আরব্য রজনী পার্ট ৪০ ( Part 40 ) alif laila

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
মাকান জেরুজালেমে বুড়ােবুড়ির কাছেই আরও কিছুদিন রইল। সে এবার দামাস্কাসের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা ভাবল, বুড়াে তাকে একা ছাড়তে রাজি নয়। একে বয়স কম, তার ওপর তবিয়ৎ এখনও ভালভাবে সারে নি। বিমারি আবার নত করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। পথে বিপদে পড়লে দেখভাল কে করবে? মাকান কিন্তু দামাস্কাসে যাওয়ার জন্য খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

মাকানকে যখন কিছুতেই নিরস্ত করতে পারল না তখন বুড়াে বুড়ি বাধ্য হয়ে মনস্থ করল মাকান যদি যায়-ই তবে তারাও তার সঙ্গে যাবে। তারা বুড়াে-বুড়ি দুটি প্রাণী। দুটোমাত্র পেট। গুঁড়া বাচ্চা নেই বলতে কেউ-ই নেই। যেখানে যাবে সেখানেই দুটো রুটির জোগাড় ঠিকই হয়ে যাবে।

বুড়াে তাদের খুব দরকারী কিছু বাসনপত্র রেখে বাকি সব নগদ পঞ্চাশ দিরহামে বেচে দিল। সব ব্যবস্থা পাকা। এখন কেবল বেরিয়ে পড়লেই হয়।

এমন সময় প্রাসাদের বাইরে, বাগিচায় গাছে গাছে পাখিদের কিচিরমিচির শুরু হয়ে গেল। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।

                     পঞ্চান্নতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ আবার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন‘জাঁহাপনা, সে বুড়াে-বুড়ি দু-অল-মকানকে নিয়ে দামাস্কাসে যাবার জন্য তৈরি হ’ল। বহুদুরের পথ। পথে খানাপিনা সারার জন্য কিছু শুকনাে খানা পাকিয়ে এক ডিব্বায় ভরে নিল। মাকান-এর জন্য একটি খচ্চর ভাড়া করল। এক সকালে মাকানকে খচ্চরের পিঠে বসিয়ে বুড়াে আর বুড়ি তার পিছন পিছন পয়দল হেঁটে রওনা হ’ল। কয়েকদিন চলার পর বুড়াে তার বিবি আর মাকানকে নিয়ে দামাস্কাস নগরে পৌছে গেল। পথশ্রমে সবাই ক্লান্ত। সবার আগে এক মুসাফিরখানায় উঠল। বুড়াে একটু জিরিয়ে নিয়ে খানাপিনা খরিদ করতে বাজারের খোঁজে বেরলাে। কিছু সময় বাদে রুটি আর সক্তি নিয়ে ফিরল। সবাই এক সঙ্গে বসে খানাপিনা সারল। সে রাত্রেই বুড়ির কাঁপিয়ে জ্বর এল। বেধুম জ্বর। একেবারে বেহুশ হয়ে পড়ল। কিন্তু বুড়াে বা মাকান কেউ কল্পনাও করতে পারে নি বুড়িকে কালব্যাধিতে ধরেছে। পাঁচদিন বাদেই সে দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে খােদাতাল্লার দরবারে চলে গেল। বুড়িকে হারিয়ে মাকান গভীর শােকে মুহ্যমান হয়ে পড়ল। সে তাে ভালই জানে, বুড়ির অকৃত্রিম সেবাযত্নের ফলেই তার জান রক্ষা পেয়েছিল। দু'-চারদিন বুড়াে ও মাকান কামরা থেকে আর বেরােতে পারল না । বুড়ির আকস্মিক বিয়ােগ-ব্যথা সামলে উঠতে তাদের খুবই বেগ পেতে হল।

এক সকালে মাকানকে নিয়ে বুড়াে পথে হাঁটাহাঁটি করছে। এমন সময় দেখে কোতােয়ালীর সামনে উট, ঘােড়া, খচ্চর আর গাধার পিঠে প্রচুর সমানপত্র চাপিয়ে ক'জন লােক যাত্রার উদ্যোগ নিচ্ছে। মাকান তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারল, বাগদাদের বাদশা উমর অল-নুমানকে স্থানীয় শাসক বাৎসরিক ভেট পাঠাচ্ছেন। উমর অল-নুমান-এর নাম কানে যেতেই মাকান-এর চোখ দুটোতে পানি ভিড় করল। বুড়াে ভাবল, নিজের মুলুকের নাম শুনেই মন বিষিয়ে উঠেছে। আসলে বুড়াে তাে জানে না, উমর তার কে হন। জন্মভূমির নামে চোখে পানি আসাই স্বাভাবিক। বুড়াে তাকে নানা কথার মাধ্যমে সান্ত্বনা দিল। কিন্তু কোন কথাতেই তার অস্থির মনকে শান্ত করতে পারল না।।

বুড়াে শেষ পর্যন্ত মাকানকে নিয়ে বাগদাদে যাওয়া মনস্থ করল। এখন তার কাছে তাে জেরুজালেম, দামাস্কাস আর বাগদাদ—সবই সমান। পিছুটান বলতে বুড়িটি ছিল, তা-ও খােদাতাল্লার দরবারে পাড়ি জমিয়েছে। এখন সে নীল আসমানের পাখির মতই স্বাধীন মুক্ত। বুড়াে দামাকাস থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে এবার মাকানকে নিয়ে বাগদাদের উদ্দেশে পা বাড়াল।

বেগম শাহরাজাদ এ-পর্যন্ত বলার পর তার কিসসার মােড় ঘােরাতে গিয়ে বলেন—‘জাঁহাপনা, আমরা বরং এখন মাকান এর রূপসী-কিশােরী বহিন নুজাৎ-এর খোঁজ করে দেখি, সে কোথায়, কি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।

নুজাৎ তার অসুস্থ ভাইয়া মাকানকে সরাইখানার রােয়াকে রেখে রােটি-রােজগারের ধান্দায় পথে নামল। সে কাম কাজের খোঁজে হন্যে হয়ে নগরের পথে পথে ঘুরে বেড়াতে লাগল। কিন্তু কোথায় কাজ ? কে-ই বা দেবে তাকে কাজ ? অর্থোপার্জনের কোন ধান্দা তাে সে করতে পারলই না। উপরন্তু এক বাদাবী সর্দারের খপ্পরে পড়ে গেল। তার সঙ্গে জনা পাঁচেক সাকরেদ রয়েছে। বাদাবীরা ওই অঞ্চলের দুর্ধর্ষ ডাকাত, মরু অঞ্চলের বাদাবী নামক স্থানে তাদের বসতি। বাদাবী সর্দার গুটিগুটি নুজাৎ-এর কাছে গেল। তাকে বল্ল “কি বেটি, তুমি কি কারাে ঘরে কাজ করছ, নাকি কাম কাজ পেলে করবে? আমার ছ'টি লেড়কি ছিল। পাঁচ-পাঁচটি এরই মধ্যে খােদাতাল্লার দরবারে চলে গেছে। ঘরে এক গুঁড়া লেড়কি আছে। তাকে দেখ ভাল করার মত কেউ-ই নেই। তুমি যদি আমার ঘরে যাও। তাকে দেখ ভালের দায়িত্ব নাও তবে আমার সুবিধা হয়।

নুজাৎ আমতা আমতা করে বলল—“কিন্তু হুজুর, আমি পরদেশী। আমার এক ভাইয়া সরাইখানায় রয়েছে। বিমারি।

আপনার ঘরে নােকরি আমি করতে পারি, আন্ধার হওয়ার আগেই কিন্তু আমাকে ছেড়ে দিতে হবে।'

-“বহুৎ আচ্ছা! আমি রােজ আন্ধার হওয়ার আগেই ঘরে ফিরব। তুমি তখন সরাইখানায় তােমার ভাইয়ার কাছে চলে যেয়াে।

নুজাৎ যেন আসমানের চান্দ হাতে পেল। খােদাতাল্লাকে সুকরিয়া জানাল। খােদাতাল্লার দোয়া না হলে লােকটি উপযাচক হয়ে তাকে কাজ দিতে আসবে কেন? 

বাদাবী দস্যুটি নুজাৎ’কে ধাপ্পা দিয়ে তার মনের বিশ্বাস সঞ্চার করতে সক্ষম হ’ল। তার ঘরে নােকরি, ছ-ছ'টি লেড়কি, পাঁচটি দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে, একটি নাবালিকা, ঘরে একা থাকে সবই বানানাে কিসসা। তার ধাপ্পা ধরার মত বয়স, বুদ্ধি বা বাস্তব অভিজ্ঞতা সব কিছুরই নিতান্ত অভাব তার। বাদাবী দস্যু এবার নুজাৎকে উটের পিঠে চাপিয়ে পালাতে লাগল। কিছুদূর যেতে না যেতেই নুজাৎ তার দুরভিসন্ধির কথা অনুমান করে কান্না জুড়ে দেয়। দস্যুটি তার মুখ চেপে ধরে। সে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে। বাদাবী দস্যুটি উপায়ান্তর না দেখে একটি সুতীক্ষ্ণ ছুরির ফলা তার গলায় চেপে ধরে। গর্জে ওঠে—“হতচ্ছাড়ি, আর একবার চেঁচাবি তাে এ-চাকু তাের গলায় গেঁথে দেব, বলে রাখছি! নুজাৎ বুঝল, নির্জন-নিরালা মরু অঞ্চলে চিৎকার করে গলা ফাটালেও কেউ তার ইজ্জৎ রক্ষা করতে ছুটে আসা তাে দূরের কথা কেউ সাড়াও দৈবে না। অনন্যোপায় হয়ে সে চুপ করল। কেবল ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে চোখের পানি ঝরাতে লাগল।

বাদাৰী দস্যুটি এবার রাগে গস গস করতে করতে বল্ল -শােন, যখন বুঝবি আমি খুবই গােসসা করেছি তখন কোন ব্যাপারেই ‘না’ বলবি না, নইলে আমার শিরে হয়ত খুনই চেপে যাবে। ব্যস, তখন তাের গলায় চাকু বসিয়ে দিতেও দ্বিধা করব না। এবার সিধা কথা শােন, আমি তাে ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, সত্যি বটে। এ-আমার ব্যবসা। ধোঁকা দিয়ে কাজ হাসিল করতেই হয়। আর এক বাত শুনে রাখ, আমি নিজে তােকে ভােগ করব না। ইজ্জৎ নেব না । অন্য একজনের ভােগের জন্যই তােকে নিয়ে চলেছি। তবে আমার লাভ কি, ভাবছিস তাে? প্রচুর দিনার ইনাম পাব। এই আমার লাভ।

নুজাৎ তার কথা শুনে কান্নার বেগ আরও বাড়িয়ে দিল।

বাদাবী দস্যু এবার জোরে এক ধমক দিয়ে বলল-চুপ কর বলছি হারামজাদী! বলছি, যার কাছে তুই থাকবি তার চেয়ে সুখে রাখার মত হিম্মৎ তামাম বাগদাদ নগরে দ্বিতীয় কাউকে মিলবে না। বাদশাহ উমর অল-নুমান-এর দালালের হাতেই তােকে তুলে দেব। ব্যস, তারপরই সােজা গিয়ে উঠবি একেবারে বাদশাহের হারেমে।

বাদশাহ উমর-অল-নুমান-এর কথা কানে যেতেই নুজাৎ-এর মুখের ভাবান্তর ঘটল। সে বুঝতে পারল না, দস্যুটি এ-ব্যাপারেও তাকে আবার ধাপ্পা দিচ্ছে কি না।

বার বার ধমক খেয়ে চরম ক্রোধে ছুরির ফলা নাচান দেখে নুজাৎ আর কথা বাড়াল না , কান্নাকাটিও তেমন করল না। খােদাতাল্লার নাম নিয়ে দাঁতে দাঁত কামড়ে নসীব সম্বল করে এবার সে চুপ করে রইল।

বাদাবী ডাকাত সর্দার বলে চলল শােন, তাের দেহে নয়া যৌবনের জোয়ার। সুরত ও মন মজানের পক্ষে যথেষ্ট। এমনই এক মনমৌজী বাগদাদের বাদশাহ উমর তল্লাস করছে। আমি কথা দিচ্ছি, বাদশাহের হারেমে তাের যাতে জায়গা হয় আমি তার বন্দোবস্ত করে দেব। আর যদি কাদিস, মেলা খিটির খিটির করিস তবে এক বজ্জাত সওদাগর দেখে বেচে দেব বুঝবি তখন মজা কাকে বলে।

নজাৎ লােকটিকে এরই মধ্যে চিনে নিয়েছে। হাড়ে হাড়ে বজ্জাত। তাই মুখে কলুপ এঁটে নিজের নসীবের কথা ভাবতে লাগল।।

এমন সময় ভােরের পূর্বাভাস পেয়ে বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন। 

                                   ছাপ্পান্নতম রজনী

বেগম শাহরাজাদ আবার তার কিসসা শুরু করলেন ‘জাঁহাপনা, বাদাবী সর্দার নুজাৎকে নিয়ে দামাস্কাসে পৌছল। এক মুসাফিরখানায় নিয়ে তুলল।

পরদিন নুজাৎকে বাদী হাটে নিয়ে যাওয়া হল। দালালরা এগিয়ে এসে দরদস্তুর করতে লাগল। বাদাবী ডাকাত সর্দার দালালদের উদ্দেশে বল্ল—‘শােন, লেড়কির সুরৎ তাে তােমরা চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছ। আমি আর এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাই না। তােমরা দেখে শুনে দর দস্তুর কর। যদি আমার পােয় দিয়ে দেব, তবে একটি শর্ত আছে। এ লেড়কির এক ছােট ভাইয়া আছে। জেরুজালেমের সরাইখানায় আছে। একে যে কিনবে তাকে কিন্তু ওই লেড়কার দায় দায়িত্ব কাঁধে নিতে হবে। অতএব ভেবেচিন্তে দামদস্তুর কর।

এক সওদাগর নুজাৎ-এর কাছে এল। হ্যা, অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে তার আপাদমস্তক বার বার নিরীক্ষণ করল। হ্যা, জুতসই লেড়কিই বটে। সওদাগর জিজ্ঞাসা করল—‘এ লেড়কির ওমর কত ?

‘খুবই কম। বেশ ডাগর ডাগরই বটে। বয়স খুব বেশী হলেও পনের। কুমারী। দেখছ না এর উন্নত বক্ষ কেমন কামিজ ফেটে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে? দেহ-মনে যৌবনের জোয়ার। এক নজর দেখলেই মনে কামােন্মদনা জাগিয়ে তােলে। তামাম বাগদাদ নগর ঢুঁড়ে এলেও এমন যৌবনের ঢেউ কোন কুমারীর দেহেই দেখতে পাবে না।

নৃজাৎ পিছন ফিরে সমানে চোখের পানি ফেলে চলেছে। ভালমন্দ কিছুই বলল না। বলবেই বা কি? নসীব সম্বল করে চোখের পানি ফেলা ছাড়া তার কি-ই বা করণীয় আছে ? নুজাৎ নাকাবের ফাক দিয়ে আড়চোখে তাকিয়ে দেখল, দালালটি বুড়াে। একেবারেই বুড়াে। তবু সে আল্লাতান্নার হাতে নিজের নসীবের ভার সঁপে দিল। তার এখন সবচেয়ে বড় কর্তব্য ডাকাত সর্দারটির হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া। তাতে যদি তাকে এ সওদাগরের দাসী হয়েও দিন গুজরান করতে হয় তাও শ্রেয়ঃ । তারপর কিভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয় পরে ভাবা যাবে।'

সওদাগরটি তাকে জিজ্ঞাসা করল—“তুমি কে গাে ? কি পরিচয় তােমার ? তােমার পরিচয় বল তাে শুনি।



–‘আমার পরিচয়? কেবলমাত্র এতটুকু শুনে রাখুন, আমি আপনার শত্রু নই। আমার দ্বারা আপনার কোনই অহিত সাধিত হবে না। বরাতে যা আছে তা হবেই। আমার নসীবে যা আছে শত চেষ্টা করেও তা থেকে অব্যাহতি পাব না। আমাকে নিঃশঙ্কচিত্তে তা মেনে নিতে হবেই। আপনি যদি ভেবে থাকেন আপনি আমার নসীবকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, ভুল করবেন। আসলে আমি কিন্তু মনে করি, আপনি নিছকই উপলক্ষ।

সওদাগর নুজাৎ-এর কথা শুনে নিঃসন্দেহ হল, এ কোন না কোন আমীর ওমরাহের লেড়কি। একে যদি কোন রকমে একবার বাদশাহ উমর অল নুমান-এর সামনে নিয়ে ফেলা যায় তবে সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে নেবেন। বহুৎ ইনাম নিয়ে ঘরে ফেরা যাবে। এবার সর্দারকে লক্ষ্য করে বলল —ভাইজান, তােমার লেড়কিটি আমার বহুৎ মনপছন্দ। এবার বল তাে এর জন্য কি দাম প্রত্যাশা করছ?  ডাকাত সর্দার কৃত্রিম গােসসা প্রকাশ করে বলে উঠল “তােমার কোন কাণ্ড জ্ঞানই নেই। মানুষের চরিত্র সম্বন্ধে তুমি অ আ ক খ-ও জান না। একে যদি ভাল বল তবে বদ লেড়কি কাকে তুমি বলবে, জানি না। আমি তাে জানি এর প্রতিটি গাঁটে গাঁটে বদবুদ্ধি। যদি একে কিনে ঘরে নিয়ে যাও তবে দু’ দিনে তােমার ভিটে-তে ঘুঘু চরিয়ে ছাড়বে। যাও, ভাইজান পাতলা হও। তােমার সঙ্গে আমি কারবার করব না। সওদাগর ডাকাত সর্দারের কথায় ভড়কে গেল। কারাে সামনে পাত্রের প্রশংসা করলে যে এমন হিতে বিপরীত হতে পারে তা তার আগে জানা ছিল না। এবার নিজেকে সামলে নিয়ে বলল- ‘আরে ভাইজান, গােসসা করছ কেন? এমন চটাচটি করলে কি চলে? ঠিক আছে, লেড়কিটি খুবই বুড়া, খুবই দজ্জাল। আমি দজ্জাল লেড়কিই কিনতে চাইছি। এবার বল তাে এর জন্য তুমি কত দাম চাইছ?'

‘আমার মুখে না-ই বা শুনলে। সবই তাে দেখলে ? শুনলে আর বুঝলে, এবার তুমিই বল না, কি দাম দিতে চাইছ?’ ' -এ কি রকম কথা হ’ল ভাইজান? তুমি বেচতে এসেছ, তুমিই তাে দাম চাইবে। তাতে আমার যদি পােষায় ভাল নইলে অন্যত্র ধান্দা করব।

ডাকাত সর্দার সত্যই সমস্যায় পড়ল। লেড়কি কেনা-বেচা সে বহুৎ করেছে সত্য। এতকাল যাদের নিয়ে কারবার করেছে তাদের দাম হয়েছে কেবলমাত্র সুরতের দিক বিবেচনা করে। আজকের লেড়কিটি যে তাদের চেয়ে আশমান জমিন ফারাক, সুরতের সঙ্গে বহু গুণেরও একত্র সমাবেশ ঘটেছে। ফলে এর বিনিময়ে কি দাম চাওয়া যেতে পারে সে ধারণাও করতে পারছে না। আবার বাদীরক্ষিতার মধ্যে গুণের বিকাশকে গুণ মনে না করে বাদশাহের কাছে দোষ বিবেচিত হওয়াও আশ্চর্য নয়। অতএব কি দাম চাইবে সে কূল-কিনারা করতে পারছে না।

সওদাগর রেগেমেগে বলল —“ঠিক আছে ভাইজান। এক কাজ কর। দু' শ’ দিনার নিয়ে লেড়কিটিকে আমার হাতে তুলে দাও।

‘ভাইজান, আমার এ সওদা খরিদ করা তােমার কর্ম নয়। ঝুটমুট ঝামেলা না করে কেটে পড়। দু’ শ’ দিনারই যদি শেষমেষ দাম ওঠে তবে আর বেচব না। ঘরে নিয়ে গিয়ে ভুট্টার ক্ষেতে লাগিয়ে দেব, চাষ করবে।'

‘তুমি মিছেই চটাচটি করছ ভাইজান, বাদশাহের হারেমে বাদী হয়ে থাকবে। সেখানে তােমার ওইসব গুণ কি কাজে লাগবে, বল তাে?

–‘গুণ না-ই বা কাজে লাগল। কিন্তু সুরৎ? এমন সুরৎ বাগদাদ নগরে ঢুঁড়ে এলেও মিলবে না। তার দামই বা দু' শ’ দিনার কোন সাহসে তুমি হাঁকছ ? ঠিক আছে ভাইজান, পাতলা হও। তােমার মুরােদ আমার বােঝা হয়ে গেছে। বেগম শাহরাজাদ কিসসার এ পর্যন্ত বলতে না বলতেই ভাের হয়ে গেল। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।

                                সাতান্নতম রজনী 

_ রাত্রির দ্বিতীয় যামে বাদশাহ শারিয়ার অন্দর মহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাহাপনা, বাদাবী ডাকাত সর্দার আর সওদাগরের মধ্যে দরকষাকষি চলতে লাগল। সওদাগর নুজাৎ-এর গুণাবলীর চেয়ে রূপের কদরই বেশী মনে করে। সে এবার বলল —ঠিক আছে, বােরখার নাকাবটি আর একবার সরাতে বল, আমি এর মুখটি 'আর একবার দেখতে চাই।

ডাকাত সর্দার তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল—“আমি আর দেখাতে টেখাতে পারব না। তুমি যাও দেখে নাও গে। সে আর এগােল না। দু' পা এগিয়ে গিয়ে উটের দানাপানি দেওয়ার কাজে মন দিল।

সওদাগর এবার নুজাৎ-এর কাছে যেতেই সে নিজেই নাকাবটি তুলে ধরল। কাদো কাঁদো স্বরে সওদাগরকে বল্ল-হুজুর মেহেরবান, আমাকে এ হিংস্র জানােয়ারটির হাত থেকে মুক্তি দিন, আমি এর বেয়াদপি আর একটি দিনও বরদাস্ত করতে পারব না। আপনি যদি আমাকে খরিদ না করেন তবে আমি নিজে হাতেই জান খতম করে ফেলব।

সওদাগর নীরবে নুজাৎ-এর কাছ থেকে ফিরে এসে ডাকাত সর্দারকে এক লাফে পঞ্চাশ হাজার দিনার দিতে চাইল।

ডাকাত সর্দার ভাবল এ তাে বেশ মজার ব্যাপার! দু’শ’ দিনার থেকে এক লাফে একেবারে পঞ্চাশ হাজার ! সে এবার বেঁকে বসল। বলল —পঞ্চাশ হাজার দিনারেই যদি দেব তবে তাে অনেক আগে কেনা-বেচা ছেড়ে ঘরে চলে যেতাম হে।।

—“ঠিক আছে, আরও দশ হাজার বাড়িয়ে দিচ্ছি, পুরােপুরি ষাট হাজারই পাবে।

–না ভাইজান, তােমার পক্ষে দেখছি আমার সওদা খরিদ করা হবে না। এর পিছনে আমার খরচ হবে নব্বই হাজার। আর তুমি পঞ্চাশ-ষাটে চক্কর খাচ্ছ ! যাও, কিছু মনে কোরাে না, পথ দেখ।

—“ঠিক আছে, আরও দশ বাড়ালাম।

—‘ভাইজান, কেন মিছে নিজে বকছ, আমাকেও বকিয়ে মারছ? বললাম তাে, তুমি আমার সওদা কিনতে পারবে না।

এবার সওদাগর বেশ একটু রাগত স্বরেই বল—“ঠিক আছে। পুরাে এক লাখই দেব। যদি রাজী থাক, দিনার বুঝে নিয়ে লেড়কিটিকে আমার হাতে তুলে দাও।

ডাকাত সর্দার আর কচলাকচলি করতে ভরসা পেল না। যদি সওদাগর ঘাড় বাঁকিয়ে কেটে পড়ে তখন সমস্যায় পড়তে হবে। সে বলল—‘ভাইজান, তুমি তাড়াতাড়ি দিনারগুলাে মিটিয়ে দিয়ে তােমার সওদা বুঝে নাও। আমাকে আবার জেরুজালেমে গিয়ে ওর ভাইয়ার খোঁজ নিতে হবে।

সওদাগরের কাছ থেকে এক লাখ দিনার বুঝে পেয়ে সে জেরুজালেমে হাজির হল। সে-সরাইখানায় গিয়ে নুজাৎ-এর ভাইয়া মাকান-এর তল্লাস করল। পাত্তা পেল না। সরাইখানার মালিক বলল—সে ক'দিন আগে সেখান থেকে ভেগেছে। তামাম শহর চষে বেড়াল। কোথাও তার পাত্তা মিল না। তাকে চোখেও দেখেনি কোনদিন। মুখােমুখি দাঁড়িয়ে কথা বললেও তাে তাকে চিনতে পারবে না। তবু সে হাল ছাড়ল না। | ইতিমধ্যে পূর্ব-আকাশে রক্তিম ছােপ দেখা দিয়েছে। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।।

                            আটান্নতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় যামে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-‘জাঁহাপনা, সওদাগর এক লক্ষ দিনারের বিনিময়ে নুজাতকে কিনে নিজে বাড়ি নিয়ে গেল। তার বিবি তাকে হামায়ে নিয়ে গিয়ে আচ্ছা করে গােসল করাল। সওদাগর দোকান থেকে তার জন্য ভাল পােশাক ও কিছু গহনাপত্র খরিদ করে নিয়ে এল। তার বিবি নুজাৎ’কে সেগুলাে পরিয়ে দিল। একে তার সুরৎ খুব, তার ওপর, ঝকমকে পােশাক ও গহনাপত্র পরালে তাকে জব্বর দেখতে লাগল। সওদাগর তাকে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাওয়ার জোগাড়, ভাবল, একবার শাহজাদা সারকান-এর সামনে নিয়ে ফেলতে পারলে আর দেখতে হবে না, বাজী মাৎ। সওদাগর নুজাৎ কে বলল —“শােন, তােমাকে আগেই বলে রাখছি, শাহজাদা সারকান যদি তােমাকে দর দামের কথা কিছু জিজ্ঞেস করেন তবে কত দিয়ে আমি খরিদ করেছি ভুলেও যেন বলাে না। আর এমন সব কথা বলবে যাতে সে বেশ ফলাও করে তার আব্বা বাদশাহ উমর-এর নিকট একটি চিঠি লিখে দেন। তারপর আমি সে চিঠি আর তােমাকে নিয়ে যাব বাগদাদে বাদশাহ উমর-এর দরবারে। ব্যস, একেবারে দাও মেরে দেব। মােটা অঙ্কের দিনার দিয়ে বাদশাহ তােমাকে লুফে নেবেন।

বাগদাদ, শাহজাদা সারকান আর বাদশাহ উমর-এর নাম কানে যেতেই নুজাৎ-এর চোখ দিয়ে পানির ধারা নেমে এল। ব্যাপারটি সওদাগরের নজর এড়াল না। এর আগে হাটে দরদামের সময়েও বাদশাহের কথা উঠতে তার মুখে কেমন বিষাদের ছায়া নেমে আসতে লক্ষ্য করেছিল। তখন পাত্তা দেয় নি।এখন ব্যাপারটি তার দিলে দাগ কাটল। অত্যুগ্র আগ্রহ প্রকাশ করে বলল-“কি গাে, বাদশাহ উমর-এর নাম করতেই তােমার চোখে পানি ভিড় করল, ব্যাপার কি? আমি তাজ্জব মানছি।

‘বাদশাহ উমর অল-নুমান আমার পরিচিত তাই তার নামটি শােনার পরই আমার

-বাদশাহ উমর তােমার পরিচিত! সবিস্ময়ে সওদাগর বলে উঠল।





নুজাৎ বুদ্ধি খরচ করে কথার মােড় ঘুরিয়ে নিল—না, মানে বাদশাহের লেড়কি আমার সঙ্গে মক্তবে পড়ত। সে সুবাদে তাদের প্রাসাদে দু'-চারবার গিয়েছি। তিনি আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। যদি বাদশাহের কাছ থেকে আপনার কোন কাজ উদ্ধার করার থাকে। তবে কাগজ-কলম দিন আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি। যদি চিঠি নিয়ে আপনি নিজে তার সঙ্গে মােলাকাৎ করতে যান তবে তাকে বলবেন, নসীবের ফেরে আমি আজ এখানে ওখানে চক্কর খেয়ে দিন গুজরান করছি। আর বলবেন, বহু মুলুক ঘুরে, ভাসতে ভাসতে আমি তারই লেড়কা শাহজাদা সারকান-এর আশ্রয়ে অবস্থান করছি।'

নুজাৎ-এর কথায় সওদাগরের মন এবার ভিজে একেবারে পানি হয়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে দেরাজ খুলে কাগজ-কলম এনে নুজাৎ-এর হাতে দিল। সে খস্ খস্ করে কয়েক ছত্র লিখে চিঠিটি সওদাগরের হাতে দিয়ে বলল —‘বাদশাহকে আমার সালাম জানাবেন। সওদাগর চিঠিটি ভাজ করে শারিয়ানের জেবে রাখতে রাখতে ভাবাপ্লুত কণ্ঠে বলল —‘বেটি, খােদাতাল্লার কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন তােমার মধ্যে আরও গুণের সঞ্চার করেন। যেন তােমার ভালই করেন। এমন সময়ে রাত্রির অবসান হ’ল। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।

                                 উনষাটতম রজনী

বাদশাহ শারিয়ার তার কাজকর্ম মিটিয়ে প্রায় মাঝরাত্রে অন্দর মহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—‘জাহাপনা, সওদাগর নুজাৎ-এর লেখা চিঠিটি জেবে রাখল। এবার থেকে সওদাগর ও তার বিবির কাছে নুজাৎ-এর কদর অনেকগুণ বেড়ে গেল। তাকে যে কিভাবে সন্তুষ্ট করবে, ভেবে অস্থির হল। সওদাগরের বিবি নুজাৎ’কে খুব ভাল করে সাজিয়ে দিল। শাহজাদা সারকান-এর দরবারে তাকে নিয়ে যাওয়া হবে। শাহজাদা বলে কথা। তার নজরে যদি তাকে ধরাতে না পারে তবে সব ভেস্তে যাবে। ইতি মধ্যে এক লাখের ওপর দিনার এর পিছনে খরচ হয়ে গেছে। শাহজাদা যদি একবার তার সুরৎ দেখে মুখ বাঁকান তবে মুহূর্তে তার নসীবের চাকা ঘুরে একেবারে চোখের পানি বের করে ছাড়বে। আর যদি শাহজাদা খুশী হন—না, আর ভাবতে পারছে না! তার নসীব তাকে একেবারে আমীর বানিয়ে দেবে। এমন দাও মারবে যাতে জিন্দেগী ভর পায়ের ওপরে পা তুলে মৌজ করে কাটিয়ে দিতে পারবে।

সওদাগর খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে নুজাৎ’কে নিয়ে শাহজাদা সারকান-এর প্রাসাদে হাজির হল। শাহজাদা সারকান-এর সামনে নুজাৎকে দাঁড় করিয়ে তার বােরখার নাকাবটি সরিয়ে দিল। শাহজাদা সারকান এর আগে কোনদিন তার বহিনকে চোখে দেখে নি। তাই সঙ্গত কারণেই তাকে চিনতে পারল না। সওদাগর নুজাৎ-এর নাকাবটি সরিয়ে তার মুখটিকে দেখার সুযােগ করে দিল।

শাহজাদা সারকান এক ঝলক নুজাৎ-এর মুখের দিকে তাকিয়ে অনুচ্চ কণ্ঠে বলে উঠল—“শুভন আল্লাহ! এ কী এ দুনিয়ার কেউ নাকি বেহেস্ত থেকে নেমে আসা হুরী! এমন সুরৎ তাে এর আগে কোনদিন চোখে পড়ে নি!'

নুজাৎকে দেখামাত্র শাহজাদা সারকান-এর শরীরের সব ক'টি স্নায়ু যেন এক সঙ্গে সচকিত হয়ে উঠল। এমন অনন্য সুরৎ আর যৌবনের ভরা জোয়ারের একত্র সমাবেশ ঘটলে কোন যুবক তাে দূরের কথা যে কোন বৃদ্ধেরও দিমাক ঘুরে যাওয়ার কথা।

( চলবে )

Post a Comment

0 Comments