আরব্য রজনী পার্ট ৩২ ( Part 32 )

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
খলিফা ঠোটের কাছে তর্জনি নিয়ে বললেন—“চুপচুপ! একদম চিল্লাবি না! টু-শব্দটি করলে গর্দান নেব বলে দিচ্ছি।'

করিম জেলে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে এক এক করে চোগা চাপকান সব খুলে ফেলল। একেবারে উলঙ্গ। এদিকে খলিফাও নিজের গা থেকে যাবতীয় পােশাক খুলে ফেলে একেবারে বিবস্ত্র হলেন। নিজের পােশাকগুলাে করিমকে পরালেন। আর নিজের গায়ে চাপিয়ে নিলেন করিম-এর তেলচিটে পড়া চোগা চাপকান। পােশাকের ভেতরে ছারপােকার মেলা। কুটকুট করে তাকে কামড়াতে লাগল। করিম খলিফাকে প্রবােধ দিতে গিয়ে বলল—“ও কিছু না জাঁহাপনা। নয়া আদমি আর নয়া খুন পেয়ে একটু ফুর্তি করে খাচ্ছে। পেট ভরে গেলে আর কামড়াবে না। গরীবের কথা মিলিয়ে নেবেন। দেখবেন, আপনার সঙ্গে এক সময় ঠিক সমঝােতা হয়ে গেছে।

বার কয়েক অস্থিরভাবে লাফালাফি ছটফটানি করার পর খলিফা ছারপােকার ব্যাপারটিকে কোনরকমে সামলে নিলেন।

খলিফা নিজের আঙুল থেকে হীরা জহরৎ বসানাে একটি আংটি খুলে করিম জেলেকে দিলেন। তার ধরা মাছগুলাে রেখে দিয়ে বললেন—“যা, বাগিচার সীমানার বাইরে চলে যা।' করিম জেলে খলিফার হাত থেকে অব্যাহতি পেয়ে জাল-মছলি সব ফেলে চো-চা দৌড় মারল।

এবার করিম-জেলের পােশাকে সজ্জিত খলিফা গুটি গুটি উদ্যান-প্রাসাদে ঢুকে গেলেন। ইবরাহিম’কে সামনে পেয়ে আদাব জানালেন। এবার বললেন—‘আপনার জন্য কিছু মছলি নিয়ে এসেছি হুজুর।

আনিস কৌতূহলাপন্না হয়ে এগিয়ে আসে মছলি দেখার জন্য। উল্লসিত হয়।

ইবরাহিম ধমক দিয়ে ওঠে—'বেটা হতচ্ছাড়া জেলে কাহাকার! আমার মেহমানরা কি তাের কাঁচা মছলি খাবে নাকি রে? ঘটে বুদ্ধি বলতে কিছুই নেই দেখছি! মছলি কেটে-ধুয়ে-ভেজে নিয়ে আনতে পারিস নি ?

জেলের পােশাকে সজ্জিত খলিফা চোখ-মুখ কাচুমাচু করে বললেন—‘গােস্তাকি মাফ করবেন হুজুর! আমি এখনি মছলিগুলাে ভেজে আনছি।'

--“ওদিকে কোণার ঘরটি রসুইখানা। তেল-মসলা সবই মজুদ আছে। আচ্ছা করে ভেজে নিয়ে আয়।

খলিফা পড়লেন এবার মহা ফাপরে মছলিগুলাে কাটা, ধােয়া বা ভাজা কোনটিই তার পক্ষে সম্ভব নয়। উপায়ান্তর না দেখে উজির জাফর-এর শরণাপন্ন তাকে হতেই হ’ল। খলিফা এবার জাফর-এর কাছে গিয়ে সব বৃত্তান্ত জানালেন। তিনি জাফর-এর সাহায্যে মছলিগুলাে খুব কড়া করে ভো হুকুমদাতা বুড়াে মালী ইবরাহিম-এর কাছে নিয়ে গেলেন।।

ইবরাহিম খলিফাকে তার কাজের জন্য বহুভাবে শুকিরিয়া জানাল। আলীনূর, আনিস এবং ইবরাহিম মৌজ করে ভাজা মছলিগুলাে খেতে লাগল।

আলী নুর খুশী হয়ে জেলের বেশধারী খলিফাকে তিন দিনার ইনাম দিল। খলিফা দিনার তিনটে কপালের সঙ্গে সেঁটে নিলেন। বুঝাতে চাইলেন—হুজুরের ইনাম মাথায় রাখলাম।

খলিফা এবার করজোড়ে নিবেদন করলেন—“হুজুর মেহেরবান, আমার একটি আর্জি আছে। যদি মেহেরবানি করে—

আলী নূর ভাবল, তিন দিনারে আদমিটির মন ভরে নি। কিন্তু করারও তাে কিছু নেই। দোস্ত তাকে মাত্র চল্লিশটি দিনার দিয়েছিল। জাহাজ ভাড়া গেছে পাঁচ দিনার। মােট আট দিনার এরই মধ্যে চলে গেছে। আর রয়েছে বত্রিশটি। দু’-দু’জন লােক, বিদেশ বিভূঁই। বত্রিশ দিনার খরচ হতে কতক্ষণ। তারপর ?

মুচকি হেসে আলী নূর খলিফার কথার জবাব দেয়—‘আর্জি ? বল শুনি, কি আর্জি তােমার ?  ‘হুজুর, দূর থেকে হুজুরানির বাজনা শুনে দিল্ ভরে গেছে। মন চাইছে তেনার গলার একটি গান শুনতে। যদি মেহেরবানি করে একটি গানা

আলীনূর তার মুখের কথা শেষ হবার আগেই বলে উঠলেন— ‘গানা? গান শুনবে? বেশ তাে, তােমার দিল যখন চাইছে জরুর শােনাবে। কিন্তু কোন ধরনের গান তােমার পছন্দ, বল?’ 

হাত কচলে খলিফা বললেন—“জী, হুজরানি কি সব কিসিমের গানাই জানেন?

আনিস এবার মুখ খুলল—‘খেয়াল, কাওয়ালী, ঠুংরী—কোন গানা তােমার পছন্দ, বল ?

খলিফা চোখের তারায় বিস্ময়ের ছাপ এঁকে ভাবতে লাগলেন —লেড়কিটি বলে কী রে! সব গানাই জানে দেখছি! তাজ্জব ব্যাপার তাে! এবার মুখ খুললেন—“যদি মেহেরবানি করে একটি দরবারী কানাড়া শােনান তাে বহুৎ আচ্ছা হয়।' আনিস সবিস্ময়ে খলিফার দিকে তাকায় ভাবতে লাগল । লােকটি বলছে কী! দরবারী কানাড়া শােনার খেয়াল ? এবার খলিফার দিকে তাকিয়ে বলল—সে কী হে! তুমি মছলি ধরে দিন গুজরান কর, দরবারী কানাড়ার কি বুঝবে?’

–“দেখুন, মছলি ধরে দিন গুজরান করি। ভাল কিছুই শিখি নি। সুযােগও পাইনি কোনদিন। তবে শুনতে দিল চায়। যদি মেহেরবানি করে—

_ঠিক আছে। তােমার মন যখন চাইছে তখন আমি অবশ্যই শােনাব। আনিস এবার গান ধরল। মন-প্রাণ ঢেলে দরবারী কানাডা গাইতে লাগে।।

খলিফা আত্মমগ্ন হয়ে তার আকাঙ্ক্ষিত গান শুনতে লাগলেন। একাদ ইশাক ছাড়া অন্য কেউ যে এমন গান গাইতে পারে তার ধারণাই ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে মন-প্রাণ সঁপে দরদ দিয়ে আনিস গান গাইল। থানা শেষ হলে খলিফা উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে বহুভাবে গায়িকার তারিফ করলেন।

খলিফা আবেগের সঙ্গে বলেন—“হুজুরানি, এমন আচ্ছা গানা আপনি কোথায় শিখেছেন? আপনার গান শুনে আমার দিল উদাস হয়ে গেল!

আলী নূর হেসে বললেন—“জেলে ভাইয়া, আমি গানাটানা বুঝি । ওর গান আমার কাছে কদর পায় না। তুমি বরং একে নিয়ে যাও।

তােমার ঘরে রাখবে। তােমাকে চিরদিনের জন্য একে দিয়ে দিচ্ছি। নিয়ে যাও।

কথা বলতে বলতে আলী নূর উঠে দাঁড়ায়। বিবি আনিস-এর কাছ থেকে বিদায় নেবার জন্য তৈরি হয়।

আনিস কেঁদে ওঠে—‘মেহবুব, আমাকে ফেলে তুমি কোথায় চললে? তােমার কি দিল-দরদ বলতে কিছুই নেই! যদি আমাকে এভাবে ফেলেই ভেগে যাবে তবে একটি কথা বলছি, শুনে যাও।' কথাটি বলেই সে শিশুর মত হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে।

খলিফা হারুণ-অল রসিদ এমন এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার মুখােমুখি হয়ে বড়ই বিব্রত বােধ করতে লাগলেন। ভাবলেন, এ কী তাজ্জব ব্যাপার! লেড়কিটি কি তবে তার বিবি নয়, শাদী করেনি একে ? শাদী করা বিবি নয়? কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে এবার তিনি মুখ খুলতে বাধ্য হলেন। সবিনয়ে নিবেদন করলেন—“হুজুর, একটি কথা বলছি, মেহেরবানি করে গােসসা করবেন না। আমি আপনার আববাজীর চেয়ে বয়সে হয়ত বড়ই হ'ব। তাই বলছি কি, আপনাদের দুঃখ, অভাব-অভিযােগের কথা আমার কাছে খুলে বলুন। আপনাদের মুশকিল আশান করতে কোসিসের ক্রটি করব না । সত্যি করে বলুন তাে হুজুর, লেড়কিটিকে কি ভুলিয়ে ভালিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে এসেছেন, নাকি আপনার শাদী করা বিবি ?

আলী নূর বলল —“আরে, ওসব ব্যাপার মােটেই না। আমাদের জীবনের কিসসা, দুঃখদরদের কথা, নসীবের খেল তােমাকে বলে বােঝাতে পারব না। তা ছাড়া সে অনেক কথাও বটে।  ‘হুজুর, মেহেরবানি করে যদি কিছু বলেন তবে আমি আপনাদের মুশকিল আশানের কসুর করব না, কথা দিচ্ছি।

—“তুমি যখন না শুনেই ছাড়বে না তখন সংক্ষেপে আমাদের দুঃখের কথা তুলে ধরছি, শােন। নূর এবার সুলতানের হুকুম অনুযায়ী বাজার থেকে আনিসকে কিনে আনার পর থেকে বাগদাদে ও খলিফার বাগিচায় আসা পর্যন্ত সব ঘটনা খােলাখুলি ব্যক্ত করল।

আলীনূর তার কিসসা শেষ করলে খলিফা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—“হুজুর, এখন আপনাদের দিল্ কি চাইছে?

—“চাওয়া চাওয়ির ব্যাপার কিছু আর নেই জেলে ভাইয়া। দু’ চোখ যে দিকে চায় হাঁটা জুড়ব। এর শেষ কোথায় আল্লাতাল্লাই জানেন।

—‘হুজুর, দেখতেই তাে পাচ্ছেন, সামান্য এক জেলে আমি। মছলি ধরে দিন গুজরান করি। তবে বসরাহর সুলতান আমাকে দোস্ত জ্ঞান করেন। খাতিরটাতিরও করেন খুবই, তাজ্জব ব্যাপার মনে হচ্ছে, তাই না? আদৎ ব্যাপার হচ্ছে ছেলেবেলায় আমরা একই মক্তবে মৌলভী সাহেবের কাছে পড়ালিখা করি। কিন্তু তিনি সুলতান হওয়ার পরও আমাকে ভুলে যান নি। সে সুলতানের বেটা। সুলতান বেহেস্তে গেলে সে সুলতান বনে গেল। আর আমি ? কোন পথ না পেয়ে কাঁধে জাল তুলে নিলাম। তুমি যদি বসরাহতে ফিরে যেতে মন কর তবে আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি। আশা করি তােমাদের মুশকিল আশান হয়ে যাবে। আমার অনুরােধ তিনি ফেলতে পারবেন না বলেই আমি মনে করি।

এমন সময় বেগম শাহরাজাদ দেখলেন, ভাের হতে আর দেরী নেই। বাধ্য হয়ে তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।

ছত্রিশতম রজনী 

প্রায় মাঝরাত্রে বাদশাহ শারিয়ার ফিন বেগম সাহেবার ঘরে এলেন। বেগম শাহরাজাদ কিসসা শুরু করলেন—জাহাপনা, অলী নূর ও আনিস-এর তকলিফ দূর করার চিন্তা নিয়ে খলিফা হারুণ-অল রসিদ বললেন-“আপনারা চাইলে আমি সুলতানকে একটি হাত চিঠি লিখে দিতে পারি।

-“ঠিক আছে। একটি চিঠি তবে লিখেই দাও। দেখি চেষ্টা করে যদি পােড়া নসীবটিকে ফেরাতে পারা যায়।

খলিফা কাগজ-কলম চাইলে ইবরাহিম দৌড়ে পাশের ঘরে গিয়ে নিয়ে এল।

খলিফা ব্যক্ত-হাতে চিঠি লিখতে লাগলেন। তিনি চিঠির বক্তব্যে লিখলেন, চিঠিটি হাতে পাওয়া মাত্র বসরাহ-র সুলতান মহম্মদ ইবন সুলেমান যেন একে হুকুমনামা মনে করে পত্রবাহক আলী নূরকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করেন। এতদিন তাকে সুলতানের পদে অবস্থান করার যে অধিকার তাকে দিয়েছিলেন তা আজ থেকে খারিজ করা হ’ল। আর সে অধিকার দেওয়া হ’ল নওজোয়ান আলী নূরকে।

চিঠি লেখা শেষ করে খলিফা হারুণ-অল-রসিদ টিপ সহি দিয়ে খামে ভরলেন। আঠা দিয়ে খামের মুখ ভাল করে বন্ধ করে সেটি আলী নূর-এর হাতে দিলেন।

আলী নূর কিন্তু খলিফার কথা পুরােপুরি বিশ্বাস করতে পারল না । তবে একেবারে অবিশ্বাস করে উড়িয়ে দিতেও উৎসাহ পেল না। মনে মনে বলল-নসীবে যা আছে হবে। দেখাই যাক না আল্লাতাল্লার কি মর্জি।

আলীনূর তার বিবি আনিসকে জেলের বেশধারী খলিফার কাছে রেখে বসরাহ-র উদ্দেশে পা বাড়াল। মালী ইবরাহিম কিন্তু ব্যাপারটিকে মােটেই সুনজরে দেখল না। সে গোঁৎ গোঁৎ করতে লাগল—নচ্ছার জেলে! শয়তানী করার আর জায়গা পাস নি! সামান্য মাছভাজা খাইয়ে নগদা নগদ তিন তিনটি মােহর নিলি। উপরি পাওনাস্বরূপ গান শুনলি। শেষ পর্যন্ত লেড়কাটিকে ভাঁওতা দিয়ে দিলি ভাগিয়ে ! এখন ফুলের মত খুবসুরৎ লেড়কিটিকে নেওয়ার মতলবে আছিস! নাহি কভি নাহি—আমি থাকতে এতবড় একটি অবিচার কিছুতেই হতে দিচ্ছিনে। আমার দাবী আগে। আমিই তাদের এখানে আশ্রয় দিয়েছি। নইলে আধাআধি বখরা তাে চাই-ই। তিন মােহরের আধা বখরা, আর লেড়কির বখরা চাই-ই চাই। লেড়কিটি আগে আমার পিয়াস মিটাবে। তারপর ছিবড়ে টিবড়ে যা পড়ে থাকবে তা তাের দিকে ছুঁড়ে দেব। নইলে তুই বেটা লেড়কিটিকে নিয়ে ভাগবি, একেবারে বেপাত্তা হয়ে যাবি। তখন আমার আঙুল চোষা ছাড়া গত্যান্তর থাকবে না।

মালী ইবরাহিম-এর মুখ থেকে এরকম সব অশ্লীল-অশ্রাব্য কথা শুনে খলিফা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। নিজেকে আর সংযত রাখতে পারলেন না। জানালার ধারে গিয়ে সঙ্কেত-ধ্বনির সাহায্যে দেহরক্ষী মাসরুরকে ডাকলেন।

মাসরুর হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে খলিফাকে কুর্নিশ করে হুকুমের অপেক্ষায় দাঁড়াল। তার হুকুম পেয়ে ইবরাহিমকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার কাজে মন দিল।

উজির জাফরও ছুটে এলেন। তাঁর হাতেই জেলেটি যাবার আগে খলিফার পােশাক জমা দিয়ে গিয়েছিল। খলিফা এবার নিজের পােশাকে সজ্জিত হলেন।

ইবরাহিম যেন একেবারে আশমান থেকে পড়ল। সে খলিফার গােড়ে লুটিয়ে পড়ে বার বার মাফি মাঙতে লাগল। খলিফা এবার নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন—“তােমার ব্যবহার আমাকে স্তম্ভিত করেছে ইবরাহিম। তােমার মত একজন ধর্মভীরু আদমি যে এরকম বে-শরম বেতমিসের মত অশ্রাব্য কথা উচ্চারণ করতে পারে তা ভাবতে আমি উৎসাহ পাচ্ছি নে। আজকের মত মাফ করে দিলাম। ভবিষ্যতে এরকম কোন আচরণ তােমার কাছ থেকে পেলে কিন্তু গর্দান নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না। খলিফা এবার আনিস-এর দিকে ফিরে মুচকি হেসে বললেন—সুন্দরী, আশাকরি তুমি ইতিমধ্যেই আমার আসল পরিচয় পেয়ে গেছ। এবার চল আমার প্রাসাদে গিয়ে থাকবে।

খলিফা আনিসকে নিজের প্রাসাদে নিয়ে গেলেন। আর দাসী, খােজা প্রভৃতিকে তার পরিচর্যার জন্য নিযুক্ত করলেন। সবার ওপরে কড়া হুকুম দিলেন, তার কোনরকম তকলিফ হলে গর্দান যাবে। এদিকে খলিফা হারুণ-অল-রসিদ-এর চিঠি নিয়ে আলী নূর বসরাহ-র সুলতান মহম্মদ সুলেমান-এর দরবারে হাজির হ’ল। সে সুলতানকে কুর্নিশের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন না করেই এগিয়ে গিয়ে হাতের চিঠিটি তার হাতে তুলে দিল।

খামের মুখ ছিড়ে, চিঠিটা বের করে সুলতান চোখের সামনে ধরলেন। হাতের লেখা দেখে চিনতে তার অসুবিধা হ’ল না যে, খলিফা হারুণ-অল-রসিদ-এর পাঠানাে চিঠিই বটে। জাল জুয়াচুরি নয় মােটেই। তার মুখে হঠাৎ বিষন্নতার ছাপ ফুটে উঠল। চিঠি পড়া শেষ করে সুলতান বিষন্ন মুখে উজির মইন এবং অন্যান্য পারিষদদের উদ্দেশ্যে বললেন—“মহামান্য খলিফা হারুণঅল-রসিদ আল্লাহর পয়গম্বর আমার দণ্ডমুণ্ডের কর্তাও বটে। তার হুকুম আমি তামিল করতে বাধ্য। শােন মইন, আমীর-ওমরাহদের খবর পাঠাও। চারজন কাজীকে তলব কর। সবার উপস্থিতিতে আমি এ-অজ্ঞাত পরিচয় নওজোয়ানকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করে বসরাহর শাসনভার এর হাতে তুলে দেব। খলিফার হুকুম তামিল করে আমি দায়মুক্ত হতে চাই।

উজির মইন এগিয়ে এসে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করল—জাহাপনার দিমাকটিমাক খারাপ হয়ে গেল নাকি? হঠাৎ করে এতবড় কাজ করে ফেলবেন! ব্যাপারটি নিয়ে ভাবুন সত্যি-মিথ্যা যাচাই করুন। আমার তাে দিল্ বলছে চিঠিটা জাল। এবার চিঠির তলায় খলিফার স্বাক্ষরযুক্ত অংশটুকু কৌশলে ছিড়ে ফেলে বলল- জাঁহাপনা, আমি আগেই ভেবেছিলাম, জাল চিঠি নিয়ে এসে নওজোয়ানটি আপনার সঙ্গে প্রতারণা করছে। আরও ভেবে দেখন, খলিফার চিঠিই যদি এটি হবে তবে সাদা কাগজে তিনি লিখতে যাবেন কেন। এতবড় একটি হুকুমনামা নিজের শীলমােহর যক্ত কাগজে না পাঠিয়ে তিনি কিছুতেই সামান্য এক চিলতে সাদা কাগজ ব্যবহার করতেন না। আরও বড় কথা হচ্ছে, এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি চিঠি এর হাতে না দিয়ে তিনি অবশ্যই দূত মারফৎ পাঠাতেন। ঠিক কিনা?

সুলতান মহম্মদ সুলেমান উজির মইন-এর কথায় থমকে গেলেন।

উজির মইন এবার বলেন—জাহাপনা, আমি আপনাকে জোর গলায়ই বলছি, এ নওজোয়ান ঠগ। জাল চিঠি নিয়ে এসে আপনাকে ঠকিয়ে আপনার মসনদ দখল করতে চাইছে। আগে একে কয়েদখানায় আটক করুন। তারপর বাগদাদে খলিফার কাছে দূত পাঠান। ব্যস, দেখবেন তবেই সব হিল্লে হয়ে যাবে।

কথা বলতে বলতে মইন চিঠিটিকে মুখে পুরে বার কয়েক চিবিয়ে, ডেলা পাকিয়ে মেঝেতে ফেলে দিলেন। সুলতান বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন—এ তুমি কি করলে মইন! যদি এটি খলিফারই চিঠি হয়ে থাকে তবে তাকে কতখানি-

তাকে কথাটি শেষ করতে না দিয়েই উজির মইন বলে উঠলেন—“আমি তাে বলছি জাঁহাপনা, কিছুতেই এটি খলিফার চিঠি নয়। হারামী জাল চিঠি নিয়ে এসে আপনার সঙ্গে প্রতারণা করছে। সবার আগে একে আচ্ছা করে ঘা কতক দেওয়া দরকার। পিঠমােড়া করে বেঁধে মােক্ষম দাওয়াই আমি দিয়ে দিচ্ছি। একবারটি আমার হাতে শয়তানটিকে তুলে দিন। এমন দাওয়াই দেব যে, জিন্দেগীভর মনে থাকবে। জাঁহাপনা, চিঠি দিয়ে খলিফার কাছে দূত পাঠান। প্রয়ােজনে এক পারিষদকেও সঙ্গে দিন। ব্যস, আদৎ ব্যাপার ফাস হয়ে যাবে।।

সুলতান এতক্ষণে উজির মইন-এর কথা বিশ্বাস করলেন। হুকুম দিলেন, চালাও বেত। আসল কথা কবুল না করা পর্যন্ত বেত বন্ধ করবে না।

সুলতানের আদেশে কয়েকজন সিপাহী আলীনুরকে পিঠমােড়া করে বেঁধে মেঝেতে ফেলে দিল। এবার চলল সপাং-সপাং শব্দে অনবরত বেত। উজিরের সুখী লেডকা, বেতের ঘা বেশীক্ষণ সইতে পারল না। ঘা কতক খাওয়ার পরই সম্বিৎ হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। এবার ধরাধরি করে তাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হ’ল কয়েদখানায়।। আর কয়েদখানার প্রধানের ওপর কড়া হুকুম দেওয়া হ’ল রােজ সকাল-সন্ধ্যায় যেন তাকে বেত্রাঘাত করা হয়। যে করেই হােক তাকে দিয়ে আদৎ ব্যাপার কবুল করাতে হবে।

কয়েদখানার প্রধান আলী নূরকে চিনতে পারল। সে নূর-এর আব্বা উজির অল-ফাদল-এর এক বড় ভক্ত। সে সাধ্য মত নূরকে বাঁচাবার প্রতিশ্রুতি দিল। নূরকে অনুচ্চ কণ্ঠে বল্ল-হুজুর, আমি আলতাে করে আপনার গায়ে বার কয়েক চাবুক ঠেকানাে মাত্রই মরার মত হাত-পা এলিয়ে দিয়ে পড়ে থাকবেন। বাহানা করবেন, যেন সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছেন। আমার ওপর হুকুম, আপনি যে ঠগ, প্রবঞ্চক, জালিয়াত তা স্বীকার করাতেই হবে। একটু বাদেই শয়তান মইন আসবে, ঘাপটি মেরে পড়ে থাকুন। ডাকলেও সাড়া দেবেন না । আমি বলব হরদম বেত খেয়ে বেহুঁস হয়ে পড়েছেন। এক-দুই-তিন করে পুরা চল্লিশটি দিন কেটে গেল। মইন-এর কাছে কয়েদ খানার প্রধান খবর পাঠায়, রােজ সকাল - সন্ধ্যা জোর বেত চালানাে হচ্ছে, কিন্তু কয়েদী তার কসুর কবুল করে নি।

একচল্লিশতম দিন বসরাহর সুলতানের কাছে বাগদাদ থেকে বহুমূল্য ভেট এল। সুলতান বিস্মিত হলেন। কিন্তু আদৎ ব্যাপার ধারণাও করতে পারলেন না। যারা ভেট নিয়ে এসেছে তাদের কাছ থেকে কোন কথা বের করতে পারলেন না।

এদিকে সুলতান তাে ব্যাপার দেখে তাজ্জব বনে গেলেন। উজিরও আমীর-ওমরাহদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। তারাও বিস্ময়ের ছাপ চোখে - মুখে এঁকে মুখে কলুপ এঁটে বসে থাকা ছাড়া কোন সৎপরামর্শই দিতে পারলেন না।  তবে কোন কোন পারিষদ অনুমানের ওপর নির্ভর করে বললেন—‘জাহাপনা, খলিফা হয়ত নতুন সুলতানকে ভেট পাঠিয়ে প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।  উজির মইন-এর পরামর্শে সুলতান আলী নূর’কে জানে খতম করে দেওয়ার চিন্তা করলেন।  সুলতান-এর হুকুমে বসরাহনগরের সর্বত্র ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে দেওয়া হ’ল উজির অল-ফাদল-এর লেড়কা ঠগ আলী নূর-এর গর্দান নেওয়া হবে। আগামীকাল সকালে উৎসাহীদের গর্দান নেওয়ার দৃশ্য দেখার জন্য জমায়েত হতে জানানাে হচ্ছে।

পরদিন সকাল হতে না হতেই দরবার কক্ষের সামনে দলে দলে কাতারে কাতারে উৎসাহী নগরবাসীরা জমায়েত হতে লাগল। যথা সময়ে উজির মইন কয়েদখানায় হাজির হলেন। কয়েদখানার প্রধান বাধ্য হয়ে দরওয়াজা খুলে দিল। আলী নূর বিষগ্নমুখে কয়েদখানা থেকে বেরিয়ে এল। গম্ভীর স্বরে বলল-শয়তান মইন, তুমি কি করছ তা নিজেই জান না। তামাম দুনিয়ার আদমি তােমার শয়তানী ধরতে না পারলেও ওপরওয়ালার চোখে তাে আর ধোঁকা দিতে পারবে না। আল্লাহর হাত থেকে তুমি কিছুতেই ছাড়া পাবে না। তােমার কুকর্মের শাস্তি তােমাকে দেবেন-ই দেবেন।

মইন তাচ্ছিল্যের হাসি মুখে ফুটিয়ে তুললেন। আলী নূর-এর কথার কোন জবাব না দিয়ে রক্ষীদের হুকুম করলেন, তাকে খচ্চরের পিঠে আচ্ছা করে বাঁধতে।।

এদিকে দরবার কক্ষের সামনে নগরবাসী যারা জমায়েত হয়েছিল তারা আলী নূর-এর নামে ধ্বনি দিতে দিতে কয়েদখানার দিকে ছুটে আসতে লাগল। তাদের দাবী, নতুন সুলতান আলী নূর এর মুক্তি দিতে হবে। আর শয়তান মইন-এর মৃত্যুকামনা করতে লাগল সবাই।

আলী নূর তাদের শান্ত করতে চেষ্টা করে জনতার উদ্দেশ্যে বলল—“দোস্তরা, উতলা হয়াে না। ধৈর্যে বুক বাঁধ। বিচারের ভার আল্লাহ-র ওপর ছেড়ে দাও। মইন আমার ওপর যে জবরদস্তী করছে তার শাস্তিবিধান আল্লাহ-ই করবেন।

মইন-এর ধমক খেয়ে রক্ষীরা খচ্চরের পিঠে বেঁধে রাখা আলী নূর’কে নিয়ে জনসমুদ্র ভেদ করে অগ্রসর হওয়ার কোশিস করল। খচ্চরটি ধীর পায়ে এগিয়ে চলল। মৃত্যুপথযাত্রী আলী নূর মুখে জোর করে হাসি ফুটিয়ে তুলে সবাইকে অভিনন্দন জানাতে লাগল। এক সময় আলী নূরকে নিয়ে খচ্চরটি সুলতানের দরবার-কক্ষের সামনে হাজির হল। _ আলীনূর এবার গলা ছেড়ে বলতে লাগল—'দোস্তগণ, তােমরা শুনে রাখ, আমি কোন কসুর করি নি, এমন কোন কাজ করি নি যার ফলে আমার গুণাহ হতে পারে। আমাকে জবরদস্তি প্রাণদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। আমার গর্দান নিয়ে এরা কিন্তু আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। আল্লাহ এর বিচার করবেন-ই।

শয়তান মইন প্রাসাদের নিরাপদ স্থান থেকে চিৎকার করে জল্লাদকে বলতে লাগলেন—‘দেরী করছ কেন? ওর ধড় থেকে শিরটি নামিয়ে দাও। তাড়াতাড়ি কর।'

এবার ঘটে গেল এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড। দূর থেকে ভেসে আসতে লাগল একদল ঘােড়ার খুরের গম্ভীর আওয়াজ। জন কোলাহল স্তব্ধ হ’ল। সবাই উৎকর্ণ হয়ে আওয়াজটিকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করতে লাগল।
কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই বিশাল এক সেনাবাহিনী প্রাসাদের সামনে উপস্থিত হ’ল। তাদের সঙ্গে রয়েছেন খলিফার উজির জাফর অল-বারমাকী।

উজির জাফর-এর আগমনবার্তা পেয়ে সুলতান মহম্মদ সুলেমান ব্যস্ত হয়ে প্রাসাদ থেকে নেমে এলেন। উজির জাফর বললেন—“স্বয়ং খলিফাই চিঠি লিখে আলীনুর’কে পাঠিয়েছিলেন। চিঠিটি অবশ্যই আসল, জাল নয়। তিনি ভুলেও ভাবতে পারেন নি যে, তার হুকুম কেউ তামিল না করে অগ্রাহ্য করতে সাহসী হতে পারে। তিনি নিঃসন্দেহ ছিলেন যে, আলী নুর-ই বসরাহ-র মসনদে বসে প্রজা পালন করছেন। সে তার বিবি আনিসকে খলিফার হাতে সঁপে দিয়ে এসেছিল। কথা ছিল, বসরাহর মসনদে বসে সে তার বিবিকে নিজের কাছে নিয়ে আসবে। খলিফা তাকে মাত্র একটি রাত্রির জন্য শয্যসঙ্গিনী করেছিল। ব্যস, আর তার সঙ্গে মােলাকাত হয় নি। তারপরই তিনি নিজের কাজে ডুবে যান। আনিস-এর কথা তার আর খেয়ালই ছিল না। একমাস বাদে খলিফা হঠাৎ প্রাসাদের ভেতরে ঢুকতে গিয়ে কান্না শুনতে পেয়ে থমকে যান। পরিচারিকাকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন, আলী নূর-এর বাঁদী আনিস কাঁদছে।নিতান্ত অপরাধীর মত মন নিয়ে খলিফা আনিস-এর কামরায় গেলেন। তাকে দেখেই আনিস-এর কান্না আরও বেড়ে গেল। খলিফা এবার আলী নূর-এর ব্যাপারটি নিয়ে ভাবতে লাগলেন। এক মাসের ওপর হয়ে গেল, অথচ তার কোন পাত্তা নেই। নির্ঘাৎ কোন কোনাে বিপদ তার হয়েছে। আনিস-এর কক্ষ থেকে বেরিয়ে খলিফা, আমাকে তলব করলেন।

আমি ব্যস্ত হয়ে ছুটে যেতেই বললেন—‘বসরাহ থেকে আলী নূর-এর খবর সংগ্রহ করতে। আর মহম্মদ সুলেমান তার সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন এ-ও জানাতে বললেন। খলিফার নির্দেশে আমি সিপাহীদের নিয়ে এখানে আসি।

Post a Comment

0 Comments