গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
আমার কাছে এসাে। আমরা পরস্পরকে আলিঙ্গন করে ভাব বিনিময় করি, দোস্তিটিকে একটু পাকা করে নেই। বক এবার কচ্ছপটির কাছে এগিয়ে এল। তারা পরস্পরকে আলিঙ্গন করল। উচ্ছসিত আবেগের সঙ্গে কচ্ছপটি এবার বলল -ভাইয়া তােমার জাত ভাইরা যখন নিতান্তই আত্মকেন্দ্রিক তখন আর বেকার ওদের কাছে থেকে দরকার নেই। চল, ভিন দেশে গিয়ে আমরা দুই দোস্ত পরস্পরের সাহায্য-সহযােগিতায় সুখে দিন গুজরান করি।'
বক হেসে বলল —‘বেড়ে মতলব ফেঁদেছ দোস্ত। কিন্তু আমার বিবি আর লেড়কা-লেড়কিদের কি হাল হবে?
—“কি আবার হবে। তাদেরও সঙ্গে নিয়ে নেবে।
তারপর একদিন বক ও কচ্ছপ সপরিবারে অন্য মুলকের উদ্দেশে রওনা হল।
ইতিমধ্যে প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় ভােরের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
নেকড়ে ও খেকশিয়ালের কিস্সা
এক শ’ উনপঞ্চাশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কক্ষে এলেন। আসন গ্রহণ করতে করতে বললেন -মেহবুবা, তােমার কিসসা আমাকে যার পর নাই মুগ্ধ করছে। এবার আমার অনুরােধ, তুমি কোন হিংস্র জানােয়ারের কিসসা শােনাও।
—‘জাঁহাপনা, আপনার হুকুম তামিল করাই তাে আমার প্রথম ও প্রধান কর্তব্য। আপনার বাঞ্ছা পূরণ করতে আমি এখন হিংস্র জানােয়ার এক নেকড়ে এবং ধূর্ত খেকশিয়ালের কিসসা শুরু করছি।
এক নেকড়ের একটি পােষা খেকশিয়াল ছিল। নেকডেটি রােজ নানাভাবে খেকশিয়ালটির প্রতি দুর্ব্যবহার করে খেকশিয়ালটির প্রাণ একেবারে ওষ্ঠাগত করে তােলে। সে প্রতিনিয়ত ফিকির খুঁজতে লাগে, কি করে শয়তান মালিক নেকড়েটির হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায়।
এক সকালে নেকড়েটি ঘুম থেকে উঠেই খেকশিয়ালটির চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধার করতে লাগল-হারামী শয়তান, নচ্ছার কোথাকার! এতক্ষণ করছিলি কি? বজ্জাত শেয়ালের বাচ্চা কাহিকার! খেকশিয়ালটি নির্বাক। নেকড়ে যে তার গুষ্টি তুষ্টি করছে, সে সবের কিছুই যেন তার কানে যায় নি। সে উপরন্তু মুখে কৃত্রিম হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল —“হুজুর। আমার মাথায় চমৎকার একটি মতলব এসেছে! যাকে বলে একেবারে বেড়ে মতলব!’
তার মালিক নেকড়েটি দাঁত-মুখ খিচিয়ে সজোরে এক ধমক দিয়ে উঠল—'রেখে দে তাের বেড়ে মতলব। উদ্ভট সব ভাবনা তো তোর মাথায় খেলে। ওসব ভেবে ভেবে মগজটিকে আর বরবাদ করিস নে। যা, নিজের কাজ কর গে, তবেই আমি কৃতার্থ। ফিন যদি এরকম মাতব্বরি করিস তাে পিটিয়ে হাড্ডি গুঁড়া করে ছাড়ব, বলে রাখছি। খেকশিয়ালটি হকচকিয়ে উঠে করজোড়ে মিনতি করে -“হুজুর, আমি আপনার অনুগত নফর। যদি না বুঝে কোন গােস্তাকী করে থাকি মাফ করে দেবেন।
খেকশিয়ালটির নম্রতা ও বিনয়ে হিংস্র নেকড়েটির মেজাজ কিছুটা শরিফ হয়। মুচকি হেসে এবার সে বলল—এত করে যখন বলছিস তখন এবারের মত মাফ করেই দিলাম। তবে খেয়াল রাখবি ভবিষ্যতে যদি আর কোনদিন এরকম বে-আদপি করবি তাে তাের কলিজাটি টেনে ছিড়ে দেব। যেটুকু দরকার তার এক রত্তিও বাড়তি বাৎ বলবি না।
খেকশিয়ালটি এবার তেমনি করজোড়েই বলল—একেবারে হক কথাই বলেছেন হুজুর! আমাদের পয়গম্বর তাে বলেই গেছেন, ‘প্রয়ােজনের অতিরিক্ত কোন কথা কাউকে বলবে না, জিজ্ঞাসাও করবে না। আর কেউ কিছু জিজ্ঞাসা না করলে গায়ে পড়ে কাউকে কিছু শােনাতেও কোশিস করবে না, উপদেশ তাে অবশ্যই নয়। নিজের কাজে লেগে থাকা ছাড়া অন্য কোন ধান্দা করবে না। অন্য কারাে ব্যাপার স্যাপার নিয়ে মিছে ভাবনা চিন্তা কোরাে না।
নেকড়েটি ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে থাকে—“হতচ্ছাড়া খেকশিয়াল একদিন কায়দামত তােকে বাগে পেলে তাের মাতব্বরির শােধ সুদে-আসলে তুলে ছাড়ব। খেকশিয়াল এবার বলল —“আপনার তাে আর অজানা নয় যে, ন্যায় বিচারের মাধ্যমেই পুণ্য সঞ্চয় হয়ে থাকে। আর ক্ষমার মাধ্যমে ঔদার্যগুণের প্রকাশ হয়। হুজুর, আপনি যখন আমাকে বাঁ-পায়ে সজোরে লাথি মারেন তখন কিন্তু আমার ভেতরের আন্ধার কেটে গিয়ে জায়গাটি আলােয় উদ্ভাসিতই হয়ে ওঠে। নেকড়েটি নিজের অজ্ঞতার জন্য অনুতাপ জ্বালায় দগ্ধ হতে থাকে। খেঁকশিয়ালটির পিঠ চাপড়ে এবার বলল—“ভাইয়া, তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছ। তােমার নিজের চৈতন্যোদয় হয়েছে। বলেই তাে এমন জ্ঞানগর্ভ সব বাৎ বাতলাতে পারছ। সত্যি বলতে কি তােমাকে সেদিন লাথি মেরে আমি স্বস্তি পাইনি। এবার থেকে একটু সামলে সুমলে চলবে যাতে এমন দুর্ব্যবহার আমাকে আর করতে না হয়।
‘ভাইজান, আল্লাতাল্লার কাছে প্রার্থনা করি তিনি আপনার ক্ষমতা ও প্রতাপ বৃদ্ধির সহায়ক হােন।
–‘তােমাকে তাে আমি আগেই বুকে টেনে নিয়েছি ভাইয়া।
এখন থেকে তুমি আমার অভিন্ন হৃদয় বিশ্বাসভাজন অনুচর হলে। হরবখত চোখ-কান খােলা রাখবে। যদি নতুন কিছু দেখ সঙ্গে সঙ্গে এসে আমাকে খবর দেবে।
খেকশিয়াল করজোড়ে নিবেদন করল—আপনার হুকুম তামিল করাই তাে বান্দার কাজ। আল্লাহ আপনার ভালই করুন।
এবার খেকশিয়াল নেকড়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। ছােট-বড় কয়েকটি ঝোপঝাড় অতিক্রম করে এক আঙুর বনে ঢুকল। জায়গাটি তার পরিচিত। এখানে মস্ত বড় এক নালা রয়েছে। তাই সে এ-পথে না এসে ঘুরে যাতায়াত করে। মহাজনরা তাে উপদেশ দিয়েছেনই, চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলাফেরা করবে। অন্যথায় পতন ঘটতে বাধ্য।
খেকশিয়ালটি আপন মনে বলে উঠল-শয়তান আদমকিনের ছলাকলা আর ছদ্মবেশের ব্যাপার-স্যাপার আমি ধরে ফেলেছি। যদি খেকশিয়ালের কোন নকল মূর্তি এখানে চোখে পড়ে তবে আর এখানে দাঁড়ানাের দরকার নেই। নির্ঘাৎ আদমকিন নতুন কোন ফাঁদ পেতে সর্বনাশ সাধনে ব্রতী হয়েছে। ব্যস, সােজা চম্পট দেব।” এরকম বলতে বলতে অতি সন্তপর্ণে পা ফেলে, মাটির গন্ধ শুকে, বাতাসের আঘ্রাণ নিয়ে, কান দুটো সজাগ রেখে সে বিপদ সীমা পেরিয়ে গেল। এবার এক গর্তের ধারে এসে আচমকা দাড়িয়ে পড়ল। ভাল করে তাকিয়ে দেখল কে যেন লতাপাতা দিয়ে গর্তের মুখটি বুজিয়ে দিয়ে গেছে। তার মনে পুলকের সঞ্চার হ’ল। কিন্তু কিসের পুলক, কেনই বা সে এমন পুলকিত হ’ল নিজেই জানে না।
খেকশিয়ালটি এবার এগােবার ধান্দা করল। ঠিক তখনই নেকড়ের সঙ্গে দেখা। মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে সে নেকড়েকে বলল —“হুজুর, মনে হচ্ছে আল্লাতাল্লা এবার আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন। আমাদের নসীবের চাকা ঘুরে গেছে। নেকড়ে চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ এঁকে ধমকের স্বরে বল্ল –‘ধানাইপানাই রেখে সাফ সাফ বাতা, ব্যাপার কি। সােল্লাসে শিয়ালটি এবার বলল —এ-জঙ্গলের মালিক দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। তাকে গাের দেওয়া হয়েছে। আমি নিজের চোখে তার গােরস্থান পর্যন্ত দেখে এলাম।
—তবে তাে নসীব উল্টে দিয়েছ দেখছি। তবে আর আমড়া কাঠের টেকির মত হাঁ করে দাঁড়িয়ে কেন? সেখানে গিয়েই দাঁড়িয়ে থাক, পাহারা দাও।
নেকড়ের কাছ থেকে আচ্ছা মত ধমক খেয়ে খেকশিয়াল গুটি গুটি এগিয়ে চলে। নেকড়ে তাকে অনুসরণ করে। সামান্য গিয়ে খেকশিয়াল বলল—“হুজুর, এখানে-জঙ্গলের মালিককে এখানেই গাের দেওয়া হয়েছে।' আঙুরবন। থােকা থােকা আঙুর ঝুলছে। এত আঙুর দেখে নেকড়ে আর লােভ সম্বরণ করতে পারল না। শরীরের সবটুকু তাগদ দিয়ে সে এক লাফ দিল আঙুরের একটি থােকা ধরার জন্য। পারল তাে না-ই উপরন্তু আছাড় খেয়ে মাটিতে পড়ল। ব্যস, একেবারে লতাপাতায় বন্ধ করা গর্তটির মুখে ধপাস করে আছড়ে পড়ল। এতেল আর স্বাভাবিক গর্ত নয়, একটি ফাঁদ। নেকড়ে পড়ামাত্রই গর্তের মধ্যে সিঁধিয়ে গেল।
নেকড়ের দুরবস্থা দেখে খেকশিয়ালটি উল্লসিত হয়। সে সামনের পা দুটো তুলে আনন্দে লাফাতে লেগে যায়।
নেকড়ে ফাদ থেকে মুক্তি পাবার জন্য নানা ফিকির করতে লাগল। সব চেষ্টাই তার বিফলে গেল। কোন কৌশলই ফলপ্রসূ হল না। পরিশ্রম বেকার হয়ে গেল।
নেকড়ে ধমক দিয়ে ওঠে—এ কী দোস্ত, এমন চরমতম বিপদের সময় তুমি ঠ্যাঙ ছড়িয়ে কাঁদতে বসে গেলে! কান্না থামিয়ে দেখ, কোন ফন্দি ফিকির বের করতে পার কিনা যাতে আমি গাজ্ঞা। থেকে উদ্ধার হতে পারি। স্বীকার করছি, এক সময় আমি তােমার ওপর একটু-আধটু নির্মম নিষ্ঠুর আচরণ করেছিলাম। আজ তার জন্য অনুশােচনায় কম দগ্ধ হইনি। সে সব এখন দিল থেকে ঝেড়ে মুছে ফেলে আমার জন্য কিছু কর। আমার লেড়কা লেড়কিদের খবর দেওয়ার চেষ্টা কর। আমার চরম বিপদের দৃশ্য নিজের চোখে তারা দেখুক। চোখের পানি মুছে আমাকে কিভাবে উদ্ধার করা যায় সে ফিকির বের কর।
খেকশিয়াল এবার নিজমূর্তি ধারণ করল। দাঁত-মুখ খিচিয়ে নেকড়ের কথার জবাব দিল--কী আমার পিরিতের নাগর রে। তার জন্য আমি কেঁদে বুক ভাসাতে যাব। হতচ্ছাড়া, নচ্ছার, শয়তান কাহিকার । বলে কিনা একটু-আধটু নির্মম নিষ্ঠুর আচরণ করেছিল। হারামি, তাের লাথির চোটে আমার কলিজাটি ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এখনও আমার বুকটি ধুকপুক করে। তাের আজকের দুর্গতি আরও ক’বছর আগেই হওয়া উচিত ছিল। আল্লাতাল্লা তাের সহায় বলেই আজও তাের হাড্ডিগুলি আস্ত রয়েছে। তাই তাে চোখের সামনে তুই একটু একটু করে মরবি আর আমি তা দেখে উল্লাস করব।
‘আমি জানি দোস্ত, তুমি মুখে যা-ই বল না কেন আমার এরকম চরমতম দুঃসময়ে তুমি কিছুতেই মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারবে না। তােমার দিল কত উদার তা আর কেউ না জানুক আমার তাে অন্তত অজানা নয়। আমাকে এ-গাড়া থেকে উদ্ধার করার ফিকির তুমি বের করবেই।
খেকশিয়াল গাড়ার কাছে দাঁড়িয়ে ফিক ফিক করে হাসতে থাকে। নেকড়েটি এবার প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল-“দোস্ত, একটু বড় রশিটশি জোগাড় করে নিয়ে এসাে, নিদেনপক্ষে শক্ত দেখে লতা-পাক দিয়ে রশি বানিয়ে নাও। তার এক প্রান্ত গাছের সঙ্গে বেঁধে অন্য প্রান্তটি গাড্ডায় আমার দিকে নামিয়ে দাও। আমি রশি বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠে আসতে পারব। দোস্ত, তােমার এ সহৃদয়তার কথা আমি জিন্দেগীতে ভুলব না।।
খেকশিয়ালটি বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে হেসে বলল-শয়তান কাহিকার! তাের এমন সুন্দর বাক্যি এতদিন কোথায় ছিল? তবে হ্যা, তাের আত্মা গাড্ডা থেকে উঠে বেহেস্তে-ধুৎ বেহেস্তে নয়, দোজকে চলে যাবে। কিন্তু তাের নশ্বর দেহটি গাড্ডার ভেতরেই পচে-গলে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। জিন্দেগীভর সবার সঙ্গে যে দুর্ব্যবহার করেছিলি তার ফল তাে ভােগ করতেই হবে।
নেকড়ের দু চোখের কোল বেয়ে পানি গড়াতে লাগল। খেকশিয়াল বলে চলল—“ওরে শয়তান, মরতে যখন হবেই তখন বৃথা চোখের পানি ফেললে ফয়দা কিছু হবে না। তার চেয়ে বরং বাজ পাখির কিসসা, বলছি, সবার আগে শুনে নে।
বাজপাখির কিসসা
খেকশিয়াল বল্ল, কিছুদিন আগের কথা। এক বিকালে আমি আঙুর বনে ঢুকে টসটসে আঙুরের থােকা পেড়ে উদরস্থ করছি। হঠাৎ আঙুর বনের ধারে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল। একটি তিতির পাখি আছাড় খেয়ে পড়ল। ওপরের দিকে চোখ ফেরাতেই একটি বাজপাখিকে দেখতে পেলাম। বুঝতে অসুবিধা হ’ল না, নসীব বিড়ম্বিত তিতির পাখিটি বাজপাখিটির খপ্পরে পড়েছিল ।
বিপদের মুহুর্তে আল্লাহ তিতির পাখিটির দিকে মুখ তুলে তাকালেন। সে সামনে একটি গর্ত পেয়ে টুক করে তাতে ঢুকে গিয়ে আব্বার দেওয়া জানটিকে কোন রকমে রক্ষা করতে পারল। বাজপাখিটি কিন্তু এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নয়। ধরা শিকার হাতছাড়া হবার আক্ষেপ বুকে নিয়ে গর্তটির মুখে ঠায় বসে রইল। আজ না হােক কাল হলেও তাকে বাইরে আসতেই হবে। পেটের জ্বালা বড় জ্বালা।
গর্তের মুখে বসে, তিতিরটি শুনতে পায় এরকম উচ্চগ্রামে গলা চড়িয়ে বলতে লাগল—“ওরে ছােট্ট পাখি, আমার আদরের দুলাল, এত ভয় ডরের কি আছে বুঝছি না তাে। কোন ডর নেই। আমি তাে বুঝি, খিদেতে তাের পেটে জ্বালা ধরে গেছে। কেন ঝুটমুট নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিস, বল তাে? আয়, বাইরে বেরিয়ে আয়। এসে দেখ, কী সুন্দর সব দানা তাের জন্য জোগাড় করেছি। পানিও আছে। তােকে আমি যে নিজের কলিজার চেয়েও ভালবাসি তা যদি জানতিস তবে আর গর্তে ঢুকতিস না। তুই কি বুঝিস নে, তােকে বুকে করে নিয়ে আমি তাের সুখের খোঁজেই যাচ্ছিলাম? বােকা হাঁদারাম তিতির পাখিটি শয়তান বাজপাখির মধুমাখা বাক্যি শুনে মজে গেল। সে বাইরে বেরিয়ে আসতেই বাজপাখিটি টুক করে তাকে দু'পায়ে আঁকড়ে ধরে সােজা আকাশের দিকে উঠে গেল।
এবার সে এমন জোরে আঙুল দিয়ে চেপে ধরল যে, ছােট্ট তিতিরটির জান বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড় হ’ল। রাগে ও যন্ত্রণায় সে রীতিমত কাৎরাতে লাগল—“আমার গােস্ত খেয়ে খুশি হবি ভেবেছিস, তাই না? সেটি কিছুতেই হতে দিচ্ছি না। আমি পেটে গিয়ে বিষ হয়ে তাের জান খতম করব। মরতেই যদি হয় তবে তােকে নিয়েই মরব। বাজপাখিটি তিতিরের কথায় কানও দিল না। সে তাকে মুখে পুরেই টুক করে গিলে ফেলল।
কী তাজ্জব ব্যাপার! ছােট্ট পাখি তিতিরটির করুণ প্রার্থনা বুঝি আল্লাতান্না শুনতে পেয়েছিলেন। তিতিরটিকে গেলামাত্রই বাজপাখিটি কেমন এলিয়ে পড়ল। বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। ব্যস, সব খতম।
কিসসা শেষ করে খেকশিয়াল এবার নেকড়েটিকে বলল—“কি রে শয়তান, কি বুঝলি? বাজপাখির মত তাের দশাও একই রকম হবে। অত্যাচার, অবিচার, শােষণ আর অধর্মের শেষ একদিন না একদিন হবেই। আর তার ফল অত্যাচারীকে ভােগ করতেই হবে। না, আল্লাতাল্লা তাের শেষ বিচারের ব্যবস্থা করেছেন।
নেকড়ে কেঁদেকেটে বলে—“ভাইয়া, দোস্ত আমার, একটু সদয় হও। এমন করে মুখ ফিরিয়ে থেকো না। একদিন দেখবে, আমিই তােমার সবচেয়ে বড় হিতাকাঙ্ক্ষী। খেকশিয়াল মুখে বিদ্রুপের হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল-“হায় রে হতচ্ছাড়া নেকড়ে ! তাের দেখছি কোন কাণ্ডজ্ঞানই নেই। কোন নীতি কথাই তাের জানা নেই! তাজ্জব ব্যাপার! মরার আগে যেটুকু পারিস শুনে নে। বিজ্ঞজনরা বলে গেছেন তাের মত কদাকারদের চেহারা আর চোখের শয়তানী দেখেই তার দিলের প্রকৃত স্বরূপ সম্বন্ধে ধারণা করে নিতে হবে। একটু আগেই তুই যেসব মিঠা প্রলেপ দেওয়া বাৎ আওড়েছিস তা খুবই উপাদেয় সন্দেহ নেই। কিন্তু তাের মুখে সারল্যের লেশমাত্র নেই। আর চোখের তারায় শয়তানীর সুস্পষ্ট ছাপ কেন? তুই আমাকে বিপদের সময় সৎ পরামর্শ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিস, কিন্তু তাের ঘটে যদি সত্যি ছিটোফোটা বুদ্ধিও থাকে তবে তাে নিজে গর্ত থেকে বেরিয়ে আসার ফিকির নিজেই বের করে ফেলতে পারতিস। তুই ভাবিস তাের মত ধূর্ত দ্বিতীয় কেউ-ই নেই। কার্যতঃ আমি কিন্তু দেখছি, তাের মত মাথায় গােবর পােরা এক নিরেট মূর্খ অন্য কোন প্রাণীই নেই। নইলে আমার কথা ভাল-মন্দ বিবেচনা না করেই আঙুর বনে আসতেই বা গেলি কেন? আর না হয় এলি কিন্তু লাফালাফি করে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনতে গেলিই বা কেন? সবশেষে বলছি, তাের নসীবই তােকে ব্যাপারটি নিয়ে তলিয়ে দেখার মত দিল দেয় নি। নইলে অবশ্যই একবার হলেও ভাবতিস, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে চেষ্টা করতিস, এখানে লতাপাতার নিচে কোন ফাঁদ পাতা আছে কিনা। বিশ্রী স্বরে হেসে খেকশিয়াল এবার বলল-“তাের নিজের ঘটেই বুদ্ধির লেশমাত্রও নেই আর তুই কিনা আমাকে আশ্বাস দিচ্ছিস, বিপদের সময় উপদেশ দিয়ে মুশকিল আসান করবি! আহাম্মক কাহিকার, তাের কথা শুনে এক হেকিমের কিসসা আমার মনে পড়ে গেল, জান খতম হওয়ার আগে কিসসাটি বরং শুনেই যা ।
এক আদমির ডান-হাতে একটি আব হয়েছিল। যত দিন যায় ততই বড় হতে থাকে। সে সঙ্গে ব্যথা বেদনা তাে আছেই। নগরের সব বড় ও নামকরা হেকিমকে তলব করা হ'ল। হেকিম তার দাওয়াইয়ের বাক্স নিয়ে ছুটে এল। হেকিমের চোখ ঢাকা, পটি বাঁধা।
রােগী জিজ্ঞাসা করল—‘হেকিম সাহেব, আপনার চোখে পট্টি কেন? কি হয়েছে? কোন্ বিমারি| হেকিম বিমর্ষ মুখে বলল —“আর বলবেন না ভাইয়া, আমার চোখে একটি আব হয়েছে। হেকিমের বাৎ শুনে রােগী তাে তাজ্জব বনে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে বলল —সে কী হেকিম সাহেব, আপনার চোখেই আব! ইলাজ করে আবটি সারাতে পারছেন না? এদিকে আপনি আবার আমার আবটির ইলাজ করতে এসেছেন? হাসালেন মশাই ; বুঝেছি, এ আপনার কম্ম নয়। আপনার ক্ষ্যামতায় আমার ইলাজ কুলােবে না। আপনার দক্ষিণা দিচ্ছি নিয়ে বিদায় হােন।।
তাই বলছি কি আহাম্মক নেকড়ে, অন্যের বিমারি সারাবার আগে তাের নিজের গলতি কিছু থাকলে আগে দাওয়াই দিয়ে সারিয়ে নে। আগে নিজের জান বাঁচাবার ফিকির কর। তারপর আমাকে উপদেশ দেবার কথা ভাববি। আমি বলি কি, তাের মরণ যখন ঘনিয়ে এসেছে তখন আর মিছে হ্যাচর ফ্যাচর করে লাভ কি। এখানেই চুপটি করে পড়ে থেকে ধীরে ধীরে মৃত্যুকে বরণ করে নে।
খেকশিয়ালটির কথা শুনে নেকড়েটি খুঁড়া বাচ্চার মত বিলাপ পেড়ে কাঁদতে শুরু করল। দোস্ত, আমাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাও। নিদেনপক্ষে তােমার লেজটি নিচে ঝুলিয়ে দাও। আমি ওটি ধরেই না হয় ওপরে উঠে যাই। কোশিস তাে করে দেখি, যদি জান বাঁচাতে পারি। তুমি আমার আগের সব গােস্তাকি মাফ করে দাও। আর আমার হিংস্রতা? আমি খােদার কসম খেয়ে বলছি, আমার মসৃণ দাঁত আর নখগুলি আজই পাথরে ঘষে ভোঁতা করে নেব। তবে তাে আর বিবাদ বিসম্বাদের প্রশ্নই উঠবে না। এমন কি গােস্ত খাওয়া পর্যন্ত ছেড়ে দেব, কথা দিচ্ছি। কেবল ঝর্ণার পানি খেয়ে জিন্দেগী কাটিয়ে দেব। তখন তাে আমি এক সাচ্চা ফকিরই বনে যাব। আল্লাহর নাম জপ করেই আমি দিন গুজরান করব।'
খেঁকশিয়ালটির মুখে বিদাপের হাসি লেগেই রইল। সে এবার বলল শয়তান কাহিকার, তাের মধুর বাৎ শুনে মজে যাব এমন আহাম্মক আমি নই। আর তাের মত এক ঝানু শয়তানের চরিত্র রাতারাতি বদলে গেছে এরকম কোন নজির অন্ততঃ আমার চোখের সামনে নেই। বােকা হাঁদা, আমাকে কি তাের মত আহাম্মক ঠাওরেছিস নাকি রে! আমি তাের বাৎ শুনেই সুড় সুড় করে লেজাট নামিয়ে দেব আর তাের সঙ্গে গলা জড়াজড়ি করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ব! তার চেয়ে তুই মৃত্যুর দিকে একটু একটু করে এগিয়ে যা আর আমি এখানে বসে তাের মৃত্যুযন্ত্রণা দেখে উল্লাস করি, কেমন ? পীর-পয়গম্বররা তাে বলেই গেছেন,-“একমাত্র দুরাচারীদের নিধনের মাধ্যমেই দুনিয়ার বিল্কুল গুনাহের অবসান ঘটা সম্ভব।”
নেকড়ে বিলাপ পেড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল —“আমার জিগরী দোস্ত খেকশিয়াল, আমি তাে জানিই আমীর-বাদশার ঘরে তুমি পয়দা হয়েছ। সমাজে তােমার একটি আলাদা খাতির আছে। তােমার পাণ্ডিত্যের কথা তামাম জঙ্গলের জন্তু জানােয়ারদের কারােরই অজানা নেই। আর তােমার ঔদাৰ্য্যগুণের কথা কে না জানে? তাই আমার এ উপকারটুকু করে তােমার চারিত্রিক গুণাবলী অক্ষুন্ন রাখ।'
খেকশিয়ালটি এবার ফিক করে হেসে উঠল। হাসি পাবারই তাে কথা। নেকড়ে ফাদে পড়ে খেকশিয়ালকে কেমন তােষামােদ শুরু করেছে তাতে হাসি চাপা সত্যি দুষ্কর। হাসতে হাসতে বলল —'ওরে নেকড়ে, তুই বােকাহাঁদা আমি জানতাম, কিন্তু এত যে বােকা ঘুণাক্ষরেও ধারণা করতে পারি নি। তােকে একটি উপদেশ দিচ্ছি, মরার আগে শুনেই যা—হেকিমরা সব কিসিমের বিমারিই ইলাজ করতে পারে, সারাতেও পারে। লেকিন মৃতদের জান ফিরিয়ে দিতে পারে না। আর একমাত্র হীরাতেই ভেজাল মেশানাে যায় না। একমাত্র নসীব ছাড়া আর যা কিছু আছে চেষ্টার মাধ্যমে সবকিছুকে আমরা এড়িয়ে যেতে পারি। তুই বারবার বলছিস, তাের জান বাঁচলে তুই জিন্দেগীভর আমার জিগরী দোস্ত হয়ে কেনা গােলাম হয়ে থাকবি। চমৎকার বাৎ, শয়তান কাহিকার। শােন, তাের শিক্ষা এখনও শেষ হয়নি। খল সাপের কিসসা তােকে শােনাচ্ছি, যদি কিছু অন্ততঃ শিক্ষা তাের হয়। এক সাপুড়ের ঝুড়িতে এক সাপ থাকত। একদিন সাপুড়ের অসতর্কতার সুযােগ নিয়ে সাপটি ঝুড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় চলে যায়। রাস্তায় হরদম গড়াগড়ি খেতে থাকে। আসলে তার শরীরে তেমন তাগদ ছিল না। দিনের পর দিন না খেতে দিয়ে সাপুড়ে তার তবিয়ত একেবারে ঢিলা করে দিয়েছিল। তাই বহুৎ কোশিস করল ভেগে যাবার জন্য। লেকিন পারল না। এক আদমি তাকে দেখে থমকে খাড়া হয়ে গেল। দিলটি দুখাইল। তাকে তুলে নিজের ঘরে নিয়ে গেল। দুধ আর কলা খাইয়ে খাইয়ে তার দেহে ফিন তাগদ ফিরিয়ে আনল। এবার সাপটির নিজের ওপর আস্থা ফিরে এল। সে নিঃসন্দেহ হ’ল-সে একাই এখন খুশীমত যেখানে খুশী চলে যেতে পারবে। যা খুশী করতেও পারবে। ব্যস, এবার সে নিজমূর্তি ধারণ করল। সে তার জান রক্ষাকর্তার শিরে ছােবল মেরে বসল। আর দেরী নয়। সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরে বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। অচিরেই তার জান খতম হয়ে গেল। তাই বলছি কি শয়তান নেকড়ে এবার আমি কেটে পড়ছি। তুই একাই বরং তাের মৃত্যুর দৃশ্যটি দেখ। খেকশিয়ালটি এবার কিছু দূরে একটি উঁচু জায়গায় গিয়ে গলা ছেড়ে ‘হুক্কা হুয়া হুক্কা হুয়া’ করে চেঁচাতে লাগল। তার গলা শুনে আঙুর খেতের মালিক লাঠি নিয়ে ছুটে এল।
ইতিমধ্যে খেকশিয়ালটি একটি ঝােপের আড়ালে চলে গিয়ে নেকড়ের গর্তটির দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে তাকাতে লাগল। এদিকে আঙুর খেতের মালিক লাঠি নিয়ে ছুটে গর্তটির কাছে এসে থমকে দাঁড়াল। ঝট করে বেড়ে একটি মতলব তার মাথায় এল। ইয়া পেল্লাই সব পাথরের টুকরাে এনে এনে নেকড়ের ওপরে ফেলতে লাগল। খেকশিয়ালটি ঝােপের আড়াল থেকে নেকড়ের বুকফাটা আর্তনাদ শুনতে পেল। কিন্তু সে আর কতক্ষণ? অচিরেই পাথরের আঘাতে তার জান খতম হয়ে গেল।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।
নেউল ও ইঁদুরের কিসসা
পরের রজনীতে বাদশাহ শারিয়ার আবার অন্দরমহলে বেগমের কামরায় এলেন। বেগম বললেন—জাহাপনা, আশা করি নেকড়ে ও খেকশিয়ালের কিসসাটি আপনার ভালই লেগেছে। এখন আপনাকে নেউল আর ইদুরের কিসসা শোনাচ্ছি ।
জাঁহাপনা, এক আউরত ক্ষীরার বীচির ডাল বানিয়ে বস্তিতে বস্তিতে বেচত। এক সকালে আউরতটির কাছে এক নওজোয়ান এল ক্ষীরার বীচির ডালের ফরমাস দিতে। হেকিম নাকি তাকে ব্যবস্থা দিয়েছেন ক্ষীরার বীচি সেদ্ধ করে খেতে। সে একবারে পাঁচ সের ক্ষীরার বীচি কিনে নিয়ে গিয়ে ঘরে মজুদ করে রাখতে চাইছে। আউরতটি বলল —“কাল এসে নিয়ে যেও। আমি বীচি থেকে ডাল বানিয়ে গােছগাছ করে রেখে দেব। তুমি এলেই পেয়ে যাবে। সন্ধ্যার পর সে অনেকক্ষণ ধরে কোশিস করে ক্ষীরার বীজ থেকে ডাল বানিয়ে একটি ঝুড়িতে করে খাটিয়ার তলায় রেখে দিল।

0 Comments