আরব্য রজনী পার্ট ৫০ ( Part 50 ) Alif laila part 50

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
আমার পঙ্খীরাজ খেল দেখাল। সবাই তাজ্জব মানল। সৈন্যদের শিরায় শিরায় খুন টগবগিয়ে উঠল। তাদের সেনাবাহিনীতে যা দুর্লভ তা যদি এক ডাকাতের কাছে থাকে তবে খুন শিরে চাপবেই। তারা পাগল হয়ে গেল। সমানে বর্শা খুঁড়তে লাগল আমাকে লক্ষ্য করে। ব্যস, তাদেরই দু-চারটে আমার গায়ে গেঁথে গেল। তবু আমার জান হয়ত টিকে যেত কিন্তু ঘােড়ার গতি বাগে আনতে পারলাম না। এক নাগাড়ে তিনদিন-তিনরাত্রি বাতাসের বেগে সে ছুটল। খােদাতাল্লার দোয়া না থাকলে এমনটি তাে হতে পারে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাকাতটি এলিয়ে পড়ল। কণ্ঠস্বর ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসতে লাগল। জড়িয়ে জড়িয়ে কোনরকমে উচ্চারণ করল- “দোস্ত, আমার ডাক এসে গেছে। দুনিয়ার খেল খতম। দিল চাইছিল তােমার সর্দারের সঙ্গে একবার ভেট করি। সে আর হবার নয়। আমার দেহটা গাের দিতে ভুলাে না যেন। আর আমার জান এ-ঘােড়াটিকে তােমার হাতে তুলে দিয়ে গেলাম। একে আমি অল-কাতুল-অল মাজনুন নামে ডাকি। কথাটি শেষ করেই সে আদমি দুনিয়া ছেড়ে বেহেস্তর পথে যাত্রা করল। তারা দু'জনে মিলে মাটি খুঁড়ে তাকে গাের দিল।

বেগম শাহরাজাদ তার কিসসার এ পর্যন্ত বলতে না বলতে প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় ভােরের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।
বাদশাহ শারিয়ার পরের রজনীতে অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার অবশিষ্টাংশ শুরু করলেন। | ডাকাতটির মৃতদেহ গাের দেওয়ার কাজ মিটল। এবার ডাকাত সাব্বা কানমাকানাকে ঘােড়ার পিঠে চাপিয়ে নিজে ক্রীতদাসের মত তার পিছন পিছন পয়দল চলল। পাহাড়ের পাদদেশে ঘােড়া থামাল। খানাপিনা সারা দরকার। কিন্তু কোথায় খানা? উপায়ান্তর না দেখে বর্শা চালিয়ে একটি হরিণ শিকার করল। তার গােস্ত পুড়িয়ে উভয়ে পেটের জ্বালা নিভাল।।

আবার তারা পথে নামল। পথে তিনজন সৈনিকের মুখােমুখি হতে হ’ল তাদের। বাধল লড়াই। কানমাকানা বলল—‘তুমি দাঁড়িয়ে মজা দেখ। আমি একাই জানােয়ার তিনটিকে খতম করতে পারব। আমার গায়ে সুলতানের খুন বইছে। আমি সুলতান উমর অল-নুমান-এর নাতি। কথা বলতে বলতে সে সৈনিক তিনজনের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। অনায়াসেই তাদের ঘায়েল করে সাব্বার কাছে ফিরে এল।

সাব্বা তার পিঠ চাপড়ে বলল —সাবাস দোস্ত! শাহজাদার মত কাজই করেছ বটে! তােমার কজির জোর আমাকে অবাক করেছে।

আবার ঘােড়া এগিয়ে চলল। আগের মতই ঘােড়ার পিঠে কানমাকানা আর পয়দল চলছে ডাকাত সাব্বা।

                           নিগ্রো লেড়কির কিস্সা

পথ চলতে চলতে এক নিগ্রো লেড়কির সঙ্গে কানমাকানা ও সাব্বার ভেট হয়। আলাপ পরিচয় হয়। সে মরু অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে মরুবাসীদের কিসসা শুনিয়ে পেট চালায়। এ-ই তার জান বাঁচাবার ফিকির। কানমাকানা বল—“আজ রাত্রিটুকু আমাদের সঙ্গেই কাটাবে। আপত্তি আছে? তুমি কিসসা বলবে, আমরা শুনব, রাজী তাে?”

‘আমার তাে এ-ই ধান্দা বাবু সাব। আপত্তির কি আর থাকতে পারে!'

একটি ঝাকড়া বাদাম গাছের তলায় সাব্বা তাঁবু খাটাল। হরিণের পােড়া গােস্ত দিয়ে খানাপিনা সারল তিনজনে। তাঁবুর সামনে নরম ঘাসের বিছানায় তিনজন বসল। কানমাকানা বলল —কই গাে, কিসসা শুরু কর।

নিগ্রো লেড়কিটি একটু নড়ে চড়ে জুত হয়ে বসে তার কিসসা শুরু করল—এক চরস খােরের কিসসা শুরু করছি। এক ফেরেবাজ নওজোয়ান ছিল। তার নেশা একটিই কুমারী লেড়কির দেহ সম্ভোগ করে বেড়ানাে। তার খপ্পরে একবার পড়লে কোন কুমারীরই আর ইজ্জত বাঁচানাে সম্ভব হত না। আমীর বাদশাহের মত অর্থও ছিল তার। যাকে বলে একেবারে দিনারের পাহাড়ের মালিক। নিত্য-নতুন কুমারী লেড়কি জোগাড় করার হিম্মতও ছিল তার। দিনের পর দিন জনানার দেহ সম্ভোগের মধ্য দিয়ে একদিন তার মনে বিতৃষ্ণা দেখা দিল। ভাবল, দেহ আলাদা আলাদা বটে। কিন্তু জিনিস তাে একই। কত আর রােচে! দিনের পর দিন দলন, পেষণ, চুম্বন আর সম্ভোগে বিতৃষ্ণা তাে আসতেই পারে। কার্যতঃ হ’লও তা-ই। আবার এদিকে অর্থও ফুরিয়ে এল। নতুন ফিকির করবে কি দিয়ে?

লেডকাটি নিঃস্ব হয়ে দৈন্যদশার মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে লাগল। কোর্তা-পাৎলুন জোগাড় করার মতও ফিকির নেই। পােশাক ফেঁসে গেছে। কিনবে কি দিয়ে ? খানাপিনাও জোটে না। ভিখ মেঙ্গে দিন গুজরান করে। একদিন বাজারের পথে পথে ভিখ মেঙ্গে বেড়াবার সময় তার পায়ে এক পেরেক গেঁথে যায়। বহুৎ খুন ঝরল। বহুৎ কোশিস করল, খুন বন্ধ করতে পারল না।

কয়েক পা গিয়ে এক হামামে ঢুকে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে পা-টিকে আচ্ছা করে ধুয়ে নিল। তখন তার নজরে পড়ল এক আদমি অন্য এক পৈঠায় বসে মৌজ করে কি যেন চিবােচ্ছে। কৌতুহল হল।

তাকে জিজ্ঞাসা করল—“কি খাচ্ছ গা?

সে আদমি জবাব দিল-হাসিস। খাবে? দিল চাইলে বল, দিতে পারি।

–‘দাও একটু, খাবাে। খেয়ে দেখি তােমার হাসিস কেমন নেশা ধরাতে পারে। সে আদমিটি ফিক করে হেসে মুখ থেকে সামান্য হাসিস বের করে নওজোয়ানটির হাতে দিয়ে বলল-“চিবােও। দুনিয়াকে ভুলে থাকার এমন দাওয়াই আর হয় না।

নওজোয়ানটি দ্বিধা না করে হাসিসটুকু মুখে ছুঁড়ে দিয়ে ঘন ঘন চিবােতে লাগল। অভ্যাস নেই। আগে কোনদিন হাসিস চোখেও দেখে নি। ফলে বার কয়েক চিবােতেই বেমালুম নেশার শিকার হয়ে পড়ল। ফিক ফিক করে হাসতে শুরু করল। হামামে যারা গােসল করতে এল তারা তাকে দেখে পাগল ঠাওরাল।

কিছুক্ষণ হাসাহাসির পর সে পাথরের মেঝের ওপর সটান শুয়ে পড়ল। এবার হাসি থেকে শুরু হ’ল প্রলাপ বকা। তার সে প্রলাপ থেকেই আজকের এ- কিসসার সূত্রপাত। এবার তাকে দুটো নিগ্রো জাপটে ধরল। উলঙ্গ করে ফেল্ল। পিঠমােড়া করে বেঁধে হামামের এক ধারে মেঝের ওপর ফেলে দিল। তারপর ইয়া বড় বড় খােসা আর সাজিমাটি দিয়ে ঘষে ঘষে তার গায়ের ময়লা তুলল। পানি ঢেলে ঢেলে গােসল করাল। একেবারে সাফসুতরা এক নওজোয়ান হয়ে গেল সে। এমন সময় অন্য আর এক নিগ্রো এসে বলল-“জলদি কর, সময় হয়ে গেছে। এবার একে পাত্রীর ঘরে পৌছে দিতে হবে।

নওজোয়ানটি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। চোখ দু'টি কপালে তুলে বলল—‘পাত্রীর? কিসের পাত্রীর ? কার পাত্রী? আমি তাে আজ পর্যন্ত শাদীই করি নি।

–‘হুজুরকে কি কেউ হাসিস খাইয়ে দিয়েছে? নইলে এমন প্রলাপ বকছেন কেন? আর দেরী করা ঠিক হবে না, ওদিকে হয়ত অপেক্ষা করে করে আপনার পাত্রীর কলিজাটি দরকচা মেরে গেছে।

এবার কালাে বােরখা পরিয়ে তাকে বিশাল এক মকানের শােবার কামরায় নিয়ে গেল। সুসজ্জিত কামরা। তাকে কামরায় ঢুকিয়ে দিয়ে নিগ্রো দু’ টি বিদায় নেয়। এবার মাঝবয়সী ইয়া লম্বা চওড়া নিগ্রো কামরায় এল। খানসামা। এক গ্লাস গুলাব পানির সরবৎ তার হাতে। বল্ল-জাঁহাপনা, বান্দা হাজির। আপনার সরবৎ আর কি হুকুম, বলুন?

‘জাঁহাপনা’! কথাটি উচ্চারণ করেই নওজোয়ানটি ফিক্‌ করে হেসে দেয়। আপন মনে বলে উঠল—এখানে সবাই দেখছি, হাসিস খেয়ে বুদ হয়ে রয়েছে। নইলে আমাকে জাহাপনা’ সম্বােধন

 করতে যাবে কেন? যত্তসব নেশাখােরের দল। এক কাজ কর। তোমাদের গুলাব পানির সরবৎ আমার পেট সহ্য করতে পারবে না ।

তার চেয়ে বরং একটি ইয়া বড় তরমুজ কেটে আমার সামনে ফেল, দেখবে কেমন গােগ্রাসে খাওয়া শুরু করি।'

খানসামাটি করলও তা-ই। ইয়া ঢাউস একটি তরমুজ এনে ধপ করে তার সামনে রাখল। ছুরির ফলা ঢুকিয়ে টুকরাে টুকরাে করল।

নওজোয়ানটি বল্ল-ভাইয়া, তরমুজে রস তাে দেখি পুরােদস্তুরই রয়েছে। এবার একটি ডাঁসা —মানে বেশ রসটস আছে, এমন একটি লেড়কি জোগাড় করে নিয়ে এসাে তাে দেখি কেমন পার। লেড়কির রস আর তরমুজের রস মিশে যে সাগর সৃষ্টি করবে তাতে ডুব দেওয়ার যে কি শান্তি-তৃপ্তি তা ভাষায় বুঝানাে যাবে না।

ব্যস, খানসামা এবার তার হুকুম তামিল করতে ছুটল। এক উদ্ভিন্ন যৌবনাকে নিয়ে কিছুক্ষণ পরে ফিরল। খানসামা বিদায় নিল। নওজোয়ানটি লেড়কিটিকে দু হাতে জড়িয়ে ধরে কোলের ওপর বসিয়ে নিল।

এমন সময় পিঠে ঠাণ্ডা মালুম হচ্ছে অনুমান করে সে পাথরের মেঝের ওপর উঠে বসল। চোখ মেলে তাকিয়েই দেখতে পেল তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে এক দল আদমি। সবার চোখেই কৌতুহলের ছাপ। নওজোয়ান অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে চারদিকে তাকাতে লাগল। শেষ পর্যন্ত চোখে-মুখে হতাশার ছাপ এঁকে বলল —কোথায় ? লেড়কিটিকে গায়েব করে তােমরা কোথায় লুকিয়ে রেখেছ বল ?

প্রায় শ খানেক আদমি সমস্বরে হেসে ওঠে।

নওজোয়ানটি সবার হাসাহাসি দেখে ঘাবড়ে যায়। ভাবে, এ কি তাজ্জব ব্যাপার ! সবাই হাসছে—হাসিস খেয়ে এরা বুদ হয়ে রয়েছে নাকি? নইলে এমন কোন হাসির ব্যাপার তাে ঘটে নি।

ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা আদমিগুলাে বলল-“কি হে ডাঁশা লেড়কির মােহ তােমার এখনও কাটে নি দেখছি! বাদশা, উজির, নাদির সেজে খুব তাে কচিকাচা লেড়কি নিয়ে মজা লুঠলে। শখ মেটেনি এখনও ? খুব হয়েছে, এবার চুপ মার দেখি।

নিগ্রো লেড়কিটির কিসসা শুনে কানমাকানা তাে হেসে দম বন্ধ হয়ে মরার জোগাড়। হাসি থামিয়ে এক সময় বলল ভারী, মজার কিসসা ফেঁদেছ তাে!'

-“কিসসা বলাই তাে আমার কাজ গাে। গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঢুঁড়ে কিসসা বলে পেটের জোগাড় করি।'

—“তুমি আর একটি মজাদার কিসসা শােনাও। তােমাকে খুশী করে দেব, কথা দিচ্ছি।

নিগ্রো লেড়কিটি আর একটি কিসসা শুরু করতে যাবে, অমনি তাদের সামনে এক ঘােড়সওয়ার এসে ঘােড়া দাঁড় করাল।

কানমাকানা ঝট করে কোমর থেকে তরবারি টেনে নিয়ে উঠে দাড়াল।

ঘােড়সওয়ারটি বলল —“আমি বাগদাদ থেকে ঘােড়া ছুটিয়ে এখানে এসেছি। উজির দানদান সৈন্য-সংগ্রহ করে বাগদাদ আক্রমণ করেন। আমাদের ভাবী সুলতান কানমাকানার পিসাকে তিনি মসনদ থেকে বলপূর্বক নামিয়ে দেন। এখন বাগদাদের মসনদ তার দখলে। আমাদের শাহজাদা কানমাকানা বিবাগী হয়ে মুলুক ছেড়ে এসেছে। উজির দানদান-এর হুকুম, যেভাবেই হােক, যেখান থেকে হােক তাকে খুঁজে নিয়ে যেতে হবে। তাকে মসনদে বসিয়ে তিনি দায়িত্ব শেষ করতে চান। আমরা দলবেঁধে চারদিকে ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছি, কেউ যদি তার খোঁজ দেয় মেহেরবানি করে জানালে আমরা উপকৃত হব । 

কানমাকানা এবার সাব্বার কানে কানে বলে-দোস্ত, বাগদাদ থেকে ডাক এসেছে। চল, যাত্রা করা যাক। কানমাকানা অনুচ্চ কণ্ঠে কথাটি বললেও কানমাকানার কথা শুনতে পায়। তার বুঝতে অসুবিধা হয় না, সে এতক্ষণ তার বাঞ্ছিত কিশাের কানমাকানার সঙ্গেই কথা বলেছে।

কানমাকানা এবার দস্যু সাব্বা আর তার নিগ্রো লেড়কিটিকে নিয়ে বাগদাদের পথে রওনা হ’ল। কান-মাকানা সে-পঙ্খীরাজ কাতুল-এর পিঠে চেপে যাত্রা করল। কানমাকানা প্রাসাদে ঢুকেই সবার আগে তার আম্মার কামরায় ছুটে যায়। চোখের পানি ফেলে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে—কতদিন পর তােমাকে দেখলাম। যখন, যেখানে ছিলাম কেবল তােমার কথা ভেবেছি। তােমার কানমাকানা আবার তােমার কাছেই এসেছে।”

তার আম্মাও তাকে বহুভাবে আদর-সােহাগ করতে থাকে কানমাকানা এবার তার আম্মার সঙ্গে নুজাৎ-এর কামরায় আসে। বিষাদের প্রতিমূর্তির মত নসীবা ও তার আম্মা পালতে এক কোণে বসে হতাশ দৃষ্টি মেলে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল নিষ্পলক তাদের চাহনি।

নসীবা এবার তার বিশাদক্লিষ্ট মুখটিকে জানালার দিকে ফেরায়। বাইরের নীল আকাশের দিকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।

কানমাকানা আর দেরী করল না। সে রাত্রেই নসীবাকে শাদী করে কাছে টেনে নিল।

বাসর ঘরে কানমাকানা তার সদ্য শাদী করা বেগমকে বুকে টেনে নিয়ে সােহাগ করে বলল—‘পেয়ারী, মেহবুবা, আমার অদর্শনে তােমার কলিজাটি ছটফট করে নি?’

—“কেন? তােমার কথা ভাবতে যাব কেন, শুনি? তুমি মুলুক ছেড়ে যাবার সময় আমার কথা একবারও কি ভেবেছিলে, নাকি দেখা করে গিয়েছিলে?’ অভিমান ভরে নসীবা কথাটি ছুঁড়ে দেয়। এবার বলল —“বেশ তাে এ মুলুক-সেমুলুক ঢুঁড়ে বেড়িয়ে এলে। আমার কথা ভেবে তােমার দিল কি এক মুহূর্তের জন্যও আকুল হয়েছিল?

-“কি যে বল পেয়ারী! হায় খােদা! আমার সম্বন্ধে এরকম ধারণা তুমি করতে পারলে! ভাল কথা, আমার কথা যদি বিশ্বাস না হয় তবে সাব্বাকে জিজ্ঞাসা করলেই তােমার মনের ধন্দ দূর হয়ে যাবে।

–‘সাব্বা? কে সাব্বা? কোথায় থাকে? –‘এক পরদেশী, আমার দোস্ত। সে এক দুর্ধর্ষ ডাকাত।

–‘ডাকাত! সচকিত হয়ে নসীবা কানমাকানা’কে জড়িয়ে ধরে। চোখ বড় বড় করে বলে—“ডাকাত? তুমি শেষ পর্যন্ত ডাকাতের দলে গিয়ে নাম লিখিয়েছিলে?'

‘দূর! ডাকাতের দলের কথা কে তােমাকে বলেছে? একজন মাত্র ডাকাত। বাদাবী ডাকাত। সে-ই তাে আমার দুঃসময়ে নিজের জান কবুল করে আমার জান রক্ষা করে। আমার সঙ্গেই এখানে এসেছে। তাকে আমার দেহরক্ষী নিযুক্ত করেছি। আমার তামাম সুলতানিয়াতে খুঁজলে তার মত শক্তিশালী, নির্ভীক ও বিশ্বাসী একজনকেও মিলবে না।

বেগম শাহরাজাদ তার কিসসার এ পর্যন্ত বলার পর প্রভাত হয়ে আসে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।

                           জানােয়ার ও পক্ষীর কিসসা।

                             একশ’ ছত্রিশতম রজনী। 

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার অন্দর মহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কক্ষে এলেন। বেগম শাহরাজাদ এবার জানােয়ার ও পক্ষীর কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, কোন এক সময়ে এক ময়ূর দম্পতি এক সমুদ্রের ধারে, জঙ্গলে বাসা বেঁধে বাস করত। ময়ূরী খােসমেজাজে পাখা মেলে নেচে বেড়াত, আর ময়ূরটি নৃত্য পটিয়সী ময়ূরীর নৃত্য উপভােগ করে পুলক লাভ করত। তারা দিনের আলােয় জোড়বেঁধে খানার তল্লাশে এখানে সেখানে ঢুঁড়ে বেড়াত। দিনের শেষে ফিরে আসত তাদের নিশ্চিন্ত আশ্রয় স্থল এক গাছের কোটরে। এভাবে মহানন্দে তারা দিন গুজরান করছিল।

একদিন গাছের কোটরে বসে ময়ুর-ময়ূরী খােশ মেজাজে গল্প করছিল। গল্পের ফাকে ময়ূরটি ময়ূরীকে বলল —ধুৎ, এভাবে দিনের পর দিন একই জায়গায় চক্কর মারতে আর দিল চায় না। তার চেয়ে বরং চল কোন দূরের মুলুক থেকে বেড়িয়ে আসি গে। নতুন নতুন বন, গাছগাছালি, পাহাড়, ঝরণা আর কত কি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছড়িয়ে রয়েছে—ভালই লাগবে।

ময়ুরী সােল্লাসে বলল-“খুব ভাল প্রস্তাব। চল তবে শুভ দিন দেখে দু'জনে বেরিয়ে পড়ি।

যে-কথা সেই কাজ। একটি দিনও নষ্ট করতে তারা নারাজ। সেদিনই বিকাল পড়তে না পড়তে ময়ূর-ময়ূরী আকাশে পাখা মেলল। তারা হারা উদ্দেশ্যে উড়তে উড়তে সমুদ্র পেরিয়ে এক ছােট্ট দ্বীপে হাজির হ’ল। কত জানা-অজানা গাছপালা, রঙ বেরঙের কতসব ফুল আর ফলের বিচিত্র সমারােহ যা দেখে ময়ুর দম্পতির দিল আনন্দে নাচানাচি শুরু করে দিল। তারা সাধ মিটিয়ে গাছের সুমিষ্ট ফল খেল, ঝরণার পানি দিয়ে তৃষ্ণা মিটাল। নতুন পরিবেশ, নতুন নতুন ফলের অফুরান সমারােহ দেখে ময়ূরী তাে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবার জোগাড়, ময়ূরটির মধ্যেও কম আনন্দের সঞ্চার ঘটল না। প্রথম দিনটি ময়ুর দম্পতি মহানন্দেই কাটাল। সন্ধ্যার অন্ধকার নামতে না নামতেই এক রাজহাঁস অতর্কিতে তাদের সামনে উপস্থিত হল। মুখে বিষাদের ছাপ, চোখ দুটো দিয়ে পানি ঝরছে। সে কাঁদতে কাঁদতে ময়ূর দম্পতিকে বল্ল—বাঁচাও! আমার জান বাঁচাও!'

ময়ূরটি বলল—“ভাইয়া শান্ত হও। চোখের পানি মােছ। কোন ডর নেই। আমরা তাে আছি। মাথা ঠাণ্ডা করে বল তাে ব্যাপার কি? কি হয়েছে তােমার ? রাজহাঁসটি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল —‘ভাইজান, আদমকিন।

—“আল্লাহ তাে ওপরে রয়েছেন রক্ষা করবেন। কিন্তু বুঝতে পারছি না। সমুদ্রের মধ্যে এমন একটি দ্বীপে আদমকিন কি করেই বা এল? তাজ্জব ব্যাপার দেখছি!

–হ্যা, আদমকিনই বটে। আদমকিনের কবল থেকে আমাকে বাঁচাও।

-বলেছিই তাে আমরা জান কবুল করে হলেও তােমার জান রক্ষা করব। কিন্তু এমন এক তাজ্জব ব্যাপার বিশ্বাস যে করতে উৎসাহ পাচ্ছি নে। আমি জানি আদমকিন আশমানে উড়তে পারে না, সাঁতার কাটতে জানে না। তবে এমন এক দ্বীপে তার পক্ষে কি করে আসা সম্ভব হ’ল ? ভাল কথা, তুমি এখানে কতদিন আছ, বল তাে?

‘এক্কেবারে শৈশব—যখন গুড়াবাচ্চা ছিলাম, তখন থেকে আমি এ দ্বীপে বাস করছি। কিন্তু এতদিন আদমকিন তাে দূরের কথা কেউ-ই আমার দিলে আতঙ্কের সঞ্চার করতে পারে নি। গতরাত্রে আমি আস্তানায় নিদ যাচ্ছিলাম। মাঝ রাত্রে খােয়াব দেখলাম এক আদমকিন আমার শিয়রে বসে বলছে—এই যে রাজহাঁসের পাে, তােমাকে তাে খুবই নাদুস নুদুসই দেখা যাচ্ছে! শরীরে গােস্তও আছে বহুৎ খুব। আর খিদেতে আমার পেটে দাউ দাউ করে আগ জ্বলছে! তার মূলাের মত ইয়া বড় বড় দাঁত, ভাঁটার দুটো চোখ দেখে আমার কলিজাটি শুকিয়ে এক্কেবারে কাঠ হয়ে গেল। তাদের গায়ে গতরে অসীম তাগত। হাতীর চেয়ে বেশী তাগতের অধিকারী। তারা বুনাে হাতীর সঙ্গে লড়াই করে সহজেই তাদের কাবু করে দেয়।

ব্যস, আমি ঊর্ধ্বশ্বাসে উড়তে শুরু করলাম। আদমকিন কিন্তু থেমে গেল না। আমার পিছু নিল। এক পাহাড়ের গুহায় এসে কোনরকমে আব্বার দেওয়া জান বাঁচালাম। পেটে কিল মেরে গুহার মধ্যেই কাটাতে লাগলাম। খানাপানি জোটে না। বাইরে বেরিয়ে খানা ও পানির পাত্তা লাগাব এমন সাহস আমার নেই। এক সময় পানি বিনা তেষ্টায় আমার কলিজা শুকিয়ে গেল। আমি অস্থির ভাবে চোখের মণি দুটো বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে গিয়ে গুহার এক কোণে অতিকায় এক সিংহকে লেজ নাড়তে দেখলাম। চোখ দুটো জ্বল জ্বল করছে। তবে জিভ দিয়ে লালা গড়াচ্ছিল কিনা ঠিক দেখতে পাই নি। লক্ষ্য করার মত দিলও আমার ছিল না। আমি তাে তাকে সবে দেখলাম। সে কিন্তু অনেক আগে থেকেই আমার ওপর নজর রেখে চলছিল।

পশুরাজকে দেখে তাে আমার মধ্যে নতুন করে ভয়ের সঞ্চার। আমি হাঁটু দুটোকে যতই শক্ত করে সােজাভাবে দাঁড়াতেচেষ্টা করি ততই যেন কাপাকাপি শুরু করে দিল।

পশুরাজের মুখে মৃদু মৃদু হাসি। সে মিষ্টি-মধুর স্বরে আমাকে বল্ল-বেটা, এমন বিষন্ন মুখে কেন ? খুব ডর লেগেছে বুঝি ? আয় বেটা, কাছে আয়। কি হয়েছে, কিসের ডর শুনি?

তার আশ্বাস পেয়ে আমি কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরে পেলাম। পায়ে পায়ে তার দিকে সামান্য এগিয়ে যাই। পশুরাজ মুখের হাসিটুকু অক্ষুন্ন রেখেই এবার বল্ল-বেটা, তাের নাম কি ? কোন গােত্রের অন্তর্ভুক্ত ?

–‘রাজহাঁস। পক্ষি।

–‘বহুৎ আচ্ছা! এবার বল তাে বেটা, তাের কিসের ডর? কেউ তাের পিছু নিয়েছে কি ? আমি তাকে আমার খােয়াবের কথা বল্লাম।

‘তাজ্জব কি বাৎ! কয়েক দিন আগে আমিও ঠিক এরকমই এক খােয়াব দেখেছিলাম বটে। আমি পরে আব্বাজানকে বললাম। তিনি শুনে আমাকে হুঁশিয়ার করে দিলেন। চোখ দুটো কপালে তুলে বললেন—“আদমকিনরা বহুৎ বদমায়েশ, শয়তান। তাদের মগজে চট করে শয়তানী বুদ্ধি বানিয়ে নিতে পারে। পিছন থেকে কখন, কিভাবে সে এসে জান নিয়ে নেবে ঠাহরও করতে পারবে না।' পশুরাজের কথায় আমার কলিজায় যৎসামান্য যে জল ছিল তা নিঃশেষে উবে গেল। বার কয়েক ঢােক গিলে বললাম—'তবে জান বাঁচাবার ফিকির কি করা যাবে? এমন একটি ভয়ঙ্কর প্রকৃতির জানােয়ার নিয়ে এ-বনে বসবাস কি করে সম্ভব?

সিংহমশাই, তুমি তাে এ-বনের রাজা। সর্বেসর্বা। সামান্য একটি আদমকিন তােমার ওপর দিয়ে হুমকী চালাবে আর তুমি কিনা তা বরদাস্ত করবে, মুখ বুজে হজম করবে! অন্য জানােয়াররা শুনলে যে তােমার অপযশ গাইবে। তােমার দাপটে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে পানি খায়। মেঘের মত একবারটি গম্ভীর স্বরে হুঙ্কার ছাড় তাে দেখবে আদমকিনের চৌদ্দ পুরুষ কেমন কাপাকাপি শুরু করে দেয়। আমরা তাে তােমার প্রজা। আমাদের জান জিন্দা রাখার সার্বিক দায়িত্ব তােমার, অস্বীকার করতে পারবে না। অতএব কিভাবে আমাদের রক্ষা করা যায় কিছু একটি ফিকির তো বের কর।'

–‘আলবাৎ! আমি কিছুতেই আদমকিনের বেয়াদপি বরদাস্ত করব না। আমার সঙ্গে একবারটি চল তাে নচ্ছারটির দফা রফা করে দিয়ে আসি। আমার রাজত্বে এমন সব শয়তানের জায়গা নেই।  এ কথা বলে পশুরাজ আমাকে নিয়ে রাগে ফুসতে ফুসতে বীরদর্পে এগিয়ে চলল। সে রাগের চোটে লেজটিকে এত জোরে জোরে দোলাতে লাগল যে, তার পিছন পিছন চলা আমার পক্ষে সমস্যা হয়ে দাঁড়াল।

কিছুদূর যেতে না যেতেই সামনে ধুলােয় অন্ধকার এক জায়গার কাছাকাছি আমরা হাজির হলাম। ধুলাের ঝড়টি যেন আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। একটু বাদেই বুঝলাম, একটি গাধা উদ্ভান্তের মত এগােচ্ছে। পশুরাজ তাে তার রকম সকম দেখে রেগে একেবারে অগ্নিশর্মা। গর্জে উঠল—“হেই ছােকরা, এমন বেয়াদপি করছিস কেন? কে তুই? কি নাম? কোন্ জাতের জানােয়ার বল তাে?

—জাঁহাপনা, আমাকে গাধা বলেই সবাই জানে। আমি জাতেও গাধা। আদমকিন-এর ডরে আব্বার দেয়া জান বাঁচাবার তাগিদে এমন হন্যে হয়ে ছুটে পালাচ্ছি।

—“নিলজ্জ কাহাকার! শরম লাগল না কথাটি কইতে ? ইয়া তাগড়া চেহারা তাের। আর তুই কিনা সামান্য এক আদমকিনের ডরে জান নিয়ে ভাগছিস!' বার দু-তিন ঢােক গিলে গাধাটি ফ্যাকাসে-বিবর্ণমুখে বল্ল জাঁহাপনা, আদমকিনের সঙ্গে আপনার বােধ হয় জান পরিচয় নেই। নইলে এমন তাগদদার আর হিংস্র জানােয়ারটির কথা এমন হেসে উড়িয়ে দিতে পারতেন না। এমন ছলাকলা করে আপনাকে ফাঁদে ফেলবে আগে তিলমাত্র টের পাবেন না। জংপড়া একটি লােহার আকশি দিয়ে আমার জিভটিকে কেমন ফালাফালা করে দিয়েছে, দেখুন। সত্যি বেচারার জিভ দিয়ে তখন তিরতির করে খুন ঝরছে দেখলাম। গাধাটি কাঁদো কাঁদো স্বরে এবার বলল—“বিশ্বাস করবেন না জাঁহাপনা, সপাং সপাং করে এমন জোরে চাবুক হাঁকতে লাগল যা শুনেই আমার কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এল। খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে আমি বলছি, আমি সাচ্চা গাধার লেড়কা। আমার

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments