গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
আলী নুর তার হাতটি চেপে ধরে বলে—“ঝামেলা করবেন না। শুধু হাতেই বাড়ি ফিরে যান, বলে দিচ্ছি। ব্যস, শুরু হয়ে গেল হাতাহাতি ধস্তাধস্তি। উজির আর উজিরের লেড়কার বিবাদ। এর মধ্যে বাজারের সাধারণ আদমীরা নাক গলাতে চাইল না। তারা বিপদ এড়াতে মানে মানে সরে পড়ল সেখান থেকে।
এদিকে যুবক নূর-এর সঙ্গে বৃদ্ধ উজির হাতাহাতি করে টিকতে পারবেন কেন। ভবিষ্যতের কথা না ভেবেই সে উজিরকে সমানে কিল-চড়-লাথি মারতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই উজির পথের ওপর পড়ে যায়। সংজ্ঞা হারিয়ে এলিয়ে পড়ে। নূর এবার শান্ত হ’ল। সে বিবি আনিসকে নিয়ে ঘরের দিকে হাঁটা জুড়ল।
কিছুক্ষণ পড়ে থাকার পর উজির মইন সংজ্ঞা ফিরে পান। উঠে বসেন। কামিজ, পাতলুন ছিড়ে টুকরাে টুকরাে হয়ে গেছে। হাত পাও ছড়ে গেছে কয়েক জায়গায়। খুন ঝরছে। উঠে গা থেকে ধুলাে ঝাড়লেন, কোনরকমে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে সুলতানের দরবারে হাজির হলেন।
সুলতান মহম্মদ ইবন সুলেমান-এর গােড় দুটো চেপে ধরে উজির মইন কাদতে কাদতে বললেন— ‘জাহাপনা, আমি আপনার উজির। আমার গায়ে হাত তােলার অর্থ হচ্ছে, আপনার ইজ্জৎ নষ্ট করা। আপনি আলীনূরকে সিপাহী পাঠিয়ে পিঠ মােড়া করে বেঁধে দরবারে হাজির করুন। বিচার করে উচিত শাস্তি দিন। নইলে সে কিন্তু আপনার সঙ্গে শত্রুতা করতেও পিছ পা হবে না।'
সুলতান উজির মইন-এর মুখে সব কিছু শুনে হঠাৎ এরকম ঘটনার কারণ জানতে চাইলেন।
উজির মইন আসল ঘটনার সঙ্গে সাধ্যমত খাদ মিশিয়ে সুলতানের কাছে পেশ করলেন। তিনি চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন—জাহাপনা, আমি ক্রীতদাসীর বাজারে গিয়েছিলাম বেহেস্তের হুরী পেলে আপনার জন্য খরিদ করে আনব। আপনাকে ভেট দেব। হঠাৎ এক খুবসুরৎ লেড়কি দেখেই দিলটি দুর্বল হয়ে পড়ল। নাকাব সরিয়েই চিনতে পারি। আপনার হয়ত স্মরণ আছে, একবার উজির অল-ফাদল’কে দশ হাজার সােনার মােহর দিয়ে এক ক্রীতদাসী খরিদ করার জন্য হুকুম দিয়েছিলেন। এ খুবসুরৎ লেড়কিকে তিনি তখন খরিদ করে আনেন। তামাম আরব দুনিয়া ঢুঁড়ে এলেও এমন দ্বিতীয় আর একটি লেড়কি মিলবে না। উজির অল-ফাদল কিন্তু লেড়কিটিকে আপনার জন্য খরিদ করলেও আপনাকে না দিয়ে গােপনে তার প্রাসাদে রেখে দিলেন। অন্য একটি ক্রীতদাসী খরিদ করে আপনাকে ভজিয়ে দেন। তারপর একে তার বেটা নূরের সঙ্গে শাদী দেয়। এখন অভাবের দায়ে নূর একে বেচার জন্য বাজারে নিয়ে যায়। নিলাম হয়, সাড়ে চার হাজার সােনার দিনার দাম হেঁকে আমি খরিদ করে নেই। জাঁহাপনা, আপনাকে ভেট দেওয়ার জন্যই আমি খরিদ করেছিলাম তামাম আরব দুনিয়ার সবচেয়ে সুরৎ লেড়কিটিকে। শেষমেষ আলী নূর বেগড়া বাঁধায়। মত পাল্টে বলে কিনা বেচবে না। আমাকে খিস্তি খেউড় করে। সে বলতে চায় প্রয়ােজনে কোন খ্রীস্টান বা ইহুদীর কাছে সস্তাদামে তার বিবিকে বেচতে রাজি লেকিন সুলতানকে এক লাখ দিনারের বিনিময়েও দেবে না। আমি পীড়াপীড়ি করলে সে রেগেমেগে বলে—আপনি নাকি বুড্ডা। গােরে যাবার সময় হয়েছে। এরকম আদমির পক্ষে তার বিবির কদর দেওয়া সম্ভব নয়। জাহাপনা, আমার একটি মাত্র কসুর ছিল আমি প্রতিবাদ করেছিলাম, সুলতানকে এরকম অকথ্য ভাষায় কথা বলা সঙ্গত নয়। ব্যস, আর যাবে কোথায়। আলীনূর গুলি খাওয়া শেরের মত আমার ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। হেঁচকা টানে খচ্চরের পিঠ থেকে ফেলে দিয়ে সমানে কিলচড়-লাথি মারতে থাকে। আমি বুড়া হয়েছি। তার ওপর সুলতানের উজির। পথের মাঝে মারদাঙ্গা করতে গেলে আমারই ইজ্জৎ যাবে। তাই মার খেয়েও বদলা নেয়ার কোসিস থেকে বিরত থাকলাম। সে আরও সুযােগ পেয়ে গেল। পিটতে পিটতে আমাকে বেহুঁস অবস্থায় ফেলে রেখে লেড়কিটিকে নিয়ে ভেগে গেল। আর আমার অবস্থা তাে দেখছেনই। সুলতান মুহূর্তকাল নীরবে কাটিয়ে মুখ খুললেন—“আপনার সঙ্গে দেহরক্ষী ছিল না? তারা কি দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিল?
—“ছিল জাঁহাপনা। আমি উজির বটে। আবার আলী নুরও তাে উজিরের বেটা। তার খাতিরও তো আপনার সুলতানিয়তে কম নয়। তাছাড়া কে না জানে জাঁহাপনা সে এক সময় নামকরা এক মস্তান ছিল। এসব কথা বিবেচনা করে তারা নীরব দর্শক হয়েই দাঁড়িয়ে রইল।
—এক কাজ করুন। চল্লিশজন সিপাহী পাঠিয়ে দিন আলী নূরকে বন্দী করে দরবারে হাজির করবে। আর তার বিলকুল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বলে ঘােষণা করে দিন। আর সে খুবসুরৎ লেড়কিটিকেও যেন দরবারে নিয়ে আসে।
উজির মইন-এর মুখে শয়তানের হাসি ফুটে উঠল। সে যা চেয়েছিল পেলও তা-ই।।
এদিকে সুলতানের দরবারের এক নওজোয়ান পারিষদ সুলতানের হুকুমটি শােনামাত্র ইতিমধ্যেই সবার চোখের আড়ালে দরবার ছেড়ে যায়। আলীনূর-এর আব্বা একে খুব পিয়ার করতেন। আলী নূর-এর জিগরী দোস্তও বটে। ইতিমধ্যে, আলী নূর-এর বেগম, ঘটনার নায়িকা আনিস উজির মইন-এর ব্যাপারটি নিয়ে বড়ই দুর্ভাবনায় পড়েছে। ঘটনাটি যে ওখানেই মিটে যায় নি, ভয়ঙ্কর পরিণতি হতে পারে নূরকে বােঝাতে লাগল।
এমন সময় সে নওজোয়ান পারিষদটি ছুটতে ছুটতে গিয়ে আলী নূর-এর বাড়ির কড়া নাড়ল।
দরওয়াজার কড়া নাড়ার আওয়াজ পেয়ে নূর দরওয়াজা খুলতে এগােয়। আনিস আতঙ্কিত হয়ে বলে আমার মন বলছে সুলতানের ফৌজ তােমাকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছে। তুমি পিছনের দরওয়াজা দিয়ে পালাও। নুর পাত্তা দেয় না।
শেষ পর্যন্ত আনিস নূরকে ভেতরের দিকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেই দরওয়াজা খুলতে চায়। নূর রাজি হয়।
আনিস দরওয়াজা খুলে দেখে নূর-এরই জিগরি দোস্ত।
আগন্তুক নওজোয়ানটি বলল—‘সুলতান আপনাদের নামে গ্রেপ্তারী পরােয়ানা দিয়ে সিপাহী পাঠাচ্ছেন। যত শীঘ্র সম্ভব এখান থেকে ভেগে যান। এই নিন চল্লিশ দিনার। এ দিয়ে যতদূর সম্ভব চলে যান। শয়তান মইন নিজে সিপাহীদের সঙ্গে রয়েছেন। শীঘ্র ভেগে যান।
আর এক মুহূর্তও দেরী নয়। নূর তার বিবি আনিসকে নিয়ে পিছনের দরওয়াজা দিয়ে পথে নামল। গলি ঘুপচি দিয়ে বসরাহ বন্দরে হাজির হল।
নূর তার বিবিকে নিয়ে বাগদাদগামী জাহাজে চেপে বসল এদিকে উল্লসিত উজির মইন সিপাহী নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে উজির অলফাদল-এর বাড়ি এসে মুষড়ে পড়লেন। দেখেন চিড়িয়া ভাগ গিয়া। রাগে-দুঃখে-অপমানে তিনি ক্ষেপা কুত্তার মত হয়ে গেলেন, বাজখাই গলায় সিপাহীদের হুকুম দিলেন—“যাও, তামাম বসরাহ নগর ঘিরে ফেল। জোর তল্লাসী চালাও। যেখানে থাকে, পাতালে লুকিয়ে থাকলেও আমি তাকে চাই। সিপাহীরা চিরুনি-তল্লাসী চালাল কিন্তু আলী নূর বা তার বিবি কারােরই হদিস পেল না। কাজ যা হ’ল তা হচ্ছে তামাম বসরাহ তােলপাড় করে কিছু নিরীহনিরপরাধ আদমীকে বন্দী করে নিয়ে গিয়ে চাবুক চালিয়ে সিপাহীরা। কর্তব্য পালন করল। এ পর্যন্ত বলার পর বেগম শাহরাজাদ দেখলেন ভােরের আলাে উঁকি দিচ্ছে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।
চৌত্রিশতম রজনী
রাত্রি একটু গভীর হতেই বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগমের কামরায় এলেন।
বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাঁহাপনা, সুলতানের সিপাহীরা যখন শিকার না পেয়ে ব্যাজার মুখে উজির মইন-এর সামনে হাজির হ’ল তখন আলী নূর তার বিবিকে নিয়ে জাহাজে বসে দোল খাচ্ছে।
উজির মইন বিষন্ন মনে সুলতানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। নিতান্ত অপরাধীর মত হাত কচলে নিবেদন করলেন—‘জাহাপনা, শিকার ভাগ গিয়া। তামাম বসরাহ নগরে চিরুনি তল্লাসী চালালাম। আলী নুর বা তার বিবি খুবসুরৎ সে-লেড়কির কোন হদিসই মিলল না ।
সুলতান গুলিখাওয়া শেরের মত গর্জে উঠলেন—“অপদার্থ। নিষ্কর্মার ঢেকী কাহাকার! নগরীর সব প্রবেশ দ্বার বন্ধ করে দিয়ে তল্লাসী চালাও। হুলিয়া জারি কর, যে হদিস দিতে পারবে তাকে এক হাজার সােনার দিনার বকশিস দেওয়া হবে।
হায় মূর্খের দল। কে হদিস দেবে? বকশিসই বা নেবে কে? যাদের জন্য এত তােড়জোড় তারা যে ইতিমধ্যেই বাগদাদ নগরে পৌছে গেছে। বিদায়ী সূর্য শেষ রক্তিম আভাটুকু আশমানের গায়ে ছড়িয়ে দিয়ে বিদায় নেবার জন্য তৈরি। বাগদাদ বন্দরে নেমে এল আধাআলাে আর আধাে-আন্ধার। ঠিক এমনই এক মুহুর্তে আলী নূর তার বেগম আনিস-এর হাত ধরে বাগদাদ বন্দর থেকে বেরিয়ে নগরে প্রবেশ করল। অজানা-অচেনা নগর। হারা উদ্দেশ্যে হাঁটতে হাঁটতে তারা একটি বাগিচার কাছে এসে দাঁড়াল। উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা বাগিচাটি। পাশেই একটি দরওয়াজা পেয়ে তারা ভেতরে ঢুকে গেল। খুবই সুন্দর বাগিচা।
নির্জন-নিরালা বাগিচায় নূর তার বিবি আনিস’কে নিয়ে রাত্রি কাটাল। বাগিচার মালিক কে তাদের জানা নেই।
পাখির ডাকে সকাল হ’ল। নূর এবার আনিসকে নিয়ে বাগিচাটি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। সামান্য এগিয়েই মালীর দেখা পেয়ে গেল। তার নাম ইবরাহিম। বুড়াে। যৌবনে পা দিয়েই বাগিচাটির তদারকির কাজ নেয়। আর এর মালিক স্বয়ং বাগদাদের খলিফা হারুণ-অল-রসিদ। তার অবসর বিনােদনের কেন্দ্র এটি। দিনের শেষে অবসাদগ্রস্ত দেহে তিনি মাঝে মধ্যে এখানে আসেন। মুক্ত বাতাস আর ফুলের খুসবুতে কিছু সময় অবস্থান করে শরীর ও মনকে চাঙা করে তােলেন। বাগিচাটির কেন্দ্রস্থলে একটি সুরম্য প্রাসাদ। পয়তাল্লিশটি জানালা দিয়ে সুগন্ধি বাতাস প্রসাদটিতে যাতায়াত করে। সােনার চিরাগবাতি অন্ধকার দূর করার কাজে ব্যবহৃত হয়। এরকম এক শান্ত-সৌম্য পরিবেশে কখন সখন গানের মজলিসও বসে। দুনিয়ার সেরা ওস্তাদ গাইয়ে ইশাকও মাঝে মধ্যে খলিফাকে তার মিষ্টি-মধুর কণ্ঠের গান শুনিয়ে যান।
নূর আর আনিসকে দেখে বুড়াে মালী তার নিস্তেজ চোখের মণি দুটোতে বিস্ময়ের ছাপ এঁকে তাকায়। খলিফার বাগিচায় সাধারণের প্রবেশাধিকার নেই। দরওয়াজার কাছে ফলকের গায়ে একথা স্পষ্টাক্ষরে লেখা কিন্তু এরা ঢুকল কোন্ সাহসে? কলিজার জোর আছে বলতেই হয়।
বুড়াে মালী ইবরাহিম রাগে ফুলতে ফুলতে তাদের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু কাছাকাছি যেতেই সে যেন কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়ল। আদতে কাছে গিয়ে তাদের চেহারা ছবি দেখে সে সচকিত হয়ে পড়ল। ভাবল এরা নিশ্চয়ই ভিদেশীয়। এ বাগিচার ব্যাপার স্যাপার জানে না। আর নির্ঘাৎ কোন বাদশাহ বা সুলতানের, নিদেন পক্ষে কোন উজিরের লেড়কা-লেড়কি। পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে সামনে বাগিচা পেয়ে ঢুকে পড়েছে। বুড়াে মালী ইবরাহিম বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখের আর আনিস এর দিকে তাকিয়ে বলল—“তােমরা কে গা? তােমাদের ঘর কোথায়? ভিনদেশী মুসাফির নাকি ?
আলী নূর ভয়ে ভয়ে জবাব দেয়—“আপনার অনুমান অভ্রান্ত বটে। আমরা ভিনদেশীয় মুসাফির। রাত্রে কোথাও আশ্রয় না পেয়ে বাগিচায় ঢুকে পড়েছিলাম। গােস্তাকি মাফ করবেন। আমরা এখনই বেরিয়ে যাচ্ছি। কথা ক’টি বলেই সে আনিসকে নিয়ে বেরােবার উদ্যোগ নেয়। বুড়াে মালী তাদের পথ আগলে দাঁড়ায়। সস্নেহে বলে-“সে কী বেটা, চলে যাবে কোথায়? তােমরা ভিন্ দেশ থেকে এসেছ। আমার মেহমান। কোরাণের বহু জায়গায় তাে বলাই আছে— ‘পথশ্রমে যারা ক্লান্ত-অবসন্ন, যারা ভিন দেশী তাদের সঙ্গে মেহমানের মত আচরণ করবে। বেটা আল্লাহর উপদেশ তাে আমি ফেলতে পারব না। তবে যে বেহস্ত তাে দূরের কথা দোজকের দরওয়াজাও আমার জন্য খােলা থাকবে না। এ-বাগিচার মালিক যদিও খলিফা হারুণ-অল রসিদ কিন্তু আমারও মনে করতে পার। আমরা তিন পুরুষ ধরে একে বুকে করে আগলে রেখেছি। ফলে এতে আমার অধিকারও একেবারে কম নয়। | বুড়াে মালী ইবরাহিম, আলী নূরও তার বিবি আনিসকে সঙ্গে করে ঘুরে ঘুরে পুরাে বাগিচাটি দেখাল। কোন্ গাছের কি নাম, কোনটিতে কি ধরনের ফুল ধরে, কোনটি কোন ফলের গাছ সবই এক এক করে সব বুঝিয়ে দিল। আলী নূর বিবি আনিসকে নিয়ে বুড়াে মালী ইবরাহিম-এর মেহমান হয়ে থেকে গেল। ইবরাহিম তাদের নিয়ে প্রাসাদের একটি কক্ষে প্রবেশ করল। সেখানে সরাবের আলমারি কয়েকটি রয়েছে। সরাবের বােতলে ঠাসা। খলিফার মেহমান যারা আসেন তাদের আপ্যায়নের জন্যই এগুলাে ব্যবহার করা হয়।
বুড়াে ইবরাহিম আলমারি খুলে সরাবের বােতল আর পেয়ালা এনে নূর-এর সামনে রাখল। নূর বােতলের ছিপি খুলে নাকের সামনে ধরল। চমৎকার খুসবু বেরােচ্ছে। খুবই দামী সরাব। সে আর লােভ সামলাতে পারল না। বােতল ধরেই ঢক ঢক করে পুরাে বােতল গলায় ঢেলে দিল।
ইবরাহিম আর এক বােতল নিয়ে এল। নূর তা থেকে এক পেয়ালা বিবি আনিসকে দিয়ে বাকি সবটুকু ঢেলে দিল নিজের গলায়।
আনিস হাতের পেয়ালাটি ইবরাহিম-এর দিকে এগিয়ে দিল। সে জিভ কেটে বলল —“হায় খােদা! আমি আজ থেকে তেরাে বছর আগেই সরাবের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি।
ইতিমধ্যে আলী নূরকে সরাবের নেশা বেশ জেঁকে ধরেছে। মাত্রাতিরিক্ত সরাব গলায় ঢালায় সে কিছুক্ষণের মধ্যেই বেহুঁশ হয়ে এলিয়ে পড়ল।
মালী ইবরাহিম বুড়াে হয়েছে বটে। কিন্তু তার মন থেকে ভােগতৃষ্ণা নিঃশেষে অন্তর্হিত হয় নি। উদ্ভিন্ন যৌবনা রূপের আকর আনিস-এর যৌবনচিহ্নগুলি খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগল। কিছু করার সাধ্য তেমন না থাকলেও সাধ কিছু রয়েছেই। রূপসী যুবতীকে দেখে যতটুকু চোখ ও মনের তৃপ্তি পাওয়া যায়।
আনিস পড়ল মহা সমস্যায়। হাতে সরাবের পেয়ালাটি তখনও ধরা রয়েছে। মালীকে বলল —“দেখুন না ও সরাব গিলে এরই মধ্যে কেমন প্রায় সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছে। আদতে একা একা সরাব খেয়ে আনন্দ নেই। মালী ইবরাহিম এবার একটু নরম হয়ে বলল—তা বাছা তােমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি এক পেয়ালা সরাব খাচ্ছি।।
কথা বলতে বলতে ইবরাহিম আলমারি খুলে আর এক বোতল সরাব নিয়ে এল। তা থেকে নিজে এক পেয়ালা খেল, আর কিছুটা দিল আনিসকে।
এমন সময় বেগম শাহজাদ দেখলেন, প্রাসাদের বাইরের বাগিচায় পাখির আনাগােনা আর কিচির-মিচির শুরু হয়ে গেছে। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
পয়ত্রিশতম রজনী যথা সময়ে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ এর কাছে এলেন। শাহরাজাদ কোনরকম ভূমিকা না করেই কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, তারপরের ঘটনা কি ঘটেছিল বলছি শুনুন'—বুড়াে মালী ইবরাহিম আনিস-এর হাত থেকে আর এক পেয়ালা সরাব নিয়ে ঠোটের কাছে যেই না তুলতে গেল অমনি ভাল করে নেশায় বুদ হয়ে পড়ে থাকা নুর আচমকা উঠে বসে বলে উঠল-'আমি যখন বাম তখন ঢঙ করে বললে হজ করে তের বছর সরাব ছোঁও নি—আর ছোঁবেও না। কতই না বাহানা করলে! আর এখন খুবসরৎ লেড়কির কথায় হজটজের কথা ভুলে গেলে দেখছি!
—“আরে ভাইয়া, সে সব কিছু না। দায়ে পড়ে পেয়ালা হাতে নিতেই হ’ল। তুমি সরাবের নেশায় বুদ হয়ে পড়লে। লেড়কিটি বলল, আমি একেলা কি করে সরাব খাই, মন চায় না। তাই এক আধ পেয়ালা' | ‘এক-আধ পেয়ালার নমুনাই বটে এটা। কথা জড়িয়ে আসছে, শরীর দুলছে, রীতিমত টলছ। আর বলছ কিনা এক-আধ পেয়ালা!
মালী ইবরাহিম তার কথার আর জবাব দিতে পারল না। আদতে জবাব দেবার মত ক্ষমতাই তার নেই। নেশার ঘােরে কাৎ হয়ে ঢলে পড়ার জোগাড় হল। ক্রমে রাত্রি হ’ল। বুড়াে মালী ইবরাহিম টলছে। ভাল করে দাঁড়াবার ক্ষমতাও তার নেই। টলতে টলতেই প্রাসাদের বাতিগুলি জ্বালিয়ে দিল। ইতিমধ্যে নেশা আরও বেশী করে চেপে ধরল তাকে। কোনরকমে দেয়াল ধরে ধরে একটি আরাম কেদারায় গিয়ে বসল। ব্যস, বুদ হয়ে পড়ে রইল।।
আলী নূর প্রাসাদের জানলাগুলাে খুলে দিল। বাগিচা থেকে হিমেল হাওয়া ছুটে এসে সরাবের নেশাকে আরও চাঙা করে তুলল।
এদিকে প্রাসাদের জানলাগুলাে খুলে দেওয়ায় প্রাসাদের ভেতরের আলাে বাগিচায় গিয়ে লুকোচুরি খেলতে লাগল।
খলিফা হারুণ-অল-রসিদ-এর প্রাসাদ থেকে বাগিচার প্রাসাদটিকে স্পষ্ট দেখা যায়। প্রাসাদের ঘরে ঘরে চিরাগবাতির উজ্জ্বল আলাে জ্বলছে দেখে খলিফার কৌতূহল হল। তিনি উজির জাফর অল বারসাকীকে পাঠালেন ব্যাপার কি দেখে আসার জন্য।
জাফর ছুটলেন খলিফার নির্দেশ পালনের জন্য। খোঁজ খবর নিয়ে ফিরে এসে খলিফাকে জানালেন, বুড়ো মালী এক দম্পতিকে প্রাসাদটি ভাড়া দিয়েছে। সে এখন খেয়াল খুশী মত কাজ করে বেড়াচ্ছে। খলিফাকে তােয়াক্কাই করে না।
খলিফা বললেন—“শােন জাফর, ইবরাহিম আমার বহুদিনের কর্মী। বংশ পরম্পরায় তারা আমাদের নােকরি করছে। তাকে আমি ভাল ভাবেই চিনি। আমার অজান্তে সে আমার প্রাসাদ ভাড়া দিয়ে অর্থোপার্জন করবে আমি এ কথা বিশ্বাস করতেও উৎসাহ পাচ্ছি না ।
তবু তুমি যখন বলছ তখন কিছু না কিছু ব্যাপার রয়েছেই। চল, একবারটি দেখে আসি গে, আদৎ ব্যাপারটি কি।।
খলিফা হারুণ-অল-রসিদ বিদেশী সওদাগরের ছদ্মবেশ ধারণ করে উজির জাফর এবং দেহরক্ষী মাসরুর’কে সঙ্গে নিয়ে পথে নামলেন। বাগিচায় ঢুকে খলিফা ভাবলেন, হঠাৎ করে প্রাসাদে ঢুকলে আসল রহস্যটি হয়ত উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। কোথাও আত্মগােপন করে থেকে দেখতে হবে ব্যাপারটি কি? মাসরুর-এর কাঁধে চেপে খলিফা ও উজির একটি ঝাকড়া গাছে উঠে তার ডালে বসলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের নজরে পড়ল ঘরে তিনটি আদমি রয়েছে। তাদের একজন তাে সুপরিচিতই—ইবরাহিম। অন্য দু'জন যুবক-যুবতী। খুবসুরৎ। তাদের হাতে সরাবের পেয়ালা। ইবরাহিমএর হাতে সরাবের পেয়ালা দেখে খলিফা তাে ভিমরি খাবার জোগাড়। তা-ও আবার নেশায় বুদ। আপন মনে বলে উঠলেন—“তােবা-তােবা!
খলিফা বললেন—“জাফর আমার মনে হচ্ছে, এরা ভিন দেশী মুসাফির। কিন্তু আমার বাগিচায় কেন ও কি করে এরা এল!’
এমন সময় মালী ইবরাহিম একটি ফ্লুট এনে আনিস-এর হাতে দিয়ে বলল—‘বেটি, বাজাতে পার ? বাজাও তাে শুনি।।
ব্যাপার দেখে খলিফা রাগে গজগজ করতে লাগলেন। ওস্তাদ ইশাক যে বাজনা বাজান তা অন্যের হাতে দেখলে রাগ তাে হওয়ারই কথা। তিনি অনুচ্চ কণ্ঠে বলেন—জাফর, বেসুরাে ফ্লুট বাজালে সবাইকে আমি কোতল করব। না না, শূলে চড়াব সবাইকে।
উজির জাফর অনুচ্চ কণ্ঠে বল—‘যদি বেসুরাে না বাজায় ? সুর-তাল ঠিক ঠিক রেখে বাজালে কি করবেন জাহাপনা ?
—“তবে? তবে তােমাকে চড়াব শূলে। আর তাদের ছেড়ে দেব।' জাফর বলে ওঠে—‘হায় খােদা, তবে যেন লেড়কিটি বেসুরােই বাজায়।
এমন সময় উদ্যান-প্রাসাদ থেকে ফ্লুট চমৎকার সুর ভেসে এল। খলিফা বার বার তার তারিফ করতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ মুগ্ধচিত্তে ফ্লুট বাজনা শােনার পর খলিফা বললেন—“জাফর, আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে। তারা কারা, কেনই বা আমার বাগানে এসেছে জানার জন্য আমার দিল অস্থির হয়ে পড়ছে। আর আমার প্রাসাদে এমন গুণীজনের আগমন ঘটল আর আমিই জানতে পারলাম না। তাজ্জব ব্যাপার!
উজির জাফর বললেন—‘জাঁহাপনা, তাদের এমন এক আনন্দোচ্ছল মুহূর্তে আমাদের উপস্থিতি বে-রসিকের মত কাজ হবে এ নাকি ? খলিফা জাফর-এর কথায় নিজেকে সামলে নিয়ে গাছ থেকে নেমে এলেন। একাই প্রাসাদের ধার কাছ দিয়ে একটু হাঁটা চলা করে কিছু উদ্ধার করার প্রত্যাশায় এগিয়ে গেলেন। তিনি গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে চললেন। কিছুটা এগােতেই বিশাল এক তলাও। মাটির তলা দিয়ে নালা কেটে টাইগ্রীস নদী থেকে পানি এনে তলাওটিকে সর্বদা কানায় কানায় ভর্তি রাখার ব্যবস্থা। কতরকম মছলির যে বিচিত্র সমাবেশ ঘটানাে হয়েছে তা গােনাগাঁথা নেই।
নিঝুম-নিস্তব্ধ রাত্রি। খলিফা তলাও-এর ধার দিয়ে ঘুরে অন্য ধারে আসতেই দেখলেন, এক জেলে চুরি করে তলাও-এ জাল ফেলে মছলি ধরছে। খলিফা তাকে ডাকলেন। নাম তার করিম। করিম ধরা পড়ে গিয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে খলিফার সামনে এসে করজোড়ে দাঁড়িয়ে কৃতকর্মের জন্য নানা ভাবে মাফ চাইতে লাগল।
খলিফা তাকে পােশাক খুলে উলঙ্গ হতে বলেন। করিম জেলে ভাবল, উলঙ্গ করে বুঝি বিশেষ কোন শাস্তি দেবেন। সে কেঁদে ওঠে। ( চলবে )

0 Comments