেন—এ আপনি করছেন কি জাহাপনা! মৃত্যুদণ্ডাদেশ তুলে নিন! আমাকে মুক্তি দিন নইলে খােদা আপনাকে ক্ষমা করবেন না। আপনার সর্বনাশ অবধারিত।
—বাদশাহ উনান একবার যে হুকুম দেয় তা কি করে প্রত্যাহার করতে হয় তার জানা নেই।
—হায় আল্লাহ! এ-ই কি তােমার বিচার! এ যে সেই কুমীরের শয়তানীর মত কাণ্ড ঘটতে চলেছে!
—কুমীরের কিসসা কি বলুন তাে শুনি।
—না জাহাপনা, জান দেবার পূর্ব মুহূর্তে আপনাকে সে কাহিনী আর না-ই বা শােনালাম, আমাকে জান বাঁচিয়ে দিন, খােদা আপনার মঙ্গল করবেন।
হেকিম রায়ান যখন মৃত্যুর জন্য নিজের মনকে তৈরি করছেন। ঠিক তখনই পারিষদদের মধ্য থেকে কয়েকজন বাদশাহের কাজের প্রবল আপত্তি তুললেন। তারা করজোড়ে প্রার্থনা করলেন—“জাঁহাপনা, যে লােকটি আপনাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এসে নবজীবন দান করলেন আপনি কিনা তাঁরই জান নেবার জন্য কবুল করেছেন। মেহেরবানি করে ওকে মুক্তি দিন।
বাদশাহ উনান গর্জে উঠলেন—“অসম্ভব! আপনারা জানেন লােকটি অমিত ক্ষমতার অধিকারী। যে লােক সামান্য উপায়ে আমার বিমারির ইলাজ করে সারিয়ে তুলেছে সে অতি সহজেই আমার জানও নিয়ে নিতে পারে। তাকে জিইয়ে রেখে আমি আমার নিজের পায়ে কুড়ুল মারতে উৎসাহী নই। তাকে খতম করে দেওয়া ছাড়া আমার গত্যন্তর নেই।
কাঁদতে কাঁদতে হেকিম এবার বলেন—“জাহাপনা, জান যখন এবার দিতেই হবে তখন কিছু সময়ের জন্য আমাকে একবারটি আমার বাসায় যাবার অনুমতি দিন। ঘরদোর অগােছাল রেখেই আমি আপনার তলব পেয়ে ছুটে এসেছি। সেগুলাে সব গােছগাছ করে বন্ধু ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে আপনার দরবারে আবার ফিরে আসব, কবুল করছি।' বাদশাহ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিমেলে হেকিমের দিকে তাকালেন। হেকিম বলে চললেন--জাহাপনা, আমার ঘরে কতকগুলাে .................. To be continued

0 Comments