আরব্য রজনী পার্ট ৪১ ( Part 41 ) alif laila

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
সওদাগর নিজ অভিজ্ঞতা সম্বল করে যুবক শাহজাদা সারকানের মানসিক পরিস্থিতির কথা সহজেই আঁচ করে নিতে পারল। এবার হাত কচলে হুজুরের কাছে পেশ করল—এ লেড়কি কেবল সুরতের বিচারেই শ্রেষ্ঠা নয়। এর বহুমুখী গুণও যেকোন আদমির নজর কাড়বে। এমন কোন বিদ্যা নেই যাতে এর যথেষ্ট দখল নেই। হুজুর, মেহেরবানি করে একবারটি যাচাই করলেই বুঝতে পারবেন, আমি কেবলমাত্র ব্যবসার খাতিরে আমার সওদার সুখ্যাতি করছি না।

—“না না, পরীক্ষা করার আর কি আছে। তােমার প্রথম কথা যখন মিলে গেছে তখন আর সব কথা আর কাজের মধ্যে কিছুমাত্রও ফারাক নেই বলে আমার বিশ্বাস। খাজাঞ্চিকে বলছি, তােমার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবে।

-হুজুর আমি কিন্তু অন্য চিন্তা করে লেড়কিকে আপনার দরবারে হাজির করেছি। বাদশাহ উমর-অল-নুমান-এর জন্য একে খরিদ করেছিলাম। তা হুজুর মেহেরবান, সওদাটি যদি আপনারই চোখে ধরে থাকে তবে রেখে দিতে পারেন। আমার তাে ব্যবসা, আপনি রাখলেও যা আবার বাদশাহ নিলেও একই কথা। তবে আমার সওদা আপনার ভােগে লাগলেই আমি বেশী খুশী হ’ব।

—“ঠিক আছে, এবার বল তাে কি দামে তুমি একে খরিদ করেছ? আর আমার ইনামই বা কি আশা করছ?

–‘হুজুর ঝুট বলব না। একে খরিদ করেছি এক লক্ষ দিনারের বিনিময়ে। আর সাজ পােশাক আর গহনাপত্রের জন্য খরচ হয়েছে আর এক লক্ষ। আমার দালালীই বলেন ইনামই বলেন সে আপনার যা বিবেচনা হয় দেবেন।

শাহজাদা সারকান এবার খাজাঞ্চিকে ডেকে সওদাগরের সওদা বাবদ এক লক্ষ, সাজ পােশাক গহনাপত্রের জন্য এক লক্ষ আর ইনাম বিশ হাজার দিনার মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। আর সওদাগর এবার থেকে যখন, যা কিছু বাণিজ্য করবে তার কর যেন মকুব করে দেওয়া হয় এরকম হুকুম দিয়ে দিলেন।

সওদাগর হাত কচলে, ঠোটের কোণে যুদ্ধজয়ের হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল —“হুজুর মেহেরবান। আপনার মত দিল দরিয়া আদমি সচরাচর চোখে পড়ে না। সওদাগর তার প্রাপ্য বুঝে পেয়ে শাহজাদা সারকানকে সালাম জানিয়ে দরবারকক্ষ ত্যাগ করল।।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।

                  ষাটতম রজনী 

বাদশাহ শারিয়ার রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কোনরকম ভূমিকার অবতারণা না করেই তার কিসসার পরবর্তী অংশটুকু শুরু করলেন—“জাহাপনা, সওদাগর নুজাৎ’কে শাহজাদা সারকান-এর হাতে তুলে দিয়ে নিজের প্রাপ্য দু’ লাখ বিশ হাজার দিনার শেরিওয়ানের জেবে পুরে বিদায় নিল।

শাহজাদা সারকান-এর তলব পেয়ে নগরের চারজন প্রখ্যাত কাজী পড়ি কি মরি করে ছুটে দরবারে উপস্থিত হ'ল।

শাহজাদা সারকান কাজীদের লক্ষ্য করে বললেন-“শােনাে, আমি এক সওদাগরের কাছ থেকে এ-লেড়কিকে খরিদ করেছি। আমি একে শাদী করতে চাই। শাদীর হলফনামা তৈরি কর। আর আমার শাদীর সাক্ষী হবে তােমরা। শাহজাদার হুকুমে কাজীরা ব্যস্ত-হাতে শাদীর হলফনামা তৈরি করে ফেলল।

শাহজাদা সে সওদাগরকেও তলব করল। তাকেও শাদীর সাক্ষী রাখতে চায়। শাহজাদার তলব পেয়ে সওদাগরও হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। শাহজাদা সারকান বলল —‘সওদাগরের মুখ থেকে আমি শুনেছি, এ-লেড়কি কেবলমাত্র সুরতের বিচারে অনন্যা নয়, অগাধ গুণাবলীও তার শ্রেষ্ঠত্বের আর এক দিক। এ যে নানা বিদ্যায় অসাধারণ বিদূষী তার প্রমাণ বাঁদী তােমাদের উপস্থিতিতে দেবে। তােমরা বিচার করে আমাকে বলবে, সওদাগরের বক্তব্য কতখানি সত্য।

প্রাসাদেরই এক বিশালায়তন কক্ষে পর্দা ঘেরা স্থানে বাঁদী নুজাৎ'কে বসানাে হ’ল। পর্দার এক ধারে নগরের আমীর-ওমরাহ প্রভৃতি সম্রান্ত ঘরের জনানারা আর অন্য ধারে শাহজাদা সারকান, সওদাগর আর চার কাজী বসল।

শাহজাদা সারকান পর্দার বাইরে থেকে বলল —‘সুন্দরী, তুমি তাে জানই, সওদাগর পঞ্চমুখে তােমার জ্ঞান-বুদ্ধির তারিফ করেছে। আমরা তােমার মুখ থেকে কিছু নীতিকথা শুনতে উৎসাহী। এ ব্যাপারে তােমার জ্ঞান বুদ্ধি কতখানি গভীর তার পরিচয় দাও।

নুজাৎ বলল-শাহজাদা, আপনি বর্তমানে আমাকে যে হুকুম করেছেন তা শ্রদ্ধার সঙ্গে মাথায় রেখে আপনাকে সন্তুষ্ট করতে চেষ্টা করছি।

সবার আগে আমি প্রাথমিক আচরণ বিধির কথা ব্যক্ত করছি। মনুষ্য জীবনে প্রধান উৎসাহের সঞ্চার ঘটে আত্মবিশ্বাস থেকে। উৎসাহ উদ্দীপনা জাগে বাসনার অতৃপ্ত আগুনে দগ্ধ হতে, অন্যথায় কিছুতেই তার সঞ্চার ঘটা সম্ভব নয়। মনুষ্য জাতি কোন্ কোন্ বিষয়ে তার কুশলতা প্রদর্শন করতে উৎসাহিত হয় ? এর উত্তর—সংসারধর্ম পালন, শিল্পকলা, রাজনীতি আর বাণিজ্য ।

সবার আগে আমি রাজনীতি সম্বন্ধে সংক্ষেপে বক্তব্য রাখছি। দেশের শাসন ব্যবস্থা যে-নীতির দ্বারা সুদৃঢ় হতে পারে তাই রাজনীতির পর্যায়ে পড়ে। প্রজারা সুখে-শান্তিতে জীবিকা নির্বাহ করে, দেশের আভ্যন্তরীণ শান্তি শৃঙ্খলা অব্যাহত থাকে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় হয় আর প্রজারা সরকারের প্রতি আস্থাভাজন হয়।

রাজনীতি সম্বন্ধে পারস্যের বাদশাহ তৃতীয় শাহ বলেছেন‘সরকার' এবং 'আস্থা' যমজ বােনের মত। সরকারকে ‘রক্ষক হিসেবে আর ‘আস্থা’কে সম্পদ জ্ঞান করা যেতে পারে।

আমাদের পয়গম্বর যে উপদেশ দিয়েছেন তাতে বলা আছে দুনিয়াতে দুটো মাত্র বস্তু সর্বাধিক ক্ষমতাবান। তাদের একটি ন্যায়’ আর দ্বিতীয়টি 'অন্যায়'। সবাই যখন ন্যায় ধর্মকে আশ্রয় করে তখন তামাম দুনিয়া সুন্দর হয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আবার দুনিয়া বিষময় হয়ে ওঠে যখন অন্যায়-ই ধর্ম বলে বিবেচিত হয়।

এবার বাদশাহ আরদাশির-এর কথা বলছি শুনুন—তিনি তার সুলতানিয়তকে মােট চারটি ভাগে বিভক্ত করে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। আর প্রতিটি সুবার প্রমাণস্বরূপ এক একটি মােহর আঁকা আংটি ধারণ করতেন। এভাবে সুস্থ শাসন কার্য পরিচালনা করতেন। তার শাসন ব্যবস্থা ইসলামের শাসনকাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। পারস্য সম্রাট কাসরা তার সেনাবাহিনীর অধিনায়কের পুত্রকে একবার এক পত্র দিয়েছিলেন।

বেগম শাহরাজাদ তাঁর কিসসার এ পর্যন্ত বলে প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচার দিকে দৃষ্টি ফেরালেন। সেখানে ভােরের প্রস্তুতি চলছে। লক্ষ্য করে কিসসা বন্ধ করলেন।

                        একষট্টিতম রজনী

বেগম শাহরাজাদ তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাঁহাপনা, পারস্যের বাদশাহ কাসরা পত্রটিতে লিখেছিলেন—আব্বাজান, একটি কথা স্মরণ রেখাে, অযথা কারাে প্রতি করুণা দেখাতে যেয়াে না। এর ফলে সরকার দুর্বল হতে বাধ্য। তিনি পত্রটির আর এক জায়গায় এ-ও লিখেছিলেন—“কিন্তু যেখানে ক্ষমা প্রদর্শন প্রয়ােজন সেখানে কখনই শক্ত হওয়া উচিত নয়। তারা এর ফলে বিদ্রোহী হয়ে উঠবে।

একবার খলিফা আবদুল-অল-মানিক ইবন-অল-মারবান মিশরে তার সেনাপতি, ভাইয়া আবদ অল আজিজ’কে এক পত্রে লিখেছিলেন—‘তােমার পরামর্শদাতারা তােমাকে কিছুমাত্র শিক্ষাও দিতে সক্ষম হয় নি। তুমি শত্রুপক্ষের কাছ থেকে শিক্ষালাভ করেছ। তারাই তােমাকে শিখিয়েছে কিভাবে সেনাবাহিনীকে অধিকতর মজবুত করা সম্ভব।

আবার খলিফা উমর ইবন খাতাব তার সভায় যাদের উচ্চপদে নিযুক্ত করতেন তাদের আগে হলফ করতে হ'ত—দুর্বল ও শক্তিসামর্থ্য হীন পশুর পিঠে আরােহণ করব না। শত্রুর সমানপত্র আত্মসাৎ করব না, নামাজ পাঠের সময় বিলম্ব করব না আর সাহেবী পােশাক ব'লে যা চিহ্নিত তা পরিধান করব না।

উমর ইবন্ খাতাব আরও বলেছেন—তিন প্রকার রমণীর অস্তিত্ব দেখা যায়। পতিকে মন-প্রাণে চায় যে মুসলমান নারী সে আদর্শ নারী হিসেবে চিহ্নিত। কেবলমাত্র সন্তানের মঙ্গলার্থে যে মুসলমান নারী স্বামীর সঙ্গ কামনা করে তাকেও ভাল বলা যেতে পারে। কিন্তু যে মুসলমান নারী পর পুরুষের প্রতি আসক্তা তাকে খারাপ বিবেচনা করে তার সঙ্গ এড়িয়ে চলবে।

উমর ইবন্ খাতাব আরও বলেছেন, দুনিয়ায় তিন প্রকার পুরুষের অস্তিত্ব রয়েছে। যারা চালাক চতুর ভাল কাজে হাত দেয় বিচার-বিবেচনা করে। যারা বুদ্ধিমান তারা সবার আগে বিচারবিবেচনা করে, কাজ শুরু করার আগে অন্যের পরামর্শ নিয়ে নেয়।। আর যারা বােকার হদ্দ তারা কারাে বুদ্ধি-পরামর্শ তাে নেয়-ই না উপরন্তু বিচার বিবেচনা না করেই কাজে ঝাপিয়ে পড়ে।

দর্শন শাস্ত্রে পণ্ডিত আলী-ইবন কালিব নারীর রঙ্গ-তামাশা সম্বন্ধে সাবধান হতে বলেছেন। তাদের সম্বন্ধে চোখ-কান খােলা রাখতে উপদেশ দিয়েছেন। তাদের বুদ্ধি-পরামর্শ কখনই গ্রহণ করবে না। কিন্তু তাদের অসন্তোষের কারণ হলে ভয়ঙ্কর পরিণতির মুখােমুখি হতে হবে। তারা চূড়ান্ত সর্বনাশের দিকে মতি দিতে পারে।

কাজীরা নুজাৎ-এর জ্ঞানের গভীরতার কথা বিবেচনা করে স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন। তারা সােল্লাসে বললেন—এমন উপদেশামৃতের হদিস আমরাও তাে ইতিপূর্বে পাই নি !  এবার নুজাৎ বলল—অন্য আর একদিন মানবতার তিনটি ধারা নিয়ে আলােচনা করা যাবে। আজ আমি বিচক্ষণতা ও আচার আচরণের দ্বিতীয় ধাপ সম্বন্ধে বক্তব্য রাখছি। আপনারা শুনে রাখুন, সাধারণ মানুষের পক্ষে পরিপূর্ণতার ধাপে পৌছনাে কিছুতেই সম্ভব নয়। জন্মলব্ধ গুণ ব্যতীত কারাে পক্ষেই এখানে পৌছনাে সম্ভব হয় না । আমি কেবলমাত্র দু’-একটি দৃষ্টান্ত উত্থাপন করে প্রসঙ্গটি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে ব্ৰতী হ'ব।

এমন সময় বেগম শাহরাজাদ দেখলেন ভাের হয়ে আসছে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।

                            বাষট্টিতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় যামে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, নুজাৎ এবার বলল —একদিন খলিফা সুযারিয়াহ নগর পরিভ্রমণে বেরিয়ে চোখের সামনে ল্যাংড়া হাস্যরসিক আবু বাহৰ ইবন্ কাইসকে দেখতে পেলেন। সে পথে পথে ভিক্ষা মেঙে বেড়াচ্ছে। খলিফা তার কাছে এগিয়ে গেলেন। তাকে ডেকে বললেন—“উপদেশ কিছু দাও তাে শুনি।



ল্যাংড়া খলিফার আগ্রহের কথা বিবেচনা করে সােল্লাসে। বলল -জাহাপনা, আপনি রােজ মস্তক মুণ্ডন করবেন, গোঁফ ছাটবেন আর নখ কাটবেন। আর আপনার দাঁত-মুখ যাতে সাফ সুতরা থাকে সে ব্যবস্থা করবেন। তবে যেন কিছুতেই জুম্মাবারে এসব কাজ করতে যাবেন না। এই পবিত্র উপদেশ।।

খলিফা মুচকি হেসে বললেন—“ওহে, আমাকে না হয় সৎ উপদেশ দিলে, কিন্তু তুমি নিজে ? তুমি নিজে কোন উপদেশ পালন কর, বল তাে?”

–‘জাহাপনা, আমার কথা যদি জিজ্ঞেস করেন তবে আমি বলব, আমি একপা সামনে বাড়াবার আগে দুটো পায়ের অবস্থানই সতর্ক দৃষ্টিতে লক্ষ্য করি।

‘আর একটি কথা। বড়দের প্রতি তােমার আচরণ কেমন?

- মাত্রাতিরক্ত সম্মান না দিয়ে যােগ্যতা অনুসারে সম্মান দিয়ে থাকি। আবার তারাও প্রীত হয়ে আশীর্বাদ করবেন, আশা রাখি।

-এবার বল তাে তােমার বিবির সঙ্গে তুমি কেমন আচার ব্যবহার করে থাক ?

–‘আমি মাফি মাঙছি জাঁহাপনা। সে-কথা আমি মুখ ফুটে। বলতে পারব না।' সলজ্জমুখে ল্যাংড়া বলল। পরমুহুর্তেই ভাবল স্বয়ং খলিফা যখন শুনতে চাচ্ছেন তখন তাে বলাই দরকার। —“জাহাপনা, আমার বিবি একেবারেই দুর্বল-কাবু। কুঁজোও বটে। চিৎ হয়ে শােয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।

—“সে কী হে, তবে তাে মহাসমস্যা দেখছি। যদি চিৎ হয়ে শুতেই না পারে তবে ছাদের তলার টিকটিকির খেলা, কড়ি কাঠ গােণা প্রভৃতি তার পক্ষে কি করে সম্ভব হয়, ভেবে পাচ্ছিনে।

-সে কিন্তু উপুর হয়ে শুয়ে ইদুরের ছুটোছুটি দাপাদাপি দেখতেই পছন্দ করে বেশী। ল্যাংড়ার উপস্থিত বুদ্ধি ও কথার মারপ্যাচ দেখে মুগ্ধ হলেন। মুচকি হেসে বললেন—“তােমার সঙ্গে কথা বলে আমি মুগ্ধ হয়েছি। তােমাকে আমি সন্তুষ্ট করতে চাই। বল, কি পেলে তুমি খুশী হবে!

–‘জাঁহাপনা, ন্যায় ও সত্য পথে থেকে প্রজাপালন করুন। ব্যস, এটাই আপনার কাছ থেকে আমার একমাত্র কাম্য। এর বেশী এক কণাও আমি প্রত্যাশা করি না। খলিফার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ল্যাংড়া তার নিজস্ব ভঙ্গিতে হেঁটে এগিয়ে গেল।

ল্যাংড়া এগিয়ে গেলে খলিফা আপন মনে উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে বলে উঠলেন—‘তামাম ইরাকে যদি আর একজনও জ্ঞানী ব্যক্তি না থাকে তবু আমার আর কিছুমাত্র আক্ষেপ নেই। আবু বাহব একাই একশ’ জনের অভাব পূরণ করছে। ইতিমধ্যে ভােরের আলাে একটু একটু করে প্রকাশ পেতে লাগল। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।

                            তেষট্টিতম রজনী 

মাঝরাত্রে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদের কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার অবশিষ্ট অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, নুজাৎ এবার বলল খলিফা উমর ইবন অল-খাতাবের আমলে কোষাগারের দায়িত্বে ছিলেন বুড়াে মুয়াইকিব। ধর্মপ্রাণ। খলিফা একদিন তার ছােট লেড়কাটিকে নিয়ে মুয়াইকিব-এর কাছে উপস্থিত হলেন। মুয়াইকিব শিশুটির হাতে একটি রুপাের দিরহাম দিলেন। এর ক দিন বাদে খলিফা মুয়াইকিবকে ডেকে বললেন—শুনছি, তুমি নাকি ধনাগারের অর্থ নয়-ছয় করছ ?

–তােবা তােবা! এ কী কথা জাঁহাপনা! জিন্দেগীতে আমি কারাে একটি কানাকড়িও আত্মসাৎ করি নি।

–‘তাই যদি হবে তবে তুমি আমার ছােট লেড়কাকে সেদিন রুপপার দিরহামটি কোখেকে দিয়েছিলে? বৃদ্ধ উঠে গিয়ে একটি খাতা নিয়ে এল। একটি পাতার দিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে বলল—‘জাঁহাপনা, নিজের চোখেই দেখুন, শাহজাদার নামে আমি এক দিরহাম হিসাবে উল্লেখ করেছি।

‘ভাল কথা। কিন্তু কার দিরহাম, কাকে দিলে? তাকে তামাম ইসলাম ধর্মীদের কাছে ঋণী করলে মুয়াইকিব?’ বুড়াে মুয়াইকিব চোখের তারায় বিস্ময়ের ছাপ এঁকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইল। সে এতদিন নিজেকেই সবচেয়ে সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞান করত। কিন্তু আজ দেখছে তার চেয়েও সৎ লােক রয়েছে। সুলতানের সততার কাছে তার সততা তুচ্ছাতিতুচ্ছ।

খলিফা এক রাত্রে আবু জাইদকে নিয়ে নগর পরিক্রমায় বেরিয়ে দেখেন পথের ধারে এক জনানা কাঠ জ্বেলে হাড়িতে জল গরম করছে। রােগা হাড় জিরজিরে দুটো শিশু তার পাশে। খলিফা জিজ্ঞাসা করলেন—‘বেটি, এতরাত্রে রাস্তার ওপর বসে করছ কি ?

‘পানি গরম করছি। গুড়া বাচ্ছা দুটোর পেটে সারাদিন দানাপানি পড়ে নি। একটু পানি গরম করে খাইয়ে দেব। আমার নসীবের কথা কাকেই বা জানাই। গুড়াবাচ্ছাদের এক মুঠো খানা জোটে না। খােদাতাল্লার কাছে খলিফাকে এর জন্য কৈফিয়ত দিতে হবে।'

—“তুমি কি ভাবছ, তােমার তকলিফের কথা জেনেও খলিফা নিশ্চিন্তে বসে বসে রয়েছেন? বাগদাদ শহর তাে আর এতটুকু নয়। এখানে কে, কোথায় অনাহারে দিন কাটাচ্ছে, না জানালে তিনি কি করে জানবেন বল তাে? ‘প্রজাদের দুঃখ-কষ্টের হদিসই যদি না রাখতে পারেন তবে খলিফা হওয়ার সাধ হয়েছে কেন?'

খলিফার মুখ বন্ধ হয়ে গেল, কোন জবাবই দিতে পারলেন না। আবু জাইদ’কে নিয়ে সােজা প্রাসাদে ফিরলেন। ভাড়ার থেকে এক বস্তা আটা আর এক ঝারি চর্বি বের করলেন। জাইদকে বললেন, আটার বস্তাটি তার পিঠে তুলে দিতে।

—জাঁহাপনা, আপনি নিজে কেন আটার বস্তা টানতে যাবেন ? কোন নােকরকে ডাকছি, জনানাটিকে দিয়ে আসবে। নয় তো, আমাকে দিন। আমি পিঠে করে তার কাছে পৌছে দিয়ে আসি।

—না। আমাকেই পৌছে দিতে হবে। জাইদ, শেষ বিচারের দিন আল্লাতাল্লার দরবারে আমার পাপের বােঝা কি তুমি বইবে, বল?'

‘আটার বস্তা আর চর্বির ঝারিটি খলিফা নিজেই বয়ে নিয়ে গিয়ে জনানাটিকে পৌছে দিলেন। এবার কিছু আটা মেখে পরােটা বানাতে লেগে গেলেন। আর তা গুঁড়া বাচ্ছা দুটো আর আম্মাকে খাওয়ালেন। তারপর ঠাণ্ডা পরােটা নিজেও খেলেন। আর বাকী আটা আর চর্বি জনানাটিকে বুঝিয়ে দিয়ে খলিফা প্রাসাদে ফিরলেন। পথে জাইদকে বললেন—বুঝলে, জনানাটির কথা আজ আমার আখি খুলে দিয়েছে। সামনের আন্ধার ঘুচে গেছে জাইদ।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

                          চৌষট্টিতম রজনী 

বাদশাহ শারিয়ার রাত্রির দ্বিতীয় যামে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার অবশিষ্ট অংশ বলতে শুরু করলেন—“জাঁহাপনা, নুজাৎ নীতিকথা শুনিয়ে চলেছে—খলিফা উমর একদিন মেঠো পথ দিয়ে যাচ্ছেন। এক রাখালকে কতগুলাে বকরি চরাতে দেখলেন। তাকে বললেন—‘আমার কাছে একটি বকরি বেচবে?

–‘বকরির মালিক তাে আমি নই। নেহাৎই যদি খরিদ করতে চান তবে আমার মালিকের সঙ্গে বাতচিত করুন। আমি তাে তার কেনা বান্দা মাত্র। আমি কি করে বকরি বেচব?’

‘তার সততায় খলিফা মুগ্ধ হলেন। বললেন—“তােমার মালিকের কাছে আমাকে নিয়ে চল। আমি তােমাকেই খরিদ করে নিতে চাচ্ছি। সৎ আদমির বড়ই অভাব। তােমাকে খরিদ করে মুক্তি দিতে ইচ্ছুক। আর গােলামী করতে হবে না তােমাকে। যে দিকে মন চায় চলে যাবে। দিল যা চাবে করবে। খলিফার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় খলিফার কাছে এল। নাম তার হাফসা। সে বলল—মহাত্মা, আপনি বহুৎ ধনদৌলত নিয়ে নিজের মুলুকে ফিরছেন, শুনতে পেলাম। আমি তাে আপনার এক ভাগীদার, আমার অংশ আমাকে মিটিয়ে দিন।

–‘আল্লাহ আমাকে শুধুমাত্র রক্ষা করার দায়িত্ব দিয়েছেন। ধনদৌলত যা কিছু আমার ভাবছ, সবই আমার মুসলমান প্রজাদের সম্পত্তি। একটি কপর্দকও আমার নিজের নয়। আবার প্রজা হিসেবে যদি কিছু আশা কর তবে তা-ও সম্ভব নয়। তুমি আমার সহােদর ভাই। যদি কিছু দেই তবে সবাই আমাকে স্বজন পােষণের দায়ে অভিযুক্ত করবে।আমি এবার তৃতীয় পর্বের কথা বলছি। এতে পুণ্যবানদেরই একমাত্র অধিকার।

হাসান অল বাসরির মতে আদমিরা তার অন্তিমকালে তিনটি কথা ভেবে শােক-তাপ পায়। তাদের প্রথমটি হচ্ছে—পাওয়া ধনকে অবজ্ঞা করা, দ্বিতীয়—অপূর্ণ কামনা-বাসনা, আর তৃতায় —অপূর্ণ উচ্চাভিলাষ।

কয়েকজন একবার সুফিয়াকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আমীর আদমিরা পুণ্যের অধিকারী হয় ?

তিনি বলেন—‘পারে, অবশ্যই পারে। কখন পারে তাই না? তারা তাদের ধনদৌলত হারিয়ে যখন নিঃস্ব-রিক্ত হয় তখন। আর শ্রদ্ধাবনত হয়ে যখন দান ধ্যান করতে সক্ষম হয়।

আবদাল্লাহ ইবন সাদ্দাদ অন্তিমকালে তার লেড়কা মহম্মদকে ডেকে উপদেশ দান করেছিলেন—“সৎ পথে চলবে, ধর্মের প্রতি আস্থা রাখবে। আর আল্লাহর প্রতি ভক্তিতে অবিচল থাকবে। আর সর্বদা স্মরণ রাখবে, ধনদৌলত সুখ উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু আনন্দ লাভ করবে তা না। ভােগে নয়, ত্যাগের মাধ্যমে পরম প্রাপ্তি ঘটে।

মহাধার্মিক প্রবর আবাদ অল-আজিজ যখন উমায়াদের অষ্টম খলিফার পদ লাভ করে মসনদে আরােহণ করেন তখন একদিন নগরের আমীর-ওমরাহদের তার দরবারে আহ্বান করলেন। তাদের উদ্দেশ্যে বললেন—“তােমাদের অত্যাবশ্যকীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি নিজের অধীনে রেখে বাকী সব সরকারের হাতে তুলে দাও। এতে তারা খুবই রাগান্বিত হলেন। খলিফার বৃদ্ধা পিসির কাছে এ ব্যাপারে অভিযােগ জানালেন। তার নাম ফতিমা। ফতিমা একদিন খলিফার শয়নকক্ষে এলেন। তাঁকে বললেন—“তুমি মহাধার্মিক খলিফা। আমি কেন এসেছি তা তুমি আশা করি অনুমান করতে পারছ। | ‘আল্লাহ তার পয়গম্বরকে দুনিয়ায় পাঠান জনগণের মাঝে খুসবু বইয়ে দিতে আর মানব ধর্মের বিস্তার ঘটাতে। নদ-নদী যেমন পানি দান করতে করতে এগিয়ে চলে ঠিক তেমনি পয়গম্বরের পবিত্র জীবনধারা নিজে কিছু গ্রহণ না করে দান করতে করতে অগ্রসর হন। তাকে অবলম্বন করে কত সব আদমি উদ্ধার হয় তার ইয়ত্তা নেই। সে-স্রোতধারা যাতে শুকিয়ে কাঠ হয়ে না যায় তা লক্ষ্য রাখাই আমার প্রথম ও প্রধান কর্তব্য। এমন সময় ভাের হয়ে আসায় বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।

                                 পয়ষট্টিতম রজনী 

গভীর রাত্রে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদের কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বলেন—“জাহাপনা, নুজাৎ নীতিকথা বলে চলেছে। আর। শাহজাদা সারকান, সওদাগর ও চার কাজী অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে তা শুনছে।

ফতিমা এবার তার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে বিদায় নিলেন। তিনি আমীর ওমরাহদের বললেন—“তােমাদের কয়েক জনের নসীবের জোরে তােমরা খলিফা আজিজ-এর মত সুলতানকে লাভ করেছ। তার কথা নির্দ্বিধায় মেনে নিয়ে কাজ কর।

উমর শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ার পূর্ব মুহূর্তে তার লেড়কাদের উপদেশ দিয়ে গেছেন—দারিদ্র বাঞ্ছনীয় নয় কিন্তু দারিদ্র্যের স্বাদ পেতেই হয়। খােদাতাল্লার সাহচর্য লাভ করতে হলে দারিদ্র্যকে হাসিমুখে বরণ করে নিতেই হবে। তার অন্তিম সময়ে মসলামাহ ইবন্ আবদ অল-মালিক উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি জানার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলেন—সবাই বলাবলি করছে, আপনি আপনার বিষয় সম্পত্তির একটি কানাকড়িও আপনার লেড়কাদের দান করে যাচ্ছেন না। আপনি চাইলেই কিন্তু তাদের আমীর বানিয়ে রেখে যেতে পারতেন। খলিফা বিস্মিত হন। ক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠলেন—“বলছ কি হে, জিন্দেগী ভর ন্যায় পথ আঁকড়ে থেকে শেষনিঃশ্বাস ফেলার আগে এরকম একটি জঘন্য কাজ করে যাব! তবে জনম ভর যা কিছু পুণ্য সঞ্চয় করেছি মুহুর্তে কপূরের মত সব উবে যাবে যে! আর আমার জন্য দোজকের পথ পরিষ্কার হয়ে যাবে। বাল্যে আমার এক পূর্বসূরীর শবযাত্রায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। জিন্দেগীভর বহুৎ কিছু

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments