আরব্য রজনী পার্ট ৪৯ ( Part 49 ) alif laila bangla

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
বেতমিস কাহাকার যদি তাের কথা সত্যি না হয় তবে কিন্তু তাের গর্দান যাবে বলে রাখছি।
সুলতান শারিমান হুঙ্কার দিতে দিতে অন্দর মহলের দিকে আগ্রসর হতে লাগলেন- কার গর্দানে কটি মাথা একবার আমি দেখব! 

আমার প্রাসাদের অন্দর মহলে ঢুকে নষ্টাচার করে বেরিয়ে যাবে, এত বড় কলিজা কার আছে দেখতে চাই। ক্রোধােন্মত্ত সুলতান সারিমান গসগস করতে করতে দুনিয়ার ঘরে দরওয়াজার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন, শরমে চোখ দুটো আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। আপন মনে বলে উঠলেন—‘খােজা-সর্দার কাফুর তাে একবিন্দুও ঝুট বাত বলে নি।
গুলিবিদ্ধ শেরের মত গর্জে উঠলেন—“কে আছিস?
সুলতানের হুঙ্কার শুনে এক নিগ্রো পরিচারক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। সুলতান হুকুম দিলেন—শাহজাদী আর ওই শয়তানটিকে পিঠমােড়া করে বেঁধে দরবারে হাজির করাে।

নিগ্রো পরিচারকটি সুলতানের হুকুম তামিল করল। দরবার কক্ষ ফাকা। একমাত্র সুলতান সারিমান ছাড়া দ্বিতীয় কোন আদমি সেখানে নেই। নিগ্রোটি শাহজাদী আর তাজ’কে সুলতানের সামনে হাজির করল। ক্রোধােন্মত্ত সুলতান অতর্কিতে একটি বর্শা তাজকে লক্ষ করে ছুঁড়ে মারলেন। কাপা কাঁপা হাতের বর্শাটি লক্ষ্য ভ্রষ্ট হল। হাত বাঁধা অবস্থাতেই শাহজাদী দুনিয়া ঝটকরে তাজ-এর সামনে গিয়ে তাকে আগলে দাঁড়িয়ে বলে উঠল-কোতল করতেই যদি হয় তার আগে আমাকেই কোতল করুন, আব্বাজী। এ নওজোয়ান নির্দোষ। আমিই তাকে অন্দরমহলে নিয়ে গেছি। আমার আস্কারা না পেলে কোন নওজোয়ান নির্বিবাদে আমার কামরায় রাত কাটাতে পারে, আপনিই বলুন?

বিষধর সাপের মাথায় শিকড় ধরলে যেমন তার উগ্রতা নাশ হয় সুলতান অকস্মাৎ ঠিক তেমনি মিইয়ে গেলেন। তবু তিনি ভিতরে ভিতরে ফুসতে লাগলেন। এবার তাজ-এর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তিনি বললেন- কে তুমি? তােমার পরিচয় কি, বল?'

তাজ নির্ভয়ে সুলতানের সওয়ালের জবাব দেয়-“আমার নাম তাজ অল-মুলুক। আমার আব্বার নাম সুলতান সুলেমান শাহ। সবুজ নগরে তার রাজধানী। সমগ্র ইস্পাহান তার সুলতানিয়ৎ। এবার আপনার দিল যা চায় করুন। যদি আমাকে কোতল করতে চান, আপত্তি নেই। তবে আশা করি পরিণামে কি ঘটতে পারে আপনিও অনুমান করতে পারছেন। তাই আমাকে খতম করে নিজের পায়েই যেন আবার কুড়ুল মারবেন না।'

সুলতান সারিমান কয়েক মুহূর্ত নীরবে ভেবে আর স্থির থাকতে পারলেন না। মসনদ থেকে নেমে তাজকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সােল্লাসে বললেন-“বেটা, তােমার হাতে আমার কলিজার সমান দুনিয়াকে তুলে দিতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য জ্ঞান করব। না জেনে, না বুঝে তােমার ওপর অবিচার করেছি, কটু কথা বলেছি এ দিল থেকে ঝেড়ে মুছে ফেল।'

এমন সময় বৃদ্ধ উজির ছুটতে ছুটতে এসে বলল - জাহাপনা, সর্বনাশ ঘটতে চলেছে। আমাদের সীমান্ত পেরিয়ে সুলতান সুলেমান-এর সেনাবাহিনী জোর কদমে অগ্রসর হচ্ছে। আগে ভাগে এর বিহিত করতে না পারলে আমাদের ইমারত থেকে শুরু করে সব কিছু ধুলােয় মিশিয়ে দেবে। আমি আর এক মুহূর্তও দেরী করলে আমাদের অস্তিত্ব আর থাকবে না । আমি আমাদের সেনাপতিদের তৈরী হতে বলি গে। কথা বলতে বলতে বৃদ্ধ উজির দরবার কক্ষ ত্যাগ করলেন।

সেদিনই সুলতান সারিমান শাহজাদী দুনিয়া আর শাহজাদা তাজ’কে নিয়ে সবুজ নগরের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। তাদের সঙ্গে বৃদ্ধ উজির আর নাজিরও চল্ল। এদিকে সুলতান সুলেমান-এর সৈন্যদলের কাছে খবর যায় শাহজাদা তাজ সুস্থ। বহাল তবিয়তেই জিন্দা আছে। ফলে মারমুখী সৈন্যরা থমকে যায়।

শাহজাদা তাজ অল-মুলুক জিন্দা আছে খবরটি সুলতান সুলেমান-এর কাছে পৌঁছে দেবার জন্য এক দূত ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘােড়া ছুটিয়ে দিল।

আবার এদিক থেকে সুলতান সারিমানও সুলতান সুলেমান এর কাছে দূত পাঠিয়ে দিলেন, সুলতান সারিমান স্বয়ং শাহজাদা তাজ এবং তার বিবিকে নিয়ে সবুজ নগরে যাচ্ছেন। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসার এ-পর্যন্ত বলার পর ভাের হয়ে এল। বেগম তার কিসসা বন্ধ করলেন।

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর শুরু হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার অন্দর মহলে বেগমের ঘরে এলেন। বেগম তার কিসসার অবশিষ্ট অংশটুকু শুরু করতে গিয়ে এবার বললেন—“জাহাপনা, শাহজাদা তাজ যে তার বিবিকে নিয়ে প্রাসাদে ফিরছে খবরটি সুলতান সুলেমান-এর কানে যথা সময়ে পোঁছে গেল। শাহজাদা তাজ অল-মুলুক প্রাসাদে পৌঁছল। সে সুলতান সুলেমান’কে জড়িয়ে ধরে বলল —“আব্বাজান, আমি আপনাকে বড়ই কষ্ট দিয়েছি। আমার জন্য আপনাকে দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন গুজরান করতে হয়েছে। আমার অপরাধের সীমা নেই। আমাকে ক্ষমা করে দিন। সুলতান তাজ’কে বললেন—“বেটা, আল্লাহর ওপর আস্থা রাখবে। তিনি যখন, যেভাবে রাখেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তা নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ বা দুশ্চিন্তা নেই। আজ যে তােমাকে আবার বুকে ফিরে পেয়েছি তার জন্য তাকে সশ্রদ্ধ সালাম জানাই। তিনি তােমাদের ভবিষ্যৎ-জীবন মধুময় করে তুলুন। সুলতান সুলেমান তার মেহমান সুলতান সারিমানকে সাদরে গ্রহণ করলেন। যথাযযাগ্য মর্যাদায় তার থাকার ব্যবস্থা করলেন।

সুলতান সুলেমান-এর দিল আজ আনন্দে ভরপুর। তার ভেতরে উত্তাল উদ্দাম সাগরের জোয়ার বইছে। তিনি উজির দাদান’কে দিয়ে তাঁর সুলতানিয়তের বড় বড় কাজীদের তলব করলেন।

সুলতান বললেন আমার বেটা শাহজাদা তাজ অল-মুলুক আর শাহজাদী দুনিয়ার শাদী হবে। তােমরা তাদের শাদীর কবুলনামা তৈরি কর। ফুল, মালা আর রঙিন বাতি দিয়ে প্রাসাদটিকে সুন্দর করে সাজানাে হ’ল। সুলতান নিজে হাতে জনে জনে নতুন পােশাক, ফুল-মালা গােলাপ ও আতর প্রভৃতি দান করলেন। প্রজারা এক মাস ধরে নাচা-গানা আর হৈ-হুল্লোড়ের মাধ্যমে আনন্দ করল। আনন্দউৎসবের মধ্য দিয়ে তাজ আর দুনিয়ার শাদী হয়ে গেল। শাহজাদা তাজ কিন্তু এত আনন্দের মধ্যে আজিজ’কে ভুলে যায় নি। বহুমূল্য পােশাক পরিচ্ছদ, প্রচুর ধনরত্ন, নফর-বাঁদী উট ও খচ্চর প্রভৃতি দিয়ে আজিজকে তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিল। কিছুদিন পর সুলতান সুলেমান দুনিয়া ছেড়ে বেহেস্তে যাত্রা করলেন। তাজ অল-মুলুক এবার সবুজ নগরের মসনদে বসল। আজিজ হ’ল তার প্রধান পরামর্শদাতা—উজির।

                            কানমাকানা আর নসিবার কিসসা 

শাহজাদা তাজ অল-মুলুক এবং শাহজাদী দুনিয়ার কিস্সা শেষ করে বেগম শাহরাজাদ এবার দু-অল-মাকান-এর লেড়কা কানমাকানা আর নুজাৎ-এর লেড়কি নসিবার কিসসা শুরু করলেন। বাল্যকাল থেকেই এক সঙ্গে খেলাধুলা করে তারা বড় হতে থাকে। তাদের উভয়ের সুরতই চোখে লাগার মত। এ যেন একজনের চেয়ে অন্যজনের সুরত অনেক অনেক বেশী। নসিবা খুবই শান্ত। তার কথাবার্তা, চলাফেরা খুবই ধীরস্থির। কোনরকম ঝুটঝামেলা দেখলে নিজেকে সতর্কতার সঙ্গে দূরে রাখে। কিন্তু কানমাকানা ? সে যেন সম্পূর্ণ অন্য ধাতু দিয়ে গড়া। ঘােড়ার পিঠে চেপে দুটোছুটি তার নিত্যকার অভ্যাস। আর শিকারের নেশা যেন তার খুনের সঙ্গে মিশে রয়েছে। তেজী ঘােড়ার সওয়ার হয়ে তীর ধনুক নিয়ে বনে বনে হিংস্র জন্তুর মােকাবেলা করাতেই তার যেন আনন্দ। আর নিগ্রো বীরদের সঙ্গে তরবারি নিয়ে লড়াই এবং মল্লযুদ্ধের প্রতিও তার আকর্ষণ কম নয়। নসিবার আব্বা নুজাৎ-এর স্বামী কানমাকান-এর সার্বিক সাহায্য-সহযােগিতা পেয়ে আজ প্রবল শক্তিধর ও প্রতাপশালী হয়ে উঠেছে। সৈন্যদের অনেককেই আজ সে বশীভূত করে নিয়েছে। তবে কেউ কেউ যে উজির দানদান-এর তাঁবে রয়েছে, মিথ্যা নয়। কিন্তু উজির দানদান-এর চেয়ে নসীবার আব্বাই দিন দিন অধিকতর প্রতাপশালী হয়ে উঠতে লাগল। তার প্রতাপ-প্রভাব সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত উজির দানদান উপায়ান্তর না দেখে বাগদাদ থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে স্থানান্তরে চলে যেতে বাধ্য হয়। অদূরবর্তী এক নগরে গিয়ে গােপনে শক্তি সঞ্চয় করতে লাগল। আল্লাহ যদি কোনদিন মুখ তুলে তাকান তখন ফিন নসীব যদি ফেরাতে পারে সে আশাতেই সে দিন গুজরান করতে লাগল। তার একমাত্র ইচ্ছা, কিশাের কানমাকানা কবে নওজোয়ান হয়ে উঠবে। কবে তাকে মসনদে বসিয়ে মনস্কামনা পূর্ণ করে নুজাৎ-এর স্বামীর হাত থেকে রাজ্য শাসনের ক্ষমতা ছিনিয়ে নেবে। এরকম সব আশায় বুক বেঁধে উজির দানদান ভবিষ্যতের পথ চেয়ে দিন গুজরান করছে। এদিকে নুজাৎ-এর স্বামীর দৌরাত্ম দিন দিনই বেড়ে চলেছে। তার ভয়ে শের আর গাই এক ঘাটে পানি খায়। তার কথা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য জ্ঞান করবে এমন আদমি সে তল্লাটে কেউ-ই নেই। সেই তামাম মুলুকের দণ্ডমুণ্ডের কর্তায় পরিণত হয়ে নিজের প্রতাপ খাটিয়ে চলেছে। তার কঠোর নির্দেশে কানমাকানা আর তার বুড়ি আম্মা গৃহে নজরবন্দী হয়ে দিন গুজরান করে চলেছে। চোখের পানি তাদের এখন সম্বল। এর একটাই কারণ, কানমাকানা যাতে আর নসীবার সঙ্গে যােগাযােগ রক্ষা না করতে পারে। এ-অবস্থায় অসহায়ভাবে খােদাতাল্লার কাছে চোখের পানি ফেলে আর্জি জানানাে ছাড়া আর কি-ইবা তাদের করার থাকতে পারে!

কানমাকানাকে কিন্তু তার আব্বা শত কোশিস করেও বশে রাখতে পারে না। সে গােপনে যথারীতি তার মেহবুবা নসীবার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। কিন্তু এভাবে তাে আর দিনের পর দিন চলা সম্ভব নয়। চলতে পারল না। নসীবার আব্বা তাকে কড়া পাহারার মধ্যে রাখতে লাগল যার ফলে কানমাকানা কিছুতেই তার সঙ্গে আর মােলাকাত করার সুযােগ পায় না। কিন্তু তার দিল মানবে কেন? উপায়? উপায় একটি বের করল।

কানমাকানা তার মেহবুবা নসীবাকে একটি চিঠি লিখে নিজের মানসিক পরিস্থিতির কথা জানাল। সে লিখল—“মেহবুবা নসীবা, তমি চোখের আড়াল হওয়ার পর থেকে আমার মন-প্রাণ যে কিরকম বিষিয়ে রয়েছে তা ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করা সাধ্যাতীত। তােমার অদর্শনে আমার খানাপিনা আর চোখের নিদ ঘুচে গেছে। জানি না খােদাতাল্লা আবার কবে আমাদের মােলাকাত করাবেন। তােমাকে আমার পাশে না পেলে জিন্দেগী বরবাদ হয়ে যাবে। এমুলুক আজ আমার কাছে দোজাক-এর সমান হয়ে গেছে। নসিবা, মেহবুবা আমার, চল আমরা এ-মুলুক ছেড়ে এমন এক মুলুকে চলে যাই যেখানে কেউ আর আমাদের মধ্যে বাধার প্রাচীর সৃষ্টি করতে পারবে না।” কানমাকানা তার কলিজার সমান চিঠিটি এক বিশ্বস্ত খোঁজা পরিচারকের হাতে দিয়ে বললে—এটি নসীবার হাতে পৌঁছে দিবি। খবরদার কেউ যেন টের না পায়।

চিঠিটি হাতে নিয়ে খােজা পরিচারকটি সালাম জানিয়ে বিদায় নিল। কিন্তু সে কথা রাখল না। চিঠিটি নসীবার হাতে না দিয়ে চুপিচুপি তার আব্বাজানের হাতে দিল। চিঠির বয়ান পড়ে তার আব্বাজান তাে রেগে একেবারে অগ্নিমূর্তি ধারণ করল। কানমাকানাকে সমুচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য বদ্ধপরিকর হ’ল। 

শেষ পর্যন্ত নসীবার আব্বাজান অনেক ভেবে চিন্তে নিজেকে সংযত করে ভাবল, মাথা গরম করে হঠাৎ কিছু করে বসলে আখেরে সব ভেস্তে যাবে। নিজেকে সামলে নিয়ে গুটিগুটি নুজাৎএর কাছে হাজির হল। নুজাৎ চিঠিটি পড়ার পর যারপরনাই বিস্মিত হ'ল। একেবারে আশমান থেকে পড়ল যেন। গুম হয়ে বসে রইল। তার কীর্তিমান ভাইপাে যে তলে তলে এতদূর অগ্রসর হয়ে পড়েছে এ.যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। তার স্বামী সব কিছু শুনে বলল—‘শােন নুজাৎ, লেড়কির এখন দিনদিনই ওমর বাড়ছে, বয়স হচ্ছে। আর কানমাকানাও নওজোয়ান হয়ে উঠছে। তার দেহে যৌবনের কামনা-বাসনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। বিবেচনা করে দেখ, এখন কি নসীবা আর কানমাকানার ঘন ঘন মােলাকাত হতে দেওয়া সঙ্গত? বল? তাই আমার পরামর্শ, আজ থেকে নসিবাকে সর্বদা হারেমে রাখার ব্যবস্থা কর। আর তার দিকে কড়া নজর রাখবে।

বিবিকে পরামর্শ দিয়ে নুজাতের স্বামী নিজের কাজে চলে গেল। নুজাৎ চোখের পানি ফেলতে ফেলতে ভাইপােকে সতর্ক করে দিতে গিয়ে বলল - ‘শােন, নসীবার আব্বাজান তােমার ওপর তেলে বেগুনে জ্বলে রয়েছেন। একে রগচটা, তার ওপর এমন একটি অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটে যাওয়ায় আখেরে যে কি ঘটবে তা ভেবে আমি অস্থির। তােমার লেখা চিঠিটি তার হাতে পড়েছে। তাই আমার বদ্ধমূল ধারণা তিনি তােমার সর্বনাশ সাধন করতে পারেন। আমি জানি, তুমি নসীবাকে নিজের কলিজার সমান পেয়ার কর। নসীবা আমার লেড়কি। সবকিছু শােনার পর আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি। সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বলেছে, তােমাকে ছাড়া তার কাছে দুনিয়া অস্তিত্বহীন। তােমাকে কাছে পাওয়ার জন্য সে নিজের কলিজা পর্যন্ত ছিড়ে দিতেও কুণ্ঠিত নয়। এ-ও সত্যি, তুমিই মসনদের একমাত্র দাবীদার। তবু তুমি এখনও সাবালকত্ব প্রাপ্ত হওনি। তাই তােমার প্রতি আমার একমাত্র পরামর্শ রইল—ধৈর্য ধর। দাঁতে দাঁত চেপে আরও কয়েক সাল কোনরকমে কাটিয়ে দাও। তারপর তােমার প্রাপ্য মসনদ তুমি লাভ করবে। ফিরে পাবে তােমার হকের সুলতানিয়ৎ। তখন তােমার বাঞ্ছা পূরণের আর কোনই প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। কারণ, আমরা তাে তখন তােমার হাতের মুঠোয় থেকে হুকুম তামিল করতে বাধ্য থাকব। তবে আমি কথা দিচ্ছি, তুমি মাঝে-মধ্যে যাতে নসীবার দেখা পাও সে চেষ্টা আমি করব।

কানমাকানা নুজাৎ-এর কথায় তেমন ভরসা পেল না। এখানে আমার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসছে। এখান থেকে পালিয়ে অন্যত্র গিয়ে বাঁচতে চাই। মসনদের মােহ আমার নেই। সুলতানিয়াৎ-ও আমার কাছে নিতান্তই মূল্যহীন। আপনার লেড়কি নসীবা আমাকে পেয়ার মহব্বত করে। আমিও তাকে নিজের কলিজার চেয়েও বেশী পেয়ার করি। আমরা চাই কাছাকাছি পাশাপাশি থাকতে। অর্থের মােহ আমাদের কারােরই নেই। আমরা পথে পথে ভিখ মেঙ্গে দিন গুজরান করতেও কুণ্ঠিত হব না। নসীবাকে না পেলে আমার, কেবলমাত্র আমারই বলি কেন, আমাদের দু'জনের জিন্দেগী বরবাদ হয়ে যাবে।'  নুজাৎ বল্ল-মসনদের বা সুলতানিয়ৎ-এর মােহ তােমার না থাকলেও প্রজাদের কিন্তু তােমাকে চাই-ই চাই। তাদের বিশ্বাস, এ-মসনদ ধর্মের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে। তােমাকে মসনদে অধিষ্ঠিত না করা পর্যন্ত ধর্মের নির্দেশ যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে না ।

কারণ, তুমিই এ-মসনদের একমাত্র উত্তরাধিকারী। অতএব বুঝতেই পারছ, তুমি মুলুক ছেড়ে চলে গেলে প্রজারা হতাশ হয়ে বিদ্রোহ করতেও দ্বিধা করবে না। তারা নিঃসন্দেহ হবে আমার স্বামী চক্রান্ত করে তােমাকে মুলুক ছাড়া করেছেন।

কানমাকানা নুজাৎ-এর কোন উপদেশেই কানে দিল না। সে এক রাত্রে কালান্দর ফকিরের ছদ্মবেশ ধারণ করে সত্যি সত্যি গৃহত্যাগী হ'ল। কানমাকানা হারা উদ্দেশে পথ চলতে শুরু করে। এ গ্রাম সে গ্রাম পেরিয়ে, বহু মুলুক ঘুরে এক রাত্রে এক বনের ধারে একটি ঝাকড়া গাছের তলায় শুয়ে রাত কাটাতে থাকে। রাত্রির প্রায় দ্বিতীয় প্রহরে কার যেন মিষ্টি-মধুর গানা তার কানে যায়। নিদ টুটে গেল। তড়াক করে উঠে বসে পড়ে। উত্তর্ণ হয়ে শােনার চেষ্টা করে। প্রথমে ভেবেছিল বুঝি বা খােয়াব দেখছে। এবার নিঃসন্দেহ হল। খােয়াব নয়, পুরােপুরি বাস্তব। সত্যি অদূরবর্তী কোন স্থানে কে যেন তন্ময় হয়ে গান গাইছে। সে এবার উঠে পড়ল। কণ্ঠস্বর অনুসরণ করে এগিয়ে চলতে লাগল।

সামনে এক অনুচ্চ পাহাড়। কানমাকানা উদ্ভ্রান্তের মত পাহাড়টির উপর উঠতে লাগল। সামান্য উঠতেই আবছা অন্ধকারে কে একজন বসে তন্ময় হয়ে গান গাইছে। কানমাকানাকে দেখে রহস্যময় আদমিটি গানা থামিয়ে বলে উঠল--‘কে? কে গাে তুমি ? তুমি কি কোন আদমি, নাকি জিনিটিনি? শােন, যদি জিনি হয়ে থাক। তবে এগিয়ে আসতে পার। আর যদি কোন আদমি হও তবে আর এক পা-ও এগােতে চেষ্টা কোরাে না। আন্ধার। তার ওপর ঘন ঘন চড়াই উত্রাই। পা ফেলতে একটু ভুলচুক হয়ে গেলে একেবারে পাতাল পুরীতে পৌছে যাবে। জানে বাঁচার তাে প্রশ্নই ওঠে না। চুপটি করে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাক। আন্ধার কেটে আলাে ফুটুক তখন আমাদের মােলাকাত আর চিন-পরিচয় হবে। বাতচিত যা কিছু তখনই সেরে নেওয়া যাবে।

 কানমাকানা উপায়ন্তর না দেখে আন্ধারে সেখানেই দাঁড়িয়ে বাকি রাতটুকু কাটিয়ে দেয়।

একসময় আন্ধার কেটে পাহাড়ের মাথায় ভােরের আলাে দেখা দেয়। প্রকৃতির কোলে নেমে আসে ঝলমলে সকাল। এমন সময় , কানমাকানা একটি আদমিকে তার দিকে অগ্রসর হতে দেখল । তার গায়ে মরু অঞ্চলের বাদাবী দস্যুদের মত পােশাক। কোমরে ঝুলছে ইয়া বড় এক তরবারি। কাছাকাছি এসেই সে কানমাকানকে প্রশ্ন করে—কে তুমি ? কোন্ মুলুকে ঘর? কোন্ জাত তােমার? কোন অস্ত্র না নিয়ে খালি হাতে এ-দুর্গম পাহাড়ে উঠেছ, তােমার সাহস তো কম নয় নওজোয়ান! কানমাকানা বাদাবী দস্যুটির প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলল —“আমার নানা ছিলেন শাহেনশাহ উমর অল-নুমান। তিনি ছিলেন বাগদাদের সুলতান। আর আব্বার নাম দুল-অল-মাকান তিনিও এক সময় বাগদাদের সুলতান ছিলেন। তিনিও বেহেস্তে গেছেন। আর আমার নাম কানমাকানা। আমার ফুফার লেড়কি নসীবার সঙ্গে আমার পেয়ার মহব্বত হয়। সে কারণেই আমাকে মুলুক ছেড়ে এখানে-ওখানে ঢুঁড়ে বেড়াতে হচ্ছে।

–‘গুলতাপ্পী দেওয়ার আর জায়গা পাওনি ! তুমি শাহজাদা হলে গায়ে কালান্দার ফকিরের পােশাক কেন?

-“বললামই তাে আমি মুলুক ছেড়ে বিবাগী হয়েছি।

—তােমার সাহস তাে কমতি নয় দেখছি! দেহরক্ষী না নিয়ে তুমি একা একা ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছ!'

‘যে বিবাগী হয়ে ফকিরের বেশে মুলুকে মুলুকে ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছে তার আবার দেহরক্ষীর প্রয়ােজন কি ? তবে কোনদিন যদি নসীবে থাকে, সুলতান হয়ে মসনদে বসতে পারি তখন না হয় তােমাকেই আমার দেহরক্ষী নিযুক্ত করব।'

–তােমার সাহস তাে কম নয় হে ? এটুকু এক পুঁচকে ছােকড়া বলে কিনা আমার মত এক দুর্ধর্ষ যােদ্ধাকে দেহরক্ষী রাখবে! জান, আমি চাইলে তােমাকে আমার নফর বানিয়ে রাখতে পারি ?

সহজ-সরল কিশাের কানমাকানার কথায় বাদাবী দস্যুটি কিন্তু খুবই মজা পেল। এক ঝটকায় তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে পাহাড় থেকে নামতে লাগল। সামান্য নেমে বলল -“তােমাকে এখন পাহাড় থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিলে কে ঠেকাবে, শুনি? ঐ নদীর জলে ফেলে দিলেই বা কে রক্ষা করবে?' পাহাড় থেকে নেমে বাদাবী দস্যুটি কানমাকানাকে কাধ থেকে নামায়। তার সঙ্গে করমর্দন করে বলে -“আজ, এ-মুহূর্ত থেকে আমি তােমার বান্দা। শাহজাদা, আজ থেকে তােমাকে রক্ষা করাই আমার সবচেয়ে বড় কাজ। আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলছি, আমার জান থাকতে তােমার গায়ে কেউ ফুলের টোকাটিও দিতে পারবে না।'

কানমাকানা বাদাবী দস্যুর কথায় যার পর নাই অবাক হয়। ভাবে বড় অদ্ভুত আদমি তাে! কথাবার্তা কেমন খাপছাড়া। একটু আগে যাকে সে পাহাড় থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে চেয়েছিল, নদীর পানিতে ছুঁড়ে ফেলবে বলেছিল এখন সে-ই কিনা বলছে তার নফর হয়ে জিন্দেগী কাটিয়ে দেবে। ইয়া আল্লাহ! এ আবার কেমন আদমি!

পাহাড় থেকে নেমে বাদাবী দস্যু কান্মাকানাকে নিয়ে নদীর ধারে বসল। পােটলা খুলে শুকনাে রুটি আর নিমক বের করল। নিজে কিছু খেল আর কিছু দিল কানমাাকানাকে।

রােটি চিবােতে চিবােতে বাদাবী দস্যু বল—“তুমি আমার নাম জানতে চাইলে না তাে? আমার নাম সাব্বা ইবন্ রামাহ ইব হুমাম। মরু অঞ্চলে আমার ঘর। আমরা জাতে তাইস। আমার ওমর যখন দু’ সাল তখন আমার আব্বাজান বেহেস্তে চলে যান। চাচার ঘরে আমি মানুষ হতে থাকি। নাজমা নামে চাচাজীর এক লেড়কি ছিল। এক সময় আমাদের মধ্যে পেয়ার মহব্বত জন্মায়। আমাদের শাদীর ওমর হলে আমরা শাদী-নিকা করার মতামত ব্যক্ত করলাম। চাচীর মত পেলাম। কিন্তু চাচাজী একেবারেই গররাজী। তার সাফ কথা, শাদী করে আমি বিবিকে রােটি কাপড় দিতে পারব না। আমার দলের সর্দার এগিয়ে গেল। চাচাকে বল্ল—আমাদের শাদীর পর দলই আমাদের রােটিকাপড়ার দায়িত্ব নেবে। কিন্তু তার কথাতেও চাচাজী নরম হলেন না। তখন এক নতুন পথ নিলেন। শাদী করতে হলে তাকে পঞ্চাশটি উট, পঞ্চাশটি ঘােড়া, দশটি নফর, পঞ্চাশ বস্তা ভুট্টা আর পঞ্চাশ বস্তা যব আমাদের বিয়ের যৌতুক হিসাবে দিতে হবে। আমার তাে শিরে হাত পড়ল। তার এমন বিরাট ফর্দ অনুযায়ী চাহিদা পূরণ করা কি করে সম্ভব হবে? তারপর থেকে আমি সরাব পান করে সারা রাত জানােয়ারের মত মকানে মকানে ডাকাতি করে বেড়াই। আজ না হােক কাল আমার মেহবুবাকে যে পেতেই হবে। দিনার কামাতে হবে—প্রচুর দিনার।

কানমাকানা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—“আমাদের দু'জনের নসীবই দেখছি সমান। তারা যখন গল্পে মসগুল তখন দূরে একজন ঘােড়সওয়ার তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। সাব্বা কোমর থেকে তরবারি বের করে শক্ত করে ধরে। না, ডাকাত বা সুলতানের সিপাই হবে হয়তাে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে তাদের সামনে এসেই ঘােড়া থেকে নামল। আহত এক আরব মুসলমান। ডাকাত। ক্ষতস্থান থেকে চুইয়ে চুইয়ে খুন ঝরছে। কানমাকানা ব্যস্ত-পায়ে এগিয়ে গিয়ে আহত মুসলমান ডাকাতটিকে ঘােড়ার পিঠ থেকে নামাল। ঘাসের নরম বিছানার ওপর শুইয়ে দিয়ে তারা উভয়ে মিলে তার সেবা শুশ্রুষা শুরু করে। সৈনিকটির কামিজটি তাজা খুনে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। সে কামিজটি তুলে দেখাল, বিরাট একটি ক্ষত। চুইয়ে চুইয়ে খুন ঝরছে। সাব্বা বল—“দোস্ত, তােমার এ-অবস্থা কে, কেন করেছে?

-এই যে ঘােড়াটি দেখছেন, এ-ই আমার কাল হ’ল। তামাম আরব দুনিয়ায় এর মত তেজী ঘােড়া দ্বিতীয় আর একটি মিলবে না। গায়ে গতরেও কেমন বড় দেখছেন তাে? এক সময় কনস্তান্তিনােপলের সম্রাট আফ্রিদুন এর মালিক ছিলেন। আমি একে চুরি করে নিয়ে আসি। তামাম আরব দুনিয়ায় এর খ্যাতির কথা প্রচার হয়ে যায়। ব্যস, হয়ে গেল খেল শুরু। সবার নজর কেড়ে নেওয়া ঘোড়াটিকে অন্য দলের ডাকাত ছিনতাই করে নেওয়ার ফিকির খুঁজতে লাগল। সর্দার শােচলাে কি, বেচে দিলে ঝামেলা চুকে যাবে। তাই আমাকে হুকুম করল আরব সীমানায় রক্ষী বাহিনীর কাছে বেচে দিয়ে আসতে।

সর্দারের হুকুম তামিল করতে আমি সেনাপতির সঙ্গে ভেট করলাম। তিনি এক তাজ্জব কথা শােনালেন—“তুমি ঘােড়ার যে সুখ্যাতি করছ তার প্রমাণ কি? এতগুলাে দিনারের বিনিময়ে কিনে যদি আখেরে দেখি গাধার বাচ্চা, তখন? সেনাপতির বাৎ শুনে আমার খুন শিরে চেপে গেল। একটু বেশ রাগত স্বরেই বল্লাম-“বহুৎ আচ্ছা, তবে প্রমাণই দিচ্ছি। আপনার কাছে যত ঘােড়া আছে তাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে তাগড়াই ঘােড়াটিকে নিয়ে আসুন। আমি ঘােড়া নিয়ে ছুটব। তাকে ডিঙিয়ে যাওয়া তাে দূরের কথা। কেউ ছুঁতে পারলেও জান কবুল করে যাব, কথা দিলাম।

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments