গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
নূর এবার এগিয়ে এসে দড়াম করে দরওয়াজাটি বন্ধ করে দেয়। খােজা বামন দুটো প্রমাদ গণে। এ কী সর্বনাশা কাণ্ড! মালিক জানতে পারলে যে তাদের জানে মেরে ফেলবেন। নূর যখন কিছুতেই দরজা খুলে আনিস-এর কাছ থেকে বেরিয়ে এল না তখন খােজা বামন দুটো কাঁদতে কাঁদতে তাদের মালকিন এর কাছে গেল দুঃসংবাদটি দেবার জন্য। উজিরের বেগম তখন সবে গােসল সেরে হামাম থেকে বেরিয়েছেন।
খােজা বামনদের মুখে দুঃসংবাদটি শােনামাত্র উজিরের বেগম লম্বা লম্বা পায়ে ঘরে ফিরে এলেন। দরজার কাছে পৌছেই থমকে গেলেন। দেখেন, বিবস্ত্রা আনিস পালঙ্কের ওপর গা-এলিয়ে দিয়ে অবসন্নের মত পড়ে। তার চোখের তারায় তৃপ্তির ছাপ। মুখে আতঙ্ক। উজিরের বেগম সচকিত হয়ে বললেন—“কি ? কি হয়েছে বেটি ?
‘আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমার জীবনের পরম সম্পদ লুঠে নিয়ে দস্যু গা-ঢাকা দিয়েছে। আজ আমি নিঃস্ব-রিক্ত-সর্বশান্ত!
--তােমার এত বড় সর্বনাশ করে গেল, আর তুমি তা নীরবে হজম করলে ? উজির সাহেব জানতে পারলে পরিস্থিতি কি হবে, ভেবে দেখেছ কি ?
–‘আমি প্রবল আপত্তি করেছিলাম। কিন্তু তিনি যে আমাকে অন্যরকম বােঝালেন—উজীর সাহেব নাকি গােড়াতে সুলতানকে ভেট দেবার জন্যই দশ হাজার দিনার দিয়ে আমাকে খরিদ করেছিলেন। কিন্তু পরে নাকি মনস্থ করেছেন, আপনার লেড়কার সঙ্গে আমার শাদী দেবেন। আমার অবস্থার কথা মেহেরবানি করে একবারটি বিবেচনা করে দেখুন। আমি অর্থের বিনিময়ে কেনা বাঁদী। হুকুম তামিল করাই আমার প্রথম ও প্রধান কর্তব্য।
উজিরের বেগম দুঃখে-আতঙ্কে কপাল চাপড়াতে লাগলেন। উজিরকে কি বলবেন তাই নিয়ে তিনি ভেবে অস্থির হলেন। একটি অন্যায়কে মুখ বুজে হজম করার পাত্র তিনি নন। শােনামাত্র লেড়কার গর্দান নেওয়ার হুকুমই হয়ত দিয়ে বসতে পারেন ।
উজির ফাদল জরুরী কাজে অন্দর মহলে এলেন। বেগমের আখির পাতা ভেজা দেখে বিস্মিত হলেন। উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—“কি ব্যাপার, কাদছ কেন? হয়েছে কি ? হঠাৎ এমন কি ঘটল যে—
বেগম আঁখি মুছতে মুছতে বললেন—'তােমার কাছে কিছুই লুকোবার ইচ্ছে আমার নেই। তুমি হলফ কর, আমি যে অনুরােধ করব তার বাইরে কোন কাজ করবে না। আমার কথা না রাখলে। আত্মঘাতী হওয়া ছাড়া আমার আর গত্যন্তর থাকবে না।'
—তুমি নির্দ্বিধায় তােমার বক্তব্য পেশ করতে পার। কথা দিচ্ছি, তােমার মতের বিরুদ্ধে কোন কাজই করব না। স্বামীর কাছ থেকে আশা পেয়ে বেগম এবার বেটা নূর-এর কীর্তির বিস্তারিত বিবরণ দিলেন। লেড়কিটিকে ধাপ্পা দিয়ে সে তার ইজ্জত নষ্ট করেছে, এ-কথা বলতেও ভুললেন না। সব শুনে উজির হায় হায় করে উঠলেন। কপাল চাপড়ে বলতে লাগলেন—‘হায় আল্লাহ, এ কী করলে! সুলতানের কাছে আমি কোন্ মুখে গিয়ে দাঁড়াব!’
স্বামীকে প্রবােধ দিতে গিয়ে বেগম বললেন—“বিপদের সময় এমন করে মুষড়ে পড়লে বিপদ তাে আরও বেশী করে ঘাড়ে চাপবে! মনকে শক্ত করে বাঁধ। আমি দশ হাজার দিনার তােমাকে দিচ্ছি। সুলতানকে ফিরিয়ে দিয়ে এসাে।
—“দিনার নয়, ইজ্জতই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে! দশ হাজার দিনার জোগাড় করার মত ক্ষমতা কি আমার নেই ? কথাটি শুনেই সুলতান নির্ঘাৎ তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন। আমাকে কোতল করার নির্দেশ দিয়ে বসাও কিছুমাত্র তাজ্জবের ব্যাপার নয় নূর-এর আম্মা! ‘মিছেই তুমি ঘাবড়ে গিয়ে এমন কাহিল হয়ে পড়ছ। সুলতান তাে আর আনিস-এর কথা কিছু জানেন না। আমি, তুমি, নুর আর আনিস ছাড়া ব্যাপারটি তাে আর অন্য কারােরই জানা নেই। আমরা ফাস করলে কাক পক্ষীও জানতে পারবে না। আর উজির মইন এর কথা যদি ভাব যে, সে সুলতানের কানে বিষ ঢেলে তাকে উত্তেজিত করে তুলবে তারও কোন সম্ভবনা নেই। সে-ও তাে আনিস-এর কথা জানে না। জানতেও পারবে না কোনদিন।
বেগমের কথায় উজির ফাদল কিছুটা আশ্বস্ত হলেন বটে, তবু উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বললেন—“তুমি কি ভাবছ, উজির মইন-এর কানে কথাটি কোনদিন যাবে না? বাতাসেরও কান আছে। সে ঠিকই একদিন না একদিন আমাদের গােপন কথা টের পেয়ে যাবে। সে যে আমার সর্বনাশের ধান্দায় সর্বদা নিজেকে লিপ্ত রাখে।
এমন সময় প্রাসাদের বাইরের বাগানে পাখির কলরব শুনে বেগম শাহরাজাদ বুঝলেন, ভােরের আলাে ফুটে উঠতে আর দেরী নেই। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।
তেত্রিশতম রজনী
বাদশাহ শারিয়ার যথা সময়ে অন্দর মহলে বেগম সাহেবার কক্ষে প্রবেশ করলেন। বেগম শাহরাজাদ তার কিসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাহাপনা, উজির ফাদল তার বেগমকে বললেন, নূরএর আম্মা, উজির মইন আমার বিশ্বাসঘাতকতার কথা যে-কোন উপায়েই হােক বের করবেই। আর তা সুলতানের কানে পৌছে দিতে অবশ্যই কসুর করবে না।
বেগমের পরামর্শে উজির ফাদল কিন্তু বরাত ঠুকে শেষ পর্যন্ত রূপসী যুবতী আনিসকে নিজের প্রাসাদেই রেখে দিলেন। আদতে তার বেটা নূর-এর কথা ভেবেই তাকে এমন একটি বিশ্বাসঘাতকতার ফঁদে পা দিতে হ’ল। সে দিন দিনই কেমন উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়ছে। এমন এক রূপসী ও সর্বগুণান্বিতা লেড়কিকে যদি তার গলায় লটকে দেওয়া যায় তবে হয়ত তার বহির্মুখী মন ঘরে বাঁধা পড়বে। আবার লেড়কিটির কথাও কম ভাবেন নি। সুলতানের হারেমে হাজার খানেক বেগম রয়েছেন। আনিস গিয়ে তাদের সঙ্গে যোেগ দিলে সংখ্যা একটি বাড়বে। ব্যস, এ পর্যন্তই। বুড়াে সুলতান দু'-চারদিন নাড়াচাড়া করে ডাবের খােসার মত তাকেও হারেমে অন্যান্যদের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। একটি লেড়কির রূপ-যৌবন চিরদিনের মত খতম হয়ে যাবে।
বেগম বললেন—জাহাপনা, বেটার এখন উমর হয়েছে। শাদী দিয়ে সংসারী করার চেষ্টা করতে হবে। নইলে তার বাইরের ঝোঁক কমবে না। আনিস পরমা সুন্দরী, অষ্টাদশী। তার ওপর তার মধ্যে বহুগুণের সমাবেশ ঘটেছে। তামাম দুনিয়া খুঁজে এমন সর্বগুণান্বিতা দ্বিতীয় আর একটি লেড়কি পাবে না। তােমার বেটাও তাে তাকে খুবই পছন্দ করে। তাই বলছি কি, তাদের চার হাত এক করে দাও। তারা সুখে ঘর করুক। আমাদের মাথা থেকেও দুশ্চিন্তার বােঝা নেমে যাক।
উজির কোন কথা না বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান। নুর অনেক রাত্রে বাড়ি ফিরল। উজির তার বেটার জন্য ঠায় বসে রইলেন। বেটাকে যেতে দেখে দাঁড় করালেন। তখনও তার মন থেকে ক্ষোভ অপমানের জ্বালা পুরােপুরি মুছে যায় নি। | নূর তার আব্বাকে সামনে দেখে সচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। কৃতকর্মের ভীতি তার মন-প্রাণ জুড়ে রয়েছে। তাই আব্বাকে কোন কথা বলার সুযােগ না দিয়েই দুম করে তার পায়ে লুটিয়ে পড়ে। নিজের কাজের জন্য বহুভাবে মাফ চাইতে থাকে। বেটার কান্না দেখে উজিরের মন গলে যায়। তিনি হাত বাড়িয়ে বেটাকে বুকে তুলে নিলেন। সস্নেহে বললেন-বেটা, এখন আর তুমি সেই ছােট্টটি নও। উমর হয়েছে। নিজের ভাল-মন্দ বােঝার মত জ্ঞানও তােমার যথেষ্টই হয়েছে। এবার বিয়ে শাদী করে ঘর বাঁধ। আমার সম্পত্তি ও কিছু ধন-দৌলত রয়েছে ; ধীরে ধীরে বুঝে নাও। আনিস আমার ঘরে বহু হয়ে আসার যােগ্য বটে। তার রূপযৌবন, ও নানা গুণ রয়েছে যা তােমার ভবিষ্যৎ জীবনকে মধুময় করে তুলতে সক্ষম হবে। তােমার সঙ্গে তার শাদী দেয়ার পরিকল্পনা আমি ও তােমার আম্মা ইতিমধ্যেই করে ফেলেছি। তবে আমার বিশেষ নির্দেশ থাকবে শাদীর পর কিন্তু আমি আর তােমার কোনরকম বদখেয়ালকে বরদাস্ত করব না। তােমার বর্তমানের যত বেলেল্লাপনা সব ছেড়েছুড়ে মনকে ঘরমুখী করতেই হবে। নূর তার আব্বার কথায় সম্মতি দেয়।
উজির অল-ফাদল-এর প্রাসাদে শাদীর রােশনাই। মহাধুমধাম করে তিনি লেড়কার শাদী দিলেন।
এদিকে উজির ফাদল দশ হাজার দিনার দিয়ে অন্য একটি খুবসুরৎ লেড়কি হাট থেকে খরিদ করে আনলেন। তাকে সুলতানের প্রাসাদে পৌছে দিয়ে এলেন।
কুচক্রী উজির মইন তলে তলে সব খবর সংগ্রহ করে ফেললেন। কিন্তু তিনি মুখে কুলুপ এঁটে রইলেন। উপযুক্ত সুযােগের প্রত্যাশায় প্রহর গুণতে লাগলেন। তিনি ভালই জানেন, উজির ফাদল বর্তমানে সুলতানের সুনজরে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে কিছু বলে সুলতানের কান ভারী করতে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে নিজের পায়ে নিজেই কুড়ল মারা। অতএব সুযােগ চাই। উপযুক্ত সুযােগের জন্য ধৈর্য ধরতেই হবে।।
সুযােগ সন্ধানী উজির মইন-এর হাতে সুযােগ আসতে বেশী দেরী হ’ল না। অল-ফাদল কঠিন বিমারিতে পড়লেন। শয্যাশায়ী। মাত্র দু’ দিন টিকেছিলেন। তারপরই বেহেস্তের পথে পা বাড়ালেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে লেড়কাকে কাছে ডাকলেন। তার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন—“বেটা, আমার বেহেস্তের ডাক এসেছে। এবার দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতেই হবে। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে চলবে। আর একটি কথা, আনিস বহুত আচ্ছা লেড়কি। রূপ-যৌবন ছাড়া অগাধ বিদ্যাবুদ্ধির অধিকারিণীও বটে। চলার পথে সমস্যার মুখােমুখি হলে তার বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে ভুল কোরাে না যেন। নসীবকে মেনে চলবে। আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে দিন গুজরান করবে।
সুলতানের উজির অল-ফাদল দেহরক্ষা করেছেন। বসরাহ নগরীতে শােকের ছায়া নেমে এল। নুর আড়ম্বরের সঙ্গে আবার শেষ কৃত্য সম্পন্ন করল। তার বিবি আনিস সর্বদা তার কাছাকাছি। পাশাপাশি থেকে সব কাজ যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় সে ব্যবস্থা করল।
আব্বার মৃত্যুর পর নূর-এর মধ্যে আশাতীত পরিবর্তন লক্ষিত হ’ল। খানাপিনা ধরতে গেলে তার উঠেই গেছে। এক সকালে নূর তার ঘরে বসে আব্বার স্মৃতিচারণে মগ্ন। এমন সময় দরওয়াজার কড়া নাড়ার শব্দ তার কানে এল। দরওয়াজা খুলতেই তার সমবয়সী এক নওজোয়ান ঘরে ঢুকে এল। তার বাবার দোস্তের লেড়কা। সে সমবেদনা প্রকাশ করতে গিয়ে নূরকে বলল-দোস্ত, এমন করে ভেঙে পড়লে কি করে চলবে বল দেখি? দুনিয়ায় কেউ-ই চিরদিন থাকে না। দেনা-পাওনা মিটিয়ে দিয়ে আজ না হােক কাল সবাইকে দুনিয়া ছেড়ে যেতে হবে শােক না করে বরং একে স্বাভাবিক বলেই মেনে নেওয়া উচিত।
নূর কিন্তু সব বুঝেও যেন কিছুই বােঝে না। সে আব্বাকে কিছুতেই ভুলতে পারে না। তার দোস্ত এবার বলল—“তুমি বরং এক কাজ কর, সব ইয়ার দোস্তদের একদিন ডেকে খানাপিনা করাও । এতে শােক তাপ কিছুটা কেটে গিয়ে দিল হাল্কা হতে পারে। নূর ভাবল, পরামর্শটি মন্দ নয়। এতে সবার সঙ্গে মােলাকাতও হবে। হাসি-মস্করার মধ্যে মনের তাপ-জ্বালা হাল্কা হতে পারে। আলি তা-ই মনস্থ করল।
জিগরী দোস্তের পরামর্শে আলী নূর সেদিন সন্ধ্যাতেই ইয়ার দোস্তদের নিমন্ত্রণ করল।
নূর-এর নির্দেশে পরিচারক-পরিচারিকারা বাড়িটিকে সুন্দর করে সাজাল। প্রত্যেকটি কামরাকে সাজিয়ে গুছিয়ে এমন করে তােলা হ'ল যেন কোন উৎসবের আয়ােজন করা হয়েছে।
সন্ধ্যা হতে না হতেই ইয়ার দোস্তরা এক এক করে নূর-এর বৈঠকখানায় জড়াে হতে লাগল। অনেক রাত্রি পর্যন্ত চলল নাচাগানা হৈ হুল্লোড় আর খানাপিনা। জিন্দেগীকে আজ যেন সে নতুন করে উপভােগ করল।
আলী নূর আগেকার সে হাসি-আনন্দময় জীবন ফিন ফিরে পেল। এবার থেকে প্রায় প্রতি রাত্রেই সে পালা করে সওদাগর ইয়ার দোস্ত ও আমীর ওমরাহদের নিমন্ত্রণ করে নিজের বাড়ি আনতে লাগল। গভীর রাত্রি পর্যন্ত চলে খানাপিনা, নাচা-গানা আর হৈ হুল্লোড়।
আনিস-এর কিন্তু প্রথম থেকেই স্বামীর এসব কাজে আপত্তি ছিল। তার যুক্তি আমীর-বাদশাহদেরই এসব মানায়। তার পক্ষে অবশ্যই নয়। তাই এসব বন্ধ করতে পরামর্শ দিল। নইলে অচিরেই পথের ভিখারী বনে যেতে হবে এরকম কথাও সে বলতে ভােলে নি।নূর কিন্তু তার কথা হেসে উড়িয়ে দেয়। সে বরং বলে আমি উজিরের বেটা, এসব একটু-আধটু না করলে ইজ্জত থাকবে কেন? আর সমাজে মান-ইজ্জতই যদি না থাকে তবে দুনিয়ায় থাকা আর না থাকা দু'-ই সমান। আর অমীর-ওমরাহদের হাতে রাখলে ব্যবসাবাণিজ্যে নিজেকে লিপ্ত করে আয়-উপার্জন কোন ব্যাপারই নয়।
কিছুদিনের মধ্যেই তার বিবি আনিস-এর কথাই বাস্তব রূপ নিল। নূর-এর জেব ফাকা। ইয়ার দোস্তদের নিয়ে মজলিস বসানাে তাে দূরের কথা তার এখন নিজের সংসারই অচল হয়ে পড়ল। কিন্তু ইয়ার দোস্তদের ঢেউ বন্ধ হ’ল না। তারা রােজ সন্ধ্যা হতে না হতে তার বাড়ির বৈঠকখানায় এসে জড়াে হতে থাকে। সে উপায়ান্তর না দেখে একদিন দোস্তদের কাছে নিজের আর্থিক পরিস্থিতির কথা বলে। পরামর্শ চায় কি করে অর্থোপার্জন করে সংসারের দুরবস্থা ফেরাতে পারবে।
নুর-এর দোস্তরা সবাই একথা-সেকথা বলে কেটে পড়ে। ইয়ার-দোস্তরা বিদায় নিলে তার বিবি আনিস সে-ঘরে এল। সে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ সবই শুনছিল। এবার স্বামীর গায়ে-মাথায় হাত বােলাতে বােলাতে বলল—এখন আর ভেবে দিলকে কষ্ট দিয়ে লাভ কি। এ যে ঘটবে আমি তাে আগেই বহুবার তােমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম। দুনিয়ার নিয়মই তাে এ-ই। দুর্দিনে কোন দোস্তকেই কাছে পাবে না।
নূর বলে—এরা মুখ ঘুরিয়ে বলে গেলেও আমার সব দোস্তরা অবশ্যই এরকম আচরণ করবে না। কোন কোন দোস্ত আছে যারা আমার জন্য জান কবুল করতেও কসুর করবে না।'
-শােন, তােমার সব দোস্তকে আমি দেখি নি বটে। তাদের চরিত্র সম্বন্ধেও আমি অজ্ঞ। কিন্তু আমার বিশ্বাস, আজ এ দুঃসময়ে সবার কাছ থেকেই একই আচরণ পাবে।
নূর আর কথা বাড়াল না। তখনকার মত প্রসঙ্গটি সেখানেই চাপা পড়ে রইল। পরদিন কাক-ডাকা সকালে আলী নুর এক দোস্তের ঘরে গেল। নিগ্রো দাসীকে দিয়ে খবর পাঠাল। বেশ কিছুক্ষণ বাদে সে ফিরে এসে গম্ভীর মুখে বল্ল মনিব বললেন, তিনি বাড়ি নেই। নুর আশাহত দিল নিয়ে অন্য আর এক দোস্তের বাড়ি গেল। তার কাছ থেকেও একই রকম আচরণ পেল। একের পর এক করে দশ দশজন দোস্তের দরজায় দরজায় সে ঢুঁড়ে বেড়াল। খালিহাতেই সবার কাছ থেকে ফিরতে হ’ল। কিন্তু এদিকে তার ঘরে একটিও দানা নেই। দুপুরে হাঁড়ি চাপানাে সংস্থান পর্যন্ত নেই। এখন উপায়? খালি হাতে সে বিবির সামনে গিয়ে কোন মুখে দাঁড়াবে।
আলী নূর ঘরে ফিরলে আনিস ম্লান হেসে বলল—“কি, তােমাকে আমি বলিনি, দোস্তদের কাছ থেকে কেমন আচরণ তুমি পেতে পার?' চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবার সে বলল—“দামী ও অপ্রয়ােজনীয় আসবাবপত্র যা আছে কিছু কিছু বেচে দাও। নূর করলও তা-ই। কিন্তু বসে খেলে বাদশার ধন দৌলতও দু’ দিনে ফুরিয়ে যেতে বাধ্য।
নূর অর্থোপার্জনের কোন ফিকির করতে না পেরে একদিন চোখের পানি ঝরাতে থাকে। আনিস সেখানে হাজির হয়। স্বামীর গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বলে—পুরুষ মানুষকে কাঁদতে নেই। এতে তাে জনানাদের একচেটিয়া অধিকার। তুমি তাে জানই আমার রূপের জৌলুষ দেখে তােমার আব্বাজী একদিন আমাকে দশ হাজার সােনার দিনার দিয়ে কিনেছিলেন। আমি মনে করি এখন তার চেয়ে খুব কম দাম পাবে না। সে অর্থ দিয়ে বাণিজ্য কর। দু’ দিনে তােমার হালৎ ফিরে যাবে। আমাদের পেয়ার-মহব্বতে কোনদিনই ঘাটতি হবে না। আল্লাহর দোয়া থাকলে আমরা একদিন না একদিন আবার মিলিত হবই। আলী নূর বিবির কথায় সচকিত হয়ে ওঠে। তাকে দু হাতে জড়িয়ে ধরে বলে—“তা হয় না মেহবুবা। তােমাকে হারিয়ে জান বাঁচবে না আমার। শান্তির তাগিদে আমাকে জান দিতে হবে। আনিস তবু একই কথার পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত অনন্যোপায় হয়েই নূর তার কলিজা আনিসকে বাজারে নিয়ে গেল। ক্রীতদাসীদের সারিতে দাঁড় করিয়ে দিল। বসরাহ-র ক্রীতদাসীর বাজার তামাম দুনিয়ার মধ্যে সেরা। দুনিয়ার বাদশাহ, সুলতান, উজির আর আমিররা এখান থেকে তাদের মন পছন্দ ক্রীতদাসী কিনে নিয়ে গিয়ে তাদের রূপ-যৌবন ভােগের মাধ্যমে জিন্দেগী সার্থক করে তােলে। এখান থেকেই আনিস উজিরের বাড়ি যায়। তার লেড়কা নূর-এর কণ্ঠলগ্না হয়। আবার একই উদ্দেশ্যে, তাকে এসে বসরাহর বাজারে ক্রীতদাসীদের সারিতে আজ দাঁড়াতে হয়। একেই বলে নসীব। খােদাতাল্লার মর্জি।।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সে-দালালটি সেখানে হাজির হয়। আনিস’কে দেখেই চিনতে পারে। মুখে বিস্ময়ের ছাপ এঁকে সে নূরকে বলে—“হুজুর, আপনি একে পেলেন কোথায়? উজির সাহেব তাে একে সুলতানের বাঁদী করার জন্য আমারই কাছ থেকে খরিদ করেছিলেন। দাম পেয়েছিলাম পুরাে দশ হাজার দিনার। কিন্তু হাত বদলে এ আপনার হাতে এল কি করে ?
নূর অতর্কিতে তার মুখ চেপে ধরে অনুচ্চ কণ্ঠে বলে—“আরে করছ কি ভাইয়া! এর নাম আনিস-ই বটে। কিন্তু সুলতান যে বাদী করার জন্য কিনেছিলেন কারাে কাছে ফাস কোরাে না। তােমাকে আসল ঘটনা খুলে বলছি, আমার শত্রুর অভাব নেই। কাছে এসাে। আমাদের গােপনে সব কাজ সারতে হবে। আজ আমার দিন গুজরান করাই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন ফন্দি ফিকির করতে না পেরেই তো একে বাজারে এনে দাঁড় করিয়েছি। এ আমার কলিজার সমান, আশা করি অনুমান করতে পারছ?
দালালটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে—“হুজুর, সবই খােদাতাল্লার মর্জি। সবই নসীব। নসীবকে এড়াবেন সাধ্য কি ? আপনি এ নিয়ে ভাববেন না। আমি সবচেয়ে বেশী দামে একে বেচার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি। আপনি মুখ বুজে থাকবেন দাম দস্তুর যা করার আমিই করছি। দালালটি এবার আনিস’কে পছন্দমত এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে গলা ছেড়ে তার গুণগান করতে থাকে। বেহেস্তের হুরী তামাম দুনিয়া ঢুঁড়েও এমন আর একটি লেড়কি মিলবে না। এর শরীরে যেমন রূপের বাহার তেমনি বহুগুণে গুণান্বিতাও বটে। একমাত্র জহুরীই রতন চিনতে পারে। পছন্দ করার মত নজর থাকা চাই। সমঝদার আদমী ছাড়া এর কদর বুঝবে না। এমন আরও বহু কথা বলে দালালটি চিল্লাতে লাগল।
দালালটির কথায় মজে গিয়ে এক বণিক এগিয়ে এল। বােরখার নাকাবটি তুলে দেখল। প্রথম দর্শনেই তার দিল মজে গেল। ব্যস, হেঁকে বসল চার হাজার সােনার মােহর। দালালের মন ভরল না।
সুলতানের উজির মইন তখন বাজারে ক্রীতদাসী পছন্দ করে বেড়াচ্ছেন। হাঁটতে হাঁটতে আনিস-এর কাছে এলেন।
উজির মইন’কে দেখেই দালালটি নতজানু হয়ে কুর্নিশ করল। মইন বললেন—এ ক্রীতদাসীটিকে আমি খরিদ করতে চাই। দাম কত ? ‘হুজুর, এক বণিক চার হাজার সােনার দিনার দাম হেঁকেছে। আপনি এবার মেহেরবানি করে বলুন, কি দাম দেবেন?
‘আমি সাড়ে চার হাজার সােনার দিনার দিচ্ছি। আনিস সেদিনের সেরা ক্রীতদাসী। ঠিক মত নিলাম হলে চড় চড় করে দাম উঠত। কিন্তু বদমেজাজী উজির মইন-এর ভয়ে কেউ আর দাম হাঁকতে কোশিস করল না, সাহস পেল না।
উজির মইন এবার বললেন—“আর কোন কথা নয়। পুরাে সাড়ে চার হাজার সােনার মােহরই পাবি। ক্রীতদাসীটিকে আমার ওখানে পৌঁছে দিয়ে আয়। আলী নূর কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে সবই শুনল। মাত্র সাড়ে চার হাজার সােনার দিনার দাম শুনে তার দিল মােচড় দিয়ে ওঠে। দালালটি বােঝায়—“হুজুর, আপনার বিবির ওপর শকুনের নজর পড়েছে। নেকড়ের মত একবার যখন নচ্ছারটি এর দিকে থাবা বাড়িয়েছে তখন এর বেশী দাম ও দেবে না। আবার খরিদ না করে হতাশ হয়েও ফিরবে না। সে আপনার আব্বাজীর সঙ্গে জিন্দেগী ভর শত্রুতা করে গেছে। তার কোনই ক্ষতি করতে পারেন নি। আজ তিনি বেহেস্তে। আর শয়তান মইন সুলতানের দরবারে সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছেন। দুনিয়াকে সরা জ্ঞান করছেন। তার সঙ্গে আপনারা বিবাদ করতে পারেন বটে, কিন্তু আমি নাচার হুজুর। হেরফের কিছু করতে গেলে আমার ধড় থেকে গর্দান নামিয়ে দেবে। নুর হতাশার স্বরে বলে—তবে এখন উপায়? যদি উচিত দামই না পেলাম, বেঁচে থাকার মত ফিকিরই যদি নাই হয় তবে আর আমার বিবি, আমার কলিজাকে অন্যের হাতে তুলে দিতে যাব কেন?
–‘দর দস্তুর হয়ে গেছে। এখন আর কিছু করার নেই। কিছু করতে গেলে উজির মইন আমাকে জানে খতম করে দেবে। মুহূর্তকাল ভেবে দালালটি এবার বলল-“হুজুর, একটি ফন্দি করা যেতে পারে। আমি যখন একে নিয়ে উজিরের বাড়ির দিকে যেতে থাকব তখন আপনি ছুটে গিয়ে খপ করে এর হাত চেপে ধরবেন। বলবেন—“হতচ্ছাড়ি, চললি কোথায় ? তুই কি ভেবেছিস, আমি সত্যিই তােকে বেচে দেয়ার জন্য বাজারে নিয়ে এসেছি! আর যাতে ঝগড়া, খিটমিট না করিস, আমার ওপরে হাত না চালাস সে জন্যই একটু ভয় ডর দেখাতে এনেছিলাম। আর কোনদিন যদি বে-ফাস কিছু করিস তবে কিন্তু সত্যি সত্যি বাজারে বেচে দিয়ে যাব। খুব হয়েছে, এখন বাড়ি চল—এমন সব কথা বলবেন হুজুর।
নূর বলল—‘জব্বর ফন্দি বাৎলেছ দোস্ত! ঠিক আছে, তােমার কায়দা-কৌশলকেই কাজে লাগাব।' দালালটি আনিস’কে নিয়ে উজির মইন-এর বাড়ির দিকে সবে দু’পা এগিয়েছে অমনি নূর ছুটতে ছুটতে গিয়ে তার গালে আলতাে করে এক চড় বসিয়ে দিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল— হারামজাদী! বজ্জাত মাগী কাহাকার! চলেছিস কোথায় শুনি? কিলিয়ে মেরুদণ্ড ভেঙে দেব বলে দিচ্ছি! জিন্দেগী ভর অনেক জ্বালিয়েছিস, হাড্ডি পােড়া পােড়া করে ছেড়েছিস। আর যদি কোনদিন বেলাল্লাপনা করিস তবে সত্যি সত্যি তােকে বাজারে বেচে দিয়ে যাব। আজ তাের গােস্তাকী মাফ করে দিচ্ছি বটে। ভবিষ্যতে এরকম হলে তাের নসীব সত্যি সত্যি এ বাজারে নিয়ে আসবে, মনে রাখবি। কথা বলতে বলতে নূর আনিস’কে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে। ব্যাপার দেখে মইন এগিয়ে এসে ধমকের স্বরে বলে—“আরে, এ হচ্ছে কী! একে নিয়ে কোথায় চললে হে? আমি সাড়ে চার হাজার সােনার দিনারের বিনিময়ে একে খরিদ করে নিয়েছি।'
—“ঘরের বিবিকে বাজারে বেচতে হবে এরকম হালৎ এখনও হয় নি আমার।’
বকবকানি রাখ বাছাধন। তােমার সংসারের হালতের কথা আমার আর জানতে বাকী নেই। হাড়িতে ছুঁচো ডিগবাজী খাচ্ছে। দিন গুজরান করাই তােমার এখন দায়। যাক, হুজ্জতি বাঁধাবার কোসিস না করে মানে মানে এখান থেকে কেটে পড়। আমি সাড়ে চার হাজার সােনার দিনার দিয়ে খরিদ করেছি। একে আমার ঘরেই নিয়ে যাব।'কথা বলতে বলতে তিনি আনিস-এর দিকে হাত বাড়ান। ( চলবে )

0 Comments