গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
একমাত্র লেড়কা বলেই হয়ত বাদশাহ উমর তাকে নিজের কলিজার চেয়েও পেয়ার করত। তার নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল, তিনি বেহেস্তে গমন করলে একমাত্র লেড়কা সারকান-ই তার মসনদে বসবে। বাদশাহ উমর চার-চারটি শাদী করেছিলেন। প্রথম-তিন বিবির গর্ভে কোন সন্তানাদি পয়দা না হওয়ায় তাকে চতুর্থবার শাদী করতে হয়। তারই গর্ভে লেড়কা সারকান পয়দা হয়। চার বিবি ছাড়াও তার হারেমে তিনশ ষাটটি রক্ষিতা ছিল। তারা যেমন ছিল নানা দেশের তেমনি নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের ছিল। তারা প্রাসাদের হারেমের তিনশ’ ষাটটি পৃথক পৃথক কক্ষে বাস করত। আর হারেমটি ছিল বারােটি আলাদা আলাদা মহলে বিভক্ত। বাদশাহ পৃথক পৃথক রক্ষিতার ঘরে প্রতিরাত্রি কাটাতেন। ফলে এক এক রক্ষিতা বছরে একবার মাত্র তার সহবাসের সুযােগ পেত। ফলে রক্ষিতারা তার এ ব্যবস্থায় খুবই সন্তুষ্ট ছিল।
এক সকালে বাদশাহ দরবারে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঠিক তখনই তার কাছে এক বৃদ্ধা পরিচারিকা ছুটে এল। তাকে সােল্লাসে জানাল, তার সফিয়া নামে এক রক্ষিতা অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে। যথা সময়ে সফিয়ার এক লেড়কি জন্ম নিল।
এক বৃদ্ধ খােজা এসে বাদশাহকে লেড়কি পয়দা হওয়ার কথা জানাল। লেড়কি পয়দা হয়েছে শুনে বাদশাহের একমাত্র পুত্র সারকান যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। নইলে বাদশাহের পর সেও সিংহাসনের দাবীদার হত। জিন্দেগীভর দুশ্চিন্তার বােঝা মাথায় নিয়ে বেড়াতে হত। এ পর্যন্ত বলে শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন। প্রাসাদসংলগ্ন উদ্যানে ভােরের পূর্বাভাষ দেখা দিল।।
পঁয়তাল্লিশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কক্ষে এলেন। বেগম শাহরাজাদ কোনরকম ভূমিকার অবতারণা না করেই তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন--“জাহাপনা, বাদশাহের রক্ষিতা লেড়কি প্রসব করলে শাহজাদা সারকান ভাবল জোর বাঁচা বেঁচে গেছি! একাই সে মসনদে বসে রাজ্য শাসন করতে পারবে। ভাগ বাটোয়ারার প্রশ্নই ওঠে না। সে অবশ্য পাকা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল, যদি নেহাৎই লেড়কা জন্মগ্রহণ করে তবে তাকে যে করেই হােক খতম করে পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলবে।।
আরও কিছুদিন কেটে গেল। এক বিহানে সে বুড়ি ক্রীতদাসী এসে বাদশাহ উমরকে জানায়—‘হুজুর, সে-রক্ষিতা আরও একটি সন্তান প্রসব করেছেন। এবার আর লেড়কি নয়, লেড়কা।
এখানে বুড়ির কাছথেকে লেড়কা পয়দা হওয়ার কথা জানতে পারলনা।
বাদশাহ উমরকে গ্রীক সম্রাট এ-রক্ষিতাটিকে ভেট স্বরূপ দান করেছিলেন। তাই বাদশাহের লেড়কা পয়দা হয়েছে খবর পেয়ে গ্রীক সম্রাট তাকে ভেট পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
নবজাতক জন্মগ্রহণ করায় বাদশাহের প্রাসাদে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। নাচা-গানার মজলিস বসল। বহুত খানাপিনা হ’ল। সরাবের জোয়ার বয়ে চলল। লেড়কির নাম রাখা হয়েছিল নুজাত-অল-জামান আর সদ্যোজাত লেড়কার নামকরণ করা হ’ল দু-অল-মাকান।
এবার থেকে বাদশাহ উমর বুড়ি ক্রীতদাসীটি মারফৎ প্রত্যহ প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর রক্ষিতার লেড়কা ও লেড়কিটির খবর নিতে লাগলেন।এদিকে শাহজাদা সারকান তার আব্বার রক্ষিতা গর্ভবতী শুনে সে প্রাসাদে অবস্থান করছিল গােপন কুমতলব নিয়ে। কিন্তু এ হ’ল প্রথম সন্তান লেড়কিটির বেলায়। তারপর দ্বিতীয় সন্তান লেডকা যখন পয়দা হ’ল তখন? লেড়কার কথা সে বিন্দুবিসর্গও জানে না। কারণ, লেড়কিটি পয়দা হবার কিছুদিন বাদেই তাকে বাদশাহের নির্দেশে ভিনদেশ আক্রমণে যাত্রা করতে হয়েছিল। পুরাে চার চারটি সাল তাকে বাগদাদ থেকে বহুদূরে যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত থাকতে হয়েছে। এক খােজা ক্রীতদাসের মুখে সে বাদশাহের লেড়কা পয়দা হওয়ার খবর জানতে পারে। সে বুঝল, তার সবচেয়ে বড় শত্রু বাগদাদে চাঁদের কলার মত তিলে তিলে বেড়ে চলেছে। বহুদেশ, বাজ্য সে একের পর এক জয় করেও সৈন্যদের সঙ্গে দিল-খুলে বিজয়ােৎসবে যােগদান করতে পারল না।
এদিকে এক সকালে বাদশাহ উমর অল নুমান পারিষদদের নিয়ে দরবারকক্ষে অবস্থান করছেন ঠিক তখনই কয়েকজন আমীর ওমরাহ ও রইস আদমী দরবারে প্রবেশ করলেন। বাদশাহকে যথােচিত ভঙ্গিতে কুর্ণিশ করলেন।
আগন্তুকদের একজন কুর্নিশ সেরে বললেন—জাহাপনা, আমরা রােম সম্রাট আফ্রিদূন-এর দরবার থেকে আসছি। আপনি যদি এতে অখুশী হন তবে আমরা এ মুহূর্তে আপনার দরবার ত্যাগ করব। আর যদি খুশীমনে আমাদের গ্রহণ করতে পারেন তবে আসন গ্রহণ করব। আমাদের সম্রাট গ্রীস, ইয়ােনিয়ার এবং রােমের অধীশ্বর। তিনিই আপনার দরবারে আমাদের পাঠিয়েছেন। আমাদের আগমনের কারণ, সিসারিয়ার প্রবল পরাক্রান্ত সম্রাট হারদুব অকস্মাৎ হাজার হাজার নিরীহ প্রজার জীবন দুবির্ষহ করে তুলেছেন।
-“কিন্তু অকারণে তাে আক্রমণ করার কথা নয়। এর পিছনে কোন অন্তর্নিহিত কারণ রয়েছে বলে আপনারা অনুমান করছেন?
-হ্যা, কারণ অবশ্যই রয়েছে জাঁহাপনা। আমাদের এক সেনাপতি কিছুদিন আগে মরু অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে সৈন্য নিয়ে যাবার সময় অকস্মাৎ এক রত্নভাণ্ডারের হদিস পান। তামাম দুনিয়া জয় করে সম্রাট আলেকজান্দার এখানে তার লুঠ করা ধনদৌলত লুকিয়ে রেখেছিলেন। হীরা-জহরৎ, মণি-মাণিক্য যা কিছু ছিল তাদের মধ্যে তিনটি অমূল্য সম্পদ গ্রহরত্ন ছিল যার ব্যবহারে যেকোন কঠিন বিমারি সেরে যায়। আমাদের সেনাপতি এসব পাথরের ব্যাপারে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। যা-ই হােক সে সব ধন দৌলত উদ্ধার করে সেনাপতি সুলতানকে ভেট দেবার বাসনা নিয়ে কনস্তানতিনােপলের পথে যাত্রা করলেন। জাহাজ বন্দর ছাড়ল। এর কিছু পরেই খবর পাওয়া গেল, সিসারিয়ার অধিপতি হারদুব আমাদের রাজ্যের ওপর ঝাপিয়ে পড়েছেন। আমাদের সেনাপতি তার আক্রমণ প্রতিরােধে চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হন। ধনদৌলত লুঠ করে ভেগে যায়। তখন সে অমূল্য গ্রহরত্ন তিনটিও নিয়ে যায়। আমাদের সম্রাট বিশাল সৈন্যবাহিনী ভেজলেন হারদুব’কে দমন করতে। তারা পরাজিত হয়ে কেউ প্রাণ দেয়, কেউ বা লড়াই ছেড়ে ভেগে যায়। পর পর দু’জাহাজ নৌ-বাহিনী ভেজলেন। তারাও খতম হয়ে গেল। জাহাপনা, আমাদের সম্রাট এখন হতাশ হয়ে পড়েছেন বটে। কিন্তু হাল ছাড়তে পারছেন না। হারদুব’কে দমন করার প্রবল বাসনা। নিয়ে তিনি আমাদের আপনার দরবারে ভেজলেন। আমাদের বিনীত প্রার্থনা, আপনি আমাদের সম্রাটের এ-দুর্দিনে সাহায্য সহযােগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। তিনি খুশী হয়ে জাহাজ বােঝাই করে আপনার জন্য ভেট পাঠিয়েছেন। আপনার অনুমতি পেলে আমরা আপনার দরবারে নিয়ে আসি। আপনি অনুগ্রহ করে আপনার অভিপ্রায়ের কথা আমাদের ব্যক্ত করুন।
কিসসার এ পর্যন্ত বলার পর বেগম শাহরাজাদ দেখলেন, বাগিচায় পাখির কিচিরমিচির শুরু হয়ে গেছে। ভােরের পূর্বাভাষ।। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।
ছেচল্লিশতম রজনী
বেগম শাহরাজাদ পরের রাত্রে আবার কিসসা শুরু করলেন‘জাঁহাপনা, আফ্রিদুন-এর প্রেরিত দূতগণ বললেন, “আমাদের সম্রাট যেসব ভেট পাঠিয়েছেন তাদের মধ্যে পঞ্চাশটি খুবসুরৎ গ্রীসের কুমারী লেড়কি রয়েছে। আর আছে গ্রীসের সুশ্রী ও সুদেহী নওজোয়ান। মণিমুক্তা যা কিছু আছে তা ছাড়া যেসব সােনাদানা পাঠিয়েছেন তার পরিমাণ কম করেও এক হাজার সের তাে হবেই। বাদশাহ উমর-এর মুখে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল। তিনি বললেন—“ঠিক আছে, তােমাদের সম্রাটের পাঠানাে ভেট দরবারে নিয়ে এসাে। আমি তা সানন্দে গ্রহণ করলাম।
আগন্তুক মেহমানদের সেবা যত্নের ব্যবস্থা করে বাদশাহ উমর তার বৃদ্ধ উজিরকে নিয়ে মন্ত্রণা কক্ষে পরামর্শের জন্য বসলেন। বাদশাহের অভিপ্রায়ের কথা শুনে বৃদ্ধ উজির চিন্তাক্লিষ্ট মুখে বললেন—‘জাহাপনা, একটি কথা আমাদের ভুললে চলবে না, সম্রাট আফ্রিদুন বিধর্মী – কাফের, খ্রীস্টান। তার প্রজারাও বিধর্মী। আবার তার শত্রুপক্ষও বিধর্মী কাফের। অতএব দেখা যাচ্ছে লড়াই বেঁধেছে খ্রীস্টানে-খ্রীস্টানে। অতএব আমাদের আপত্তির কিছুমাত্রও কারণ থাকার কথা নয়। এতে ইসলাম ধর্মের কোন ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না। আমার পরামর্শ যদি চান তবে আমি বলব, কনস্তানতিনােপলের সম্রাট আফ্রিদূন-এর সাহায্যার্থে আপনার বীরপুত্র সারকান’কে সৈন্য দিয়ে প্রেরণ করুন। আপনার সাহায্যে আফ্রিদুন যদি সিরিয়ার সম্রাটকে পর্যুদস্ত করতে পারে তাতেই গৌরব। কিন্তু সামান্য সিরিয়ার সম্রাটকে পরাজিত করতে যদি স্বয়ং আপনাকেই সৈন্য নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে হয় তা কিন্তু আপনার পক্ষে মােটেই গৌরবের হবে না। যেহেতু আফ্রিদুন-এর প্রেরিত ভেট আপনি গ্রহণ করছেন, আপনাকে সৈন্য পাঠাতেই হবে। নতুবা শীঘ্র খবর পাঠান, আগন্তুকগণ যেন তাদের ভেট জাহাজ থেকে না নামান।
বাদশাহ উমর বললেন – তাদের আনীত ভেট গ্রহণ করব বলে স্বীকৃতি যখন দিয়েই দিয়েছি তখন আফ্রিদুন-কে সাহায্য অবশ্যই আমাকে করতে হবে। আপনার বিচক্ষণতার পুরস্কার স্বরূপ আমি আপনাকে আমার সেনাপতির পদে বহাল করলাম। আপনার সুচিন্তিত পরামর্শ ও নির্দেশ অনুসারে আমার লেড়কা সারকান যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য পরিচালনা করবে।
শাহজাদা সারকান প্রাসাদে ফিরে এল। বৃদ্ধ উজির দানদান এবং প্রচুর সংখ্যক সৈন্য নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করল। বিশদিন বিশরাত্রি ক্রমান্বয়ে পথ অতিক্রম করে সম্রাট আফ্রিদুন-এর সঙ্গে মিলিত হ’ল। বিদায় মুহূর্তে সুলতান উমর অল-নুমান সাত বাক্স সােনার মােহর দিয়ে বলে দিয়েছিলেন, তিনি যেন সেগুলাে নিজের জিম্মায় রেখে দেন।
সম্রাট আফ্রিদুন বিশাল প্রান্তরে সারিবদ্ধভাবে সারকান ও তার সেনাবাহিনীর জন্য তাবু খাটিয়ে রেখেছিলেন। সেখানেই তাদের তিনদিন বিশ্রাম নিতে রাখলেন।
সারকান-এর তাবুর অদূরে শত্রু শিবির। সম্রাট হারদুব সেখানে সসৈন্যে অবস্থান করছেন। সারকান মনস্থ করল, আগেভাগে রাস্তাঘাট সম্বন্ধে জেনে নেবে। তাই এক রাত্রে দেহরক্ষী ছাড়াই গােপনে বেরিয়ে পড়ল। অঞ্চলটি সম্বন্ধে মােটামুটি ধারণা করে নেওয়ার জন্য। ঘােড়া নিয়ে এক সময় একা এক গভীর জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করল। শুধু গাছগাছলা আর ঝােপঝাড়। মনুষ্য বসতির নামগন্ধও নেই। রাত্রির প্রথম প্রহর ঘােড়ার পিঠেই কাটাল। শরীর ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়ে। পথশ্রমে ঘােড়াটিও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ঘােড়ার পিঠ থেকে নামল। একটি গাছের সঙ্গে ঘােড়াটিকে বাঁধল। এবার সেটিকে বেশ মােটাসােটা একটি গাছের গুড়ির গায়ে হেলান দিয়ে ক্লান্তি অপনােদনের চেষ্টা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর আবার ঘােড়ার পিঠে ওঠে। আবার এগিয়ে চলল গাছপালা অতিক্রম করে।।
এক সময় সারকান শুনতে পেল জনানার গলার হাসির রােল। সারকান ভাবল, এতরাত্রে এমন দুর্ভেদ্য জঙ্গলে জনানা কোথা থেকে এল। তবে নিশ্চয়ই কাছাকাছি কোথাও জনবসতি আছে। তল্লাশ করে জনবসতির নামগন্ধও পেল না। কিন্তু জনানা কণ্ঠের হাসির রােল আরও স্পষ্টতর হ’ল। কাছে, খুবই কাছে এগিয়ে এল রহস্যজনক হাসির শব্দ। ব্যাপারটি সারকান-এর মনে আতঙ্কের সঞ্চার করে। ভাবল নির্ঘাৎ কোন ভূত-পেত্নীর ব্যাপার। এরকম পরিস্থিতিতে খােদাতাল্লার কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। জিন্দা রাখেন কি মারালেন যা হয় তিনিই করবেন।
সারকান কৌতূহলের শিকার হয়ে পড়ে। হাসির রহস্যভেদ করতেই হবে। ঘােড়ার পিঠ থেকে সে লাফিয়ে নেমে পড়ল। একটি গাছের সঙ্গে ঘােড়াটিকে বেঁধে পায়ে হেঁটে হাসির শব্দটিকে অনুসরণ করতে থাকে। কিছুদূর গিয়েই সে একটি স্রোতস্বিনী নদীর ধারে পৌছল। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে চারদিকে তাকাল। হঠাৎ চাঁদের আলােয় উঁচু মিনারযুক্ত একটি প্রাসাদ তার নজরে পড়ল। তার বিশ্বাস, সে রহস্যজনক হাসির রােল প্রাসাদটির দিক থেকেই ভেসে আসছে। দুরুদুরু বুকে প্রাসাদটির দিকে এগােতে লাগল। এক সময় আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখতে পেল, প্রাসাদের সামনের এক চিলতে প্রাঙ্গণে দশটি খুব-সুরৎ লেড়কি বৃত্তাকারে বসে হাসাহাসি করছে। এবার তাদের টুকরাে টুকরাে কথাও তার কানে এল। আরবী ভাষায় বাক্যালাপ করছে। লেড়কিদের একজন বলছে, এমন ক্ষ্যাপা হলে কি কুস্তি লড়া যায়। এর জন্য চাই কায়দা কৌশল আর দেহের তাগদ। কথা বলতে বলতে সে উঠে দাঁড়িয়ে অন্যান্যদের আহ্বান জানায়। আমাকে হারাতে হবে, খেয়াল থাকে যেন।
একটি লেড়কি মুখ কাচুমাচু করে উঠে এল। প্রথম লেড়কিটি তাকে আছাড়ে কুপােকাৎ করে দেয়। এবার এল আর একটি। তাকেও এক পটকান দিল। এভাবে সবাই এক এক করে তার হাতে ঘায়েল হ'ল।
এমন সময় পাশের ঝােপের আড়াল থেকে এক বুড়ি বেরিয়ে এল। প্রথম লেড়কিটিকে ধমক দিয়ে বলল—এদের ন্যাকা বােকা পেয়ে খুব যে রঙ নিচ্ছিস। লড়াইয়ের সাধ যদি এতই হয়ে থাকে আয় আমার সঙ্গে লড়বি। মস্করা নয়, লড়বি তাে চলে আয়। মজা টের পাইয়ে দিচ্ছি।
বেগম শাহরাজাদ দেখলেন, ভাের হয়ে এল বলে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।
সাতচল্লিশতম রজনী
বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন। –জাঁহাপনা, বুড়ির কথায় প্রথম লেড়কিটির আঁতে ঘা লাগল। সে বলল – তুমি বুঝি খুবই প্যাচ-পায়জার রপ্ত করেছ, তাই নয় ? তােমার বড়াই দেখে আমার দিল বলছে, একবার লডে তােমার লড়াইয়ের সাধ মিটিয়ে দেই।
রাগে গড়গড় করতে করতে বুড়িটি এবার বলল—“ঠিক আছে, দেখাই যাক কে, কাকে মজা টের পাইয়ে দেয়। কিন্তু এসব পােশাক টোশাক পরে তাে আর কুস্তি লড়া যাবেনা। কথা বলতে বলতে সে তা গায়ের সবকিছু এক এক করে খুলে ফেলল। মায় ইজেরটি পর্যন্ত। একেবারে উলঙ্গ হয়ে পড়ল। ইয়া দশাসই চেহারা, তার ওপর একেবারে উলঙ্গ হয়ে পড়ায় বুড়িটিকে কী যে বীভৎস দেখাতে লাগল তা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যি সাধ্যাতীত। বুড়িটি কেবল নিজেই উলঙ্গ হ’ল না, প্রথম যুবতীটির গা থেকেও যাবতীয় পােশাক খুলিয়ে উলঙ্গ করে নিল।
বিবস্ত্রা যুবতীটি সারকানের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে। সারকান তার অনন্য রূপ-সৌন্দর্য আর যৌবনভরা দেহটির দিকে বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতরে কলিজাটি লাফালাফি দাপাদাপি শুরু করে দিল। কোন মানবীর দেহে এমন সৌন্দর্য আশ্রয় করতে পারে এ যেন তার কল্পনারও অতীত।
এবার শুরু হ’ল কুস্তি। শুরুতেই বুড়িটি জব্বর এক প্যাচ কষল। যুবতীটি সুরুৎ করে পিছলে বেরিয়ে এল। এবার সে তার বাঁ-হাতটি বুড়ির দুই জঙঘার ফাক দিয়ে চালিয়ে দেয়! আর ডানহাতটি রাখে তার ঘাড়ে। পরমুহুর্তেই এক ঝটকায় বুড়িটির বিশালায়তন বপুটিকে এক পটকান দিয়ে দেয়। বুড়িটি আছাড় খেয়ে পড়ে কেঁৎ করে ওঠে।
যুবতীটি এবার এগিয়ে গিয়ে বুড়িটিকে হাত ধরে তুলতে তুলতে বলে -“তােমার দোষেই এমনটা হ’ল। তুমিই তাে আগ বাড়িয়ে লড়তে এসেছিলে। চোট লাগে নি তাে?’
কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্যান্য লেড়কি সরাবের নেশায় বুদ হয়ে পড়ে রইল। বুড়িটিও ক্লান্ত দেহে এলিয়ে পড়ে রইল। কেবলমাত্র প্রথম যুবতীটি জেগে রইল।
সারকান ঘােড়ার পিঠে উঠে বসল। এগিয়ে চলল প্রাসাদটির দিকে। এক সময় ঘােড়া থামিয়ে আচমকা চিৎকার করে ওঠে। সব শক্তির আধার। সবাই শক্তিধর!’
যুবতীটি অতর্কিতে চোখ ঘুরিয়ে সারকানকে দেখতে পায়। মাত্র পাঁচ-সাত হাত চওড়া নদীটি একলাফে পেরিয়ে গেল। পিছন ফিরে দাঁড়ায়। মিষ্টি-মধুর স্বরে বলে—“কে তুমি? কে ? আমাদের শান্তির নীড়ে এসে শান্তি ভঙ্গ করছ কেন? কে তুমি? মিথ্যার আশ্রয় নিলে কিন্তু এখান থেকে জান নিয়ে ফিরতে পারবে না। আমি একবার মাত্র হুঙ্কার দিলে চার হাজার খ্রীস্টান সৈন্য ছুটে এসে তােমাকে ঘিরে ধরবে। সত্যি করে বল, তােমার অভিলাষ কি। যদি বনের মধ্যে পথ হারিয়ে থাক তবে আমি অবশ্যই তােমাকে পথ দেখিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছবার ব্যবস্থা করব।
‘আমি এক ভিনদেশীয় মুসলমান। আজকের রাত্রে সঙ্গদান করার জন্য কয়েকটি খুবসুরৎ লেড়কির খোঁজ করে বেড়াচ্ছি। তােমার দশটি বাঁদী আমাদের কামতৃষ্ণা নিবৃত্ত করতে পারবে বলেই মনে করছি। আপত্তি না থাকলে আমাদের তাবুতে নিয়ে যেতে পারি। কি, রাজি?”
—“তােমার কথা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। তুমি ধাপ্পা দিচ্ছ। দেখ, তােমার আসল উদ্দেশ্য কি, খুলে বল। নইলে আমার সৈনিকদের তলব করতে বাধ্য হ’ব, বলে দিচ্ছি। তুমি যদি সত্যি মুসাফির হয়ে থাক তবে তুমি আমার বাঁদীদের ভােগ করার জন্য নিয়ে যেতে পারবে। তবে আমার সঙ্গে এক হাত কুস্তি লড়তে হবে। আমাকে যদি তােমার পিঠে তুলে নিয়ে যেতে পার তবেই বাদীরা তােমার সঙ্গে যাবে। আর যদি লড়াইয়ে হেরে যাও তবে তােমাকে আমার নফর হয়ে থাকতে হবে, রাজি ? ‘রাজি। খালি হাতেই আমি তােমার সঙ্গে লড়ব। আমি হেরে গেলে যত দিনার মুক্তিপণ চাও পাবে। আর তুমি হারলে আমার সুলতানের উপহারের সামগ্রী হবে।
লেড়কি এক লাফে আবার নদীটি পেরিয়ে সারকান-এর কাছে আসে। মুখােমুখি দাঁড়ায়। মুচকি হেসে বলে –“তুমি তবে আমার হাতে মান-ইজ্জৎ হারাতেই চাইছ?' সারকান বলল—“শােন, তােমার এলাকায় যখন ঢুকেই পড়েছি। তখন একটু সােহাগ টোহাগ না করে গেলে যে নিজেকে অপরাধী মনে হবে সুন্দরী। তােমার রূপ আমার দিলে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে। এমন এক রূপসী এরকম এক জঙ্গলে কিন্তু একেবারেই বে-বানান। তােমাকে আমি আমাদের বাগদাদ নগরে নিয়ে যেতে চাই, যাবে? ‘হায় খােদা! পাগলের মত কি সব যা-তা বলছ! বাগদাদে ঘােড়াদেরই ভাল মানায়। সেখানকার বাদশাহ উমর-অল-নুমান এর হারেমে নাকি তিনশ’ ষাটটি রক্ষিতা রয়েছে। রােজ রাত্রে নাকি তিনি এক একজন করে রক্ষিতাকে সম্ভোগ করে তৃপ্ত হন। আর তুমি কিনা আমাকে সেই নেকড়েটার খপ্পরে ফেলার চেষ্টা করছ। বছরে মাত্র একটি রাত্রি সে আমাকে সঙ্গদান করবে। হিংস্র জানােয়ারের মত আমার দেহটিকে ছিডেফেঁড়ে খেয়ে সকাল হলেই বিদায় নেবে। ব্যস, তারপর পুরাে একটি বছর আর তার দেখা মিলবে না। খােদা রক্ষা করুন! জান গেলেও তার ফাঁদে পা দিতে আমি রাজী নই। আর তুমি যদি সে-শয়তান বাদশাহের লেড়কা স্বয়ং সারকানও হও তবু আমি তােমার সঙ্গে যেতে নারাজ।
‘সারকান সম্বন্ধে তুমি কিছু না জেনেই বােধ হয় এরকম উক্তি করছ।
-“জানি না আবার? সে আমাদের দেশের সীমান্তে তাবু ফেলেছে। আমাদের সম্রাট হারদুব’কে শায়েস্তা করার জন্য সে আফ্রিদুন-এর সঙ্গে হাত মিলিয়ে যুদ্ধ শুরু করতে চলেছে। সে আমাদের শত্রু –‘পরমতম শত্রু। আমার মন চাইছে দৌড়ে গিয়ে ওর ধড় থেকে শিরটি নামিয়ে দেই।
বেগম শাহরাজাদ কিসার এ পর্যন্ত বলার পর ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে কিসসা বন্ধ করলেন।
আটচল্লিশতম রজনী
বাদশাহ শারিয়ার-এর আগ্রহে বেগম শাহরজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন – ‘জাহাপনা, বাদশাহের লেড়কা সারকান বুঝতে পারল লেড়কিটি তার ওপর খুবই ক্ষিপ্ত। তাই নিজের পরিচয় চেপে রেখে লেড়কিটির পিছন পিছন চল্ল। সু-বিশাল এক প্রাসাদে পৌছল তারা। লেড়কিটি সুসজ্জিত একটি কক্ষে সারকানকে নিয়ে গেল। কক্ষটির কেন্দ্রস্থলে একটি পালঙ্ক পাতা রয়েছে। পালঙ্কের ওপর মখমলের একটি চাদর।
সারকান পালঙ্কের ওপর শুয়ে পড়ল। লেড়কিটি পাশের ঘরে চলে গেল। দু'জন বাঁদী সারকান-এর পরিচর্যায় লিপ্ত হ'ল।
দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেল। লেড়কিটির আর কোন পাত্তা নেই। সারকান বাঁদীদের জিজ্ঞাসা করল –“তােমাদের মালকিন আমাকে এখানে শুতে বলে সেই যে কোথায় চলে গেল আর ফিরল না। সে এখন কোথায় কি করছে বলতে পার? বাদীদের একজন বল্ল –“হায় খােদা! আপনি বুঝি ওনার অপেক্ষায় জেগে রয়েছেন? তিনি তাে নিজের কামরায় গিয়ে ঘুমােচ্ছেন।
–‘ঘুমােতে গেল। আমাকে এভাবে একা ফেলে তিনি নিজে গেলেন ঘুমােতে ! চমৎকার।
বাদীরা নানারকম সুখাদ্যের থালি সাজিয়ে খানা নিয়ে এল। বুভুক্ষুর মত সেগুলাে উদরস্থ করল। তারপর নিয়ে এল দামী সরাব। তা-ও গলা পর্যন্ত পুরে নিল। এবার সে একটু ধাতস্থ হল। | সারকান পালঙ্কের ওপর কাৎ হয়ে শুয়ে তার সৈন্য সামন্তের
( চলবে )

0 Comments