আরব্য রজনী পার্ট ৩৭ ( Part 37 ) alif laila

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
সারকান পালঙ্কের ওপর কাৎ হয়ে শুয়ে তার সৈন্য সামন্তের কথা ভাবল। অজানা অচেনা জায়গা। পরদেশ! রাত্রির অন্ধকারে যদি শত্রু সৈন্য তাদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে তবেই কেলেঙ্কারীর চুড়ান্ত হয়ে যাবে। তার আব্বা বার বার সতর্ক করে দিয়েছিলেন, সৈন্যদের ফেলে কোথাও যেন না যায়। কিন্তু সে তাে তাদের অন্ধকার প্রান্তরে ফেলে নিজে বিলাসব্যসনে ডুবে রয়েছে।

সারকান অস্থির হয়ে ওঠে। একে সৈন্যদের চিন্তা তার ওপর লেড়কিটির অপ্রত্যাশিত অনুপস্থিতি।
লেড়কিটির কোন পরিচয়ই সারকান জানে না। আর এ বিশালায়তন প্রাসাদটি কি কোন বাদশাহ বা সুলতানের, নাকি কোন ধনী সওদাগরের কিছুই তার জানা নেই। এমন কত সব টুকরাে টুকরাে চিন্তা-ভাবনার মধ্যে তলিয়ে গিয়ে এক সময় নিজের অজান্তে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ল।

কাকডাকা সকালে সারকান চোখ মেলে তাকিয়েই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবার জোগাড় হ’ল। দেখে খুবসুরৎ সে-যুবতীটি মূল্যবান ও ঝকঝকে-চকচকে পােশাক ও মণি-মুক্তা খচিত অলঙ্কারাদিতে সজ্জিত হয়ে জনা বিশেক বাঁদী পরিবেষ্টিত হয়ে বসে। তার মন পাগল করা রূপে সে মুগ্ধ। দুনিয়ার সবকিছু তার মন থেকে মুছে গেল। মুছে গেল যুদ্ধের কথা, অপেক্ষমান সৈন্যদের কথা আর পিতার উপদেশ সমূহ। রূপসী যুবতীটির রূপের সায়রে সে একেবারে হাবুডুবু খেতে লাগল। নিতম্ব নাচিয়ে, বক্ষ দুলিয়ে অপরূপ ভঙ্গিতে সে-অপরূপা উঠে এল। দু’পা এগিয়ে সে তার মনমােহিনী রূপের ডালি সারকানের সামনে মেলে ধরে দাঁড়াল। ঠোট টিপে টিপে হাসল। তারপর এক সময় চোখের বাণ মারল তাকে লক্ষ্য করে। সারকান তাে আবেগে উচ্ছাসে একেবারে গলে যাওয়ার জোগাড় হল। মিষ্টি-মধুর স্বরে এবার সে বল্ল- কি গাে ভাল মানুষ, তােমার ব্যাপার স্যাপার তাে তেমন সুবিধের মনে হচ্ছে না।'

সারকান নির্বাক। নিষ্পলক চোখে তার রূপ-সৌন্দর্যটুকু নিঃশেষে নিঙড়ে নেওয়াতে মগ্ন। তার কথা শােনা বা উত্তর দেয়ার মত মানসিকতা সারকানের নেই। সে এবার তার যৌবনের জোয়ারলাগা দেহপল্লবটিকে আলতাে করে দুলিয়ে বলল— “তুমি যে সারকান, ভুলেও আমার কাছে প্রকাশ করলে না তাে! তবে তাে তুমি দুর্ধর্ষবীর ও প্রবল প্রতাপশালী বাদশাহ উমর-অল-নুমান-এর লেড়কা। এমন এক বীরের লেড়কা হয়ে তুমি কি করে নিজের পরিচয় গােপন করতে পারলে, ভেবেই পাচ্ছিনা! 

সারকান বুঝল, হাতে নাতে ধরা পড়ে গেছে। আর পরিচয় গােপন করতে গেলে তা হবে নিছকই ব্যর্থ প্রয়াস। এতে মুনাফা তো কিছুই হবে না বরং আখেরে লােকসানের বােঝাই বইতে হবে।

-রূপসী, তােমার অনুমান অভ্রান্ত। আমি আর কিছুই বলতে চাই না। সে মুখও আমার নেই। তােমার দিল যা চায় সে-সাজাই তুমি দিতে পার।

–‘সারকান, এনিয়ে তােমার ঘাবড়াবার কিছু নেই, আমার দ্বারা তােমার কোন অনিষ্টই হবে না। তুমি আমার প্রাসাদে মেহমান। তােমার ক্ষতি বা অমর্যাদা কেউ করতে চাইলেও আমি রুখে দাঁড়াব। তােমার ইজ্জৎ রাখা আমার কর্তব্য বলেই আমি মনে করি। সারকান তার রূপ-সৌন্দর্যে মজে গেলেও তার কথার ওপর পুরােপুরি আস্থা রাখতে পারল না। চোখের তারায় অবিশ্বাসের ছাপ একে ভাবতে লাগল। মুখে সহানুভূতি দেখিয়ে বিষ খাইয়ে যদি জান খতম করে দেয়, তখন?

তাজ্জব ব্যাপার! সারকান-এর চোখের তারায় সে যেন তার দিলটিকে দেখে ফেলল। তসবির যেমন দেখা যায়, ঠিক সেরকম। নইলে সে কি করে বলল-“কেন মিছে ডর করছ? কোনই ডর নেই, বিষটিষ কিছু খাওয়াব না। আমার দিল যদি এরকম কিছু চাইত তবে গত রাত্রেই কাজ হাসিল করে ফেলতে পারতাম। একমাত্র তুমি আমার মেহমান বলেই আমি তা করি নি, ভবিষ্যতেও করব না। একবার তােমাকে যখন খাতির করেছি, আর ডর ভয়ের কিছু নেই।

সাৱকান এর জন্য রক্ষিত খাবারের থালি থেকে একটি লাড্ডু তুলে নিয়ে রূপসী - যুবতীটি নিজের মুখে পুরে চিবােতে লাগল। এক সময় কচি লেড়কির মত খিল খিল করে হেসে বল্ল-- কি গাে, এবার বিশ্বাস হচ্ছে তাে, তােমাকে জহর খাইয়ে খতম করার ধান্দা আমার ছিল না?'

এবার তারা দু'জনে পাশাপাশি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে নাস্তা সারল। লেড়কিটি পেয়ালায় সরাব ঢেলে তার মেহমানকে দিল, নিজেও একটু-আধটু পান করল। ইতি মধ্যেই প্রাসাদের বাইরের বাগিচায় ভােরের পূর্বাভাষ লক্ষিত হয়। বেগম শাহারাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

                       উনপঞ্চাশতম রজনী 

রাত্রির প্রায় দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে এলেন। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাহাপনা, সে-সকালে বাদশাহ উমর অল নুমানএর লেড়কা সারকান আর সে রূপসী যুবতী নাস্তা সারতে সারতে ক্রমে ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। এমন সময় এক বাদী চারটি খুবসুরৎ লেড়কিকে সঙ্গে নিয়ে সে কামরায় এল। তাদের কারাে হাতে বাঁশী, কারাে চিনারা, কারাে বা মিশরের গীটার আর একটি লেড়কির হাতে বীণা ।

রূপসী-যুবতীটি হাত বাড়িয়ে বাঁশীটি নিয়ে মনে দোলা লাগানাে সুর তুলে তন্ময় হয়ে বাজাতে লাগল। অন্যান্যরা নিজনিজ বাদ্যযন্ত্রে মন দিল। সব মিলিয়ে সে যেন এক মনমােহিনী বেহেস্তের পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গেল।

সারকান বিমুগ্ধ চিত্তে সে সঙ্গীত-লহরী শুনতে শুনতে এক সময় তন্ময় হয়ে যায়। পালঙ্কের ওপর শরীর এলিয়ে দিয়ে চোখের পাতা বন্ধ করে পড়ে থাকে।

এক সময় রুপসী-যুবতীটি অন্য এক লেড়কির হাতে বাঁশীটি তুলে দিয়ে কিন্নর কণ্ঠে গান ধরে। সারকান যেন পুলক সায়রে ভাসতে থাকে।

গান শেষ হলে রূপসী-যুবতীটি ঠোট টিপে টিপে হেসে বলে -“কিগাে, ভাল মানুষ, কিছু বুঝলে কি ? কেমন লাগল? আমার গানা কি তােমার দিলে দাগ কাটতে পারল ?

-তােমার গানের ভাষা আমার কাছে একেবারেই অবােধ্য! কিন্তু সুর কিছু কিছু ধরতে পেরেছি। আর কেমন লেগেছে যদি জিজ্ঞাসা কর তবে বলব, তােমার গান আমার দিল কেড়ে নিয়েছে। আমি কখন যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম, নিজেই বলতে পারব না। তােমার কথায় সম্বিত ফিরে পেলাম।

একে সরাবের নেশা তার ওপর গানে-গানে দিল মাতােয়ারা হয়ে সারকান এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল। একেবারে বেহুঁস হয়ে গেল। সারকান সারাদিন পালঙ্কের ওপর অচৈতন্য হয়েই পড়ে রইল। রাত্রিও কাটল গভীর ঘুমের মধ্যেই।

সকাল হ'ল। সারকান চোখ মেলে তাকাল। আড়মােড়া ভেঙে উঠে বসল। তারই সেবায় নিযুক্ত এক বাদীকে জিজ্ঞাসা করল —“কি হে, তােমার মালকিন কোথায় ?

—“তার নিজের কামরায়। আপনার ঘুম ভাঙলে আপনাকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার হুকুম রয়েছে।

সারকান বাঁদীটির সঙ্গে অন্দরমহলে রূপসী-যুবতীটির কামরায় গেল। সে তখন পালঙ্কের ওপর সুন্দর ভঙ্গিতে শুয়ে। মখমলের চাদরটি যেন তার রূপ-সৌন্দর্যকে হাজার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

রূপসী-যুবতীটির নির্দেশে এক বাঁদী সরাবের বােতল আর পেয়ালা এনে তাদের সামনে রাখল। সারকান এক পেয়ালা সরাব যুবতীটির দিকে বাড়িয়ে দিল! আর এক পেয়ালা নিজের ঠোটের কাছে তুলে নিল। যুবতীটি এবার গান ধরল। দিল উজার করে সে একের পর এক গান গাইল।

সারকান তন্ময় হয়ে রূপসী যুবতীটির কিন্নরকণ্ঠের গান শুনতে লাগল। ক্রমে সে যেন গানের সুরের সঙ্গে ভাসতে ভাসতে বহু দূরে, অন্য এক লােকে চলে গেল। সেখানে যেন শুধুই গান আর গান। সারকান-এর চোখের পাতায় সবে একটু তন্দ্রা আয় করল। ঠিক সে-মুহুর্তেই একদল লােকের হুড়ােহুড়ির শব্দে তার তন্দ্রা টুটে গেল। চোখ মেলেই দেখে এক দুর্ধর্ষ সেনাপতি তরবারি হাতে, রােষপূর্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে। সে বিশ্রী স্বরে গর্জে উঠল –‘সারকান, আজ তােমাকে বাগে পেয়েছি।' সারকান সচকিত হয়ে ঝটকরে সােজাভাবে বসে পড়ল। বিস্ময়ের ঘাের কাটিয়ে, জোর করে বুকে সাহস সঞ্চার করে বল—“কে? কে তুমি? কি চাও ?  রূপসী-যুবতীটিকে লক্ষ্য করে দরজায় দণ্ডায়মান সেনাপতি এবার আগের চেয়ে মােলায়েম স্বরে বলল—‘মহামান্যা রাজকুমারী ইরবিজা, এ-আগন্তুক যুবকের পরিচয় কি আপনার জানা আছে? এ হচ্ছে বাগদাদের বাদশাহ উমর অল-নুমান-এর একমাত্র লেড়কা সারকান। প্রবল পরাক্রমশালী যােদ্ধা। নিজের পরিচয় গােপন করে আমাদের আস্তানায় ঢুকে পড়েছে। দুর্গে হানা দিয়েছে। আমাদের গােপন সংবাদ সংগ্রহ করার অভিপ্রায়ে –

রূপসী-যুবতীটি এবার মুখ খুলল—কী সব বাজে কথা বলছ! এ তাে এক পরদেশী, মুসাফির। কোন ষড়যন্ত্র বা গােপন অভিপ্রায় নিয়ে সে এখানে আসে নি। আমি তাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছি। আমার মেহমান।

——“আমার ওপর মিছে গােসসা করবেন না রাজকুমারী। আমরা সংবাদ পেয়েছি, বীরযােদ্ধা সারকান এখানে আত্মগােপন করে রয়েছে। আপনার পিতার নির্দেশে আমি তাকে গ্রেপ্তার করে তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিপ্রায় নিয়ে ছুটে এসেছি।'

–‘চমৎকার! এরকম একটি আজগুবি খবর আমার পিতাকে কে-ই বা দিল!  ‘আমাদের বুড়ি বাঁদী রাজা মশাইকে গােপনে খবরটি পৌঁছে দিয়েছে।

–‘বুঝেছি, সেই ধুমসাে বুড়িটি কাল রাত্রে আমার সঙ্গে কুস্তি লড়তে এসে নাজেহাল হয়েছিল। আর সে রাগের বসেই এরকম এক খবর পৌছে দিয়ে আমার পিতাকে আপনাদেরও বিভ্রান্তির মুখে ঠেলে দেয়।

‘রাজকুমারী কিছু মনে করবেন না, আপনিই বরং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে চাইছেন। আমরা বিভিন্ন প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিন্ত হয়েছি, এ-ই সারকান। আপনি নির্দ্বিধায় একে আমার হাতে তুলে দিয়ে আপনার পিতার ও দেশের মঙ্গল সাধন করুন। জেনে রাখবেন, সারকানকে কবজা করতে পারলে আফ্রিদুন’কে আমরা অনায়াসেই পরাস্ত করতে সক্ষম হব।

ইরবিজা-র চোখে-মুখে জ্বলন্ত ক্রোধের ছাপ ফুটে উঠল। সে বেশ রাগত স্বরেই এবার বলল কে তুমি ? তােমার পরিচয় কি জানতে পারি কি?'

–“মহামান্য রাজকুমারী, আমার নাম মাসুরা। মাউসুরা আমার পিতা। আর তার পিতার নাম কাসিদা। আপনার পিতার পদাতিক বাহিনীর সেনাপতির পদে আমি নিযুক্ত।

-“আমি তােমার কাছে একটিমাত্র কথার জবাব চাই। কার আদেশে তুমি প্রাসাদের অন্দরমহলে, আমার কক্ষের দরজা পর্যন্ত এসেছ, আগে আমাকে বল।

‘শুনুন রাজকুমারী, আমার কৃতকর্মের জন্য প্রাণদণ্ড হওয়াও কিছুমাত্র আশ্চর্য নয়। আমি তাে সম্রাটের দাসানুদাস। তার আদেশ পালন করাই আমার একমাত্র কর্তব্য। তাই আমার সনির্বন্ধ অনুরােধ আপনি একে আমার হাতে তুলে দিয়ে আমাকে কর্তব্য পালনের সুযােগ দিন।

-“আমি এখনও বলছি, আমি একজন অজানা-অচেনা মানুষকে এখানে আশ্রয় দিয়েছি। আর এ-ও ঠিক তেমনি সত্য যে, এ পরদেশী, আমার মেহমান। এর সঙ্গে সারকান-এর কি সম্পর্ক থাকতে পারে, আমি ভেবে পাচ্ছি না। আর এ যদি সত্যি সত্যিই সারকান হয়েও থাকে তবু তাে এ আমার মেহমান। মেহমান যত অন্যায়ই করুক না কেন সে অবধ্য। এর প্রতি অত্যাচার অবিচার আমি মেনে নেব না, কিছুতেই না। আমি এর সঙ্গে বসে খানাপিনা করেছি। তারপরও যদি এর ক্ষতি করি সে হবে চরমতম বিশ্বাসঘাতকতা। সেনাপতি মাসুম, আমার অভিপ্রায়ের কথা তাে শুনলেই এবার তুমি গিয়ে আমার পিতার কাছে আমার নামে যা খুশী বলতে পার। আর জবাবদিহি যদি করতেই হয় তবে তার কাছেই করব? তােমার কাছে অবশ্যই নয়।

মাসুরা তবু দরজা থেকে একচুলও নড়ল না। অধিকতর বিনয়ের সঙ্গে এবার নিবেদন করল – রাজকুমারী, আপনি যতই ক্রুদ্ধ হন না কেন আমি কিন্তু সারকান’কে না নিয়ে এখান থেকে ফিরতে পারব না। এর দেখা পেয়েও আমার পক্ষে সম্রাটের সামনে খালি-হাতে গিয়ে দাঁড়ানাে কিছুতেই সম্ভব নয়। আপনার পিতা সম্রাট হারদুব কড়া নির্দেশ দিয়ে আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন, যেকোন মূল্যে সারকানকে তার সামনে হাজির করতে হবে।'

রাজকুমারী ইরবিজা গুলিখাওয়া বাঘিনীর মত গর্জে ওঠে। -সেনাপতি মাসুরা, আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, তুমি অধিকারের সীমা অতিক্রম করছ। ভুলে যেয়ােনা, এটি যুদ্ধক্ষেত্র নয়। আমার ব্যাক্তিগত ব্যাপার স্যাপারে তােমার হস্তক্ষেপ করতে আসা মােটেই সঙ্গত নয়। আর যদি তা কর তবে তার ফল পেতেও দেরী হবে না , মনে রেখাে। তুমি যদি আমার মেহমানকে সারকান সন্দেহে হাতকড়া পরাতে চাও তবে কিন্তু তা সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বেই তােমাকে করতে হবে। রাজকুমারী ইবিজা সারকান-এর হাতে ঢাল তরবারি তুলে দিল। এবার সেনাপতি মাসুরা’কে বলল-“ঠিক আছে, তােমরা এক এক করে এর সঙ্গে লড়াই করবে এসাে। তারপরও যদি তােমাদের মধ্যে একে বন্দী করে নিয়ে যাওয়ার মত কেউ জীবিত থাক তখন হাতকড়া পরিয়ে, আমি টু-শব্দটিও করব না। সেনাপতি মাসুরা এবার সত্যি সত্যি সঙ্কটপূর্ণ পরিস্থিতির মুখােমুখি হয়। হাত কচলে নিবেদন করে ‘রাজকুমারী, আমার হয়েছে উভয় সঙ্কট। সারকানকে না নিয়ে খালি হাতে ফিরে গেলে আপনার আব্বা আমার ওপরে রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে যাবেন আবার যদি একে বন্দী করি তবে আপনার রক্তচক্ষু আমার ওপর বর্ষিত হবে। ঠিক আছে আপনার অভিপ্রায় অনুযায়ীই কাজ হবে। আমি এবং আমার সঙ্গে উপস্থিত যযাদ্ধারা সারকান-এর সঙ্গে অসি —যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছি। যেহেতু আমি সেনাপতি তাই আমিই সবার আগে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হই।।

বেগম শাহরাজাদ তার কিসসার এ পর্যন্ত বলার পর দেখলেন ভাের হতে আর দেরী নেই। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।

                        পঞ্চাশতম রজনী। 

রাত্রির প্রায় দ্বিতীয় যামে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগমের কক্ষে এলেন। বেগম শাহরাজাদ কোনরকম ভূমিকার অবতারণা না করেই কিসসার শুরু করলেন – ‘জাহাপনা, সেনাপতি মাসুরা সারকান-এর সঙ্গে অসিযুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হ'ল। ইরবিজা তাকে সতর্ক করে দিতে গিয়ে বল্ল-মনে রেখাে, তােমার দলের কেউ ভুলেও যদি শর্ত লঙঘন করে তবে আমি কিন্তু আমার সম্মানীয় মেহমানকে রক্ষা করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।'

সারকান এতক্ষণ নীরবে তাদের কথােপকথন শুনছিল। এবার সে মুখ খুলল ‘সুন্দরী, এ ব্যাপারে আমার কিছু বলার ছিল। কেবলমাত্র একজনের সঙ্গে লড়াই করা আমার রীতি বহির্ভূত কাজ। তবু তুমি যখন এ-রকমই ব্যবস্থা করেছ, মেনে নিলাম।

এবার সারকান এবং মাসুরা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হ’ল। মুহূর্তে শুরু হয়ে গেল তুমুল লড়াই। মাসুরা কিন্তু বেশীক্ষণ লড়াই অব্যাহত রাখতে পারল না। চোখের পলকে সারকান -এর তরবারি ঝলসে উঠল। এক কোপে মাসুরার গর্দান থেকে তার মাথাটি মেঝেতে ছিটকে পড়ল। ফিনকি দিয়ে খুন বেরিয়ে এল। সব খতম।

সারকান-এর যুদ্ধ-কৌশল ও তার বীরত্ব চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করে ইরবিজা যারপর নাই মুগ্ধ হয়। ইতিপূর্বে এর ওর মুখে তার শৌর্যবীর্যের কথা শুনেছিল বটে। আজ চাক্ষুষ করে চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন হল।

মাসুরার ছিন্ন মুণ্ডটি তাজা খুনে মাখামাখি হয়ে মেঝেতে পড়ে রইল। এবার মাসুরার এক ভাই তরবারি হাতে এগিয়ে এল। বিশাল তার চেহারা। অসুরকেও যেন হার মানাবে। সারকান এর সামনে এসেই সে অতর্কিতে তরবারি চালিয়ে দিল। ব্যস, তরবারি আর ঘুরে তার দিকে আসতে পারল না। তার বাটটি তার হাতে মুঠো করাই রইল। সুমসূণ ইস্পাতের টুকরােটি ছিটকে গিয়ে পড়ল কয়েক হাত দূরে। ব্যস, তার ছটফটানি মুহুর্তে খতম হয়ে গেল। কিন্তু নিরস্তুকে আঘাত করা বীরােচিত কর্ম নয়। ইরবিজা দেয়াল থেকে একটি তরবারি টেনে নিয়ে তার দিকে ছুঁড়ে দিল। আবার শুরু হল লড়াই। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই সারকানের হাতের তরবারিটি তার তলপেটে গেঁথে গেল। একেবারে এফোড় ওফোড়। বিকট আর্তনাদ করে পাহাড়ের মত অতিকায় যুবকটি আছাড় খেয়ে মাটিতে পডে বার কয়েক আছাড়ি পিছাড়ি করল। ব্যস, তারপরই সব ঠাণ্ডা। এবার একের পর এক নয় শর্তের কথা ভুলে এক সঙ্গে সবাই এগিয়ে আসে। এক মিনিটও তারা সারকানের তরবারির সামনে টিকতে পারল না।

এক ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় পঞ্চাশ জন যােদ্ধা ধরাশায়ী হয়ে গেল।  রাজকুমারী ইরবিজা এবার দ্বাররক্ষীদের তলব করে। তারা কোরবাণির বকরীর মত কাপতে কাপতে তার সামনে দাঁড়ায়। ইরবিজা গর্জে ওঠে- তােমরা, এতগুলাে জোয়ান মরদ পাহারায় নিযুক্ত ছিলে। আমার হুকুম ছাড়া এতগুলাে লােক কি করে আমার অন্দরমহলে প্রবেশ করল, জবাব দাও।

দ্বাররক্ষীরা কাপা কাঁপা গলায় জবাব দেয় – ‘মালকিন, প্রধান সেনাপতিকে বাধা দেওয়ার সাহস বা ক্ষমতা আমাদের কোথায় বলুন? সম্রাটের হুকুমনামা নিয়ে তিনি এসেছেন, আমরা তাে এ ব্যাপারে অসহায়, বিবেচনা করে দেখুন।

ক্রোধােন্মত্তা রাজকুমারী ইরবিজার নির্দেশে সারকান দ্বাররক্ষীদের সবাইকে কোতল করল।ইরবিজা এবার বীরশ্রেষ্ঠ সারকানকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করল। আবেগে-উচ্ছাসে বার কয়েক চুম্বন করল। নিজের যৌবনভরা বক্ষে সারকানের সুপ্রশস্থ বক্ষটি স্থাপন করে মন্ত্রমুগ্ধার মত দাঁড়িয়ে রইল। কতক্ষণ তারা পরস্পরকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিল সে হিসাব করার মত মানসিকতা তাদের কারােরই ছিল না। এক সময় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ইরবিজা সারকানের বলিষ্ঠ বাহুদ্বয়ের বেষ্টনী থেকে নিজেকে মুক্ত করল। তার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে পালঙ্কের ওপর বসাল। নিজে বসল তার পাশে। কাছাকাছি, একেবারে গা-ঘেঁষাঘেষি করে। তার একটি হাত নিজের কোলের ওপর তুলে নিয়ে মৃদু মৃদু চাপ দিতে দিতে বলল —“আমার নিজের কথা এবার তােমাকে শােনাতে চাই। আমার নাম যে ইরবিজা তাতাে তুমি আগেই শুনেছ। আর আমি যে সম্রাট হারদুব -এর কন্যা তা-ও এখন আর তােমার অজানা নেই। যে - মােটাসােটা বুড়িটিকে গত রাত্রে আমার সঙ্গে কুস্তি লড়তে দেখেছিলে সে আমার পিতার পুরনাে বাঁদী। একবার আমার পিতা কঠিন ব্যাধিগ্রস্ত হন। শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ধুমশাে বুড়িটি সেবা যত্নের মাধ্যমে তার রােগ নিরাময় করে। তারপর থেকেই সে আমার পিতার প্রিয় পাত্রী হয়ে ওঠে। এ দুর্গ-প্রাসাদের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব সে কৌশলে হস্তগত করে। আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক চিরদিনই সাপ আর নেউলের মত। সে যে আজকের ঘটনাটি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে আমার পিতার কানে তুলবে তা আমি আগেই অনুমান করেছিলাম। 

সারকান মন্ত্রমুগ্ধের মত ইরবিজা-র কথা শুনতে লাগল। এক সময় বলল — সুন্দরী, এ- ফাঁদ থেকে তােমার অব্যাহতি পাওয়ার কি কোন উপায়ই নেই ?  ‘উপায় একটিই, আমার দেশের বাড়ি চলে যাওয়া। আমাকে যেতেও হবে তা-ই, আর এ-ব্যাপারে তােমার সক্রিয় সাহায্য - সহযােগিতা আমি প্রত্যাশা করছি।'  -শােন, তােমার জন্যই আজ আমি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে অব্যাহতি পেয়েছি। অতএব তােমার জন্য কিছু করতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য জ্ঞান করব। কিন্তু একটি কথা, তুমি কি তােমার আব্বার সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাচ্ছ?'

—‘এ ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথই আমার সামনে খােলা নেই। অদূর ভবিষ্যতে এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হবে যার কাছে পিতাকন্যার সম্পর্ক আর স্নেহ-মায়া মমতা অতীব তুচ্ছ। তােমাকে আমি আর একটি অনুরােধ করছি, যত শীঘ্র সম্ভব তােমার ছাউনি গুটিয়ে বাগদাদে ফিরে যাও।

সারকান সবিস্ময়ে বলল—“কিন্তু তা কি করে সম্ভব, সুন্দরী? আমার আব্বা যে তােমার আব্বার সঙ্গে লড়াই করার জন্য সৈন্যসামন্ত ও অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে এখানে ভেজলেন। তবে তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পার, তােমার আব্বা আমার কোন অনিষ্টই করতে পারবেন না। যুদ্ধের কারণ তুমি জান কিনা আমার ঠিক জানা নেই। সংক্ষেপে বলছি, শােন। তােমার আব্বা কনস্তানতি নােপলের সম্রাট আফ্রিদুন -এর জাহাজে হানা দিয়ে সর্বস্ব লুঠ করে নেন। জাহাজে প্রচুর সােনাদানা ছাড়াও হীরা জহরত আর মণি-মুক্তা ছিল। আর ছিল অলৌকিক শক্তির আধার তিনটি অমূল্য সম্পদ-তিনটি পাথর। তাই –

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments