গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
এক শ' পঁচাশিতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, শাহজাদীর কাণ্ডকারখানা আফ্রিদি দানাশ ও কশকশ আর জিনি মাইমুনাহ গােপন অন্তরাল থেকে লক্ষ্য করতে লাগল। মাইমুনাহর মুখে হাসি ফুটে উঠল। সােল্লাসে বলে উঠল কি গাে, এবার তােমাদের থোতামুখ যে ভোতা হয়ে গেল। আমি তাে বলেই ছিলাম, আমার শাহজাদার সুরৎ তােমার রাজকুমারীর তুলনায় একটু হলেও বেশী। এবার নিশ্চয়ই স্বীকার করতে দ্বিধা নেই ?
আফ্রিদি দানাশ ফ্যাকাশে মুখে বলল—‘মাইমুনাহ, আমি তােমার কাছে পরাজিত হয়েছি, নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিচ্ছি।' মাইমুনাহ এবার কশকশ’কে বহুভাবে সুকরিয়া জানাতে লাগল। এতাে খুবই সত্য যে, তারই কৌশল কাজে লাগিয়ে তাদের উদ্ভূত সমস্যার মীমাংসা করা সম্ভব হয়েছে। এবার আফ্রিদি দানাশ পালঙ্কের দিকে এগিয়ে গিয়ে নওজোয়ান কামার অল-জামান-এর প্রশস্ত বুকের ওপর ঘুমে অচৈতন্য হয়ে পড়ে থাকা বদরকে আলতাে করে কাঁধে তুলে নিল। সম্রাট ঘায়ুর এর প্রাসাদের নির্দিষ্ট কামরায় শুইয়ে দিয়ে আবার জানালা দিয়ে বেরিয়ে আকাশপথে উড়ে চলল। এদিকে ঘুমন্ত শাহজাদা কামার অল-জামান-এর দিকে মাইমুনাহ এগিয়ে গেল তার তুলতুলে ঠোট দুটোতে আলতাে করে চুম্বন করল। এদিকে ভােরের আলাে ফুটে উঠতে দেরী নেই অনুমান করে নিজের আশ্রয়স্থল ইঁদারাটিতে সে আশ্রয় নিল।
পাখীর ডাকে ভাের হ’ল। শাহজাদা কামার অল-জামান চোখ মেলে তাকাল। গত রাত্রের ঘটনা তার স্মৃতি থেকে মুছে যায় নি। তাই সে অস্থির হয়ে তার পাশে শুয়ে থাকা লেড়কিটিকে খুঁজতে লাগল। কিন্তু কোথায় তার বাঞ্ছিত লেড়কি? সে তাে অনেক আগেই ভো - ভা!
শাহজাদা কামার অল-জামান ভাবল, এর পিছনেও নির্ঘাৎ তার আব্বাজানের কোন কৌশল কাজ করছে। নইলে রাত্রির অন্ধকারে লেড়কিটি কি কপূরের মত উবে গেল। কামার অল-জামান পালঙ্ক থেকে নামতে নামতে ভাবল, আর দেরী নয়, আজই তার আব্বাজানকে বলবে, শাদীতে তার আপত্তি নেই।
শাহজাদা কামার অল-জামান কামরা থেকে বেরিয়ে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে তার শয্যাসঙ্গিনী সে-খুবসুরৎ লেড়কিটিকে খুঁজতে লাগল।
এদিকে বেলা কিছুটা বাড়লে সাব্বাব নামে এক পরিচারক নাস্তা নিয়ে এল। অত্যুগ্র উৎসাহের সঙ্গে তাকে জিজ্ঞাসা করল-“কি রে, সে লেড়কিটি কোথায় গেল, জানিস কিছু?
লেড়কি? কিসের লেড়কি? কার লেড়কি? কোথায় ছিল? সাব্বাব তার প্রশ্নের উত্তর তাে দিলই না উপরন্তু হাজার খানেক প্রশ্ন তার দিকে ছুঁড়ে দিল।
সাব্বাব-এর তাে কিছুমাত্র দোষ নেই। এতবড় বাড়িতে লেড়কির মুখ কোনদিন দেখেনি। সেখানে কেউ যদি আচমকা এরকম প্রশ্ন করে বসে তবে তাে আকাশ থেকে পড়ারই কথা।
কামার অল-জামান ভাবল, সাব্বার সবকিছু জেনেও না জানার ভান করছে। তাই রেগে একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে গিয়ে বলল—শােন, যা জানিস, যেটুকু জানিস সত্যি করে বল। নইলে তাের গর্দান নিয়ে ছাড়ব বলে রাখছি।
কোরবানির খাসির মত কাপতে কাপতে সাব্বার বলল—“হুজুর, গর্দানই নেন, আর কোতলই করেন—আমি খােদার নামে কসম খেয়ে বলছি, কিসের লেড়কি, কার লেড়কি—কিছু আমি জানি না। আমি তাে'......
সাব্বারকে কথাটি শেষ করতে না দিয়েই কামার অল-জামান তাকে একের পর এক কিল-চড়-লাথি মারতে লাগল।
সাব্বার শাহজাদা কামার অল-জামান-এর হাত থেকে কোনক্রমে নিজেকে মুক্ত করে উদভ্রান্তের মত ছুটতে ছুটতে সুলতানের কাছে উপস্থিত হ’ল। ঠিক তখনই উজিরের সঙ্গে সুলতানের কথা হচ্ছিল। সুলতান বললেন—উজির, আমার কলিজার সমান কামার অল-জামান-এর জন্য আমার খুব খারাপ লাগছিল। সারারাত্রি ঘুমােত পারিনি। অস্থিরভাবে পায়চারি করে বেড়িয়েছি। কেবল মনে হয়েছে, আমার জামান না জানি সে পোড় বাড়ির অন্ধকার কুঠরিতে কত কষ্টই না পাচ্ছে। উজির ম্লান হেসে বলল-“কেন ঝুটমুট শাহজাদার জন্য ভেবে কষ্ট পাচ্ছেন? সে আপনার প্রাসাদের চেয়ে কোন অংশে কম আরামে নেই। এমন সময় সাব্বাব দরবার কক্ষের দরজায় পৌছেই বলল—“জাঁহাপনা, মহা সর্বনাশ ঘটে গেছে। শাহাজাদার দিমাক খারাপ হয়ে গেছে। একদম পাগল বনে গেছেন।
—“দিমাক খারাপ হয়ে গেছে? পাগল বনে গেছে? বুঝলি কি করে?
—জাহাপনা সকালে বিছানা থেকে নেমেই শাহাজাদা আমাকে বললেন-কাল রাত্রে যে লেড়কিটি আমার সঙ্গে রাত্রি কাটিয়ে গেল, সে কোথায়?’ ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে সাব্বাব বলল—“আমি বার বার বলতে লাগলাম, হুজুর, এখানে লেড়কি কোথেকে আসবে? কেউ আসে নি, আসতে পারে না। ব্যস আমার ওপর চড়াও হলেন। আমি যেন সবকিছু জেনেও তাঁর কাছে গােপন করছি এরকম ভাব নিয়ে আমাকে বেদম মারধাের শুরু করে দিলেন। মেরে আমার হাড্ডি গুঁড়াে গুঁড়াে করে দিয়েছে জাঁহাপনা। এবার হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল—এমন এলাে পাথাড়ি ঘুষি চালাতে লাগল যে, এই দেখুন নাক ফেঁটে খুন ঝরছে, দু’দুটো দাঁত ভেঙে গেছে।
সুলতান গুলিখাওয়া শেরের মত তর্জন-গর্জন শুরু করলেন—“উজির, তুমিই যত সর্বনাশের মূল! তােমার কুমতলব শুনতে গিয়েই আমি নিজে হাতে নিজের পায়ে কুড়ুল মারলাম। আমার সুস্থ-স্বাভাবিক বেটার দিমাক খারাপ করে দিলাম। তােমার গােরে যাবার দিন ঘনিয়ে আসছে উজির। তােমাকে উচিত শিক্ষা আমি দিয়ে ছাড়ব। যাও, গােরে যাবার আগে শেষ কাজটুকু করে যাও। তাড়াতাড়ি গিয়ে দেখ বেটার আমার কি হাল হ’ল।।
বৃদ্ধ উজির লম্বা লম্বা পায়ে সে পোড় বাড়ির চিলে কোঠায় হাজির হল। দরজায় পোঁছেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে বাধ্য হ’ল। দেখে শাহজাদা কামার অল-জামান কোরাণ পাঠ করছে। প্রশান্ত স্বাভাবিক তার দিল কোরাণ-এর শ্লোকের মধ্যে আত্মমগ্ন।
এমন সময় বেগম শাহারাজাদ বুঝলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই ভােরের আলাে ফুটে উঠবে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন। বাদশাহ তাঁর কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলেন।
একশ’ সাতাশিতম রজনী
রাত্রি একটু গভীর হলে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তাঁর কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, উজির জামান-এর পাশে দাঁড়িয়ে তার মিষ্টি-মধুর কণ্ঠের কোরাণ পাঠ শুনতে লাগল। কোরাণ-এর প্রতি তার এ-মুহূর্তে অন্ততঃ আকর্ষণ নেই। যার গদান যেতে বসেছে তার কাছে কোরাণ পাঠ তাে ভাল লাগার কথাও না।
কোরাণ থেকে মুখ তুলেই জামান উজিরকে বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুচকি হেসে বলল—“কেমন আছেন উজির সাহেব? আপনার তবিয়ত আচ্ছাতাে?
—শাহজাদা, তােমাকে দেখার পর আমার কলিজা ঠাণ্ডা হ’ল। 'এখন মালুম হচ্ছে, গানটি এ-যাত্ৰা বুঝি রক্ষা পাবে। সাব্বাব-এর মুখে তােমার কথা শুনে
‘সাব্বার? কেন, কি বলেছে সাব্বার ? উজির হাত কচলে বলল-“খুবই মন্দ কথা শাহজাদা। হতচ্ছাড়াটি বলে কিনা তােমার দিমাক বিলকুল খারাপ হয়ে গেছে! তুমি নাকি বলেছ, তােমার কামরায় কাল রাত্রে কোন্ লেড়কি ছিল— | তাকে কথাটি শেষ করতে না দিয়েই জামান বলল-“উজির সাহেব, শুধু আমার কামরায়ই নয়, আমার পালঙ্কে ? আমার কাছাকাছি পাশাপাশি শুয়ে লেড়কিটি রাত্রি কাটাল। আর বলে কিনা, সাব্বাব কিছু জানে না? উজির সাহেব, আমার সাফ কথা শুনুন, যা সত্যি তাই বলবেন, বুজরুকির আশ্রয় নেবেন না। আপনিই কারসাজি করে আব্বাকে দিয়ে এখানে আমাকে কয়েদ করে রেখেছেন। তারপর আমার ঘুমের মধ্যে লেড়কিটিকে প্রায় উলঙ্গ করে আমার পাশে পালঙ্কের ওপর শুইয়ে দিয়েছিলেন। ভাের হবার আগেই তাকে আবার হাফিস করে দিয়েছেন। এত কিছুর পরও বলতে চান আপনারা আমার সঙ্গে মজাক করছেন না? আব্বাজানের সঙ্গে গােপন আঁতাত করে আপনি এসব বুজরুকি করে চলেছেন। আব্বাজান আপনাকে শূলে না চড়ালেও আমি আপনাকে কোতল করব, বলে রাখছি। এখনও সময় আছে, সাফ সাফ বলুন। সে খুবসুরৎ লেড়কিটিকে কোথায় হাফিস করেছেন?
জামান-এর বাত শুনে বৃদ্ধ উজিরের কলিজা তাে শুকিয়ে একেবারে কাঠ। সে যেন একেবারে আসমান থেকে পড়ল-
খােদা মেহেরবান! শাহজাদা তুমি এসব কি বলছ! কি হয়েছে তােমার, খােলসা করে বল তাে? কাল রাত্রে কি তােমার ভাল নিদ হয় নি? খােয়াব টোয়াব কিছু দেখেছিলে কি? তাজ্জব কোন খােয়াব দেখেছিলে? প্রহরীরা চারদিকে সর্বদা টহল দিচ্ছে। এর মধ্যে লেড়কি এলই বা কি করে, গেলই বা কোন্ কৌশলে? দিমাক ঠাণ্ডা কর। নইলে সবাই বলবে তােমার দিমাক গড়বড় হয়েছে, পাগল হয়ে গেছ।
—‘পাগল এখনও হইনি। তবে আপনাদের মত বেতমিসদের পাল্লায় পড়ে পাগল হওয়া কিছুমাত্র বিচিত্র নয়। আমার চোখ দুটো দিয়ে তাকে আমি স্পষ্ট দেখেছি, এ হাত দুটো দিয়ে তাকে স্পর্শ করেছি, তার শরীরের খুসবু আমি নাক দিয়ে স্পষ্ট অনুভব করেছি আর বলছেন কিনা আমি খােয়াব দেখেছি! বেতমিস বেআক্কেল শয়তান কাহিকার।'
কথা বলতে বলতে জামান বৃদ্ধ উজিরের মুখে আচমকা সজোরে এক ঘুষি লাগিয়ে দেয়। চোখের পলকে উজির মেঝেতে পডে যন্ত্রণা ও আতঙ্কে কাৎরাতে লাগল। চোখ গােল গােল করে আল জামান বলে উঠল--"শয়তান কাহিকার। সাফ সাফ বলুন, সে-লেড়কিকে কোথায় লুকিয়েছেন? নইলে আপনার জান খতম করে দেব। এবার সজোরে মাথায় করাঘাত করল, নিজে হাতে নিজের চুল টানতে টানতে বল্ল-শয়তানগুলাে আমাকে পাগল করার মতলব এঁটেছে! বৃদ্ধ উজির মেঝেতে পড়ে কাতরাতে কাতরাতে বলল‘শাহজাদা, গােসা করবে না। যা ঘটনা সাফ সাফ তােমাকে বলছি—‘সুলতানের পরামর্শে আমাকে একাজ করতেই হয়েছে। তিনি লেড়কিটিকে তােমার কাছে পাঠিয়ে বুঝার কোশিস করেছেন তার প্রতি তােমার আকর্ষণ কতখানি। যদি দেখা যায় তুমি তাকে পছন্দ করছ, তবে তার সঙ্গে তােমার শাদী'
—শাদী দেবেন? শাদীই যদি দেবেন তবে আর এত দেরী করছেন কেন? আব্বাজীর কাছে যান, পরামর্শ করুন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শাদীর বন্দোবস্ত করুন।।
বৃদ্ধ উজিরের মুখে হাসি ফুটল। বুঝল, দাওয়াইয়ে কাজ হয়েছে। কৌশলটি প্রয়ােগ না করলে এ যাত্রায় আর জান বাঁচাবার ফিকির ছিল না। | বৃদ্ধ উজির ছাড়া পেয়ে যেন ধড়ে জান ফিরে পেল। আর মুহূর্তমাত্র দেরী না করে কোনরকমে কাতরাতে কাতরাতে দরবারে ফিরে এল। এবার হাঁপাতে হাঁপাতে বলল —“জাহাপনা, সর্বনাশ হয়ে গেছে! আপনার লেড়কা জামান সত্যি সত্যি উন্মাদ দশা প্রাপ্ত হয়েছে। এই দেখুন, বেধড়ক পিটিয়ে আমার হালৎ কি করে ছেড়েছে!
—কী সব আজেবাজে কথা বলছ উজির! পাগল.... উন্মাদ... আমি তাে কিছুই বুঝতে পারছি না। কী তাজ্জব কাণ্ড দেখ দেখি! আসল ব্যাপারটি আমাকে খােলসা করে বল তাে শুনি।
–‘জাহাপনা, তার বক্তব্য হচ্ছে, গতরাত্রে আপনি আর আমি ফন্দি করে তার পালঙ্কে বিবস্ত্র প্রায় এক লেড়কিকে রেখে এসেছিলাম। রাতভর নাকি লেড়কিটি তার পাশাপাশি শুয়েছিল। ঘুম থেকে জেগে তাকে দেখতে না পেয়ে তার দিমাক খারাপ হয়ে মাথায় খুন চাপে। হাতের কাছে সাব্বাবকে পেয়ে চেপে ধরে, বেদম প্রহার করে। তারপর হাজির হলাম আমি। চোখ মেলে তাকিয়েই সামনে আমাকে দেখেই রেগেমেগে একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে যায়। ব্যাস, শুরু করে এলােপাথাড়ি কিল-চড়-লাথি-ঘুষি।
–“উজির এতেই তােমার কলিজা শুকিয়ে গেল? তােমার নসীবে যে শেষ পর্যন্ত কি আছে তা একমাত্র আমিই জানি। তােমাকে কোতল করব। না, একটু একটু করে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারব তােমাকে। তােমার কু-পরামর্শেই আমার একমাত্র বেটার এ-হালৎ হয়েছে, অস্বীকার করতে পার? তুমি কিছুতেই আমার হাত থেকে ছাড়া পাচ্ছ না। এখন আমাকে নিয়ে সে পােড় বাড়িতে চল। নিজের চোখে আমার বেটার হালৎ একবারটি দেখে আসি।
সুলতান কামরায় ঢুকেই বেটাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। বার বার চুম্বন করে কিছুটা স্বস্তি লাভ করেন।
সুলতান এবার তার আদরের দুলাল, চোখের মণি একমাত্র বেটা জামানকে নিয়ে পালঙ্কে বসলেন। জামান প্রথমে আব্বাজানের পাশে বসতে একটু দ্বিধা করছিল বটে। কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
সুলতান বেটার মুখের দিকে মুহুর্তের জন্য তাকিয়ে নিয়ে রাগে গসগস করতে করতে উজিরকে বললেন—“তােমার মত মিথ্যবাদী প্রবঞ্চক দ্বিতীয় আর একটি নেই। আমার সুস্থ-স্বাভাবিক বেটাকে তুমি বলছ কিনা—তােমাকে আমি রেহাই দিচ্ছি না।'
সুলতান এবার বেটা জামান-এর গায়ে-মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন—“বেটা, আজ কি বার, বল তাে?
—‘আব্বাজান, আজ তাে শনিবার। —বহুৎ আচ্ছা। আজ শনিবার হলে কাল কি বার হবে বেটা?’ রবিবার। —বহুৎ আচ্ছা!'সুলতান সবিনয়ে একবার বেটার মুখের দিকে পরমুহুর্তেই উজিরের দিকে তাকাতে লাগলেন।
এদিকে সুচতুর শাহাজাদা জামান তার আব্বাজানের আকস্মিক আচরণে বিস্মিত হয়। ভাবতে লাগল—আব্বাজান হঠাৎ এরকম কথা জিজ্ঞাসা করছেন কেন? অতি শৈশবে অবশ্য তাকে পাশে বসিয়ে তার আব্বাজান এরকম বহু প্রশ্নের মাধ্যমে তার বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা নিতেন। এবার সে নিঃসন্দেহ হ'ল-বুড়ােভাম উজিরটি নির্ঘাৎ তার আব্বাজানকে বলেছে, তার দিমাক গড়বড় হয়েছে, উন্মাদ দশা প্রাপ্ত হয়েছে। সুলতান এবার উজিরের মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তাকালেন। চোখের ভাষায় তিনি বুঝাতে চাইছেন—“উজির, তােমার কথা যে কতবড় মিথ্যা এর পরও তােমাকে প্রমাণ দেবার কিছু আছে?
বেগম শাহরাজাদ ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে কিসসা বন্ধ করলেন।
একশ’ অষ্টাশীতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর শুরু হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার অন্দর মহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাঁহাপনা, সুলতান মােটামুটি নিঃসন্দেহ হলেন, উজির তার বেটা জামান-এর সম্বন্ধে যা কিছু বলেছে, সব ঝুট বাৎ। বেটার সঙ্গে তিনি যেটুকু বাৎচিৎ করেছেন তাতে তাকে অন্ততঃ পাগল মনে করার কোন কারণ নেই। সুলতান আবার বেটার গায়ে-মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে সস্নেহে বললেন—‘বেটা এটা কোন মাহিনা? আরবী হিসাবের?
সুলতানের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে শাহজাদা জামান বলল —‘জেলক।
-এর পরের মাহিনা?’ —এর পর জেলহিজ্জা। —এর পর থেকে তাকে কথাটি শেষ করতে না দিয়েই শাহজাদা জামান বলতে লাগল—‘জেলহিজ্জার পরে মহরম’, এর পর রবিয়াল আউয়াল’ এরপর রবিয়াস্বাসি’, এরপর জামাদ আউয়াল’, এরপর ‘জামাদ স্বাসি', এরপর ‘রজব’, এরপর ‘শ্ববন, এরপর ‘রমজান’ এবং সব শেষে শ্বওয়াল।
শাহজাদা জামাল-এর বাৎ শুনে সুলতান একেবারে খুশীতে ডগমগ হয়ে গেলেন। দাঁত কিড়মিড় করে বললেন—উজির, আমি তাে মনে করছি, তুমি নিজেই একটি পাগল। বয়স হয়েছে। তােমার দিমাক এখন কাম কাজ ঠিক ঠাক করছে না। দরবার ছেড়ে বরং মক্কা-মদিনায় গিয়ে আল্লাতাল্লার নাম আর কোরাণ পাঠ করে শেষ ক'টি দিন গুজরান করগে। সুলতান আবার বেটা জামান-এর দিকে তাকিয়ে, আগের মতই সস্নেহে গায়ে-মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন—“বেটা, এ
বুড়া উজির আর সাব্বাব তােমার নামে কি সব যাচ্ছেতাই কথা বানিয়ে বানিয়ে বলেছে। গতরাত্রে তােমার ঘরে নাকি এক খুবসুরৎ লেড়কি ঢুকেছিল। তােমার পালঙ্কে, তােমার পাশে শুয়ে রাত্রি কাটিয়েছে। সকাল হলে তাকে না দেখে তুমি নাকি অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছিলে ? এমন কি তুমি সাব্বাব আর উজিরকে দারুণ মারধােরও নাকি করেছিলে? যত্তসব মিথ্যাবাদীর দল জুটেছে আমার নসীবে! সব ক'টিকে আমি শূলে চড়াব, কোতল করে ছাড়ব।”
শাহজাদা জামান এবার ক্ষীণকণ্ঠে বলল —“আব্বাজান, ব্যাপারটি নিয়ে অনেক জলই ঘােলা হয়েছে। এরকম রঙ্গ রসিকতায় আমার আর দিল নেই। সাফ কথা বলছি শুনুন—আপনি তাে আমাকে এতদিন শাদীর জন্য খুবই পীড়াপীড়ি করেছিলেন। আমি কিছুতেই মত দেই নি। লেড়কিদের সম্বন্ধে আমার মধ্যে যে ধারণা জন্মেছিল আজ বিলকুল বদলে গেছে। গত রাত্রে যে লেড়কিটিকে আপনি আমার কামরায়, আমার বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিলেন, তাকেই আমি শাদী করতে আগ্রহী। আপনি বন্দোবস্ত করুন। আমি আজই তাকে শাদী করব। তাকে দেখার পর থেকে আমার কলিজায় আগুন ধরে গেছে। তাকে দূরে রেখে একটি দিন গুজরানও আমার পক্ষে অসম্ভব। আজই শাদীর বন্দোবস্ত করে আমাকে রক্ষা করুন, বাঁচান।'
সুলতান তাে বেটার মুখ থেকে এরকম অপ্রত্যাশিত কথা শুনে রীতিমত স্তম্ভিত। মাথায় বাজ পড়ার উপক্রম। করুণ আর্তনাদ করে উঠলেন—‘খােদা মেহেরবান! আমার এ কী সর্বনাশ করলে! আমার একমাত্র বেটার দিমাক সত্যি সত্যি খারাপ হয়ে গেছে। এর একী হালৎ করলে খােদা! একে ছাড়া আমি কি করে জিন্দা থাকব! খােদা, এ কী করলে তুমি ?
সুলতান এবার লেড়কার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে সস্নেহে বলতে লাগলেন—‘বেটা ঘাবড়াও মাৎ। খােদার ওপর ভরসা রাখ। তার দোয়া হলে তােমার উন্মাদ দশা নিশ্চয়ই কেটে যাবে। তােমার কাধে কোন শয়তান ভর না করলে এমনটি তাে হবার নয়। রাত্রে নিশ্চয় গভীর নিদ হয় নি! নিদ গভীর না হলে অনেক সময় শিরে এসে হরেক কিসিমের চিন্তা ভাবনা ভর করে! এমনই সবাই খােয়াব টোয়াব দেখে থাকে। বেটা, আমি কথা দিচ্ছি, ভবিষ্যতে আর কোনদিন আমি তােমাকে শাদীটাদীর কথা বলব না। কোন জোর জুলুমের তাে প্রশ্নই ওঠে না। বেটা, তুমি দিমাক ঠাজ্ঞা কর। সুস্থ স্বাভাবিক দিল ফিরে পাও। ব্যস, খােদাতাল্লার কাছে আমার আর কিছু চাইবার নেই।'
শাহজাদা কামার অল-জামান-এর দু’চোখের কোল বেয়ে পানির ধারা নেমে এল। সে ডুকরে ডুকরে কেঁদে বল্ল‘আব্বাজান, তামাম দুনিয়ায় যত আদমি আছে তাদের মধ্যে আমি, আপনাকে সবচেয়ে বেশী পেয়ার করি। শ্রদ্ধাও করি সবচেয়ে বেশীই। আপনি খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে একটিবার মাত্র বলুন, গতরাত্রে আমার কামরায়, আমার পালঙ্কে শুয়ে যে লেড়কিটি রাত কাটিয়েছিল—তার সম্বন্ধে আপনার কিছু জানা নেই।
সুলতান হতভম্বের মত বেটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
শাহজাদা জামান এবার বলল —‘হা আব্বাজান, আপনি লেড়কিটির ব্যাপারে কিছুই জানেন না, একথাটিই শুধুমাত্র আমি শুনতে চাই। আপনার বাৎ শােনার পর আমি প্রমাণ দেব, কোন লেড়কি কাল আমার কামরায় রাত্রি কাটিয়েছিল কিনা।
—“বেটা, খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি, কোন লেড়কি বন্দোবস্ত করা তাে দূরের কথা, এমন কি কিছু জানিও না। শাহজাদা জামান এবার নতমুখে, ক্ষীণকণ্ঠে বলতে লাগল। ‘আব্বাজান, গতরাত্রে—চতুর্থ প্রহরে হঠাৎ আমার নিদ টুটে গেল। আধা নিদের অবস্থা। হঠাৎ মনে হল আমার ওপরে উঠে কোন এক লেড়কি লাফালাফি দাপাদাপি করছে। তখন আমার হালৎ এমন ছিল না যে লেড়কিটিকে সরিয়ে দেই বা উঠে বসি। কখন যে আবার নিদ এসে গিয়েছিল আমি ঠাহরই করতে পারি নি। অনেক বেলায় আমার নিদ টুটল। লেড়কিটি বেপাত্তা। এদিক - ওদিক তাকালাম, হদিস মিলল না। তখনই লক্ষ্য করলমা, আমার তলপেটে শুকনাে খুন। অবাক মানলাম। তারপর হামামে গিয়ে ভাল করে গােসল করলাম। চলুন, হামামে গেলে এখনও তার চিহ্ন কিছু না কিছু দেখতে পাবেন।
শাহজাদা জামান এবার ডান-হাতের তর্জনিটি সুলতানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল—“আব্বাজান, আপনি কি আগে কোনদিন আমার হাতে এ -অঙ্গুরীয় দেখেছিলেন, বলুন? এটি কোন না কোন লেড়কির। আর আমার আঙুলে যে - হীরার অঙ্গুরীয় ছিল তা গায়েব হয়ে গেছে।
সুলতান গম্ভীর মুখে দীর্ঘ সময় ধরে চিন্তা করলেন। এক সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—সবই তাে বুঝলাম বেটা। কিন্তু তুমি যেসব প্রমাণ দাঁড় করিয়েছ তা-ও যথেষ্ট নয়। ব্যাপারটি নিয়ে ভাল করে ভাবনা চিন্তা করতে হবে।
এমন সময় ভাের হয়ে আসছে অনুমান করে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
এক শ’ নব্বইতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় যামে বাদশাহ শারিয়ার অন্দর মহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন।
বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, লেড়কার বাৎ শুনে সুলতান যারপরনাই ভাবিত হলেন। ব্যস্ত পায়ে হামামে গেলেন। দেখলেন, জমাটবাঁধা খুন মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আর কিছু পানির সঙ্গে ধুয়ে গেছে।
সুলতান ভেতরে ভেতরে গর্জাতে লাগলেন—শয়তান উজিরই এর মূলে। আর লেড়কিটি দেহে খুবই তাগদ ধরে।
সুলতান লেড়কার কামরায় ফিরে গেলেন। গুম হয়ে বসে রইলেন কিছু সময়। তারপর এক সময় আহত শেরের মত গর্জে উঠলেন—‘উজির, নির্ঘাৎ তােমারই শয়তানি এটি। তােমার জন্যই আমার বেটার এ - হাল হয়েছে। তুমিই গত রাত্রে শয়তানি করে কোন এক লেড়কিকে এ - কামরায় পাঠিয়েছিলে।
বৃদ্ধ উজির সুলতানের পা জড়িয়ে ধরে বলল—“জাহাপনা, আমি এসবের বিন্দু বিসর্গও জানি না। কোরাণ ছুঁয়ে, খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে আমি বলতে পারি, লেড়কির ব্যাপার স্যাপার কিছুই আমার জানা নেই।
সুলতান এবার সাব্বাব’কে তলব করলেন।
সাব্বাব খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে সাফ সাফ জবাব দিল—জাহাপনা, লেড়কির ব্যাপার স্যাপার কিছুই আমি জানি না ।
সুলতান দিশেহারা হয়ে পড়লেন। এতবড় একটি ব্যাপার ঘটে গেল, অথচ কেউ জানে না! রহস্য তবে। গভীর এক রহস্য এর পিছনে কাজ করে চলেছে। কিন্তু কি করে এ - রহস্যের জট ছাড়ানাে যেতে পারে, তিনি আপন মনে ভেবে চললেন।
শাহজাদা কামার অল-জামান এবার চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল —“আব্বাজান, আমি কোন বাৎ শুনতে চাই না। ওই লেড়কিকে আমার চাই-ই চাই। ওকে আমি শাদী করব। ওকে ছাড়া
( চলবে )

0 Comments