গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
সে পরামর্শ দিল—“ঠিক আছে, তােমার কথাই থাকবে, বড় ভাইয়ার দিলে দাগা তােমাকে দিতে হবে না। এক কাজ করা যাক, রাজ্যের গণ্যমান্য আদমিরা যখন চাইছেন তখন তােমার অভিষেক পর্ব এখানেই চুকিয়ে নেওয়া যাক। তুমিই বাদশাহের পদে অভিষিক্ত হও। পরে সুযােগ মাফিক সারকানকে তলব করে, রাজ্যকে দু'ভাগ করে, এক অংশের শাসক তুমি হবে আর অন্যটির শাসনক্ষমতা সারকানকে দেওয়া যাবে। এতে তােমাদের মধ্যে পেয়ার মহব্বৎ অক্ষুন্ন থাকবে বলেই আমার বিশ্বাস।
দু’-অল-মাকান এবার আর অমত করতে পারল না। বাদশাহী সাজ বাগদাদ থেকে সঙ্গে করেই আনা হয়েছিল। উজির দানদান এর নিদের্শে দু-অল-মাকান’কে সাজগােছ করিয়ে একেবারে সাচ্চা বাদশাহ বানিয়ে দেওয়া হল। তার হাতে তুলে দেওয়া হ’ল সােনার তরবারি। অভিষেককালে বংশ পরম্পরায় উত্তরাধিকার সূত্রে এটি লাভ করে আসছে। দু-অল-মাকান সােনার তরবারিটি মাথায় ঠেকিয়ে হলফনামা পাঠ করল। হলফনামার মর্মার্থ—“আমি দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনে ব্রতী থাকব।
এবার আমীর-ওমরাহরা নব অভিষিক্ত বাদশাহকে কুর্ণিশ জানিয়ে হলফ করল—“আজ থেকে আপনাকে আমাদের মহামান্য বাদশাহ হিসাবে মান্য করতে কসুর করব না। আর আপনার হুকুম শিরােধার্য জ্ঞান করব।
ইতিমধ্যে প্রাসাদের বাইরের বাগিচায় পাখিদের ব্যস্ততা লক্ষ্য করে বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।
চুয়াত্তরতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার আবার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কক্ষে এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, এর পর কি হ'ল বলছি, শুনুন। অভিষেক পর্ব চুকে গেলে এক বাদশাহী ভােজসভার আয়ােজন করা হ'ল।
ভােজসভায় খানাপিনা সারতে সারতে উজিরকে নুজাৎ বল্ল —“কিভাবে আব্বাজানের মৃত্যু হয়েছে মেহেরবানি করে সে কথা বলবেন কি? উজির দানদান ম্লান হেসে বললেন-‘বেটি, অবশ্যই বলব। আর তােমাদের তা বলা তাে আমার কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। বলছি তবে শােন—তােমরা বাগদাদ ছেড়ে মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করার পর তােমাদের বহুৎ তল্লাশ করা হ’ল। এ-মুলুক সে-মুলুকই কেবল নয় তামাম মক্কা-মদিনা ঢুঁড়ে বেড়ানাে হ’ল। যাকে বলে একেবারে চিরুণী-তল্লাসী। কিন্তু কেউ-ই কোন হদিস দিতে পারল না। তােমাদের অদর্শন ও শােক-তাপে বাদশাহ মনমরা হয়ে হরবখত প্রাসাদেই কাটাতে লাগলেন। দরবারে তার উপস্থিতিও অনিয়মিত হয়ে পড়ল। এমন সময় এক বুড়ি এল প্রাসাদে। তার সঙ্গে পাঁচপাঁচটি খুবসুরৎ লেড়কি যুবতী। তাদের প্রত্যেকের দেহেই যেন লেগেছে যৌবনের জোয়ার, আর বসেছে রূপের হাট, পরদেশিয়া। কনস্তানাতিনােপল থেকে এসেছে বুড়িটি। আমাকে বল্ল, বাদশাহের সঙ্গে ভেট করতে চায়। যুবতী পাঁচটিকে বাদশাহের হাতে তুলে দেয়ার জন্যই নাকি এতখানি পথ পাড়ি দিয়ে তাদের নিয়ে এসেছে। বুড়ি দৃঢ়তার সঙ্গেই বলল—কেবলমাত্র সুরৎ-এর বিচারেই নয়। তাদের মত সর্বগুণসম্পন্ন লেড়কি নাকি তামাম দুনিয়া ঢুঁড়ে এলেও আর একটি মিলবে না। | বাদশাহের কাছে খবর পাঠালাম। তিনি বুড়িকে তলব করলেন। লেড়কি পাঁচটিকে চাক্ষুষ করলেন। তখনও তাদের গুণের পরিচয় পাওয়া যায় নি বটে। তবে এমন সুরৎ অন্য কোন লেড়কির মধ্যে জিন্দেগীতে দেখি নি। বাদশাহও বহুভাবে তাদের সুরৎ-এর তারিফ করলেন। বাদশাহ ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললেন “কি গাে রূপসীরা, তােমাদের গুণের কথা বুড়ি যা কিছু বলছে, সত্যি কি?
লেড়কিরা সমবেত ভাবে কুর্ণিশ সেরে সমবেত কণ্ঠেই বল—“বিলকুল ঠিক।
–‘বহুৎ আচ্ছা, কি কি বিদ্যা তােমরা রপ্ত করেছ দু’-একটি নমুনা দেখাও তাে, দেখি।
লেড়কিদের মধ্য থেকে একটি লেড়কি কুর্ণিশ করে বলল —‘জাঁহাপনা, বলছি শুনুন—মানুষ জিন্দা থাকে কেন? তার কারণ সে নিজের ওপর প্রভুত্ব দেখাতে আগ্রহান্বিত। এ কোসিস করতে গিয়ে সে খােদাতাল্লার দোয়ায় জিন্দা থাকতে চায়। শির তুলে খাড়া হতে চায়। সবার সেরা হতে, নাম-খ্যাতির অধিকারী হতে আগ্রহান্বিত হয়।
আল্লাহ মানুষকে দুনিয়ায় পাঠান কেন? কারণ সে যাতে নিজেকে এবং অন্য দশজনকেও সুন্দর করে গড়ে তােলে। নবাব বাদশাই প্রথম পুরুষ। তার পুণ্য বলেই প্রজারা হয় পুণ্যবান। তার সুখুেই প্রজাদের সুখ উৎপাদিত হয়, আর তার দুঃখেই তারা হয় দুঃখিত-মর্মাহত। জ্ঞানী ও বােদ্ধারা মিতভাষী, বিনম্র, বিনয়ী, ন্যায়পরায়ণ এবং সত্যনিষ্ঠ হন। প্রকৃত দোস্ত-জিগরী দোস্তকে বাছাই করে নিতে সক্ষম হন। শত্রুকে দূরে ঠেলে রাখেন। আর দোস্তের জন্য জান কবুল করতেও কুণ্ঠিত হন না। কারণ, তিনি তাে ভালই জানেন, তামাম দুনিয়ায় জিগরী দোস্ত বিনা আর সবই সুলভ। দোস্তের সঙ্গে মেহবুবা, এমন কি বিবির তুলনা পর্যন্ত করা যায় না। এক মেহবুবাকে ছেড়ে অন্য জনকে পাকড়াও করা যায়, এক বিবিকে তালাক দিয়ে অন্য লেড়কিকে শাদী করে বিবি বানিয়ে ঘরে নিয়ে আসাও সম্ভব। কিন্তু দোস্তের সঙ্গে বিবাদ বাঁধলে, বিচ্ছেদ ঘটলে অন্য দোস্ত পাকড়াও করা অসম্ভব। দোস্তীতে যদি চিড় খায় তবে তা আর জোড়া দিয়ে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
পয়গম্বরের একটি বাণী বলছি শুনুন—এক কাজী আমীর আর ভিখমাঙার মধ্যে কোনই ফারাক-জ্ঞান করতেন না। সবাইকেই তিনি সমজ্ঞান করতেন। বিচারের সময় নিরপেক্ষতার মূল্য দিতেন। যা ন্যায় ও সঙ্গত সে-রায়ই প্রদান করতেন। উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝােতা করিয়ে দেওয়ার দিকেই তার প্রধান নজর থাকত। কোন ব্যাপারে তা সম্ভব না হত তবে বিভিন্ন দিক থেকে সম্পূর্ণ ঘটনাটির বিচার-বিবেচনা করে দেখার চেষ্টা করতেন। আর সাক্ষী প্রমাণের মারফৎ সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে তবেই রায় দান করতেন। সামান্যতম দ্বিধা থাকলেও রায় দানে ব্রতী হতেন না। নতুন করে পুরাে ব্যাপারটির পর্যালােচনা শুরু করতেন।।
কাউকে ভয় ডর দেখিয়ে জুলুম চালিয়ে আর ভুখা রেখে তাকে দিয়ে কিছু স্বীকার করিয়ে নেওয়া কোন বিচারকের উচিত বলে গণ্য হয় না। এর মাধ্যমে সত্য উদ্ধার করা, সুবিচার করা যায় না।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষ পেটের জ্বালায়, জুলুমের ডরে ঝুটবাতকেই সাচবাত বলে স্বীকার না করে পারে না।
দিগ্বীজয়ী সম্রাট আলেকজান্দার মুলুক জয় করতে বেরিয়ে হরবখত তিনজনকে কাছে কাছে রাখতেন। তাদের একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক, একজন বিচক্ষণ-বিচারক আর একজন দক্ষ রসুইকর। তিনি বলতেন, অপরাধী সেনার বিচার নিজে করতে গেলে ক্রোধপরায়ণ হয়ে হয়ত নামমাত্র অপরাধের ক্ষেত্রে কঠিন শাস্তি দিয়ে দিতে পারি। তাই একজন বিচক্ষণ ও নিরপেক্ষ বিচারক অত্যাবশ্যক।
আর শিক্ষকের প্রয়ােজন সম্বন্ধে তিনি বলতেন—যােগ্য শিক্ষক অপরিহার্য এই জন্য যে, লেড়কা লেড়কির পড়ালিখা বিনা দুনিয়ার সব কিছুই আন্ধার। উপযুক্ত শিক্ষক বিনা সুশিক্ষা দান কিছুতেই সম্ভব নয়। ভবিষ্যতের ভিত মজবুত করতে হলে যােগ্য শিক্ষক তাে চাই-ই চাই। অভিজ্ঞ পাচকের প্রয়ােজন সম্বন্ধে আলেকজান্দার-এর অভিমত এই যে, পাচক আমার তবিয়তের দিকে নজর রাখবে। আমার খানাপিনার ভার যদি আমারই ওপর বর্তায় তবে অধিকাংশ দিন ভুখাই থাকতে হবে।
লেড়কিটি এ পর্যন্ত বলে কুর্ণিশ জানিয়ে পিছু হঠে গেল। এবার অন্য এক লেড়কি কুর্ণিশ জানিয়ে তার বক্তব্য শুরু করে —জাহাপনা, এবার আমার কথা শুনুন। এক সময় লুকমান নামে এক দার্শনিক ছিলেন। তিনি একবার বলেছিলেন দুনিয়াতে তিন প্রধান সত্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য তিনটি মােক্ষম কষ্টিপাথরের অস্তিত্ব বর্তমান। (ক) যে যথার্থ বীর তার পরিচয় লড়াইয়ের সময়ই মিলতে পারে। মুখে যে আদমি শের মারে তার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করার প্রয়ােজন নেই। (খ) কোন আদমির কেবলমাত্র গােসসার সময় তার সততা ও মহত্বের পরিচয় মিলতে পারে। গােসসা মানুষের আসলী রূপ উন্মােচন করে দেয়। (গ) তােমার জিগরী দোস্ত কে তা বুঝতে পারবে তােমার তকলিফের মুহুর্তে। যে দোস্ত পাশে দাঁড়িয়ে তােমার তকলিফ বিনাশ করতে তােমার কাধে কাধ লাগিয়ে চেষ্টা করে তাকেই জিগরী দোস্ত জ্ঞান করবে।
তােমাদকারীদের তােষামদ সত্ত্বেও দাম্ভিক-অত্যাচারী শাসক তার উচিত শিক্ষা লাভ করে। লাঞ্ছিত-অত্যাচারিত ব্যক্তি একদিন না একদিন সুবিচার লাভ করবেই। সুশাসক তার প্রজার ওপর তার কর্ম অনুযায়ীই আচরণ করে থাকে। কোন্ ব্যক্তি কোন কাজ করতে গিয়ে বিপদে জড়িয়ে পড়েছে সেদিকে নজর দিয়ে বিচারের রায় দান অবশ্যই উচিত নয়। তার আসল ধান্দার তল্লাস করা দরকার। হৃদয়ই হচ্ছে মনুষ্যদেহের সর্বশ্রেষ্ঠ অঙ্গ। কাউকে মন্দ বলে মনে করার অর্থই হচ্ছে তার হৃদয়টি খারাপ। আর এ জন্যই সে মনুষ্যদেহ ধারণ করলেও মানুষ বলে গণ্য হয় না।
কোন এক সময় ইজরায়েলে দুই ভাইয়া বাস করত। ভাইয়াদের মধ্যে একজন অন্য ভাইয়াকে জিজ্ঞাসা করল —‘ভাইজান, আজ পর্যন্ত তুমি যা কিছু করেছ তাদের মধ্যে কোনটি তােমার মতে সবচেয়ে কঠিন কাজ মনে করেছ, বল তাে?' বড় ভাইয়া তার প্রশ্নের উত্তরে জবাব দিল -বলছি তবে শােন, একদিন আমি মুরগীর খামারের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন একটি মুরগীকে দু হাতে ধরে ফেলি। দেখলাম, সে তার মাথাটিকে চট করে চক্কর মেরে ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। পর মুহূর্তেই মাথাটিকে বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে ফিন মাথাটি সােজা অবস্থায় নিয়ে গেল। ব্যাপারটি আমার মধ্যে বিস্ময় উৎপাদন করল। ভাবতে লাগলাম, একটি মুরগী অনায়াসে যা করে ফেল্ল আমি মানুষ হয়ে কি তা শতবার চেষ্টা করেও সম্পন্ন করতে পারব না? কোন্ কাজ তােমার কাছে কঠিন বােধ হয়েছে, এবার বল তাে?
ছােট ভাইয়া নিজের কথা বলল —“আমি একদিন ভাবলাম, খােদাতাল্লার কাছে কিছু মাঙবাে। নামাজ পড়ার সময় তাকে স্মরণ করলাম, কিন্তু হায়! আমার পক্ষে কিছুই প্রার্থনা করা সম্ভব হ’ল না। জিভ যেন আড়ষ্ট হয়ে এল। এ পর্যন্ত বলার পর দ্বিতীয় লেড়কিটি চুপ করল। অন্য একটি লেড়কি এবার উঠে দাঁড়িয়ে তার বক্তব্য শুরু করতে গিয়ে বলল জাহাপনা আমি কেবলমাত্র দুটো নীতির কথা আপনার দরবারে পেশ করছি ক) সুফিয়া বলেছেন—মানুষের মুখই তার দিল-এর আয়না। আর (খ) মানুষের আত্মশুদ্ধি হলে তবেই সে বেহেস্তে যেতে সক্ষম হয়।
এবার চতুর্থ লেড়কি এগিয়ে এসে দাঁড়ায়।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।
পঁচাত্তরতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় যামে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাঁহাপনা, চতুর্থ লেড়কি এবার তার বক্তব্য শুরু করল
ইবরাহিম মিঞা একবার একটি কিসসা বলেছিলেন—এক ভিখারী পথে পথে ভিক্ষা করে বেড়াত। একদিন সে হঠাৎ একটি তামার পয়সা হারিয়ে ফেলল। আমার দুঃখ হ’ল। তার দিকে আমি একটি রুপাের টাকা এগিয়ে দিলাম। সে কিছুতেই নিল না। সে সাফ জবাব দিল, আমি হারিয়েছি তামার পয়সা, রুপাের টাকা নিয়ে ফ্যাসাদে পড়বাে নাকি হে? পয়সাটি আমি অনায়াসে খরচ করে ফেলতে পারবাে। কিন্তু রুপাের টাকা? টাকা হাতে এলে সেটি ভাঙাতে দিল কিছুতেই চাবে না।
মনসুর ইবন একবার এক কি বলেছিলেন। কিস্সাটি মােটামুটি এরকম—একবার আমি মক্কায় হজ করতে যাচ্ছিলাম। আন্ধার রাত। কৃষ্ণা শহরের পথ দিয়ে হাঁটছি, হঠাৎ একটি লােকের তারস্বর কানে এল। লােকটি চেঁচিয়ে বললে—হা আল্লাহ আমি তােমার গােলাম! তােমার অভিপ্রেত অমান্য করার মত হিম্মৎ আমার নেই। কিন্তু নসীবের ফেরে আজ আমি পাপী। তােমার হুকুম আমি যথাযথ ভাবে পালন করব। তুমি আমার গুণাহ নাশ করে দাও।
আল্লাহর কাছে এ-প্রার্থনা জানাবার পর মুহূর্তেই আচমকা ভয়ানক এক শব্দ হ'ল। কোন কিছু যেন নিচে পড়ে গেল। আন্ধার রাত কোন কিছুই ঠাওর করে উঠতে পারলাম না। বহুৎ চিল্লাচিল্লি হাঁকডাক করলাম। তবু কারও কণ্ঠই কানে এলাে না। অনন্যোপায় হয়ে আমি আমার মাথাগোঁজার জায়গাটিতে চলে গেলাম।
পরদিন সকালে একটি শবদেহ গােরস্থানে নিয়ে যেতে দেখলাম। শব্যাত্রীদের মধ্য থেকে শােকসন্তপ্ত এক অতিবৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে হে? আমার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে লােকটি বলল—আমার লেড়কা গত কাল নামাজের পর উপস্থিত সম্মানীয় ব্যক্তিদের আল্লাহর বাণী শােনাচ্ছিল। তার বক্তব্যের মাঝে এক জায়গায় ছিল—তােমাদের মধ্যে যে বা যারা আমার কথায় আস্থাবান, তাদের প্রতি আমার নির্দেশ তােমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ হৃদয় উন্মুক্ত কর। এ পর্যন্ত বলে সে চুপ করল।
এবার এক পথিক পবিত্র ধর্মগ্রন্থের এ বাণী শােনামাত্র নিজের বুকে এক ছুরির ফলা আমূল গেঁথে দিয়ে কলিজাটি টেনে বের করে নিল।
শেষ লেড়কিটি এবার এগিয়ে এল। সে তার বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলল—এক দার্শনিক সাফ বলেছেন, প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখের খোজ যে রাখে না, তার পক্ষে খােদাতাল্লার করুণা প্রত্যাশা করাও উচিত নয়। একজন প্রতিবেশীর কাছে যে ঋণ সঞ্চিত রয়েছে সহােদর ভাইয়ার কাছে তা জমা হয় না। ইবন আদহাম একবার মক্কা থেকে হজ সেরে ফিরে আসার সময় তার এক দোস্তকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেমন জীবন যাপনে তুমি আগ্রহী?'
তার দোস্তটি জবাব দিয়েছিল—“আমি খুবই কম খানাপিনা করি। যেদিন কিছু হাতে পাই খাই, অন্যথায় আশা করে থাকি যদি কিছু খানা জুটে যায় তবে খাব, আর যদি না-ই জোটে তবে উপােষ করে পেটে কিল মেরে পড়ে থাকব। কিছুই খাব না।'
ইবন আদহাম-এর মুখে কিছুই আটকায় না। যাকে যা বলার মুখের ওপর স্পষ্ট বলে দেন। তাকে বলেছিলাম, বাঘ-এর কুকুরগুলাের স্বভাবও কি সেরকমই। আমার কথা বল, খোদাতালা যেদিন জুটিয়ে দেন সেদিন নিজেকে ভাগ্যবান ভাবি, পঞ্চমুখে তার গুণ গাই এবং যেদিন বিমুখ করেন সেদিন তাকে সুকরিয়া জানাই। এবার লেড়কিটি সরে দাঁড়ায়। এবার তাদের নেত্রী উঠে দাঁড়ায়। সে বুড়িটির কথা বলছি। সে তার বক্তব্য শুরু করে—ইমাম অল-সাফির বক্তব্য হচ্ছে—একটি রাত্রিকে তিনটি যামে বিভক্ত করা যায়। প্রথম যামে পাঠাভ্যাস, দ্বিতীয় যামে নিদ আর তৃতীয় যামে নামাজ-এর কথা ব্যক্ত করেছেন। অবশ্য জীবনের শেষ ধাপে। পুরাে রাত্রিই তিনি বিনিদ্র কাটিয়েছেন। ইমাম আর একবার বলেছেন—কিঞ্চিৎ মাত্র যবের রুটি খেয়ে আমি দশটি সাল গুজরান করেছি। অধিক আহার দেহকে ভারী করে তােলে। বুদ্ধি ভোতা হয়। অবসাদ আসে, শরীর ঘুমে নেতিয়ে পড়ে। কাজের প্রতি অনাগ্রহ দেখা দেয়।
একবার ইবন ফুয়াদ বললেন—আমি একদিন নামাজের আশে রুজু করার জন্য ব্যস্ত-পায়ে নদীর দিকে যাচ্ছি। এমন সময় এক বুড়াে, সাদা দাড়ি-গোঁফ মুখে, আমাকে লক্ষ করে বললেন—বেটা, এত হুড়ােহুড়ি করছ কেন? নিষ্ঠার সঙ্গে রুজু কর। নিষ্ঠার অভাব থাকলে নামাজের ফল কিছুই পাবে না। বুড়াে নদীতে নামলেন। যত্নের সঙ্গে হাত-মুখ ধুলেন এবার। ধীর-পায়ে মসজিদের দিকে হাঁটলেন। আমি তার পিছু নিলাম এক সময় থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—বেটা, কিছু বলবে কি?
আমি হাত কচলে নিবেদন করলাম, মেহেরবানি করে যদি বললেন কিভাবে চললে আল্লাতাল্লাকে লাভ করতে পারব, বড়ই উপকার হয়।
–‘সবার আগে নিজেকে জানতে-চিনতে কোসিস কর। যখন নিজেকে পুরােপুরি জানতে পারবে তখন নিজে থেকেই তাকে পেয়ে যাবে।
খলিফা আবু জাফর অল-মনসুর আবু হানিফাকে তিনি বাৎসরিক দশ হাজার দিরহাম বেতন দিয়ে তার মুলুকের প্রধান বিচারপতির পদে বহাল করলেন। তার পরদিন সকালে প্রধান খাজাঞ্চিকে আবু হানিফার কাছে পাঠালেন। অতি সাধারণ পােশাক। পরে আবু হানিফা ঘর থেকে বেরােলেন। প্রধান খাজাঞ্চি তার সামনে দশ হাজার দিরহামের থলেটি রাখলেন। আর সুলতানের হুকুমনামা পেশ করলেন। আপনার এক সালের বেতন হিসাবে দশ হাজার দিরহাম অগ্রিম পাঠিয়ে দিয়েছেন। আর বলেছেন, এ অর্থ কোনরকম অসৎ পথে অর্জিত নয়। তিনি যেন নির্দ্বিধায় গ্রহণ করেন।
হানিফা দিরহামের থলেটি ফিরিয়ে দিয়ে বললেন এ দিরহামগুলাে সৎ পথে অর্জিত হতে পারে বটে। কিন্তু সুলতান তাে নিজেই অসৎ, অত্যাচারী, দাম্ভিক ও অবিবেচক। এমন একজনের নােকরি করতে আমি উৎসাহী নই।
বুড়িটি এবার বলল —অনেক রাত্রি হয়ে গেছে। আজ এ পর্যন্তই থাক। সুলতান যদি সত্যই আগ্রহী হন তবে পরে না হয় আবার শােনানাে যাবে।
বাদশাহের উজির দানদান কিছু সময়ের জন্য বিরতি দিলেন। একটু দম নিয়ে এবং দু-অল-মাকান-এর অত্যুগ্র আগ্রহ লক্ষ্য করে এবার বললেন-“বুড়ি আর তার সঙ্গিনী পাঁচটি লেড়কির প্রশংসা বাদশাহ শতমুখে করতে লাগলেন। প্রাসাদের অন্দর মহলের যে কামরাগুলাে ইরবিজা ভােগ করত সেখানে এদের থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য উজির দানদানকে হুকুম দিলেন।
এবার থেকে বাদশাহ রােজ নিজে এসে বুড়ি ও তার লেড়কি পাঁচটির খোঁজখবর নিয়ে যান। তাদের কোনরকম তকলিফ হচ্ছে কিনা নিজে চোখে দেখে যান।
বুড়িটি সারাদিন কিছুই খানাপিনা করত না। রাত্রে কেবল একটি যবের রুটি আর সরবৎ খেত। দিনভর আল্লাতাল্লার প্রার্থনায় ডুবে থাকত। বুড়ির কৃচ্ছসাধনের ব্যাপার-স্যাপার বাদশাহকে আরাে অভিভূত করে তুলল। তার প্রাসাদ যেন তীর্থক্ষেত্রের পবিত্রতা লাভ করেছে। তিনি যারপরনাই উল্লসিত হলেন। দশ-দশটি দিন এভাবে কেটে গেল। বাদশাহ আমাকে বললেন—‘এবার আসল বাতচিত হয়ে যাক। বুড়িকে জিজ্ঞেস কর, কি দাম সে প্রত্যাশা করে?'। বুড়ি আমার প্রশ্নের উত্তরে বলধনদৌলত আমি কিছুই নেব না। কেবলমাত্র একটি শর্তেই এদের হস্তান্তর করতে পারি। শর্তটি হচ্ছে, এক মাস ধরে আপনি উপবাসের মধ্য দিয়ে দিন গুজরান করবেন। আর একমাত্র আল্লাহর উপাসনাতেই নিজেকে লিপ্ত রাখবেন। কোনরকম কামনা বাসনাকেও মনে ঠাই দেবেন না।
এর ফলে আপনার দেহ-মন পবিত্র হয়ে উঠবে। তারপর লেড়কিদের গ্রহণ করবেন। কোন ধনদৌলত নয়, আপনার মুলুকের যা বিখ্যাত জিনিস আছে তার কিছু আমাকে উপহারস্বরূপ দান করতে পারেন, গ্রহণ করব।
বুডির এরকম অভাবনীয় প্রস্তাবে বাদশাহ আরও মুগ্ধ হয়ে পড়েন। তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “আমি তােমার প্রস্তাবে সম্মত।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
ছিয়াত্তরতম রজনী
প্রায় মাঝরাত্রে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে এলেন। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন —“জাঁহাপনা, বুড়ির কথায় বাদশাহ উমর সম্মত হলেন। বুডি এবার বলল —জাঁহাপনা একটি তামার পাত্র আনতে হুকুম করুন। আর বলবেন তাতে করে যেন একটু পানিও নিয়ে আসে।
এক দাসী তামার পাত্রে পানি নিয়ে এল।
বুড়ি পাত্রটি হাতে নিয়ে অনুচ্চ কণ্ঠে বিড় বিড় করে মন্ত্র পাঠ করল। এবার সেটি বাদশাহের হাতে দিয়ে বলল—“উপবাসের দশদিন পর এ পাত্র থেকে জলপান করবেন। এতে শরীরের ক্ষয়পূরণ হয়ে দুর্বলতা দূর হবে। আজ যাচ্ছি। ঠিক এগার দিনের দিন ফিন মােলাকাৎ হবে। বুড়ি এবার কুর্নিশ করে বিদায় নিল। বাদশাহ পানির পাত্রটি সিন্দুকে তালাবন্ধ করে রেখে দিলেন।
বাদশাহ সেদিন থেকেই উপবাস শুরু করলেন। তার একটি মাত্রই লক্ষ্য—দেহ-মন শুদ্ধ-পবিত্র করা। তবেই তিনি খুবসুরৎ লেড়কি পাঁচটিকে শয্যাসঙ্গিনী করতে পারবেন।
দশদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। এগারাে দিনের দিন বাদশাহ তামার পাত্রের মন্ত্র পড়া সবটুকু পানি এক দমে পান করে ফেললেন। দশদিন উপবাসে পেটের নাড়িভুড়ি পর্যন্ত জ্বলে যাচ্ছিল। পানিটুকু সে জ্বালা নিভিয়ে যেন স্বস্তি দিল। অবসাদও অনেকাংশে লাঘব হয়ে গেল। বাদশাহ ভাবলেন, বুড়ির কথা পুরােপুরি ফলে গেছে। তবে তাে তার পানিতে কোন দৈবশক্তি প্রয়ােগ করে গেছে যার ফলে এমন ভােজবাজির খেল সম্ভব হ’ল।
পানিটুকু পান করে হাতের তামার পাত্রটি রাখতে না রাখতেই দরওয়াজায় করাঘাতের শব্দ হ’ল। বাদশাহ নিজে হাতে দরওয়াজা খুলে দিলেন। কলার পাতার একটি পুটুলি হাতে নিয়ে বুড়ি কামরায় ঢুকে এল।
বুড়ি কলাপাতার পুটুলিটি বাদশাহের হাতে দিয়ে বল্ল –জাহাপনা, আপনার উপবাসের একুশ দিনের মাথায় এপুটুলিটি খুলবেন। এর ভেতরে সামান্য আচার আছে। সেদিন এটুকু খাবেন।
বাদশাহ শ্রদ্ধার সঙ্গে পুটুলিটি হাতে নিয়ে সিন্দুকের ভেতরে রেখে তালা বন্ধ করলেন।
একুশতম দিনে বাদশাহ সিন্দুক থেকে পুটুলিটি বের করলেন। একটু বাদেই বুড়িটি এসে দরজায় করাঘাত করল। দরজায় দাড়িয়েই বুড়ি মুচকি হেসে বলল—“আমার ভাইয়াদের সঙ্গে মােলাকাৎ করতে গিয়েছিলাম। কোন শর্তে তাদের লেড়কিদের আপনার হাতে সম্প্রদান করব তাদেরকে বলেছি। তারা খুবই খুশী হলেন। বাদশাহ যখন তাদের লাভ করার জন্য কৃচ্ছসাধনে ব্রতী হয়েছেন তখন তার আগ্রহ আন্তরিক ও অত্যুগ্র বলেই তারা ধরে নিয়েছেন। আর তার আকাঙ্ক্ষায় কোনরকম ফাঁকি নেই। তাদের বিশ্বাস, লেড়কিরা আপনার কাছে সুখে-শান্তিতেই থাকবে। তবে জিন্দেগীর জন্য তাদের দূরে সরিয়ে দেবার আগে একটি বার দেখতে চান। আজ আপনার উপবাসের একুশ দিন চলেছে। আমি আজ লেড়কিদের নিয়ে যাব। ত্রিশ দিনের দিন আপনার এখানে ফিরিয়ে আনব। সেদিন আপনার উপবাসের দিন পূর্ণ হবে। বাদশাহের মুখে বিষন্নতার ছায়া নেমে এল। বুড়ির একথা মেনে নিতে তিনি উৎসাহী নন। চোখ দুটো কপালে তুলে বললেন—সে কী, যাদের জন্য এত সব কৃচ্ছসাধন তারাই হাতের নাগালের বাইরে চলে গেলে চলবে কি করে? বুড়ি এবার ফোকলা দাঁতে হেসে বলল —এতদিন আপনার সান্নিধ্যে কাটালাম তবু আমার ওপর পুরােপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না। আপনি তাে লেড়কিদের ওপর জুলুম করে ধরে আনেন নি। আমিই উপযাচক হয়ে কথাটি পেড়েছি। তাই আপনার অমতের কারণ কিসের। তাদের সন্তান সারা জনমের জন্য তাদের অধিকারের বাইরে চলে যাচ্ছে। শেষ বারের মত একবারটি চোখে দেখার ইচ্ছা তাে হতেই পারে।
বাদশাহ এবার নরম হয়ে বলেন—হ্যা, ঠিক কথাই তাে বটে। লেড়কা-লেড়কি আব্বাকে ছেড়ে গেলে কী যে মর্মান্তিক বেদনার সঞ্চার হয় তা আমি উপলব্ধি করছি। ঠিক আছে, লেড়কিদের নিয়ে যাও। তবে ত্রিশ দিনের দিন ফিন নিয়ে এস,
( চলবে )

0 Comments