আরব্য রজনী পার্ট ৫৪ ( Part 54 ) Alif laila part 54

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
সামস অল-নাহার এবার চোখের পানি মুছতে পর্দার আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায়। নিজেকে একটু সামলে নেবার চেষ্টা করে। আলী ইবন আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। লম্বা লম্বা পায়ে পর্দা ঠেলে তার মুখােমুখি গিয়ে দাঁড়ায়।

সামস অল-নাহার হাত দুটো দিয়ে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আচমকা আলী ইবন এর বুকের ওপরে পড়ে গেল। হাত দুটো দিয়ে জড়িয়ে ধরল তার যৌবন ও পৌরুষভরা শরীরটিকে। ক্রমে তার হাত দুটো সুদৃঢ় হয়ে আসতে লাগল। দৃঢ়.... আরও.....আরও দৃঢ়ভাবে জাপটে ধরল তাকে। নিটোল স্তন দুটোকে তার প্রশস্ত বুকের চাপে দলিত পিষ্ট করে ফেলতে চাইছে। তার দেহে যেন দৈত্যের শক্তি ভর করেছে। যৌবনজ্বালা তাে এমন করে আগে কোনদিন তাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেয় নি। ইতিপূর্বে প্রৌঢ় খলিফাকে বহুবার দেহদান করেছে বটে। কিন্তু আজকের মত দিল দরিয়া হয়ে নিজেকে পুরােপুরি বিলিয়ে দিতে পারে নি। কিন্তু আজ-এ নওজোয়ান আলী ইবনকে দিল নিঃশেষে উজাড় করে দেওয়ার জন্য যেন সে উন্মাদিনীর প্রায় হয়ে উঠেছে। পর মুহুর্তেই আলী ইবন নিজেকে মুক্ত করে নেয়। ঢুকে যায় কামরার ভেতরে। অনিশ্চিত আশংকা তার মন প্রাণ জুড়ে বসল। ভাবল, সদ্য যে ঘটনাটি ঘটে গেছে তা নির্ঘাৎ প্রাসাদের সবাই জেনে গেছে। এসব কথা বাতাসের কাঁধে ভর দিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আবুল হাসান এতক্ষণ কোথায় গা-ঢাকা দিয়েছিল, কে জানে। সে হঠাৎ ঘরে ঢুকে বলল —‘তােমাকে তলব করেছে। যাও, ঘুরে এসাে আলী ইবন এবার আবুল হাসান-এর পিছন পিছন সুসজ্জিত একটি কামরায় ঢুকল। রূপসী সামস অল-নাহার দরজার দিকে মুখ করে পালঙ্কের ওপরে মনলােভা ভঙ্গিতে বসে। আলী ইবন এর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে মুচকি হেসে অভ্যর্থনা জানাল।

সামস অল-নাহার এবার আবুল হাসান-এর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল —“তােমাকে সামান্য সুকরিয়া জানিয়ে বা মৌখিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ছােট করার কোশিস আমি করব না। তবে একথা স্বীকার না করলে খােদাতাল্লার কাছে অপরাধী হতে হবে, একমাত্র তােমার জন্যই আমি এ-অমূল্য রতন লাভ করেছি। জিন্দেগীকে নতুন করে ভােগ করার পথের হদিস পেয়েছি। দেহদান-সম্ভোগ আর পেয়ার মহব্বতের মধ্যে যে আসমান-জমিন ফারাক আজই তা আমি প্রথম উপলব্ধি করার সুযােগ পেলাম। সবই কিন্তু তােমারই অবদান, আবুল হাসান শুধু এটুকু জেনে রাখ, আমি নিমকহারাম বেইমান নই। তােমার কথা আমার দিলে গাঁথা থাকবে।

‘মালকিন, আপনি যে মুখে বললেন, আমার কথা স্মরণে রাখবেন তা শুনেই আমি ধন্য ও যারপরনাই খুশি।

সামস অল-নাহার এবার আলী ইবনকে লক্ষ্য করে ভাব বিমুগ্ধ স্বরে বলল—‘মেহবুব আমার! তােমার পেয়ার মহব্বৎ নিখাদ। আমি বুঝেছি। আর তা বুঝেছি বলেই তােমাকে আমার বুকের সর্ব শীর্ষে স্থান করে দিয়েছি। লেড়কিরা অনেককে বুকে তুলে নিতে পারে বটে। কিন্তু এখানে? কেবলমাত্র একজনের জন্যই এটি খালি রেখে দেয়। কারাে বা জিন্দেগীই কেটে যায়। কিন্তু এ স্থানটি ফাকাই রয়ে যায়। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলল-মেহবুব, মাত্র কয়েক ঘণ্টার পরিচয়ে তুমি আমার বুকের সে-বিশেষ স্থানটিতে স্থায়ী আসন লাভ করে ফেলেছ।' আবার গান-বাজনা শুরু হয়। এক নিগ্রো ক্রীতদাসী সরাবের বােতল ও পেয়ালা দিয়ে গেল। সামস অল-নাহার মেহমান আবুল হাসান এবং আলী ইবনকে নিজে হাতে সরাব পরিবেশন করল। সৱাবের নেশা একটু একটু করে তাদের দেহে ভর করতে লাগল।

এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

         একশ’ চুয়ান্নতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় যামে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কোন রকম ভূমিকার অবতারণা না করেই তার কিসসার পরবর্তী অংশটুকু বলতে শুরু করলেন---জাহাপনা, সামস অল-নাহার তার মেহমান আবুল হাসান এবং আলী ইবনকে নিজের হাতে সরাব পবিবেশন করল এবং নিজেও এক পেয়ালা গলায় ঢালল। এবার তার মেহবুবকে সুললিত কণ্ঠের গান শােনাবার জন্য তৎপর হ’ল। কী মিষ্টি-মধুর তার গলা! আর গানার কথা ও সুর দিলকে আকুল করে দেয়।

আলী ইবন তন্ময় হয়ে তার মেহবুবার কিন্নরকণ্ঠের গান শুনতে লাগল। তারা কতক্ষণ যে এমন বিভাের হয়ে সুরের সায়রে ডুবেছিল নিজেরাই তা জানে না। তারা এমন এক জগতে পৌছাল যেখানে শুধুই গানা আর গানা। মন থেকে নিঃশেষে মুছে গেল তাদের দিনারের পাহাড়ের কথা, সওদাগরী কারবারের কথা আর উজির নাজির ও আমীর-ওমরাহদের সঙ্গে তার হৃদ্যতার সম্পর্কের কথা। এমন কি সে যে এ-দুনিয়ারই একজন সেকথাও কোন্ অতল অন্ধকারে তলিয়ে গেল।

এক সময় মাত্রাতিরিক্ত আনন্দ-উচ্ছাসে আলী ইবন-এর দু’চোখের কোল বেয়ে নেমে আসে পানির ধারা। কান্নায় ভেঙে পড়ে। শিশুর মত ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। উদভ্রান্তের মত আবুল হাসানকে আলিঙ্গন করে বলতে লাগল—“দোস্ত এ কী করলে তুমি? কোথায় নিয়ে এসেছ আমাকে? কেন নিয়ে এসেছ? জীবনে যে এত গান আছে, সুর আছে আর আছে আনন্দ তা জানতাম না—সে-ই তাে অনেক ভাল ছিল। আমার একটি মাত্রই ডর এক সময় না এক সময় এ-মধুরতম রাত্রি ফুরিয়ে যাবে। স্তব্ধ হয়ে যাবে সুমধুর সঙ্গীত লহরী—তখন, তখন কি নিয়ে বাঁচব।

দোস্ত?

-তােমাকে নিয়ে আর পারি না দোস্ত! ভবিষ্যতের কথা ভেবে তুমি বর্তমানের আনন্দমুখর রাত্রিটিকে অস্বীকার করবে? এমুহুর্তে যে-অমৃতের স্বাদ পেলে কাল যদি তার তিলমাত্রও অবশিষ্ট না থাকে । তাতেই কি আসে যায়। আজকের মজাটুক আকণ্ঠ পান করে নাও, কালকের ভাবনা কালই আবার নতুন করে ভাবা যাবে।

আবুল হাসান কথা বলতে বলতে দু’খানা বাঁশি হাতে তুলে নিল। একটি বাঁশি নিজের হাতে রাখল আর দ্বিতীয়টি আলী ইবন এর হাতে দিয়ে বলল-“দোস্ত, বাজাও। এসাে আমরা রূপসী নাহার এর সঙ্গে সুর মিলিয়ে বাজাই, নাচি—মজা লুঠি।

এমন করে সুরের সায়রে সবাই যখন আকণ্ঠ নিমজ্জিত ঠিক তখনই প্রধান ফটক থেকে খবর এসেছে—মাসরুর হাজির। শুধুমাত্র সে-ই নয়, সঙ্গে আফিফ-ও রয়েছে। আর কয়েকজন খােজা রক্ষী। সামস অল-নাহার এবার আলী ইবন এবং আবুল হাসানকে লক্ষ করে বলল—‘মাসরুর প্রধান ফটকে অপেক্ষা করছে। তােমাদের সঙ্গে বাৎচিৎ করতে এসেছে।

মাসরুর-এর নাম শুনেই আলী ইবন এবং আবুল হাসান যেন সম্বিৎ ফিরে পেল। চোখ-মুখ মুহুর্তের মধ্যে চকের মত ফ্যাকাশে হয়ে এল।

সামস অল-নাহার পরিস্থিতি সম্বন্ধে আঁচ করতে পেরে নিজে থেকেই বলল—“থাক, তােমাদের এ নিয়ে ভাবতে হবে না। যা করার আমিই করছি। আমি নিজেই যাচ্ছি মাসরুর-এর মােকাবেলা করতে।

আলী ইবন আর আবুল হাসানকে কামরার ভেতরে রেখে বাইরে থেকে দরজায় তালা লটকে দেওয়া হ’ল। আর দাসদাসী' নফরবাদী সবাই অনেক আগেই নীরবে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। সামস অল-নাহার সদর-দরজার দিকে এগিয়ে যায় মাসরুর মেজাজ ঠাণ্ডা করতে। কামরার দরওয়াজা-জানালা সব বন্ধ। আলী ইবন গোমড়া মুখে বসে রইল। আবুল হাসান তার কাধে হাত দিয়ে তাকে প্রবােধ দিতে গিয়ে বলল-“দোস্ত, বিপদ যখন মাথার ওপর তখন ভেঙে পড়ার অর্থই হ’ল বিপদের হাতে আত্মসমর্পণ করা। দিলকে শক্ত কর। সােজা হয়ে খাড়া হও। খােদাতাল্লার ওপর ভরসা রাখ।

আলী ইবন ফোস করে উঠল—‘খােদাতাল্লা! খােদাতাল্লা কি বলে দিয়েছেন, যাও হে লেড়কিদের নিয়ে মজা লুঠো?’

-দোস্ত, মাথা ঠাণ্ডা কর। ধৈর্যে বুকবাঁধ। মহব্বতের পথ মােটেই মসৃণ নয়। বন্ধুর—একেবারেই বন্ধুর। সতর্কতার সঙ্গে ধীর পদক্ষেপের মাধ্যমে যে ধৈর্যের পরিচয় দিতে পারে একমাত্র সেই মহব্বতের ফয়দা লুঠতে পারে।

সামস অল-নাহার বাগিচায় গিয়ে এক শ্বেতপাথরের বেদীর ওপর বসল। এক বাদীকে বল্ল মাসরুরকে তার কাছে নিয়ে আসতে। খলিফার দেহরক্ষী। নিজে তার সঙ্গে ফটকে গিয়ে মােলাকাৎ করা তার পক্ষে ইজ্জৎহানির ব্যাপার। মাসরুর সামস অল-নাহার-এর তলব পেয়ে বাগিচায় তার সামনে হাজির হয়ে সালাম জানাল। কিন্তু এরকম নগ্নপ্রায় অবস্থায় তাকে দেখবে ঘুণাক্ষরেও ভাবে নি। সে ধরতে গেলে ঘাড় ঘুরিয়ে অন্যদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বলল —মালকিন, খলিফা আপনাকে স্মরণ করেছেন, খবরটি দিতে এসেছি। বহু দিন আপনার সঙ্গে মােলাকাৎ নেই। তাই তার দিল উতলা। তিনি বলে পাঠিয়েছেন, সে যদি নিজে আসে, বহুৎ আচ্ছা। সঙ্গে করে আমার কাছে নিয়ে আসবি। আর যদি আমাকে যেতে বলে তবে আমি গিয়ে তার সঙ্গে মােলাকাৎ করব।

সামস অল-নাহার আমতা আমতা করে বলল—তাকে আমার নাম করে বলবে, তিনি যদি বাঁদীর কামরায় হাজির হন তবে আমি খুবই খুশী হ'ব। মাসরুর সালাম জানিয়ে বিদায় নিল।

এবার সামস অল-নাহার উন্মাদিনীর মত ছুটে গিয়ে ওই ঘরের ভেতর ঢুকল। আলী ইবন-এর বুকের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। কান্নাভেজা কন্ঠে বলল —আলী, মেহবুব আমার। কেন তুমি আমার বুকে এমন করে আগুন ধরিয়ে দিলে? কেন এমন করে মহব্বতের বাতি জ্বালিয়ে দিলে? তােমার সঙ্গে কেনই বা আমার মােলাকাৎ হ’ল! নইলে গােরে যাওয়ার আগে পেয়ার মহব্বত কি বস্তু আমার মালুম ছিল না। শুধু জানতাম পুরুষকে খুশী করার জন্যই লেড়কিদের জন্ম। শুধুই দেয়া, কিছুই পাওয়ার নেই। আজ তুমি আমাকে প্রথম শিখালে দেয়ার মাধ্যমেই পাওয়াও যায়। কিন্তু নসীবের ফের তােমাকে আমি কাছে রাখতে পারব না। যাকে চাই তাকে পাব না। কিন্তু যাকে আমার দিল চায় সে আমার এ-শরীরটিকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে—অসহ্য! চমৎকার খােদাতাল্লার মর্জি।

আলী ইবন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবেগ মধুর স্বরে বলল—“ফিন মিছে চোখের পানি ফেলছাে! তােমার আলী তােমারই থাকবে। যখন, যেখানেই থাক না কেন, তােমার তসবির তার বুকে আঁকা থাকবে। দিলের আয়নায় তােমাকে সে দেখবে আর তােমার কথা ভাববে। মেহবুবা, আমি আজ যেমন তােমার তেমনি ভবিষ্যতেও তােমারই থাকব। খােদার নামে কসম খেয়ে বলছি, আমার জীবন-যৌবনে তুমিই একমাত্র নারী। পহেলা মহব্বতের মুহুর্তে আমি আমার সবটুকু পেয়ার-মহব্বত নিঃশেষে-উজাড় করে তােমাকে দিয়ে দিয়েছি। অন্য কারাে জন্য একতিলও সঞ্চয় করে রাখিনি।' এমন সময় এক খােজা ছুটে এসে সামস অল-নাহারকে খবর দিল, খলিফা হারেমে আসছেন।

খলিফার আগমনবার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামস অল-নাহার শেষবারের মত তার মেহবুব আলী ইবনকে বুকে জড়িয়ে ধরল। এবার বাদীদের লক্ষ্য করে বলল —‘প্রাসাদের ওদিকে ফটকটি খুলে খলিফাকে অভ্যর্থনা জানাও। আমি তৈরী হয়ে যাচ্ছি।'

এবার সামস অল-নাহার এর নির্দেশে এক ক্রীতদাসী আলী ইবন ও আবুল হাসানকে নিয়ে এমন একটি কামরায় ঢুকিয়ে দরওয়াজা বন্ধ করে দিল যেখান থেকে বাদশাহ যে ঘরে অবস্থান করছে সে-ঘরটি স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু সে-ঘরের কেউ-ই বহু চেষ্টা করেও তাদের দেখতে পাবে না।  আলী ইবন ঘরে ঢুকেই আবুল হাসানকে বলল —“দোস্ত কামরাটি যে আন্ধার! চোখে কিছুই মালুম আসছে না।' _ আবুল হাসান হাতড়ে একটি কুরশি পেয়ে বসতে বসতে বলল—এখন জমাটবাঁধা আন্ধার বটে। কিন্তু একটু বাদেই চোখে সয়ে যাবে। তখন হয়ত সবই মালুম হবে। যে-ক্রীতদাসীটি তাদের ঘরে নিয়ে এসেছে সে গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিসিয়ে বল্ল–আপনাদের তকলিফ হবে ঠিকই কিন্তু বাত্তি জ্বালানাে যাবে না। খলিফার নজরে পড়লে কেলেঙ্কারী হয়ে যাবে। একটু ধৈর্য ধরুন। এ-ঘরে আন্ধার বটে কিন্তু এরই মুখােমুখি খলিফার ঘরে বাত্তির মেলা বসেছে। বাত্তির রােশনাইয়ে হাসান ও আলী জানালার শার্সিতে চোখ রেখে খলিফার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখল।

খলিফার ঘরের দরওয়াজায় পৌঁছে সামস অল-নাহার নতজানু হয়ে কুর্ণিশ সেরে বলল —‘খােদা আপনার ভালই করুন।

সামস অল-নাহার খলিফার কাছে এগিয়ে গেল। খলিফা তাকে আলিঙ্গন করল। চুম্বন করতে গিয়েও মুখটি সরিয়ে নিয়ে বল্ল-চল, ছাদে গিয়ে খােলা আশমানের নিচে বসি।

উন্মুক্ত ছাদ। একদিকে প্রমত্তা টাইগ্রিস নদী, অন্যদিকে ফুল ও ফলের বাগিচা। মাথার ওপরে অতন্দ্র প্রহরী শুক্লপক্ষের চাঁদ। বাতাসে জানা-অজানা ফুলের খুসবু দিলকে উদাস ব্যাকুল করে দেয়। তারই মাঝখানে রুপাের মসনদে খলিফা উপবেশন করল। পাশে রক্ষিত অন্য একটি আসন দখল করে সামস অলনাহার। ছাদ জুড়ে নরম গালিচা বিছানাে। সামস অল নাহার কণ্ঠস্বর সাধ্যমত মিষ্ট করে বল্ল‘খােদাতাল্লার অশেষ মেহেরবানী যে আজ আপনাকে কাছে পেলাম জাহাপনা। আপনার বিরহজ্বালায় আমি প্রতিনিয়ত দগ্ধ হই। মানুষ তাে অনেক কিছুই চায় কিন্তু পায় কতটুকু? আর আপনাকে কাছে পেতে চাইলেই আমি পাব কেন? আর চাওয়াও তাে সঙ্গত নয়।

খলিফা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল—‘সঙ্গত নয়! কেন? কেন সঙ্গত নয় ?

—“তাহলে নিতান্ত স্বার্থপরতার পরিচয় দেওয়া হবে জাঁহাপনা।

–‘স্বার্থপরতা? কিসের স্বার্থপরতা? এর মধ্যে আবার স্বার্থপরতা বা আসে কোত্থেকে?

‘জাঁহাপনা, আপনি তাে আর আমার একার নন যে, চাইলেই পাব। নিজের খুশীমত, প্রাণভরে আপনাকে পাবার জন্য উদ্বেল হ'ব। আপনার হারেমে যে আমার মত রূপসীদের হাট বসিয়েছেন। তবু যে মাঝে-মধ্যে এ বাঁদীর কাছে ছুটে আসেন তার জন্য খােদাতাল্লাকে সুকরিয়া জানাতেই হয়। তার মেহেরবানি ছাড়া- 

–নাহার, তােমার কাছ থেকে আমি পেয়েছি বহুৎ কিছু। কিন্তু বিনিময়ে কতটুকুই বা দিতে পেরেছি? আমি তােমার ব্যাপারে একেবারে উদাসীন যদি ভেবে থাক তবে অবিচারই করা হবে। তােমার নিঃসঙ্গতার ব্যথা, মর্মবেদনা আমি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করি। কিন্তু খলিফার কর্তব্যনিষ্ঠা আমাকে তােমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। শােন, আমার হারেমে হাজার বাঁদী-বিবি থাক না কেন আমার নাহার একজনই। আমি যে তােমার, শুধুই তােমার।

ইতিমধ্যে একদল খুবসুরৎ লেড়কি ঘরে ঢুকল। তাদের সুরৎ যেমন আকর্ষণীয় তেমনি তাদের সােনার জরির কাজ করা ঝলমলে পােশাক। তবে তার পরিমাণ খুবই কম। দেহের খুব কম জায়গাই তারা আবৃত রেখেছে। যেটুকু ঢেকে ঢুকে না রাখলে ইজ্জৎ বাঁচে না, ব্যস সেটুকুর ওপরে মিহিজালের কাপড়ে তৈরী আচ্ছাদন চাপিয়ে দেওয়া রয়েছে।

সামস অল-নাহার এর নির্দেশে রূপসীরা গানা ধরল। বিরহ সঙ্গীত। প্রেমের সঙ্গীত গানার মধ্য দিয়ে বিরহজালা যেন উপচে পড়ছে। আলী ইবন ও আবুল হাসানকে ক্রীতদাসীটি বল্ল-হুজুর, বেগম সাহেবা লেড়কিদের এ-গান গাইতে বলল কেন, বলতে পারেন? তার কলিজার জ্বালা। তার দিলের দর্দ আপনার কাছে পেীছে দেবার জন্য। আপনি তার দিল কেড়ে দেউলিয়া করে দিয়েছেন। এখন আপনার বিরহে তার দিন গুজরান কি করে সম্ভব?

এমন সময় বেগম শাহরাজাদ ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে কিসসা বন্ধ করলেন।

                একশ’ পঞ্চান্নতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাহাপনা, সামস অল-নাহার গান শুনতে শুনতে এক সময় বিরহজ্বালা সহ্য করতে না পেরে এক লেড়কির কোলে ঢলে পড়লেন। মুহূর্তে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল। সামস অল-নাহার-এর আকস্মিক ভাবান্তরটুকু আলী ইবন’কে বড়ই ভাবিয়ে তুলল। সে ফ্যাকাসে মুখে, চোখের তারায় আতঙ্কের ছাপ একে ক্রীতদাসীটিকে বলল —“আমার পেয়ারী, আমার মেহবুবার একি হাল হ’ল! হায় আল্লাহ! একি করলে!'

ক্রীতদাসীটি মুচকি হেসে তাকে প্রবােধ দিতে গিয়ে বলল —“হুজুর, ঘাবড়াবেন না। বিরহজ্বালা সইতে না পেরে মাথা চক্কর মেরেছে, মূৰ্ছা গেছেন। একটু বাদেই আবার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়বেন, সামলে নেবেন নিজেকে। এদিকে আলী ইবন-এর মধ্যেও তার প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। তার মাথাও কেমন ঝিম ঝিম করছে। শরীর টলছে। গা গােলাচ্ছে। তার মধ্যেও বিরহজ্বালা প্রবল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল। আবুল হাসান ধরে না ফেললে হয়ত মেঝেতে পড়েই যেত।

আলী ইবন একটু স্বাভাবিকতা ফিরে পেলে ক্রীতদাসীটি তাদের প্রাসাদের খিড়কী দরওয়াজা দিয়ে বাইরে নিয়ে গেল। হাজির হ’ল টাইগ্রিস নদীর ধারে। একটি ডিঙ্গি নৌকা ঘাটেই বাঁধা ছিল। আলী ইবন ও আবুল হাসান নৌকায় উঠল। মাঝবয়সী মাঝি লগি মেরে মেরে ডিঙ্গিটিকে নদীর মাঝামাঝি নিয়ে গেল। এবার সেটি ভাটার টানে এগিয়ে চলল। কিছুদূর গিয়ে ডিঙ্গিটি আবার পাড়ের দিকে এগিয়ে চলে। বিপরীত পাড়ে নিয়ে গিয়ে মাঝি ডিঙ্গি ভেড়ায়।

টাইগ্রিস নদীর এ দিকটিতে দস্যু-তস্করের উপদ্রব খুব বেশী, অতর্কিতে পথচারীদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। যথাসর্বস্ব লুটপাট করে ভেগে যায়। খুনখারাপিতেও তারা সিদ্ধহস্ত। আবুল হাসান বিপদের ঝুঁকি না নিয়ে আলী ইবন’কে নিয়ে তার এক দোস্তের বাড়ি গিয়ে উঠল। আবুল হাসানের দোস্তটি এত রাত্রে তাদের দেখে বিস্মিত হ'ল। অভ্যর্থনা করে কামরায় নিয়ে গিয়ে বসাল। সাধ্যমত খানাপিনার বন্দোবস্ত করল। ঘরে সরাবও ছিল এক বােতল। এনে দিল। খানাপিনা সেরে আলী ইবন ও আবুল হাসান আলাদা একটি ঘরে চৌকির ওপর শুয়ে পড়ল। আবুল হাসান ক্লান্ত চাহে চৌকির ওপর শরীর এলিয়ে দিতেই নিদ এসে চোখে ভর করল। অচিরেই বেহুঁশ হয়ে সে নিদ যেতে লাগল। আলী ইবন কিন্তু কিছুতেই দু’চোখের পাতা এক করতে পারল না। সামস অল নাহার এর চিন্তা তাকে পেয়ে বসেছে। কলিজাটিকে দরকচা মেরে দিয়েছে তার বিরহজ্বালা। এ কী মহা জ্বালায় পড়া গেল। শত কোশিস করেও দিল থেকে সরিয়ে নিজেকে হাল্কা করতে পারছে না। আলী ইবন সারাটি রাত্রি নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতার মধ্যে বিনিদ্র অবস্থাতেই কাটাল।

সকাল হ’ল, দোস্তের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আলী ইবন আর আবুল হাসান আবার পথে নামল। কোনরকমে পয়দল হেঁটে আলী আবুল-এর বাড়ি পৌছােয়। একে বিনিদ্র রাত্রি যাপন তার ওপর পরিশ্রম তাে রয়েছেই। ফলে আলী কামরায় ঢুকেই চৌকির ওপর গা এলিয়ে দিল। কখন যে তার দু'চোখের পাতা এক হয়ে গিয়েছিল বুঝতেই পারেনি।

সন্ধ্যার দিকে আবুল হাসান তার দোস্ত আলী ইবন-এর বিষাদক্লিষ্ট মনকে চাঙা করে তােলার জন্য গান-বাজনার ব্যবস্থা করল।

আলী ইবন-এর কিছুতেই মেজাজ মর্জি শরিফ হ’ল না। সামস অল-নাহার-এর বিরহজ্বালা তার কলিজাটিকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে লাগল। আবার নেমে এল রাত্রির অন্ধকার। আবার সে-মেহবুবার চিন্তা, আবার বিরহ-যাতনা আর আবার চলতে লাগল বিনিদ্র রাত্রি জাগরণ। অভিশপ্ত রাত্রি।

সকালে আবুল হাসান দোকান খুলে বসল। আলী ইবন তার কামরায়ই রয়ে গেল। একটু বেলা হলে, খানাপিনা সেরে নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে, দু’দোস্ত এরকম পরিকল্পনা করার পর আবুল হাসান দোকানে গেছে। আবুল হাসান দোকান খােলার কিছুক্ষণ বাদে সামস অলনাহার-এর সে-ক্রীতদাসীটি হাজির হল।

এদিকে প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় ভােরের প্রস্তুতি চলছে বুঝতে পেরে বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।

               একশ’ ছাপান্নতম রজনী 

প্রায় মাঝরাত্রে বাদশাহ শারিয়ার আবার বেগম শাহরাজাদএর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, ক্রীতদাসীটিকে দেখেই আবুল হাসান-এর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বুকের মধ্যে ঢিবঢিবানি শুরু হ’ল। সে ধরেই নিল, ক্রীতদাসীটি নির্ঘাৎ কোন না কোন ফরমান নিয়ে এসেছে। আর তা মােটেই আনন্দদায়ক নয়। ক্রীতদাসীটি প্রথম মুখ খুলল—“আমাকে মালকিন পাঠিয়েছেন, আলী সাহেব কেমন আছেন খোঁজ নিতে। তার তবিয়ৎ আচ্ছা তাে? আমার মালকিন তাে খানাপিনা ছেড়ে দিয়েছেন। একটু বাদে বাদে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। আর থেকে থেকে খােদা মেহেরবান....খােদা মেহেরবান করছেন।

–‘আলী উপযুক্ত বিশ্রামের পর এখন মােটামুটি সুস্থই আছে। আমরা তাে দেখে এলাম, বেগম সাহেবা গান শুনতে শুনতে এক লেড়কির ওপর আচমকা পড়ে গিয়ে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন। তারপর?

--আপনাদের ডিঙ্গিতে তুলে দিয়ে প্রাসাদে ফিরে যাই। দেখি, বেগম সাহেবা তখনও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। আমরা যারপরনাই উদ্বিগ্ন। খলিফাও চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ এঁকে অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগলেন। রাত্রির চতুর্থ প্রহরে মুহুর্তের জন্য তিনি মুখ তুলে তাকালেন। খলিফা ব্যস্ত-পায়ে এগিয়ে গেলেন। তার মুখের ওপর ঝুকে ডাকলেন–নাহার। মেহবুব আমার, তােমার, তােমার কি হয়েছে, বল তাে? তােমার কি তকলিফ না বললে আমি বুঝব কি করে? বল, কি হয়েছে তােমার?

সামস অল-নাহার তার ডান হাতটি আলতাে করে খলিফার হাতের ওপরে রাখল। কিছু বলার কোশিস করল। পারল না। কেবল তার ঠোট দুটো বার কয়েক তিরতির করে কাপল। পর মুহুর্তেই আবার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এল। সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল।

কেটে গেল, আরও কিছুটা সময়। ভাের হওয়ার পূর্বমুহুর্তে সামস অল-নাহার আবার চোখ মেলে তাকাল। অস্থিরচিত্ত খলিফা তার মাথায়-গালে হাত বুলােতে বুলােতে বলল পেয়ারী, কি হয়েছে? তােমার দর্দ কোথায় আমাকে বল। যদি তেমন কিছু হয় তবে না হয় হেকিমকে তলব দিচ্ছি। বল, কি তকলিফ তােমার।

সামস অল-নাহার দম নিয়ে নিয়ে বলতে লাগল—“জাহাপনা। কেন ঝুটমুট ভেবে আকুল হচ্ছেন? তেমন কিছুই আমার হয় নি। আসলে নতুন এক ফল খেয়েছিলাম। গরহজম হয়েছে। টাটকা ফল কিনা তাই সহ্য হয় নি।

-কী তাজ্জব কী বাত! ফল খেয়ে মূচ্ছা গেলে? হতেও পারে তৃপ্তি সহকারে খেতে পার নি হয়ত। বিদ্বেষ-ঘৃণা অশ্রদ্ধার সঙ্গে কিছু খেলে এমনটি হওয়া অবশ্য অসম্ভব নয়।

সামস অল-নাহার ম্লান হেসে বলল —না। বরং তার বিপরীতই বলতে পারেন জাঁহাপনা। তৃপ্তির মাত্রা একটু বেশী ছিল বলেই হয়ত গরহজম হয়েছিল। আপনি ভাববেন না, ঠিক সামলে নিতে

পারব।'

-নাহার ? মেহবুবা আমার, তােমার তবিয়ত সুস্থ না থাকলে আমার দিল তাে সুস্থ থাকতে পারে না। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে অন্ততঃ তুমি নিজেকে সুস্থ রাখবে।

সামস অল-নাহার ম্লান হাসল।

ভাের হ’ল। খলিফার তলব পেয়ে বৃদ্ধ হেকিম তার দাওয়াইয়ের বাক্স নিয়ে ছুটে এল। দাওয়াই দিল। হেকিম সাহেবের ইলাজে সামস অল-নাহার অচিরেই স্বাভাবিকতা ফিরে পেল। ভাের হ’ল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

             একশ’ সাতান্নতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় যামে বাদশাহ শারিয়ার আবার বেগম শাহরাজাদ এর কামরায় এলেন। বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—“জাঁহাপনা, সামস অল-নাহার হেকিম সাহেবের ইলাজে প্রায় স্বাভাবিকতা ফিরে পেলেন। তার বিমারি সেরে যাওয়ায় খলিফাও স্বস্তি পেলেন।

ইতিমধ্যে আলী ইবন হাঁটতে হাঁটতে দোস্ত আবুল হাসান-এর দোকানে এল। ক্রীতদাসীটির মুখে তার মেহবুবা সামস অল-নাহার-এর অসুস্থতার বাৎ শুনে বড়ই উৎকণ্ঠিত হল।

আবুল হাসান দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলী ইবন’কে বলল—‘দোস্ত আমিই যত অনিষ্টের মূল। আমারই জন্য তােমাদের দু-দুটো কলিজায় আগুন জ্বলছে। জ্বলেপুড়ে খাক হচ্ছে তােমাদের দিল। আমিই তােমাদের পরিচয়ের যােগসূত্র। তােমাকে তার কামরায় নিয়ে যাই আমিই।

তারপরদিন আলী ইবন-এর খবর নিতে সে-ক্রীতদাসীটি আবার এল। সালাম জানিয়ে বলল —‘আমার মালকিন আজ কিছুটা সুস্থ বােধ করছেন। শাহজাদা আলী ইবন-এর তবিয়ৎ কেমন আছে জেনে যেতে হুকুম করেছেন। কথা বলতে বলতে সে কামিজের ভেতর থেকে একটি ভাজ করা কাগজ বের করে আলী ইবন-এর হাতে তুলে দেয়। সামস অল-নাহার-এর চিঠি। মহব্বতের চিঠি। আলী ইবন চিঠির বক্তব্য পাঠ করে কয়েক মুহূর্ত নীরবে কাটাল। এক সময় কাগজ কলম নিয়ে চিঠির জবাব লিখতে শুরু করল।

ক্রীতদাসীটি আলী ইবন-এর চিঠিটি বুকের কাছে, কামিজের ভেতরে চালান করে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

আলী ইবন কয়েক মিনিট পর আবুল হাসান-এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এবার নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। আবুল হাসান-ই একটি তাগড়াই খচ্চর ঠিক করে দিল।

আলী ইবন বিদায় নিল, আবুল হাসান এবার ভাবতে বসল। ব্যাপারটি যেদিকে মােড় নিচ্ছে তাতে করে আখেরে ফল ভাল হবে না বলেই তার আশঙ্কা। ব্যাপারটি গােড়াতে যেমন সহজ-সরল ও স্বাভাবিক মনে হয়েছিল এখন দেখা যাচ্ছে বরং তার বিপরীত। বড়ই জটিল। কোনক্রমে খলিফার কানে গেলে তাকে হয় কোতল করবে, নয় তাে শূলে চড়াবে। আর যেভাবে চিঠি চাপাটি শুরু হয়েছে ব্যাপারটি আজ না হােক কাল ফাস হবেই হবে। শেষের কথা ভেবে ডরে আবুল হাসান-এর হাত-পা পেটের মধ্যে সিধিয়ে যাবার জোগাড় হ’ল।

পরদিন সক্কালে আবুল হাসান খচ্চরের পিঠে চেপে আলী ইবন-এর বাড়ি হাজির হ’ল। কোনরকম ভূমিকা না করেই সে তাকে সরাসরি বলল —“দোস্ত, আমার কিন্তু ব্যাপারটি সুবিধের মনে হচ্ছে না। ফালতু ঝুট ঝামেলা ছাড়ান দাও। আমি সংসারী আদমি, বাল বাচ্চা নিয়ে ঘর করি। আমার নিজের জন্য ভাবি না। খলিফার কোপে পড়ে আমার জান গেলে আমার বিবি আর বাল বাচ্চার কি গতি হবে ভাবলেই আমার হাত-পা কাপে। আর তােমারই বা এমন কি ওমর হ’ল। জান বাঁচলে এর চেয়ে অনেক খুবসুরৎ লেড়কি তােমার চারপাশে চক্কর মেরে বেড়াবে। তার চেয়ে যা হবার হয়ে গেছে। মনে কর ওটি একটি দুর্ঘটনা মাত্র। এবার

Post a Comment

0 Comments