গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
আমি মালিকের বাসন কোসন আসবাবপত্র আর লেপ-তােষক প্রভৃতি নষ্ট করেছি এই অজুহাতে মালিক আমাকে খােজা করে দিলেন। খােজার বাজারদর সাধারণ ক্রীতদাসের চেয়ে বেশী বলে আমাকে আবার ক্রীতদাসের বাজারে পাঠিয়ে দেওয়া হল। এভাবে বার বার বিক্রি হতে হতে এক সময় এক খলিফা আমাকে কিনে নিয়ে গিয়ে হারেমের কাজে লাগিয়ে দিল।
নিগ্রো বুখাইতের খােজা হওয়ার কিসসা
কাফুর নামে নিগ্রো যুবকটি তার খােজা হবার কিস্সা বলার পর এবার বুখাইত নামে এক যুবক একটু নড়ে চড়ে বসে তার কিসসা শুরু করল। সে বলল—“আমার খােজা হবার কিসসা তােমাদের কাছে তুলে ধরছি। সত্যি বলতে কি, আমার জীবনের ঘটনা যেমন এলােমেলাে তেমনি খুবই দীর্ঘও বটে। তবে কাটছাঁট দিয়ে সাধ্যমত অল্প কথায় বলছি। আমি এক বাড়ি ক্রীতদাসরূপে থাকতাম। আমার মালকিনটির বয়স ছিল কম। ছিমছাম চেহারা। যাকে বলে একেবারে ডাঁসা পেয়াবার মত। আমি কাজের ফাকে তার দিকে আড় চোখে তাকিয়ে থাকতাম। চেষ্টা করতাম তার মনের খবর নিতে। সে তার শরীরের যৌবনচিহ্নগুলাে ঢেকেঢুকে রাখলেও মাঝে মধ্যে তার কাপড় চোপড় কেমন বেসামাল হয়ে পড়ত। তার নিটোল স্তনদুটোর এক বিরাট ভগ্নাংশই কামিজের ফাক দিয়ে উঁকি মারত। আসলে সে দুটো ছিল এতই বড় যে কামিজের তলায় বন্দী হয়ে থাকতে চাইত না। বিদ্রোহ করত। আমার সুযােগ সন্ধানী চোখ দুটো সে-সুযােগের প্রতীক্ষায় সর্বদা ছোঁক ছোঁক করত। আর থেকে থেকে আমার খুনে ধরে যেত মাতন। নিজেকে আর সংযত রাখা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ত। একদিন আমার মালিক এক জরুরী কাজে বাইরে গিয়েছিলেন। আমরা দুটোমাত্র প্রাণী বাড়িতে। আমার মাথার দুষ্ট পােকাগুলাে কিলবিলিয়ে উঠল। আমার কুড়ি বছরের যৌবনকে আর নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে রাখতে পারলাম না। অতর্কিতে ঝাপিয়ে পড়লাম মালকিনের ওপর। তারপর কি হ’ল আশাকরি আর খুলে বলার দরকার নেই। সেদিনের সে সাময়িক আনন্দানুভূতিই আমার কপাল পােড়ার একমাত্র কারণ।।
আমার মালিক বাড়ি এসে সবকিছু শুনলেন। আমাকে নিয়ে ছােট্ট এক কামরায় তালাবন্ধ করে রেখে দিলেন। পরদিন সকালে নাপিত এসে পুরুষের যা অমূল্য সম্পদ সেটি ছেদন করে আমাকে সারা জীবনের মত খােজা করে দিল।
আমার জীবনের দুঃখের কিসসা যদি আরও খােলাখুলি শুনতেই চাও পরে না হয় একদিন সুযােগ-সুবিধামত শােনাব। আজ চল। কোদাল চালিয়ে গর্ত করার কাজটি সেরে ফেলা যাক।
এবার তিন নিগ্রো যুবক বাক্সটির মাপে একটি গর্ত খোড়ার কাজে উঠে পড়ে লেগে গেল। কঠোর পরিশ্রম করে বাঞ্ছিত গর্তটি খুঁড়ল। তারপর ধরাধরি করে তার মধ্যে বাক্সটি ঢুকিয়ে দিল। ব্যস্ত হাতে মাটিচাপা দিল। তারপর তারা কোদাল আর লণ্ঠনটি নিয়ে গােরস্থান ছেড়ে গেল।
সওদাগর আয়ুব ও ঘানিমের কিসসার শেষাংশ
নিগ্রো যুবক তিনটি বিদায় নিলে ঘানিম নারকেল গাছ থেকে নামল। ব্যস্ত-হাতে মাটি তুলে বাক্সটিকে গর্ত থেকে বের করে আনল। পাথর দিয়ে আঘাত করে তালাটি ভেঙে ফেলল। বাক্সের ডালা তুলতেই সচকিত হয়ে পড়ল। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ার জোগাড়। শরীরের সবক'টি স্নায়ু যেন একসঙ্গে ঝঝনিয়ে উঠল। এক রূপসী তন্বী যুবতী চোখবুজে শুয়ে খুবসুরৎ লেড়কি ঘুমিয়ে রয়েছে। তার পরনে সােনার জরির কাজ করা বহুমূল্য সিল্কের পােশাক। জড়ােয়া হার, হীরের নাকছাবি, টায়রা, বিছা আর হীরা - জহরত ব্যবহৃত তাগা—সবই রয়েছে একনজরে দেখলেই মনে হয় কোন বাদশাহ বা সুলতান নিদেন পক্ষে কোন প্রখ্যাত উজিরের লেড়কি। ঘানিম বিস্ময়ের ঘাের কাটিয়ে এক সময় তার বুকের ওপর হাত রাখল। বেশ গরমই বােধ হ’ল তার। নিঃসন্দেহ হ’ল, জীবিত। নাকের কাছে কোন ওষুধ ধরে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। তার নাকের কাছে নিজের নাকটি এগিয়ে নিল। হ্যা, ওষুধের গন্ধ পেল। লেড়কিটি ঘুমে একেবারে অচৈতন্য। বারকয়েক আলতাে করে ধাক্কা দিল, কোনই সাড়া নেই। নাকের ছিদ্রপথে সরু একটি কাঠি ঢুকিয়ে শুড়সুড়ি দিল। মনে হল নাকটি সরিয়ে নিতে চাচ্ছে। তারপর বার কয়েক হাঁচি দিল। আরও কয়েক মুহূর্ত এভাবে থাকার পর এক সময় চোখ মেলে তাকাল রহস্যময়ী লেড়কিটি। মনে হল লেড়কিটি যেন তার সামনের সবকিছুকে আবছা দেখছে। তখনও তার মধ্য থেকে তন্দ্রা ভাৰ কাটে নি।
এক সময় লেড়কির ঠোট দুটো তিরতির করে কাপতে লাগল। মনে হল কিছু বলতে চাইছে। প্রায় অস্ফুট অস্পষ্টতার স্বর। উৎকর্ণ হয়ে শােনার পর ঘানিম তার কথায় টুকরাে টুকরাে দু'-একটি শব্দের অর্থ উদ্ধার করতে পারল। একটু পানি, একটু পানি দাও। কী গৰম! বাতাস, এ ক ট বা তাস।'
ব্যস, আবার এলিয়ে পড়ল। চোখ গেল আগের মতই বন্ধ
মিনিট খানেক যেতে না যেতেই এবার অধিকতর স্পষ্ট উচ্চারণ করে বলতে লাগল - ‘বাতাস! রাজিয়া, সীতারা আয়, আমার কাছে আয়। একটু বাতাস কর? উঃ কী গরম! সব জ্বলেপুড়ে গেল। কে জবাব দেবে? কোথায় তার রাজিয়া, আর কোথায়ই বা সীতারা। কে-ই বা তার কাছে যাবে বাতাস করবে। ঘানিম আর বাক্সের ভেতরে শায়িতা লেড়কিটি ছাড়া ধারে-কাছে কেউ থাকলে তো তার কথায় সাড়া দেবে।
এবার তার দৃষ্টি যেন কিছুটা স্বচ্ছ হয়ে আসছে মনে হ’ল। সে অস্থিরভাবে এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফেরাতে লাগল। এক সময় আর্তনাদ করে উঠল—আমি কোথায়? আমি এখানে, গােরস্থানে কেন? কে আমাকে এ-গােরস্থানে নিয়ে এল? আমার প্রাসাদ ? প্রাসাদের হারেম? আমার নােকর, নফর আর খােজারা সব গেল কোথায়? খােদা—কে এরকম সর্বনাশ আমার করল? কোন বেইমান আমাকে গােরস্থানে পাঠাল?’
লেড়কিটি এবার ঘানিমের মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তাকাল। ঘানিম বলল—রূপসী, আমি ঘানিম ইবন আয়ুব। প্রাসাদ ছেড়ে এ নির্জন গােরস্থানে এসে পড়লেও তােমার ভয়ডরের কোন কারণ নেই। আমি থাকতে তােমার কোন ক্ষতিই কেউ করতে পারবে না, বিশ্বাস রাখ। যদি পারি তােমার উপকারই করব, সর্বনাশ করতে তিলমাত্র চেষ্টাও করব না, বিশ্বাস রাখতে পার। খােদাতাল্লা হয়ত তােমার সাহায্যের জন্যই আমাকে এখানে এনে ফেলেছেন। নইলে আমার এখানে আগমন তােমার আগমনের মতই একেবারে অপ্রত্যাশিতই বটে। লেড়কিটি এবার বলল —“আমি কি খােয়াব দেখছি? তা নইলে এখানে, এ-গােরস্থানে এলাম কি করে ?
ঘানিম এবার তিন খােজা নিগ্রো যুবকের কীর্তির কথা তার কাছে ব্যক্ত করল।
লেড়কিটি এবার যেন কিছুটা স্বাভাবিক হতে পেরেছে। ঘানিমকে বলল —এক কাজ কর। আমি বাক্সের মধ্যে যেমনটি ছিলাম ঠিক তেমনি রেখে তালা দাও তারপর একটি খচ্চর জোগাড় করার কোসিস কর। তােমার ঘরে আমাকে নিয়ে চল। আমার সব কথা, আমার করুণ কাহিনী তােমাকে শােনাব।
সকাল হতে না হতেই ঘানিম একটি খচ্চর জোগাড় করে ফেলল। তার পিঠে বাক্সটি চাপিয়ে নিজের ভাড়া বাড়ির দিকে যাত্রা করল। তার বাসায় পৌছােতে একটু বেলাই হয়ে গেল। কিসসার এ-পর্যন্ত বলার পর ভাের হয়ে আসছে বুঝতে পেরে বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করল।
চল্লিশতম রজনী
বাদশাহ শারিয়ার আজ অন্যদিনের চেয়ে একটু আগেই বেগম শাহরাজাদ-এর কাছে এলেন। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, ঘানিম খচ্চরের পিঠ থেকে লেড়কিটিকে বাক্স সমেত নামিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে গেল। ডালা খুলে তাকে বের করে তাকে পালঙ্কে বসাল। সে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিমেলে ঘরের সব কিছু দেখতে লাগল।
ঘানিম লেড়কিটি থেকে যথা সম্ভব দূরে খাটের এক কোণে বসল। ব্যাপারটি কিন্তু লেড়কিটির মনের মত হ’ল না। সে সরতে সরতে একেবারে ঘানিম-এর গা-ঘেঁষে বসল। খিল খিল করে হেসে বলল-“তুমি যেন আমার সঙ্গে কেমন করছ। এত দূরে বসলে কখনও ভাল লাগে ছাই। দূরে দূরেই যদি রাখবে তবে গােরস্থান থেকে নিজের ঘরে নিয়ে এলে কেন?
ঘানিম কি জবাব দেবে ভেবে না পেয়ে বােকার মত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। এক সময় আমতা আমতা করে। বলে—বলছিলাম কি, মানে।
-“থাক খুব হয়েছে ! এবার দেখতাে ঘরে খাবার কিছু আছে কিনা। খিদেতে পেটের ভেতরে আগুন জ্বলছে। ঘানিম উঠে গিয়ে বয়ম থেকে কয়েকটি লাড্ডু এনে লেড়কিটির সামনে রাখল।
সে একটি লাড্ডু তুলে নিয়ে ঘানিম-এর মুখে পুরে দিল। লেড়কিটির আঙুল ঘানিম-এর ঠোট দুটো স্পর্শ করা মাত্র কেমন এক বিচিত্র অনুভূতি তার দেহ মনে জাগে। সর্বাঙ্গে বিদ্যুতের শিহরণ দেখা গেল। সে স্তম্ভিত হয়ে যায়। কোন নারীর দেহের স্পর্শ এর আগে সে আর মুহূর্তের জন্যও অনুভব করে নি। জীবনের নতুনতর ‘স্বাদ’, নতুনতর উত্তেজনা, নতুনতর আনন্দ সে আজ অনুভব করল। লেড়কিটি আরও সামান্য কাছে ঘেঁষে বসল। নিজের মুখটি তার মুখের কাছাকাছি নিয়ে গেল।
ঘানিম নির্বিকার। ভেতরের উত্তেজনাকে জোর করে প্রশমিত করল। লেড়কিটি এবার অভিমানের স্বরে বলল—“আহা, এমন লজ্জা শরম তাে ভাল নয়।
ঘানিম এবারও নির্বাক ও নির্বিকার রইল। চোখের তারা দু’টো জ্বল জ্বল করতে থাকে। লেড়কিটি আবেগ মৃধুর স্বরে বলল-আরে, এমন করলে তাে চলবে না। আমাকে ঘরে নিয়ে এসে অনাদর করবে। আমি যে আজ তােমার মেহমান গাে। মেহমানকে আদর-আপ্যায়ন করতে হয় তাও বুঝি তােমার জানা নেই? লাড্ডু এনে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতে চাচ্ছ নাকি ? খাইয়ে দেবে না? আমাকে খাইয়ে দাও।
ঘানিম একটি লাড্ড নিয়ে ওর মুখে গুঁজে দেয়। তারপর বদনা থেকে জল দিতে গিয়ে তার কামিজে কিছুটা জল ফেলে দেয়। লজ্জা, আতঙ্ক ও ব্যস্ততার জন্য এমন একটি অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটে গেল।
লেড়কিটি বলল—‘এতে কিছু হবে না। কিন্তু তােমার ঘরে কি অতিরিক্ত কামিজ টামিজ আছে?
–কামিজ ? আমি কামিজ পাব কোথায়? আমি কি শাদী করেছি যে কামিজ থাকবে?
–তাই বল। তবে তাে তুমি একেবারে সতী গাে। ঘানিম দৌড়ে গিয়ে একটি শুকনাে তােয়ালে নিয়ে এল।। লেড়কিটি খিল খিল করে হেসে উঠল।
ঘানিম বলল –হাসছ কেন? এতে আবার হাসার কি হল বুঝছি না তাে। তােয়ালেটি দিয়ে মুছে ফেল।
—“থাক, মুছতে হবেনা। একটু-আধটু ভেজাটেজা থাকা ভাল। নইলে আবার তােমার মত কাঠখােট্টা হয়ে যাব যে!” লেড়কিটি ঘানিমকে দিয়ে সরাবের বােতল আনাল। নিজে খেল, ঘানিমকেও খাওয়াল। খুব মৌজ করে খেল। সরাবের নেশায় লেডকিটির চোখ দুটো আবেশে জড়িয়ে আসতে লাগল। সে ঘানিম-এর কোলে মাথা রেখে শরীর এলিয়ে দিল। ঘানিম-এর দেহ মনে এক অনাস্বাদিত পুলকের সঞ্চার হয়। শিরায় উপশিরায় রক্তের গতি ক্রমে দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে থাকে। এরকম অনুভূতির স্বাদ এর আগে কোনদিনই সে পায় নি।
লেড়কিটির চোখ দুটো আবেশে ঢুল ঢুল হয়ে আসতে থাকে। আবেগ মধুর স্বরে বলে –“তুমি যেন একটা কি! কিছু বোেঝ না! হাতের আঙুলগুলাে দিয়ে আমার মাথায় একটু বিনি কেটে দাও না গাে।
কয়েক মুহূর্ত পরে লেড়কিটি অনুযােগের স্বরে বলে—এ হচ্ছে কি, শুনি? একে বুঝি মাথায় হাত বােলানাে বলে ? ঘানিমের শরমে মরে যাবার জোগাড় হল। আসলে কখন যে লেড়কিটির মাথা থেকে হাতটি তার গালে নেমে এসেছিল তা সে নিজেই জানে না। ফলে আচমকা হাতটি তুলে নিয়ে এল। আবার মাথায় রেখে আলতােভাবে চুলে বিনি কাটতে লাগল।
লেড়কিটি আনন্দানুভূতিতে চোখ দুটো বন্ধ করে ঘানিম-এর কোলে পড়ে থাকে।
ঘানিম সুযােগের সদ্ব্যবহার করতে গিয়ে লেড়কিটির আপেল রাঙা তুলতুলে ঠোট দুটোর দিকে সতৃষ্ণ নয়নে তাকিয়ে থাকে। আবার মাথা থেকে হাতটি নেমে এল তার বিদায়ী সূর্যের রক্তিম আভার মত টুকটুকে গাল দুটোর ওপর। মসৃণ, নরম ও নিটোল, আঃ কী বাহার! কী বাহার! লেড়কিটি আবার সরবে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে বল্ল
—কি গাে, হেরে গেলে দেখছি? হাতটি যে আবারও মাথা থেকে গালে নেমে এল। এবার বুঝলাম, তুমি যতই ভেজা বেড়ালের মত থাক না কেন, আসলে কিন্তু তা নয়। এক কাজ কর। আর এক বােতল সরাব নিয়ে এসাে। নেশার ঝোক কেটে গেলে দিনটিই বরবাদ হয়ে যাবে।
তারা সারাদিন সরাব পান, গানাবাজনা, হাসি-তামাশা প্রভৃতির। মাধ্যমে কাটিয়ে দিল। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রির অন্ধকার নেমে এল বাগদাদ নগরীর বুকে। ঘানিম তার মেহমানকে নিয়ে পালঙ্কের ওপরে বসে তার অতীত-জীবনের কথা শােনায়।
রাত্রি এমে গভীর হয়। তারা আরও কাছাকাছি একেবারে গা ঘেষা-ঘেষি করে বসে। সারাদিন ঘানিম নিজেকে সংযত রেখেছে। যৌবনের ক্ষুধা তাকে উত্তেজিত করেছে, খুনে জাগিয়েছে মাতন। তবু অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত রেখেছে। কিন্তু এবার তার দেহ-মন দুটো যেন তার আয়ত্বের বাইরে চলে যেতে লাগল। সে লেড়কিটিকে হাত দুটো বাড়িয়ে দিয়ে জড়িয়ে ধরল নিজের ঠোট দুটোকে তার তুলতুলে ঠোট দুটোর ওপর রাখল। চুম্বন করল, এক-দুই-তিন করে বহুবার।
লেড়কিটি ভাবাপ্লুত কণ্ঠে বলে উঠল—“সত্যি মেহবুব, এবার মনে হচ্ছে তােমার মধ্যে পৌরুষত্ব রয়েছে। পুরুষ মানুষ যদি সত্যিকারের পুরুষের মত না হয় তবে কোন লেড়কিরই মন ভরে না। পুরুষের দাঁতের কামড়ে আমার ঠোট দিয়ে রক্ত ঝরার মধ্যেই আনন্দানুভূতি। আর ? তােমার হাত দুটো আমার যৌবনকে পিষ্ট করবে, তােমার প্রশস্ত বুকের চাপে আমার শ্বাসরুদ্ধ হবার উপক্রম হবে তবেই তােমাকে সত্যিকারের পুরুষ মানুষ বলে মনে হবে। কোথায় তুমি আমার মধ্যে কামস্পৃহা জাগিয়ে তুলবে তা নয় তাে আমি লেড়কি হয়ে তােমার যৌবনকে সারাদিন ধরে উদ্দীপিত করলাম।'
—“তুমি এমন করে বলছ কেন? আমার জীবনে প্রথম নারী তুমি। তাই লজ্জা শরম একটু তাে হওয়াই স্বাভাবিক।
ক্রমে রাত্রি গভীর হয়। ঘানিম আর লেড়কিটি আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে বেশ কিছু সময় পড়ে রইল। লেড়কিটির খুনে মাতন লাগে, ক্রমে কামােন্মাদন জাগে। কিন্তু ঘানিম নিজেকে সংযত রাখে।
লেড়কিটি আব্দারের সুরে বলে -মেহবুব, কেবলমাত্র আলিঙ্গন, শােষণ আর দলনে যে আমার মন ভরবে না। আমার সম্ভোগ-তৃষ্ণা --
এত উতলা হচ্ছাে কেন, বলতাে? তুমি বা আমি-কেউ-ই তাে আর এখান থেকে ভেগে যাচ্ছি না যে, যা কিছু দেনা-পাওনা আজ রাত্রের মধ্যেই মিটিয়ে নিতে হবে।
লেড়কিটি ঘানিম-এর গালে একটি টোকা দিয়ে বল্ল —“মেহেবুব, তােমাকে কিছুতেই চাঙ্গা করে তুলতে পারছিনে এটাই আমার কাছে তাজ্জব ব্যাপার মনে হচ্ছে। জান, আমাকেই একদিন না একদিন চলে যেতেই হবে।'
ঘানিম তার মুখটি লেড়কিটির বুকের মধ্যে গুঁজে দিল। কয়েক মুহূর্ত পরে মুখ তুলে বলল—“তুমি চলে যাবে? কেন যাবে? কোথায় যাবে?
—“স্বেচ্ছায় যাব না। ওরা আমাকে খুঁজে বের করবেই। তারপর টেনে হিচড়ে নিয়ে যাবে এখান থেকে।
লেড়কিটি এবার তার জীবনের কিসসা বলতে লাগল। আমি খালিফা হারুণ-অল রসিদ-এর বাঁদী। খুবই পিয়ারের বাঁদী। আমাকে তিনি আদর করে কুৎ-অল-কুলুব বলে সম্বােধন করেন। খুব কম বয়স থেকে আমি তার প্রাসাদে বাস করছি। আমার সুখ উৎপাদনের জন্য তিনি সর্বদা সচেষ্ট থাকেন। হীরা-জহরৎ,মনিমাণিক্য দিয়ে আমার গা-সাজিয়ে রেখেছেন। আমার রূপসৌন্দর্যের কদর দিতে গিয়ে অধিকাংশ রাত্রিই তিনি আমার মহলে কাটাতেন। আমার এরকম দহরম মহরম সবার, বিশেষ করে বেগম জুবেদা বরদাস্ত করতে পারত না। হিংসায়-রাগে-দুঃখে-অপমানে সে সর্বদা জ্বলে-পুড়ে খাক হ'ত। তাই সে তার চক্ষুশূল আমাকে দুনিয়া থেকে সরাবার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হ’ল। ফিকির খুঁজতে লাগল। গত রাত্রে উদ্দেশ্য সিদ্ধ করল। খলিফা মহলের বাইরে। খলিফা সুবায় গেছেন বিদ্রোহী প্রজাদের কজা করতে।
আমার নােকরানীর সংখ্যা বারােজন। তাদের একজনের সঙ্গে জুবেদার সাঁট রয়েছে। গতরাত্রে অন্যদিনের মত আমাকে সরবৎ দেয়। তাতে বিষ মেশানাে ছিল। সরবতের ব্যাপারটি আমাকে ধন্দে ফেলে। মন মােচড় মেরে ওঠে। মন শক্ত করে জেগে থাকলাম। বিষক্রিয়া শুরু হল। কিছুক্ষণ বাদে নােকরানীটি এসে আমাকে শুতে বলল। আমিও আর বসে থাকতে পারছিলাম না। তার কথামত পালঙ্কে গেলাম। কাৎ হয়ে পড়ে গেলাম। ব্যস, তারপরই উদ্ভট একটি উগ্র গন্ধ অনুভব করলাম। হাত-পা—সর্বাঙ্গ কেমন অবশ হয়ে আসতে চাইলেও আমার চেতনা একেবারে লােপ পায় নি। সব কিছু শুনতে পাচ্ছি, বুঝতে পারছি, কিন্তু মনের ভাব ব্যক্ত করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছি।
আমার কানে এল, জুবেদা আমার কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে। বলছে-কাফুর, বুখাইত আর সাবাবকে ঠিক করা আছে। তাদের বল কাঠের বাক্সটি নিয়ে এসে ঝটপট কাজ হাসিল করে ফেলতে। তিন খােজা এল। আমার নিঃসার দেহটিকে অতিকায় কাঠের বাক্সটিতে ঠেসে ভরে দিল।
আবার জুবেদার কণ্ঠস্বর শােনা গেল—গােরস্থানে নিয়ে গিয়ে গাের দিয়ে আয়। রাত্রেই—ভাের হবার আগেই মহলে এসে আমাকে জানাবি।
আমি শুনছি, বুঝছি সবই। কিন্তু কিছুই বলতে পারছি না, করতে তাে পারছিই না। তখন আমার কী মর্মান্তিক অসহায় অবস্থা। একবারটি ভেবে দেখ মেহেবুব।
একটি কথা কি জান মেহেবুব, আমি তখন নিঃসার হয়ে পড়ে থাকায় ভালই হয়েছে। দাওয়াই ধরে নি বুঝলে জুবেদা হয়ত ছােরা দিয়ে আমার কলিজাটি ছেদাই করে দিত। পাঠিয়ে দিত একেবারে বেহেস্তে।
মেহেবুব, পরবর্তী যা কিছু ঘটনা সবই তাে তােমার চোখের ওপরেই ঘটেছে। সবই খােদার মর্জি। তুমি পরদেশী। গােরস্থানে তখন তাে তােমার যাবার কথা নয়। অথচ তুমি সেখানে ছিলে। খােদার মর্জি না হলে এ কী হওয়া সম্ভব ছিল, বল ?
ঘানিম রুদ্ধশ্বাসে রূপসী তন্বী যুবতী কুল-অল-কুলুব-এর কিসসা শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। সর্বাঙ্গে ঘাম দেখা দেয়। মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে। আপন মনে সে বলে ওঠে—‘হায় খােদা! এ আমি কি করতে চলেছি। পয়গম্বর খলিফা হারুন-অল-রশিদের পিয়ারী! তাকে স্পর্শ করলেও গুনাহ হবে, যেতে হবে দোজকে, ঘানিম খাট থেকে নেমে একটি কুর্শিতে গিয়ে বসল। কুৎ-অল কুলুব এর কারণ ঠাহর করতে পারল না। সে সবিনয়ে বলে—“সে কী মেহেবুব, ওখানে চলে গেলে যে বড়!
–‘তুমি খলিফার পিয়ারী, তােমার দিকে নজর দিলে আমি যে অন্ধা হয়ে যাব। তুমি খাটে শােও। আমি নিচে বিস্তারা বিছিয়ে শুয়ে পড়ব।
–‘পাগল কাহাকার! তা-ই আবার হয়। খাটে চল, এক সঙ্গে শোবে । আমি তােমাকে বলছি। গুণাহ-ই যদি কিছু হয়, তাে আমার।
ঘানিম প্রবল আপত্তি তােলে। পুরাে রাত্রি কুর্শিতে বসেই কাটায়। কাকডাকা সকালে সে বাজারে চলে গেল। বাদশাহী খানা খরিদ করল। ঘরে মেহমান, তার দিলখুশ করার জন্য গুলাব পানি, আতর, মনমৌজী রঙ বেরঙের ফুল আরও খুঁটিনাটি কত সব সমানপত্র খরিদ করে ঘরে ফিরল।
কুৎ-অল একটু আগে পর্যন্ত নিদ যাচ্ছিল। ঘানিমকে দেখে আড়মােড়া ভেঙে খাট থেকে নামল।
কুৎ-অল বলল -এর মধ্যে বাজার সেরে এলে? আমাকে একেলা ফেলে -'
—“আরে তুমি খলিফার পিয়ারী, আমার মেহমান। আদর আপ্যায়নের গতি হলে আমার গর্দান যাবে যে।” কথা বলতে বলতে সে নাস্তার ঠোঙা বের করে ভাগ করার উদ্যোগ নিল।।
কুৎ-অল বাধা দিল। গােসসা করে বল–নাস্তা টাস্তা ফেলে রাখ। আমার কাছে এসাে। পেটের ধান্দা রেখে আমার কাছে সর্বদা থাকতে হবে। খানাপিনা করার লােভে আমি এখানে আসি নি, শুনে রাখ।' কথা বলতে বলতে হেঁচকা টান মেরে তাকে খাটে শুইয়ে দেওয়ার কোসিস করে। ঘানিম বেগড়া দেয়। সবিস্ময়ে বলে—“আরে করছ কি! আমি তােমার নফর। তােমার হুকুম তামিল করা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারি না।
—নফর? হুকুম তামিল? তবে আমি তােমাকে হুকুমই করছি, আমার কাছে এসাে। নইলে ধড় থেকে তােমার শির নেমে যাবে।
–‘শির নামাও। গর্দান নাও বা শূলে চড়াও –তােমার দিল যা চায় করতে পার। কিন্তু মেহেরবাণি করে ওসব কাজ কামের হুকুম কোরাে না। আমি অক্ষম। ঘানিম বােকার মত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়। কুৎ-অল বিদ্যুৎগতিতে তার কাছে আসে। দু'হাতে সাঁড়াশীর মত আকড়ে ধরে। জোর করে তার ঠোটে ঠোট রাখে। চুম্বন করে। শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে তার ঠোটে ঠোট দুটো ঘষতে থাকে। অস্থির হয়ে পড়ে। রক্তে মাতন লেগে যায়। দাঁত দিয়ে ঘানিম এর নিচের ঠোটটি কামড়ে ধরে। খুন! তিরতির করে খুন ঝরতে থাকে তার ঠোট থেকে। কুৎ-অল উন্মাদিনীর মত ঘানিম’কে আঁকড়ে ধরে। নিজের বুকের ওপর তার সুপ্রশস্ত যৌবনভরা বুকটিকে সজোরে চেপে ধরে। জোরে আরও জোরে —আরও। দিল চাইছে এভাবে নিজের জান খতম করে দেয়। ঘানিম আর্তনাদ করে ওঠে—আরে করছ কী! করছ কী। মলিকের ভক্ত কুত্তা কি মন করলেই শের বনে যেতে পারে? অসম্ভব! আমাকে ছেড়ে দাও।' এক ঝটকায় নিজেকে কুত -অল-এর বাহু বেষ্টনী থেকে মুক্ত করে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকে। কুৎ-অল নিজেকে সামলে নেয়। কামিজ অগােছাল। আশাহত বাঘিনীর মত শুয়ে পড়ে থাকে।
ঘানিম বারন্দায় গিয়ে বাঁশী বাজাতে থাকে। করুণ সুর। মন পাগল করা সুরে নিজেকে সপে দেয়। বিভাের হয়ে পড়ে।
( চলবে )

0 Comments