গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
ঘানিম বারন্দায় গিয়ে বাঁশী বাজাতে থাকে। করুণ সুর। মন পাগল করা সুরে নিজেকে সপে দেয়। বিভাের হয়ে পড়ে। হাসি-আনন্দের মধ্যে আবার নেমে এল রাত্রির অন্ধকার। ঘানিম বারান্দায় বাঁশী হাতে তারা ভরা আশমানের দিকে উদাস ব্যাকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কুৎ-অল এসে তার গা-ঘেঁষে দাঁড়ায়। তার মাংসল ও তুলতুলে নরম উরুদেশ ঘানিম-এর পিঠ স্পর্শ করে। ঘানিম-এর সর্বাঙ্গে শিহরণ জাগে। শিরা-উপশিরায় খুন চনমনিয়ে ওঠে। বুকের ভেতরে কলিজাটি অস্থির হয়ে ওঠে। কুৎ-অল আরও একটু ঘনিষ্ঠ হয়। তার তলপেট ঘাড়ের ওপর—মাথা স্পর্শ করে। ঘানিম-এর বুকের ভেতরে কাল বৈশাখীর ঝড়—উত্তাল, উদ্দাম সমুদ্রের আছাড়ি পাছাড়ি চলতে থকে। নিজেকে আর বশে রাখা সম্ভব হবে কিনা, কে জানে?
খােদা তার সহায় হলেন। কুৎ-অল কি ভেবে গুটি গুটি পায়ে যেমন এসেছিল ঠিক তেমনি নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে যায়। খাটের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ে। ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে। ঘানিম শােনে। মর্মাহত হয়। কিন্তু দিলকে কিছুতেই দুর্বল হতে দেয় না। গােড়ার দিকে তার মনকে একটু-আধটু প্রশ্রয় দিয়েছিল বটে। কিন্তু কুৎঅল-এর প্রকৃত পরিচয় পাওয়ার পর থেকে নিজেকে সে পুরােপুরি গুটিয়ে নেয়। আর কুৎ-অল মর্মবেদনায়, না পাওয়ার হতাশায় জ্বলে-পুড়ে খাক হতে থাকে।
বাগদাদে খবর আসে বিদ্রোহী প্রজাদের দমন করে খলিফা প্রাসাদে ফিরছেন। খবরটি তার খাস বেগম জুবেদা-র কানেও পৌছায়। তিনি ভয়ে মুষড়ে পড়েন। কুৎ-অল-এর হদিস না পেয়ে তিনি যে কোন্ মূর্তি ধারণ করবেন তা ভেবেই তিনি অস্থির হয়ে পড়েন। তার খুব পেয়ারের বুড়ি ক্রীতদাসীকে বললেন, এখন উপায় ?
ফোকলা দাঁতে হেসে বুড়ি বলে—এত ঘাবড়াচ্ছেন কেন। বেগম সাহেবা? মােক্ষম এক ফন্দি-ফিকির বাৎলে দিচ্ছি।। কাঠমিস্ত্রিীকে দিয়ে কুৎ-অল-এর একটি পুতুল গড়িয়ে নিন। প্রাসাদের গায়ে এক গাের তৈরী করে সেটিকে গাের দিয়ে দিন। আর কুৎ-অল সর্বদা যেভাবে হীরা-জহরৎ মণি-মাণিক্যের গহনা ব্যবহার করত পুতুলটিকে সেসব পরিয়ে দিতে হবে। খলিফা সন্দেহের বশে গাের খুঁড়িয়ে দেখতে চাইলে ওপর থেকে গহনাপত্র দেখেই নিঃসন্দেহ হয়ে যাবেন। আবার মাটি চাপা দিয়ে দেবার হুকুম দেবেন। আর যদি নেহাৎই তার লাশ হাত দিয়ে দেখতে চান তবে আপনি বাধা দিয়ে বলবেন—কুৎ-অল-এর লাশ বিবস্ত্র করে গাের দেওয়া হয়েছে। নিজের বিবি হলেও তার বিবস্ত্র লাশ স্পর্শ করা পুরুষের ধর্ম বিরুদ্ধ কাজ। তবেই ধর্মভীরু খলিফা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হবেন। জুবেদা বুড়ি ক্রীতদাসীর বুদ্ধির তারিফ করলেন। জুবেদা তার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করলেন। নিশ্চিন্ত।
খলিফা বিদ্রোহী প্রজাদের দমন করে প্রাসাদে ফিরলেন, প্রাসাদের সদর-দরজার কাছে এক সমাধি দেখে থমকে গেলেন। আর নফর থেকে শুরু করে প্রাসাদের সবার পরনে শােকের চিহ্নবাহী কালাে পােশাক। তার খাস বেগম জুবেদাও কালাে পােশাক ধারণ করেছেন। খলিফা নীরবে কুৎ-অল-এর কক্ষে গেলেন। কেউ নেই। খাখা করছে। জুবেদা চোখ মুছতে মুছতে বললেন—কুৎ-অল দুনিয়া ছেড়ে বেহেস্তে চলে গেছে। আমি নিজে তদ্বির-তদারকি করে যথােচিত মর্যাদায় তাকে গাের দিয়েছি। | খলিফা পথের ধকল সহ্য করে ক্লান্ত-অবসন্ন। তার ওপর সর্বাদিক প্রিয়জনের বিয়ােগ-ব্যথা। যারপরনাই মর্মাহত হলেন। কোনরকমে নিজের কক্ষে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। কুৎ-অল-এর ভাবনা তার দেহ-মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। মহল ত্যাগ করার সময় যে লােক একেবারে সুস্থ-স্বাভাবিক ছিল তার মৃত্যু তাে ভাবিয়ে তােলার কথাই বটে। পরদিন সুবা হওয়ার আগে তিনি ঘরের দরজা খুললেন না। দুপুরের কাছাকাছি তার কক্ষে উজির জাফরের তলব হ’ল। জাফর এলে বললেন—“গাের খুঁড়ে আমি কুৎ-অল-এর লাশ দেখতে চাই। ব্যবস্থা কর। ।
খলিফার অভিপ্রায়ের কথা জানতে পেরে জুবেদার তাে কলিজা শুকিয়ে কাঠ। বুড়ি ক্রীতদাসী পরামর্শ দিল—কাঁদো কাঁদো মুখ করে হুজুরের পাশে গিয়ে দাঁড়ান বেগম সাহেবা। ঘাবড়াবেন না, সব ঠিক ঠাক হয়ে যাবে।
খলিফা সামনে দাঁড়িয়ে গাের খোঁড়ালেন। পুতুলের গায়ে হীরে-জহরৎ, মনি-মুক্তোর গহনাপত্র দেখে তাঁর মনে আর দ্বিধা রইল না। গােরে মাটিচাপা দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। উজির জাফরকে বললেন—সাতদিন সাতরাত্রি কোরাণ পাঠ হবে কুৎঅল-এর গােরের সামনে। মৌলভীকে খবর দাও।
বেগম শাহরাজাদ এ-পর্যন্ত বলার পর কিসসা বন্ধ করলেন। সকাল হ’ল। বাদশাহ শাহরিয়ার দরবারের দিকে পা বাড়ালেন।
একচল্লিশতম রজনী
বাদশাহ সারাদিন নানা কামকাজের মধ্যে ডুবে রইলেন। রাত্রি একটু গভীর হলে তিনি অন্দর মহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কক্ষে এলেন। বেগম শাহরাজাদ তার অসমাপ্ত কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন –‘জাঁহাপনা, কুৎ-অল-এর নকল সমাধির পাশে সাতদিন সাতরাত্রি জাঁক করে কোরাণ পাঠ করা হ’ল। খলিফা পানাহার ত্যাগ করলেন। নিজের কক্ষের মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে চুপচাপ শুয়ে কাটালেন দিনের পর দিন। দু’জন ক্রীতদাসী তাঁর পরিচর্যায় লিপ্ত রইল।
এক দুপুরে খলিফা চোখ বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে রইলেন। ক্রীতদাসী দু’জন তার পদসেবা করতে করতে সাধ্যমত গলা নামিয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল ‘খলিফা কী কাণ্ডই করছেন। এক নকল কবরের পাশে কোরাণ পাঠ করিয়ে নিজেকে প্রবােধ দিচ্ছেন। রূপসী কুৎ-অল কোথায় পড়ে রইলেন তার হদিস নেই। আর এদিকে জাঁক করে কোরাণ পাঠ করে তার বেহেস্তের পথ সাফ সুতরা করার আয়ােজন। হাসির মত কাণ্ডই বটে। দ্বিতীয়জন বলল—‘বেগম জুবেদা তাকে ওষুধ দিয়ে বেহুঁস করে কোথায় চালান দিয়ে দিয়েছেন তা কাকপক্ষী ও টের পায়নি। বেহুঁস কুৎ-অলকে কাঠের বাক্সে পুরে যে-তিনজন খােজা নিগ্রো রাত্রির অন্ধকারে প্রাসাদ থেকে নিয়ে গিয়েছিল তারা ছাড়া আর কেউ-ই কিছু জানে না। জব্বর ফন্দি করেছিলেন বেগম জুবেদা।
–‘তবে কি বেহুঁস কুৎ-অল’কে জ্যান্ত কবর দিয়ে খতম করা হয়েছে?
-খােদাতাল্লা যাকে খতম না করেন তাকে সামান্য মানুষ খতম করবে, সাধ্য কি ? শুনেছি বাগদাদ নগরের ঘানিম ইবন নামে এক যুবক বণিকের ঘরে নাকি তিন দিন গুজরান করছেন। বুড়ি দাসী আরও কত কথাই না আমাকে বলেছে। তবে অনেক কিরা কাটিয়ে তবেই আমাকে গােপনে এসব কথা বলেছে।
আচমকা সম্বিৎ ফিরে পেয়ে যেন খলিফা তড়াক করে উঠে বসলেন। উজির জাফর’কে ডাকলেন। রাগে-দুঃখে তার সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কাপতে লাগল।
উজির হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এলেন। খলিফা গর্জে উঠলেন, এখনই ফৌজ নিয়ে নগরে যাও। ঘানিম ইবন নামে বণিককে খুঁজে বের কর। যেখান থেকে, যেমন করে পার আমার সামনে হাজির করা চাই-ই চাই।'
খলিফার হুকুম তামিল করতে উজির জাফর চল্লিশজন সৈন্য নিয়ে ঘানিম-এর খোঁজে বাগদাদ নগরের উদ্দেশে যাত্রা করলেন।
ঘানিম তখন সবে নাস্তা নিয়ে বসেছে । বাড়ির বাইরে সৈন্যরা কোলাহল করতে করতে বাড়ি ঘিরে ফেলল।
বিপদ মাথার ওপরে। এখন উপায়? উপায় কুৎ-অলই বুদ্ধি খরচ করে বের করে ফেলল। ঘানিম-এর হাতে একটি ভাঙা বালতি আর ঝাড়ু ধরিয়ে দিল। আর তার মাথায় গামছা দিয়ে বেঁধে দিল এক ফেটি। কে বলবে, জমাদার ময়লা পরিষ্কার করতে আসে নি।
ঘানিম বলল—আমার জান বাঁচাবার বন্দোবস্ত তাে করলে। কিন্তু কুৎ-অল, তােমার কি হাল হবে ভেবে দেখেছ? তােমাকে কয়েদ করে'
তাকে থামিয়ে দিয়ে কুৎ-অল বলল—“আমার জন্য পরােয়া করিনা। আমাকে নিয়ে তাে তারা খলিফার সামনেই হাজির করবে। তারপর তাকে কি করে বশ করতে হয় সে কায়দা আমার ভালই রপ্ত করা আছে। তুমি আগে জান নিয়ে খিড়কি দরজা দিয়ে ভাগ।
উজির জাফর বীরদর্পে ঘরে ঢুকলেন, কুৎ-অল খাটের ওপর বসে। তার গায়ের অলঙ্কার তেমনি রয়েছে। জাফর যথার্থ ভঙ্গিতে কুর্নিশ করে বললেন—“আপনি এখানে কি করে এলেন মালকিন ?
–‘আমার নসীবেই আমাকে এখানে টেনে এনেছে।
‘মালকিন, জাহাপনার হুকুম নিয়ে ছুটে এসেছি ঘানিম ইবন আয়ুব নামে নওজোয়ানকে কয়েদ করে নিয়ে যেতে। আপনি কি তার হদিস দিতে পারেন?
—“ঠিকানা আমার জানা নেই। তবে তার আম্মার বিমারী, তাই আজ কয়েক দিন আগে এক সুবহে সে এ বাড়ি ছেড়ে গেছে। শুনেছি, দামাস্কাসে তিনি থাকেন। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উজির জাফর বললেন—“মালকিন, আপনি কি মেহেরবানি করে আমার সঙ্গে প্রাসাদে যাবেন ?
—“যাব। অবশ্যই যাব। আমি এরকমই কোন ফিকির খুঁজছিলাম। উজির জাফর কুৎ-অল’কে নিয়ে খলিফার সামনে হাজির করলেন। খলিফাকে কুর্নিশ করে বললেন-“আমরা পৌছােবার বেশ কয়েক দিন আগে ঘনিম বাগদাদ ছেড়ে দামাস্কাসে চলে গেছে, সেখানে তার আম্মা আর এক বহিন থাকে।
‘খলিফা কুৎ-অল’কে জিজ্ঞাসা করলেন—“শুনেছি, ঘানিম নওজোয়ান! তার ওমর কত ?
চব্বিশ-পঁচিশ সাল। খুব সৎ ও ধর্মপরায়ণ । আমাকে সে বে-ইজ্জত করেনি।
‘চুপ কর! তােমাকে আর তার হয়ে সাফাই গাইতে হবে না। এক নওজোয়ানের সঙ্গে এতদিন কাটাতে তােমার শরম লাগল না। কথা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে। আগুনের কাছে ঘি থাকলে কিছু না কিছু গলবেই। এবার তার দেহরক্ষী মাস্রুর কে ডেকে বললেন-“একে পিঠমােড়া করে বেঁধে অন্ধকার কয়েদখানায় ঢুকিয়ে দাও।
ক্রোধােন্মত্ত খলিফা এবার দামাস্কাসে একদল সিপাহী পাঠিয়ে দিলেন ঘানিমকে হাতকড়া পরিয়ে বাগদাদে নিয়ে আসার জন্য। সঙ্গে দামাস্কাসের সুলতান মহম্মদ ইবন সুলেমান অল এর নামে একটি চিঠিও দিয়ে দিলেন। ঘানিম ইবন আয়ুব নামে এক নওজোয়ান বণিক আছে যেন প্রেরিত সৈন্যদের সঙ্গে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। খলিফার চিঠি নিয়ে সেনাবাহিনী বাতাসের বেগে দামাস্কাসের উদ্দেশে ঘােড়া ছুটিয়ে দিল। বিশদিনের পথ আটদিনে পাড়ি দিয়ে বা মহম্মদ ইবন সুলেমান-এর দরবারে হাজির হ’ল। সুলতানের হাতে খলিফার চিঠি তুলে দিলে রক্ষী সৈন্যদের নিয়ে সুলতান স্বয়ং ঘানিম-এর বাড়ি হাজির হলেন। তার বাড়ি ঘেরাও করা হ’ল।।
সৈন্যদের কোলাহল শুনে ঘানিম-এর বহিন ফিত্না বেরিয়ে এল। সে সুলতানকে কুর্নিশ জানিয়ে বলল –“ভাইয়া তাে এক সালের ওপর বাগদাদে ব্যবসা করতে গেছে।
কয়েকদিন আগে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি এসে খবর দিয়েছে ঘানিম দুনিয়া ছেড়ে বেহেস্তে চলে গেছে। বাড়ির উঠোনে তার স্মৃতি রক্ষার জন্য একটি সমাধিসৌধও বানানাে হয়েছে। সুলতান খলিফার নির্দেশে তার আম্মা ও বহিনকে বিবস্ত্র করে দুপুর রােদে পথের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। একনাগাড়ে তিন দিন তিন রাত্রি দাঁড় করিয়ে রাখার পর শহর থেকে দূর দূর করে ভাগিয়ে দিলেন। বেগম শাহরাজাদ বললেন—জাহাপনা এবার চলুন আমরা ঘানিম-এর তল্লাসি করে দেখি, সে কোথায় আছে, কি করছে। সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছুটেই চলেছে। বাগদাদ নগর ছেড়ে পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে ছুটছে তাে ছুটছেই। শেষ পর্যন্ত এক গ্রামের এক মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নেয়। পরদিন নামাজ পড়তে এসে গ্রামের লােকজন দেখল, এক নওজোয়ান বেহুঁশ হয়ে পড়ে। তারা সেবা শুশ্রুষা করে তাকে সুস্থ করে তুলল। খানাপিনা তারাই জোগাতে লাগল পালা করে।
মসজিদের বারান্দা হ’ল ঘানিম-এর আশ্রয়স্থল। একমাস এখানেই পড়ে রইল।
একদল বণিক উটে চড়ে বাগদাদ নগরে যাচ্ছিল। গ্রামবাসী অনুরােধ করল তাকে বাগদাদের হাসপাতালে পৌঁছে দিতে। তারা সম্মত হ'ল। উটের পিঠে চাপিয়ে তাকে নিয়ে বণিকরা বাগদাদের উদ্দেশে যাত্রা করল।
বাগদাদে পৌছে বণিকের দল ঘানিম’কে হাসপাতালের বারান্দায় বসিয়ে রেখে নিজেদের কাজে চলে গেল। এক দোকানি তাকে দেখে চিনতে পারে। তাকে নিজের বাড়ি নিয়ে গেল। হেকিম ডেকে ইলাজ করাল। কিছুদিন দাওয়াই খাইয়ে কিছুটা সুস্থ সবল করে ফেল্ল। বেগম শাহরাজাদ বুঝলেন ভাের হয়ে এল বলে। তিনি এবার কিসসা বন্ধ করলেন। ভােরের আলাে ফুটে উঠলে বাদশাহ শারিয়ার নিজের কক্ষে চলে গেলেন।
বিয়াল্লিশতম রজনী
প্রায় মাঝ রাত্রে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে এলেন । বেগম শাহরাজাদ কিসার পরবর্তী অংশ বলতে শুরু করলেন। শাহরাজাদ বললেন-জাঁহাপনা, ঘানিম ক্রমে সুস্থ হয়ে উঠল। এদিকে কুৎঅল অন্ধকার ঘরে বন্দী-জীবন যাপন করতে লাগল। সে-বুড়িটি সর্বদা দরজায় বসে তাকে পাহারা দেয়। কড়া পাহারা বিদ্রোহবিক্ষোভ দমন করার কাজে খলিফা ডুবে রইলেন। কুৎ-অল-এর কথা ভুলে গেলেন। একদিন খলিফা প্রাসাদে ঢােকার মুখে কান্নার শব্দ শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বুঝলেন কুৎ-অল কাঁদছে। পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে উৎকর্ণ হয়ে রইলেন। শুনতে পেলেন কুৎ-অল কাদতে কাদতে বলছে—‘ঘানিম কেন তুমি আমার জান বাঁচাতে গেলে। তা না হলে তাে গােরস্থানে মাটি চাপা পড়ে আমি খতম হয়ে যেতাম। জানটিকে টিকিয়ে রেখেই বা ফয়দা কি হল? আমাকে সঙ্গদান করনি, সহবাস করনি তা-তাে আমি খলিফাকে বিশ্বাস করাতে পারলাম না। তবে কেন তুমি নিজেকে সংযত রেখে আমার দেহভােগ থেকে বঞ্চিত হলে? তুমি যেখানেই থাক, যখনই তােমাকে কয়েদ করতে পারুন খলিফা একদিন না একদিন তােমাকে হাতকড়া পরিয়ে শূলে চড়াবেন, নতুবা গর্দান নেবেন। তার পেয়ারের জনানার ইজ্জত বাঁচিয়ে তােমার কোন মুনাফা হ'ল। আর কেউ না জানুক, না বুঝুক আমি তাে মর্মে মর্মে অনুভব করেছি এতগুলাে নিঃসঙ্গ রাত্রি তােমাকে কী মর্মান্তিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে কাটাতে হয়েছে। তার বকশিস পেলে জান খতমের আদেশ। আর তােমার আম্মা আর বহিনের নির্যাতন। দুনিয়ায় যতদিন থাকবে আমার সঙ্গে তােমার আর মােলাকাৎ হবে না। তবে শেষ বিচারের দিন আমাদের আর খলিফার নির্দেশ কাউকে দূরে রাখতে পারবে। না। তখন আমরা কাছাকাছি মুখােমুখী হবই। কোন আইন, কোন হুকুমই আমাদের তখন আর ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না সেদিন।
এবার খলিফা হারুণ-অল-রশিদ-এর কানে জল ঢুকল। তিনি এবার নিঃসন্দেহ হলেন যে ঘানিম এবং কুৎ-অল নির্দোষ। তিনি প্রহরীকে নির্দেশ দিলেন-কুৎ-অলকে কয়েদখানা থেকে বের করে নিয়ে এসাে। কুৎ-অল এলে তিনি নিজের কৃতকর্মের জন্য বার বার মার্জনা ভিক্ষা করতে লাগলেন। আর বললেন-মেহবুবা, তােমাকে বিনা কারণে কয়েদখানায় আটক করে কষ্ট দিয়েছি, তার জন্য আমি অনুতপ্ত। প্রতিদান স্বরূপ তুমি আমার কাছে যা প্রার্থনা করবে পূর্ণ করব।
চোখ মুছতে মুছতে কুৎ-অল বলল-জাহাপনা, আমার নিজের জন্য আমি এতটুকুও ভাবিত নই। বিনা দোষে, আমাদের, বিশেষ করে আমার জন্য যে নিঃস্বার্থভাবে এত ত্যাগ স্বীকার করল সেই নির্দোষ-নিরপরাধ ঘানিমকে মার্জনা করুন।
‘মার্জনা করব কাকে, বলতে পার মেহবুবা ? তামাম বাগদাদ আর দামাস্কাস নগর চষে ফেলেও যাকে ধরা গেল না, কোন হদিসই মিলল না, তাকে আমি কিভাবে মার্জনা করে বুকে টেনে নেব, বলতে পার? তবে কথা দিচ্ছি, তুমি আমার সবচেয়ে পেয়ারের বাঁদী। তবু আমি তােমাকে তার কাজের পুরস্কার স্বরূপ তার হাতে তুলে দেব। আর তুমি যদি পার তার খোঁজ করতে পার। কুৎ-অল-এর দিলটা খুশিতে ডগমগ করে উঠল। শুকিয়ে যাওয়া কলিজাটি যেন জীবনীশক্তি ফিরে পেল। খলিফার কাছ থেকে হাজার খানেক দিনার নিয়ে দু’জন খােজাকে পথপ্রদর্শক ও রক্ষী হিসাবে সঙ্গে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল তার মেহেবুব ঘানিমের খোঁজে।
কুৎ-অল পথে নামল। এখানে ওখানে খোঁজ করতে করতে বাগদাদ নগরের এক বৃদ্ধ বণিকের মুখে শুনতে পেল, ঘানিম দিন কয়েক আগে হাসপাতালের ফটক থেকে এক পরদেশীকে তুলে নিয়ে বাড়িতে রেখেছে। হেকিমকে দিয়ে ইলাজ করিয়ে প্রায় সুস্থ স্বাভাবিক করে তুলেছে। কুৎ-অল উচ্ছসিত আবেগের সঙ্গে বলল-“আমি তাকে একবারটি দেখতে চাই। আপনি যদি অনুগ্রহ করে সুযােগ করে দেন। বড়ই উপকার হয়। বনিক কাজে ব্যস্ত। তার পক্ষে কাজ ফেলে এখন কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। তাই তার এক বালক কর্মচারীকে দিয়ে কুৎ-অল কে তার বাড়ি পাঠাবার ব্যবস্থা করল। কুং-অল বণিককে সুকরিয়া জানিয়ে পথে নামল।
কুৎ-অল বণিকটির বাড়ি গিয়ে দেখে ঘনিম বারান্দায় আরাম কেদারায় বসে বিশ্রাম করছে। হাড্ডিসার চেহারা। দেখলে চেনাই যায় না। কুৎ-অল উচ্ছসিত আবেগে জড়িয়ে ধরল তাকে। সােহাগে-আদরে ভরিয়ে তুলল। খলিফা তাদের চার হাত এক করে দেবার অভিপ্রায় জানিয়েছেন, একথা জানাতেও ভুল করলেন না। কুৎঅল সঙ্গে নিয়ে আসা এক হাজার দিনার বণিকের বিবির হাতে দিয়ে বলল—মেহেরবানি করে বড় হেকিমকে নিয়ে ওর ইলাজ করাবেন। ভাল দাওয়াই ও ফল-দুধ দেবেন। পরে আরও দিনার পাঠিয়ে দিচ্ছি। কুৎ-অল ঘানিমকে সে বণিকের বাড়িতেই রেখে দিল। আর একটু সুস্থ না হলে তাকে খলিফার প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এত দূরের পথ। পথের ধকল সইতে পারবে না। কুৎ-অল এবার ঘানিম ও বণিকের বিবির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিল।
পরদিন দুপুরের পর কুৎ-অল আবার বণিকের বাড়ি এল ঘানিমকে দেখতে। বণিক বলল—“বেটি, গতকাল তুমি বিদায় নেবার পর এক ভিখারী আমার গুদামে এসেছিল। মনে হল পরদেশী। মনে হল ভিক্ষে সিক্ষে করে দিন গুজরান করে। পরে বাতচিত করে বুঝলাম, তুমি যার খোঁজ করছ তারাও তারই খোঁজে ছুঁড়ে বেড়াচ্ছে। ঘানিম ইবন-আয়ুবকে খুঁজছে। তাদের আস্তানার ঠিকানা আমি রেখে দিয়েছি। এক সরাইখানার বারান্দায় রাত্রি কাটায়। আর দামাস্কাসে নাকি তাদের ঘর।
দামাস্কাসের নাম শুনেই কুৎ-অল চমকে উঠে। আপন মনে বলে ওঠে, তবে কি ঘানিম-এর আম্মা আর বহিন !!
কুৎ-অল -এর অনুরােধে তার বালক-কর্মচারীটি এক দৌড়ে গিয়ে এক জনানা আর লেড়কিকে নিয়ে এল। কুৎ-অল তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারল, তারা ঘানিম-এর আম্মা আর বহিনই বটে। সে হাতের দিনারের থলিটি বণিকের হাতে দিয়ে বল্ল—“আপনি আমাদের জন্য অনেকই করেছেন। আরও একটি অনুরােধ করে আপনাকে বিব্রত করতেই হচ্ছে। মেহেরবানি করে এদের দু'জনেরও দেখভাল করবেন। খােদা আপনার ভাল করবেন ।
বণিক মুচকি হেসে বল্ল-“বেটি, আমি সাধ্যমত এদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করব। এমন সময় বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।
তেতাল্লিশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কক্ষে এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন – ‘জাহাপনা, কুৎ-অল বণিকের হাতে দিনারের থলেটি এবং ঘানিম-এর আম্মা ও বহিনকে গচ্ছিত রেখে নিশ্চিন্ত মনে বিদায় নিল।
দু’দিন বাদে কুৎ-অল আবার সে বণিকের বাড়ি তার মেহবুব ঘানিম -এর সঙ্গে মিলিত হতে গেল। ঘানিম এখন অনেক সুস্থ। হাঁটাচলা করতে পারে। বণিক ও তার বিবিকে বহুভাবে সুকরিয়া জানিয়ে সে ঘানিম ও তার মা-বহিনকে নিয়ে খলিফার প্রাসাদে এল।
খলিফা তখন খাস মহলে বিশ্রামে রত। এক তলার একটি ঘরে ঘানিম আর তার আম্মা ও বহিনকে বসিয়ে রেখে কুৎ-অল খলিফার কামরায় গেল। সব বৃত্তান্ত তাকে জানাল। খলিফার নির্দেশে সে ঘানিম আর তার আম্মা ও বহিনকে তার ঘরে নিয়ে গেল। ঘানিম খলিফাকে যথােচিত ভঙ্গিমায় কুর্নিশ জানিয়ে বলল–বান্দা হাজির জাঁহাপনা। খলিফা সংক্ষেপে তার কুশল বার্তাদি নিলেন। তার পরে মুচকি হেসে বললেন – “শােন, তুমি আমার ছােটা ভাইয়ার মত। ভুল করে তােমার প্রতি অবিচার করেছি। আশা করি আমার মুখের দিকে চেয়ে ওসব কথা মন থেকে ঝেড়ে মুছে ফেলে দেবে। কুৎ-অল এর মুখে হয়ত শুনে থাকবে আমি আমার পিয়ারের বাঁদীকে তােমার হাতে সঁপে দেব মনস্থ করেছি। অবশ্য যদি তুমি একাজে স্বেচ্ছায় সম্মত হও তবেই – তার মুখের কথা শেষ হবার আগেই ঘানিম বলে উঠল‘জাহাপনার হুকুম তামিল করতে আমি দোজকেও যেতে রাজি আছি।
—“আর একটি কথা। আমি ভুল করে তােমার আম্মা ও বহিনের ওপরও কম অবিচার করিনি। সংক্ষেপে বলতে গেলে আমি তাদের বে-ইজ্জতই করেছি। এর জন্য আল্লাহ আমার গুণাহ মার্জনা করবেন না। আমার কৃত-অপরাধের প্রায়শ্চিত্তের চিন্তাও আমি করে রেখেছি। তােমার আম্মার আমৃত্য ভরণপােষণের ভার আমি স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিলাম। মেহমানের মত নয় আপনজনের মত আমার প্রাসাদে তিনি থাকবেন। আর তােমার বহিন ফিত্নাকে আমি শাদী করে বেগমের মর্যাদা দেব। তােমার কোন ওজর আপত্তিই আমি শুনতে নারাজ।
উচ্ছসিত আবেগের সঙ্গে ঘানিম বলল—জাহাপনা, এ তাে আমার কাছে আশমানের চাঁদ হাতে পাওয়ার সামিল! ওজর আপত্তির তাে প্রশ্নই ওঠে না।
—“আমার অবিমৃষ্যকারিতার জন্য তারা একদিন যা হারিয়েছে তা ফেরৎ দেওয়ার সাধ্য আমার নেই ঘানিম। তাই অনন্যোপায় হয়েই আমাকে এ-পথ বেছে নিতে হ’ল। এতে তােমার কুণ্ঠিত বা শরমের ব্যাপার কিছু নেই।
এবার খলিফা কাজীকে তলব করলেন। কাজী এলে তাকে দিয়ে দু’টি শাদীর কবুলনামা বানিয়ে নিলেন। তার একটি খলিফা ও ফিত্নার আর দ্বিতীয়টি ঘানিম ও কুৎ-অল এর শাদীর কবুলনামা।
সেদিনই খলিফা হারুণ-অল-রশিদ-এর প্রাসাদে শাদীর আয়ােজন করা হ’ল। একে খলিফার শাদী তার ওপর দু'-দু'টি শাদী একই রাত্রে, একই প্রাসাদে সম্পন্ন হচ্ছে। কম কথা! বাদশাহী খানাপিনার ব্যবস্থা করা হ’ল। আর দামী সরাবের ঢালাও ব্যবস্থাতাে রয়েছেই। মহাধুমধামের সঙ্গে শাদীর পাঠ চুকল। খলিফার প্রাসাদে তিনদিন উৎসবের রােসনাই বয়ে চলল।
বেগম শাহরাজাদ বললেন—জাহাপনা, ঘানিম আর কুৎ-অল -এর কিসসা তাে শুনলেন। এবার আপনি যদি উৎসাহী হন তবে আমি উমর-অল-নুমান এবং তার লেড়কাদের কিস্সা শুরু করতে পারি। বাদশাহ অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে বললেন—‘মেহবুবা, তােমার কিসসা আমার দিল কেড়ে নিয়েছে। তুমি নির্দ্বিধায় কিসসা শুরু করতে পার।
বাদশাহ উমর-অল নুমান এবং তার লেড়কার কিসসা
বাদশাহ শারিয়ার-এর উৎসাহে বেগম শাহরাজাদ উমর-অল নুমান এবং তার লেড়কাদের কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, বাগদাদে উমর-অল-নুমান নামে এক বাদশাহ রাজত্ব করতেন। খলিফাদের রাজত্বের শেষের দিককার কথা। তিনি ছিলেন যুদ্ধবিদ্যায় যথার্থই বিশারদ। আসলে অস্ত্র চালনায় তার সমকক্ষ কেউ-ই ছিল না। দোর্দন্ড প্রতাপশালী বাদশাহ প্রাচ্যের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের ওপরই আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দুর্ধর্ষ দিগ্বীজয়ী বীর জুলিয়াস সীজারও তার অস্ত্রকে সমীহ করতেন। বাদশাহ উমর-এর একমাত্র লেড়কার নাম ছিল সারকান। সেও তার আব্বার মত দুর্ধর্ষ যােদ্ধা ছিল। আর তার রূপও ছিল অনন্য। একমাত্র লেড়কা বলেই হয়ত বাদশাহ উমর তাকে নিজের...... ( চলবে )

0 Comments