গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
কিছুক্ষণ বাদে বৃদ্ধা ক্রীতদাসী ইরবিজার ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। চোখের সামনে এমন কোন বীভৎস দৃশ্য দেখবে সে কল্পনাও করতে পারে নি। সে দেখল, ইরবিজা মরার মত এলিয়ে পড়ে রয়েছে। শয্যা এলােমেলাে। মখমলের চাদরটির কিছু অংশ পালঙ্ক থেকে ঝুলে পড়েছে। ইরবিজা বিবস্ত্রা। একেবারেই বিবস্ত্রা। মাথার চুল এলােমেলাে। নিচের ঠোটটিতে দাঁতের দাগ। সামান্য কেটে গেছে। চুইয়ে চুইয়ে খুন ঝরছে। অভিজ্ঞ বৃদ্ধার বুঝতে আর বাকি রইল না, যে কেউ-ই হােক একটু আগেই ইরবিজার সতীত্ব নষ্ট করে পালিয়েছে। বৃদ্ধটি এবার ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তার কাছে এগিয়ে যায়। দুরু দুরু বুকে গায়ে হাত দিয়ে দেখল, হৃদস্পন্দন ঠিকই আছে বটে। তবে একেবারে বে-হুস। আর গাল বেয়ে গাজলা বেরােচ্ছে। ব্যাপারটি এবার তার কাছে আরও পরিষ্কার হ’ল। ওষুধ খাইয়ে বেহুস করে কোন এক শয়তান তার সর্বনাশ করে গা-ঢাকা দিয়েছে। ভাবল, এ-অবস্থায় পােশাক পরান সম্ভব নয়। উপায়ান্তর না দেখে একটি চাদর তার গায়ে চাপা দিয়ে বৃদ্ধা দ্রুত ঘড় ছেড়ে গেল।
সকাল হ’ল। বেশ বেলাতেই ইরবিজার ঘুম ভাঙল। ঠোটটিতে সামান্য ব্যথা অনুভব করল। হাত দিল। চুঁইয়ে পড়া খুন জমাট বেঁধে শুকিয়ে রয়েছে। বুঝতে বাকি রইল না গতরাত্রে তার সর্বস্ব খােয়া গেছে। উঠে বসার চেষ্টা করল। তল পেটে তিরতির করে ব্যাথা হচ্ছে। বার কয়েক হাত বােলাল সেখানে। ফুসফুস নিঙড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। বিবস্ত্র অবস্থাতেই মিনিট কয়েক পালঙ্কের ওপর বসল। অগােছাল বিছানাটির দিকে হতাশ দৃষ্টিতে তাকাল। চাদরের এক জায়গায় চোখ পড়তেই চমকে ওঠে। খুনের দাগ। চাদরের গায়ে শুকনাে খুনের দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
এমন সময় বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটি বিষন্নমুখে ঘরে ঢুকল। ইরবিজা তাকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল। বৃদ্ধা নানাভাবে তাকে প্রবােধ দিতে থাকে। তারপর বলল—“গতরাত্রে আপনাকে ঘুমের দাওয়াই খাইয়ে শয়তান আপনার ইজ্জৎ হানি করে গেছে। নাশ করেছে আপনার সতীত্ব।
চোখের পানি মুছতে মুছতে ইরবিজা গর্জে ওঠে—এর বদলা আমি নেব-ই নেব।'
বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটি ম্লান হাসল। বলল -বদলা ? বদলা কি করে আপনি নেবেন, মাথায় আসছে না। সামান্য একজন রক্ষিতা আপনি, বাদশাহের হারেমে আপনার ঠাই।
-না, আমি তার বাঁদী বা রক্ষিতা কিছুই নই। তবে আশ্রিতা বটে। আমার পিতা সম্রাট হারদুব। শৌর্যে-বীর্যে এর চেয়ে কোন অংশে কম নয়। শয়তান দুবৃত্তকে কি করে সমুচিত শিক্ষা দিতে হয় তা তার ভালই জানা আছে।
বৃদ্ধা বলল —'এত উতলা হবেন না। তড়িঘড়ি কিছু করতে গেলে সব ভেস্তে যাবে। মাথা ঠাণ্ডা করে ফন্দি আঁটুন কিভাবে শয়তানকে ঢিট করা যায়।
ইরবিজা এবার থেকে আর ঘরের বাইরে তেমন বেরােয় না। অধিকাংশ সময় ঘরে দরজা এঁটে শুয়ে বসে দিন কাটায়। বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটি তার একমাত্র সঙ্গিনী। দরজা বন্ধ করে উভয়ে বসে ফন্দি আঁটে কি করে শয়তান উমরকে কৃতকর্মের শাস্তি দেওয়া যায়।
এভাবে ইরবিজা নিজেকে সবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখে প্রায় মাস দুই কাটাল। সে এবার বুঝতে পারে, সে সন্তানসম্ভবা, মা হতে চলেছে। সর্বদা চোখের পানি ফেলে। বৃদ্ধা ক্রীতদাসীর সঙ্গে পরামর্শ করে এ-অবস্থায় তার করণীয় কি। সারকান বাগদাদে অনুপস্থিত। কোথায় গেছে, কবে আসবে কিছুই সে জানে না।
বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটি পরামর্শ দিল, যে করেই হােক শয়তান বাদশাহ উমর-এর খপ্পরের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে তাকে চলে যেতে হবে ।
ইরবিজা বলে—চলে তাে যাব, কিন্তু কোথায় যাব? কার কাছে যাব? ঠিক আছে। সিসিরিয়াতে আমার আব্বার কাছেই ফিরে যাব। আমার আব্বা আমার ওপর যতই বিরূপ হােন না কেন আমাকে ফেলে অন্ততঃ দেবেন না। আমি তাঁর একমাত্র সন্তান।
–হ্যা, আমিও এরকম কথাই ভাবছি।
–“কিন্তু আসল সমস্যা হচ্ছে, প্রহরীবেষ্টিত এ-প্রাসাদ থেকে পালাব কি করে? আর সঙ্গে কোন পুরুষ না থাকলে লােকে নানারকম সন্দেহ করবে। বদমায়েশরা পিছনে লাগবে।'
–‘ব্যাপারটি আমার হাতে ছেড়ে দিন। আমি ঠিক একটি না একটি উপায় বের করতে পারবই।'
—“কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব, আমি তাে ভাবতেই পারছি না! ‘শুনুন, প্রাসাদের দ্বাররক্ষীদের প্রধান একজন নিগ্রো।
হতচ্ছাড়াটির পয়সার খুব লােভ। হাতে কিছু পড়লে সে পারে না। এমন কাজ নেই। তাকে কোনরকমে পটিয়ে সঙ্গে নিয়ে নিতে পারলে দু' দিকই রক্ষা পাবে। পথে কেউ তার পিছনে লাগতে সাহস পাবে না, ভাববেও না কিছু। বৃদ্ধা ক্রীতদসীটি নিগ্রোটির সঙ্গে কথা বলে। সে সারা জীবন দ্বাররক্ষীর কাজ করে যে অর্থোপার্জন করবে তার চেয়ে বেশী অর্থ তাকে দেওয়ার লােভ দেখায়। আর উপরি পাওনাস্বরূপ সিসিরিয়ার সম্রাটের দ্বাররক্ষীর চাকুরিটি তাে ফাউ হিসাবে পেয়ে যাবে।
বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটির প্রস্তাবে দ্বাররক্ষীদের প্রধান নিগ্রোটি রাজী হয়ে গেল। একদিক থেকে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।
বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটি ইরবিজার কক্ষে এসে দ্বাররক্ষীদের প্রধান নিগ্রোটির সম্মতির কথা জানাল। আর তাকে এ-ও বলল —“আগামী জুম্মাবারে বাদশাহ নামাজ সেরে শিকারে বেরােবেন। সেদিনই আমরা প্রাসাদের খিড়কি দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাব। আর নিগ্রোটি অদুরে তিনটি খচ্চর নিয়ে আমাদের অপেক্ষায় থাকবে।
নির্দিষ্ট দিনে বাদশাহ উমর ইয়ার দোস্তদের নিয়ে শিকারে বেরিয়ে গেলেন। বৃদ্ধা ক্রীতদাসী এবার তৎপর হয়ে ওঠে। ইরবিজার হীরাজহরৎ প্রভৃতি যা কিছু গহনাপত্র রয়েছে সব কিছু একটি ভাঙাচোরা সাধারণ বাক্সে ভরে নিল। আর ইরবিজাকে অতি সাধারণ এক পােশাকে সাজিয়ে নিল। নবাব বাদশাহের মেয়ে ভাববার কিছুমাত্র অবকাশ নেই।
রাত্রি একটু গভীর হলে বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটি খােদাতাল্লার নাম নিয়ে খিড়কির দরজা দিয়ে ইরবিজাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী নিগ্রোটি সেখানে তিনটি খচ্চর নিয়ে অপেক্ষা করছে। সে এগিয়ে এল। ইরবিজাও বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটিকে খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে যাত্রা শুরু করল। রাত্রির চতুর্থ প্রহর। নিগ্রোটি ইরবিজা ও বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটিকে নিয়ে নগরের বাইরে পৌছে গেল। এবার তারা অনেক নিরাপদ বােধ করল। নির্জন নিরালা অঞ্চল। ধারে-কাছে জনবসতি আছে বলে মনে হ’ল না।
সারারাত্রি খচ্চরের পিঠে বসে বসে ইরবিজা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। একটু বিশ্রাম নিয়ে নিতে পারলে মন্দ হয় না। নিগ্রোটি ইরবিজার শরীরের অবস্থা চিন্তা করে একটি ঝাকড়া গাছের তলায় খচ্চর দাঁড় করাল। ঘাসের ওপর চাদর বিছিয়ে দিয়ে ইরবিজা ও বৃদ্ধাকে একটু জিরিয়ে নিতে বলল। ভাের হলে আবার খচ্চরের পিঠে উঠবে।
ইরবিজা যেন হাতে স্বর্গ পেল। শরীর খুবই ক্লান্ত। অন্য সময় হলে কোন সমস্যার ব্যাপারই ছিল না। সে যে অন্তঃসত্ত্বা। এ শরীরে অবসাদ একটু-আধটু ভর করেই থাকে।
গাছের তলায়, চাদরের ওপর শরীর এলিয়ে দিতেই ঘুমে চোখ দটো বন্ধ হয়ে আসতে চাইল। বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটির চোখও ঢলঢ়ল। নিগ্রোটি বলল—“আপনারা নিশ্চিন্তে নিদ যান, আমি জেগে পাহারা দিচ্ছি।'
কিছুক্ষণের মধ্যেই ইরবিজা ও বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। এক সময় অবাঞ্ছিত এক আওয়াজে ইরবিজার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলে তাকিয়েই চমকে ওঠে। দেখে নিগ্রোটি হিংস্র নেকড়ের মত লােলুপ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে। উলঙ্গ, একেবারেই উলঙ্গ। মুখে শয়তানের হাসি। হাতের তরবারিটি উচিয়ে ধরা।
বিশ্রী স্বরে হেসে নিগ্রোটি বল্ল-“কি গাে, ডর লাগছে নাকি? বাদশাহ তােমার সতীত্ব তাে খতমই করে দিয়েছেন। আসলি মাল তো তার ভাগেই লেগে গেছে। এখন ছিবড়ে টিবড়ে যেটুকু পড়ে রয়েছে তা নিয়ে মিছে বড়াই করতে যেয়াে না। এদিক-ওদিক বিলিয়ে দাও, আমরা হতভাগারা লুটেপুটে খাই।
—“হারামজাদা! ছােটলােক নচ্ছার কোথাকার! সামান্য একটি তরবারি দিয়ে আমাকে ভয় দেখাতে চাচ্ছিস! শুনে রাখ, আমার শরীরে এক ফোটা খুন থাকতে তুই আমাকে হাতের মুঠোয় পাবি না ।
কথা বলতে বলতে সে নিগ্রোটির ওপর ঝাপিয়ে পড়তে উদ্যত হয়। কিন্তু সে সুযােগ আর পেল না। বেগতিক দেখে নিগ্রোটি হাতের তরবারিটি অতর্কিতে তার বুকে গেঁথে দেয়। বিকট আর্তনাদ করে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। গলগল করে খুন বেরােতে লাগল। বার কয়েক আছাড়ি-পিছাড়ি করে ইরবিজার খুনে ভেজা শরীরটি এলিয়ে পড়ল। সব শেষ। ইরবিজা অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে বেহেস্তের পথে যাত্রা করল।
এদিকে ভাের হতে আর দেরী নেই দেখে বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।
বাহান্নতম রজনী
বাদশাহ শারিয়ার রাত্রে অন্দরমহলে বেগমের ঘরে এলেন। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, শয়তান নিগ্রোটির হাতে সম্রাট হারদুব-এর একমাত্র কন্যা ইরবিজা নিষ্ঠুরভাবে জান দিল।
কাজ হাসিল করে নিগ্রোটি তার ধনরত্নের বাক্সটি নিয়ে পাহাড়ের দিকে চম্পট দিল। বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটি অসহায় দৃষ্টি মেলে তার ফেলে যাওয়া পথের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। এমন সময় এক অশ্বারােহী বাহিনী সেখানে উপস্থিত হ’ল। তাদের পােশাক আশাক দেখে বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটি বুঝতে পারল এরা ইরবিজার আব্বা সম্রাট হারদুব-এর বাহিনী। কাছে আসতেই দেখা গেল তাদের সঙ্গে স্বয়ং সম্রাট হারদুবও রয়েছেন। কন্যার রক্তাপ্লুত নিঃসার দেহটি দেখেই তিনি গুলিবিদ্ধ বাঘের মত গর্জে উঠলেন—কে? কে এমন নৃশংস কাণ্ডাটি করল? কার এমন সাহস যে এমন করে আমার সর্বনাশ করল!'
বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটির মুখে সম্রাট হারদুব শুনল বাগদাদের বাদশাহ উমর-অল-নুমান-এর নিগ্রো দ্বাররক্ষী ইররিজাকে খুন করে পাহাড়ের দিকে চম্পট দিয়েছে। আর বাদশাহ স্বয়ং তার ওপর বলাৎকার করে তার সতীত্ব হরণ করেছে একথাও বৃদ্ধা সবিস্তারে বলল । সম্রাট হারদুব আগেই শুনেছিল বাগদাদের বাদশাহের লেড়কা সারকান ইরবিজাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বাগদাদে নিয়ে যায়। তারপর প্রাসাদে উমর-এর বাদী করে রেখেছে। একথা শােনার পরই তিনি বিশাল অশ্বারােহী বাহিনী নিয়ে কৃতকর্মের প্রতিশােধ নেওয়ার জন্য বাগদাদের পথে যাচ্ছিলেন। পথে এ-দুর্ঘটনার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলেন।
সম্রাট হারদুব গর্জে উঠলেন—“শয়তান উমর, আমার এত বড় সর্বনাশ তুমি করলে! এর বদলা আমি নেব-ই নেব।'
বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটি এবার চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল -“হুজুর, শয়তান উমর-এর ওপর বদলা নেবার সবচেয়ে বড় উপায় হচ্ছে খুবসুরৎ লেড়কিকে টোপ ফেলা। গােটা পাঁচেক খুবসুরৎ যুবতী লেড়কি সংগ্রহ করুন। তারপর তাদের মুসলমানী আদব কায়দা শিখিয়ে তৈরি করে নিতে হবে। খানদানি মুসলমানের ঘরের লেড়কির মত তাদের গড়ে তুলতে হবে। উমর-এর হারেমে তিনশ’ ষাটটি বাঁদী রযেছে। সারা বছর ধরে শয়তানটি রােজ একা একটি লেড়কিকে জানােয়ারের মত ভােগ করে। তাদের যৌবনের জোয়ার লাগা দেহটিকে সারা রাত্রি ধরে ছিডেফেড়ে খায়। ইরবিজার সঙ্গে একশটি খ্রীস্টান কুমারী গিয়েছিল। তারা সবাই তার হারেমে আশ্রয় পেয়েছে। তাদেরও শয়তান উমর ভােগ করে চলেছে। হুজুর, ওই যে, বললাম জনা পাঁচেক কুমারী লেড়কিকে শিখিয়ে পড়িয়ে তৈরি করে আমার হাতে তুলে দিন। তারপর দেখবেন, কি করে শয়তানটিকে ঘায়েল করি। তার কাম-লালসা আমি চিরদিনের মত ঘুচিয়ে ছাড়ব।' বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটির কথা শুনে সম্রাট হারদুব-এর মনে আশার সঞ্চার হ’ল। বললেন—‘শােন, আমি দু’-একদিনের মধ্যেই আমার রাজ্যে পৌছে যাচ্ছি। তারপর খুবসুরৎ পাঁচটি লেড়কি বাছাই করে তােমার হাতে তুলে দেব। তুমি পছন্দ মাফিক লােক নিয়ােগ করে তাদের শিখিয়ে পড়িয়ে তােমার মনের মত করে তৈরি করে নেবে।
এমন সময় বেগম শাহরাজাদ দেখলেন, ভাের হয়ে এল। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।
তিপান্নতম রজনী
বাদশাহ শারিয়ার রাত্রির দ্বিতীয় যামে অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, সম্রাট হারদুব তার দেশে ফিরে বৃদ্ধা ক্রীতদাসীটির ফরমাস মত পাঁচটি খুবসুরৎ লেড়কি জোগাড় করে মুসলমানী কায়দা কানুন শিখিয়ে তাদের মনের মত করে তৈরি করে নেয়ার পর তার হাতে তুলে দিলেন। | এদিকে বাদশাহ উমর অল-নুমান শিকার সেরে প্রাসাদে ফিরে এলেন। অন্দর মহলে গিয়ে দেখেন, ইরবিজা নেই। কামরা ফাঁকা। চিড়িয়া ভাগ গিয়া।
বাদশাহ উমর শিকার হাত ছাড়া হওয়ায় হিংস্র জানােয়ারের মত গর্জে উঠলেন। দ্বাররক্ষীদের প্রধানের তলব হ’ল। শুনলেন, সে-ও ভেগেছে। দ্বাররক্ষীরা জান হাতে নিয়ে কুরবাণির ফাঁসির মত ভয়ে জড়ােসড়াে হয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকল।
বাদশাহের লেড়কা সারকান তখন বাগদাদের বাইরে ছিল। প্রসাদে ফিরে এসে শােনে, ইরবিজা বৃদ্ধা ক্রীতদাসী ও রক্ষীদের প্রধানের সাহায্যে প্রাসাদ ছেড়ে পালিয়েছে। আর এ-ও শােনে, তার আব্বা তার ওপর বলাৎকার করার জন্যই সে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। সব কিছু শুনে তার মাথায় খুন চেপে যাওয়ার জোগাড় হ’ল। নিজের ওপরই সে বেশী ধিক্কার দেয়। তার ওপর নির্ভর করেই সে নিজের মুলুক ছেড়ে বাগদাদে এসেছিল। তার আব্বাকে তাে সে ভালই চেনে। শয়তানটির হাতেই ফুলের মত তরতাজা লেডকিটিকে ছেড়ে দিয়ে সে ভিনদেশে পাড়ি দিয়েছিল কোন আক্কেলে! আব্বার ওপর তার মন অস্বাভাবিক রকম বিষিয়ে উঠল। প্রাসাদ তার কাছে এখন দোজকের তুল্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর নয়, এখানে আর একদিনও থাকতে সে নারাজ।
সারকান তার আব্বাকে বলল—“আমি এখানে আর থাকতে চাই না। আপনার বাদশাহীর যেকোন একটি সুবার দায়িত্ব দিয়ে আমাকে পাঠিয়ে দিন।
—‘দামাস্কাসে যাবে? আমার সুবাগুলির মধ্যে এর গুরুত্বই সবচেয়ে বেশী। মন চাইলে সেখানকার সুবাদার হয়ে যেতে পার।”
‘রাজী। আমি দামাস্কাসেই যাব। আপনি আমার যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন।
বাদশাহ উজির দানদানকে ডেকে বললেন—‘সারকানকে দামস্কাসের সুবেদার করে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন।
সারকান দামাস্কাসের সুবেদারী নিয়ে প্রাসাদ ছেড়ে গেল।
বাদশাহ উমর এবার তার লেড়কি নুজাৎ আর লেড়কা দু-অল মাকান-এর খোঁজ নিলেন। তারা ভালই আছে। মক্তবে যাচ্ছে। নিয়মিত পড়াশুনা করছে।
নুজাৎ-এর ওমর তখন চৌদ্দ আর দু-অল-মাকান-এর তেরাে সাল। তাদের বিদ্যাবুদ্ধির কথা বাগদাদ নগরীর মানুষের মুখে মুখে।
কিশাের দু-অল-মাকান দেখল, বাগদাদ নগরের ভেতর দিয়ে একদল হজযাত্রী যাচ্ছে। ইরাক থেকে আসছে তারা। মক্কায় হজ করতে যাবে। তারপর মদিনা হয়ে পয়গম্বর মহম্মদের সমাধি ক্ষেত্রে গিয়ে নামাজ পড়বে। কিশাের দু-অল-মাকান তাদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য বায়না ধরে। তার আব্বা উমর অনেক করে বােঝান, সেখানে যারা তীর্থ করতে যায় প্রায় সবাই জীবনের শেষ সিঁড়িতে পা দিয়েছে। বালক, কিশাের বা যুবকদের সেখানে যাওয়ার কোন অর্থই হয় না।
দু-অল-মাকান নাছােড়বান্দা। শেষ পর্যন্ত উপায়ান্তর না দেখে বাদশাহ তাকে মত দিতে বাধ্য হন। মাকান এবার তার বড় বহিন নুজাকে নিজের ইচ্ছার কথা জানায়। সে-ও মক্কায় যাবার জন্য গােপনে তৈরি হয়। পুরুষের পােশাক পরে সে যাবে মনস্থ করে। মাকান চুপি চুপি দুটো উট ভাড়া করে। বাদশাহ নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাকানকে মক্কায় যেতে দিতে রাজী হয়েছেন বটে। কিন্তু কিশােরী নুজাৎকে কিছুতেই যেতে দিতে চাইবেন না। তাই তারা রাত্রির অন্ধকারে, চুপি চুপি প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে উটের পিঠে চেপে বসল।
বহু পথ ঘুরে, বহু মুলুক দেখতে দেখতে দুই কিশাের-কিশােরী একদিন মক্কায় উপস্থিত হ’ল। পবিত্র তীর্থক্ষেত্র আরাফৎ পর্বত শৃঙ্গ, মদিনার পবিত্র সমাধি ক্ষেত্রে প্রভৃতি একের পর এক তারা দর্শন করল। নুজা এবং মাকান বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্র দর্শন করে এবার ফেরার পথে খ্রীস্টানদের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র ভগবান যীশুর জন্মস্থান জেরুজালেমের দিকে যাত্রা করল। দুর্গম পথ। কঠোর পথশ্রম সহ্য করতে না পেরে তারা উভয়েই অসুস্থ হয়ে পড়ল। আসলে জন্মাবধি তারা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্য দিয়ে দিন কাটিয়েছে। হঠাৎ করে এমন কঠিন কঠোর পরিশ্রম সহ্য হবে কেন? মাকানই বেশী কাবু হয়ে পড়ল। কোনরকমে তারা জেরুজালেমে পৌছল। মাকান-এর গা তখন জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।
নূজাৎ অসুস্থ ভাইয়াকে নিয়ে এক সরাইখানায় উঠল। হাতে দিনার যা ছিল তা-ও ফুরিয়ে এল। হেকিম ডেকে দাওয়াই দিল। কিন্তু বিমারি আরাম হ’ল না। নুজাৎ পড়ল মহাসমস্যায়। আল্লাহর কি মর্জি কে জানে। আরও ক’দিন হেকিমের দাওয়াই খেয়ে মাকান ক্রমে সুস্থ হয়ে উঠল। কিন্তু এখন তারা একেবারে নিঃস্ব-রিক্ত। একটি কানাকড়িও হাতে নেই যা দিয়ে দুটো রুটি কিনে তারা পেটের জ্বালা নেভাতে পারে। বিদেশ-বিভুই, কে-ই বা তাদের অসহায় অবস্থার কথা বুঝবে?
একটি দিন উপােষ করে কাটিয়ে পরদিন সকালে নুজাৎ ভাইয়াকে সরাইখানায় রেখে রােজগারের ধান্দায় পথে নামল। ভেবেছিল কোন আমীর টামীরের বাড়ি কাজ যােগাড় করে রােজগার পাতির চেষ্টা করবে। কিন্তু কোথায় কাজ? কে দেবে তাকে কাজ ? একেবারেই অজানা-অচেনা জায়গা, কার কাছে গিয়ে হাত পাতবে?
মাকান সারাদিন সরাইখানায় একা কাটাল। ভাবল বিকেলের আগেই তার বহিন খানা নিয়ে ফিরে আসবে। কিন্তু সন্ধ্যা হল নুজাৎ ফিরল না। রাত্রি গভীর হয়ে গেল তবু তার ফেরার নামটি নেই। একে খিদের জ্বালা তার ওপর বহিনের চিন্তা মাথায় নিয়ে মাকান সারারাত্রি বিনিদ্র অবস্থায় নিদারুণ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে কাটাল। দু’ দুটো দিন কেটে গেল। তবু নুজাৎ-এর কোন খোজ পাওয়া গেল না। সরাইখানার এক যুবক কর্মীর সহায়তায় মাকান বাজারে গেল। যদি সেখানে কারাে দয়া হয়, সামান্য কিছু খেতে দিয়ে তার জান বাঁচায়। সরাইকর্মীটি তাকে নিয়ে বাজারে পথের ধারে এক পােড়া বাড়ির রােয়াকে বসিয়ে দিয়ে এল। একে বিমারিতে কাহিল তার ওপর দু’ দিনের ওপর মুখে কুটোটিও কাটে নি। কথা বলার মত সামান্য ক্ষমতাও সে যেন হারিয়ে ফেলেছে। তার শােচনীয় অবস্থা দেখে বাজারেরই কয়েকটি লেড়কার মায়া হ’ল। তারা দোকানদারদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে মাকানকে কিছু মিঠাই কিনে এনে দিল। আর একটি মাটির ঘটে করে জল দিল। বাজারের লেড়কারা যে চাঁদা সংগ্রহ করেছিল তা থেকে ত্রিশ দিরহাম রয়ে গিয়েছিল। তারা ভাবল তা দিয়ে একটি উট ভাড়া করে মাকানকে দামাসকাস-এর হাসপাতালে পৌছে দিয়ে আসবে। কিন্তু দামাস্কাস বহু দূরের পথ। শেষ পর্যন্ত কেউ-ই যেতে উৎসাহী হ’ল না। বাদশাহ উমর-এর বেটা, সুবেদার সারকান-এর ভাই মাকান অনাহারে-অচিকিৎসায় পােড়া বাড়িটির বারান্দায় পড়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে চলেছে।
এবার রােগজীর্ণ মাকানকে দেখে এক প্রবীণের দিল কেঁদে উঠল। সে তার মহল্লার কয়েক জনকে নিয়ে চাঁদা তুলে তাকে দামাস্কাসের হাসপাতালে নিয়ে রওনা হল। কিছুদূর যাবার পর মাকান-এর অবস্থা আরও খারাপের দিকে। উটের পিঠে মাচার ওপর শুয়ে ধুকছে। সংজ্ঞাহীন। মনে হ’ল আর বেশীক্ষণ টিকবে না । ভাবল, এ মড়াটিকে আর শুধু শুধু এতখানি পথ টেনে নিয়ে গিয়ে কি লাভ! অবশ্য জান রক্ষার আশা থাকলে না হয় দেখা যেত। এরকম ভেবে তারা পথের ধারের এক হামামের বারান্দায় নামিয়ে রেখে তারা ঘরে ফিরে এল।
এক বুড়াে হামামেই থাকে। এখানে যারা নাইতে আসে তাদের জল জোগান দেয়। সক্কাল বেলা মৃতপ্রায় মাকানকে বারান্দায় পড়ে থাকতে দেখে অবাক হয়। আপন মনে বলে ওঠে—কী তাজ্জব ব্যাপার দেখ দেখি! মড়াটিকে এখানে কে ফেলে রেখে গেল। কিন্তু কাছে গিয়ে বুঝল, মরেনি। এখনও গলার কাছে আত্মাটি ধুকপুক করছে। এখনও জিন্দা আছে। চেহারা ছবি দেখে বুঝল কোন খানদানি পরিবারের লেড়কা। তবে এখানে এরকম অরক্ষিত অবস্থায়ই বা ফেলে যাবে কেন? বুড়াে মৃতপ্রায় মাকানকে নিজের কামরায় নিয়ে গেল। সে আর তার বিবি তার সেবায় লেগে গেল। তার বিবি বলল —সবই আল্লাহর মর্জি। সে তাড়াতাড়ি চেলা কাঠ দিয়ে আগুন জ্বেলে পানি গরম করে নিয়ে এল। ন্যাকড়া ভিজিয়ে গা মুছিয়ে দিল। বুড়ােটি দৌড়ে গিয়ে হেকিমকে ধরে নিয়ে এল। হেকিম চিন্তিত মুখে কিছুক্ষণ বসে থেকে দাওয়াই দিল। শেষ চেষ্টা যাকে বলে। যদি আল্লাহ তাকে কাছে টানে তবে কার সাধ্য দুনিয়ায় ধরে রাখে। কয়েক দিনের মধ্যেই মাকান-এর বিমারি আরাম হয়ে গেল। কেবল উঠে বসাই নয়, দু-চার কদম হাঁটচলাও এখন সে করতে পারে।
এমন সময় রাত পােহাল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বলা বন্ধ করলেন।
চুয়ান্নতম রজনী
অন্যান্য দিনের মত প্রায় মাঝরাতে বাদশাহ শারিয়ার অন্দর মহলে বেগমের কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার অবশিষ্ট অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, হামামের সে বুড়ােবুডির সেবা যত্ন ও ঐকান্তিক আগ্রহে-উৎসাহে মাকান ক্রমে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিকতা ফিরে পেল।
বুড়াের সামথ্য তেমন না থাকলেও মাকান-এর জন্য খুবই ভাবিত। তবে হ্যা, এর জন্য তাকে কারাে কাছে হাত পাততে হয় নি। সে হামামে জল জোগান দিয়ে রােজ পাঁচ দিরহাম করে কামায়। চার দিরহাম করে বুড়াে-বুড়ির খাবার দাবারের জন্য ব্যয় করে। আর রােজ এক দিরহাম করে বিপদ আপদের জন্য জমায়। তা দিয়েই মাকান-এর ইলাজ করিয়ে সুস্থ করে তুলল।
( চলবে )

0 Comments