গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
পুরুষ কবুতরটির মত সব পুরুষ আদমিরা স্বার্থপর হওয়া কি সম্ভব? এক আদমির সঙ্গে অন্যের কিছু না কিছু ফারাক তাে হতে বাধ্য। আবার লেড়কিদের মধ্যে সবাই ভাল এমন তো নয়। ভাল-মন্দ মিলেই তাে দুনিয়াটি গড়ে উঠেছে। আজ গিয়ে সুযােগ বুঝে তুমি তাকে বলবে, সে জিন্দেগীতে কটি পুরুষ দেখেছে? ক'জনার চরিত্রের হদিসই বা সে রাখে?
—সবই তাে বুঝলাম। কিন্তু যার বােঝার চেয়ে না-বােঝার চেষ্টা বেশী তাকে কি করেই বা বুঝাই, বলুন তাে?'
-ওসব আমি বুঝি না। আমার একটিই অনুরােধ যে করেই হােক তার সঙ্গে একবারটি আমার মােলাকাৎ করিয়ে দিতেই হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তােমার দ্বারা আমার অভিলাষ পূর্ণ হবেই।
মুহূর্তকাল নীরবে ভেবে বুড়ি বলল—ঠিক আছে। কোশিস আমি অবশ্যই করব। এবার কি বলছি ধৈর্য ধরে শুনুন—প্রাসাদের বাইরে এক চিলতে বাগিচা আছে। সেখানে ছােট্ট একটি মঞ্জিল দেখা যাবে। শাহজাদী দুনিয়া হরমাহিনায় একবার করে সেখানে যান। ঠিক এক হপ্তা বাদে তার সে মঞ্জিলে যাবার কথা আছে। আপনাকে তখন তার সঙ্গে মােলাকাৎ করিয়ে দেব। তারপর আপনার কাজ। যদি নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা ও কথা কৌশল দিয়ে তার দিল জয় করতে পারেন তবে বুঝব আপনার কৃতিত্বের এবং আমার হতাশের জন্যই আপনি অভিলাষ পূর্ণ করতে পেরেছেন। তবে এমনও হতে পারে, আপনাকে মুখােমুখি দেখলে আপনার সম্বন্ধে তার মনের বদ্ধমূল ধারণা বদলে যেতেও পারে। তাজ অল-মুলুক এবার বল্ল—“ঠিক আছে, তােমার পরামর্শমত কাজ করব। এখন চল, তােমাকে একটি জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি।
তাজ আর আজিজ বুড়িকে নিয়ে তাদের বাড়ি এল। বৃদ্ধ উজির দানদান’কে সব বৃত্তান্ত খুলে বলে। উজির কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে বলল—“আমার মাথায় চমৎকার একটি ফন্দি এসেছে। পরে বলব। আগে চল, বাগানে গিয়ে নিজের চোখে দেখে আসি গে। তারপর যা করণীয় তা ভেবেচিন্তে করা যাবে।'
বাগানে পৌছে উজির বুড়াে মালিকে কিছু দিরহাম হাতে গুজে দিয়ে বাগানে অবস্থানের অনুমতি আদায় করে নিল।
মালি দিরহামগুলি জেবে পুরতে পুরতে বলল—এক সময় এ বাগিচা আর মঞ্জিলটি আরও অনেক ভাল ছিল। শাহজাদীর এখন আর এদিকে আগের মত দিল নেই। শুনেছি, এখন কিছুদিন যাবৎ তিনি বিমারিতে ভুগছেন। দিল অশান্ত, সুখ-শান্তি কিছুই নেই।
উজির এবার মালির হতে দিরহামের একটি গােছা ধরিয়ে দিয়ে বলল —“ভাইয়া, তােমাকে একটি কাজ করতে হবে। একজন ভাল চিত্রশিল্পী জোগাড় করতে হবে। তাকে দিয়ে এ-মঞ্জিলের দেয়ালে কিছু ছবি আঁকতে হবে। তােমার মালকিন তাে দিন সাতেক পরে এখানে আসবে। তার আগেই কিন্তু কাজটি সেরে ফেলা চাই-ই চাই।
—“চিত্রশিল্পী? দেয়ালে ছবি আঁকতে হবে? কিসের ছবি হুজুর?
–“মন দিয়ে শুনে রাখ–বড় ঘরটি, যেখানে বসে শাহজাদী নাচা-গানা শোনেন তার দু’দেওয়ালে দুটো ছবি আঁকতে হবে। তাদের একটি ছবি—যেমন ধর, চমৎকার একটি বাগিচার ছবি। তাতে দেখাতে হবে ছােট-বড় গাছ আর ঝােপঝাড়ের বিচিত্র সমারােহ। বাগিচার একটি ঝাকড়া গাছের তলায় এক ব্যাধ জাল পেতে অদূরবর্তী একটি মােটাসােটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে। জালে একটি মেয়ে কবুতর আটকা পড়ে গেছে। নিজেকে মুক্তো করার জন্য বহুৎ কোশিস করছে। আর পুরুষ-কবুতরটি অস্থির হয়ে তার আশপাশ দিয়ে চক্কর মারছে। তার দিল অশান্ত, চোখে-মুখে হতাশার ছাপ ফুটিয়ে তুলতে হবে, বুঝেছ? বুড়াে মালি ঘাড় কাৎ করে বােঝার ভাব দেখায়।
–‘উজির দানদান ব’লে চল, আর এক ধারের দেওয়ালে অন্য একটি ছবি আঁকতে হবে। সেখানে আকতে হবে পুরুষ কবুতরটি দাঁত দিয়ে জাল কেটে মেয়ে কবুতরটিকে মুক্ত করার জন্য মরিয়া হয়ে কোশিস করছে। জাল কাটার পর মেয়ে কবুতরটি উড়ে ভেগে যাচ্ছে। আর পুরুষ কবুতরটি জালে আটকা পড়ে ছটফট করছে। এবার ব্যাধটি গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে পুরুষ কবুতরটিকে জাল থেকে বের করে খাঁচায় পুরছে, বুঝেছ? ব্যাস, একটি ছবি আঁকাবে।
তাজ অল-মুলুক কিন্তু উজিরের মতলবটির কথায় খুব বেশী আশাস্থিত হতে পারল না। সামান্য দুটো ছবির মাধ্যমে শাহজাদীর নিদারুণ বিতৃষ্ণাকে স্নান করে দিয়ে তার মনকে পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলবে, ভাবা যায়। দুদিন কেটে গেল। ইতিমধ্যেই বুড়াে মালি অভিজ্ঞ এক চিত্র শিল্পীকে ধরে নিয়ে এসে উজির দানদান-এর ফরমাস অনুযায়ী দুটো বেশ বড় ছবি আঁকিয়ে নিল। সাতদিন পর শাহজাদী দুনিয়া বুডিটি এবং দাসীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে বাগিচায় এল। বিকালের ফুরফুরে হাওয়ায় খােশ মেজাজে পায়চারী করতে লাগল।
ইতিমধ্যে বৃদ্ধ উজির দানদান তাজ অল-মুলুক আজিজ’কে নিয়ে বাগিচার এক ঝােপের আড়ালে অপেক্ষা করছে। বুড়ির এরকমই পরামর্শ ছিল, প্রয়ােজনের সময় বুড়ি তাদের তলব করবে।
শাহজাদী দুনিয়া যখন বাগিচায় পায়চারি করছে তখন সুযােগ বুঝে বুড়ি বলল —“আপনাকে একটি কথা বলার ছিল। যদি আপনার মেজাজ মর্জি এখন শরিফ থাকে, যদি অভয় দেন তবে বলতে পারি।'
দুনিয়া পায়চারি করতে করতে মুচকি হেসে বল্ল-“বল, তুমি কি বলতে চাইছ, শুনি?’
বুড়ি বলল – “ঠিক আছে, একটু পরে বলছি। আপনি মঞ্জিলে গেলে বলব। ইতিমধ্যে, বুড়ি দুনিয়াকে নিয়ে পায়চারি করতে করতে সে-ঝােপটির কাছে চলে যায়। তাজ এবার তার বাঞ্ছিতা রূপসীকে পরিষ্কার দেখতে পায়। বুড়ি তাকে নিয়ে দাঁড়াল না | মঞ্জিলের দিকে এগিয়ে যায়।
মঞ্জিলে ঢুকে প্রশস্ত বৈঠকখানায় প্রবেশ করেই দুনিয়া থমকে যায়। দেওয়ালের গায়ে আঁকা ছবি দুটো তার মধ্যে বিস্ময়ের সঞ্চার করে। নিষ্পলক চোখে ছবিগুলিকে নিরীক্ষণ করতে থাকে, এবার ঘাড় ঘুরিয়ে বুড়িকে বলল—এ ছবি এখানে কি করে এল? কেই বা আঁকল? এযে আমার ‘খােয়াবের মধ্যে দেখা সেই বিশেষ দৃশ্য। অবিকল একই দৃশ্য। আশ্চর্য ব্যাপার তাে? অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে আরও কয়েক মুহূর্ত ছবি দুটোকে নিরীক্ষণ করার পর দুনিয়া এবার বলল-না’ অবিকল এক দৃশ্য তাে নয়। এখানে দেখছি মেয়েকবুতরটি ব্যাধের জালে আটকা না পড়ে আটকা পড়েছে পুরুষ কবুতরটি। আর নিতান্ত স্বার্থপরের মত মেয়ে কবুতরটি উড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। একেবারে বিপরীত দৃশ্য। আমার খােয়াবের মধ্যে দেখা দৃশ্যের একেবারে বিপরীত দৃশ্য।
‘খােয়বের দেখা দৃশ্য কিন্তু সর্বদা পরবর্তীকালে নিদ টুটে যাওয়ার পর হুবহু মনে থাকে না। অনেক সময় গুলিয়ে যায়। আপনি হয়ত পুরুষ-কবুতরকে মেয়ে, আর মেয়ে কবুতরকে পুরুষ ভেবে
গুলিয়ে ফেলেছিলেন। সবারই যখন এমনটি হয় আপনার হবে এতে আর আশ্চর্যের কি থাকতে পারে শাহজাদী।'
শাহজাদী দুনিয়ার মুখে অকস্মাৎ বিষাদের ছায়া নেমে এল। সে প্রায় কাদো কাদো হয়ে বলল-~-কী ভুল যে আমি করেছি তা আর কারাে কাছে বলার নয়। ইচ্ছা করছে নিজের মাথার চুল নিজে হতে টেনে ছিড়ি। কদিন আগেই আমি যে সুলতানের লেড়কাকে আশাহত করে ভাগিয়ে দিয়েছি। সামান্য ভুলের জন্য বিলকুল বরবাদ করে দিয়েছি। আব্বাজানকে আজই বলব, এক নওজোয়ান জোগাড় না করলে আমার জিন্দেগী বরবাদ হয়ে যাবে।'
-এতে উতালা হচ্ছেন কেন শাহজাদী। আপনার দিল যখন চাইছে অচিরেই তা পূরণ হবে।'
-“কিন্তু কি করে তা সম্ভব? আমি যা করে রেখেছি তা কি সামান্য মুখের কথাতেই শােধরানাে সম্ভব? কোন্ নওজোয়ান এখন আমাকে বিশ্বাস করে শাদী করতে উৎসাহী হবে, বলতে পার? তুমি কি ভুলে গেছ, কিছুদিন আগেই আমি ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে প্রচার করেছিলাম, যে-নওজোয়ান আমাকে শাদী করবে আমি তাকে যেন-তেন প্রকারেণ গলাটিপে তাকে হত্যা করব। এরকম ভয়ঙ্কর একটি কথা শােনার পরও কেউ আমাকে নিয়ে ঘর বাঁধতে উৎসাহী হবে বলে তুমি মনে কর? যদি আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেও প্রচার করি, এখন আমি শাদী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি তবে সবাই ভাববে আমি নতুন এক ফিকির বের করেছি।'
বুড়ি শাহজাদী দুনিয়াকে নিয়ে আবার বাগিচায় যায়। বাগিচায় পায়চারি করতে করতে দুনিয়া এবার প্রধান ফটকের কাছে শাহজাদা তাজ অল-মুলুক কে দেখতে পায়। অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে নওজোয়ান সুপুরুষ তাজ-এর দিকে। তাজ কিন্তু এর কিছুই জানতে পারল না। সে তখন পাশ ফিরে দাঁড়িয়ে গাছের ডালে খেলায় মত্ত পাখিদের দেখছে। শাহজাদী দুনিয়া বিস্ময়ের ঘােরে কাটিয়ে এক সময় বলে ওঠে—“আহা! কী সুন্দর নওজোয়ান! যেমন তার মনলােভা মুখের আদল তেমনি খুবসুরৎ তার দৈহিক গঠন।
দুনিয়া এবার বুড়িকে বলল —“তাড়াতাড়ি যাও, নইলে দরওয়াজা দিয়ে বেরিয়ে গেলে আর তার হদিস পাবে না। এমন খবসুরৎ এক নওজোয়ান হাতের নাগালের বাইরে চলে গেলে আখেরে নিজের আঙুল কামড়ানাে ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না।' বুড়ি মুহূর্ত মাত্র সময় নষ্ট না করে থপ থপ করে দৌড়ােতে শুরু করল। শাহজাদা তাজ অল-মুলুক-এর কাছে গিয়ে অনুচ্চ কণ্ঠে বল্ল-শাহজাদী মহব্বতে হাবুডুবু খাচ্ছে। একেবারে বাজী মাৎ! কাল আপনার বাড়ি যাব। সঙ্গে করে শাহজাদীকে নিয়ে যাব। তৈরী থাকবেন।
কথা ক’টি বলেই বুড়ি পিছন ফিরে হাঁটতে থাকে। শাহজাদীর কাছে গিয়ে মুখ কাচুমাচু করে বলে—এত করে বললাম আপনার কথা, পাত্তাই দিলনা! কিছুতেই আসতে রাজী হ’ল না। দেমাক দেখে গা-পিত্তি জ্বলে যায়। কী আমার কাজের মানুষ রে! আমার মুখের ওপর বলে দিল, আমার জরুরী কাজ রয়েছে, নষ্ট করার মত ফুরসৎ নেই। তা ছাড়া কোন জনানার সঙ্গে দেখা করার মনও আমার নেই। কী আমার মরদ রে! আপনি ভাববেন না, কালই আমি ওর দিমাক বিগড়ে দেব। দেখবেন, সুড়সুড় করে কেমন আপনার প্রাসাদে গিয়ে হাজির হয়। আজ রাত্রিটি কোনরকমে দাঁতে দাঁত চেপে কাটিয়ে দিন। সকাল হলেই আমার খেল শুরু করে দেব। যদি নিতান্তই বেগড়বাই করে তবে দেখবেন গলায় দড়ি বেঁধে কড়িকাঠে ঝুলিয়ে ছাড়ব আপনার মেহবুবকে।
শাহজাদী দুনিয়া রীতিমত হায় হায় ক'রে ওঠে—সে কী, গলায় দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দেবে, বলছ কী! যদি তার দিল না-ই চায় তবে জোরাজুরি করে ফয়দা কিছু হবার নয়।
–“ঠিক আছে, আপনি যখন নিতান্তই গররাজী তখন না হয় গলায় দডি টডি দেব না। তবে তার দেমাকের দৌড় আমি দেখে ছাডব, বলে দিলাম। কাল আপনার প্রাসাদে তাকে হাজির করে। তবে ছাড়ব।
শাহজাদী দুনিয়া আর কথা না বাড়িয়ে বুড়ির সঙ্গে প্রাসাদে ফিরে গেল।
সকাল হতে না হতেই বুড়িটি শাহজাদা তাজ-এর বাড়ি হাজির হ’ল। তার হাতে একটি পুটুলি। এক পরস্ত সালােয়ার কামিজ প্রভৃতি লেড়কিদের পােশাক। পুটুলিটি তাজ-এর হাতে দিয়ে বলল-“তাড়াতাড়ি পােশাক বদলে লেড়কি সেজে নিন। নইলে দ্বাররক্ষী আপনাকে প্রাসাদের ভেতরে ঢুকতে দেবে না।
তাজ বুড়ির সাহায্যে পােশাক বদলে লেড়কি সেজে নিল। আয়না দিয়ে দেখল, বিলকুল লেড়কি বনে গেছে। বলে দিলেও কেউ সহজে বিশ্বাস করবে না যে, এ লেড়কি নয়। বুড়ি এবার ছদ্মবেশী তাজ’কে নিয়ে প্রাসাদের দরজায় হাজির হল। খােজা দ্বাররক্ষী পথ আগলে দাঁড়াল। বুড়ি বল্ল—“তুমি কি অন্ধা নাকি হে! দেখছনা, এক আমীরের বিবি। খুব ভাল সেলাই জানে। তাই সুলতান সে আমীরকে বলেছিলেন, তার বিবি যেন মাঝে-মধ্যে এসে শাহজাদীকে সেলাইয়ের কাজ শিখিয়ে দিয়ে যায়। তাই আমি একে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। বুড়ি কথা বলতে বলতে ছদ্মবেশী তাজ’কে নিয়ে সদর-দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে যায়। বুড়ি একের পর এক মহল পেরিয়ে তাজকে নিয়ে শাহজাদী দুনিয়ার কামরার কাছাকাছি পৌঁছে থমকে যায়। তাজকে বলল-“আমি আর যাব না। আপনি ডানদিকের কামরায় ঢুকলেই শাহজাদীর দেখা পেয়ে যাবেন। তারপর যা কিছু করার বুদ্ধি খরচ করে আপনাকেই করতে হবে।
তাজ এবার কয়েক পা এগিয়ে দরজার সামনে গেল। পর্দা সরিয়ে কামরার ভেতরে উঁকি দিতেই তার চোখে পড়ল পালঙ্কের ওপর শরীর এলিয়ে শাহজাদী দুনিয়া বিচিত্র ভঙ্গিতে শুয়ে ঘুমে আচ্ছন্ন। তার কামিজের সব কটি বােতাম খােলা। নিটোল স্তন দুটো ঘাসের ফাক দিয়ে উকি দেয়া আধ-ফোঁটা পদ্মের কুঁড়ির মত অংশ বিশেষ বেরিয়ে রয়েছে। সে দিকে এক ঝলক তাকাতেই তাজ-এর শরীরের সব কটি স্নায়ু যেন এক সঙ্গে সচকিত হয়ে উঠল। রক্তের গতি হ’ল দ্রুততর। আর বুকের ভেতর কলিজাটি তিরতির করে লাফাতে শুরু করে দিল। ছােট ছােট অলকগুচ্ছ কপালের ওপর ভিড় করেছে। তারই কয়েকটি বাতাসের সঙ্গে দোল খাচ্ছে। আর শালােয়ারটি? শালােয়ারটি পায়ের অনেকখানি ওপরে উঠে গেছে। আঃ কী বাহার!
তাজ নির্বাক-নিষ্পন্দ ভাবে দাঁড়িয়ে অপলক চোখে তার খােয়াবের মনময়ুরীকে দেখতে লাগল। ভাবল, তাকে জাগাবে, নাকি না জাগিয়ে দূর থেকে তার ঘুমন্ত পেয়ারীর রূপ-সৌন্দর্য সুধা পান করে তৃপ্তি লাভ করবে?
হাত বাড়ায়। হাত দিয়ে কপালে নেমে আসা চুলগুলি সরিয়ে দিতে চায়। পর মুহুর্তেই হাতটি সরিয়ে নেয়। আর কয়েক মুহুর্তে এমনি দ্বিধার মধ্যে কাটে। তারপর অতিসন্তর্পণে তার পাশে বসে। যেন নিজের অজান্তে মুখটি নেমে যায় তার ঠোট দুটোর দিকে। নিজেকে সংযত রাখা তার পক্ষে আর সম্ভব হ’ল না। তার ঠোট দুটো দিয়ে দুনিয়ার আপেল-রাঙা ঠোঁট দুটোকে আলতাে করে স্পর্শ করে। তাজ যেন ঘুমের ঘােরে খােয়াব দেখার মত নিজের হাত দুটো দিয়ে দুনিয়ার-এর গলা জড়িয়ে ধরে। তার ঠোট দুটো দিয়ে নিজের ঠোট আবারও স্পর্শ করায়। শাহজাদী দুনিয়া বুঝতে পারে না, সে সত্যি জেগে, নাকি ঘুমের ঘােরে খােয়াব দেখেছে। আচমকা উঠে বসার কোসিস করল, পারল না। তাজ-এর পেশীবহুল সুদৃঢ় হাত দুটো তাকে জাপটে ধরে রেখেছে। চিৎকার করে কি যেন বলার চেষ্টা করে। তা-ও পারল না । ইতিমধ্যে আর দুটো ঠোট তার ঠোট দুটোকে আবদ্ধ করে দিয়েছে। তার বহু আকাঙ্ক্ষিত নওজোয়ানটির কাছে হার মানতেই হ'ল। আত্মসমর্পণ করতে হ’ল সম্পূর্ণরূপে। কেবলমাত্র তাকেই নয়, দুনিয়ার সব লেড়কি জনানাকেই পুরুষের কাছে হার মানতে, আত্মসমর্পণ করতে হয় এমনি করেই। শাহজাদী দুনিয়া তার আধ-ফোটা পদ্মের কুঁড়ির মত ডাগর ডাগর চোখ দুটো মেলে তাকাল। খােয়াবের মধ্যে এতদিন যাকে দেখেছে, যার রূপ-সৌন্দর্য সুধা পান করে তৃপ্তিলাভের ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়েছে সেই মনের মানুষ আজ তার বুকে। বুকের যৌবনচিহ্ন দুটোকে নিজের প্রশস্ত বুকের চাপে পিষ্ট করে তাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করে রেখেছে। একী খােয়াব, নাকি বাস্তব ? আবেগে-উচ্ছ্বাসে অভিভূতা দুনিয়া দু’হাত বাড়িয়ে জাপটে ধরে। একেবারে তার বুকের সঙ্গে তাজ লেগে রয়েছে তবু যেন পুরােপুরি তৃপ্তি পাচ্ছে না । কাছে, আরও কাছে পাবার জন্য মন তার উতালা হয়ে ওঠে।
তাজ-এর ডান-হাতটি পড়ন্ত সূর্যের রক্তিম আভায় আলােকিত আকাশের মত গাল দুটোর ওপরে আলতাে করে বােলাতে থাকে। দুনিয়ার দিল এক অকথিত পুলকে-উচ্ছাসে বার বার শিহরিত হতে থাকে। হাতটি কিছুক্ষণ এগাল-ওগাল করে এক সময় অস্থিরভাবে নেমে আসে তার গলা ছাড়িয়ে নিচের দিকে। তারপর এক সময় তার বােতাম-খােলা কামিজের মধ্যে ঢুকে হারিয়ে যায়। কেবল বার বার অস্থিরভাবে নাড়া চাড়ার মধ্য দিয়ে তার অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। এবার? এবার তারা কামােন্মাদনার বন্যায় ভাসতে ভাসতে কোন অতল গহ্বরে তলিয়ে গেল তার বিবরণ না-ই বা দিলাম।
তাজ প্রায় একটি মাস প্রাসাদের অনেকের বিশেষ করে সুলতানের অজান্তে দুনিয়া-র ঘরেই রয়ে গেল। রােজ রাত্রেই তারা পরস্পরের মাধ্যমে কাম-পিপাসা পরিতৃপ্ত করতে থাকে। মানুষের স্বভাবই তাে এ-ই যত পায় ততই যেন না-পাওয়ার হতাশা তাকে পেয়ে বসে। কতখানি পেলে তার মন-প্রাণ কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে তা সে নিজেই জানে না। সবই মনে হয় সাময়িক তৃপ্তি। পরমুহুর্তেই আবার নতুন করে পাওয়ার জন্য বুকের ভেতরে অবর্ণনীয় চাঞ্চল্যের সঞ্চার হয়।
এদিকে উজির দানদান আর আজিজ চঞ্চল হয়ে উঠে। এ-ভাবে আর কতদিন অলসভাবে বসে থাকা সম্ভব। শাহজাদা তাজ সেই যে একমাস আগে সুলতানের প্রাসাদে গেছে আর তার ফেরার নাম নেই। সে-বুড়ির আর দেখা নেই। উজির ধরেই নিয়েছে, তাজ নির্ঘাৎ ধরা পড়েছে। সুলতান ক্ষেপে গিয়ে হয় তার গর্দান দিয়েছে, নয়ত নিদেনপক্ষে কয়েদখানায় পুরে দিয়েছে। যাই-হােক, কিছু না কিছু অঘটন যে ঘটেছে এ বিষয়ে কিছুমাত্রও সংশয় তার রইল না। আজিজও ভেবে কোন কূল কিনারা করতে পারল না। অনেক ভেবে চিন্তে আজিজ বলল-এবার বােধ হয়, আমরা শাহজাদাকে ফিরে পাব। নিদেনপক্ষে তার খবর তাে পাবই। এক মাস হ’ল শাহজাদী এবার বাগিচার মঞ্জিলে যাবে। এখন তাকে ধরা না পেলেও সেবুড়িটিকে ঠিক হাতের নাগালের মধ্যে পাবই পাব। তখনই যা হােক হিল্লে একটি হয়ে যাবেই। উজির দাদান যার পার নাই শঙ্কিত হয়ে যায়। অস্থির ভাবে ঘরময় পায়চারি করতে করতে এক সময় বলে উঠল-“না, আমি আর এক মুহূর্তও এখানে অলসভাবে বসে থাকতে নারাজ। কিছু একটা হয়ে গেলে নিজের মুলুকে ফিরে সুলতানের কাছে মুখ দেখাব কি করে? আজ, এ-মুহূর্তেই আমি রওনা হচ্ছি। সুলতানের কাছে গিয়ে পুরাে ব্যাপারটি খুলে বলে আগে তাে আমার বুকের বােঝা হাল্কা করি। তারপর সুলতান যা ভাল বুঝবেন, করবেন।
বৃদ্ধ উজির প্রাসাদে ফিরে সুলতানের কাছে ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করল। সুলতান সবকিছু শুনে স্তম্ভিত, মর্মাহত হলেন।
গুলিবিদ্ধ বাঘের মত গর্জে উঠলেন-‘কপূর দ্বীপের সুলতান আমার বেটাকে কোতল করেছে, নয় তাে শূলে চড়িয়েছে! যা-ই করুক, তার বদলা আমাকে নিতেই হবে! এত স্পর্ধা তার! আমার বেটার গায়ে হাত তুলেছে! তামাম ইস্পাহান আমার ডরে কঁপে। আর কপূর দ্বীপের সুলতান তাে কোন ছার। তার ইমারত আমি ধূলায় মিশিয়ে দেব। ধ্বংস করব তার সুলতানিয়ৎ।
উজির দানদান’কে দিয়ে সেনাপতিদের খবর পাঠানাে হল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কপূর দ্বীপ আক্রমণের চূড়ান্ত ব্যবস্থা করে ফেলা হ’ল। অস্ত্রেশস্ত্রে সুসজ্জিত বিশাল সেনাবাহিনী হুঙ্কার ছাড়তে ছাড়তে বীরদর্পে এগিয়ে চল কপূর দ্বীপের উদ্দেশে।
এদিকে শাহজাদা তাজ অল-মুলক আর শাহজাদী দুনিয়া মহব্বতের অথৈ সাগরে আত্মমগ্ন। এক রাত্রির দ্বিতীয় চতুর্থ যামে তাজ তার মেহবুবা দুনিয়ার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আদরেসােহাগে ভরিয়ে দিতে দিতে বলল —‘মেহবুবা আমার, তুমি আমাকে অ-নে-ক দিয়েছ, আমিও সাধ্যমত নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি তােমার কামতৃষ্ণা নিবারণ করতে। কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও আমাদের পেয়ার মহব্বতে সামান্য খুঁত রয়ে গেছে। আমি আজ পর্যন্ত তােমার কাছে আমার আসল পরিচয় দেই নি। আজ বলছি বেগম—আমি সুলতান সুলেমান শাহর লেড়কা। সবুজ নগর ও ইস্পাহান-এর অধিপতি তিনি। আর আমার নাম তাজ অল-মুলুক। তােমার কাছে আমি সওদাগরের পরিচয় দিয়েছি। ক'দিন ধরেই কথাটি বলব বলব করে আর বলা হয়ে ওঠে নি। শাহজাদী দুনিয়া সচকিত হয়ে তাজ-এর মুখের দিকে বিস্ময়বিস্ফারিত চোখে তাকায়। তাজ-এর গালে হাত বুলাতে বুলাতে বলে-'সেকী! তুমি সুলতান সুলেমান-এর বেটা। তােমার আব্বার কাছ থেকেই আমাদের শাদীর প্রস্তাব নিয়ে তােমাদের উজির আমার আব্বাজীর সঙ্গে ভেট করতে এসেছিলেন, আমি তাকে হতাশ করে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।
–হ্যা, সবই আমি জানি। তােমার আব্বাজী তাকে খুবই খাতির করেছিলেন। কিন্তু তুমিই তাঁর সে প্রস্তাব নির্মমভাবে খারিজ করে দিয়েছিলে। তুমি নাকি পুরুষদের নাম শােনামাত্র ক্ষেপে একেবারে টঙ হয়ে যেতে। আজ মাসাধিক কাল হয়ে গেল আমি এখানে মৌজ করে দিন গুজরান করছি। কিন্তু ওদিকে উজির সাহেব আর আমার দোস্ত আজিজ যে কি করছে, কিছুই জানি না।
-বুড়িকে পাঠিয়েছিলাম আমি। তাদের কোন পাত্তা নেই। তােমার দোকান বন্ধ। কামরায়ও তালা ঝুলছে। আশপাশের কেউই কিছু বলতে পারল না। তারপর আর একদিন গিয়ে বাড়িওয়ালার সঙ্গে ভেট করে জানতে পারলাম তারা তাদের মুলুকে ফিরে গেছে।
তাজ সচকিত হয়ে উঠে বসে পড়ল। মুখের হাসি মুহূর্তে অন্তর্হিত হয়ে গেল। ফ্যাকাসে বিবর্ণ মুখে বলে উঠল –‘মেহবুবা, কেলেঙ্কারীর চূড়ান্ত হতে চলেছে! আমার দিল বলছে, যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। উজির সাহেব নির্ঘাৎ ধরে নিয়েছেন, তােমার আব্বা আমাকে যেকোন ভাবেই হােক কোতল করেছেন। তিনি আমাদের সুলতানিয়তে ফিরে গিয়ে আব্বাকে এ রকম কোন কিছুই বলেছেন।
—“তবে? তবে উপায় ?
–উপায় একটিই আছে। চল, আজই আমরা সবুজ নগরের উদ্দেশে যাত্রা করি। আমাদের দেখলেই আব্বাজী শান্ত হবেন।
সকাল হ’ল। সুলতান সারিমান-এর দরবারে এক জহুরী এল। তার হাতে, একটি বেশ বড়সড় গহনার বাক্স। সেটি সুলতানের হাতে তুলে দিয়ে সে বল্ল-জাহাপনা, পারস্য থেকে এ গহনাগুলাে নিয়ে এসেছি। আপনার পছন্দ হলে রাখতে পারেন।
সুলতান খােজা-সরদারের হাতে গহনার বাক্সটি দিয়ে বললেন –‘অন্দর মহলে দুনিয়াকে দেখিয়ে আনাে। এ যদি তার পছন্দ হয় তবেই রাখার প্রশ্ন।
দরওয়াজা ঠেলে খােজা-সর্দার কাফুর ঘরে ঢুকতেই সচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সে যেন নিজের চোখ দুটোর ওপরেও আস্থা রাখতে পারছে না। একেবারেই অভাবনীয় ব্যাপার। শাহজাদী দুনিয়া একেবারে বিবস্ত্রা। এক খুবসুরত নওজোয়ানকে জড়িয়ে ধরে, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কাফুর ভাবল খােয়াব দেখছে। চোখ দুটো রগড়ে আবার তাকাল। না, খােয়াৰ টোয়াব তাে নয়। কাফুর-এর কাছে শাহজাদী দুনিয়ার ব্যাপার-স্যাপার পরিষ্কার হয়ে যায়। এ-নাগরটির জন্যই তাে সে এতদিন শাদীর নাম শুনেই রেগে একেবারে রুদ্ররূপ ধারণ করত। সুলতানের হুকুম তামিল করতে এসে একদিন কী বিপদের মুখেই না পড়েছিল। ইয়া বড় এক ছুরি নিয়ে শাহজাদী তাকে তাড়া করেছিল। সেকথা মনে হলে আজও তার হাত-পা পেটের মধ্যে সিঁধিয়ে যেতে চায়। তার মনে প্রতিশােধ স্পৃহা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কাফুর ব্যস্ত-পায়ে দরবারে ফিরে গিয়ে সুলতানকে ইশারায় বাইরে নিয়ে আসে। কোনরকম দ্বিধা-সঙ্কোচ না করেই বলে‘জাঁহাপনা, গহনা পছন্দ করাতে গিয়ে আমি কী অপ্রস্তুতেই না পড়েছি! মনে হ’ল আমি বুঝি দোজাকের দরজায় দাঁড়িয়ে। দেখি, শাহজাদী এক নওজোয়ানকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বিভাের হয়ে নিদ যাচ্ছেন। কারাে গায়ে এক চিলতে কাপড়ও নেই। আমি শরমে এতটুকু হয়ে গেলাম।
-চুপ কর! বেতমিস কাহাকার যদি তাের কথা সত্যি না হয় তবে কিন্তু তাের গর্দান যাবে বলে রাখছি।
( চলবে )

0 Comments