গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
আমার আব্বা আর আম্মার নাম ধরে এমন সব খিস্তি খেউড় করতে লাগল যা মুখে আপনার দরবারে পেশ করা খুবই কষ্টকর। আমি সুযােগের অপেক্ষায় ছিলাম। এক লাফে এক টিলা থেকে অন্য টিলায় যেতে গিয়ে আচমকা পিছনের পা দিয়ে শয়তানটিকে মারলাম এক চড় । সে হুমড়ি খেয়ে গিয়ে পড়ল এক খাদে। ব্যস, সে মওকায় আমি লম্বা দিলাম। পশুরাজ সিংহ জোর করে মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল—ভাল কথা। কিন্তু এখন দৌড়বার কি আছে।
চোখ দুটো কপালে তুলে গাধাটি এবার বলল—বলছেন কী জাঁহাপনা! শয়তানটি বলছে আমাকে ভিস্তিওয়ালার কাছে বেচে দেবে। আমার পিঠে জলের বােঝা—আঃ! আর ভাবতে পারছি না! জান খতম করে দেবে। এ বুড়াে হাড় এত ধকল কি আর সইতে পারবে! আদমকিন-এর মত শয়তান তামাম দুনিয়া ঢুঁড়েও আর একটি মিলবে না। ধরতে পারলে নির্ঘাৎ জান খতম করে দেবে।
গাধাকে পেয়ে আমি যেন আর একটু জোর পেলাম। করজোড়ে বল্লাম—জাহাপনা, জানােয়ারটি কি সাঙ্ঘাতিক পাজি, আশা করি এবার মালুম হচ্ছে? গাধার মত জানােয়ার যদি এমন পৌনে মরা হয়ে যায় তবে তাে আমাকে টুপ করে গিলেই ফেলবে।
গাধাটি পালাবার উপক্রম করলে পশুরাজ থাবা বাড়িয়ে তার লেজটি ধরে ফেলে বলল —“কতদিন আর পালিয়ে পালিয়ে বেড়াবে। তার চেয়ে আমার সঙ্গে চল, শয়তান আদমকিন-এর আস্তানাটি যদি খুঁজে পাই।
আরে ব্ব্যাস, খােদাতাল্লার দোহাই জাঁহাপনা, আপনি আমাকে অন্ততঃ এরকম হুকুম করবেন না। শুনেই আমার কলিজাটি হরদম ডিগবাজি খাচ্ছে। আমি দৌড়ে কোন নিরাপদ স্থানে গিয়ে আগে তাে জান বাঁচাই তারপর অন্য—'
গাধাটির কথা শেষ হতে না হতেই অন্য একটি জানােয়ারকে আমাদের দিকে আসতে দেখা গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে সে আমাদের কাছে এল। মুখ দিয়ে তার ফেনা ঝরছে।
পশুরাজের প্রশ্নের উত্তরে জানােয়ারটি তার নাম বলল—অশ্ব।
সে বলল—‘জাঁহাপনা, আদমকিন-এর দৌরাত্মে অতিষ্ট হয়ে আমি জান নিয়ে ভাগছি।'
পশুরাজ সিংহ গর্জে ওঠে—‘ভাগছ! জান নিয়ে ভাগছ! ইয়া তাগড়াই তােমার চেহারা। আর কী তােমার বিক্রম। আর তুমি কিনা সামান্য আদমকিন-এর ডরে ভাগছ! তােমার শরম হওয়া উচিত। তুমি পা দিয়ে একটি ঝাপটা দিলে পাহাড় পর্যন্ত কেঁপে উঠতে পারে। আর আমার তাে তােমার মত জাদরেল চেহারা না তা সত্ত্বেও আমি তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি তার গোস্ত দিয়ে নাস্তা সারব বলে। তাকে খতম করে দুনিয়া থেকে সরাতে না পারলে প্রজাদের কাছে যে আমার ইজ্জৎ ঢিলা হয়ে যাবে। আর তারা আমার আশ্রয় ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হবে। পথশ্রমে ক্লান্ত ঘােড়াটি ঘাসে মুখের ফেনা মুছে বল্ল‘জাঁহাপনা, নক্করবাজ শয়তান আদমকিন-এর ফন্দি ফিকির ধরতে পারে এরকম জানােয়ার আপনার রাজ্যে কেউ-ই নেই। বেটা একেবারে হাড়ে হাড়ে বজ্জাৎ! একবার ছলাকলা করে আমার গলায় দড়ির ফাস পরিয়ে কি নাজেহালই না করেছিল! দড়ির বিপরীত দিকটি একটি গাছের গুড়ির সঙ্গে বেঁধে ইয়া বড় বড় দাঁতগুলাে বের করে বিশ্রী কায়দায় ঠোট টিপে টিপে হাসছে। একদিকে রাগে আমার গা পিত্তি জ্বলে যেতে লাগল। ভয়ে আমার কলিজা শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেল। তারপর বাঁধন ফেলে তড়াক করে লাফিয়ে আমার পিঠে চাবুক কষাতে লাগল। অঙ্কুশ লাগানাে চাবুক। ফলে পেট ও পিঠের বহু জায়গায় কেটে গিয়ে খুন ঝরতে লাগল। তবু চাবুক থামাল না। তারপর প্রায় আধমরা করে এক কলুর কাছে আমাকে বেচে দেয়। কলু আমাকে দিয়ে ঘানি টানিয়ে দাম উসুল করতে মেতে গেল। শেষ পর্যন্ত একদিন খােদাতাল্লার নাম নিয়ে নচ্ছার কলুটিকে শরীরের সবটুকু শক্তি নিঃশেষে নিয়ােগ করে ঝাড়লাম এক লাথি। জাঁহাপনা, আমার কথা মানুন, বজ্জাতটির থেকে নিজেকে দূরে রেখে বাপের দেয়া জানটিকে রক্ষা করুন। মেহেরবানি করে পালান এখান থেকে।
পশুরাজ ঘােড়াটির কথায় বিতৃষ্ণায় দাঁত কিড়মিড় করতে থাকে। যত্তসব ভীরু কাপুরুষের দল জুটেছে। তােমরা দেখে নিও আদমকিনকে আমি খতম করবই করব। তোমরা শুধু আমার সঙ্গে গিয়ে তার ডেরাটি একবার দেখিয়ে দাও। তারপর কি করে তাকে ঢিট করি তােমরা দূরে দাঁড়িয়ে দেখবে। এবার বিরাট কুঁজ নাচিয়ে, গলা দুলিয়ে ধুকতে ধুকতে একটি উট এসে পশুরাজের সামনে দাঁড়াল। তার সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কাপছে। সিংহ চোখে-মুখে বিদ্রুপের ছাপ একে বল্ল-“কি হে, শয়তান আদমকিন-এর ডরে তােমাদেরও হাত-পা পেটে সিধিয়ে যাচ্ছে নাকি?”
-“জাহাপনা, আমার দুরবস্থার কথাটি একবারটি বিবেচনা করে দেখুন। নাকটির দিকে তাকিয়ে দেখুন হতচ্ছাড়া আদমকিন আমার নাক ফুটো করে মােটা একটি রশি বেঁধে দিয়েছে। আর পিঠে করে ইয়া পেল্লাই পাথরের চাঁই চাপিয়ে দিয়েছে। একটু বেগড়বাই করলেই পিঠে ঘন ঘন অঙ্কুশের ঘা মেরে মেরে আমার পিঠটিকে একেবারে ঝাঝরা করে দিয়েছে। তারপর বেগতিক দেখে দিল আমাকে এক কষাইয়ের কাছে বেচে। আমার আব্বারই কেবল নয় চৌদ্দ পুরুষের নসীব ভাল যে, হতচ্ছাড়া কৰাইটিকে লাথিগুতাে মেরে কোনরকমে ভেগে আসতে পেরেছি।
পশুরাজ এবার তড়পাতে লাগল-শয়তান আদমকিন। কোথায় আছে তােমরা একবারটি আমাকে দেখিয়ে দাও। আমি তার হাড্ডি আর গােস্ত আলাদা আলাদা করে ছাড়ব।”
‘জাহাপনা, তার দুরবস্থা নিজের চোখে দেখার কিছুমাত্র উৎসাহ-আগ্রহও আমার নেই। আমাকে ছেড়ে দিন, পালাই। জিন্দেগীভর আপনার কেনা গােলাম হয়ে থাকব তবু শয়তান আদমকিন-এর ধারে কাছে আমাকে যেতে বলবেন না। কথা বলতে বলতে বেচারি উটটি গােদা গােদা পায়ে থপথপ শব্দ করে পালাতে লাগল।
পশুরাজ সিংহ হতাশ দৃষ্টিতে দাঁত কিড়মিড় করে উটটির ফেলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
এমন সময় এক বৃদ্ধ, অতিবৃদ্ধ লাঠি ভর দিয়ে কোনরকমে পশুরাজের সামনে এসে দাঁড়াল। করজোড়ে নিবেদন করল ‘জাহাপনা, আমি একজন ছুতাের মিস্ত্রী। বনে বনে কাঠ কেটে গুঁড়া বাচ্চা নিয়ে কোনরকমে দিন গুজরান করি। আপনি বনের বাদশাহ। একচ্ছত্র অধিপতি। আজ আমার জিন্দেগী বরবাদ করে দিল এক শয়তান। সবাই হতচ্ছাড়াটিকে আদমকিন বলে জানে। আপনিও হয়ত বজ্জাতটির নাম শুনে থাকবেন।
-“তােমার কি ধরনের অনিষ্ট সে করেছে, বল তাে?
‘আমাকে শয়তানটি ছলাকলার মাধ্যমে খপ্পরে ফেলে উদয়াস্ত কাঠ কাটিয়ে নিচ্ছে। বদলে খানাপিনা বা ইনাম—কিছু আমাকে দেয় না। আজ আমি সুযােগ বুঝে কোনরকমে জান নিয়ে তার খপ্পর থেকে ভেগেছি। এবার নিজের পিঠটি দেখিয়ে বল্ল চেয়ে দেখুন, চাবুক মেরে মেরে আমার পিঠ কেমন ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে।
-“কিন্তু এরকম উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে চললে কোথায়? আমার কাছেই এসেছ, নাকি অন্য কোথাও—' পশুরাজের মুখের কথা শেষ হবার আগেই ছুতােরটি বল্ল জাহাপনা, আপনার দরবারে আমার অভিযােগ পেশ করলাম। এবার আপনার আব্বাজীর উজির চিতাবাঘের কাছেও যাব।
-“উজিরের কাছে? আমি যদি তােমার মুশকিল আসান করতে না পারি তবে উজির কি—
-না জাহাপনা, উজিরের কাছে যাব তেনারই তলব পেয়ে আদমকিন-এর দৌরাত্মে তিনি নাকি রাতের পর রাত নির্ঘম অবস্থায় কাটাচ্ছেন। আমাকে তলব দিয়েছেন, তেনার থাকার জন্য মজবুত করে একটি কামরা বানিয়ে দিতে।
ছুতাের মিস্ত্রীর কথায় সিংহ তেলে বেগুনে চটে যায়। দাঁত কিড়মিড় করে বলে—কী এত বড় স্পর্ধা! চিতাবাঘ তাে তিনি সামান্য উজির মাত্র। আর আমি বনের বাদশাহ। আমার কামরা না বানিয়ে তুমি চলেছ তার জন্য কামরা বানাতে। বলিহারি আব্দার তাে! আগে আমার জন্য খুব মজবুত করে একটি কামরা বানিয়ে দিয়ে তবে অন্যের কথা বিবেচনা করবে। ‘জাহাপনা, খােদা মেহেরবান, উজির আগে আমাকে তলব করেছেন। মেহেরবানি করে গােসসা করবেন না। আগে তার কামরাটি কোনরকমে বানিয়ে দিয়ে এসেই কোমর বেঁধে লেগে যাব আপনার জন্য খুব মজবুত একটি কামরা বানাবার কাজে। কথাটি কোনরকমে ছুঁড়ে দিয়েই বুড়াে ছুতাের মিস্ত্রীটি ছুটতে চেষ্টা করল। সিংহটি লেজ ছাড়ল না। দাঁত খিচিয়ে বলল—“মামদোবাজি পেয়েছ নাকি। আগে আমার কামরা বানিয়ে দিয়ে তবে অন্য কথা।
ছুতাের মিস্ত্রী দেখল, আদমকিন-এর হাত থেকে কোনরকমে জান বাঁচলেও শেষ পর্যন্ত পশুরাজের হাতেই তা যেতে বসেছে। সে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে সিংহের জন্য একটি কামরা বানিয়ে ফেলল। সিংহ দাঁত কিড়মিড় করে বলল—কী এক দায়সারা কাজ করলে হে! এতটুকু কামরায় আমাকে যে সর্বদা কুকুরকুণ্ডলি পাকিয়ে শুতে হবে। ছুতাের মিস্ত্রী বলল –‘মেহেরবান, গােসসা করবেন না। আসলে কাঠ তাে কেটেছিলাম উজির নেকড়ের মাপে কামরা তৈরির জন্য। সে কাঠে আপনার জন্য কামরা—ছােট তাে হবেই।
এমন সময় বুড়াে মিস্ত্রীর ঠিক পিছনে এসে দাঁড়াল ছােট্ট একটি জানােয়ার—আদমকিন। এক্কেবারে কদাকার চেহারা। বেটে খাটো - কিন্তু মােটাসােটা। মুখটি কদর্য, নাক খ্যাদা ; চোখ দুটো শরীরের তুলনায় খুবই বড়। জ্বলজ্বল করছে। যেন দুটো বড়সড় কাচের গুলিতে সরাসরি সূর্যের কিরণ পড়েছে। কুচকুচে কালাে লােমে সারা শরীর ঢাকা।
বিশ্রী স্বরে হেসে আদমকিন বলল—“কি গাে। নিজের ইয়া দশাসই চেহারার জন্য খুবই গর্বিত, তাই না? আমাকে চিনতে পারছ? পারলে না তাে? আমি তােমার মােউৎ। তােমাকে দুনিয়া থেকে তাড়িয়ে আমি জঙ্গলের নবাব বাদশা হ'ব। তামাম জঙ্গল আর পাহাড় শাসন করব। অবশ্য বেহেস্তে বা দোজখে যেখানে তােমার দিল চায় যেতে পার, আপত্তি নেই। কিন্তু আপত্তি একটিই তােমার আর এখানে থাকা চলবে না। মানে মানে যদি কেটে পড় তবে তাে কথাই নেই। নইলে তােমাকে ঢিট করার, তােমার নক্কারবাজি বন্ধ করার দাওয়াই আমার ভালই জানা আছে। কেশরগুলাে ধরে এমন এক হেঁচকা টান দেব যে, আছাড় খেয়ে জান খতম হয়ে যাবে।
পশুরাজ চোখের পানি ফেলে, হাউমাউ করে কেঁদে বলল — খােদাতাল্লার কসম। অপঘাতে আমার জান-
আদমকিন ফিক করে হেসে উঠল—“জিন্দেগীভর বহুৎ সুখই তাে করেছ। আর কেন। এবার তােমাকে জাহান্নামে—কথাটি শেষ না করেই আদমকিন তার ছােট্ট থাবা দুটো দিয়ে বেচারি পশুরাজের কেশর ধরে এমন এক হেঁচকা টান দিল যে, চার-পাঁচ হাত দূরে গিয়ে পড়ল। দারুণভাবে গােঙাতে লাগল। ব্যস, হাড়গােড় ভেঙে গুঁড়াে-গুড়াে হয়ে গেল। পশুরাজের সে কী করুণ আর্তনাদ! মাটিতে পড়ে বার কয়েক আছাড়ি পিছাড়ি করে পশুরাজ চিরদিনের মত দুনিয়া ছেড়ে গেল। ব্যস, সব খতম। আদমকিন যখন পশুরাজকে নিয়ে ব্যস্ত সেই সুযােগে কাঠ মিস্ত্রী সেখান থেকে গুটি গুটি কেটে পড়ল।
আদমকিন সিংহের লাশটি তার সদ্য তৈরি খুপরিতে ঢুকিয়ে দিল। এবার শুকনাে লতাপাতা জোগাড় করে দিল আগ ধরিয়ে। ব্যস, একদম খতম ।
এমন সময় এক সকালে একটি জাহাজ এসে দ্বীপটিতে নােঙর করল। একদল শিকারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হুড়মুড় করে জাহাজ থেকে নেমে এল। শিকারীদের দেখে ময়ুর-ময়ুরী থেকে শুরু করে চিতা হাতী প্রভৃতি সবাই যে, যেদিকে পারল ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। কিন্তু সমস্যায় পড়ল রাজহাঁসটি, সে না পারে ভাল উডতে আর না পারে ভাল ছুটতে। ফলে শিকারীরা অনায়াসে তাকে ধরে ফেলল, ছাল ছাড়িয়ে গােস্ত বের করল। রসুইখানায় নিয়ে গিয়ে তেল-মসলা দিয়ে আচ্ছা করে পাকিয়ে সবাই মিলে ভাগজোক করে খেয়ে নিল।।
শাহরাজাদ কিসসা থামিয়ে একটু দম নিতে লাগলেন। বাদশাহ শারিয়ার বললেন-‘বেগম সাহেবা, তােমার কিসসা আমার দিল কেড়ে নিয়েছে।
বাদশাহকে কথাটি শেষ করতে না দিয়ে বেগম শাহরাজাদ মুচকি হেসে বললেন-জাহাপনা, এর চেয়েও বহুৎ আচ্ছা কিসসা। আমার জানা আছে।
নওজোয়ান মেষপালক ও লেড়কির কিসসা
বেগম শাহরাজাদ এবার বললেন—জাঁহাপনা, এক নওজোয়ান মেষপালক ও লেড়কির কিসসা আপনার দরবারে পেশ করছি।
এক পর্বতমালার ধারে এক নওজোয়ান মেষপালক কুটীর বেঁধে বাস করত। সে ছিল যথার্থই সৎ, সত্যনিষ্ঠ, মহাধার্মিক ও পরােপকারী। তামাম মুলুকের আদমি তার গুণগান করে। এমন কি বনের পশু-পাখিরাও সকাল-বিকাল তার চারিত্রিক গুণাবলীর কথা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে। _ আল্লাহের কাছেও মেষপালকটির চারিত্রিক গুণাবলীর কথা পেীছে গেল। বহুবার তার সম্বন্ধে বহু কথা শুনে আল্লাহ বললেন, ব্যাপার কী!' একদিন আল্লাহ তার চারিত্রিক দৃঢ়তার পরীক্ষা নেয়ার জন্য তৎপর হলেন। তামাম মুলুকের আদমিরা যা বলে তার কতটুকু সত্যি যাচাই করবেন তিনি। তাই এক সকালে বেহেস্তের এক হুরী কে পাঠিয়ে দিলেন নওজোয়ান মেষপালকটির কাছে। মেষপালক তার কুটীরে শুয়ে। উঠি উঠি করেও তখন পর্যন্ত ওঠা হয়ে ওঠেনি। চোখ দুটো বন্ধ করে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় শুয়ে |
এমন সময় নাকে উগ্র খুসবু যাওয়ায় সবিস্ময়ে চোখ মেলে তাকাল। দেখল, এক লেড়কি দরজায় মনলােভা এক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ঠোট টিপে টিপে হাসছে। মেষপালকটির চোখে বিস্ময়ের ছাপ। সে ভাবছে, এ কী বাস্তব, নাকি খােয়াব দেখছে! চোখ দুটো রগড়ে আবার তাকাল। একই দৃশ্য। লেড়কিটি হরদম হেসেই চলেছে।
মেষ পালকটি নিঃসন্দেহ হ’ল, খােয়াব টোয়াব নয়। একেবারে সাক্ষাৎ এক খুবসুরৎ লেড়কিই বটে। সে চোখে-মুখে অনুরূপ হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল —“তুমি কে গাে সুন্দরী? এখানে, আমার কাছে তােমার কি দরকার? কই, আমি তো তােমাকে তলব করি নি ? তবে কেন কষ্ট করে এসে এখানে দাঁড়িয়ে রয়েছ?
লেড়কিটি তেমনি হাসতে হাসতে গিয়ে নওজোয়ান মেষপালকটির পাশে একেবারে গা-ঘেঁষে বসল। অভিমানের সুরে বলল —“তুমি যেন কেমন পুরুষ মানুষ। আমার ষোল বছরের রূপযৌবনের ডালি সাজিয়ে তােমার কাছে ছুটে এলাম। আর তুমি কিনা নিতান্ত নিস্পৃহের মত বেগুনবেচা মুখ করে অন্য দিকে তাকিয়ে রইলে! তােমার কি ইয়েটিয়ে নেই নাকি? আমি ছুটে এসেছি, আমার যৌবনসুধা তােমাকে নিঃশেষে দান করে তৃপ্ত হতে আর সে সঙ্গে তােমাকে তৃপ্তি দিতে। আমাকে দলন, পেষণ, চুম্বন প্রভৃতি সহকারে সম্ভোগ কর মেহবুবা। আমি আর যৌবনের ভার বৃথা বয়ে নিয়ে বেড়াতে পারছি না। আমার কলিজাটি জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। এসাে কাছে এসাে। আমাকে জাপ্টে ধর। দলে পিষে একেবারে শেষ করে দাও মেহবুব আমার। সবাই বলে তােমার দিল নাকি দয়া-মায়ায় ভরপুর। দিলদরিয়া তুমি! সবার বাঞ্ছা পূরণে তুমি সদা তৎপর হও। তবে কেন আমাকে বাঞ্ছা পূরণে বিমুখ করবে? কথা বলতে বলতে বেহেস্তের হুরীটি নওজোয়ান মেষপালকটিকে আলিঙ্গন করল। ব্যস, আর যাবে কোথায়! মেষপালকটি এক ঝটকায় লেড়কিটির কাছ থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিল। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল —নষ্টামি করার আর জায়গা পাও নি! বেরােও —দুশ্চরিত্রা, বে-শরম, বে-আব্রু লেড়কি কাহাকার! আর কোনদিন এ মুখাে হলে জান খতম করে দেব। আল্লাহ ছাড়া আর কোন কিছুর দিকেই আমার দিল ঝুঁকবে না কোনদিন।
লেড়কিটি কিন্তু ঘাবড়াল না। বরং সে ফিক করে হেসে মেষপালকটির দিকে সামান্য এগিয়ে বসল। চোখের বাণ মারল। কেন মিছে গােসসা করছ? ঝটমুট আমাকে তাড়িয়ে দেবার ধান্দা করছ! তােমাকে কিছু করতে হবে না। আমিই তােমার মধ্যে কামনার আগুন জ্বেলে দেব আর খুনে ধরার মাতন। দেখবে, সম্ভোগের বাসনা তােমার দিলে কেমন চড়চড় করে জেগে ওঠে। আমার আপেল রাঙা টসটসে ঠোট দুটো দেখে তােমার দিলটিতে মােচড় মেরে উঠছে না। চুম্বন করার জন্য তােমার ভেতরটি আকুপাকু করছে না? ভরা যৌবনের জোয়ারলাগা আমার বুক আর। থলথলে নিতম্ব দুটো কি তােমার কলিজাটিকে চঞ্চল করে তুলছে না ? তবে কেন মিছে তােমার যৌবনকে জোর করে দাবিয়ে রাখছ?”
বিশ্বাস কর, আমি আর পারছি না। মেহেবুব আমার, বুকে টেনে নাও আমাকে। তােমার প্রশস্ত বুকের চাপে আমার বুক পিষ্ট হােক। এরই মধ্য দিয়েই চরম প্রাপ্তির সুচনা হােক। পুরুষের দৈহিক নির্যাতনেই নারীর সুখ-শান্তি উৎপাদিত হয়।' নওজোয়ান মেষপালকটি তীরবিদ্ধ জানােয়ারের মত ফোস করে উঠল—'বেলেল্লাপনা করার আর জায়গা পাওনি শয়তানী। এখনও বলছি, ভালােয় ভালােয় আমার ডেরা থেকে বেরিয়ে যাও। নইলে এমন এক ঠুসা দেব জিন্দেগীর মত কামজ্বালা নিভে যাবে, বলে দিচ্ছি। লেড়কিটি নির্বিকার। যেন তার হম্বিতম্বি তার কানেই যায় নি। আচমকা লেড়কাটির গলা জড়িয়ে ধরে চুম্বন করার চেষ্টা করে। মেষপালকটি বিতৃষ্ণায় মুখ সরিয়ে নেয়।
-“সত্যি এমন এক ভাব দেখাচ্ছ যেন ইয়েটিয়ে কিছুই নেই তােমার। এমন তরতাজা আপাপবিদ্ধ কুমারী, ডাঁসা পেয়ারার মত টসটসে আমার বুক—চেখে দেখ একবারটি। এক কুমারী তার অমূল্য সম্পদ কুমারীত্ব তােমার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য উসখুস করছি আর তুমি কিনা ভাল আদমি সেজে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ। তার মুখটিতে হাত দিয়ে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে এবার বলল—'শােন, এ রসের স্বাদ তাে পাওনি কোনদিন, বুঝবে কি করে? জিন্দেগীভর ‘আল্লাতাল্লা’ আর ‘খােদাতাল্লা’ করেই নিজেকে বঞ্চিত করলে। একটিবার চেখে দেখ আমার ষোল বছরের যৌবন সুধা তখন দ্বিতীয়বারের জন্যে হন্যে হয়ে ছুটোছুটি দাপাদাপি করে বেড়াতে হবে, বলে দিচ্ছি।'
মেষপালকটি পরম বিতৃষ্ণায় চোখ-মুখ বিকৃত করে বলে উঠল-'ইয়া আল্লাহ! শােভন আল্লাহ! আমার চোখ-কান, দেহ দিল সবই অপবিত্র করে ছাড়ল দেখছি, বজ্জাত লেড়কি কাহিকার! ভাগ—ভাগ এখান থেকে ভাগ—ভাগ বলছি।'
খুবসুরৎ লেড়কিটি এবার ঝট করে উঠে দাঁড়াল। মেষপালক ভাবল, আপদ বিদায় হচ্ছে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে সে তার কামিজ, চুরিদার সব—সবই এক এক করে খুলে একেবারে বিবস্ত্রা হয়ে গেল। উদ্ভিন্ন যৌবনা লেড়কিটির সদ্য প্রস্ফুটিত যৌবন চিহ্নগুলাে নওজোয়ান মেষপালককে কাছে ডাকতে লাগল।
‘—অসহ্য-- অসম্ভব। কিছুতেই না। কিছুতেই সম্ভব নয়। আচমকা বিকট আর্তনাদ করে উঠল-না...না...না!' দু হাত দিয়ে চোখ দুটোকে ঢাকল। পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে বলে উঠল ‘বেশরম বে-ইজ্জৎ কুত্তী কহিকার। ভাগ আমার চোখের সামনে থেকে। কথা ক’টি লেড়কিটির দিকে ছুঁড়ে দিয়েই সে একটি গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে, পিছন ফিরে বসে রইল।
লেড়কিটি অনন্যোপায় হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল ‘ওগাে, ধামিকপ্রবর, তােমার ধর্মনিষ্ঠা ও একাগ্রতার কাছে আমার রূপ-যৌবন পদদলিত হল। আমি পরাজয় স্বীকার করে বিদায় নিচ্ছি। তুমি আল্লাহর প্রতি ভক্তি অবিচল রেখে জিন্দেগীকে সার্থক করে তােল। কথা ক’টি বলে বেহেস্তের হুরী মুহুর্তে মিলিয়ে গেল।
বেগম শাহরাজাদ কিসসা শেষ করলে বাদশাহ শারিয়ার ভাববিমুগ্ধ চিত্তে বলে উঠলেন-‘বেগম সাহেবা, তােমার কিসসা আমার দিলের দরওয়াজা একটু একটু করে খুলে দিচ্ছে। এরকম কিসসা যদি তােমার আর জানা থাকে তবে তা শুনিয়ে আমাকে চিত্তশুদ্ধির সুযােগ দান কর।'
বক ও কচ্ছপের কিসসা
এক শ’ ছেচল্লিশতম রজনী
বেগম শাহরাজাদ বললেন—জাহাপনা, এবার আপনাকে বক ও কচ্ছপের কিসসা শােনাচ্ছি।
কোন এক সমুদ্রের কূলে বসে এক বক উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্রের রূপ-সৌন্দর্য দেখছিল। এমন সময় সমুদ্রের কূল ঘেষে এক মৃতদেহ ভেসে যেতে দেখল। লাসটি ফুলে-ফেঁপে একেবারে ঢোল হয়ে গেছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের তালে তালে নাচতে নাচতে লাসটি গিয়ে এক পাহাড়ের গায়ে আটকা পড়ে গেল। বকটি লাসটিকে অনুসরণ করে পাহাড়টির গায়ে গিয়ে বসল। লাসটির দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। দেখতে পেল, তার মুণ্ডুটি নেই। গায়ে সিপাহীর কোর্তা। বকটি বুঝতে পারল লড়াইয়ে পরাজিত হওয়ায় তার এ হালৎ করে লাসটি সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছে।
বকটি ভাবল, সিপাহীটির নসীবে যা ছিল তা-তাে অনেক আগেই ঘটে গেছে। এখন আমি-এর সদগতি করলে আমার গুনাহ তাে কিছু হবার কথা নয়। এরকম ভেবে সে লাসটির গা থেকে গােস্ত দিয়ে জিভটিকে একটু ঝালাই করে নেবার মতলব করল।
বকটি যেই না ডানা মেলতে যাবে অমনি অতিকায় এক কচ্ছপকে দ্রুত লাসটির দিকে এগিয়ে আসতে দেখল।
কচ্ছপটি এগিয়ে এসে বলল—“ভাইয়া, এখানে বসে যে? কি দেখছ এমন করে? বকটি মুচকি হেসে বলল —“কিছুই না। একেলা বসে বসে তােমার কথাই ভাবছিলাম ভাইজান। তুমি হঠাৎ কখন এসে তীরে উঠে পড়। বিপদের সম্মুখীন হও—এসবই ভাবছিলাম। আসলে ইদানিং এখানে খুব নেকড়ের আনাগােনা শুরু হয়েছে কিনা। হরদম ছোঁক ছোঁক করে বেড়ায়। তাই ভাবছি, হতচ্ছাড়া এ-মুলুক ছেড়েই ভেগে যাব।
–‘ভাইয়া যদি নেহাৎই কোথাও ভাগার ফিকির কর তবে কিন্তু আমাকে সাথে নিতে ভুলাে না যেন। আর এখানে কেউ খাতির টাতিরও তাে করে না। ভিনদেশে গেলে দেখবে সবাই আমাদের কেমন খাতির আত্তি করে। আজ থেকে তােমাকে আমার জিগরি দোস্ত করে নিলাম।
কচ্ছপের কথায় বকটির দিল গলে যায়। আহ্লাদে একেবারে গদগদ হয়ে গেল। ভাইজান, তুমি আমাকে তােমার দোস্ত একেবারে জিগরি দোস্ত বানিয়ে নিলে, কম কথা! তােমার মত দিল দরিয়া প্রাণী দ্বিতীয় আর একটি আছে বলে আমি মনে করি না। স্বার্থ এর এ দুনিয়ায় প্রকৃত দোস্ত পাওয়াই তাে মুশকিল। আমার জাতের মধ্যে যারা আছে সবারই এক ধান্দা। ভাল ভাল মছলি পাকড়ে খাবে আর হরদম গুড়াবাচ্চা পয়দা করবে। নিজেকে, নিজের জননাকে নিয়েই সবাই মজে থাকে। ইয়ার দোস্ত তাে দূরের কথা আল্লাহর কথা পর্যন্ত ভুলেও ভাবে না।
কচ্ছপ অপলক চোখে বকের দিকে তাকিয়ে তার কথাগুলাে শুনল। এক সময় উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে বলে উঠল—“বাঃ কী চমৎকার কথা! কী সুন্দর তােমার ভাষাজ্ঞান। কথা শুনলে দিল জুড়িয়ে যায়! এক কাজ কর ভাইয়া। আমার কাছে এসাে। আমরা পরস্পরকে আলিঙ্গন করে ভাব বিনিময় করি, দোস্তিটিকে একটু
( চলবে )

0 Comments