গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
একটি নেউল গভীর রাত্রে অতি সন্তর্পণে পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকে ঝুড়ি থেকে কিছু ক্ষীরার বীচির ডাল খেয়ে চম্পট দিল। সকালে নিদ ভাঙলে আউরতটি উঠে খাটিয়ার তলা থেকে ঝুড়িটি টেনে কাছে আনতেই দেখল, ক্ষীরার বীজের ডাল বেশ কম। সে রাগে ফুসতে লাগল বজ্জাত ইঁদুরগুলাের জ্বালায় আর পারার জো নেই! এক্কেবারে হাড়ি পর্যন্ত জ্বালিয়ে খেল! বিড়ালটি গােরে যাওয়ার পর ইঁদুরগুলাে যেন রীতিমত রাহাজানি শুরু করে দিয়েছে। অরাজকতায় পেয়ে বসেছে দেখছি! তােদের ব্যবস্থা আজ রাত্রেই করছি। কল পেতে এক একটি করে ধরব আর কচুকাটা করে ছাড়ব। কিন্তু আমি এখন খদ্দের নওজোয়ানটিকে বলি কি! একদিন আগে ফরমাস দিয়ে গেল আর আমি তাকে মাল জোগান দিতে পারলাম না! কথার খেলাপ করলাম।
নেউলটি তখন ঘরের পিছনে ঝােপের আড়ালে বসে। আউরতটির কথা বিলকুল শুনতে পেল। হাসল। বিলকুল গােসসা ও ঝামেলা ইঁদুরটির ওপর দিয়েই তবে যাচ্ছে-উল্লসিত হয়ে সে ভাবল।
এবার থেকে আউরতটি রােজ রাত্রে ক্ষীরার বীজের ডাল বানিয়ে রাখে আর নেউলটি চুপিচুপি এসে ভুরিভােজন করে যায়।
রােজ সকালে নিদ টুটলে আউরতটি ঝুড়িটি টেনে কাছে নেয় ! ব্যস, তারপরই ইদুরের আদ্য শ্রাদ্ধ শুরু করে দেয়। তার গােসসা এমন পঞ্চমে চড়ে যায় যে, গস গস করতে করতে বলে—“আজ রাত্রেই তাের মজা টের পাইয়ে দিচ্ছি। আজ রাত্রে আর নিদ যাবাে না, জেগেই কাটিয়ে দেব। তারপর লাঠির ঘায়ে চৌদ্দপুরুষের নাম ভুলিয়ে মারব।'
নেউলটি ঝােপের আড়াল থেকে সব শুনল। গোঁফের ফাক দিয়ে দুষ্টুমি ভরা হাসি হাসল। তারপর গুটিগুটি ইদুরের কাছে গিয়ে বলল-“দোস্ত, তােমার মত হাঁদারাম আর দ্বিতীয়টি দেখি নি। তােমার ঘরের মালকিন ঝুড়ি বােঝাই করে ক্ষীরার বীজের ডাল রেখে দেয় আর তুমি কিনা উপােষ করে দিন কাটাচ্ছ। রাত্রে গা গতর একটু নাড়াচাড়া করলেই তাে দানাপানি জোটাতে পার। যাক, আজকে খবর দিলাম। পেট পুরে খেয়ে নিও। আমি রােজই খাই, কোন ঝুটঝামেলাই নেই।
ইদুরটি দেখল, নেউলটি প্রকৃত দোস্তের কাজই করেছে। নইলে কে আগ বাড়িয়ে নিজের খানাপিনার ভাগ দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করে? রাত্রি একটু গভীর হলেই হাঁদারাম ইদুরটি খাটিয়ার তলায় ঢুকে। ঝুড়ি থেকে ক্ষীরার বীজের ডাল খেতে লেগে গেল। আউরতটি খট খট আওয়াজ শুনে লাঠি নিয়ে খুবই সন্তর্পণে খাটিয়া থেকে নামল। বেধড়ক লাঠি চালিয়ে ইদুরের দফারফা করে দিল।
জিগরী দোস্তের কিসসা
ইঁদুরের চরম পরিণতি দেখে নেউলটি কামরার পিছনে লেজ খাড়া করে আনন্দে নাচানাচি জুড়ে দিল। বেগম শাহরাজাদ ইঁদুর আর নেউলের কিসসা শেষ করে বললেন--‘জাঁহাপনা, আমার কিসসা যদি সত্যি আপনাকে আনন্দ দিয়ে থাকে তবে আরও কিসসা আমি শােনাতে পারি।'
বাদশাহ শারিয়ার বললেন-“পেয়ারি, একটি জিগরী দোস্তের কিসসা শােনাও।
বেগম শাহরাজাদ কিসসা শুরু করলেন--‘জাহাপনা, কোন এক দেশে এক সময় একটি কাউয়া আর কাঠবিড়ালির মধ্যে দোস্তি গড়ে উঠেছিল। সত্যি বলতে কি তারা ছিল যাকে বলে একেবারে জিগরী দোস্ত।
এক সকালে কাউয়া আর কাঠবিড়ালিটি এক মােটাসােটা গাছের গুড়ির ওপর বসে খােশ মেজাজে কথাবার্তা বলছিল। এমন সময় ইয়া তাগড়াই এক শের সেখানে হাজির হ’ল। শেরটি আচমকা এক হাঁক দিল। ব্যস, কাঠবিড়ালিটির কলিজা শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেল। এদিকে শেরটির তর্জন গর্জন শুনে কাউয়াটি আচমকা উড়ে পাশের এক গাছের মগ ডালে গিয়ে বসল। কিন্তু কাঠবিড়ালিটি হঠাৎ করে কোন ফিকির বের করতে পারল না, কোথায় গিয়ে লুকিয়ে থেকে জান বাঁচাতে পারে!
কঁদো কাঁদো স্বরে কাঠবিড়ালিটি কাউয়াটিকে বলল 'দোস্ত, এখন কি ফিকির করি বল তাে? এমন কোন বুদ্ধি দাও যাতে আমার জান বাঁচতে পারে।
কাউয়াটি মুখ কাচুমাচু করে বলল—এতাে মহা মুশকিলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল দেখছি। কি করে যে তােমার মুশকিল আসান হতে পারে মাথায়ই আসছে না। শেরটি খুব কাছেই চলে এসেছে। এক্ষুণি হয়ত হুঙ্কার দিয়ে তােমার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়বে।
কাউয়াটি তার দোস্ত কাঠবিড়ালিটির সঙ্গে কথা বলতে বলতে দেখতে পেল পাশের ময়দানে এক পাল ভেড়া চরে বেড়াচ্ছে। আর তাদের মধ্যে কয়েকটি শেরের মতই ইয়া তাগড়াই শিকারী কুকুরও রয়েছে। শেরের খপ্পর থেকে ভেড়াগুলাের জান বাঁচাবার জন্য ভেড়ার মালিক কুকুরগুলােকে রাখে।
ভেড়া আর কুকুরগুলােকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে কাউয়াটি ডানা মেলে উড়তে উড়তে গিয়ে ঠোকর মেরে মেরে শেরটির চোখ কানা করে দেবার জোগাড় করল। সে রাগে দাঁত কিড়মিড় করে তর্জন গর্জন করল বটে কিন্তু সুচতুর কাউয়াটিকে দমাতে পারল না। ঠোকর মেরেই সে পালিয়ে যায়। কুকুরগুলােও এবার রীতিমত ক্ষেপে গেল। তারা তাকে লক্ষ্য করে ঘেউ ঘেউ করতে করতে তেড়ে যায় আর ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে বাঘটির দিকে। এদিকে এতগুলাে কুকুরের তর্জন গর্জন শুনে শের বেচারার কলিজা শুকিয়ে গেল। ভাবল, কুকুরগুলি বুঝি তাকে লক্ষ্য করেই তেড়ে আসছে। ব্যস, আর দেরি না, লেজ তুলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গভীর বনের দিকে পালিয়ে গেল। কাউয়াটি কাছে আসতেই কাঠবিড়ালিটি বল্ল-“দোস্ত, সত্যি তুমি আমার জিগরী দোস্ত। কিসসা শেষ করে বেগম শাহরাজাদ বললেন—‘জাঁহাপনা, কিছু কিছু দোস্ত দুনিয়ায় এমন আছে যারা তাদের দোস্তকে রক্ষা করতে জান পর্যন্ত কবুল করতে দ্বিধা করে না।
আলী ইবন বকর ও সামস অল-নাহারের কিসসা
বাদশাহ শারিয়ার-এর অত্যুগ্র আগ্রহে বেগম শাহরাজাদ এবার আলী ইবন্ বকর ও সামস অল-নাহার-এর কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, এক সময় বাগদাদ নগরে আবু অলহাসান নামে এক বণিক বাস করত। খলিফা হারুণ-অল-রসিদ-এর সময়ের কথা বলছি। আবু অল-হাসান ছিল এক পােশাক বিক্রেতা। বাদশাহ, সুলতান, উজির, নাজির ও আমীর-ওমরাহদের ব্যবহারের উপযােগী বহুমূল্য চকচকে ঝকঝকে পােশাক তার দোকানে সর্বদা মজুত থাকত। এ মুলুক-সে মুলুক ঢুঁড়ে ঢুঁড়ে সে নিত্য নতুন কায়দা কলমের পােশাক সংগ্রহ করত। পােশাক আশাক ছাড়া হীরা জহরতের হরেক কিসিমের গহনাপত্রও তার দোকানে পাওয়া যেত। দোকানের এক ধারে খােজাদের পছন্দসই পােশাকও ঢেই করা থাকত। বাদশাহের হারেমের খোঁজারা তাে আবু অল-হাসান-এর নামে একেবারে অজ্ঞান। একটি সাধারণ টুপি খরিদ করতে গেলেও তারা তার দোকানে হাজির হয়। বাদশাহের ও তার পরিবারের পােশাক আশাক খরিদের ব্যাপারে খােজাদের ভূমিকাও কম নয়। তাই দোকানি তাদের খাতিরও করে খুবই। গুলাব পানির সরবৎ, সুন্দর খুসবুওয়ালা মিঠা পান ও টুকিটাকি আরও কত কিছু দিয়ে যে তাদের দিলকে খুশি করার কোশিস করত তার ইয়ত্তা নেই। আবার সামানপত্রের দামের ওপরও তাদের দস্তরি মিলত ।
হাসানের ব্যবহার ছিল খুব অমায়িক। লঘু-গুরু বিচার করে বাৎচিৎ কি করে করতে হয় তা তার ভালই রপ্ত ছিল। তাই খলিফা হারুণ-অল-রসিদও মাঝে-মধ্যে হাসান-এর দোকানে হাজির হতেন। তার খুবসুরৎ চেহারা ছবি এবং দিলখােলা ব্যবহার খলিফাকে আকৃষ্ট করেছিল।
খলিফা হারুণ-অল-রসিদ বণিক আবু হাসানকে এতই স্নেহ করতেন যে, তার প্রাসাদে কোন উৎসব অনুষ্ঠান হলে তাকে নিমন্ত্রিতদের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার কথা ভাবতেই পারতেন না। তাছাড়াও খলিফার ঢালাও নির্দেশ ছিল, হাসানকে যেন যে কোন সময় প্রাসাদে ঢুকতে দেয়া হয়। জাঁহাপনা এবার শুনুন, খুবসুরৎ নওজোয়ান হাসান-এর সঙ্গে আমীর-ওমরাহদের পরিবারের বিবি আর লেড়কিদের ব্যাপারের কথা। তারাও অবাধে তার দোকানে যাতায়াত করত। দীর্ঘ সময় ধরে পােশাক আশাক বাছাবাছি করত। পছন্দ মাফিক কেনাকাটা করে ঘরে ফিরত।
পারস্যের সুলতানের লেড়কার নাম ছিল শাহজাদা আলী ইবন বকর। বণিক হাসান-এর সঙ্গে তার খুব দোস্তী ছিল। ফলে তার দোকানে আলী ইবন বকর খুবই যাতায়াত করত।
এক বিকালে শাহজাদা আলী ইবন বকর তার দোস্ত হাসান এর দোকানে বসে বাতচিত করছে, এমন সময় দোকানের দরওয়াজায় নয় দশটি খুবসুরৎ লেড়কি এসে দাঁড়াল। তাদের সঙ্গী একটি লেড়কি খচ্চরের পিঠে বসে। তার পােশাক আশাক খুব দামী। চকচকে ঝকঝকে। সুরৎও খুবই মনমৌজি। বােরখার নাকাবের জালের ফাক দিয়ে তার মুখের যে-অংশটুকু দেখা যায় তাতেই শাহজাদা আলী ইবন বকর-এর কলিজাটি নাচানাচি দাপাদাপি শুরু করে দিল। খুবসুরৎ লেড়কিটি খচ্চরের পিঠ থেকে নামল। পদ্মের মত পা দুটো আলতাে করে ফেলে ফেলে দোকানের দিকে এগােতে লাগল। হাসান ঝট করে জায়গা থেকে উঠে সাদর অভ্যর্থনা করে তাকে দোকানের ভেতর নিয়ে গেল। আবেগে উচ্ছাসে অভিভূত হয়ে বলল —আপনার শুভ পদার্পণে আজ ধন্য হলাম।
খুবসুরৎ লেড়কিটি ধীর-পায়ে এগিয়ে হাসান-এর নির্দেশিত মখমলের গদিতে গিয়ে বসল। হাসান কর্মচারীর ওপর ভরসা করতে না পেরে একের পর এক চুড়িদার আর কামিজ প্রভৃতি তাকে দেখিয়ে সামনে ঢেই করে ফেলল। আর লেড়কি পছন্দ করায় এতই ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে, মুখের নাকাবটি কখন সরে গেছে সে হুঁসও ছিল না তার। সত্যি বলতে কি বণিক হাসান তার সুপরিচিত। তার সামনে লজ্জা শরমের তেমন কিছু নেই। কিন্তু অন্য এক নওজোয়ান যে রয়েছে। তার সামনে নাকাবটি খুলে পড়া বাস্তবিকই শরমের ব্যাপারই বটে। শাহাজাদা আলী ইবন বকর কিন্তু আকস্মিক এ সুযােগটিকে কাজে লাগাতে ভুল করল না। অপলক চোখে তার সুরত টুকু নিরীক্ষণ করতে লাগল। আপন মনে বলে উঠল-শােভন আল্লাহ! কী সুরৎ!
সত্যি লেড়কিটির সুরৎ অতুলনীয়। একেবারেই অনন্যা। রূপের আভা চোখ দুটো ঝলসে দেয়। তামাম দুনিয়ার সুরৎ যেন এককাট্টা করে লেড়কিটির গায়ে লেপে দেওয়া হয়েছে। শাহজাদা আলী ইবন বকর এক ঝলক লেড়কিটির মুখের দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতরে কলিজাটায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। শরীরের সব কটা স্নায়ু একসঙ্গে সচকিত হয়ে উঠল। তার মাথায় বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে যায়। তার দিল এমন চঞ্চল হয়ে উঠল যে, এখান থেকে দৌড়ে পালাতে পারলে সে যেন স্বস্তি পায়। অসহ্য! একেবারেই অসহ্য! এত সুরৎ তার চোখ দুটো সইতে পারছে না।
লেড়কিটিও কিন্তু নিষ্ক্রিয় নয়। তার চোখ দুটোও চঞ্চল হয়ে উঠল। আড়চোখে নওজোয়ানটিকে বার কয়েক দেখে নিল। তার মধ্যে যে আকস্মিক অস্থিরতা ভর করেছে তা সে ভালই বুঝতে পারল।
শাহজাদা আলী ইবন বকর আস্তে আস্তে কুরসি ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
শাহাজাদা আলী ইবন বকরকে উঠে যেতে দেখে খুবসুরৎ লেড়কিটি ঝট করে দাঁড়িয়ে বলল —“ছিঃ ছিঃ ! আমার জন্য আপনার দোকানের একটি খদ্দের হাতছাড়া হবে তা কি করে সম্ভব! এক কাজ করি, আমিই বরং চলে যাচ্ছি। আমি গােসসা করে একথা বলছি না। আমি না হয় অন্য এক সময়ে এসে—'তাকে মুখের কথাটি শেষ করতে না দিয়েই শাহাজাদা আলী ইবন বকর বলে উঠল—“আল্লাতাল্লার নামে খসম খেয়ে বলছি আমি কিন্তু আপনার উপস্থিতির জন্য দোকান ছেড়ে যাচ্ছি না। তবে এ-ও সত্যি, আপনার মুখটি দেখার পর মুহুর্ত থেকে কলিজায় অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করছি। যদি জিজ্ঞেস করেন, কেন এ-যন্ত্রণা, কিসের যন্ত্রণা এবং কেমন যন্ত্রণা তবে কিন্তু আমাকে শরমে ফেলবেন। আমি নিজেই জানি না, আপনাকে কি করে তা বলব? অবর্ণনীয় ও অভাবনীয় সে-যন্ত্রণার হাত থেকে রেহাই পাবার জন্যই আমি আপনার সংশ্রব থেকে দূরে চলে যেতে চাইছি। এতে যদি কোন গােস্তাকী হয়ে থাকে তবে মাফ করে দেবেন। আলী ইবন-এর সুন্দর সুন্দর কথাগুলাে তার দিলে খুব ধরল, দাগ কাটল। আপন মনে বলে উঠল-নওজোয়ানটির বাৎ বহুৎ আচ্ছা! চোখের তারায় বিস্ময়ের ছাপ এঁকে সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল খুবসুর নওজোয়ানটির দিকে। হাসান-এর দিকে সামান্য ঝুকে অনুচ্চ কণ্ঠে, প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল -এ নওজোয়ানটি কে? কোথায় থাকে?
–‘আলী ইবন বকর তার নাম। খুব খানদানি বংশের লেড়কা। প্রাচীন পারস্য শাহদের বংশে জন্ম। এর সুরৎ যেমন চোখে লাগার মত তেমনি মনটিও খুবই উঁচু।
–হ্যা, খুবসুরৎ নওজোয়ানই বটে।
লেড়কিটি যেন সম্বিৎ ফিরে পেল। সে এবার হাসান-এর দিকে ফিরে অনুরােধের স্বরে বলল —“আমি চাই আপনারা একবারটি আমাদের প্রাসাদে যান। যদি বলেন, তবে আমি এক খােজাকে পাঠিয়ে দেব আপনাদের অভ্যর্থনা করে নিয়ে যাবার জন্য। আসলে আপনার দোস্তকে একবারটি দেখাতে চাচ্ছি, বাগদাদের সুলতানের হারেমে যে সব আউরত রয়েছে তারা পারস্যের সুলতানের হারেমের আউরতদের তুলনায় সুরতের বিচারে একেবারে ফেলনা নয়।
হাসান সুচতুর। মুলুকে মুলুকে ঢুঁড়ে বেড়ায়। সওদাগরি কারবার করে। বুদ্ধি-বিবেচনা খুবই পাকা। অতএব তার উদ্দেশ্য। বুঝতে কোন অসুবিধাই হল না। সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল "আপনার আদেশ শিরােধার্য। দেখবেন, সময় মত আমরা মানিক- জোড় আপনার প্রাসাদের দরজায় হাজির হব।'
লেড়কিটি আলী ইবন বকর-এর দিকে আড়চোখে তাকাল মুহূর্তের জন্য। আচমকা চোখের বাণ মারল। ঝট করে নাকাবটি দিয়ে ভাল ভাবে মুখ ঢেকে ফেলল। এবার তার বেলনের মত নিটোল ধবধবে পা দুটোতে ছন্দ তুলে তুলে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে খচ্চরটির পিঠে চেপে বসল। খুবসুরৎ লেকড়িটি বিদায় নিলে হাসান বলল —“কি দোস্ত, কেমন বুঝলে? প্রথম দর্শনেই নিমন্ত্রণ জুটে গেল। তােমার নসীব খুবই ভাল বলতে হবে!
আলী ইবন চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-“লেড়কিটি আমার কলিজায় জ্বালা ধরিয়ে দিল! কিন্তু দোস্ত, এর পরিচয় তাে এখন পর্যন্ত জানতে পারলাম না।
-আরে দোস্ত, উনি হচ্ছেন খলিফা হারুণ-অল রসিদের সবচেয়ে বড় পেয়ারের বিবি। তার শিরােমণিও বলতে পার। খাস বেগমের ওপর টেক্কা দিয়ে চলেন। হবে না, স্বয়ং খলিফা থেকে শুরু করে বাঁদী-নফর সবার ওপরেই দাপটা খাটান। আর খলিফা তার ওপর বিশ্বাসও রাখেন যথেষ্ট। নইলে দেখলে না, তার সঙ্গে যারা ছিল সবাই লেড়কি। একটিও খােজা নফর ছিল না। হারেমেও তার ওপর নজর রাখার জন্য কোন খােজাকে নিযুক্ত করা হয় নি। এত সতর্কতা, এমন কড়া পাহারার মধ্যেও হারেমের বেগমরা কামজ্বালা নেভানাের জন্য পরপুরুষের সঙ্গ লাভের জন্য উতলা হয়। দেহদান করে। সম্ভোগের মাধ্যমে কামজ্বালা নেভায়। তাই তো খােজা নফর বেগমদের ওপর কড়া নজরদারি করে। কিন্তু এইমাত্র যে হুরীর মত খুবসুরৎ লেড়কিকে দেখলে তামাম বাগদাদ নগরে তার মত খুবসুরৎ লেড়কি দ্বিতীয়টি মিলবে না। কিন্তু তাজ্জব বাত, এর নামে কোন কেলেঙ্কারীর কথা নিয়ে প্রাসাদে বা নগরে কোনদিনই ঢি ঢি পড়ে নি। দোস্ত এত কিছু বললাম কিন্তু আসলি বাৎ-ই এখন বলা হল না। তােমার খােয়াবের হুরীটির নাম সামস অলনাহার।
দুই দোস্ত যখন বেহেস্তের হুরীর খুবসুরৎ সামস অল-নাহার এর সৌন্দর্যের কথা আলােচনা করছে ঠিক তখনই এক নিগ্রো নফর দোকানে ঢুকল, সালাম জানিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলল--‘বেগম সাহেবা আমাকে পাঠিয়েছেন আপনাদের অভ্যর্থনা করে নিয়ে যাবার জন্য। মেহেরবানি করে চলুন আপনারা।
হাসান তার দোস্ত আলী ইবনকে নিয়ে খােজা নিগ্রোটির সঙ্গে খলিফার প্রাসাদের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। আলী ইবন পথে আসতে আসতে ভেবেছিল সামস অল নাহারকে কয়েকটি কবিতা শুনিয়ে চমক লাগিয়ে দেবে। কিন্তু প্রাসাদে পা দেওয়া মাত্র সামস অলনাহার মেহমানদের নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ল’ যে, কবিতা শােনানাের মত ফুরসৎই পেল না। " হাসান আর আলী ইবন খানাপিনা সেরে সামান্য বিশ্রাম নিল। তারপর সামস অল-নাহার তাদের সঙ্গে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্রাসাদটি দেখাতে লাগল। সব শেষে সুসজ্জিত একটি কামরায় তাদের বসতে বলে কিছু সময়ের জন্য তাদের কাছ থেকে বিদায় নিল।
এমন সময় দশ-দশটি খুবসুরৎ লেড়কি, কেউ যােড়শী, কেউ বা অষ্টাদশী ব্যস্ত পায়ে কামরায় ঢুকে মেহমানদের ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারা উভয়েই বিস্ময় মাখানাে দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাদের সুরৎ দেখতে লাগল।
এমন সময় প্রভাতের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।
একশ’ তিপান্নতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার আবার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তাঁর কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন--‘জাহাপনা, দশটি খুবসুরৎ লেড়কি কামরায় ঢুকল। আলী ইবন আর আবুল হাসান সবিস্ময়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের প্রত্যেকের হাতেই কোন না কোন তারের বাদ্যযন্ত্র। সবাই সুন্দর ভঙ্গিতে বসে করুণ সুর বাজাতে লাগল। দিল উতলা করা সুর। কলিজায় জ্বালা ধরিয়ে দেওয়া বাদ্যযন্ত্রের সুর।
এমন সময় দশ-বারােটি ইয়া তাগড়াই নিগ্রো ক্রীতদাসী একটি রুপাের বেদী বয়ে নিয়ে এল। তার ওপরে উপবিষ্টা এক যুবতী। নাকাবের জালটি এতই মিহি যে, তার আপেলের মত রক্তাভ ও টসটসে গাল দুটো তাে সামান্য ব্যাপার, এমন কি চোখের পাতাগুলি পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়।
নিগ্রো ক্রীতদাসীদের বক্ষ অনাবৃত। এক চিলতে কাপড় পর্যন্ত নেই। আর নিম্নাংশ? সেও অনাবৃতই বলা চলে। অতি মিহিসূতাে। দিয়ে বােনা এক চিলতে করে কাপড় কোমর থেকে সামনের দিকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটুকু থাকা আর না থাকা দু-ই সমান। রূপসী সামস অল-নাহার নাকাবের ফাক দিয়ে আলী ইবনকে চোখের বাণ মারল। পদ্মের পাঁপড়ির মত ঠোট দুটো মেলে মুচকি হাসল। আলী ইবনও অনুরূপ হাসির মাধ্যমে তার জবাব দিল।
আবুল হাসান সুযােগ বুঝে আলী ইবন এর দিকে সরে আসে। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে—“কি দোস্ত, কেমন বুঝছ?”
——'দোস্ত, সত্যি আমি ভাবতেও পারি নি, নাকাবের আড়ালে। এমন যাদু থাকতে পারে! এ হুরী আমার দিল কেড়ে নিয়েছে, কলিজায় জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে। আর বুকের ভেতর লকলকে আগুনের শিখা জ্বালিয়ে দিয়ে আমাকে পাগল করে দিল। জানি না, আমার নসীব আমাকে কোথায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাবে।।
এদিকে খুবসুরৎ লেড়কিরা গানের সুর বাজিয়েই চলেছে। বিরহের সুর। এমন সময় সামস অল-নাহার-এর দু’চোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগল।
আলী ইবন বকর-এর পক্ষেও চোখের পানি ধরে রাখা সম্ভব হ’ল না। কোন বাদ্যযন্ত্র আদমির দিলে এমন বিরহজ্বালা ধরিয়ে দিতে পারে তা আলী ইবন অন্ততঃ খােয়াবের মধ্যেও কোনদিন মুহূর্তের জন্য ভাবে নি।
সামস অল-নাহার এবার চোখের পানি মুছতে পর্দার আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায়। নিজেকে একটু সামলে নেবার চেষ্টা করে। আলী ইবন আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। লম্বা লম্বা পায়ে পর্দা ঠেলে তার মুখােমুখি গিয়ে দাঁড়ায়।
সামস অল-নাহার হাত দুটো দিয়ে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আচমকা আলী ইবন এর বুকের ওপরে পড়ে গেল। হাত দুটো দিয়ে জড়িয়ে ধরল তার যৌবন ও পৌরুষভরা শরীরটিকে। ক্রমে তার হাত দুটো সুদৃঢ় হয়ে আসতে লাগল। দৃঢ়.... আরও.....আরও দৃঢ়ভাবে জাপটে ধরল তাকে। নিটোল স্তন দুটোকে তার প্রশস্ত বুকের চাপে দলিত পিষ্ট করে ফেলতে চাইছে। তার দেহে যেন দৈত্যের শক্তি ভর করেছে। যৌবনজ্বালা তাে এমন করে আগে কোনদিন তাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেয় নি। ইতিপূর্বে প্রৌঢ় খলিফাকে বহুবার দেহদান করেছে বটে। কিন্তু আজকের মত দিল দরিয়া হয়ে নিজেকে পুরােপুরি বিলিয়ে দিতে পারে নি। কিন্তু আজ-এ নওজোয়ান আলী ইবনকে দিল নিঃশেষে উজাড় করে দেওয়ার জন্য যেন সে উন্মাদিনীর প্রায় হয়ে উঠেছে। পর মুহুর্তেই আলী ইবন নিজেকে মুক্ত করে নেয়। ঢুকে যায় কামরার ভেতরে। অনিশ্চিত আশংকা তার মন প্রাণ জুড়ে বসল। ভাবল, সদ্য যে ঘটনাটি ঘটে গেছে তা নির্ঘাৎ প্রাসাদের সবাই জেনে গেছে। এসব কথা বাতাসের কাঁধে ভর দিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আবুল হাসান এতক্ষণ কোথায় গা-ঢাকা দিয়েছিল, কে জানে। সে হঠাৎ ঘরে ঢুকে বলল —‘তােমাকে তলব করেছে। যাও, ঘুরে এসাে আলী ইবন এবার আবুল হাসান-এর পিছন পিছন সুসজ্জিত একটি কামরায় ঢুকল। রূপসী সামস অল-নাহার দরজার দিকে মুখ করে পালঙ্কের ওপরে মনলােভা ভঙ্গিতে বসে। আলী ইবন এর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে মুচকি হেসে অভ্যর্থনা জানাল।
সামস অল-নাহার এবার আবুল হাসান-এর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল —“তােমাকে সামান্য সুকরিয়া জানিয়ে বা মৌখিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ছােট করার কোশিস আমি করব না। তবে একথা স্বীকার না করলে খােদাতাল্লার কাছে অপরাধী হতে হবে, একমাত্র তােমার জন্যই আমি এ-অমূল্য রতন লাভ করেছি। জিন্দেগীকে নতুন করে ভােগ করার পথের হদিস পেয়েছি। দেহদান-সম্ভোগ আর পেয়ার মহব্বতের মধ্যে যে আসমান-জমিন ফারাক আজই তা আমি প্রথম উপলব্ধি করার সুযােগ পেলাম। সবই কিন্তু তােমারই অবদান, আবুল হাসান শুধু এটুকু জেনে রাখ, আমি নিমকহারাম বেইমান নই। তােমার কথা আমার দিলে গাঁথা থাকবে।
‘মালকিন, আপনি যে মুখে বললেন, আমার কথা স্মরণে রাখবেন তা শুনেই আমি ধন্য ও যারপরনাই খুশি।
সামস অল-নাহার এবার আলী ইবনকে লক্ষ্য করে ভাব বিমুগ্ধ স্বরে বলল—‘মেহবুব আমার! তােমার পেয়ার মহব্বৎ নিখাদ। আমি বুঝেছি। আর তা বুঝেছি বলেই তােমাকে আমার বুকের সর্ব শীর্ষে স্থান করে দিয়েছি। লেড়কিরা অনেককে বুকে তুলে নিতে পারে বটে। কিন্তু এখানে? কেবলমাত্র একজনের জন্যই এটি খালি রেখে দেয়। কারাে বা জিন্দেগীই কেটে যায়। কিন্তু এ স্থানটি ফাকাই
( চলবে )

0 Comments