আরব্য রজনী পার্ট ৩৩ ( Part 33 )

গল্পের পরবর্তী ঃ 
উজির জাফর এবার বললেন-'আলী নুর এখন কোথায় ? তাকে আমার কাছে আন। 'সুলতান মুহর্তমান সময় নষ্ট না করে দু'জন রক্ষীকে পাঠালেন আলী নুর-এর হাত-পায়ের বাঁধন খুলে তার সামনে হাজির করার জন্য।

উজির জাফর-এর পক্ষে ব্যাপারটি বুঝতে দেরী হ’ল না। আলী নূর আসার আগেই তার নির্দেশে সৈন্যরা সুলতান মহম্মদ সুলেমান এবং উজির মইন'কে বন্দী করল।

উজির জাফর সমবেত জনতার মাঝে প্রচার করে দিলেন বসরাহ-র মসনদে সুলতানের পদে আলী নুর’কে অভিষিক্ত করা হবে।।

প্রজারা উল্লসিত হয়ে আলী নুর-এর অভিষেকের আয়ােজন করতে লাগল। সুলতানের প্রাসাদ থেকে শুরু করে রাজ্যের সর্বত্র সাজ সাজ রব উঠে গেল।

যথা সময়ে উজির জাফর আলী নুরকে বসরাহ-র সিংহাসনে অভিষিক্ত করলেন। তিন দিন-তিন রাত্রি ধরে রাজ্য জুড়ে উৎসব পালিত হ’ল। তিন দিন বাদে উজির জাফর আলি নূরকে নিয়ে বাগদাদে উপস্থিত হলেন। খলিফার সঙ্গে মােলাকাত করলেন। খলিফা নিজের কটিদেশ থেকে তরবারি খুলে আলী নূর-এর হাতে তুলে দিয়ে বললেন—এটি দিয়ে মইন-এর শিরচ্ছেদ করবে। মইন তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেটে বললেন—“বেটা, তােমার দেহে খানদানি বংশের খুন রয়েছে। তুমি কারাে অনিষ্ট করতে পারবে না, জানি। তােমার বংশের সবাই ছিলেন ক্ষমাধর্মের পূজারী। তুমিও আমার সব অপরাধ ক্ষমা করে বংশের গৌরব অবশ্যই অব্যাহত রাখবে, আমার বিশ্বাস।  আলী নূর-এর পক্ষে খলিফার আদেশ মান্য করা সম্ভব হ’ল না। কিছুতেই মইন-এর ধড় থেকে তার মুণ্ডুটি নামিয়ে দিতে পারল না। শেষ পর্যন্ত খলিফার আদেশে তার দেহরক্ষী মাসরুর কাজটি হাসিল করল। আলী নূর এবার খলিফার কাছে নিজের মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে জানাল—‘জাহাপনা, বসরাহ-র সুলতানের পদ লাভ করে। মসনদে বসার ইচ্ছা আমার আগেও কোনদিন ছিল না, বর্তমানেও নেই। আমাকে আপনি দোয়া করে আপনার কাছাকাছি থাকার সুযােগ করে দিন তবেই আমি নিজেকে ধন্য জ্ঞান করব।

খলিফা আলী নূর-এর ইচ্ছার মূল্য দিলেন। তার নিজের প্রাসাদের অদূরে একটি সুদৃশ্য প্রাসাদ তৈরী করালেন। সেখানে আলী, নূর তার বিবি আনিস’কে নিয়ে সুখে দিনাতিপাত করতে লাগল। আর খলিফা তাকে দরবারের অন্যতম পার্ষদরূপে নিযুক্ত করলেন। খলিফা মহম্মদ সুলেমান’কে ক্ষমা করলেন। তাঁকে পুনরায় বসরাহ-র সুলতানের পদে নিযুক্ত করলেন।

উজির মইন পরলােকগত । সুলতান মহম্মদ সুলেমান নতুন উজির বহাল করলেন। বসরাহ-র প্রজারা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।

                            সওদাগর আয়ুব ও ঘানিমের কিসসা

আলী নূর ও আনিস-এর কিসসা শেষ করে বেগম শাহরাজাদ বললেন—“জাহাপনা, আপনার যদি দিল চায় তবে এর চেয়েও অনেক, অনেক রােমাঞ্চকর কিসসা আপনাকে শােনাতে পারি।'

বাদশাহ শারিয়ার বেগমের কোলে শির রেখে শুয়ে, মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললেন- “কি সে কিসসা ? কেমন রােমাঞ্চকর কিসসা শুনি?'

জাঁহাপনা, এবার আপনাকে শােনাব সওদাগর ঘানিম আয়ুব-এর কিসসা । জাঁহাপনা, কোন এক সময়ে এক দেশে এক সওদাগর বাস করত। তার নাম ছিল ঘানিম আয়ুব।

সওদাগর আয়ুব-এর এক বেটা ও এক বেটি ছিল। তার বেটার নাম ঘানিম আর বেটিটির নাম ছিল ফিত্না। তারা উভয়েই খুবসুরৎ ছিল। এক পলক দেখলে কার সাধ্য চোখ ফেরায়। এক সময় মাত্র কয়েকদিনের বিমারিতে সওদাগর আয়ুব দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে বেহেস্তে চলে গেল। তার বিষয় আশয় ছিল অগাধ। সবাই বলাবলি করত সওদাগর আয়ুব নাকি দিনারের কুমীর ছিল। অগাধ ধনদৌলতের মালিক।

বেগম শাহরাজাদ কিসসার এ পর্যন্ত বলার পর ভাের হয়ে এল। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।

সাঁইত্রিশতম রজনী 

রাত্রির প্রায় দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার অন্যদিনের মতই অন্দর মহলে বেগমের কক্ষে প্রবেশ করলেন। বেগম শাহরাজাদ তাঁর কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাঁহাপনা, বিশাল সম্পদ ও দিনারের পাহাড় রেখে সওদাগব আয়ুব বেহেস্তে চলে গেল। তার সম্পত্তির মালিক হ’ল বেটা ঘানিম আর বেটি ফিত্না। সওদাগর মারা যাবার সময় তার কারবারের কাজ অর্ধসমাপ্ত রেখে যায়। বাগদাদে পাঠাবার জন্য একশ’ গাঁট সিল্কের মূল্যবান কাপড়চোপড় বাঁধা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সময়াভাবে আর পাঠানাে হয়ে ওঠে নি। আর সে সঙ্গে একশ' বােতল গুলাবের নির্যাসও জোগাড় করেছিল। সেগুলােও পাঠাতে পারে নি। সবই গুদামে জড়াে করা ছিল।

আব্বার মৃত্যুর পর তার বেটা নওজোয়ান ঘানিম বাগদাদে যাওয়ার মন করল। তার ইচ্ছা, যে কাপড় আর গুলাবের নির্যাস জড়াে করা রয়েছে সেগুলাে সেখানে নিয়ে গিয়ে বেচে আসবে।

একদিন যুবক ঘানিম ঘরে আম্মা ও বহিনকে রেখে কাপড় আর গুলাবের নির্যাসের বােতলগুলি নিয়ে জাহাজে উঠল। জাহাজ বাগদাদের পথে ছুটে চলল।

বাগদাদ বন্দরে নেমে প্রথমেই ঘানিম সুন্দর একটি বাড়ি ভাড়া করল। বাড়িতে বিশালায়তন একটি গুদাম ঘর। সব মালপত্র গুদামজাত করে ঘানি বাগদাদ নগরটি দেখার জন্য বেরিয়ে পড়ল। এখানে তার আব্বা দীর্ঘদিন ব্যবসা করে গেছে। অনেকেই তাকে চিনত। ফলে আব্বার পরিচয় দিয়ে ঘানিম সহজেই এখানকার মানুষের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে মিশে যেতে লাগল। আর কাপড় ও গুলাবের নির্যাস বেচে প্রচুর মুনাফা পিটতে লাগল। আর হবে নাই বা কেন? সিল্কের এমন সেরা কাপড় আর এমন মিষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী গুলাবের নির্যাস যে সচরাচর মেলেই না। দেখতে দেখতে পুরাে একটি বছর কেটে গেল। এক বিকেলে ঘানিম কয়েকটি কাপড় নিয়ে বাজারে গেল। বাজারের ফটকে পা দিয়েই থমকে দাঁড়াল। দোকানপাট সব বন্ধ। এমন কি ফটকটি পর্যন্ত খােলা হয় নি।

ঘানিম দু’পা পিছিয়ে এক পথচারীকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলে একজন খুব বড় ব্যবসায়ী মারা গেছে। দোকানীরা তার মরদেহ নিয়ে গােরস্তানে গেছে।

ঘানিমও গােরস্তানের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। লম্বা-লম্বা পায়ে কিছুদূর যেতেই এক মসজিদের সামনে ভিড় দেখতে পেল। বুঝল, মরদেহ সেখানে নামানাে হয়েছে। দোকানিরা তাদের দুঃসময়ে এক পরদেশীকে দেখে খুশীই হ’ল। অনেক রাত্রে গাের দেওয়া হল।।

ঘানিম ভাবল, এত রাত্রি হয়ে গেল। গুদাম অরক্ষিত রয়েছে। তালা ভেঙে সব কিছু চুরি করে নেওয়া কিছুমাত্রও বিচিত্র নয়। সে তখন ঊর্ধ্বশ্বাসে বাড়ির দিকে ছুটতে লাগল। নিঝুম-নিস্তব্ধ। চারদিক, সে ছুটতে ছুটতে বেশী দূরে যেতে পারল না। সামনেই বিশাল এক ঝােপ-ঝাড় পড়ায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল। শেয়াল, পেঁচা, ভোঁদড় আর রাতজাগা কত সব পাখির বিচিত্র ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকিতে তার সর্বাঙ্গে কাটা দিয়ে উঠল। এ পরিস্থিতিতে কি কর্তব্য সহসা ভেবে উঠতে পারল না। এমন সময় এক অবিশ্বাস্য দৃশ্যের মুখােমুখি হল। কুচকুচে কালাে অতিকায় এক জানােয়ারের মত কে যেন তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। ভয়ে তার সর্বাঙ্গে ঘাম বেরােতে লাগল। এবার সে উপায়ান্তর না দেখে পিছন ফিরে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। উদভ্রান্তের মত ছুটতে ছুটতে ঘানিম একটি গােরস্থানে ঢুকে পড়ল। এখন আর তার মন থেকে গুদাম আর সমানপাত্রের চিন্তা পালিয়ে গেছে। নিজের জান বাঁচানাের চিন্তাই সবচেয়ে বড় বলে দেখা দিয়েছে।  দু’পা এগিয়েই ঘানিম একটি বড়সড় সমাধি দেখতে পেল। কোন আমীর-ওমরাহকে হয়ত এখানে গাের দেওয়া হয়েছে। তার চলাফেরা তো দূরের কথা দাড়িয়ে থাকার মত ক্ষমতাও সে হারিয়ে ফেলেছে। অনন্যোপায় হয়ে সে সমাধি সৌধটির গায়ে হেলান দিয়ে বসে পড়ল। তার আগেই সদর দরজাটি বন্ধ করে দিয়েছিল। রাত্রি ক্রমে গভীর হতে থাকে। ঘানিম এবার দেখতে পেল একটি জ্বলন্ত লণ্ঠন তার দিকে এগিয়ে আসছে। ভয়ে কুঁকড়ে যেতে লাগল। মুহুর্তে একটি জব্বর ফন্দি তার মাথায় এল। পাশের একটি সুউচ্চ নারকেল গাছে তরতর করে উঠে পড়ল। চোখের পলকে গাছের একদম মাথায় চলে গেল। গাছের মাথায় বসে সে দেখতে পেল, লণ্ঠন নিয়ে তিনটি ইয়া লম্বা-চওড়া নিগ্রো এগিয়ে আসছে। দু’জন মাথায় করে অতিকায় একটি বাক্স বহন করছে। আর তৃতীয় জনের হাতে লণ্ঠন ও একটি কোদাল। নিগ্রোদের একজন বলল—নির্ঘাৎ গােরস্থানের ভেতরে কোন লােক আছে। নইলে দরজা বন্ধ করল কে? আমরা তাে একটু আগেই দরজাটি খুলে রেখে গিয়েছিলাম।

অন্য দু’জন তাকে সমর্থন করল।

এদিকে ঘানিম -এর অবস্থা সঙ্গীনই আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে সে যে কোন সময় ধপাস করে নারকেল গাছের মাথা থেকে পড়ে যেতে পারে। আর নিজে থেকে যদি না-পড়ে তবে নিগ্রোগুলাে নির্ঘাৎ তাকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে নেবে।

আগন্তুক নিগ্রোদের একজন প্রাচীর টপকে ভেতরে ঢুকল। তার পর সদর-দরজা খুলে সঙ্গীদের ভেতরে নিয়ে গেল। ভেতরে ঢুকে তারা কাঁধ থেকে বাক্সটি নামাল।।

নিগ্রোদের একজন বলল—কী লম্বা পথ রে! ফুরােতেই চায় না ! কখন যে বাক্সটা কাঁধে নিয়েছি মনেই নেই। আমি ভাই একটু বিশ্রাম টিশ্রাম না করে এক কোদাল মাটিও কাটতে পারবাে না। তােরা যদি পারিস করগে যা। এই আমি এখানে বসে পড়লাম। কথা বলতে বলতে সে তার দশাসই শরীরটিকে ধপাস্ করে মাটিতে ফেলে দিল। তার সঙ্গীরাও পাশে বসল।

অন্য একজন বলল—“ভাইয়া, হাঁটাহাঁটিতে শরীর কাহিল। চোখে নিদ জড়িয়ে রয়েছে। এত রাত্রে চুপচাপ বসে থাকলে নিদ চলে আসবে। তবেই কম্ম ফতে। একদম সকালের আগে নিদ টুটবে না । তার চেয়ে বরং আমরা আপন আপন খােজা হবার কাহিনী বলে সময় কাটাই।

তার সঙ্গীরা তাকে সমর্থন করল।

বেগম শাহরাজাদ জানালা দিয়ে দেখতে পেলেন প্রাসাদের বাইরের বাগিচায় একটু একটু ভােরের আলাে দেখা দিতে শুরু করেছে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।

                         আটত্রিশতম রজনী 

রাত্রি একটু গভীর হতেই বাদশাহ শারিয়ার বেগমের ঘরে এলেন। 

নিগ্রো সাবারের খোজা হওয়ার কিসসা 

বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, নিগ্রোদের মধ্যে সাবার নামে এক নিগ্রো তার খােজা হবার কাহিনী শুরু করল—শােন, তখন আমি মাত্র পাঁচ সালের লেড়কা। আমার আব্বা আর আম্মা তখন আমাকে বাগদাদের বাজারে নিয়ে গিয়ে বেচে দেয়। আমাকে কেনে সুলতানের দেহরক্ষী। তার একটি লেড়কি ছিল, তখন তার ওমর তিন সাল।

আমার কাজ ছিল মালিকের ঘর দুয়ার সাফসুতরা রাখা। আর তার বেটির সঙ্গে কাজের ফাঁকে খেলকুদ করা। আর আমরা এক সঙ্গে গানা করতাম, নাচতাম—আর কত কি মজার মজার কাণ্ড করতাম বলে শেষ করা যাবে না।

এক সময় আমার ওমর হ’ল বারাে সাল আর তার দশ। তখন একদিন আমি গুলতি দিয়ে পাখি শিকার করছিলাম। এক লেড়কী এসে অতর্কিতে আমার চোখ দুটো চেপে ধরল। আমি বুঝেও না বােঝার ভান করলাম। আমার পিঠের সঙ্গে তার বুক আর তলপেটটি ক্রমে লেপ্টে গেল। সদ্য উঁকি দেওয়া তার ছােট্ট স্তন দুটোর স্পর্শ আমি স্পষ্ট অনুভব করতে লাগলাম। সে আরও জোরে আমার পিঠে চাপ দিল। বুঝলাম, তার স্তন দুটো আমার পিঠের চাপে পিষ্ট হওয়াতে সে মনে-মনে রােমাঞ্চ অনুভব করছে। আমি তার দিকে ঘাড় না ঘুরিয়েই তার তুলতুলে নরম হাতদুটোকে বার বার দলাই মালাই করতে লাগলাম। এক অনাস্বাদিত মধুর অনুভূতিতে আমার সর্বাঙ্গ অবশ হয়ে আসতে লাগল। শিরায় শিরায় বিদ্যুতের শিহরণ খেলে গেল। কেবল আমার কথাই বা বলি কেন। লেড়কীটির অবস্থাও আমার মত সঙ্গীন হয়ে পড়াই স্বাভাবিক। কারাে মুখে কোন কথা নেই। নীরবে অনুভূতির মাধ্যমে চাওয়া ও পাওয়া সাধ্য মত মিটিয়ে নিচ্ছিলাম উভয়েই। তাকে ছাড়ার ইচ্ছা বা ক্ষমতা কোনটিই আমার ছিল না। তারও ইচ্ছা ছাড়াছাড়ি না হয়ে আমার গায়ের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে লেপ্টে থাকে।

আমি আর তার হাত দুটো নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারলাম না। ক্রমশঃ আমার হাত দুটো সরীসৃপের মত তার হাত দুটো বেয়ে ওপরে উঠে তার গলায় গিয়ে কয়েক মুহুর্তের জন্য স্থির হ’ল। তারপরই নিচের দিকে নামার জন্য হিসপিস করতে লাগল। নামলও দু’-এক ইঞ্চি। ব্যস, কিভাবে, কি হয়ে গেল বুঝলাম না।

সে বাতাসে এক ঝাক হাসি ছড়িয়ে দিয়ে আমার বাহু বন্ধন থেকে এক ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করে নিল। তারপরই পিছন ফিরে দৌড়ে পালাল। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালাম। যা ভেবেছি ঠিক তাই, সে বেশী দূর গেল না। হয়ত বা তার শরীর ও মন দু’-ই প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল। নইলে সামান্য এগিয়েই একটি মােটাসােটা গাছের গুড়ির ওপর গা এলিয়ে দেবে কেন? আমি ছুটে গিয়ে তার ওপর ঝাপিয়ে পড়লাম। তারপরই শুরু হয়ে গেল জাপ্টাজাপ্টি। সে আমাকে দু'বাহুর বেষ্টনীতে আবদ্ধ করে ফেলল। আমিও সজোরে তাকে চেপে ধরলাম আমার বুকের মধ্যে। আমাকে যেন আদিম হিংস্র পাশবিকতা পেয়ে বসল। সে যে কি করতে, কি করলে চরম তৃপ্তি লাভ করবে ভেবেই পাচ্ছিল না। নইলে আমার ডান হাতে সজোরে কামড় বসাতে যাবেই বা কেন। দুটো দাঁত বসে গেল আমার হাতে। তিরতির করে রক্ত বেরােতে লাগল। গ্রাহ্যই করলাম না । আমিও কামােন্মত্ত নেকড়ের মত তাকে চুম্বন করতে গিয়ে তার নিচের ঠোটটি কামড়ে ধরলাম। কতক্ষণ এ-অবস্থায় ছিলাম বলতে পারব না। আমি তার সরু কোমরটাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে আমার আরও কাছে আনার চেষ্টা করলাম। সে মােচড়ামুচড়ি দিতে লাগল। আবার শুরু হ’ল ধস্তাধস্তি। আচমকা আমার হাতের চাপে তার কামিজটির বেশ কিছুটা অংশ ছিড়ে গেল। যৌবনের জোয়ার আসার পূর্ব মুহূর্তের দৃশ্য প্রথম আমার চোখে পড়ল। সে এক ঝটকায় হাত দুটো বুকের কাছে তুলে নিয়ে বুকটাকে ঢাকবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগল।

আমাদের কারাের হস ছিল না যে আকাশে মেঘ জমতে জমতে কখন যে পুরাে আকাশটিকে ছেয়ে ফেলেছে। মুহুর্তে ঝড় উঠল, প্রবল ঝড়। তারপই শুরু হয়ে গেল মুষলধারে বৃষ্টি। আমরা কতক্ষণ জল-ঝড় উপেক্ষা করে সে গাছের গুডিটির ওপর পড়েছিলাম আজ আর তা মনে করতে পারছি না। | লেড়কিটির ছেড়া কামিজটা ভিজে একেবারে জবজবে হয়ে গিয়েছিল। দু'হাতে তার ছেড়া অংশটুকু জাপ্টেজুস্টে ভীত সন্ত্রস্ত মনে বাড়ি ঢুকল। তার আম্মা খুবই বুদ্ধিমতী। লেড়কির চোখ-মুখ ও ছেড়া কামিজ দেখে ব্যাপার বুঝতে ভুল হল না। তার লেড়কিটিও আম্মার রক্ত চক্ষুর দিকে তাকিয়ে কিছুই গােপন করতে পারল না। তবে তার আম্মা বকাঝকা করে লোক জানাজানি করার চেয়ে চেপেচুপে রাখতেই বেশী আগ্রহী হ’ল।

লেড়কিটির আব্বা ছিল খুব বদরাগী। সে রেগে গেলে কোনদিকে তার হুস থাকত না। আমি তাে ভাবলাম, আমার সঙ্গে সঙ্গে তার লেড়কিরও গর্দান নিয়ে ছাড়বে। তার আম্মা লেড়কির শাদীর জন্য উঠে পড়ে লেগে গেল। এক নাপিতের লেড়কার সঙ্গে শাদীর কথাও চলছিল। তড়িঘড়ি তার সঙ্গে যােগাযােগ করল শাদীর দিন পাকা করে ফেলল। লেড়কিটি অদ্ভুত এক আব্দার করে বসল। শাদী করতে সে রাজি আছে বটে। কিন্তু আমাকে তার সঙ্গে যেতে হবে। তার আম্মা পড়ল মহাফাপরে। এখন উপায়? সহজেই এক উপায়ও বের করে ফেলল । এক সকালে নাপিত ডেকে আনা হল। আমি এসবের কিছুই জানতম না। নাপিত এলে আমাকে হঠাৎ পিঠ-মােড়া করে বেঁধে ফেল্ল। তারপর খােজা করে দিল আমাকে। লেড়কিটির শাদী হয়ে গেল। তাকে দেখভাল করার জন্য আমাকেও তার শশুরালে পাঠিয়ে দিল। আমি বহুৎ দিন সেখানে ছিলাম। এক সময় তার আম্মা ও আব্বা এক এক করে বেহেস্তে চলে গেল। কিছুদিন বাদে তার স্বামীটিও দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল। তারপর আমি সুলতানের প্রাসাদে নােকরি পেয়ে গেলাম। ব্যস, পাকাপাকি ভাবে এখানেই দিন কাটাচ্ছি।

                       নিগ্রো কাফুরের খােজা হওয়ার কিসসা 

এবার কাফুর নামে এক নিগ্রোর পালা। সে তার খােজা হওয়ার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বল্ল—“আমার ওমর তখন আট সাল। আমি তখন থেকেই পুরােপুরি লম্পট হয়ে উঠেছিলাম। মিথ্যা কথা বলার স্বভাব তাে ধরতে গেলে আমার খুনের সঙ্গেই মিশে গিয়েছিল। আর সৎ কাজের ধার কাছ দিয়েও আমি যেতাম না। তা ছাড়া যতরকম কু-বিদ্যা আছে সবই আমি সে সময় থেকেই রপ্ত করে ফেলেছিলাম। তবে আমি মিথ্যা কথা বলতাম বটে। কিন্তু সব সময় নয়। সারা বছরের মধ্যে বেছেবেছে মাত্র একবার মিথ্যা কথা বলতাম। তবে হ্যা তাতেই সারা বছরের শােধ তুলে নিতাম। মােক্ষম সে চাল। তার জন্য আমার মালিকদের প্রভূত ক্ষতির বােঝা বইতে হয়েছে। একবার এরকমই জব্বর এক মিথ্যা চাল চালতে গিয়েই আমাকে খােজা হতে হয়।

যখনকার কথা বলছি তখন আমি এক বণিকের অধীনে দিন গুজরান করছিলাম। সে ক্রীতদাসের কারবার করে। আমার আগের মালিকের কাছ থেকে সে সস্তা দামে আমাকে খরিদ করে নিয়েছিল। তারপর সে আবার বেচার জন্য নিয়ে ক্রীতদাস কেনা-বেচার হাটে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়। নীলামে দর উঠল দু’শ দিরহাম। আর দস্তুরি কুড়ি দিরহাম। বেচার সময় বণিক বলেই দিয়েছিল কামকাজ আমি খুবই ভাল পারি। কিন্তু দোষ একটিই। প্রতি বছরে একবার করে মিথ্যা কথা বলি।

আমার নয়া মালিক আমাকে মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত রাখার জন্য পড়ানাের মত করে বুঝাতে লাগল। এক-দু করে দু'দু'টি মাস কেটে গেল। আমার মালিক ভাবল কি তার দাওয়াইয়ে কাজ হয়েছে। ভুলেও আমি আর মিথ্যা কথা বলব না।

এক সন্ধ্যায় মালিক আমাকে এক আমীর আদমির বাড়িতে নিয়ে গেল। বাগিচার ঠিক মাঝখানে সুন্দর সে ছােট্ট বাড়িটি। তার মুখে শুনলাম, সেখানে নাচা, গানা আর খানাপিনা হবে। তখন ইয়ার দোস্তরা এক এক করে জমায়েত হতে লাগল।

মালিক আমাকে এক সময় বললেন-“বড় ভুল হয়ে গেছে। আলমারির ওপরে দশ জোড়া তাশ ফেলে এসেছি। আমার খচ্চরটি নিয়ে গিয়ে চটকরে নিয়ে আয়গে।'  আমি খচ্চরের পিঠে চেপে বাড়ি ফিরলাম। সদর-দরজা থেকে বিলাপ পেড়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে ঢুকলাম। আমার কান্না শুনে মালিকের বিবি আর তার লেড়কি ছুটে এল। আমি কান্না অব্যাহত রেখেই বললাম–‘মালিক মারা গেছে। কাঁদতে কাঁদতে এবার বললাম—বাগিচার প্রাচীরের ওপারে উঠে একটি মুসম্বি লেবুর গাছ থেকে লেবু পাড়তে গিয়ে পড়ে যায়। একেবারে ফেঁটেফুটে ধপাস। ব্যস খেল খতম। এখন কি উপায় মালকিন ?'

আমার কথা শুনে বাড়িতে কান্নার প্রতিযােগিতা শুরু হয়ে গেল। কে, কার চেয়ে বেশী জোরে কেঁদে শােক প্রকাশ করতে পারে তারই প্রতিযােগিতায় যেন সবাই মেতে গেল। তখন সবাই প্রায় উন্মাদ দশা প্রাপ্ত হয়েছে। বাড়ির থালা বাসন আসবাবপত্র সব ভেঙেচুরে শােক প্রকাশ করতে লাগল। লেপ, তােষক, চাদর ও কাথা প্রভৃতিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল। সব মিলে এক বীভৎস কাণ্ড শুরু হয়ে গেল।

এবার শুরু হ’ল প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী শােক প্রকাশ। চুল খুলে, বােরখা ফেলে দিয়ে উন্মাদিনীর মত কাদতে কাঁদতে রাস্তা দিয়ে সবাই ছুটোছুটি দাপাদাপি শুরু করে দিল। প্রতিবেশীরা বেরিয়ে এসে নানা ভাবে প্রবােধ দেওয়ার চেষ্টা করল। কেউ বা দেওয়ালে আলকাতরা মাখিয়ে শােকের চিহ্নটিকে অধিকতর স্পষ্ট করার কাজে লেগে গেল।

প্রতিবেশীরা বলাবলি করতে লাগল দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে। অতএব সবার আগে ঘটনাটিকে কোতায়ালের নজরে আনা দরকার।' প্রতিবেশীদের কয়েকজন আমার মালকিনকে নিয়ে কোতােয়ালের বাড়ির দিকে হাঁটা জুড়ল।

আমি দেখলাম, এতক্ষণে সুযােগ পাওয়া গেছে। দশ জোড়া তাস নিয়ে আবার খচ্চরটির পিঠে চেপে বসলাম।

বেগম শাহরাজাদ ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে কিসসা বন্ধ করলেন।

                                      উনচল্লিশতম রজনী 

বাদশাহ শারিয়ার প্রায় মধ্যরাত্রে অন্দরমহলে বেগমের কাছে এলেন।।

বেগম শাহরাজাদ তার কিসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—“জাহাপনা, নিগ্রো খােজা কাফুর তার খােজা হওয়ার কিসসা বলে চলেছে। সে এবার বল্ল--আমি খচ্চরের পিঠে চেপে বাগিচার সে-বাড়িতে বিলাপ পেড়ে হাউমাউ করে কেঁদে মালিকের সামনে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়লাম। কেদেকেটে বাম-“হুজুর, আমি আর বলতে পারছি না! কে যেন আমার গলা চেপে ধরছে। ও আমি পারব না! মালিকের পায়ের কাছে পড়ে আমি বুক চাপড়ে কাদছি আর সমানে আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছি। মালিকের পীড়াপীড়িতে আমি কান্নার বেগ কমিয়ে কোনরকমে বলতে লাগলাম—আমি খচ্চরের পিঠে চেপে বাড়ির কাছাকাছি যেতেই দেখি বাড়ির সামনে হাজার হাজার আদমি জড়াে হয়েছে। আমার তখন মাথায় বাজ পড়ার উপক্রম হ'ল। মালিকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটার উপক্রম হ’ল। তিনি ক্ষেপে গিয়ে আমাকে প্রায় মেরেই বসেন। বলেন—“হারামজাদা, তখন থেকে শুধু কাদছে আর ধানাইপানাই করছে। এত্ত লােক কেন, কি হয়েছে আর তুই-ই বা এমন বিলাপ পেড়ে কাদছিস কেন?'

-হুজুর, প্রথমে আমি লক্ষ্যই করিনি যে, আমাদের বাড়িটি একেবারে ধসে পড়েছে। বাড়ির কোন আদমি তাে দূরের কথা হাঁস, মুরগি, বখরি, গাই কিছুই জিন্দা নেই। সব খতম। দেয়ালচাপা পড়ে সবাই মারা গেছে।

ব্যস, আর যাবে কোথায়। খেল শুরু হয়ে গেল। আমার মনিব কাঁদতে কাঁদতে চুল-দাড়ি টেনে টেনে ছিড়তে লাগলেন। ইয়ার দোস্তরা তাকে নানাভাবে প্রবােধ দিতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ধরাধরি করে তাকে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হল।

কিছুদূর যেতে না যেতেই বিপরীত দিক থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসতে লাগল। একটু পরেই দেখা গেল যেন শােক-মিছিল এগিয়ে আসছে। মিছিলের সামনে আমার মালকিন। গায়ে বােরখা নেই। মাথার চুল এলােমেলাে। উন্মাদিনী যেন ধেয়ে আসছেন। আমার মালিক তখন যেন হঠাৎ আশমান থেকে জমিনে পড়েছেন। হতভম্ব।

মালকিন ছুটতে ছুটতে এসে মালিকের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল। লেড়কা—লেড়কিরা এসে কাঁদতে কাঁদতে আব্বাকে জড়িয়ে ধরে।

আমার মালিকের আর ব্যাপারটি বুঝতে বাকি রইল না। আমার কারসাজিতেই যে এমন বিচ্ছিরি ব্যাপারটি ঘটেছে বুঝতে পেরে আমার কোর্তা চেপে ধরে দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠলেন —-“হারামজাদা, হতচ্ছাড়া পাজি কাহাকার।' বলেই সজোরে আমার চোয়ালে মােক্ষম একটি ঘুষি চালিয়ে দিলেন। ব্যস, আমার ওপর সমানে কিল, চড় আর লাথির বৃষ্টি পড়তে লাগল।

আমি মালিকের পা দুটো জড়িয়ে ধরে বললাম--‘মালিক, আমাকে কেন মিছে মারধাের করছেন। বণিকের কাছ থেকে আমাকে যখন কিনেছিলেন তখন রসিদে তাে আমার চরিত্রের এ বিশেষ গুণটির কথা উল্লেখ করাই ছিল। আমার সম্বন্ধে সবকিছু জেনেশুনে তবেই তাে আমাকে বাজার থেকে কিনে এনেছিলেন। আর মিথ্যা রসিকতার কথা যদি বলেন তবে মনে করতে পারেন এটা পুরােটা অবশ্যই নয়, আধখানা রসিকতামাত্র, আরও আধখানা তাে রয়েই গেছে।

মিছিলের সঙ্গে কোতােয়ালও ছিলেন। তার নির্দেশে আমার পিঠে ঘন ঘন চাবুক পড়তে লাগল।

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments