গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা শুরু করলেন—কোন এক সময়ে এক দেশে এক সওদাগর বাস করত। অগাধ ধন-দৌলতের মালিক। টাকার কুমীর। তামাম দুনিয়ায় তার মত বিত্তবান দ্বিতীয় কেউ ছিল না। এক সময় সেই-সওদাগর দেশ-বিদেশে চক্কর মেরে বেড়াচ্ছিল। ইচ্ছা ভাল কিছু সমানপত্তর খরিদ করবে। মাথার ওপরে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মত সূর্যটা হরদম চোখ রাঙিয়ে চলেছে। ক্লান্ত-অবসন্ন সওদাগর এক গছতলায় ঘােড়া থেকে নামল। রশি দিয়ে ঘােড়াটাকে গাছের সঙ্গে বাঁধল। নদীর পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে নিল। এবার ঝােলা থেকে খানা বের করে যেই না মুখে তুলতে যাবে অমনি চোখের সামনে ভেসে উঠল অতিকায় এক আফ্রিদি দৈত্য। পাহাড়ের মত উঁচালম্বা চেহারা। হাতে তার এক কাটারী। গর্জে উঠল—‘ওঠ, আমি তােমাকে হত্যা করব! জলদি কর, আমি তােমার কলিজা চাই।
—“আমার অপরাধ?’ সওদাগর করজোড়ে কাপা কাপা গলায় উচ্চারণ করল। —“তুমি খুনী। আমার একমাত্র লেড়কাকে তুমি খুন করেছ। খানাপিনা করার সময় একটা ফল খেয়ে আটিটা ছুড়ে ফেলেছিলে, মনে পড়ছে? তারই আঘাতে আমার বাপজান মারা গিয়েছিল। আমি
তার বদলা নেব। তােমার জান নিয়ে ছাড়ব। কলিজাটা টেনে বের করব। ওঠ, জলদি উঠে পড়।
দৈত্য কথাটা বলেই রাগে ফুসতে লাগল। তার বুকের ভেতরে যেন কামারের হাঁফর চলেছে। | সওদাগর চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল—তুমি দৈত্যরাজ। বহুত খুব তাকত ধর। তােমার লেড়কাকে যদি মেরেই থাকি তবে আমি অবশ্যই নিজের অজান্তে তা করেছি। গুণাহ করলেও নিতান্ত অনিচ্ছাকৃত। তবু তুমি আমাকে যে শাস্তি দেবে আমি তা নর্দ্বিধায় মেনে নেব। তবে মৃত্যুর আগে মেহেরবানি করে আমাকে একবারটি আমার আত্মজনের সঙ্গে দেখা করার সুযােগ দিলে তােমার কেনা গােলাম হয়ে থাকব। অতিকায় আফ্রিদি দৈত্য এবার চোখ গােল গােল করে সওদাগরের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল।সওদাগর আগের মতই কাপা কাপা গলায় বলে চলল—“আমার অগাধ ধন-দৌলত রয়েছে। সেসব আমার বিবি আর লেড়কালেড়কিদের মধ্যে ভাগ করে দিতে চাই। তারপর আমায় মার-কাট যা খুশি করতে পার বাধা দেব না।আফ্রিদি দৈত্যটা তেমনি রােষপূর্ণ অথচ কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সওদাগরের দিকে।সওদাগর বলে চলল—তুমি হয়ত জান না যে, আমি সওদাগরী কাজকর্মে লিপ্ত। এসব কাজে প্রচুর ধার বাকি থাকতে বাধ্য। আমারও কিছু পাওনাদার রয়েছে। গােরে যাওয়ার আগে তাদের পাওনা গণ্ডার কানাকড়ি পর্যন্ত আমি মিটিয়ে দিতে চাই। নইলে বেহেস্তে তাে দূরের কথা দোজাকেও আমার ঠাই হবেনা। জান দেওয়ার ব্যাপারে আমার মােটেই ভয় ডর নেই। আমার কথায় আস্থা রেখে মাত্র কয়েকদিনের জন্য যদি ছেড়ে দাও তবে আমি সবকিছু মিটিয়ে ফিরে এসে তােমার হাতে নিশ্চিন্তে জান দিতে পারি। খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি, আমি অবশ্যই তােমার কাছে ফিরে আসব। আফ্রিদি দৈত্য বল—তােমার কথা আমি বিশ্বাস করছি। ঠিক আছে, তােমায় ছুটি দিলাম। কাজ সেরেই আমার কাছে ফিরে আসা চাই, খেয়াল থাকে যেন।
ছুটি পেয়ে সওদাগর দেশে ফিরে গেল। যার, যা পাওনাগণ্ডা ছিল, মিটিয়ে দিল। বিবি আর লেড়কা-লেড়কিদের কাছ থেকে চিরদিনের মত বিদায় নেবার জন্য তৈরি হল। সব কিছু শুনে সবাই তাকে জড়িয়ে ধরে খুব কান্নাকাটি করল। মায়ায় মােহিত হয়ে ঘরের কোণে বসে থাকা তার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। বিচ্ছেদ-বেদনা যতই কঠিন হােক তাকে সে-আফ্রিদি দৈত্যের খোঁজে বেরােতেই হ’ল। এপথ-সেপথ হয়ে সওদাগর এক সময় নদীর ধারের সেইগাছটার তলায় হাজির হ’ল। গাছের তলায় বসে নিজের নসীবের কথা ভেবে আঁখির পানি ফেলতে লাগল। | তখন এক বুনাে ছাগলকে দড়ি দিয়ে বেঁধে এক জোয়ান মরদ হঠাৎ সওদাগরের সামনে এসে দাঁড়াল। সওদাগরকে কাঁদতে দেখে সে বল—“কি হে সওদাগর, তােমার আঁখিতে পানি, ব্যাপার কি ? এমন মনমরা হয়ে বসে কেন হে?’ | সওদাগর চোখের পানি মুছতে মুছতে নিজের বরাতের কথা | তাকে বল্ল।
যুবকটা ম্লান হেসে বলল—“আচ্ছা, এক কিসসা শােনালে তাে | ভাইজান! মুখের জবান রাখার জন্য তুমি যে নিজের জান দিতে এসেছ তা কিন্তু তামাম দুনিয়ার কেউ-ই বিশ্বাস করবে না। | এমন সময় আর এক যুবক দুটো শিকারী কুকুর সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গাছের তলায় এল। সওদাগরের নসীবের সে-ও আদ্যোপান্ত শুনল। | কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আর এক যুবক সেখানে হাজির হ’ল। তার সঙ্গে দুটো খচ্চর রয়েছে। মাদী খচ্চর। সে-ও সওদাগরের নসীবের কথা শুনে এবােরে হাঁ হয়ে গেল। _ কিছুক্ষণের মধ্যেই হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় উঠল। বালি আর শুকনাে৷ পাতায় চারিদিক ছেয়ে গেল। তার কেন্দ্রস্থলে একটা বালির স্তম্ভ ওপরের দিকে উঠে যেতে লাগল। বালির স্তম্ভটা এবার গাছটার দিকে এগােয়। চোখের পলকে বালির স্তম্ভটা অতিকায় এক আফ্রিদি দৈত্যের আকৃতি ধারণ করল।
আফ্রিদি দৈত্যটা এবার হাতের ঝকঝকে চকচকে তরবারিটা উচিয়ে গর্জে উঠল—সওদাগর, এগিয়ে এসাে, আমি তােমায় খুন করব। আমার বেটাকে খুন করেছ তুমি। তােমাকে খুন করে আমি বদলা নেব।' সওদাগর মৃত্যুভয়ে থরথরিয়ে কাপতে লাগল।
প্রথম মিঞার কিসসা
আফ্রিদি দৈত্যটার হুঙ্কারে ভীত না হয়ে যুবকদের মধ্য থেকে বুনাে ছাগলের মালিক প্রথম মিঞা এগিয়ে এসে বলল—মেহেরবান, বান্দার গুনাহ মাফ কর। আমি তােমায় আমার এ বুনাে ছাগলটার কিসসা শোনাতে চাই। আমার কিসসা যদি তােমার দিলে খুশ আনতে পারে তবে সওদাগরের গোস্তাকি মাফ করে দেবে, কথা দাও। | আফ্রিদি দৈত্য ঠোটের কোণে ম্লান হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বল্ল-বহুত আচ্ছা! তােমার কিসসা যদি আমার দিলে খুশ উৎপাদন করতে পারে তবে সওদাগরের তিন ভাগ গােসতাকীর এক ভাগ আমি হাসিমুখে মাফ করে দেব, কথা দিচ্ছি। | এবার বুনাে ছাগলের মালিক-যুবকটি তার কিসসা শুরু করল-“হে দৈত্যাধিপতি, আমার সঙ্গে এই যে বুনাে-ছাগলটা দেখতে পাচ্ছ, এটা কিন্তু আসলে অবশ্যই কোন জন্তু নয়। আমার চাচার লেড়কি। চাচাতাে বােন। আমি একে শাদী করেছি। এখন আমার বিবি। ত্রিশটা বছর আমরা এক সঙ্গে পাশাপাশি কাছাকাছি রয়েছি। শৈশবেই এ যাদুবিদ্যা রপ্ত করে নিয়েছিল।
আমার আপশােষ একটাই, ত্রিশ বছর এক সঙ্গে ঘর করলাম বটে কিন্তু একটাও ছেলেপুলে আমাদের হ’ল না। মনের দুঃখে শেষ পর্যন্ত। বাডির নােকরাণির গর্ভে লেড়কা পয়দা করে আপশােষ দূর করলাম। আমার লেড়কা যখন পনের বছরে পা দিল তখন আমাকে অর্থোপার্জনের জন্য বিদেশে পাড়ি জমাতে হয়েছিল।আমার বিবি আমার অনুপস্থিতির ফায়দা লুটল। সে যাদুবলে। আমার বেটাকে বাছুর আর তার মা’কে গাই করে ফেলল। | কিছুদিন পর আমি ঘরে ফিরে বিবিকে জিজ্ঞেস করলাম—“কি গাে, আমার বেটা আর তার মাকে দেখছি নে যে? তারা কোথায় গেছে? আমার কথার উত্তরে বিবি আমাকে মিথ্যে কথা বলল, আমার বেটা ঘর ছেড়ে উধাও হয়ে গেছে আর তার মা মরে গেছে। গাের দেওয়া হয়েছে। সামনে ঘাস-লতা পয়দা হয়ে জঙ্গল হয়ে গেছে। বিবির কথায় আমার কলিজাটা কুঁকড়ে গেল। আঁখি দুটো দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। আমি কান্নাকাটি করে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। এক সময় আমাদের পরবের দিন এল বকরি ঈদ। গাই, মহিষ বা ছাগল যার, যা সামর্থ্য কোরবানি করার পরব । খােদাতাল্লাকে যখন মানি তখন আমাদেরও কিছু না কিছু কোরবানি করতেই হয়। নােকরটাকে পাঠালাম একটা তাগড়াই গাই বা বলদ যা-ই হােক খরিদ করে আনার জন্য। সে একটা ইয়া বড় গাই খরিদ করে নিয়ে এল। আমি অস্ত্র নিয়ে তার দিকে এগােতেই | দেখলাম, আঁখি দুটো দিয়ে পানির বন্যা নেমে এসেছে। আর বিশ্রী স্বরে ডাকাডাকি করছে। হাতের অস্ত্রটা ফেলে দিলাম। কিছুতেই মন | চাইল না। নােকরটাকে বলাম তুই যদি পারিস কোরবানি কর। আমার মন সরছে না।
আসলে তাে আমার জানা নেই, যেটাকে আমি কোরবানি করতে | চাইছি সে অন্য দশটা গাইয়ের মত সাধারণ গাই নয়। আমার বেটার মা। আমার দাসীকে যাদুবলে গাই বানিয়ে রাখা হয়েছে।
আমার মন সরল না বটে, আমার নােকরটা কিন্তু মুহুর্তে কাজ হাসিল করে ফেল। | জবাই করার পর এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য আমার নজরে পড়ল। দেখি, আমার নােকরাণির ধড় আর মুণ্ডুটা খুনের মধ্যে পড়ে বার কয়েক লাফালাফি দাপাদাপি করে পাথরের মূর্তির মত নিশ্চল নিথর হয়ে রইল। দুঃখ-যন্ত্রণায় আমার মনটা বিষিয়ে রইল।। | এবার লােকটাকে আরও কিছু মােহর দিয়ে বল্লাম—“যা একটা বাছুর কিনে আন। সে এবার একটা মােটাসােটা ইয়া তাগড়াই বাছুর নিয়ে এল। আমার কাছাকাছি আসতেই বাছুরটা আমার পা দুটোর কাছে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল। দু’আঁখিতে পানির ধারা। ঠোট দুটো তিরতির করে কাঁপছে। কিছু যেন বলতে চাইছে। ক্ষমতায় কুলােচ্ছে। । নীরবে আঁখি দিয়ে পানি ঝরাচ্ছে।
আমার বুকের ভেতরে কলিজাটা বার বার মােচড় মেরে উঠতে লাগল। বিষিয়ে উঠল দিলটা। নােকরটাকে বললাম–বাছুরটাকে জবাই করতে কিছুতেই আমার মন সরছে না। একে ছেড়েই দেওয়া যাক। তুই বরং অন্য একটা গাই খরিদ করে নিয়ে আয় গে। | কিসসাটা বলতে বলতে শাহরাজাদ জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন ভােরের আলাে উঁকি দিচ্ছে।
ব্যস, এ পর্যন্ত গল্পটা বলে তিনি থেমে গেলেন, আর এগােলেন । দুনিয়াজাদ দিদির গলা জড়িয়ে ধরে বল—কী সুন্দর তােমার কিসসা! কী মিষ্টি তােমার গলা! আর বাচনভঙ্গিও চমৎকার!
শাহরাজাদ ওড়নাটা গােছগাছ করতে করতে বলল-আরে, আসল কিসা তাে শুরুই হয় নি। বহিন, যদি খােদা এ-জানটা রক্ষা করেন তবে কাল রাত্রে অবশিষ্টটুকু শােনানাের বাসনা রইল। | দুনিয়াজাদ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। বাদশাহ শারিয়ার বিবির কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলেন। বাদশাহের ঘুমকাতর চোখদুটো বুজে আসতে চাচ্ছে। তিনি আপনমনে বলে উঠলেন—সত্যি বিবি, ভারী সুন্দর কিসসাই শুরু করেছিল!নসীব মন্দ তাই শেষ হল।
আবার বলে উঠলেন, এমন একটা কিসসার শেষটুকু না শােনা পর্যন্ত বিবিকে তাে কিছুতেই কোতল করা যাবে না। এরকম ভাবতে ভাবতে তিনি বিবির ওপর কাৎ হয়ে ঘুমের শিকার হলেন। | ভােরের আলাে ফুটে উঠল। যখন তিনি চোখ মেলে তাকালেন জানলার বাইরে আলাের রােশনাই। বেগম শাহরাজাদ সে রাত্রের মত জানে বেঁচে গেলেন। বদ্ধ উজির নিঃসন্দেহ যে, অন্যদিনের মত বাদশাহ তার বেটি শাহরাজাদকেও নির্ঘাৎ কোতল করেছেন।বাদশাহ শারিয়ার অন্যদিন সকালে দরবারে এসে তার বিবির মৃত্যু সংবাদ ঘােষণা করেন। সেদিন কিন্তু তা আর করলেন না।
বদ্ধ উজির বাদশাহের আচরণে বিস্মিত হলেন। একী অবিশ্বাস্য কাণ্ড! তবে কি তার জান শাহরাজাদ বেঁচে রয়েছে? ব্যাপারটা তার কাছে কেমন জটিল রূপ ধারণ করল।
বাদশাহ শারিয়ার দরবারে সারাদিন কাজে ডুবে রইলেন। সূর্য পশ্চিম-আকাশে হেলতে না হেলতেই হারেমে, বেগম শাহরাজাদ এর কামরায় গিয়ে ঢুকলেন। কোনরকম ভূমিকা না করেই সরাসরি বলেন— ‘পেয়ারী, তােমার কিসসা শুরু কর। তােমার মুখের কিসসা কেবল তােমার বহিনেরই নয়, আমার দিলও কেড়ে নিয়েছে।
বেগম শাহরাজাদ বললেন—বাছুরটার আচরণে বুনাে ছাগলের মালিক-যুবকের মন গলে গেল। সে নােকরকে ডেকে বলল -বাছুরটাকে গােয়ালে বেঁধে রেখে অন্য আর একটা গাই নিয়ে আয়। নােকরটা মনিবের আদেশ পালনের জন্য উদ্যোগ নিতে লাগল। এদিকে আফ্রিদি দৈত্যটা আপন মনে বলে উঠল—'এ কী অবিশ্বাস্য গল্পরে বাবা! শুনতে শুনতে দম যে বন্ধ হয়ে আসতে চায়!
বুনাে ছাগলের মালিক-যুবকটা কিসসা বলতে লাগল—“আমার বিবি তখন অদূরে দাঁড়িয়ে। আমি বাছুরটাকে জবাই করতে অস্বীকার করলে সে অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে বলে উঠল-বাছুরটাকে ছেড়ে দিও না, জবাই কর। প্রচুর গােক্ত পাওয়া যাবে এর গা থেকে। | বিবির কথাতেও আমার মন নরম হ’ল না। নােকরটাকে বলাম, -এটাকে রেখে বেশতাগড়াই দেখে অন্য আর একটা গাই নিয়ে আয় গে। | তার পরদিনের কথা। নােকরটা ব্যস্ত হয়ে এসে বল্ল-হুজুর, এক বুড়িকে ধরে আমার লৈড়কি ভাল জাদুবিদ্যা রপ্ত করেছিল। বুড়িটা এখন আমার বাড়িতে মেহমান হয়ে বাস করছে। কাল বাছুরটাকে আমার লেড়কির কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেটাকে দেখামাত্র আমার লেড়কি বােরখা দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। ব্যাপারটা আমার কাছে তাজ্জব ঠেকল। আমি ছাড়া অন্য কোন পুরুষ মানুষই সেখানে ছিল না যাকে দেখে আমার লেড়কি অমন লজ্জা শরম বােধ করতে পারে। তারপর বাছুরটাকে দেখামাত্র তার চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক দেখা গেল। পরমুহূর্তেই দু’আঁখি বেয়ে পানি গড়াতে লাগল। সে আঁখি মুছতে মুছতে বল—“আব্বাজান, তুমি কি বাছুরটার ব্যাপার কিছু জান? এ যে আসলে বাছুর নয়, মানুষ—জানতে কি ? নইলে আমার কাছে নিয়ে এলে কেন? | লেড়কির কথায় আমার কলিজাটা বরফের মত ঠাণ্ডা হয়ে গেল। মানুষ? মানুষের লেড়কা! কি সব যা তা বলছিস, মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝছি না! আর তুই হাসলিই বা কেন, কাদলিই বা কেন? এর মধ্যে কি রহস্য রয়েছে খােলসা করে বল। | ‘—শােন আব্বাজান, বাছুরটা আমাদের মালিকের জোয়ান লেড়কা। যাদুবিদ্যা প্রয়ােগ করে এর বিমাতা একে মানুষ থেকে বাছুরে পরিণত করে রেখেছে। আর এর মাকে করেছে গাই। তাই আমি হাসি চেপে রাখতে পারি নি। তার মা গরুটাকে তােমরা জবাই করেছ শুনেই আমার আঁখি দুটো বেয়ে পানি নেমে এল। | হুজুর, আমার লেড়কির কথা শুনে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। তাকে বললাম—এমন তাজ্জব কাণ্ড কি হওয়া সম্ভব? এ কথা শেনার পর থেকে সারাটা রাত্রি আমি বসে কাটিয়েছি। আমার নিদ যেন আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আঁধার কাটতে না কাটতেই আমি হন্তদন্ত হয়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছি।
নােকরের মুখে এমন তাজ্জব ব্যাপার শুনে আমি তার সঙ্গে যাত্রা করলাম। তখন আমার একমাত্র চিন্তা কি করে আমার বাছার জীবনরক্ষা করা যাবে। তাকে একবারটি দেখার জন্য আমার মন উথালি পাথালি করতে লাগল। উঠোনে পা দিতেই নােকরের রূপসী লেড়কী আমাকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালমন্দ করল। আর হতভাগ্য বাছুরটা আমার পায়ের কাছে পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল।।
লেড়কিটা তখন বল—“হুজুর, একে আপনি চিনতে পারেন নি? এ যে আপনার বেটা।।
-বাছা, তােমার কথা যদি সত্যি হয় তবে আমার কলিজার সমান বেটাকে ফিরিয়ে দাও। তুমি যা পুরস্কার চাইবে, দেব।
—“হুজুর, আমি দুটো শর্তে আপনার পুরস্কার স্বরূপ অর্থ বা ধনদৌলত নিতে পারি। প্রথম শর্ত আপনার বেটার সঙ্গে আমার শাদী দিতে হবে। আর দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে আপনার বিবিকে আমি আমার পছন্দ মত একটা জানােয়ার বানিয়ে দেব। বলুন হুজুর, আমার শর্ত মানতে রাজি তাে? বলুন, তবে যাদুবিদ্যার দ্বারা আপনার লেড়কাকে বাছুর থেকে মানুষে পরিণত করে দেই।
| ‘দৈত্যরাজ, আশা করি আমার তখনকার মানসিক অবস্থা সম্বন্ধে নিশ্চয়ই ধারণা করতে পারছেন? নােকরের লেড়কির শর্তে আমি সম্মত হয়ে গেলাম।
আমার কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে নােকরের লৈড়কি ছােট্ট একটা তামার রেকাবি নিয়ে এল। তাতে পানি ভর্তি। পানির দিকে মুখ রেখে চাপাস্বরে কি সব আওড়াতে লাগল। তারপর গণ্ডুষ ভরে পানিটুকু নিয়ে এবার অনুচ্চ কণ্ঠে বলতে লাগল—“আল্লহ যদি বাছুর পয়দা করে থাকেন তবে তুমি বাছুরই রয়ে যাবে। আর যদি কোন ডাইনী যাদুমন্ত্র প্রয়ােগ করে তােমায় মানুষ থেকে বছুরে পরিণত করে দিয়ে থাক তবে খােদার দোয়ায় তুমি প্রকৃত রূপ, মনুষ্য রূপ ফিরে পাও। _ বাছুরটা এবার ধীরে ধীরে মনুষ্য রূপ, আমার লেড়কার রূপ ফিরে পেল। আমি উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে সদ্য ফিরে পাওয়া আমার বাছাকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। আমার লেড়কা তখন আমার কাছে আদ্যোপান্ত ঘটনা ব্যক্ত করল। সব শুনে আমি তখন বললাম-বাপজান, যে তােমার প্রকৃত রূপ ফিরিয়ে দিয়েছে তার সঙ্গে তােমার শাদী দেব, প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। | শাদীতে আমার লেড়কাও আপত্তি করল না। সে রাত্রেই তাদের শাদী দিলাম।
নােকরের লেড়কি আমার বেটার বৌ হয়ে ঘরে এল। এবার আমার চাচার লেড়কি, আমার বিবিকে যাদুবিদ্যার বলে বুনাে-ছাগলে পরিণত করে দিলে।
তারপর বেটার ওপর সব ঘর-সংসার ছেড়ে দিয়ে আমার বিবি বুনাে-ছাগলটিকে নিয়ে আমি হারা উদ্দেশ্যে ঘর-সংসার ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। ত্রিশ বছর একে নিয়ে সুখে-দুঃখে ঘর করেছি।
এখান দিয়ে যাবার সময় সওদাগরকে আকুল হয়ে কাঁদতে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম। তার করুণতম কাহিনী শুনে আমার বড় মায়া হ'ল। সব বৃত্তান্ত শুনে আমার কৌতূহল কম হয় নি। এর শেষ কোথায়
দেখার জন্য এখানে রয়েই গেলাম। আফ্রিদি দৈত্য এবার আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ার উপক্রম হ’ল। সে বলল -“ঠিক আছে, সওদাগরের তিন ভাগের এক ভাগ গুনাহ আমি মাফ করে দিলাম।
দ্বিতীয় মিঞার কিসসা
এবারে শিকারী কুকুর দুটোর মালিক দ্বিতীয় মিঞা আফ্রিদি দৈত্যকে কুর্ণিশ জানাল। সে বলল —“দৈত্যরাজ আমার কাহিনী শুনলে তুমি এতই অবাক হয়ে যাবে যে, মুখ দিয়ে রা পর্যন্ত বেরােবে না। যে কিসসা এইমাত্র শুনলে তার চেয়ে এটা অনেক, অনেক বেশী চটকদার। আমার কিসসা যদি বাস্তবিকই তােমার দিলকে একটুআধটুও নাড়া দেয় তবে সওদাগরের গুনাহ-র অল্প হলেও মাফ করে দিও তুমি। | আফ্রিদি দৈত্য মুচকি হেসে বল—তাই হবে যুবক। তােমার কিসসা শুরু কর। | যুবক এবার কুকুর দুটোর দিকে অঙুলি-নির্দেশ করে বলল-এ শিকারী কুকুর দুটো কিন্তু মেটেই সাধারণ কুকুর নয়। আমার দু’ ভাইয়া, সহােদর ভাইয়া। উভয়েই আমার বড়। আমাদের আব্বাজান মৃত্যুসজ্জায় তিন হাজার মোেহর তিন বেটার নামে ভাগ করে দিয়ে যান। আমার অংশ দিয়ে আমি একটা দোকান খুলে বসলাম। আমার ভাইজনরাও আলাদা আলাদা দোকান খুলল। | কিছুদিন যেতে না যেতেই আমার ভাইজানদের একজন দোকান গুটিয়ে এক সওদাগরের সঙ্গে বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে ভিন দেশে পাড়ি জমাল। এক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আমার সে ভাইজান নিঃস্ব-রিক্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরল। আমি তাকে বললাম—‘তােমাকে তাে হাজারবার নিষেধ করেছিলাম সওদাগরের কাজে ভিনদেশে গিয়ে কাজ নেই। কিছুতেই সে কথা কানে নিলে না। হয়ত বা খােদাতাল্লার এটাই মর্জি ছিল। তাই তাে তােমার নসীব এরকম হ’ল। |বুঝিয়ে শুনিয়ে তাকে এবার এনে আমার দোকানে বসালাম।
নদীর পানিতে গােসল করে এলাে সে। আমার ভাল লােশাক আশাক পরালাম। তারপর দু’ ভাইয়া খানাপিনা খেলাম। একথা সেকথার মাঝে তাকে বললাম—‘ভাইজান, এক বছরে দোকানে মুনাফা ভালই হয়েছে। আসল তাে রয়েই গেছে। তার ওপর হাজার দিনার নগদ মুনাফা। তুমি তার অর্ধেক নিয়ে নাও। আবার দোকান সাজিয়ে বস। দেখবে তাতেই ভাল চলে যাবে। বেশী মুনাফার দরকার কি। অল্পেতে সন্তুষ্ট থাকলে জীবনে সুখের হদিস পাওয়া যায়। কথায় আছে, অতিলােভে তাঁতী নষ্ট। | আমার বাৎলানো বুদ্ধি সে নিল। আবার পসরা সাজিয়ে বসল। | কিছু দিন এভাবে কাটার পর ..................To be continued .

0 Comments