গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
আমার বাৎলানো বুদ্ধি সে নিল । আবার পসরা সাজিয়ে বসল । কিছু দিন এভাবে কাটার পর এক সকালে আমার দু ভাইয়া আমার বাড়ি হাজির হ’ল। বলল --একদল সওদাগর বাণিজ্যের উদ্দেশে ভিনদশে যাচ্ছে। তারাও সাব্যস্ত করেছে তাদের সঙ্গে সঙ্গ দেবে।
আমি সবিস্ময়ে তাকালাম।
তারা বলল—দোকানদারীতে কোনরকমে পেটের ভাত হতে পারে বটে কিন্তু আমীর হওয়া সম্ভব নয়। তারা আমীর হওয়ার জন্য অত্যুগ্রাহী। আমাকেও তাদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য জোর জবরদস্তি শুরু করে দিল।আমি আপত্তি জানাতে গিয়ে বললাম—সে কী, বাণিজ্যে যাবে কি হে? একবার গেলে তাতেই তাে শখ মেটার কথা। আবারও। যাওয়ার জন্য নাচাকুদা শুরু করে দিয়েছে! শরম হওয়া উচিত!’ |
আমার কাছ থেকে ধাঁতানি খেয়ে তারা তখনকার মত নরম হ’ল | বটে কিন্তু মাঝে মাঝেই একথা-সেকথা পেড়ে লালসার জালে আমাকে আটকাতে কসুর করল না। বাণিজ্য করে কত ফকির আমীর বাদশা হয়ে গেল এমন সব কথাও কৌশলে আমার কানে তুলতে কসুর করল না। কিন্তু আমি কিছুতেই নরম হলাম না।মুখ ব্যাজার করে তারা সেদিনও ফিরে গেল বটে কিন্তু বাণিজ্যের ভূত তাদের মাথা থেকে নামল না। নানা কৌশলে আমাকে রাজী করাতে চেষ্টা করতে লাগল। আমিও যুক্তিতর্ক দিয়ে তাদের প্রতিবারই ফিরিয়ে দিলাম। পর পর দু'বছর ধরে তারা প্রয়াস চালাবার পর এক সময় আমি আর গররাজি হতে পারলাম না। তাদের কথায় মত দিতে গিয়ে বললাম “ঠিক আছে, দু’ বছরে তােমরা কে কি কামিয়েছ আমার সামনে রাখ। কারবারের হাল আগে দেখি।
আমার কথা মত তারা দু' হাজার দিনার এনে আমার সামনে রাখল। আলােচনার মাধ্যমে তিন ভাই একমত হলাম, তিন হাজার দিনার নিয়ে আমরা বাণিজ্যে যাব। আর বাকী তিন হাজার মাটিতে পুঁতে রেখে দেব। বলা তাে যায় না, আর-উপার্জন করতে গিয়ে যদি লােকসান হয় তবে আর কেঁদে কুল পাওয়া যাবে না। এতে দেশে ফিরে আর অথৈ পানিতে পড়তে হবে না।
আমার পরামর্শে সম্মত হ’ল। মাথা পিছু এক হাজার করে দিনার নিয়ে মণিহারী মালপত্র কিনে নৌকো বােঝাই করলাম।।খােদাতাল্লার নাম নিয়ে আমরা তিনজন নৌকো জলে ভাসালাম।
প্রায় একমাস নৌকো চালিয়ে বেশ জাঁকজমকপূর্ণ এক বন্দরে আমাদের নৌকো ভেড়ালাম, একদিন থেকে দশ দিনার লাভে একটা জিনিস বেচে আবার নােঙর তুলাম। এবার আমাদের লক্ষ্য আরও বড় কোন বন্দর, কোন বড় শহর। কয়েকদিন পর এক বন্দরে আবার নৌকো নােঙর করলাম।। | কেনা-বেচা চালাতে চালাতে এক রূপসী-যুবতীর সঙ্গে আমাদের চিন পরিচয় হ’ল। খুবই গরীব। হেঁড়া-ফাটা কাপড় পােশাক ছাড়া এমন পােশাক তার নেই যা দিয়ে ভালভবে লজ্জা নিবারণ করতে পারে। সে আমাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করল। আর এ-ও বলল, ভ্র আমাদের সাহায্যের বিনিময়ে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সওদা করা পর্যন্ত সব কাজই করতে রাজী। নগরে থাকার আস্তানা। তিনকূলে আপনজন বলতে কেউ-ই তার নেই। যুবতীটির কথা শুনে মনে হ’ল সে উঁচু বংশােদ্ভুতই বটে।
আমি তাকে আমার নৌকায় তুলে নিলাম। কামকাজ মন চাইলে করবে, না চাইলে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে, কই বাৎনেহি। রূপসী-যুবতী এবার একটু সাহস পেয়ে বলল—তা-ই যদি হয় তবে আমাকে শাদী করে নিজের কাছে রাখতে আপত্তি কোথায়! যুবতীর কথাগুলাে আমার খুব মনে ধরে গেল। উপরী পাওনা তার অঢেল রূপ আর দেহের অনন্য যৌবনের জোয়ারটুকু। ভাবলাম বিদেশ বিভূঁইয়ে যদি এমন এক রূপসী-যুবতীর সঙ্গ লাভ করা যায় মন্দ কি? অমত করতে মন চাইল না। নৌকোয় তুলে নিলাম অপরূপাকে। সাগরের পানিতে ভাল করে গােসল করিয়ে আমার বাঞ্ছিতা রূপসীকে সাফসুতরা করে নিলাম। পরিয়ে দিলাম দামী পােশাক। আঁখির কোলে সুরমা আর গায়ে ছিটিয়ে দিলাম দামী আতর। ভাল খানাপিনা দিয়ে তার মন ভরিয়ে তুল্লাম। নৌকোর গলুইয়ে বসে ফুরফুরে বাতাসে উভয়ে কতই না গল্প করলাম। ভবিষ্যতের রঙীন খােয়াবে মন প্রাণ ভরে তুললাম।
আমারা খুব সহজেই পরস্পরকে কাছে টেনে নিলাম। মাথার ওপর কুমড়ােফালি চাদ। তারই ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে সাগরের বুকে। আমি তার হাতে একটা হাত রাখলাম। বিস্ময় মাখনাে দৃষ্টিতে তার
রূপ-সৌন্দর্য পান করতে লাগলাম। তার নরম হাতের ছোঁয়ায় আমার এ বুকের মধ্যে কলিজাটা যেন চনমনিয়ে উঠতে লাগল। আমরা ক্রমেই ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হতে লাগলাম। ঝিরঝিরে বাতাসে মনে রােমাঞ্চ জাগিয়ে তুলতে লাগল। তার তুলতুলে বুকে আমার মুখটাকে গুজে দেবার জন্য চিত্তচাঞ্চল্য বােধ করতে লাগলাম। নৌকার গলুইয়ে আর বসে থাকা সম্ভব হ’লনা। কামােন্মাদনা আমাকে উত্যক্ত করতে লাগল। অনন্যোপায় হয়ে উঠে পড়লাম। তার নিটোল সরু কটিদেশ কখন আমার চঞ্চল হাত দুটো বেষ্টন করে ফেলেছে বুঝতেই পারি নি। সে আবেশে জড়ানাে আঁখি দুটো মেলে, নীরব চাহনিতে অপলক দৃষ্টিতে আমার যৌবনাক্রান্ত দেহটাকে যেন জরীপ করতে লেগে গেল। সে যেন বাস্তবিকই এক অনাস্বাদিত আনন্দ। তার উত্তপ্ত বক্ষটিকে আমার বক্ষের সঙ্গে সাপ্টে নিয়ে কোনরকমে শােবার ঘরে ফিরে এলাম। শুইয়ে দিলাম কচি ঘাসের মত নরম বিছানায়। আমার কামতপ্ত প্রশস্ত বক্ষের চাপে সে যেন কোন এক অন্ধকার অতল গহূরে তিলে তিলে হারিয়ে যেতে লাগল। কারাে মুখে কোন ভাষা নেই, আখিতে আঁখি রেখে কথা। উভয়ের মধ্যেই কেবল আবেগ উচ্ছাস আর পরস্পরের আত্মদানের মাধ্যমে আত্মতৃপ্তি লাভের সুতীব্র বাসনা বার বার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে লাগল।
দিন যায়, সপ্তাহ কাটে। আমাদের মহব্বত ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর হয়ে বাড়তে লাগল।
আমাদের সুখটুকু আমার ভাইয়া দু'জনের মধ্যে আনন্দ সঞ্চার করতে পারল না। ঈর্ষায় জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যেতে লাগল তারা। আমি বয়সে কনিষ্ঠ। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। তাদের বয়স অপেক্ষাকৃত বেশী। আমার মত যৌবনের উন্মাদনা তাে আর তাদের দেহ-মনকে এমন করে উত্যক্ত করে না। কোন রূপসী তাদের দিকে ফিরেও তাকায় না তাে সে দোষ কেন আমার। আমাদের ওপর, আমাদের ঘরে তাদের ঈর্ষা জর্জরিত কৌতূহলী চোখগুলাে ঘুরপাক খেতে লাগল। আর আমাদের নিয়ে সর্বদা ফুসুর ফাসুর করতে লাগল নিজেদের মধ্যে। এক সময় দরজার ছিদ্র দিয়ে তাকিয়ে, দেওয়ালের ফাঁকে চোখ রেখে তারা দেখতে লাগল আমি কিভাবে আদরে সােহাগে বিবির মধ্যে কামােন্মদনা জাগিয়ে তুলি। সে কিভাবে নিজের দেহের স্পর্শে আমাকে হিংস্র জন্তুতে পরিণত করে সম্ভোগের প্রেরণা জোগায়—তারা সে সবের ওপর গােপনে নজর রাখতে লাগল। এমনকি আমাদের একান্ত গােপন কার্যকলাপও তারা চুপিসারে দেখে নিতে লাগল। আর এরই মাধ্যমে তারা তাদের বিকৃত বাঞ্ছা পূরণে লিপ্ত থাকত। আমার বুঝতে বাকী রইল না শয়তান তাদের কাধে চেপেছে। সহজে নামার নয়।।
আমার দুই বড় ভাইয়া কেবলমাত্র আমাদের গােপন দৃশ্যাবলী দেখে তৃপ্ত হতে পারল না। আরও জঘন্যতম পরিকল্পনায় লিপ্ত হল এক রাত্রে আমরা আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে গভীর নিদ্রায় ডুবেছিলাম। তারা অতি সন্তর্পনে ঘরে ঢুকে আমাদের দু'জনকে তুলে নৌকার ছইয়ের বাইরে নিয়ে গেল। নির্মমভাবে উত্তাল উদ্দাম সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তখনই এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। অথৈ জলে হাবুডুবু খেতে খেতে আমি দেখতে পেলাম, আমার বিবি অতিকায় এক জিনির আকৃতি ধারণ করে আমাকে পুতুলের মত কাঁধে তুলে নিল। এবার দিব্যি লম্বা লম্বা পা ফেলে নির্বিবাদে জলের ওপর দিয়ে হেঁটে তীরের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। এক অজানা-অচেনা দ্বীপে নিয়ে গেল আমাকে। নির্জন-নিরালা দ্বীপের জমাটবাঁধা , অন্ধকারে নামিয়ে দিয়ে চোখের পলকে সে অন্তর্ধান হ’ল। ভােরের আলাে ফুটে উঠলে সে আবার আমার কাছে এল। দুষ্টুমিভরা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি-মধুর সুরেলা কন্ঠে বলল—“আমায় চিনতে পারছ? কে আমি, বলতে পার?
তার সুবিশাল বপুটির দিকে আমি নীরব চাহনি মেলে সবিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম।
সে ফিক করে হেসে বলল—“এই দেখ, তুমি দেখছি সত্যি আমায় চিনতে পারছ না। আমি তােমার বিবি। অবধারিত মৃত্যুর কবল থেকে আমি তােমাকে ফিরিয়ে এনেছি। খােদাতাল্লার ওপর আমার বড়ই আস্থা। তার বাসনা হয়ত এরকমই ছিল। আর তার দোয়া থাকলে অসম্ভব বলে কিছু থাকে না। তুমি আমাকে আশ্রয় দিয়ে যে মহত্বের পরিচয় দিয়েছিলে—আমি তা বিস্মৃত হই নি। আজ তােমাকে | প্রাণে বাঁচাতে পেরে কী যে আনন্দ পাচ্ছি তা ভাষায় বুঝানাে যাবে না। আমি আজই তােমার শয়তান ভাই দুটোকে খুন করে প্রতিশােধ নেব।'
আমার ভাইদের হত্যা করবে শুনে মনটা হঠাৎ বিষিয়ে উঠল। আমি আৎকে উঠে বললাম—“তুমি আর যা-ই কর, আমার ভাইদের খুন কোরাে না। কথায় আছে, মূর্খের অশেষ দোষ। উপকারীর উপকারের প্রতিদান কিভাবে দিতে হয় তা তাদের অজানা। উপকারীর সর্বনাশ করতেও দ্বিধা করে না। শয়তানরা চেষ্টা করেও ভাল হতে পারে না। আর সেটাই তাদের সবচেয়ে বড় শাস্তি মনে করা যেতে পারে।'
জিনি চেঁচিয়ে ওঠে—‘অসম্ভব! শয়তান দুটোকে কিছুতেই ছেড়ে দেব না। আমি কোতল করব। মৃত্যুই তাদের একমাত্র প্রাপ্য। কথা বলতে বলতে সে আমাকে কাঁধে তুলে নিল। আকাশপথে উডতে আরম্ভ করল। আমার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিল। এবার সােজা গাছতলায় গিয়ে পুঁতে রাখা দিনারগুলাে তুলে ফেললাম। দোকানে গেলাম। দরজা খুলে দেখি সবই ঠিকঠাক আছে। বন্ধ করে বাড়ি ফিরলাম। দেখি, দুটো শিকারী কুকুর আমার দরজায় বাঁধা। আমাকে দেখেই তারা কেঁদে আকুল হতে লাগল। কাছে গেলাম। তারাও এগিয়ে এল। আমার জোব্বার কিনারা কামড়ে ধরে টানতে লাগল। ব্যাপার কি মাথায় এল না। ঠিক তখনই আমার বিবি জিনির আবির্ভাব ঘটল। মুচকি হেসে বলল—এ-শিকারী কুকুর দুটো তােমার দু'ভাই। আমার ছােট বহিন যাদুবিদ্যায় পারদর্শিনী, সে বলেছে এরা দশ বছর কুকুর হয়েই থাকবে। কেউ এদের মানুষের চেহারা ফিরিয়ে দিতে পারবে না।
এবার দশ বছর পূর্ণ হ’ল। আমি কুকুররূপী আমার ভাইজানদের নিয়ে পথে নেমেছি। জিনির সে বহিনের খোঁজ করে বেড়াচ্ছি। তার দেখা মিললে অনুরােধ করব যাতে সে আমার ভাইজানদের আগের চেহারা ফিরিয়ে দেয়। তার খোঁজে পয়দল চলতে চলতে এখানে গাছটার তলায় এদের দেখা পেলাম। এরাই সওদাগরের দুঃখের কিসসা বলল। অপেক্ষায় আছি দেখি, এর শেষ কোথায়।
তৃতীয় মিঞার কিস্সা
দ্বিতীয় যুবকের কিসসা শেষ হলে খচ্চরের মালিক তৃতীয় মিঞা আফ্রিদি দৈত্যকে কুর্নিশ করে বলল—মেহেরবান, আমার কিসসা শুনলে তাক লেগে ---'। | ‘তােমার কিসসা? তােমারও আবার কিসসা আছে নাকি হে? বল, শুনি কেমন তােমার কিসসা।’আফ্রিদি দৈত্য মুচকি হেসে বলল। | এবার খচ্চরের মালিক তৃতীয় যুবক বলল—“দৈত্যশ্রেষ্ঠ, এই খচ্চরটা কিন্তু সত্যিকারের খচ্চর নয়। আমার বিবি। যাদু বলে তাকে খচ্চরের রূপ দেওয়া হয়েছে। একবার আমি ভিনদেশে গিয়েছিলাম।
বছরখানেক পরে বাড়ি ফিরেই বিবির সঙ্গে দেখা করার জন্য অন্দরমহলে গেলাম। আমার মাথাটা অকস্মাৎ চক্কর মেরে উঠল। দেখি আমার বিবি এক নিগ্রো নােকরের আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে মৌজ করে প্রেমালাপ করছে। মুখে আদিরসের জোয়ার, আর হাত দুটো তার শৃঙ্গারে লিপ্ত। কোনদিকে হুসমাত্রও নেই। উভয়ে যেন ভিন্লােকে বিচরণ করছে। ক্রমে তাদের মধ্যে উত্তেজনা জাগছে। আমি দরজার ফুটোয় চোখ রেখে তাদের প্রেম-পীরিতি দেখতে লাগলাম। অকস্মাৎ আমার বিবি আমাকে দেখে ফেল। তড়াক করে চৌকি থেকে নেমে দেয়ালের তাক থেকে জলের বাটি মুখের কাছে তুলে নিয়ে ফিসফিস করে কি সব মন্ত্র আওড়াল। তারপর তা গন্ডুষ ভরে তুলে নিয়ে আমার গায়ে ছিটিয়ে দিল। ব্যাপারটা আমি আগে লক্ষ্য করিনি। ব্যস, মুহূর্তে আমি কুকুরের রূপ পেয়ে গেলাম। তারপর আমাকে দূর দূর করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল।
মনের দুঃখে আমি নগরের পথে পথে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। একদিন পেটের জ্বালায় এক মাংসের দোকানে গেলাম। ফেলে দেওয়া হাড়গােড় মুখে নিয়ে চিবােতে লাগলাম। আমাকে দেখে কষাইয়ের বড়ই দয়া হ’ল। সঙ্গে করে সে তার বাড়ি নিয়ে গেল। | কষাইয়ের যুবতী লেড়কি আমাকে দেখেই ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে তার আব্বাজানকে বকাবকি করতে লাগল—তুমি একজন পরপুরুষকে কেন একেবারে অন্দর মহলে নিয়ে এলে? এটা তাে সাধারণ কুকুর নয়, পুরুষ মানুষ। এক শয়তানী একে তুক করে কুকুরে পরিণত করে দিয়েছে। তােমার ইচ্ছা থাকলে আমি এর মানুষের রূপ ফিরিয়ে দিতে পারি।
–‘বেচারার কী কষ্ট, চোখে দেখা যায় না। তুমি একে মানুষে পরিণত করে দাও। এর কষ্টে আমার কলিজাটা উথাল পাথাল করছে।
কষাইয়ের লেড়কি এক বাটি জল নিয়ে বিড়বিড় করে কি সব মন্ত্র আওড়াল। তারপর সে-জল আমার গায়ে বার বার ছিটিয়ে দিল। আমি আবার আগের সে-মানুষের রূপ ফিরে পেলাম।
আমি বললাম—সুন্দরী, তােমার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই। আমার শয়তানী বিবিকে আমি খচ্চরে পরিণত করে দিতে চাই। তােমার দ্বারা কি সম্ভব? | কষাইয়ের লেড়কি আবার সেবাটিটা ভরে জল নিল। আগের মতই বিড়বিড় করে কি যেন বলল। এবার বাটিটা আমার হাতে দিয়ে বলল—তােমার বিবি যখন নিদ যাবে তখন এ-জল তার গায়ে দিয়ে মনে মনে যা ভাববে সে সেরূপই পাবে।
এবার আফ্রিদি দৈত্যের দিকে ফিরে সে বল—“দৈত্যশ্রেষ্ঠ এখচ্চরটাই আমার সে বিবি। যাদুকরী বিবি!
আফ্রিদি দৈত্যের মুখে প্রসন্নতার ছাপ ফুটে উঠল। এবার সে বলল —সওদাগর আমি তােমার সব গুনাহ মাফ করে দিলাম। তুমি মুক্ত। যেখানে খুশি যেতে পার।
ইতিমধ্যে পূর্ব-আকাশে ভােরের আলাে উঁকি মারতে শুরু করেছে। শাহরাজাদ কিসসা শেষ করতেই দুনিয়াজাদ তার গলা জড়িয়ে বলল—কী সুন্দর! কী সুন্দর কিসসা-ই না তুমি জান দিদি। | ‘এ আর এমন কি সুন্দর কিসসা বহিন। প্রাণে বাঁচলে দেখবি কাল আরও কত সুন্দর কিসসা শােনাব।'
বাদশাহ শারিয়ার ভাবলেন, একে কোতল করে এমন সুন্দর কিসসা শােনা থেকে কিছুতেই বঞ্চিত হওয়া যায় না। বিবি শাহরাজাদ-এর কোলে মাথা রেখে তিনি নিদ্রায় অভিভূত হয়ে পড়লেন। | সারাদিন দরবারে নানা কাজে লিপ্ত থাকার পর বাদশাহ শারিয়ার সন্ধ্যার কিছু পরে অন্দরমহলে এলেন।
রাত্রে তাড়াতাড়ি পানাহার সেরে ঢুকলেন শোবার ঘরে। দুনিয়াজাদ তার দিদির গলা জড়িয়ে ধরে আব্দারের স্বরে বলল, ‘ কিসসা শুরু কর।
আফ্রিদি দৈত্য ও জেলের কিস্সা
শাহরাজাদ কিসসা বলতে লাগল—কোন এক সময়ে এক বুড়াে জেলে সাগরের পাড়ে কুটীর বানিয়ে তার বিবি আর লেড়কা-লেড়কী নিয়ে বাস করত। রােজদিন মাত্র পাঁচবার সে জাল ফেলত। এক দুপুরে জাল ফেলল। একটা গাছের গুড়ি তুলল। আবার জাল ফেল বুঝল ভারি কোন জিনিস জালে আটকা পড়েছে। অনেক আশা করে জাল গুটিয়েই আর্তনাদ করে উঠল—হায় আল্লা!’ সে দেখল, একটা
মরে ফুলে ফেঁপে যাওয়া গাধা জালে জড়িয়ে রয়েছে। তার দিলটা মােচড় মেরে উঠল। নিজেকে প্রবােধ দিল, খােদাতাল্লার বুঝি এটাই মর্জি। গাধাটাকে জাল থেকে বের করে আবার জালটাকে জলে ছুঁড়ল। ব্যস, এবার আরও অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটল। অস্বাভাবিক ভারি ঠেকল। কিছুতেই জাল গােটাতে পারছে না। ঘেমে নেয়ে একাকার। শেষ পর্যন্ত অনেক ধকল সহ্য করে জাল গুটিয়ে দেখে অতিকায় একটা মাটির জালা। মােহর টোহর নয়, পচা পাকে ভর্তি। বিষন্নমনে জাল থেকে জালাটাকে বের করে নদীর ধারে কাৎ করে রাখল। আল্লাহর নাম নিয়ে আবার জাল ফেলল। এবারও একই সমস্যা। ভীষণ ভারি ঠেকল। কোনরকমে কঁকিয়ে কঁকিয়ে জাল গুটিয়ে দেখে এক গাদা হাড়ি-কলসি ভাঙা আর ছােট বড় কাচের টুকরাে।
এবার আকাশের দিকে মুখ করে বলতে লাগল—“খােদা, তােমার কি মর্জি জানি না! চার চারবার জাল ফেলে নসীবে কিছুই জুটল না। এবারই শেষ। দেখি, তােমার কি মর্জি।
কথা বলতে বলতে বুড়াে জেলেটা শেষবারের মত জালটা জলে ছুঁড়ে মারল। এবার সে বুঝল নির্ঘাৎ বিশাল একটা পাথরের টুকরাে জালে আটকেছে। বারকয়েক টেনে এক আঙুলও নড়াতে পারল
এবার অনেক চেষ্টার পর একটা তামার জালা তুলে আনল। জালাটার মুখ আটকানাে। সিলমােহর ব্যবহার করা হয়েছে। দাউদের পুত্র সুলেমানের নাম তাতে খােদাই করা। বুড়াে জেলের হতাশা অনেকাংশে হ্রাস পেল। ভাবল, এর দাম নেহাৎ কম নয়। কম করে হলেও দশটা দিনার তাে এর বিনিময়ে মিলবেই। | বুড়াে জেলে এবার জালাটাকে একটু নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করে হতাশ হ’ল। পেল্লাই ভারি। ভাবল কি, অগেকার দিনে আমির-বাদশারা ঘড়া ঘড়া মােহর মাটির তলায় পুঁতে রাখত। যদি নসীবে সেরকমই কিছু জুটে যায়। হায় খােদা, তবে একদিনেই আমীর বনে যাব! সবই খােদার মর্জি। কিন্তু মুখে সিলমােহর আঁটা। মুখটা না খােলা পর্যন্ত কিছুই বােঝার জো নেই। ধারাল একটা কাটারি দিয়ে বহুত খুব কায়দাকসরৎ করে জালার মুখটা খুলতে পারল। ব্যস, মুহূর্তে ধোঁয়ার কুণ্ডলি ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল। চোখের পলকে ধোঁয়ায় চারদিক ঢেকে ফেল। তারপর তা একটা আফ্রিদি দৈত্যের অবয়ব ধারণ করল। তার হাত-পা দুটো অতিকায়। মাথাটাও বিরাট একটা ঝুড়ির মত। মুখটা পর্বতের গুহার মত। দাঁতগুলাে শ্বেত পাথরের টুকরাের মত চকচক করছে। নাকের ছিদ্রদুটো বাঁশের চোঙার মত, চোখ দুটো গােল-আলুর মত জ্বলজ্বলে, মাথায় যেন শনের বন গজিয়েছে। | পর্বত প্রমাণ ভয়াল দর্শন আফ্রিদি দৈত্যটাকে দেখেই বুড়াে জেলের কলিজাটা শুকিয়ে গেল। আত্মা যেন খাঁচা ছাড়া হয়ে পড়ার জোগাড়। ভাল করে চোখ পর্যন্ত খুলতে পারল না।
আফ্রিদি দৈত্য গর্জে উঠল—আল্লাহকে ছাড়া আমি দুনিয়ায় আর কাউকেই পরােয়া করি না। আল্লাহর পয়গম্বর স্বয়ং সুলেমান। এবার করজোড়ে নিবেদন করল—মেহেরবান সুলেমান, দোহাই তােমার। আমাকে মেরে ফেলাে না। আমি এক মুহূর্তের জন্যও তােমার মতের বিরুদ্ধে যাব না। তােমার কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাব না। | বুড়াে জেলে এবার মনে সাহস অবলম্বন করে বলল —“দৈত্যশ্রেষ্ট আফ্রিদি, বাদশাহ সুলেমানের ভয়ে তুমি এমন কুঁকড়ে যাচ্ছ! সুলেমান তাে আঠার শ’ বছর আগেই দুনিয়া ছেড়ে বেহেস্তে চলে গেছেন। তােমার গােস্তাকীই বা কি ছিল যার জন্য বাদশাহ সুলেমান তােমাবে জালাটার মধ্যে পুরে রেখেছিল?
বুড়াে জেলের কথায় আফ্রিদি দৈত্যের কলিজাটা যেন ভিজে গিয়ে কিছু স্বাভাবিকতা ফিরে পেল। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বল—‘খােদাতাল্লা ছাড়া আর করাে ওপরেই আমার তিলমাত্র আস্থাও নেই। তার কাছ থেকে তােমার জন্য খুব সুন্দর একটা খবর নিয়ে এসেছি।' | জেলে অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে বল্ল—“কি? কি সে চমৎকার খবর? মেহেরবানি করে বল, কি খবর নিয়ে এসেছ?
মৃত্যু... তােমার মৃত্যুর খবর। আর সে মৃত্যু হবে এক ভয়ঙ্কর। উপায়ে !”
মৃত্যুর কথায় জেলের কলজেটা যেন আচমকা ডিগবাজি খেয়ে উঠল। মুখটা শুকিয়ে একেবারে আমসি হয়ে গেল। সে কাপা কাপা গলায় কোনরকমে বল—আমার কসুর কি যার জন্য তুমি আমার জান খতম করতে চাইছ? দীর্ঘকাল জালাটার মধ্যে বন্দী ছিলে। কষ্ট পাচ্ছিলে আমি তােমায় বন্দীশালা থেকে মুক্তি দিয়েছি। এটাই যদি আমার কসুর, আর এরই জন্য যদি আমাকে জান দিতে হয় তবে আর আমার কিছুই বলার নেই। | আফ্রিদি দৈত্য যেন জেলের কথা শুনতেই পায় নি এমন ভাব করে বল—“তুমি নিজেই বল, কিভাবে তুমি মরতে চাইছ।
জেলে এবার করজোড়ে বল—আমার গােস্তাকি কি তা তাে বলবে? কেন আমাকে তােমার হাতে জান দিতে হবে? | আফ্রিদি দৈত্য এবার বল—তােমাকে তবে একটা কিসসা
শোনাচ্ছি তাতেই তােমার সওয়ালের জবাব পেয়ে যাবে। তুমি হয়ত জেনে থাকবে, আমি সক-হর-অল জিনি। বাদশাহ সুলেমানের এক বিদ্রোহী নফর ছিলাম। আমাকে ঢিট করার জন্য সুলেমান একবার উজির আশাফ-ইবন বারাখ্যাকে পাঠান। আমি গায়ে অসুরের শক্তি ধরি। তবু সে আমাকে কব্জা করে ফেলে। বন্দী করে সুলেমানের দরবারে হাজির করল। সুলেমান মিষ্টি মুখেই আমাকে বল—“তােমার গােস্তাকী আমি মাফ করে দিতে পারি যদি আমার বিশ্বস্ত নােকর হয়ে থাকতে রাজী হও। আমি তার কথায় সম্মত হলামনা। প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠলাম। এবার অতিকায় একটা তামার জালায় আমাকে পুরে তার মুখ বন্ধ করে দিল। তারপর বদশাহ সুলেমানের মােহর খােদাই করে দিল জালাটার মুখে। এবার সাগরে ফেলে দিল আমাকে সহ জালাটাকে।
পানির তলায় জালাবন্দী হয়ে মনের দুঃখে দিন গুজরাণ করতে লাগলাম। তখন শপথ করলাম, এক শ’ বছরের মধ্যে কেউ আমাকে বন্দীদশা থেকে মুক্তি দিলে তার জীবনকে সুখ-সাচ্ছন্দে ভরিয়ে তুলব। কিন্তু আমার নসীব খারাপ। কারাে দোয়া হ’ল না। দ্বিতীয় শতকে শপথ নিলাম, কেউ আমাকে মুক্তি দিলে তার ঘর তামাম দুনিয়ার হীরে-জহরৎ আর ধন-দৌলতে ভরে দেব। এবারও কারাে দোয়া হ’ল না। এভাবে চার শ’ বছর পানির তলায় জালাবন্দী হয়ে কষ্ট পেতে লাগলাম। তারপর আমি আবারও এক শপথ করলাম, যে আমাকে উদ্ধার করবে আমি তাকে তিনটি বর দেব। যা সে চাইবে তা-ই পাবে। কিন্তু কারাে দেখা পেলাম না। এবার আমি আর শান্ত থাকতে পারলাম না। রীতিমত ক্ষেপে গেলাম। রাগে-দুঃখে-অপমানে ফেটে পড়ার যােগাড় হলাে। এবার প্রতিজ্ঞা করলাম, আমাকে যে মুক্ত করবে সে-হতচ্ছাড়াকে আমি কোতল করব। .....................চলতে থাকবে ...(To be continued).........।

0 Comments