গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
সারকানকে কথাটি শেষ করতে না দিয়েই ইরবিজা বলতে শুরু করে – “তােমরা যা কিছু শুনেছ, সবই এক পক্ষের মতামতই শুনেছ। আসল ব্যাপারটির ধারে কাছ দিয়েও যাওনি। এবার আসল ঘটনাটি আমার মুখে শােন, তবেই তােমার দ্বিধাদ্বন্দ্ব কেটে যাবে। সবকিছু খােলসা হয়ে যাবে। আমরা প্রতি বছর বড়দিনের উৎসব এখানে, এ-দুর্গ-প্রাসাদে পালন করি। সাত-সাতটি দিন বিভিন্ন আনন্দ অনুষ্ঠানের মধ্যে কাটে। এ বছর সম্রাট আফ্রিদুন নিমন্ত্রিত হয়ে সপরিবারে বড়দিনের উৎসবে যােগদান করতে আসেন। দেশে ফিরে যাবার সময় তার কন্যা সােফিয়া'কে আমার পিতার হাতে তুলে দিয়ে যান। সে যে এখন তােমার পিতার প্রধানা রক্ষিতা হয়ে বাগদাদে অবস্থান করছে, আশাকরি তােমাকে বলে দিতে হবে না। সম্প্রতি সে একটি সন্তানের জননী। আমার পিতা বন্ধুত্বের খাতিরে সােফিয়াসহ পাঁচটি রূপসী গ্রীক কুমারীকেও পাঠান।
এদিকে খেল অন্য দিকে মােড় নেয়। সম্রাট আফ্রিদুন ধরে নিলেন, তাকে অপমান করার জন্যই আমার পিতা তার পাঠানাে ভেট তােমার পিতার হাতে অর্পণ করেছেন। ব্যস, গরম তেলে জলের ছিটা পড়ল। রাগে গ গ করতে করতে আমার পিতাকে তিনি পত্রাঘাত করে বসলেন। তার পত্রের মূলবক্তব্য, তার প্রেরিত ভেট সফিয়া এখন বাগদাদের সম্রাট উমর অল-নুমান-এর প্রাসাদে সামান্য রক্ষিতা হিসেবে দিন যাপন করছে। এটি তাকে অপমান করার একটি কৌশল ছাড়া কিছু নয়। সব শেষে কড়া ভাষায় শাসাতেও ছাড়লেন না।
পত্র পাঠ করে তাে আমার পিতা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ার জোগাড় হলেন। সম্রাট আফ্রিদুন-এর ভয়ে নয়, নিজের কৃতকর্মের জন্য লজ্জা-শরমের জন্য। কিন্তু সােফিয়া'কে ফেরৎ নিয়ে আসাও সম্ভব নয়। কারণ সে যে ইতিমধ্যে সম্রাট উমর-অল-নুমান-এর কন্যার জননী হয়ে গেছে। আমার পিতা তার কাছে এরকম বক্তব্য উল্লেখ করে অনুশােচনা-পত্র পাঠালেন।
কাটা-ঘায়ে নুনের ছিটা পড়ল। পত্র পেয়ে আফ্রিদুন ব্যাপারটিকে অনিচ্ছাকৃত বলে মনে করতে পারলেন না কিছুতেই। গুলিখাওয়া শেরের মত ক্ষেপে গেলেন। তিনি যুক্তি দেখাতে লাগলেন, তার মেয়ে মুসলমানের হারেমে আশ্রয় লাভ করে জঘন্য জীবন যাপন করছে। এবার আফ্রিদুন-এর মাথায় দুষ্টবুদ্ধি ভর করে। শত্রু দিয়ে শত্রুকে ঘায়েল করতে হবে। তাই বহুমূল্য উপহার সামগ্রী তিনি তােমার পিতার কাছে পাঠালেন। আর মনগড়া কিসসা বলে তার মনজয় করতে প্রয়াসী হলেন। সােনাদানা হীরা-জহরত এবং অলৌকিক গুণ সম্পন্ন পাথর প্রভৃতির মুখরােচক কিসসা ফেঁদে তােমার পিতার মন জয় করল। তার প্রতিদান স্বরূপ তােমার পিতা তােমাকে দশ হাজার সৈন্য দিয়ে পাঠালেন তার পক্ষ হয়ে আমার পিতাকে শায়েস্তা করার জন্য। তুমি একটু আগে তিন গ্ৰহরত্নের কথা বলছিলে, মনে আছে? আসলে কিন্ত সেগুলাে তার কন্যা সােফিয়ার কাছেই ছিল। গ্রীসে গিয়ে সে সেগুলাে আমার পিতার হাতে গচ্ছিত রাখে। তারপর আমি কৌশলে অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন সে পাথর তিনটি হাতিয়ে নিয়েছি। সুযােগমত তােমাকে দেখাব।
এবার চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজকুমারী ইরবিজা বলল—“হে বীর সারকান, আমার অনুরােধ, তুমি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন কর।'
—“ইরবিজা, আমার চোখে এতদিন ঠুলি পরানাে ছিল। এক ঝটকায় আজ তুমি তা খুলে দিলে। আমি আজই স্বদেশাভিমুখে যাত্রা করব। যদি আপত্তি না থাকে তবে তুমিও আমার সঙ্গে চল।
—“তাই হবে। তুমি তাবু গুটিয়ে সৈন্যদের যাত্রার জন্য তৈরী কর। আমি অচিরেই তােমার সঙ্গে মিলিত হ'ব। তারপর এক সঙ্গে বাগদাদের পথে যাত্রা করব।'
উভয়ে চোখের জলে বুক ভাসায়। সারকান ইরবিজা-র কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিষণ্ণ মুখে ঘোড়ার পিঠে চাপল।
সারকান কিছুদূর যেতে না যেতেই এক অবিশ্বাস্য ঘটনার মুখােমুখি হয়। দেখে, তিনজন যুবক ঘােড়া হাঁকিয়ে তার দিকে আসছে। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার ভুল ভেঙে যায়। দেখল, তার উজির দানদান এবং দু’জন আমীর। তার খােজেই তারা তিনদিন ধরে ঘােড়া নিয়ে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে।
সারকান কোনরকম ভূমিকার অবতারণা না করেই উজির দানদান’কে সম্রাট আফ্রিদুন-এর কুমতলবের কথা খুলে বলল ।
তারা দ্রুত ঘােড়া ছুটিয়ে ছাউনিতে পৌছল। সারকান-এর অনুরােধে উজির সৈন্য সামন্ত নিয়ে বাগদাদের পথে যাত্রা করলেন। আর সারকান একা রয়ে গেল। তিনদিন পরে ইরবিজা আসার কথা। তাকে নিয়ে সে ঘােড়া হাঁকিয়ে সৈন্যদের ধরে ফেলতে পারবে দানদানকে সে বলেছিল। তবে সে কেবলমাত্র একশ’জন সেনাপতিকে নিজের সঙ্গে রেখে দিল।
উজির সৈন্যদের নিয়ে যাত্রা করার কিছু পরেই একশ’ জন ঘােড়সওয়ার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সারকান-এর সামনে এসে দাঁড়াল। সে কিছুমাত্র আতঙ্কিত না হয়ে তার দলের সেনাপতিদের নির্দেশ দিল শয়তানগুলােকে শায়েস্তা করার জন্য। চোখের পলকে উভয় পক্ষের ঘােরতর যুদ্ধ বেঁধে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্ধ্যার
অন্ধকার নেমে আসে। প্রতিপক্ষের সৈন্যরা বেগতিক দেখে অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে কোনরকমে পিতৃদত্ত জান নিয়ে পালিয়ে বাঁচে।
ব্যর্থ মনােরথ খ্রীস্টান সৈন্যরা ফিরে গিয়ে তাদের সেনাপতির কাছে নিজেদের অক্ষমতার কথা জানায়। সেনাপতি ফিকির খুঁজতে থাকে, কিভাবে সারকানকে একটু কড়কে দেওয়া যায়। সারকান-এর সেনাপতিরা ঘােড়ার পিঠে চেপে পাহাড়ের ধার ঘেঁষে শত্রুসৈন্যদের খোঁজ করে চলেছে। তাদের মধ্যে একজন দলছাড়া হয়ে যায়। ব্যস, আচমকা একটি দড়ির ফাঁস এসে তার গলায় আটকে যায়। দড়ির এক প্রান্ত এক শত্রুসৈন্যের হাতে। সে দড়ির মাথা ধরে টানতে টানতে তাকে একটি গুহার মধ্যে নিয়ে যায়। আকস্মিক ঘটনাটি সারকান’কে ভাবিয়ে তুলল। সে একের পর এক সেনাপতিকে পাঠাল তার হদিস নিয়ে আসতে। কেউ আর ফিরল না। এ ভাবে কুড়িজন সেনাপতি বেপাত্তা হয়ে গেল। দুর্ধর্ষ সব যােদ্ধারা তার হদিস না আনতে পারায় সারকান অস্থির হয়ে পড়ল।
এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। আর সেখানে থাকা নিরাপদ নয় আশঙ্কায় সারকান ফিরে আসতে বাধ্য হয়। ক্রোধােন্মত্ত সারকান মনস্থ করে, সকাল হলে সে নিজেই যাবে ব্যাপারটি সম্বন্ধে যা হােক একটি হিল্লে করার জন্য। প্রয়ােজনে লড়াই করবে। পরীক্ষা করে দেখবে, তার কবজিতে কত শক্তি ধরে।
সকাল হ’ল। সারকান একটিমাত্র অসি সম্বল করে পাহাড়ের ওপর উঠে গেল। এক উপত্যকার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই তার চোখে পড়ল জনা পঞ্চাশেক ঘােড়সওয়ার তীরবেগে তার দিকে ধেয়ে আসছে। সবাই সশস্ত্র। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে তারা তার কাছে পৌছে গেল। সারকান ক্রোধােন্মত্ত শের-এর মত অসি নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। প্রথমে তাদের দলের সেনাপতির সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হ’ল। কিন্তু কেউ কাউকে ঘায়েল করতে সক্ষম হ’ল না । সারাদিন চলল উভয় পক্ষের অস্ত্রের ঝনঝনানি। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এলে উভয়কে রণেভঙ্গ দিতেই হ’ল।
সকাল হতেই আবার শুরু হ’ল তুমুল লড়াই। একবার সারকান আশার আলাে দেখতে পায়। পরমুহুর্তেই আবার পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়। খ্রীস্টান সেনাপতির অগ্রগতি লক্ষিত হয়। কিছুক্ষণ পরে আবার সারকান ও চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কিন্তু কেউ কাউকে পরাস্ত করতে পারছে না। এক সময় অস্ত্র চালাতে চালাতে খ্রীস্টান সেনাপতি, ঘােড়ার পিঠ থেকে হড়কে নিচে পড়ে যায়। সারকান তার হাতের তরবারিটি মাথার ওপর তুলে, শরীরের সর্বশক্তি নিয়ােগ করে তাকে যেই কোপ বসাতে যাবে অমনি নারীকণ্ঠে উচ্চারিত হয় –“থামাে খুব হয়েছে। তুমি না বিশ্ববিজেতা দুর্ধর্ষ বীর উমর অল-নুমান-এর পুত্র বীরযােদ্ধা সারকান? আর তুমিই কিনা একটি অসহায় নিরস্ত্র নারীর ওপর বীরত্ব প্রদর্শন করতে বদ্ধপরিকর হলে? লজ্জা শরম বলতে তােমার কিছুই নেই দেখছি।
-“আরে ইরবিজা, তুমি দু'দিন ধরে আমার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে গেলে, আর আমি কিনা তােমাকে চিনতেই পারলাম না!'
ইরবিজা সরবে হেসে জবাব দিল –‘তােমাকে পরীক্ষা করার জন্যই আমাকে এ পথ অবলম্বন করতে হয়েছে প্রিয়তম। যাকে নিয়ে সারাটা জীবন কাটাব, একটু-আধটু যাচাই করে নেব না?” এবার অন্যান্যদের দিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করে বলল—এই যে এদের দেখছ, কেউ-ই কিন্তু পুরুষ নয়, নারী। তােমার বিশজন সেনাপতিকে এরাই বন্দী করে আমার কাছে জমা দিয়েছে। তারা ভালই আছে।
সারকান এক লাফে ঘােড়া থেকে নেমে তার মেহবুবা ইরবিজা’কে আলিঙ্গন করল। চুম্বনের মাধ্যমে তার বীরত্বের পুরস্কার দিল। আর বলল বীরাঙ্গনা নারী আমি জীবনে বহুত দেখেছি বটে কিন্তু তুমি সত্যি অনন্যা।
এবার তারা সৈন্য সামন্ত নিয়ে বাগদাদের পথে যাত্রা করল। এমন সময় ভাের হয়ে আসছে দেখে বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করল।
একান্নতম রজনী
বাদশাহ শারিয়ার মাঝ রাত্রে অন্দর মহলে বেগম শাহরাজাদ -এর কক্ষে এলেন।
বেগম শাহরাজাদ তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-জাহাপনা, কিছুদুর গিয়ে সারকান তার এক সেনাপতিকে বলল—“তুমি তীরবেগে ঘােড়া ছুটিয়ে বাগদাদে গিয়ে আমার আব্বাজানকে বল যে, আমি অত্যল্পকালের মধ্যেই বাগদাদে পৌছে যাচ্ছি।
কুড়িদিন নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘােড়া ছুটিয়ে সারকান ইরবিজা ও অন্যন্যাদের নিয়ে বাগদাদে তাদের প্রাসাদে পৌঁছল।
সারকান দরবারে উপস্থিত হয়ে তার আব্বা বাদশাহ উমর অল-নুমান’কে কুর্ণিশ জানিয়ে ইরবিজার উপস্থিতির কথা ব্যক্ত করল। সে সঙ্গে ইরবিজা-র মুখ থেকে শােনা বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা সংক্ষেপে বলে। সম্রাট হারবুদ -এর কন্যা ইরবিজা। সে-ই সারকান’কে পাষণ্ড আফ্রিদুন -এর কবল থেকে রক্ষা করেছে, কথাটিও বলতে সে ভুলল না।
আর ইরবিজা সর্বগুণে গুণান্বিতা। এমন কি যুদ্ধবিদ্যায়ও বিশেষ পারদর্শিনী। তামাম আরব দুনিয়াতে এমন কোন বীরযােদ্ধা নেই যে অসিযুদ্ধে ইরবিজাকে পরাস্ত করতে পারে। আর এ-ও বলে যে, সে-ই তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে ফিরিয়ে এনেছে।
লেড়কার মুখে ইরবিজার ভূয়সী প্রশংসা শুনে সম্রাট উমর অল-নুমান-এর অন্তরের অন্তঃস্থলের হিংস্র পশুটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সারকান তার আব্বার পাশবিক প্রবৃত্তির কথা অনুমানও করতে পারে না। সে আব্বার অত্যুগ্র আগ্রহে ইরবিজা’কে প্রাসাদ থেকে নিয়ে এসে দরবারে তার আব্বার সামনে হাজির করল। খ্রীস্টান ইরবিজা অনভ্যস্থ হাতে বাদশাহকে কুর্নিশ করে শ্রদ্ধাপ্রদর্শন করে মাথানিচু করে অদূরে দাঁড়িয়ে রইল। বাদশাহ উমর অল নুমান ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললেন—‘সুন্দরী, তােমার রূপ গুণে আমি মুগ্ধ।
পিতৃতুল্য বাদশাহের মুখে সুন্দরী’ শব্দটি শুনে ইরবিজা স্তম্ভিত হয়ে যায়। সবিনয়ে নিবেদন করে জাহাপনা, কিছু মনে করবেন। আপনি আমার পিতৃতুল্য, আপনার মুখে সুন্দরী’ শব্দটি আমার কাছে কেমন যেন অসঙ্গত বলেই মনে হয়।
শয়তানের মত ঠোট টিপে টিপে হেসে বাদশাহ বললেন —এর মধ্যে তুমি যে আবার অসঙ্গত কি দেখছ, বুঝছিনা আম্মা, বহিন, বেটি সবই তাে একই লেড়কি। একের সঙ্গে অন্যের ফারাক কি আছে? যাক গে, তােমার সঙ্গে আমার সম্পর্কের ব্যাপার স্যাপারের কথা পরেই না হয় আলােচনা করা যাবে। আমার বেটা সারকানকে তুমি নাকি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছ। তার জন্য কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করলে তােমার ওপর বেইমানিই করা হবে। আর একটি কথা, সে অলৌকিক গুণ সম্পন্ন পাথর তিনটি নাকি তােমার হেফাজতেই রয়েছে? আমি একবারটি চোখে দেখতে চাচ্ছি। অবশ্য যদি তাকে কথাটি শেষ করতে না দিয়েই ইরবিজা বল্ল-জাহাপনা, আপনি দেখবেন, এতে আর আপত্তির কি আছে? বাদশাহের অনুমতি নিয়ে সে দরবার কক্ষ ত্যাগ করল।
ইরবিজা এবার একটি রূপাের ছােট্ট বাক্স নিয়ে ব্যস্ত-পায়ে দরবারে, বাদশাহের কাছে হাজির হয়। বাক্সটি খুলে অলৌকিক গুণসম্পন্ন গ্রহরত্ন তিনটি বের করতে করতে বাদশাহকে বলল —‘জাহাপনা, সত্যি বলতে কি, আপনাকে উপহার দেবার জন্যই আমি গ্রহরত্ন তিনটিকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। এবার তিনটি অত্যুজ্জ্বল পাথর বাদশাহের হাতে তুলে দিল। গ্রহরত্ন তিনটির দিকে চোখ পড়তেই বাদশাহ উমর অলনুমান-এর দিল নেচে ওঠে। চোখ দুটো জ্বল জ্বল করতে থাকে জিন্দেগীতে হীরে-জহরৎ, মণি-মাণিক্য বহুতই দেখেছেন বটে কিন্তু এমন অভাবনীয় দ্যুতিযুক্ত পাথর কোনদিনই চোখে দেখেন নি।
এদিকে পাথর তিনটি ফিরিয়ে দেওয়ার অজুহাতে তিনি ইরবিজার ডান-হাতটি চেপে ধরেন। মুহুর্তে চোখে-মুখে ফুটে ওঠে আদিম হিংস্র পাশবিকতার সুস্পষ্ট ছাপ। ইরবিজা বাদশাহের আচরণে যারপরনাই স্তম্ভিত হয়। সে ঝট করে নিজের হাতটি নরাধম বাদশাহের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। বাদশাহ পরিস্থিতিটি সামাল দিতে গিয়ে বলল—তােমার থাকার জন্য অন্দরমহলের একটি ঘর সাজিয়ে দিতে বলেছি। আশা করি ইতিমধ্যে খােজা ভৃত্যরা সেটিকে তােমার ব্যবহারােপযােগী করে তুলতে পেরেছে।
ইরবিজা এবার বাদশাহের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তার জন্য নির্ধারিত ঘরে চলে গেল।
বাদশাহ এবার লেড়কা সারকান -এর হাতে একটি পাথর দিয়ে বললেন-“বেটা, এ পাথরটি তােমার কাছে রেখে দাও। একটি তােমাকে দিলাম। একটি তােমার বহিন নুজাৎ'কে আর একটি তােমার ছােট ভাইয়া দু’-অল-মাকান-এর জন্য রেখে দেব।'
‘আমার ছােট ভাইয়া? দু’-অল-মাকান?’
–‘অবাক হচ্ছ নাকি? তুমি কি শােন নি, নুজাত-এর সহােদর এক ভাইয়া পয়দা হয়েছে? ও হ্যা, তুমি তাে নুজাত-এর জন্মের পর থেকেই যুদ্ধ বিগ্রহ নিয়ে বাইরে-বাইরে কাটিয়েছ, জানবেই বা কি করে। লেড়কার মুখের দিকে মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে নিয়ে বাদশাহ এবার হেসে বললেন—'বেটা, এর জন্য তােমার মন খারাপের তাে কিছু নেই, আমি তাে ফরমান জারি করেই রেখেছি, আমি বেহেস্তে গেলে তুমিই হবে মসনদের দাবীদার।
চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সারকান অনুচ্চকণ্ঠে উচ্চারণ করল --খােদাতাল্লা তাদের সুখ-শান্তিতে রাখুন। বাদশাহকে কুর্নিশ জানিয়ে সারকান তার কাছ থেকে বিদায় নিলেন।
সারকান বিষমুখে উদ্ভূত নতুনতর সমস্যাটির কথা ভাবতে ভাবতে ইরবিজা-র কামরায় হাজির হয়। তার কাছে ব্যাপারটি ব্যক্ত করে।।
মুহূর্তকাল নীরবে কাটিয়ে সারকান এবার বল্ল—“আরও বড় দুঃসংবাদ আছে মেহবুবা। আমার কাছে আজ যা অমূল্য সম্পদ বলে বিবেচিত হয় সে তােমাকেও হয়ত একদিন আমি খুইয়ে বসব। আমার নসীবই আজ চরম বিশ্বাসঘাতকতা করছে। আমার আব্বাজীর লালসা মাখানাে নজর পড়েছে তােমার দিকে। তােমার রূপ-সৌন্দর্য আর তােমার যৌবনের ঢেউলাগা শরীরের দিকে। শকুনের নজর যখন একবার পড়েছে তখন আর নিষ্কৃতি পাওয়া সম্ভব নয়।
সারকান-এর কথা শুনে ইরবিজা চমকে ওঠে। এবার সে মুখ খুলল —তবে দেখছি, আমার আশঙ্কা মিথ্যা নয়। আমিও লক্ষ্য করেছিলাম, তার লালসা মাখানাে দৃষ্টি। কিন্তু তুমি এ-ও শুনে রাখ, আমি সম্রাট হারদুব-এর কন্যা। আমি জীবিত থাকতে তিনি লালসা পরিপূর্ণ করার জন্য আমাকে স্পর্শও করতে পারবেন না। যেকোন পরিস্থিতির মােকাবিলা করে আত্মরক্ষা করার মত হিম্মৎ আমার অবশ্যই রয়েছে। আমি ভেবে পাচ্ছিনা, তার হারেম তাে নারীর গােয়াল। তবে আবার এ বয়সে সে আমার দিকে –
তার, মুখের কথা শেষ হবার আগেই সারকান বলে উঠল-মেহবুবা, একে বলে নেশা। নারী সম্ভোগের নেশা আমার আব্বার খুনের সঙ্গে মিশে রয়েছে, থাকবেও আমৃত্যু। শােন, আমি ক'দিনের জন্য জরুরী কাজে বাগদাদের বাইরে যাচ্ছি। ফিরে এসে আমরা আবার মিলিত হব।
সারকান বিদায় নিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ বাদেই বাদশাহ শিকারী বিড়ালের মত পা টিপে টিপে তার পেয়ারের রক্ষিতা সােফিয়ার কামরায় প্রবেশ করেন। কোনরকম ভূমিকা না করেই সরাসরি প্রশ্ন করেন—“তুমি যে কনতাতিনােপলের সম্রাট আফ্রিদুন-এর লেড়কি একথা আমার কাছে গােপন রেখেছিলে কেন? সম্রাটের কন্যাকে রক্ষিতা করে রেখে আমি সম্রাটকে অবমাননাই করেছি। জানলে যােগ্য সম্মান অবশ্যই দিতাম। -“জাহাপনা, আপনার খাস বেগম যে ইজ্জত পায় তার চেয়ে কম ইজ্জত নিয়ে তাে আমি আপনার কাছে নেই। আপনি মেহেরবানি করে আমার গর্ভে দু'দুটো সন্তান দিয়েছেন, এ কী কম গৌরবের?
বাদশাহ উমর এবার অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন গ্রহরত্ন দুটো সােফিয়ার হাতে তুলে দিয়ে বললেন—এ দুটো নুজাৎ আর মাকান-এর গলায় পরিয়ে দাও।
পাথর দুটো হাতে নিয়েই চমকে উঠে বলে—এ পাথর দুটো সর্বরােগ হরণ করার ক্ষমতা রাখে। আমার আব্বা আমাকে যৌতুকস্বরূপ এ-পাথর তিনটি দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি, জাঁহাপনার হাতে এগুলাে কি করে এল! সম্রাট হারদুব কি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সর্বস্ব খুইয়েছেন?
‘সম্রাট হারদুব-এর লেড়কি এখন আমার হারেমে বাস করছে। তারই কাছ থেকে উপহারস্বরূপ এগুলাে পেয়েছি।'
—“আপনি কি তাকে শাদী করে বেগম করে নেবেন, মনস্থ করেছেন?
—সে রকম পাকাপাকি কিছু মনস্থ করিনি এখনও। প্রস্তাবও দেইনি। প্রস্তাব দিলে প্রত্যাখ্যান করাও কিছুমাত্র বিচিত্র নয়। তবে অস্বীকার করব না সােফিয়া, তার সুরৎ একটিবার মাত্র দেখেই আমি পাগল হয়ে যাবার জোগাড় হয়েছি। এ রকম সুরৎ আর যৌবনের সহাবস্থান এর আগে আর আমার নজরে পড়ে নি। সত্যি বলতে কি, বেহেস্তের হুরী পরীদের তৈরি করে অবশিষ্ট সুরটুকু এনে যেন তার গায়ে কোন নিপুণ শিল্পী লেপে দিয়েছে। এমন উন্নত বক্ষ খুব কম লেড়কিরই দেখা যায়। আর চলার সময় নিতম্ব দুটো যেভাবে দোলা খায় এক নজর দেখলেই কলিজাটি যেন দরকচা মেরে যায়। এমন কোন মরদ নেই যে নিজেকে সংযত রাখতে পারে!’ চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবার বললেন--জানি না, ইরবিজার সুরৎ আর যৌবন ভােগ করা আমার নসীবে আছে কি না। সােফিয়া চোখের তারায় প্রতিহিংসার আগুন জ্বেলে নির্নিমেষ চোখে বাদশাহের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাদশাহ এবার অধিকতর মােলায়েম স্বরে বললেন –‘সােফিয়া, যদিও ব্যাপারটি নিয়ে আমার অনেক আগেই চিন্তা ভাবনা করা উচিত ছিল। সে যা হবার হয়ে গেছে। এবার কি বলছি শােন—আমার মহব্বতের নিদর্শন স্বরূপ তােমার বসবাসের জন্য নয়া একটি মহল বানিয়েছি। রক্ষিতাদের সঙ্গে তােমাকে থাকতে দিয়ে আমি খুবই কসুর করে ফেলেছি। নয়া মহলটিতে তুমি আমার বিবির মর্যাদা নিয়ে নুজাৎ আর মাকানসহ বাস করবে। আর তােমার খরচ খরচা বাবদ দশহাজার দিনার মাসােহারা মঞ্জুর করেছি।
আনন্দে আত্মহারা হয়ে সােফিয়া সােহাগে-আহ্লাদে বলে ওঠে ‘বাদশাহ পেয়ার মহব্বতের মর্যাদা স্বরূপ আমাকে যা কিছু দেবেন আমি নির্দ্বিধায় মাথা পেতে নেব। আজ আমার রূপযৌবনের পূর্ণ মর্যাদা পেলাম।
বাদশাহের কথায় সােফিয়া দুরভিসন্ধির গন্ধও পেল না।
আসলে বাদশাহ চাইছেন, যেন তেন প্রকারেন সােফিয়াকে অন্যত্র চালান করে দেওয়া। রূপসী যুবতী ইরবিজা’কে নিয়ে যে খেলায় মাততে চলেছেন তা যেন সােফিয়া ঘুণাক্ষরেও জানতে না পারে। _ বাদশাহ উমর প্রতিদিন সন্ধ্যার অন্ধকার হতে না হতেই ইরবিজার কামরায় উপস্থিত হন। তার মন গলাবার জন্য নানারকম প্রলােভন দেখাতে থাকেন। ইরবিজা কিন্তু তাকে মােটেই আমল দেয় না। সে মুখের ওপরই বলে বসে—জাহাপনা, আপনার রক্ষিতা বা বেগম কোন কিছু হবার আকর্ষণই আমার নেই। আর এরকম কোন আশার বশবর্তী হয়েও আমি নিজের দেশ ছেড়ে আসি নি। আপনার ছেলের বান্ধবী হয়ে থাকতে এসেছি। আপনি যদি আপত্তি করেন তবে আমি আমার পিতার কাছেই ফিরে যাব।
কামনার জ্বলন্ত আগুন বুকে নিয়ে আশাহত বাদশা অন্দর মহল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। কামনার জ্বালায় দগ্ধ হতে হতে বাদশাহ একদিন নিতান্ত অনন্যোপায় হয়েই বৃদ্ধ উজির দানদান’কে বলেন—“শুনুন, ইরবিজার যৌবনভরা দেহটি আমার কলিজাটিকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিয়েছে। তার দেহসুধা দিল ভরে পান করতে না পারা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। এভাবে আর কিছুদিন চললে আমি যে পাগল হয়ে যাব উজির।
‘জাঁহাপনা, এত অধৈর্য হলে চলবে কেন ? ধৈর্য ধরুন। সবুরে মোয়া ফলে, জানেন তাে? আপনাকে একটি ফন্দি শিখিয়ে দিচ্ছি। এবার যখন ইরবিজার ঘরে যাবেন তখন কিছু ঘুমের দাওয়াই সঙ্গে নিতে ভুলবেন না। সরাবের সঙ্গে খাইয়ে দেবেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখবেন ঘুমে একেবারে অচৈতন্য হয়ে পড়বে। এই মােকায় আপনি কাজ হাসিল করে নেবেন। তার ইজ্জৎ নষ্ট করবেন। সম্পূর্ণ চেতন হলে তখন সে বুঝবে জনানাদের অমূল্য সম্পদ কুমারীত্ব তার হরণ করা হয়েছে। গােড়ার দিকে অবশ্য আপনার ওপর ক্ষেপে একেবারে কাই হয়ে যাবে। কিন্তু অচিরেই স্বাভাবিকতা ফিরে পাবে। তখন আপনার দিকে একটু একটু করে ঝুঁকতে থাকবে। বৃদ্ধ উজির দান্দান-এর পরামর্শ মত শেরওয়ানীর জেবে কিছু ঘুমের দাওয়াই নিয়ে বাদশাহ গুটিগুটি ইরবিজার কামরায় এলেন, বিষন্ন মুখে বললেন—ইররিজা, আমি ক’দিনের জন্য বাগদাদের বাইরে চলে যাচ্ছি। জরুরী কিছু কাজ পড়েছে। তাই আমার ইচ্ছা, তােমার সঙ্গে অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশী সময় অবস্থান করি। আর একটু খানাপিনার আয়ােজন করতে পারলে ভাল হয়। আর কিছু না হােক, ভাল সরাব একটু হলেই চলে যাবে।
ইরবিজা সরাব নিয়ে এসে সােনার পেয়ালায় কিছুটা ঢেলে দিল। সে নিজে খেতে অনাগ্রহী। বাদশাহের অনুরােধে শেষে সে রাজী হয়। পর পর তিন পেয়ালা খেয়ে নিল। এবার বাদশাহ শেরওয়ানীর জেব থেকে ঘুমের দাওয়াইয়ের পুরিয়াটি বের করে ইরবিজার চোখের আড়ালে সরাবের পেয়ালায় দিল ঢেলে। ইরবিজা জানতেও পারল না কোথা দিয়ে কি ঘটে গেল।
ইরবিজা এবার সরাব পান করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। বাদশাহের অনুরােধেও না। তখন বাদশাহ বললেন—“ঠিক আছে, তুমি সামান্য খাও। তারপর পেয়ালার অবশিষ্ট সরাব না হয় আমিই খাচ্ছি। ইরবিজা বাদশাহের অনুরােধ শেষ পর্যন্ত এড়াতে পারল না। পেয়ালা থেকে সামান্য একটু সরাব পান করে সরাব সমেত পেয়ালাটি বাদশাহের হাতে তুলে দিল। ইরবিজা ওষুধ মেশানাে সরাব খুব সামান্যই পান করেছিল। বাদশাহ দেখলেন, মহাসমস্যা। কিছুতেই যে তাকে বাগে ফেলা যাচ্ছে না। ঘুমের ওষুধের পুরিয়া শেরওয়ানীর জেবে আরও একটি আছে বটে। কিন্তু সেটিকে কোন্ কৌশলে কাজে লাগানাে যেতে পারে বাদশাহ ভাবতে লাগলেন। ইরবিজা টেবিল থেকে খাবার থালিটি নিয়ে এসে বাদশাহের সামনে রাখল। এবার পানির পাত্রটি আনার জন্য টেবিলের দিকে পা বাড়াতেই বাদশাহ শেরওয়ানীর জেব থেকে বের করে হাতে রাখা ঘুমের ওষুধটুকু এক টুকরাে গােস্তের গায়ে মাখিয়ে দিল। ইরবিজা পানির পাত্র নিয়ে ফিরে এল। বাদশাহ বললেন-“তুমি আগে এক টুকরাে না খেলে আমি কি করে খাই বল তাে?' কথা বলতে বলতে দাওয়াই মাখানাে গােস্তের টুকরােটি তার মুখের সামনে ধরলেন। সে আপত্তি করলেও বাদশাহের অনুরােধের কাছে তা নস্যাৎ হয়ে গেল।
এবার ঘুমের দাওয়াই কাজ শুরু করে দিল, ইরবিজার মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল। আর বসে থাকতে পারল না। পালঙ্কের ওপর এলিয়ে পড়ল। বাদশাহ এবার তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ বাদে বাদশাহ উমর ইরবিজার কামরা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। সরাবের নেশায় টলতে টলতে চুপি চুপি নিজের কামরায় গিয়ে পােশাক পরিহিত অবস্থাতেই খাটের ওপর শুয়ে পড়লেন। ব্যস, তারপরই নেশার ঘােরে এলিয়ে পড়লেন।
কিছুক্ষণ বাদে বৃদ্ধা ক্রীতদাসী ইরবিজার ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। চোখের সামনে এমন কোন বীভৎস দৃশ্য দেখবে সে কল্পনাও করতে পারে নি। সে দেখল, ইরবিজা মরার মত এলিয়ে পড়ে রয়েছে। শয্যা এলােমেলাে। মখমলের চাদরটির কিছু অংশ পালঙ্ক থেকে ঝুলে পড়েছে। ইরবিজা বিবস্ত্রা। একেবারেই বিবস্ত্রা। মাথার চুল এলােমেলাে। নিচের ঠোটটিতে দাঁতের দাগ।
( চলবে )

0 Comments