আরব্য রজনী পার্ট ৪২ ( Part 42 ) alif laila

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
বাল্যে আমার এক পূর্বসূরীর শবযাত্রায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। জিন্দেগীভর বহুৎ কিছু অন্যায়-অবিচার-অত্যাচার করেছিলেন। তার মৃত্যুতে সবাই স্বস্তি পেয়েছিল। খােদাতাল্লার কাছে দু'হাত তুলে আর্জি জানিয়েছিল, দোজকই যেন তার একমাত্র আশ্রয় স্থল হয়। ব্যস, তখনই আমি হলফ করি, তার মত অসৎ আচরণে আমার মতি কোনদিনই যেন হয়।

এ-মসলামাহ অল-মালিকও একবার বলেছিলেন, আমি এক বৃদ্ধের ইচ্ছামৃত শবদেহ গাের দিয়ে সবে শুয়েছি, তন্দ্রাভাব জেগেছিল—ব্যস, খােয়াব দেখলাম, এক বৃদ্ধ আমার শিয়রে দাঁড়িয়ে। সস্নেহে আমাকে বললেন-‘জিন্দেগীতে এমন সব কাজ করবে যার জন্য পুরস্কার লাভের যােগ্য হও।

একবার তিনি একটি কিসসাও শুনিয়েছিলেন—উমর ইবন্ আবদ অল-আজিজ-এর রাজত্বকালে এক নওজোয়ান তার এক দোস্তের সঙ্গে মােলাকাত করতে যায়। সে ছিল রাখাল। ভেড়া চরাত। ভেড়ার পালের মাঝে এক জোড়া মােটাসােটা কুকুর দেখে সে বিস্মিত হয়। রাখালকে জিজ্ঞাসা করে—তােমার ভেড়ার পালে কুকুর দুটোকে রেখেছ কেন হে? তার রাখাল-দোস্তটি হেসে বলল—কুকুর নয়। ও দুটো নেকড়ে, পােষা নেকড়ে।

-পােষা? সে কী হে তারা ভেড়া খেয়ে ফেলে না?’ 

—মারের ভয় দেখিয়ে পােষ মানিয়েছি। থাবা দিতে গেলে পা ভেঙে দেব, ভয় আছে। মােদ্দা কথা হচ্ছে, কাল্লা মজবুত হলে দেহেও বল থাকে।

বেগম শাহরাজাদ এমন সময় দেখলেন প্রভাত হয়ে আসছে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।

                     ছেষট্টিতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় যামে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, নুজাৎ এবার বল্ল-খলিফা আবিদ অল-আজিজ একবার বলেছিলেন—আল্লাহ তাে চিরজীবি করেন নি। যেকোন ধর্মাবতারের কাছে মৃত্যুই তার সবচেয়ে বড় আশীর্বাদরূপে গণ্য হয়। খলিফা হিসারাস একদিন তার পারিষদদের নিয়ে বসে। তখন ইবন সফবান উপস্থিত হলেন। বললেন—“আল্লাহ আপনার সহায় হােন। আপনাকে আজ এক উপদেশ মূলক কিসসা শােনাব।

তিনি কিসসাটি শুরু করলেন—এক সুলতান একদিন তার সভাসদদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন—‘আমার মত মহাত্মা, উদারচেতা, ন্যায়নিষ্ঠ ও বিত্তশালী আর কোন বাদশাহ কি তােমাদের চোখে পড়েছে?' তা শুনে এক প্রবীণ ধর্মাশ্রয়ী সভাসদ বললেন- জাঁহাপনা, অধমের গোস্তাকি মাফ করবেন, আপনার এ অগাধ ধনদৌলত চিরস্থায়ী হবে বলেই কি আপনার বিশ্বাস?

–‘ধনদৌলত কোনদিনই চিরস্থায়ী হতে পারে না।'

–‘তাই যদি হয় তবে কেন এমন গর্বের সঙ্গে এরকম প্রশ্নের অবতারণা করছেন?

—তবে বল, আমার কর্তব্য কি?

-“নিজের মনকে পবিত্র রাখুন। অহঙ্কার মন থেকে মুছে ফেলুন। পাপচিন্তা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ-তে নিজেকে সঁপে দিয়ে অনাড়ম্বর জীবন যাপনে লিপ্ত থাকুন। তখন থেকেই খলিফা একটিমাত্র কম্বল সম্বল করে অতি দীনহীনের মত জীবন যাপন করতে লাগলেন। নুজাৎ এবার বললেন—জীবনের এ পর্বের আরও অনেক জ্বলন্ত উদাহরণ দিতে পারি। কিন্তু আজ সে-সুযােগ নেই। ভবিষ্যতে চেষ্টা করব।

এমন সময় প্রভাতের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।

                 সাতষট্টিতম রজনী

গভীর রাত্রে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে এলেন। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন –‘জাঁহাপনা, নুজাৎ-এর কথায় চার কাজী আবেগ-উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে পড়ল। তারপর তারা শাহজাদা সারকানকে যথােচিত পদ্ধতিতে কুর্ণিশ জানিয়ে ফিরে গেল।

শাহজাদা সারকান এবার তার দাস-দাসীদের বলল-“আজ রাত্রেই আমি শাদী করব। তােমরা আড়ম্বরের সঙ্গে যাতে শাদী মিটতে পারে তার আয়ােজন কর।

প্রাসাদে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। আমীর ওমরাহরা নিমন্ত্রিত হয়ে এল। কব্জি ডুবিয়ে সবাই যাতে খানাপিনা করতে পারে তার ব্যবস্থা হ'ল। বাতির রােশনাই ঝলমলিয়ে উঠল। বহু আমিরওমরাহ-সওদাগর এসে শাহজাদাকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করল।

কুমারী লেড়কিরা পাত্রী নুজাৎ’কে অপূর্ব সাজে সাজিয়ে তুলল । প্রথমে তাকে সাতবার বাসর কক্ষ প্রদক্ষিণ করাল। তারপর প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী তাকে বিবস্ত্র করা হ’ল। এক বৃদ্ধা তার শরীরের বিশেষ বিশেষ স্থান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করল যে তার দেহ সহবাসের উপযােগী কিনা। এবার সে ঘর ছেড়ে চলে গেল।

সুসজ্জিত সারকান বাসরঘরে প্রবেশ করল। নিজ দেহের শােরিওয়ান, পালুন এবং অন্যান্য, গাত্রাবরণ যা কিছু সবই এক এক করে খুলে বিবস্ত্র হ’ল। এবার খুশী মনে সদ্য শাদী করা বিবির পাশে গিয়ে বসল। ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারল না তার নিজের বহিনই বিবির আসন লাভ করেছে। আবেগে উচ্ছাসে অভিভূত হয়ে বুকে টেনে নিল নুজাৎ-এর পনের বছরের যৌবনভরা ডগমগে দেহটিকে। শাদীর প্রথম রাত্রেই নুজাৎ গর্ভবতী হ’ল। নুজাৎ-এর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর পেয়ে সারকান তার উজিরকে বলল বাগদাদে খলিফা উমর অল-নুমানকে সংবাদটি পৌছে দিতে।

সারকান নিজেই খলিফা উমরকে লেখা চিঠিটির বয়ান বলে গেল। —এক বাদীকে কিনে শাদী করেছি। সে কেবল খুবসুরৎই নয়। নানা গুণে গুণান্বিতাও বটে। শীঘ্রই বাগদাদে পাঠাব। সে তার দেবর দু অল-মকান এবং ননদ নুজাৎ-এর সঙ্গে মােলাকাৎ করে আসবে।

সারকান-এর লেখা চিঠি নিয়ে এক দ্রুতগামী অশ্বে চেপে দূত বাগদাদের পথে যাত্রা করল। যথা সময়ে বাগদাদের সংবাদ নিয়ে দূতটি ফিরে এল। পূর্ব-আকাশে ভােরের প্রস্তুতি চলেছে। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।

                        আটষট্টিতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় যামে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কক্ষে এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন। তিনি বললেন—‘জাহাপনা, সুলতান উমর অল-নুমান চিঠিতে তার লেড়কাকে লিখলেন-বেটা, তুমি বাগদাদ ছাড়ার পর থেকে বিভিন্ন উপায়ে নসীবের চাকা ঘুরেই চলেছে। শােকজ্বালায় আমার হাড়ি জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে গেছে। আমার জান ।

দু অল-মাকান আর নৃজাৎ প্রাসাদ ছেড়ে কোথায় যেন চলে গেছে। আমি তখন বাগদাদের বাইরে ছিলাম। ফিরে এসে শুনি তারা তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে ভিড়ে প্রাসাদ ছেড়ে মক্কায় গেছে। মাকান অবশ্য আমার কাছে আগে একবার মক্কায় যাবার আব্দার করেছিল। তার বয়সের কথা উল্লেখ করে আমি তখন বুঝিয়ে নিরস্ত করেছিলাম। কথা দিয়েছিলাম আমি নিজে তাকে সঙ্গে করে সামনের বছর নিয়ে যাব। তাতে মন ভরে নি। আমার অনুপস্থিতির সুযােগে তার বড় বহিন নুজাতকে নিয়ে গােপনে প্রাসাদ ছেড়ে যায়। মক্কায় লােক পাঠিয়ে তল্লাস করেছি। অন্য বহু জায়গায়ও পাত্তা লাগিয়েছি। পাত্তা মেলে নি। শেষে হতাশ হয়ে হাল ছাড়তেই হ’ল। আল্লাতাল্লা তােমার মঙ্গল করুন।

এর কিছুদিন পর নুজাৎ আসন্ন প্রসবা জেনেও জরুরী কাজে সারকানকে বাগদাদে যাত্রা করতে হ’ল। কারণ তার আব্বা গুরুতর অসুস্থ। | বাগদাদ থেকে ফিরে এসে দেখে সাতদিন আগে নুজাৎ এক লেড়কি পয়দা করেছে। লেড়কির গলায় একটি সােনার হার। তার লকেটটির দিকে চোখ পড়তেই সারকান প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে—নুজাৎ, এ হার তুমি কোথায় পেয়েছ, বল? এ তাে দৈবশক্তি সম্পন্ন পাথর তিনটির একটি। কোথায় পেলে? সত্যি করে বল। পাথরতিনটি তাে নসীব বিড়ম্বিতা ইরবিজা আমার আব্বাকে দিয়েছিল। বাঁদী কাহাকার, বল কোথায় পেলে?  বাঁদী শব্দটি কানে যেতেই নুজাং কালনাগিনীর মত ফোস করে ওঠে—‘তুমি আমাকে বাদী’ সম্বােধন করলে? আমি রীতিমত তােমার শাদী করা বিবি। বাদী’ সম্বােধন করে আমাকে অপমান করার সাহস তােমাকে কে দিয়েছে! শুনে রাখ, আমি মােটেই ফেলনা নই। এতদিন আমি আমার প্রকৃত পরিচয় গােপন রেখেছিলাম। আজ ফাস করতে বাধ্য হচ্ছি—তুমি যেমন শাহজাদা আমিও ঠিক তেমনি শাহজাদী। আমি বাগদাদের খলিফা উমর অল-নুমান-এর বেটি। আমার প্রকৃত নাম নুজাৎ অল-জামান। অতএব তােমার চেয়ে আমি কমতি কিসে শুনি?

কিসসার এ পর্যন্ত বলতে না বলতেই ভাের হয়ে এল বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

                        উনসত্তরতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় যামে বাদশাহ শারিয়ার অন্দর মহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কক্ষে এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, শাহজাদা সারকান তার বিবি নুজাৎ-এর কথা শুনে স্থবিরের মত দাঁড়িয়ে রইলেন। তার স্থিরদৃষ্টি বিবির মুখের ওপর নিবদ্ধ। চোখের তারায় বিস্ময়ের ছাপ সুস্পষ্ট। আপন মনে বলে উঠলেন—‘খােদাতাল্লার একী নিষ্ঠুর পরিহাস! নিজের বহিনকে শয্যাসঙ্গিনী করেছি! ছিঃ ছিঃ ছিঃ ! এশরমের বাত আমি কাকে বলব! আমি এমন কী গুনাহ করেছি যে এমন নির্মম-নিষ্ঠুর শাস্তি আমাকে দিলে?

নুজাৎ-এর আঁখিতেও পানির ধারা নেমে এল।

এক সময় সারকান নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বল্ল---শােন, জানতে যখন পেরেই গেছি তখন আর আমাদের মধ্যে এ-সম্পর্ক বজায় রাখা অবশ্যই সঙ্গত নয়। আমি তােমাকে তালাক দিয়ে। দরবারের উজিরের সঙ্গে তােমার শাদীর বন্দোবস্ত করব। ভুল আমাকে শােধরাতেই হবে। | নুজাৎ সােল্লাসে সম্মতি দেয়। বলে—যত তাড়াতাড়ি পার আমাদের এ-অসঙ্গত সম্পর্ক ছিন্ন করার বন্দোবস্ত কর।' সারকান এক আমীরের সঙ্গে নুজাৎ-এর শাদী দিয়ে ছিল। এঘটনার কয়েক দিন পর বাগদাদ থেকে বাদশাহ উমর-এর বার্তা নিয়ে দূত এল। তার চিঠিতে বক্তব্য—আজ পর্যন্ত নুজাৎ আর মাকান-এর কোন পাত্তা মেলে নি। তাদের শােকে তিনি যার পর নাই কাতর। কনস্তানতিনােপল থেকে এক বুড়ি পাঁচ-পাঁচটি খুব সুরৎ লেড়কি নিয়ে প্রাসাদে এসেছে। কেবলমাত্র সুরতের বিচারেই নয় বিভিন্ন গুণের বিচারেও তারা অতুলনীয়া। বেচতে ইচ্ছুক। তবে নগদ অর্থের বিনিময়ে নয়। বাহারী সমানপত্রের দিকেই তার আগ্রহ বেশী। অতএব সারকান যেন সেখানকার আকর্ষণীয় কিছু সমানপত্র পাঠিয়ে দেয়। সে সঙ্গে তার বিবিকেও যেন পাঠিয়ে দেয়। উমর শুনেছেন, সারকান-এর বিবি খুবই বিদূষী। এতএব তাকে দিয়ে লেড়কি পাঁচটির. বিদ্যাও জ্ঞানের বহর যাচাই করে নিতে চাইছেন। বাদশাহ উমর-এর চিঠি পড়ে মহা মুশকিলে পড়ল। উপায়ান্তর না দেখে নুজাৎ’কে ডেকে পাঠায়। সে বুদ্ধিমতী। নিশ্চয়ই পরামর্শ কিছু দিতেই পারবে। সব শুনে সে বল্ল—আমাকে বরং বাগদাদে পাঠিয়ে দাও। সবকিছু আব্বাকে গুছিয়ে বলতেই হবে। আর গােপন রাখা সঙ্গত নয়। এবার সারকান’কে বলল—“ভাইজান, তুমি চিঠি লিখে আব্বাকে জানাও, কি করে আমি বাদাবী ডাকাতসর্দারের হাতে পড়লাম। তারপর সওদাগর মারফৎ কি করেই বা তােমার হাতে পড়ি। তুমি আমাকে চিনতে না পেরে শাদী করেছিলে তা-ও লিখবে। আমরা সহবাস করেছি, এ-কথাটি কেবল কৌশলে চেপে যাবে। তারপর আমার আসল পরিচয় জানতে পেরে তােমার দরবারের আমীরের সঙ্গে আমার যে আবার শাদী দিয়েছ একথা লিখতেও ভুল করবে না। সারকান এবার তার আব্বার ফরমাস অনুযায়ী অন্যত্র দুষ্প্রাপ্য দামাস্কাসের বহুমূল্য দ্রব্য সামগ্রী ক্রয় করে নুজাৎ-এর সঙ্গে বাগদাদে পাঠাবার উদ্যোগ নিল।

এমন সময় সেবুড়াের সঙ্গে বহু মুলুক ঢুঁড়ে দু অল-মাকান। দামাস্কাসে হাজির হ’ল। প্রাসাদের সদর-দরজার সামনে উটের পিঠে সমানপত্র দেখে দু-অল-মাকান জিজ্ঞাসা করে জানতে পারল এসব বাগদাদে যাচ্ছে। বাদশাহ উমর অল-নুমান’কে ভেট পাঠানাে হচ্ছে। বাগদাদের নামটি কানে যেতেই তার দিল আনন্দে নেচে ওঠে। সে তখনই মনস্থ করে ফেলে তাদের পিছু পিছু বাগদাদে যাবে। বুড়ােটি কিন্তু তাকে একা ছাড়তে নারাজ। সে-ও সঙ্গে যেতে চায়।।

সারকান-এর ভেট নিয়ে উট বাগদাদের উদ্দেশে যাত্রা করল। মাকান গাধার পিঠে চেপে তাদের পিছু নিল। বুড়ােটি চল পয়দল। তিনদিন পথ চলার পর এক মুসাফিরখানার সামনে নুজাৎ-এর তাবু পড়ল। মাকানও গাধার পিঠ থেকে নামল। বুড়ােকে নিয়ে মুসাফিরখানায় আশ্রয় নিল। এদিকে নুজাৎ তার স্বামীর সঙ্গে তাঁবুতে বাস করছে। রাত্রে নুজাৎ-এর ঘুম আসছে না। নিজের নসীবের কথা ভাবতে ভাবতে তার দিল উদাস-ব্যাকুল হয়ে যায়। সে গুটিগুটি তাবু থেকে বেরিয়ে নরম ঘাসের বিছানার ওপর বসে পড়ল। মাথার ওপরে কুমড়াে ফালির মত চান্দ, তার ওপর মাঝ রাত্রের ফুরফুরে বাতাস। এমন সময় মুসাফিরখানার দিক থেকে বাতাসে গানের সুর ভেসে এল। নুজাৎ উৎকর্ণ হয়ে লক্ষ্য করল। হ্যা, সে-গানটিই তাে বটে! তার ভাইয়ার মন পছন্দ গানটিই তাে কে যেন গাইছে। নুজাৎ তার দেহরক্ষী খােজাকে হুকুম করে—যা, দেখে আয় তো, কে গাইছে!’ | খােজা বুড়ােকে জিজ্ঞাসা করে কোন হদিস না পেয়ে হতাশ মনে ফিরে গেল, বুড়াে ব্যাপারটিতে খুবই ঘাবড়ে গেল।

মুসাফিরখানার ভেতরে গিয়ে মাকানকে বলল—'তােমার গান আমিরের বিবির ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। রেগে একেবারে কাই। তার খােজা দেহরক্ষী এসে খুব করে শাসিয়ে গেছে। বিদেশ বিভুই, একটু-আধটু সমঝে চল বেটা।

মাকান তার কথায় পাত্তা দিল না। আবার গুণগুণ করে গান ধরল। নুজাৎ উৎকর্ণ হয়ে গানটি লক্ষ্য করল। না, শোনার ভুল অবশ্যই নয়। তার ভাইয়ার সে-গানটিই তাে বটে।

নুজাৎ আবার তার খােজা দেহরক্ষীকে তলব করল। ধমকের স্বরে বল—আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি কে গান গাইছে। আর তুই এসে বলি, আমার শােনার ভুল। যা, ভাল করে খুঁজে দেখ গে, কে গাইছে। তাকে আমার সামনে হাজির করবি।

বুড়াে এবারও বল—“তােমাদের শােনার ভুল। গভীর রাত্রে অনেক সময় এরকম ভুলচুক হয়েই থাকে। মরুভূমির মায়াও মনে করতে পার। মরুভূমিতে মাঝে মধ্যে কতসব অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটে যা ভাবাই যায় না। কখনও মনে ধান্দা লাগবে, কেউ যেন গান। গাইছে, কখনও মনে হবে গুড়াবাচ্চা কেউ কাদছে, আবার অনেক সময় বেহেস্ত থেকে হুরী পরী নেমে এসেও কতসব বিচিত্র কাণ্ড ঘটায়।

খােজা ফিরে যায়। নুজাৎ’কে মরুভূমির মায়ার কথা উল্লেখ করে দৃঢ়তার সঙ্গেই বলে কেউ-ই গান গায় নি। নুজাৎ এবার এক থলি সােনার মােহর খােজাটির হাতে দিয়ে বল্ল-মােহরের লােভ দেখাবি। দেখবি, যে গান গাইছিল স্বীকার করবে এবং সঙ্গে আসতেও রাজী হবে।।

খােজা এবার বুঝল, ঘুমের ব্যাঘাতের ব্যাপার স্যাপার নয়। অন্য কোন রহস্য এর পিছনে রয়েছে। আমীর আদমীদের মর্জি, সাধারণের বােধগম্য হবার নয়। নিরুপায় হয়ে মােহরের থলিটি নিয়ে খােজা আবার ছুটল মুসাফিরখানার দিকে। বুড়ােকে গিয়ে বলে,—“তুমিই গান গাইছিলে। আমার মালকিন-এর কাছে একবারটি চল। ভয় ডরের কিছুই নেই। তিনি শুধু তােমাকে এক নজর দেখতে চাইছেন। এই যে এতগুলাে মােহর পাঠিয়ে দিয়েছেন।

এমন সময় প্রভাতের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ তার কিস্সা বন্ধ করলেন।

                            সত্তরতম রজনী 

গভীর রাত্রে বাদশাহ শারিয়ার অন্দর মহলে বেগম শাহরাজাদএর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—জাঁহাপনা, বুড়ােটি এবার মাকানকে ডেকে খােজার সঙ্গে মােলাকাৎ করিয়ে দিল। সব কিছু শুনে সে তাে বিস্ময়ে একেবারে ভিমড়ি খাওয়ার জোগাড়। তার গান শুনে আমিরের বিবি তাকে তলব করেছেন, বিশ্বাস করতেও যে উৎসাহ পাচ্ছে না। আবার ঘুষ বা ইনাম যা-ই হােক না কেন এক থলি মােহরও তার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন। বুড়াের বারণ সত্ত্বেও মাকান খােজাটির পিছন পিছন তার মালকিনের তাঁবুর দিকে হাঁটতে লাগল। তাবুর কাছে পৌছে মাকান’কে বাইরে দাঁড় করিয়ে খােজা ভেতরে গিয়ে গায়কের আগমন বার্তা জানাল। নুজাৎ তাঁবুর ভেতরে থেকেই খােজাকে বলল —“তার নাম ধাম জিজ্ঞাসা কর। আর একটু আগে যে-গানটি গাইছিল সেটি তাকে আবার গাইতে বল। খােজার মুখে তার মালকিনের ফরমাস শুনে মাকান বলল ‘গান শুনতে চান একবার কেন পাঁচবার শােনাব। কিন্তু নাম-ধাম বলতে পারব না। এখন পথই আমার ঠিকানা। মুসাফির হয়ে মুলুকে মুলুকে ছুঁড়ে বেড়াচ্ছি। আর আমার নামও অনেক আগেই হারিয়ে গেছে।

মাকান গান শুরু করল। কয়েক কলি গাইতে না গাইতেই নুজাৎ উন্মাদিনীর মত তাবুর বাইরে বেরিয়ে এল। তাকে দেখেই—‘মাকান! ভাইয়া আমার! ভাইয়া’বলতে বলতে তাকে দু হাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করল। ব্যস, আর কিছুই বলা হয়ে উঠল না। দুম করে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেল্ল।।

এমন সময় প্রভাত হয়ে আসছে বুঝতে পেরে বেগম শাহরাজাদ কিত্সা বন্ধ করলেন।

                                  একাত্তরতম রজনী

রাত্রির দ্বিতীয় যামে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, নুজাৎ সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল।  দু অল-মাকান এবার তার দিদি নুজাৎ সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হয়। ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে তাকে টেনে তুলল। নুজাৎ-এর সংজ্ঞা ফিরে এল। বহিন আর ভাইয়া আনন্দে-উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে পড়ে। কয়েক মুহূর্ত কারাে মুখে কোন কথা নেই। কেবল নীরবে একে অন্যের মুখের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইল।

নুজাৎ এবার তার ভাইয়া মাকান’কে পাশে বসিয়ে নিজের অতীত-কাহিনী বলল। মাকানও তার দুঃখের দিনগুলাের কথা দিদির কাছে ব্যক্ত করল। তবে একথা বলতে ভুলল না যে, তার সঙ্গের বুড়ােটির জন্যই তার জান রক্ষা পেয়েছে।

এমন সময় নুজাৎ-এর স্বামীর নিদ টুটে গেল। গভীর রাত্রে তার বিবির পাশে এক অজ্ঞাত পরিচয় যুবককে দেখে যার পর নাই বিস্মিত হয়।

নুজাৎ তার মানসিক পরিস্থিতির কথা অনুমান করতে পেরে ঠোটের কোণে দুষ্টুমি ভরা হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল-“কি গাে ভালমানুষ, ভাবছ এত রাত্রে আমি কাকে পাশে বসিয়ে কথা বলছি, তাই না? ঘাবড়াবার কিছু নেই। আমার সহােদর ভাইয়া দুঅল মাকান। বাদশাহ উমর অল নুমান-এর ছােট লেড়কা।

নুজাৎ এতদিন তার স্বামীর কাছে নিজের আসল পরিচয় দেয় নি। আজই প্রথম নিজের জীবনের দুঃখময় ঘটনাবলী সংক্ষেপে প্রকাশ করল। এবার সে জানতে পারল আরবের সর্বেসর্বা বাদশা উমর-এর জামাতা সে। সে বাদশাহের জামাতা আর বাদশাহ তার শ্বশুর। একী কম কথা! সে আপন মনে বলে উঠল—‘হায় শুভন আল্লাহ! আমি বাদশাহের জামাতা!

পাখির ডাকে সকাল হ’ল। নুজা ও তার স্বামীর নির্দেশে খােজা এবার ছুটল মুসাফিরখানা থেকে সে বুড়ােটিকে নিয়ে আসতে।

বুড়াে তখন গাধাটিকে গাছের পাতা ছিড়ে ছিড়ে খাওয়াচ্ছে। খােজাকে দূর থেকে দেখেই তার কলিজাটি দড়কচা মেরে যাবার জোগাড় হ’ল। সে ধরেই নিল, আজ তার গর্দান যাবেই, কেউ-ই রুখতে পারবে না। লেড়কাটির জান নিয়েছে, এবার তাকেও খতম করতে এসেছে।

হ্যা, সে যা আশঙ্কা করেছিল ঠিক তা-ই। খােজাটি কাছে এসেই বল—“চল আমার সঙ্গে। তােমায় শূলে চড়ানাে হবে। তুমি বার বার মিথ্যে কথা বলে আমাকে তাড়িয়েছ, কে গান গাইছিল তুমি জানতে না, তাই না? মিথুক কাহাকার। এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

                                বাহাত্তরতম রজনী 

বাদশাহ শারিয়ার রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ-এর কক্ষে এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাঁহাপনা, খােজাকে দেখে বুড়াে তাে পৌনে মরা হয়ে গেল। বুড়াে যত মুষড়ে পড়ে খােজা ততই তড়পায়। সে এবার কোর্তার কলার নাচিয়ে বলে—“আমার সঙ্গে মস্করা করার মজা টের পাবে এবার। তােমাকে শূলে না চড়ালেও গর্দান তাে নেওয়া হবেই। আর যদি নসীব খারাপ হয় তবে গর্দানও যাবে শূলেও চড়াবে। তবে কোনটি আগে হবে তা মালিক মালকিনই ঠিক করবেন।

বুড়াে তাে কোরবাণির খাসির মত কাঁপতে কাঁপতে জান হাতে নিয়ে খােজাটির পিছন পিছন চলল। কয়েক পা গিয়েই বুড়ােটি কাপা কাপা গলায় বল্ল-‘শােন। গাে ভাইজান, যে-ছােকরাটি গান গাইছিল সে আমার কুটুম সাক্ষাৎ কেউ-ই নয়। পথের পরিচয়। ব্যস, এর বেশী কিছু ভেবে কিন্তু আমার শাস্তির বরাদ্দ আবার বাড়িয়ে দিয়াে না। খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি, ছােকরাটি আমার কেউ-ই নয়।

খােজাটি তামাশা দেখার জন্য এবার বলল—এসব কথায় আর কাজ হবার নয়। সাফ কথা, তােমরা দু জনে বিবি সাহেবার নিদ টুটিয়েছ। দু' জনকে সমান সাজা দেওয়া হবে।  বুড়াে তাবুতে গিয়ে যেন ধড়ে জান ফিরে পেল। শুকিয়ে ওঠা কলিজাটি যেন পানির ছোঁয়া পেল। সাজা দেওয়া তাে দূরের কথা তাকে বরং নুজাৎ মণ্ডা মিঠাই দিয়ে আপ্যায়ন করল।

নুজা ও তার সঙ্গী-সাথীরা আবার পথে নামল। বাগদাদের কাছাকাছি পৌঁছােতে না পৌছতে তারা এক বিশাল অশ্বারােহী বাহিনীর মুখােমুখি হ’ল। তাদের সঙ্গে সুলতানের পতাকা।

নুজাত ও তার সহযাত্রীরা উট থামাল। অশ্বারােহী বাহিনীর পাচজন প্রধান ঘােড়ায় বসেই প্রশ্ন করল-“তােমরা কে? কোথা থেকে আসছ, চলেছই বা কোথায় ?

নুজাৎ-এর স্বামী তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলল —আমরা দামাসকাস থেকে আসছি।

দামাসকাসের নাম শুনেই অশ্বারােহী বাহিনীর প্রধানদের আগ্রহ বেড়ে গেল। তারা আবার অধিকতর আগ্রহান্বিত হয়ে প্রশ্ন করল। –‘দামাসকাস ? দামাসকাস থেকে আসছ? পরিচয় কি?

—“আমি দামাসকাসের দরবারের সচিব। শাহজাদা সারকান এর পক্ষ থেকে বাগদাদের বাদশাহ উমর অল-নুমান-এর কাছে যাচ্ছি। আমাদের সঙ্গে বাদশাহের ভেট রয়েছে।

—“আমরা দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, বাদশাহ উমর অল-নুমান দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে বেহেস্থে চলে গেছেন।

—সে কী কথা। আকস্মিক মৃত্যু—কিভাবে তাঁর মৃত্যু ঘটল ?”

—“বিষক্রিয়ায়। মৃত বাদশাহের উজির দানদান আমাদের সঙ্গেই রয়েছেন। মেহেরবানি করে একবারটি চলুন তাঁর সঙ্গে বাতচিত করবেন। তার মুখ থেকে বাদশাহের মৃত্যুর কথা বিস্তারিতভাবে শুনতে পাবেন।

উজির দানদান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—‘হ্যা, বিষক্রিয়ায়ই তার মৃত্যু ঘটেছে। কিভাবে, কাদের দ্বারা এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল পরে বলব। সবার আগে আমাদের কাজ বাগদাদের বাদশাহ নির্বাচন করা। আমি ইতিমধ্যেই সেখানকার চারজন কাজীর মতামত নিয়েছি। তাদের বক্তব্য শাহজাদা সারকানই মসনদের দাবীদার। তাই আমরা সদলবলে দামাসকাসে তার সঙ্গে মােলাকাত করতে চলেছি। তবে বাগদাদের জনসাধারণের মত দু-অল-মাকানকেই মসনদে বসানাে হােক। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উজির এবার বললেন—“কিন্তু কোথায় পাব তাকে? সে যে আজ দু’ বছরের ওপর বাগদাদ ছাড়া। তার বড় বহিন নুজাৎ’কে নিয়ে মক্কায় পাড়ি দিয়েছে। ব্যস, বহুৎ তল্লাসী চালিয়েও তাদের কোন পাত্তা মেলেনি।

বাদশাহ উমর অল-নুমান-এর আকস্মিক মৃত্যুতে শােক সন্তপ্ত হলেও দু অল-মাকান-এর সিংহাসন প্রাপ্তির সম্ভাবনার কথা শুনে নুজাৎ-এর স্বামীর দিল খুশীতে নেচে ওঠে। কারণ সে মসনদে বসলে তার নসীব খুলে যাবে, সন্দেহ নেই। বাগদাদের ওপর তার প্রভাব ও প্রতিপত্তিও কম হবে না।

এমন সময় প্রভাতের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

                                তিয়াত্তরতম রজনী 

রাত্রি একটু গভীর হলে বাদশাহ শারিয়ার কিসসা শােনার অত্যগ্র আগ্রহ নিয়ে অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, দু-অল-মাকান-এর বাগদাদের মসনদ প্রাপ্তির কথা শুনে নুজাৎ-এর স্বামীর দিল আনন্দে নেচে উঠল। কোনরকমে সে নিজেকে সামলে নিয়ে বিষন্ন মুখে বলল—“আজকের এ নিদারুণ শােক তাপের মধ্যেও আপনাকে একটি খুশীর খবর দিচ্ছি—নুজাৎ অল-জামান আর তার ভাইয়া দু-অল-মাকান-এর হদিস মিলেছে। নুজাৎ আমার বেগম। তারা দু'জনই আমাদের সঙ্গে আছে।

উজির দানদান চোখের তারায় অবিশ্বাসের ছাপ এঁকে নুজাৎএর স্বামীর মুখের দিকে নিস্পলক চোখে তাকিয়ে রইলেন। একেবারে স্তম্ভিত। মুখ দিয়ে রা সরছে না।

নুজাৎ-এর স্বামী এবার সংক্ষেপে নুজাৎ এবং মাকান-এর দু’ বছরের বিড়ম্বনার কাহিনী তাঁর কাছে সবিস্তারে বর্ণনা করল।

উজির দানদান অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে রুদ্ধশ্বাসে সব শুনলেন। এবার সােল্লাসে চেঁচিয়ে সেনাপতি ও আমীর-ওমরাহদের কাছে ডাকলেন। বললেন—“আমাদের বহু আকাঙ্ক্ষিত শাহজাদা দু অলমাকান-এর হদিস মিলেছে। এবার আপনারা ভাবুন, আলােচনার মাধ্যমে স্থির করুন, বাগদাদের মসনদে কাকে বসাবেন। ছাউনি পড়ল। বিস্তীর্ণ ময়দানে সভা বসল। তারা সবাই যাচ্ছিল দামাস্কাসে শাহজাদা সারকান-এর সঙ্গে মােলাকাত করতে। তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাগদাদে নিয়ে মসনদে বসাতে। এখন দু-অলমাকান-এর হদিস মেলায় পরিস্থিতি অন্য দিকে মােড় নিয়েছে। অতএব আলােচনার দরকার অবশ্যই রয়েছে। দীর্ঘ আলােচনার মাধ্যমে তারা পাকা সিদ্ধান্তে পৌছল। মৃত বাদশাহ উমর-এর ছােট লেড়কা দু-অল-মাকানকে বাগদাদের মসনদে বসাবে। বাদশাহের মর্যাদায় অভিষিক্ত করবে।

এদিকে নুজাত আব্বার আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ পেয়ে কেঁদে আকুল হয়। মাকানও ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে। নুজাৎ ও মাকান পিতার শােক একটু সামলে নিলে নুজাৎ-এর স্বামী এবার মাকান’কে বল্ল—“উজির দানদান এবং সাম্রাজ্যের আমীর-ওমরাহরা একমত হয়েছেন, তােমাকেই বাগদাদের মসনদে বসাবেন। এবার বল, তােমার কি মত?

মাকান কিন্তু এতবড় একটি খবর শুনেও উল্লসিত হতে পারল না । সে বেঁকে বসল। প্রবল আপত্তি তুলে সে বলল—সে কী, আমি বাগদাদের মসনদে বসব কি! আমার বড় ভাইয়া বর্তমান থাকতে। আমি বাগদাদের মসনদে! অসম্ভব, এ হয় না। হতে পারে না। তার দিলে দাগা দিয়ে আমি কিছু করতে উৎসাহী নই।

দু-অল-মাকান-এর ভগ্নিপতি দেখল সব ভেস্তে যাচ্ছে। তাই

Post a Comment

0 Comments